29 December, 2008

কল্পের নায়কদলঃ এক কোটি তরুণ ভোটার

কখনো কখনো কাটতি বেড়ে যায় কারো। প্রয়োজনের মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ আসে ব্যক্তি-দল কিংবা গোষ্ঠী থেকে। এবার নির্বাচনে যেমন বলা হচ্ছে নবীন এবং তরুণ ভোটাররাই ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন চিন্তা হুটহাট বা হুজুগে নয়, বরং তাদের থিংকট্যাংকরা বেশ ভেবেই তরুণদের কাছে ভোট চাইছেন।

কেনো চাইছেন, সেটা স্পষ্ট হবে যদি বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়স ভিত্তিক সেগমেন্টে তাকাই। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে - ২০০৬ সালের তথ্য মতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যক হচ্ছে ২২.২ বছর। অর্থ্যাৎ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে এদের সবারই বয়স ছিলো সতেরোর কাছাকাছি। সে সূত্রে একেবারে নতুন ভোটারের এ গোষ্ঠী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে 'মহামূল্যবান'। নানান সূত্র বলছে - এবারের ভোটারদের ৩৩ শতাংশ তরুণ ভোটার, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪/২৫এর মধ্যে। জনসংখ্যার এ বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ কী চায় বা কী ভাবে সেটি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কখনো ভেবেছেন বলে চোখে পড়েনি। ২৫ বছর আগে কিংবা এর কাছাকাছি সময়ে, আমার মতো, যাদের জন্ম তাদের কৈশোরে কিংবা উঠতি যৌবনে পলিটিক্যাল আইকন বলে ছিলেন না কেউ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে মসনদ দখলের জন্য প্রতিহিংসার রাজনীতি ছাড়া তেমন বলার মতো কিছু চোখের সামনে ঘটেনি। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় - আ'লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার 'ভিশন ২০২১' নতুন ভোটার হওয়া তরুণ-তরুণীদের উৎসর্গ করেছে। অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের শেষ অংশে জাতীয় উন্নয়নে যুবশক্তিকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা হবে সে কথা বলা হয়েছে। এসব কথা শুনতে খুব ভালো লাগে। এতো স্বপ্ন দেখারই বয়স।

আমার যেমন ভালো লেগেছিলো ২০০১ সালে। এরকমই নির্বাচনের একদিন বা দু'দিন আগে হাতে এসেছিলো ৩২ পৃষ্ঠার নিউজ 'পৃন্টে' ছাপানো সাপ্তাহিকটি। মনকাড়া প্রচ্ছদ। চোখে চশমা পরে মোটরবাইক দিয়ে দাঁড়ানো সুদর্শন তরুণ। খানিক তফাতে গেঞ্জি আর জিন্সে মোবাইল হাতে হেটে যাচ্ছে তরুণী। মাঝামাঝি পড়ে আছে একটি বই - 'এ বৃফ হিস্টৃ অফ টাইম', লাল রঙা প্রচ্ছদের ব্যাকগ্রাউন্ডে দালান ছিলো এবং পাশে সূর্য উঠার ছাপ ছিলো বলে মনে পড়ছে। প্রচ্ছদ কাহিনী 'এক কোটি তরুণের কাছে একটি আবেদন'। চৌষট্টি কিংবা পঁয়ষট্টি অথবা সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়েসে সে সাপ্তাহিকের স্যুটেড বুটেড এডিটর চমৎকার একটি চিঠি লিখেছিলেন। 'আমার তরুণ বন্ধুরা, আমার তরুণ বান্ধবীরা' ডেকে 'তুমি' সম্বোধনের অনুমতি নিয়েছিলেন। তারপর নানান ছলে চার-দলীয় জোটের জন্য ভোট চেয়েছিলেন। 'অমুক দলকে ভোট দিও' এমন কথা তিনি সরাসরি বলেননি। তিনি তুলনা করেছিলেন, সে সময়কার দুই নেত্রীর, দুই অর্থমন্ত্রীর, দুই দলের ক্ষমতার দুই টার্মের। তারপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন তরুণ বন্ধু ও তরুণী বান্ধবীদের উপর। শেষে ছোটো ছোটো বাক্যে বলেছেন - 'কারো কথায় ভয় পেয়ো না', 'সকাল সকাল কেন্দ্রে যেও', 'আগে আগে ভোট দিও'। কিন্তু মাঝে দেখিয়েছেন দূর্দান্ত কিছু স্বপ্ন, প্রচ্ছদের অলংকরণের মডেল তরুণ তরুণী জীবন।

সেবার ভোটার হইনি। নইলে ঐ চিঠি পড়ার পরে আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাতাম, শুনেছি পালটিয়েছে অনেকে। মূল বক্তব্যে ভোটের আহবান হয়তো ছিলো, কিন্তু অমন চিঠি আমাকে কেউ কখনো লিখেনি। কেউ বলেনি - দেশের তরুণ হিসেবে আমার মোবাইল পাওয়ার অধিকার আছে। বিদেশে তরুণদের গাড়ী আছে- এপার্টমেন্ট আছে- ক্রেডিট কার্ড আছে, চাকরীর নিশ্চয়তা আছে, গার্লফ্রেন্ড আছে। আর বাংলাদেশের তরুণরা বেকার হয়ে হন্য জীবনে কাটাচ্ছে। সে চিঠিতে চিরযৌবনা এডিটর এ'ও লিখেছিলেন- 'বিদেশে তরুণদের গার্লফ্রেন্ড আছে। অথচ চাকরী নেই বলে তোমরা ভরা যৌবনেও (প্রাইম ইয়ুথ) বিয়ে করতে পারছো না'। ওয়াও! তরুণদের অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি জৈবিক চাওয়া নিয়ে এমন করে আর কেউ ভেবেছেন বলে মনে পড়েনি। তাই সে চিঠি আমি বারবার পড়ি। হয়তো দু'পৃষ্ঠার চিঠি, কিন্তু কী দূর্দান্ত তার ভাষা, কী চমৎকার আহবান, লোভনীয় জীবনের ডাক!

দু'দিন পরে নির্বাচনে সেই এডিটরের ঘনিষ্ট দলটি জিতে। ভুমিধ্বস সে জয়ের উন্মাদনায় অনেক কিছুই ঘটে। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় শহরের কাকগুলোও বিষন্ন হয়ে যায়। তারপর ঋতু বদলায়। দেয়ালের পোস্টার খসে পড়ে। কিন্তু আমি যত্ন করে রাখি সে চিঠি, ৩২ পৃষ্ঠার সাপ্তাহিক। তরুণেরা এবার গার্লফ্রেন্ড না হোক, চাকরী অন্ততঃ পাবে সে আশায় চোখ রাখি স্মার্ট এডিটরের লেখায়। কিন্তু এ কী! তিনি আরও তরুণ হয়ে গেলেন। নানান রঙা শার্ট পরে (হয়তো আগেও পরতেন) লাল গোলাপ হাতে পেছনের জুলফি সামনে এনে ট্রেন্ডি করে চটাস চটাস করে বিদেশি ম্যুভির ক্লিপ দেখান। শুনেছি এমন অনুষ্ঠান তিনি আগেও করতেন। কিন্তু এবারও বিটিভির অনুষ্ঠানের চেয়ারটি তিনি নিজেই দখল করেছেন, সেখানে বসানোর মতো আরেকজন তরুণ খুঁজে পাননি। ওদিকে ঢাউস সাইজের বিশেষ সংখ্যায় তরুণরা লিখে যাচ্ছে তাদের প্রাইম ইয়ুথে ঘটে যাওয়া শরীরি সম্পর্কের ফ্রয়েডীয় কিংবা গুপ্তীয় গল্প। বিশেষ সম্পাদকীয়তে এডিটর জানাচ্ছেন - 'এসব গল্প আগামী দিনের সমাজ বিজ্ঞানীদের নীরিক্ষার বিষয় হবে'। কিন্তু, এক কোটি তরুণের কী হবে!

বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি, এক কোটি তরুণের একজন (স্ত্রী সহ) বিটিভি'র প্রাইম টাইমের স্লট দখল করেছিলেন। এই তরুণ পরে প্রবীণ পিতাসহ 'বিকল্প' পথ ধরেছেন। আরেক তরুণ অবশ্য তরুণের পর্যায়ে নেই। সেই এডিটরের ভাষায় বাংলাদেশের মহাথির তিনি। মালয়েশিয়া থেকে শেখার জন্য কিনা জানি না, তবে কতো কোটি টাকা কী জানি কী হয়েছে, আঁটকে গেছে। এই শাহেনশাহ তরুণের কাছাকাছি বন্ধুরা কেউ টিভি চ্যানেল করেছেন, ফোন কোম্পানী এনেছেন। এগুলোর অর্থায়ন সুত্র নিয়েও নানান তর্ক আছে, মামলা আছে। আজ এটিএন বাংলায় রাহুল রাহার সাথে 'লীড নিউজ' অনুষ্ঠানে বিএনপির মিস্টার রিজভী অবশ্য বলছিলেন, "বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রের কৈশোরিক অবস্থায় দূর্নীতি একেবারে না থাকা সম্ভব নয়"। প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বড়ো কথা নয়, 'গণতন্ত্রের কৈশোরিক অবস্থা' কী, সেটা ভাবতেই অনুষ্ঠান শেষ। রাহুল রাহা বুঝেছেন কিনা জানি না। যাক, তরুণের গল্প ছেড়ে কৈশোরে নয়। ক্ষমতাবান তরুণেরা সব মামলা থেকে মুক্ত হবেন, ইতোমধ্যে হতে শুরু করেছেন, আরও হবেন, একেবারে বিশুদ্ধ তরুণ হবেন। বিপরীতে হার্ভাড/ক্যামব্রিজের পেপার নিয়ে আলোচনায় আসছেন আরেক তরুণ। তিঁনি বিদেশীনি গার্লফ্রেন্ডকে বৌ করেছেন, রাণীমা'র উজির নাজিররা লিখছে - সম্ভবনা আছে তিনিই হবেন রাজীব গান্ধী, তাঁর বিদেশীনি স্ত্রীটি সোনিয়া স্টাইলে দেশে আলো দেখাবেন। হয়তো সেসব কেবলই কল্প-গল্প। কিন্তু, শেষতক সে-ই সুদর্শন চির তরুণ সম্পাদকের পরিণতি মইন-মিলার কল্পগল্পের চেয়েও করুণ হয়েছে। লাভ রোডে 'সাদ্দাদের বেহেশতখানা'য় লস দিয়ে 'পালাতে গিয়ে' বিমান বন্দরে আঁটকে গিয়েছিলেন। তখনো আমি সে-ই চিঠিওলা ম্যাগাজিন সাথে নিয়ে ঘুরি। ইরাবতী বা কাওয়াই নদীর ওপাশে গেলেও একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরীর সাথে ভাজ করে রাখি। স্বপ্নগুলো সত্যি হোক না হোক, কল্পগল্প মনে করেই পড়ি সে চিঠি। সময় যায়, পাঁচ বছর, ছয় বছর। কেবল অপেক্ষায় থাকি, একবার যদি দেখা হয় - চিঠিটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করবো, 'আমাদের কাছে এ চিঠি আপনি লিখেছিলেন, মনে আছে?' দেখা হয়নি। বরং গত মে মাসে আরেক চিঠিতে তিনি বিদায় জানিয়েছেন ২৯ বছরের আজন্ম সংস্পর্শের পত্রিকা থেকে। সে চিঠি পড়ে আমি হতাশ হয়েছি, বিমর্ষ হয়েছি। তরুণদের মিছে স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁর কী লাভ হলো, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চিন্তা বাদ দিয়েছি। কেবল, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছি - 'আই ফিল স্যরি ফর ইউ, মিস্টার রেহমান!'

নির্বাচনের এ ডামাঢোলে, নবীন/তরুণদের জপাজপিতে আজ খুব মনে পড়ছে মিস্টার রেহমানের সে চিঠির কথা। প্রথম কৈশোরে প্রেমিকার লেখা চিঠির অনুভব যেমন প্রায়ই নস্টালজিক করে তোলে, ঠিক তেমন করে মনে পড়ছে। বাসায় কোথাও কোনো ফাঁকে আছে হয়তো এখনো। আজ বাদে কাল নির্বাচন। বিশাল তরুণ গোষ্ঠী ভোট দিবে। এক কোটি তরুণের একজন হয়ে, খুব আশার কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বেকারত্ব বাড়ছে, চাকরীর বাজার সংকোচিত হচ্ছে, ধনী-গরীবের আয় বৈষম্য বাড়ছে দিনদিন। বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দা ২০০৮এ গেলো এবং এখনো চলছে তার ধাক্কা বাংলাদেশে বিন্দুমাত্র গেলেও নতুন সরকার কীভাবে সামলাবে। জনসংখ্যার বিকাশমান বা বিস্ফোরন্মুখ যুব অংশের কর্মসংস্থান কোথায় কীভাবে করা হবে সেটা হয়তো দেখার বিষয় হবে। কে জানে, হয়তো আরো একজন শাহাবুদ্দিন প্লেনের চাকায় চড়ে বিদেশ যেতে চাইবে, অবৈধ পথে ইউরোপ পাড়ি দিয়ে গিয়ে মাঝ সমুদ্রে পথ হারাবে মুন্সীগঞ্জের সোলায়মান, স্বপ্নভূক হয়ে মারা যাবে তারা, এবং আরও অনেকে। কুয়েতে ন্যুনতম মজুরী চাওয়া শতশত শ্রমিককে আধা রুটি খেতে দিয়ে রোদের মধ্যে পাথরে দাঁড় করিয়ে রাখবে, প্লেন ভর্তি করে রক্তাক্ত জামায় এসব মিসকিনদের ফেরত পাঠানো হবে স্বদেশে। এসব দেখে আমাদের নতুন রাষ্ট্রযন্ত্র পুরনোর মতোই নির্বিকার থাকবে। পাঁচতারার বলরুমে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে প্রকাশিত প্রচারিত হবে - এবারও জিডিপি গ্রোথ সেভেন পার্সেন্ট। ধুমপান ও রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ বাড়বে। এক কিশোরী তার ফেসবুক প্রোফাইলে পলিটিক্যাল ভিউ লিখবেঃ All Sux। তখন বিভিন্ন চ্যানেলে তরুণদের আইকন সাজবেন একজন ভুঁড়িওলা বিগত বিতার্কিক। চল্লিশ ছোঁয়া হাল্কা সাদা হওয়া চুলে কলপ লাগিয়ে তরুণদের জায়গাটি তিনি দখল করে নিবেন। পরিপাটি গোঁফে, মেক-আপে স্যুটে বুটে, তিনি বলবেন, 'প্রিয় তরুণ বন্ধুরা, তোমরা হয়তো জানো, এডমান্ড বার্ক বলেছিলেন...'।

.
.
.

Read more...

24 December, 2008

নাভিদ মাহমুদের বাংলা কমেডি

একটা সময় ছিলো যখন কৌতুক শিল্পীদের কদর ছিলো। নানান অনুষ্ঠানে তাঁদের ডাকা হতো। অডিও ক্যাসেট বিক্রি হতো; মিঠু-সাইফুদ্দিনের নানা নাতি, কাজল, কইঞ্চেন দেহি জুটি। কিংবা আরও পরের হারুন কিসিঞ্জার। মনে আছে, বিটিভিতে রবিউলের সিংহের সাথে সাহস দেখানোর অংশটুকু দেখার জন্য রাত জাগতাম শৈশবে প্রতি ঈদে। সাথে থাকতো চার্লি চ্যাপলিনের জুতা সেদ্ধ করে খাওয়ার দৃশ্য। তখন থেকে অবশ্য হানিফ সংকেত এবং 'ইত্যাদি' অদম্য। বিটিভি'র ফুয়েল হিসেবে এখনো আছে 'ইত্যাদি'। ৯৪-৯৫'র দিকেও ইত্যাদি'র ক্লিপগুলোর অডিও এলবাম বের হতো। এখন মনে হয়- তেমন কাটতি নেই অডিও'র।

আরও পরে দৈনিক পত্রিকা সাপ্তাহিক ফান সাপ্লিমেন্ট চালু করেছে। মানুষের বিনোদনের বিস্তৃতি বেড়েছে অনেক। কেউ কেউ বলে থাকেন, নানান যন্ত্রণার এ জীবনের পুরোটাই রম্য, সেখানে ঘটা করে কমেডি শো'র দরকার হয় না।

কিছুদিন আগে রাসেল পিটার্সের স্ট্যান্ড আপ কমেডি দেখছিলাম। হিউমার এবং উইটের মিশ্রণ দেখে বুঝেছি কেনো সে এত জনপ্রিয় ইদানিং। ইন্টারনেটে নানান লিংকের সুত্র ধরে পেলাম বাংলাদেশী নাভিদ মাহবুবের স্ট্যান্ড আপ শো। একটি মনে হয় ঢাকার কজমো লাঊঞ্জে, বাকীগুলো বিদেশে। কিছু আছে ইংরেজীতে।

বাংলা স্ট্যান্ড আপ কমেডি চর্চা বা ধারা তেমন চোখে পড়ে না। এ অবস্থায় নাভিদ মাহবুবের শো দেখে মনে হলো, মন্দ না।
ইন্টারনেট স্পীড এবং সময় মিললে দেখতে পারেন, প্রিয় সচলবাসীঃ



_

ইউটিউবে আছে আরো বেশ কিছু।

.
.
.

Read more...

20 December, 2008

হিট ফ্লিমঃ সলিমুল্ল্যাহ টিনার ভালোবাসা

'আমি হয়তো এখন ট্যাম্পু চালাই, এক সময় চালাতাম বাস-ট্রাক-ট্রেন, হয়তো এরোপ্লেন। কিন্তু টিনা, তুমি আমার ভালোবাসার দাম বুঝলে না। আমার জন্য রয়েছে এখন শুধু কমলাপুর রেল স্টেশন, আর সেই আন্তঃনগর ট্রেন। ...ভালোবাসার এ অপমান সলিমুল্ল্যাহ সইবে না, সইবে না।'

হ্যাঁ। সে-ই চিরাচরিত দ্বন্ধ।
নায়িকা বড়লোক বাবার কন্যা, আর নায়ক? সে তো এক সাধারণ ট্যাম্পু ড্রাইভার। যার মুখ দিয়ে গ্যাসের গন্ধ আসে, যার ক্ষমতা নাই একটা টুথপেস্ট কিনবে। সে দাঁত মাজে টুথ পাউডার দিয়ে। কী করে সে নায়কা টিনাকে (আগের নাম আশা/হাশা) হরেক রকম বিদেশি জুতা, সানগ্লাস, টাইট গেঞ্জি কিনে দিবে? তাই শেষে নায়িকা টিনার আকুতি - 'সলিমুল্ল্যাহ তুমি চলে যাও, প্লিজ আমাকে ভুলে যাও।'

পরের দৃশ্যে নায়ক কী করবে? সে কি মদের বোতল হাতে 'এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু' গাইবে? নাকি সে-ই ডেটিং স্পটে গিয়ে রাজ্জাকের স্টাইলে মাটিতে বুক ঠেকিয়ে 'প্রেমের নাম বেদনা' গাইবে?

না, এসব কিছু না। দেখুন 'ফুয়াদ ফিচারিং শাহিন, জোহান, শিহাব ও লামিয়া'। গানের মডেলে আছে - মৌ/সজল।

তার আগে গানের কিছু লাইনঃ

"টিনা গো, তেরি লম্বা কালে বাল
মন চায় যে মন কিসিংমিসিং
ইয়ার গোরে গাল ।
ডিস্টিং ঢিস্টিং টিস্টিং করে
নায়ক গেলো ট্যাম্পু চড়ে
তেলের ট্যাঙ্কে দুঃখ ভরে..."

"গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল
টিনা দেয় না আমায় বেইল
আমি লিখলাম ওরে লিখলাম চিঠি
চুপিচুপি চুপিচুপি..."
সখী গো আমি তোর প্রেমে পাগল
মন ধন আমি সবই দিলাম
বানাইলি ছাগল।"


ইউটিউবের কল্যাণে দেখুনঃ


স্লো ইন্টারনেটে অডিও:

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


ফুয়াদের গান প্রথম শুনি - "সোনা বন্ধু তুই আমারে ভোঁতা দা দিয়া কাইট্যালা, পীরিতের কাঁথা দিয়া জাইত্যা ধইরা মাইরালা।" খুব বেশি আগ্রহ পাইনি সে সময়। সচলায়তনেও একবার বোধ হয় ফুয়াদের গানের লিরিক্স নিয়ে কথা বলেছিলেন কার পোস্টে। এবার ইউটিউবে পেয়ে মুগ্ধ হলাম। বিনোদনে পরিপূর্ণ ফুয়াদ এবং তার প্রচেষ্টা... ।


বোনাস অথবা এক টিকিটে দুই ছবিঃ
টাইটেল - "দুই দুইটা গার্লফ্রেন্ড লইয়া ফড়ছি আমি ফাঁন্দে"।



অডিও:
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


জয়তু, ফুয়াদ প্রোডাকশন।


.
.
.

Read more...

17 December, 2008

বাংলা ব্যান্ডের দেশের গান

আমার যখন গান শোনা শুরু তখন ব্যান্ডের উঠতি সময়। ড্রামের বিটে একটু উঁচু গলায় গান শুরু হয়েছে। বড়োদের প্রায়ই বলতে শুনেছি, 'এরকম চিৎকার করে না গাইলে গান হয় না?'
অবাক লাগে, পরে ব্যান্ডের গানে এতো হেভি মেটাল এসেছে যে ঐসময়কার গানগুলোকে এখন খুব সফট মনে হয়। ডিফারেন্ট টাচের 'শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে' বা 'দৃষ্টি প্রদীপ জ্বেলে খুঁজেছি তোমায়' প্রায় দুই দশক কাল টিকে আছে। মনে পড়ছে অরবিট/অরকিড ব্যান্ডের কথা। অনেক খুঁজে পাইনি আর 'ময়নার মা গো হাঁচা কইরা কই তোমারে' গান।
'ফ্রম ওয়েস্ট' নামের আরেকটা এলবামের কথা মনে পড়ে। আইয়ুব বাচ্চুর 'বেলা শেষে ফিরে এসে' ঐ এলবামের গান। আরেকটা হিট ছিল - 'রাজাকার' গানটা। মাঝে মাঝে ভাবি ৯০/৯১এ রাজাকার'এর মত সাহসী গান গাওয়া হলো, পরে এমন হলো না কেনো? প্রেম ভালোবাসার ভার বেশি হয়ে গেলো?

গতকাল বিজয় দিবসে ব্যান্ডের কিছু চমৎকার দেশের গান শুনলাম, আবার।
মনে হলো এখানে লিংক রাখি। প্রতিটা গান নিয়ে আলাদা অনুভূতি আছে, বলার কথা আছে।
আপাততঃ লিস্টিই দিই -
__

আজম খান

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


__
মাকসুদ ও ঢাকা
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

___

সাডেন
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

___

হাসান
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

___

আইয়ুব বাচ্চু
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

___

শুভ্রদেব-শাকিলা
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

___

জেমস
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


.
.
.

Read more...

10 December, 2008

ঝিলিমিলি



"দক্ষিণা বাতাসের তোড়ে খয়েরি ডিঙার পাল ওড়ে রে,
ঢেউয়ের তালে নাচে ডিঙা,
ঝিলমিল নদীর কুলে আসি রে,
কান্দে তবু মন কেনো কান্দেরে,
যখন সোনালী রুপালী আলো নদীর বুকে বাসা খোঁজে রে।
মাইনস্যের স্বপন - ঘুণে ধরা বৈঠা যেনো,
দুমড়ায় মোচড়ায় যায় সব -
বন্ধু রে..."


(ব্যান্ডঃ ভূমি)


Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


১০ ডিসেম্বর, ২০০৮ ।
.
.
.

Read more...

08 December, 2008

গরুর খোঁজে, ফেইসবুকে

বিকেলে পাশের বাড়ীতে খানিক চাপা হৈ-হল্লা পড়ে গেলে তৌসিফ দ্রুত বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসে। এমন সমবেত চিৎকার সাধারণতঃ এ বাড়ির কারো কানে আসে না। কিন্তু তৌসিফ এ আওয়াজ শুনলো। কারণ, জানালা খোলা রাখার কারণে পাশের বাড়ীর বারান্দায় কী কী আলাপ হয়, বাড়ীর মালিক মতিন চাচা উঁচু স্বরে চাচীকে কী কী বলেন সব তার কানে চলে আসে। এরচেয়েও বড়ো কারণ কখন আকাঙ্খিত সে ডাক শোনা যাবে – ‘মা আমি বাইরে গেলাম, দরজা লাগিয়ে দাও’। এ ডাক শোনার পরে তৌসিফ দ্রুত জিন্সে পা গলায়, আরও দ্রুত জামায় এক্সাইট স্প্রে করে। তারপর হুড়হুড়িয়ে মোড়ের রাস্তা ধরে – ‘সুমাইয়া, কলেজে যাচ্ছো?’

ঈদের ছুটিতে সুমাইয়ার কলেজ বন্ধ, প্রাইভেটেও যায় না। বরং আজ দুপুরের পর থেকে সুমাইয়ার সিডি প্লেয়ারে বাজছিলো – ‘চাঁদের আলো যদি ভালো লাগে, কাল হয়ে যায় ঝাপসা, আমার এ তরী যদি চলে যায়, ফিরে আর আসবে না’। দূর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট গানে কান পেতে তৌসিফ আনন্দআলো’র চলতি সংখ্যায় ‘অপি করিমের আয়নাঘর’ পড়ছিলো আর ভাবছিলো আগামীকাল কীভাবে সুমাইয়াদের বাসায় যাওয়া যায়। এর মাঝে আচমকা এমন হৈ-হল্লায় সে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।

মতিন চাচা হন্তদন্ত হয়ে কথা বলছেন। পেছনে চাচী। সুমাইয়াকে দেখা যাচ্ছে না। মতিন চাচা কোনদিকে যাবেন সেটাও ভেবে পাচ্ছেন না, ডান-বাম করছেন। চাচীও অস্থির। শেষে চাচা পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে ডান দিকে রওনা দিলে তৌসিফ চাচীকে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে। চাচীর কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমেছে। অস্থিরতায় জড়ানো গলায় যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে কুরবানীর গরু হারিয়ে গেছে। কীভাবে হারালো, কোথায় হারালো, কখন হারালো এসব প্রশ্নের সাথে দারোয়ান মাসুদ কই ছিলো সে প্রশ্ন চলে আসে। আর জানা যায়, গরুর সাথে সাথে মাসুদও নাই। মাসুদ কোথাও গেলো আর এই ফাঁকে চোর গরু নিয়ে হাওয়া হলো, নাকি মাসুদ নিজেই গরু নিয়ে হাওয়া হলো সে প্রশ্নের উত্তরে চাচীও দ্বিধাগ্রস্থ। কেবল বলেন, দেখো তো তোমার চাচা আবার কোনদিকে গেলো।

মতিন চাচা গরুর খোঁজে রাস্তায় হন্য হয়ে ঘুরছে, চাচী গেটে দাঁড়ানো; তখন তৌসিফের ছাদে যেতে ইচ্ছে করে। ‘এই ছাদে আমি আর ঐ ছাদে তুমি’ স্টাইলে সুমাইয়ার সাথে ইটিশপিটিশ করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চাচীর উৎকন্ঠা ‘দেখো তো, তোমার চাচা কোনদিকে গেলো’ তৌসিফকে দায়িত্বশীল করে তোলে। তার মনে হয় এ-ই সুযোগ, চাচার সাথে গরুর খোঁজে বের হয়ে খানিক প্রিয় হওয়া যাবে। এসব ভেবে তৌসিফ দৌড়ে ডান দিকের রাস্তায় যায়। অনেক দৌড়ে মতিন চাচার কাছাকাছি আসতেই চাচা ঘাঁড় বাঁকিয়ে একবার তাকান। যখন দেখে তৌসিফও সমান তালে লম্বা লম্বা পা ফেলছে তখন মতিন চাচা জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি আমার সাথে কোথায় যাচ্ছো?’
‘আমিও যাই চাচা, গরু খুঁজি’।
‘তোমাকে কে বলেছে আমাদের গরু খুঁজতে?’
তৌসিফ এবার চুপ থাকে। তবে পা চলা বন্ধ করে না।
‘এই ছেলে, কথা শোনো না কেনো? যা-ও বলছি।‘
তৌসিফ এবার থামে। বলে, ‘চাচা, আমি তাহলে ঐদিকটাই খুঁজি?’
মতিন চাচা কথার জবাব দেন না। আগের মতোই ছুটতে থাকেন। তৌসিফ তখন লীফা কনফেকশনারীর সামনে এসে খানিক জিরোয়। সেন্টু-জাহিদদের খোঁজ করে। সবাই মিলে খূঁজলে হয়তো গরু পাওয়া যাবে। পরের মুহুর্তেই মতিন চাচার খিটখিটে আচরণ মনে পড়ে। তার মনে হয়, কোনো দরকার নেই খোঁজার, গরু হারিয়েছে বেশ হয়েছে। তখন তৌসিফের কল্পনায় ভেসে উঠে সারা বিকেল সন্ধ্যা রাত ঘুরেও মতিন চাচা তার গরু খুঁজে পাবে না। ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরবে ঘাম নিয়ে। তৌসিফ আজ রাতে এসএমএস এ সুমাইয়াকে বলবে – ‘কী আর করবে, আমাদের বাড়ী চলে এসো, গোশত কেটে দিও। এক কসাইয়ের টাকা দেব, ব্যাগ ভর্তি গোশত দিবো, চাইলে কলিজা-চর্বি দেবো।‘ সুমাইয়া কী বলবে সেটা ভাবার সুযোগ হয় না। সামনে মোটরবাইক থামায় অয়ন ভাই, কলেজের ছাত্র সংসদের সভাপতি।
হাত তুলে ‘স্লামালাইকুম ভাইয়া’ বলতেই অয়ন ভাই ডাক দেয়, ‘কী করিস? এদিকে আয়, বাইকে উঠ।‘

কোথায় যাবে সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে জানা যায় সামনের ইলেকশনের এমপি ক্যান্ডিডেট আসাদ ভাই এলাকায় এসেছে। ঈদে সবার সাথে দেখা সাক্ষাত করছে, মূল কাজ নির্বাচনী প্রচারণা তো আছেই। তৌসিফ জানে না এইসব জায়গায় তার কী কাজ থাকতে পারে, তবুও অয়ন ভাইয়ের সাথে উদ্দেশ্য-কারণ-জিজ্ঞাসায় যায় না। ঠান্ডা বাতাসে মোটরবাইকে শীতশীত ভাব লাগছে আর কেনো জানি সুমাইয়াকে মনে পড়ছে।

ঝিলের পাড় ব্রিজের উপরে মোটর বাইক উঠলে অয়ন দেখে দূরে মাঠ দিয়ে মাসুদ হেটে যাচ্ছে, সুমাইয়াদের দারোয়ান মাসুদ। হাতে রশি ধরা গরু। তৌসিফের মনে হয় – আর্কিমিডিসের মতো ইউরেকা ইউরেকা বলে চিৎকার দেয়। অয়ন ভাই মোটর বাইক থামিয়ে কাহিনী শুনলে দ্রুত দুইজন মাঠে নেমে যায়। মাসুদ খানিক থতমত খেলেও বলে, ২দিনে গরুটা দূর্বল হয়ে পড়েছে, তাই সে ভেবেছে – এদিকটায় এনে ঘাস খাওয়ালে ভালো হবে। আর যাই হোক কাল সকালেই এই গরুর জীবন শেষ। মাসুদের এ গল্প নিতান্তই বানোয়াট মনে হয়। বোঝা যায় – গরু নিয়ে ভাগছিলো সে। নয়তো কাউকে না বলে কয়ে এতো দূরে এনে গরুকে ঘাস খাওয়ানোর কী দরকার হলো। মাসুদ কথার পিঠে কথা বললে অয়ন ভাই মাসুদের শার্টের কলার চেপে ধরে, বলে – ‘তুই কোন স্কুলে পড়ছোস?’
এরকম কথা কাটাকাটি শেষে অয়ন ভাই তৌসিফকে দায়িত্ব দেয় গরু এবং মাসুদ দুইটাকে নিয়ে সুমাইয়াদের বাসায় পৌঁছে দিতে। আসাদ ভাইয়ের মিটিং্যের দেরী হয়ে যাবে তাই অয়ন ভাই মোটর বাইকে টান দেন। ওদিকে গরু আর মাসুদকে সামনে রেখে তৌসিফ রাস্তা ধরে।

পথে পথে মাসুদ নানা বাহানা দেয়। বলে তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না, চুরি তো নয়ই, ক্ষুধার্ত গরুর জন্য তার মায়া চুপসে চুপসে পড়ে। তখন তৌসিফের মাথায় অংক খেলে। দুয়ে দুয়ে আর আর দুই দু’গুনে চার মিলে যায়। মাসুদকে হাত করার এই সুযোগ, সামনে নানান কাজে তাকে দরকার হতে পারে। আর আজ এই মুহুর্তে মাসুদকে চোর প্রমাণের চেয়েও নিজেকে হিরো বানানোর বড়ো দরকার। আর সে সুযোগ যখন হাতের কাছে চলে এলো তখন বৃথা হেলা করা কেনো!

খানিক ধমকের পরে মাসুদকে বুঝানো হয়, তাকে চোর বলা হবে না। বরং বলা হবে সে’ও হঠাৎ বিকেলে গেটের কাছে গরু না দেখে খুঁজতে বের হয়েছিলো। ভয়ে কাউকে বলেনি কিছু। তবে শেষমেশ গরু খুঁজে পেয়েছে তৌসিফ। ঝিলের পাড় ব্রিজের অন্য পাশে দড়ি ছেড়া গরু দেখে তৌসিফ ভেবে নিয়েছে এটাই সুমাইয়াদের গরু। গরু নিয়ে আরেকটু সামনে আসতেই মাসুদের সাথে দেখা, তখন মাসুদ সনাক্ত করে এটাই তাদের গরু। এ গল্পের ফরম্যাট ঠিক হয়ে গেলে দুজনেই খুশি হয়ে সুমাইয়াদের বাসার গেটে কড়া নাড়ে।

তখন সন্ধ্যা নেমেছে। টিভিতে দু’জন মডেল সেলিব্রিটি আর একজন নাট্যকার মিলে খাসির শাহী কোর্মা রান্না শিখাচ্ছে। মতিন চাচা গরু দেখে উল্লাসে ফেটে পড়লেন। মাসুদ তুই কই ছিলি জিজ্ঞাসার পরে যখন তিনি জানতে পারেন সব কৃতিত্ব তৌসিফের তখন তিনি তৌসিফের মাথায় হাত বুলান। বেঁচে থাকো বাবা, বলে বিকেলের রাগী কথার জন্য একটু লজ্জিতও হন – ‘বুঝো তো বাবা, ঈদের আগের দিন গরু হারানো। কাল বাসায় এসো বাবা, তোমার বাবা মা’কেও আসতে বলো’।
তৌসিফ তখন সুমাইয়ার দিকে তাকায়। নোকিয়া এন সিরিজের নতুন সেটে গরুর ছবি তুলছে সে, আর এমন ভাব করছে যেনো তৌসিফকে চিনেও না সে।

তৌসিফের নিজেকে কেমন যেনো সুপার হিরো মনে হয়। মনে হয় এরচেয়ে বেশি আনন্দের ঈদ হতে পারে না। সুমাইয়ার উপর একটু অভিমান হয়। কী এমন ক্ষতি ছিলো একটু কথা বললে। সুমাইয়া এক কাপ চা খেয়ে যেতে বললে চাচা-চাচী কি বাধা দিতো আজ? এ অভিমানে তৌসিফ সুমাইয়াকে ফোন করে না সে। আরও খানিক পরে ফেসবুকে লগ ইন করলে নোটিফিকেশনে দেখে ‘সুমাইয়া মতিন ট্যাগড ইউ ইন ওয়ান ফটো'।
তৌসিফের বুকটা ধক করে উঠে। তবে কি গোপনে সুমাইয়া তখন তার ছবিও তুলে নিয়েছে! স্লো ইন্টারনেটে আস্তে আস্তে পেজ ওপেন হয়। কিংবা অতি উৎসাহে তৌসিফের মনে হয় পেজ ওপেন হতে দেরী হচ্ছে খুব। শেষে একটা গরুর ছবি আসে, দেখা যায় ছবির নাম – ‘আমাদের কোরবানীর গরু, আজ হারিয়ে গিয়েছিলো’। গরুর পেটে ট্যাগ করা – তৌসিফ রহমান। রাগে তৌসিফের দাঁত কিড়মিড় করে। তখন মোবাইল ফোনে রিং হয়। সুমাইয়ার ফোন – ‘কী খবর, হলি কাউ- পবিত্র গরু?’
তৌসিফ চুপ করে থাকে।
সুমাইয়া জিজ্ঞেস করে – ‘কাল বাসায় আসবে তো? পরশু সকালে ফ্রি আছো? ঘুরতে যাবে?’
তৌসিফ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। মনে হয় এর জবাব গরু খোঁজার চেয়েও কঠিন।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তৌসিফ টাইপ করে –
‘আগামীকাল সুমাইয়া গরুর গোশত খাবে’।

.
.
.

Read more...

02 December, 2008

খুচরা দিনালাপ

টিটিসি'র বাসে উঠে ড্রাইভারকে পাস কার্ড দেখিয়ে সীটে বসতে যাচ্ছিলাম। ড্রাইভার ডেকে বলে, আজ নভেম্বর মাস, নতুনটা দেখাও।
নিজেকে সামলে নিয়ে নভেম্বরের কার্ড দেখালাম। আর ভাবলাম, খেয়ালই নেই আজ এক তারিখ।
এ ঘটনা ঘটার পরে আরও একমাস পার হয়ে গেলো, মনেই পড়েনি কিছু। আজ মনে পড়লো, কারণ আজ আবার ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাই। অকারণে ভালোলাগার ডিসেম্বর মাস।

০২
সেমিস্টার শেষের দিকে এলো।
ফাইনাল পরীক্ষা আর পেপার নিয়ে চক্কর খাচ্ছি।
ডিসেম্বরের ১৪তে শেষ হবে সব।
তারপর ৩ সপ্তাহ বিরতি। আহ!

০৩
প্রথমবারের গুলো গলে যাওয়ার পর আর বরফ পড়েনি।
ঠান্ডা থাকছে।
পরশু বিকেলে ভার্সিটি যাবো ভেবে রাস্তায় দাড়াই, বাস আসে না।
১০-২০-৩০ করে ৩৫ মিনিট। ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা।
রাগ করে ঘরে ফিরে এলাম।
যত্তোসব।

০৪
গতকাল থেকে চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে।
আজ সকালে ফেইসবুকে পাসওয়ার্ড ৩বার ভুল টাইপ করলাম।
অনেক অবহেলা হয়েছে।
এবার ডাক্তার দেখাতেই হবে।
'কোন ব্যাটা শয়তান, নাকে বসে ধরে কান?'

০৫
মাইকের সাথে পরিচয় ওরিয়েন্টেশনে।
এখানকার ছেলে পেলে এত ভদ্র বিনয়ী হতে পারে সেটা মাইককে না দেখলে বুঝতাম না।
গতকাল কথা প্রসংগে বলছিল ওর আন্ডারগ্রেড হিস্ট্রিতে।
জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশের হিস্ট্রি কি জানো বলো?
বলে, আগে ইস্ট পাকিস্টান ছিল, পরে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ হয়েছে।
জিজ্ঞেস করলাম, যুদ্ধে কতোজন মারা গেছে জানো?
জানে না।
বললাম, থ্রি মিলিয়ন।
শুনে শুধু চমকানো না, আকাশ থেকে পড়ার চেয়েও বেশি।
খেমারুজের কাহিনীর সাথে তুলনা করি।
সে আমাকে পালটা জিজ্ঞেস করে, "তুমি পাকিস্টানীদের সাথে কেনো কথা বলো? তোমাদের তো পাশেই বসা উচিত না।"

মাইককে কিছু লিংক পাঠাবো, 'বাংলাদেশ ১৯৭১'।

.
.
.

Read more...

29 November, 2008

এবং গান

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

লাকী আখন্দের 'আজ আছি কাল নেই, অভিযোগ রেখো না'

___

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


সম্ভবত পাঞ্জাবী ভাষার গান, বুঝি না কী বলে, তবে ভালো লাগে

___

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


শিল্পীর নাম আসিফ-মুন্নী। রুচিশীল শ্রোতার কাছে ভ্রু কুঁচকানো গান।

Read more...

24 November, 2008

বরফ মোড়ানো দিনে চিরায়ত অবিশ্বাস

বুধবার থেকে বরফে ঢাকছে সারা শহর। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। সকাল মানেই হুলস্থুল, হুড়োহুড়ি। আধ মগ চা''য়ে আধা চুমুক দিয়ে, শীতের ভারী কাপড় গায়ে চাপিয়ে, ক্যালেন্ডার চেক করে বই খাতা ব্যাগে ভরতে সোয়া আটটা পার। দরজা লক করে সামনে তাকাতেই দেখি আটটা তেইশের বাস চলে গেলো মাত্র। আবার পনেরো মিনিট অপেক্ষা...। কালকে আর দেরী করবো না, এ বাস ধরতেই হবে ভেবে ভেবে ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকি। নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়।
ম্যাকগাইভারকে মনে পড়ে...।

ঝামেলা লেগে আছে প্রথম দিন থেকে। আসার দিন এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন শেষে স্টাডি পারমিট পেয়েছিলাম সহজে। সহজে বলতে - লাইনে অপেক্ষা করা লাগেনি বেশি, উটকো প্রশ্ন করে বিব্রত করেনি। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে ঐ পারমিট পেয়ে ভাজ করে পাসপোর্টে রেখেছিলাম সযত্নে। পরে দেখেছি, ভেতরে ঘাপলা আছে। সুন্দর করে লেখা আছে, অথরাইজেশন ছাড়া পার্ট টাইম - ফুল টাইম কোথাও কাজ করার অনুমতি নেই। এই জিনিস কেনো লিখে কার জন্য লিখে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। কাউকে দেয়, কাউকে দেয় না। ইচ্ছেমতোন ব্যাপার-সেপার। ধারণা করা হয়, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট সুযোগ পেলে অন-ক্যাম্পাস কাজ করবে। পেলামও সেটা। কিন্তু, অনুমতি নিয়ে ঝামেলা রয়ে গেলো। সোশ্যাল আইডেন্টিফিকেশনের কাগজ আনতে স্পেশাল অনুমতি লাগতে পারে, বিগত ভুক্তভোগীরা এমনটাই জানালো। অনেক চক্কর দিলাম, তবে শেষে জানা গেলো - এখন নিয়ম শিথিল, ঐ কথা লেখা থাকলেও সমস্যা নেই, অনুমতি পাওয়া যাবে। এবং গেলো। তবে - আমার নানান ভুলে এবং এইচ আরের বিচিত্র ছুতোয় পেমেন্টে ঝামেলা থাকছে। শেষ নেই ঝামেলার, কতোই আর বোঝাপড়া করা যায়। 'শিখছি দিবা রাত্র'।

অবশেষে পাকি চক্করেঃ
পাকি'প্রজাতির সাথে মেলামেশার দূর্ভাগ্য আগে হয়নি। টুকটাক সম্ভবনায় সযতনে এড়িয়ে গেছি। এবার তিনটা কোর্সে গ্রুপ মেম্বার পড়লো পাকি। কিছু করার নাই, র‌্যান্ডমলি সিলেক্ট করা হয়। সচলে ঐ সময় কী বোর্ড ঝড়, বিষয় - পাকিদের সাথে অবস্থান-ঘৃণা নাকি সহানুভূতি নাকি কনটেক্সট বিচার। অনেক কিছু পড়লাম, অনেক কিছু বুঝার চেষ্টা করলাম, বেলুচ সৈয়দের কাহিনীও জানলাম। আর ভাবলাম, কে জানে এবার আমি হয়তো নিজের 'গোয়ার্তুমি' থেকে বেরিয়ে আসবো। পাকিদের আলাদা আলাদা করে বিচার করবো। আমার সহপাঠী আমিনা মালিক (আটলান্টিক পেরিয়ে নামের প্রথম অংশ 'আম্ন্যা' হয়ে গেছে), আমের আব্দুল্লাহ কিংবা ফ্যাসাল (আসলে 'ফয়সাল') মুমতাজদের কাছে থেকে চিনে নেবো। ক্ষতি কী যদি নতুনভাবে ভাবার কিছু সুযোগ পাই। তাই চুপ থাকি যখন আমের পাঞ্জাব আব্দুল্লাহ পরিচয়ের শুরুতেই আমি রোজা আছি কিনা, ও পরে আমাকে তারাবীর নামাজের জন্য ভালো মসজিদের সন্ধান দিতে চায়। বলি, এ শহরে আমার বন্ধু-বান্ধব যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। কোথায় কী আছে সে-ই ওরিয়েন্টেশন আমার হয়ে গেছে। অথবা আমি থাই খাবারের ফ্যান শুনে আম্ন্যা যখন আমাকে বলে - 'থাই ফুড হালাল না। ফিশ স্যুপ কিংবা ভ্যাজিটেবল খেলেও ইনগ্রিডিয়েন্ট নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।' তখন কড়া কথা না বলে প্রবাস জীবনে এত ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র ব্যাপারে আমার উদাসীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। বড়জোর বলেছি, 'দ্যাখো, এসব নিয়ে আমার সমস্যা নাই'। এরপরে আর কথা বাড়ায়নি - কারণ, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম 'ওরিয়েন্টেশনের ২য় দিন লাঞ্চে পিজা খেয়েছো সেটা কি হালাল ছিলো'? তখন সে বলে, আসলে বাইরের ব্যাপারগুলো যতটা পারে এভয়েড করে, কিন্তু ঘরে তার হাজব্যান্ড এবং সে এসব ব্যাপারে খুব সতর্ক। আমের আবদুল্লাহ তখন হে হে করে হাসে। এই হাসিতে আমার মনে পড়ে - আমার দাদীর কাছে, নানীর কাছে এখনো ৭১এর হানাদার মানে পাঞ্জাবী। পাকি সৈন্য মানে পাঞ্জাবী। আমার খুব সহজ হিসাব - এ আমের আব্দুল্লার পূর্ব পুরুষ এসে আমার পূর্ব পুরুষের ঘর জ্বালিয়ে গেছে, মানুষ মেরে গেছে নির্বিচারে। তার এই হে হে হাসিতে আমি পিশাচের শব্দ ছাড়া কিছু পাই না। কিন্তু, তখন আমি চুপ থাকি। অধুনা ডাইভার্সিটি ম্যানেজমেন্টের ছাত্র হয়ে আমি শেখার চেষ্টা করছি অনেক কিছু। তাই তীব্র আবেগ তখন চেপে রাখি। সে তুলনায় আমেরিকায় বড় হওয়া ফেস্যালকে মান সম্মত মনে হয়। অন্ততঃ আচরণে সমস্যা নেই। শেষে তাদেরকে মনে না নিলেও মেনে নিই।
এ মাঝে আরেক পাকির খপ্পরে পড়লাম। তার নাম দিলাম 'তর্তাজা বাটপার'।

তর্তাজা কাহিনীঃ
বিজনেস স্কুলের অনেক ইতং বিতং আছে। মুখের কথায় বেচাকেনা করতে হবে। আর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা লোকালদের তুলনায় এদিকে একটু পেছানো। কম্যুনিকেশন ডেভেলপমেন্ট ও নেটওয়ার্ক বিল্ডিং প্রোগ্রামে বিদেশী ছাত্রদের একজন করে সুপারভাইজর দেয়া হয়। পড়ালেখার কিছু নেই। এটার মূল কাজ হলো, ভিনদেশী ছাত্র যারা এই কালচারে একেবারে নতুন তাদের লোকাল বিজনেজ কম্যুনিটির সাথে পরিচয় করানো। নানান লোকাল ইভেন্টে পাঠানো, লোকজনের সাথে পরিচয় বাড়ানো। এবং এসব করে করে বাজার চাহিদার সাথে নিজেকে চাল্লু করা। খুব ইন্টারেস্টিং মনে হলো। অন্ততঃ আমার জন্য তো উপকারী বিষয় বটেই। প্রথম একটু ধাক্কা খেলাম যখন জানলাম আমার সুপারভাইজরের নাম তর্তাজাবাটপার ফ্রম পাকিস্তান।
এসিস্টেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অভয় দিলো, সমস্যার কিছু নেই, সে খুব ভালো লোক।
ভাবলাম, ক্ষতি কি যদি একজন ভালো পাকির দেখা পাই ভবে...।

কথা অনুযায়ী মেইল করলাম, বললাম - তোমার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে, তোমার অফিস আওয়ার জানাও।
রিপ্লাই আসে না।
৮ দিনের দিন দেখা এসিস্টেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের সাথে, নিজ থেকে জিজ্ঞেস করলো সুপারভাইজর কেমন? বললাম, সে তো আমার মেইলের রিপ্লাই করে নাই। এসিস্টেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর বললো, ঠিক আছে আমি দেখছি।
কী হলো জানি না, সে রাতেই মেইল পেলাম, তর্তাজা লিখেছে - শুক্রবার আফটারনুনে দেখা করো।
শুক্রবার সোয়া ১২টায় গেলাম। আমাকে দেখেই রুম থেকে বেরিয়ে এলো - 'তুমি এখন কেনো এসেছো? আমি তো এখন ব্যস্ত। আমি এখন দুপুরের খাবার খাবো, অনেক কাজ।'
ক্ষ্যাপা আচরণ।
বললাম, 'আমাকে মেইলে বলেছ আফটারনুনে আসতে। তাই আসলাম। তাহলে বলো আমি কখন আসবো?'
'চারটায় আসো'।
কী আর করা, অপেক্ষা করি। আর ভাবি, আমাকে প্রথম দেখায় এই হারামি চিনলো কীভাবে? উত্তরটা খুজে পেতে দেরি হয়নি। স্টুডেন্ট প্রোফাইল চেক করা কঠিন কিছু না।
চারটায় আবার গেলাম। রুমে বসতে বললো।
বাংলাদেশে কোথায় ছিলাম, কী করতাম এসব জেনে জিজ্ঞেস করলো - বাংলা বলি কিনা। (আরে হারামি, বাংলা বলবো না তো কী বলবো? উর্দু/হিন্দি?)
এরপরে সে 'আমার সোনার বাংলা' বলার চেষ্টা করলো। বুঝলাম, প্রিপারেশন ভালো নিয়েছে, আমাকে ভড়কানোর চেষ্টা করছে। এটা একেবারে নিশ্চিত হলাম যখন জিজ্ঞেস করলো - মনিকা আলীর নাম শুনেছ?
বললাম, 'হু, ব্রিক লেন লিখেছে'।
'পড়েছ?'
'না'।
'অবশ্যই পড়বা। লিখে রাখো, এটা কিনতে হবে - যদিও তুমি মনিকাকে পছন্দ করবা না।'
জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন? মনিকাকে কেনো পছন্দ করব না?'
'যে কারণে তোমরা তসলিমাকে পছন্দ করো না...'
কী আজব! জিজ্ঞেস করলাম 'তোমাকে কে বলছে, আমি তসলিমাকে পছন্দ করি না?'
তর্তাজা আকাশ থেকে পড়লো, 'তুমি তসলিমার লেখা পছন্দ করো? লেজ্জা পড়েছো?'
বললাম পড়েছি।
এরপরে সে আরামবোধ করলো না, 'ওকে, এ প্রসংগ বাদ দাও'।
এবার শুরু করলো আমার কী কী করতে হবে, প্রতিদিন ১টা করে বিজনেস নিউজ এনালাইসিস, ৫০০ শব্দের মধ্যে। প্রতি উইকেন্ডে লোকাল কম্যুনিটি লাইব্রেরিতে গিয়ে যা যা প্রোগ্রাম হয় ওগুলো এটেন্ড করতে হবে, সেটা নিয়ে রিপোর্ট লিখতে হবে। সাথে বললো 'পত্রিকা হার্ড কপি সাবস্ক্রাইব করবা, লেখার সাথে পেপার ক্লিপ দিবা, ইন্টারনেট থেকে প্রিন্ট আউট নিলে তুমি সিরিয়াস থাকবা না'।
আর এর মাঝে ৩বার বললো, 'ডোন্ট চিট'।
এটা আমার মেজাজ চরম খারাপ করে দিলো। ফুল টাইম স্টুডেন্ট, পার্ট টাইম কাজ; ঐসব বাড়তি এসানমেন্টের টাইম কই? আর এই তর্তাজা দেখি আগে থেকে সব ডিসিশন নিয়ে আছে। আমাকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে ইচ্ছা মত আউল-ফাউল কথা বলে যাচ্ছে।
আঙুল তুলে বলে, 'শোনো - তুমি কানাডা আসছো, ঢাকা কখনো ফিরবা না, সুতরাং তুমি কানাডার কালচার সোসাইটি ভালো করে বোঝার চেষ্টা করো।'
বললাম, 'আমি থাকবো না। পড়া শেষে ঢাকা ফিরবো, এখানে থাকতে আসি নাই।'
সে বলে, 'না, তুমি ফিরবা না, আমি জানি।'
আবারও বলি, 'আমি ফিরবো, তুমি জানো না'।
তর্তাজা বলে, 'আমার সাথে ২ বছর পরে দেখা করো...'
বললাম, 'দু বছর না, যাবার আগেরদিন তোমাকে মেইল দেবো'।
তর্তাজা এবার থামে।
শেষে বললো, সব মিলিয়ে ৫টা কাজের লিস্ট। এই ৫টা কাজ শেষ করে নিয়ে যেতে পারলে যেন আগামী সপ্তায় যাই, নইলে আর যেন দেখা না করি। তখন আমার মাথার ভেতর টং টাং কিরকির শব্দ করে।
ততক্ষণে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি এর সাথে কাজ করা যাবে না। সুপারভাইজর পাল্টাতে হবে। তাই চুপ থাকি, আম্ন্যা আর আমেরের মত একেও আপাতঃ সুযোগ দিই।...কথা বলে যা হে তর্তাজাবাটপার।

পরের সপ্তায় আমার প্রথম কাজ ছিলো এসিস্টেন্ট ডিরেক্টরের সাথে কথা বলা। বললাম সব কাহিনী। বলি, তর্তাজা যা করছে সেটা স্রেফ যন্ত্রণা দেয়া, কারণ এই প্রোগ্রামের অন্য কোনো সুপারভাইজর এসব শয়তানি করছে না। কিন্তু এ আবার উল্টা কথা বলে। আমাকে বুঝায় - 'জীবনে সব মানুষ একই রকম পাবানা। এটা তোমার জন্য চ্যালেঞ্জ। অপছন্দের লোকের সাথে কাজ করতে হয়।' পালটা টক্কর দিই, কিন্তু পাঞ্জা দেয়া যায় না। সেও স্বীকার করে তর্তাজার কিছু ইস্যু আছে, কিন্তু তাকে ম্যানেজ করতে হয়। আমি সাউথ এশিয়ার লোক হয়ে এসব বোঝার কথা। বলি, 'আমার বোঝার খায়েশ নাই। আমার সুপারভাইজর পাল্টাও।'
এসব শেষে দফা করলো তর্তজাকে ২ সপ্তাহ দেখবো, এর পরে কেমন লাগে জানাবো। কিন্তু, আমি তো বুঝে গেছি এই হানাদারের সাথে আমার মিলবে না। তবুও এসিস্টেন্ট ডিরেক্টরের কথা রাখি। পরের শুক্রবারে সময়মতো দুইটায় যাই। কোনো কাজ করি নাই। সে যদি বলে 'আল বিদা'। আমি বলবো 'আলহামদুলিল্লাহ'।
কিন্তু, দুটা বিশ মিনিটেও সে রুমে ফিরে না। চলে আসি। পরের সপ্তায় এসিস্টেন্ট ডিরেক্টরের কাছে যাই। সে জিজ্ঞেস করে -শুক্রবারে কী হলো। আমি বলি- কিছু হয় নাই। কারণ তর্তাজাকে পাই নাই। সে রুমে ছিল না, আমি ২০ মিনিট অপেক্ষা করেছি, এমনকি সে আমাকে মেইলও করে নাই। শুনে এসিস্টেন্ট ডিরেক্টর একটু কী যেনো চিন্তা করলো। তাকে বললাম, আমি এর মাঝে অন্য সুপারভাইজরের সাথে কথা বলেছি, সে আমাকে নিতে রাজী হয়েছে। এডমিন পারমিশন লাগবে। সো, তুমি প্রসেস করো। এসিস্টেন্ট ডিরেক্টর আমার ইমেইল ঠিকানা নিলো। বললো, মেইলে জানাবে।

বিকেলে তর্তাজার সাথে দেখা। আমাকে ডেকে বলে, স্যরি আমি ভুলে গেছিলাম সেদিন, কালকে আসবা আর আজকেই মেইল করবা টাইম কনফার্ম করে। সন্ধ্যায় মেইল করলাম, কালকে ৩টা থেকে ৫টা ফ্রি আছি। সে পরদিন রিপ্লাই করলো, আমি বিজি, শুক্রবারে ১১টায় আসো। আমি তারপরের দিন জবাব দিলাম - শুক্রবারে ঐসময় আমি ক্লাসে থাকি। এরপরে আমার সময় নাই। এবার সে মেইল করছে - নেক্সট মংগলবারে আসবা, ১টায়।
এখনো এই মেইলের রিপ্লাই করি নাই। করার ইচ্ছা নাই।
এই একটা অহেতূক যন্ত্রণা গত ৩ সপ্তাহ লেগে ছিলো। আশা করছি - নতুন সুপারভাইজর পেয়ে যাবো সোমবারে। না পেলেও সমস্যা নেই। এটাই ফাইনাল ডিসিশন - আলবিদা তর্তাজাবাটপার, পাকি হানাদারের উত্তরাধিকার।

আমের আব্দুল্লার হারামিনামাঃ
পরশু সকালে তাড়াহুড়া করে ক্লাসে চলে গেছি। ল্যাপটপের চার্জার নিতে গেছি ভুলে। দুপুরের মধ্যে চার্জ শেষ। টীমের সাথে প্রজেক্ট মিটিং। আমেরকে বললাম, 'তোমার ল্যাপটপে মেইল চেক করি?'
বিলকুল বিল্কুল বলে এগিয়ে দিলো।
লগ ইন করতে গিয়ে দেখে নিলাম রিমেম্বার পাসওয়ার্ড আছে কিনা। নেই।
মেইল চেক করলাম দ্রুত, ৪/৫ মিনিট লাগলো মোট। লগ আউট করে ল্যাপটপ ফেরত দিলাম।
ফেরত দিয়ে আবার মনে হলো, অন্য কোনো উপায়ে ইউজার নেম-পাসওয়ার্ড সেভ হয়ে যায় নাই তো?
সন্দেহ উকি দেয়ায় ল্যাপটপ আবার নিলাম।
কী আশ্চর্য্য! ইউজার নেমে s টাইপ করলেই আমার ইমেল এড্রেস চলে আসে। আর নিচে অটো হাজির আমার পাসওয়ার্ড!! ক্লিক করলে সাইন-ইনও হয়!!!
জিজ্ঞেস করলাম, কম্পুতে এই জিনিশ করে রাখছো আমাকে বলো নাই কেনো?
হারামির পাঞ্জাবী হারামি হে হে করে হাসে। বলে, এইটা ইচ্ছা করে করে রাখছি।
কিন্তু, পাকির বাচ্চা - তুই আমাকে আগে বললি না কেনো? তোর কম্পুতে আমার নাম আর পাসওয়ার্ড যে সেইভ হইল সেটা কি এথিক্যাল?
সে বলে, ' না না, আমি তোমার মেইল চেক করবো না'।
আরে কুত্তা, চেক করবি কিনা সেইটা পরের কথা। কিন্তু, তুই দেখলি আমি মেইল চেক করলাম। তখন বললি না কেনো? এটা তো ফাইজলামি না। এইটা সাইবার ক্রাইম।
সাথে সাথে ওর ল্যাপটপে কুকিজ ডিলিট মারলাম সব। আবার চেক দিলাম। আমার চিল্লাচিল্লি দেখে হারামি চুপ মেরে আছে।
ইচ্ছা করছিলো, কষে চড় মারি।
অনেক চেষ্টায় রাগ চেপে ল্যাবে গিয়ে বসে থাকি। এক বড়ভাই জিটকে, শুনে বললেন 'ওরে থাবড় মারা দরকার'।

থাপড় দেয়া হয় না।
কেবল নিজেকে নিজে বলি, 'হু, আমি কেবল গোয়ার্তুমি করেই পাকিদের অবিশ্বাস করি...'

.
.
.

Read more...

17 November, 2008

ভার্চুয়াল আচরণ বনাম ব্যক্তি অনুসন্ধান

যারা ব্লগস্পটে ব্লগান তাঁদের বেশিরভাগই কাউন্টার বসান - কে এলো গেলো, কোত্থেকে এলো, কেমন ভিজিটর এলো এসব জানতে। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। গুগলে কোন শব্দ সার্চ করে আমার ব্লগস্পটে কীভাবে কে এলো সেটাও দেখা যায়। গত এক মাসে খেয়াল করেছি জনৈক জম্মানবাসী সচলের নাম ধরে গুগলিং করে আমার নিজের ব্লগস্পটে ভিজিটর বাড়ছে। আটলান্টিকের এপার ওপার দুপার থেকেই গুগলিং হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে পোস্টে ভিজিটররা আসছেন সেটা নিছক কল্পগল্প। ব্লগ ইন্টার‌্যাকশনের অতীত না জানা থাকলে ঐ লেখা পড়ে নতুন কারো বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা মারাত্মক।

‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ সেমিনারে প্রফেসর আভনার প্রশ্নটা তুলেছিলেন কয়েক সপ্তাহ আগে। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে কারও সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া যায় সেটা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য। কিংবা পাওয়া তথ্য পুরোপুরি সত্য হলেও তার কতোটা গ্রহণ কিংবা কতোটা বর্জন করতে হবে?
তর্ক হয়েছে তুমুল।
কেউ তার নিজস্ব অবস্থান থেকে নিজের সাইট/ব্লগ চালাতে পারে। সেখানে তার নিজের রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলতে পারে। এটা নিতান্তই তার ব্যক্তিগত। কিন্তু, অন্যরা তার এ মত কিংবা আদর্শকে কীভাবে দেখবেন?

এ ব্যাপারেই জানতে চাইছি প্রিয় সচলদের কাছে -

কয়েকটা দৃশ্যকল্প দিলে মনে হয় ভালো হয়ঃ

এক.
একজন মানুষের সাথে নতুন পরিচয় হলো আপনার। তার সাথে সামাজিক কিংবা পেশাগত সম্পর্কের একটা সম্ভবনা আছে। যেমন, প্রেম বন্ধুত্ব বা বিয়ের প্রস্তাব হতে পারে। আবার হতে পারে তার সাথে ব্যবসা করবেন অথবা সে আপনাকে চাকরী দিবে তার অফিসে কিংবা আপনি তাকে চাকরী দিবেন আপনার অফিসে।
হঠাৎ মনে করলেন, আররে, গুগলে ওর নামে সার্চ মেরে দেখি তো কী কী আছে! এখন বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে। আপনি হয়তো তার ব্লগ পেলেন, কিংবা কোনো ফোরামে আলাপ-আড্ডা পেলেন, অথবা ফেসবুক একাউন্টের খবর পেলেন।

প্রশ্নঃ এসব জায়গায় পাওয়া তথ্যগুলোকে আপনি কতোটা সিরিয়াসলি নিবেন? যা পড়বেন তা কি বিশ্বাস করবেন? আগে যেমনটা বলেছি, সামাজিক বা পেশাগত সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব ভার্চুয়াল তথ্য আপনাকে কতোটা প্রভাবিত করবে?
__

দুই.
এটা আগেরটার সম্পুরক বা পরিপূরক। অনেকেই বলেন, ভার্চুয়াল স্বত্বা বাস্তব থেকে আলাদা। তার মানে কি এটা দাবী করা যাবে যে আমি অন্তর্জালে যা বলছি সেটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়! যাঁরা ছদ্মনামে লিখেন তাঁদের ব্যাপারটা আলাদা করে রাখি। কিন্তু যাঁরা নিজের নামে লিখেন, বিভিন্ন বিষয়ে তর্ক বিতর্কে অংশ নেন, তাঁরা কি নিজের সব মন্তব্যের কিংবা অবস্থানের দায়ভার নিবেন? ধরি একজন মানুষ নাম ‘গাজী ওবামাকেইন’। এটা তাঁর আসল নাম, তিনি এই নামেই ব্লগে লিখেন। যুক্তির আসরে ঝাপিয়ে পড়েন স্বউদ্যোমে। অন্যায় কথাবার্তা দেখলেই যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চান ঠান্ডা মাথায়। মাঝে মাঝে পারেন, মাঝে মাঝে পারেন না। তখন মাথায় রাগ চড়ে যায় আর প্রায়ই বলে ফেলেন – ‘রামছাগলের মতো কথা বললে গদাম লাত্থি খাবি’। এই কথা তিনি এতোবার বলেছেন যে একটু ডিটেইল গুগলিং করলে এই ব্যাপারটা সার্চে চলে আসে। এখন গাজী ওবামাকেইন চাকরি বা বিয়ের জন্য মাঠে নামলেন। চাকরীদাতা বা হবু শ্বশুর দিলেন গুগলে সার্চ। দিয়ে বললেন, ‘ধুর, ওতো অভদ্র রগচটা। দেখো কী সব নোংরা কথা বলে নানান ফোরামে।‘
আর এভাবে ক্রমাগতঃ বাদ পড়েন গাজী ওবামাকেইন। বন্ধুরা বিয়ে করে, বন্ধুরা চাকরি পায়। গাজী ওবামাকেইন অপেক্ষা করে সুদিনের। জানেও না কেনো সে বাদ পড়ে বারবার। জানলেও যুক্তি দেখায়, ‘আরে ওটা তো ভার্চুয়াল...’।

প্রশ্নঃ ভার্চুয়াল স্বত্ত্বা আর বাস্তব স্বত্ত্বাকে আপনি কতোটা একাত্ব বা আলাদা করে দেখেন? গাজী ওবামাকেইনের অন্তর্জালিক আচরণকে আপনি কেমন করে দেখবেন?

__
তিন.
এটা একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এটা হলো অন্তর্জাল আচরণের দায়ভার। যেমন ধরি, আমি সময় পেলে প্রায়ই ইউটিউবে ঘুরি। এরকম ঘুরতে ঘুরতে আজ পেলাম বাংলাদেশী সদ্য কিশোরী এবং সদ্য যৌবনা দুই বোনের মর্ডান নাচের ফাইল, গায়ে টি শার্ট- থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। পুরোটাই ঘরোয়া এমেচার কাজ। ভিডিও করেছে তাঁদের মা বা খালা বা বড়বোন বা অন্য কেউ। গুতিয়ে দেখলাম ঐ ইউজারের ফোল্ডারে এরকম আরও হাফ ডজন শৌখিন নাচ-গানের ভিডিও আছে। ধরি, নাচগুলো আমার কাছে খুব ভাল লাগলো। একটু ঝাকানাকা, তবে বারবার দেখার মতো ব্যাপার। কিংবা ধরি, আসলে সেরকম শিল্প মানের কিছু নয়, আমার উথাল-পাথাল বয়সের কারণেই এরকম অসাধারণ জিনিশ বলে মনে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, সচলায়তনে কিংবা ফেসবুকে দিই, সাথে আরও কিছু ইন্টারেস্টিং ভিডিও দিই। সবার সাথে শেয়ার করি। দেয়ার আগে কথা বললাম, আমার বাল্যবন্ধু দীপ্তর সাথে। সে প্রতিভাবান কম্পিউটার বিজ্ঞানী। এবং সে কম্পু-এথিকসের ব্যাপারে ভালো জানে। সে আমাকে বললো, ‘এটা একটু গ্রে সিদ্ধান্ত। তবে যেহেতু ধরা যায় এগুলো পাবলিক প্লেসে ওপেন করে রাখা আছে, সেহেতু তুমি সচলে এমবেডেড ভিডিও করে দিতে পারো। কিন্তু, খেয়াল রাখো – উলটা পালটা কমেন্ট আসলে তার দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে’।
এরপরে চিন্তা করলাম, আসলেই কী তাই? উচ্ছ্বলা উদ্ভিন্না দুটো মেয়ে নাচবে, দুলবে; এটা দেখে কেউ একজন সরেস কমেন্ট করে বসতেই পারেন। আরও দুয়েকজন তাতে রসদ দিতে পারেন, কারণ – যারা নাচছে তাদের আমরা কেউ চিনি না, তারাও আমাদের চিনে না। এই ফোরামে এরকম কমেন্ট চালাচালি হচ্ছে সে খবর তাদের কানে হয়তো যাবেও না। যেহেতূ মালিকের অনুমতি ছাড়া এরকম ক্লিপ আমি অন্য কোথাও শেয়ার করছি, এবং সেখানে ‘অনুভূতিতে আঘাত আসতে পারে’ টাইপ কমেন্ট করা হচ্ছে, সেহেতু পাবলিশার/ডিস্ট্রিবিউটর হিসাবে এর পুরো দায়ভার আমাকেই নিতে হবে। দীপ্তর এ ব্যাখ্যাটা মনে ধরেছে।

প্রশ্নঃ দীপ্ত যা বলেছে তা কি শতভাগ ঠিক? কোনো পারফরম্যান্স, সেটা লেখা হোক – গান হোক – নাচ হোক, যখন পাবলিকলি আসে তখন পাঠকের/শ্রোতার/দর্শকের মতামত দেয়ার স্বাধীনতা কি অসীম নয়? সকল প্রকার মতামত কি পারফরমারকেই নিতে হবে না?

প্রিয় সচল, আপনি কী ভাবছেন?
__

বাংলা অন্তর্জাল বিস্তৃত হচ্ছে। নিত্য আসছে নতুন ফোরাম। থাকছে নানা রকম নীতিমালা, অবস্থান। উপরের দৃশ্যপট বিবেচনায় এই মুহুর্তে ভার্চুয়াল আচরণের সীমানা নির্ধারণ কি প্রয়োজন?

__

সচলদের মন্তব্য প্রতি মন্তব্য আছে এখানে...।

.
.
.

Read more...

15 November, 2008

ব্লগে প্রবাসী বাঙালীর স্মৃতিকাতরতা

ইন্টারনেট ছাড়া চলছে না একদম। গুরু-সতীর্থ-স্বজন সব এই অন্তর্জালে বাঁধা। লগ ইন করা মানেই জিমেইল, ফেসবুক আর সচলায়তনে যাওয়া। এখন গান শোনার বাইরে বিনোদন বলতে ফেসবুক আর সচলায়তন। এক সময় ফেসবুক ভাল্লাগতো না। দু'বার মনে হয় ডিলিট করেছিলাম। আদনানের বিয়ের ছবি দেখতে হবে, বললো - ফেসবুকে আছে দেখে নাও। আমি বললাম, মেইলে পাঠাও। উহু, ফেসবুকে গিয়েই দেখতে হবে। অতঃপর আবার যাই ফেসবুকে, মনজুর কী করে ধরে ফেলে - এড করে। এরপর আর থামাথামি নেই। ব্লগের সংগীরাই বেশি। এখন খারাপ লাগে না। মজাই লাগে, নানান জনের ছবি দেখি, কমেন্ট করি টুকটাক। এর মাঝে সময় কেড়ে নিলাম সচলায়তন থেকে। মন দিয়ে লেখা পড়ে কমেন্ট কবে করেছি সেটা মনে করতে পারি, কারণ সেরকম কমেন্ট খুবই কম। ঝালমুড়ি পোস্টে ঐ তুলনায় দ্রুত কমেন্ট করা যায়। করেছিও মাঝে মাঝে।

আরেকটা কাজ করি, প্রিয় কজন মানুষের ব্লগস্পটে ঢুঁ মারি মাঝে মাঝে।
গতকাল এরকমই চোখ আঁটকালো অমিত আহমেদের ব্লগে।
'ষড়ব্লগ' লেখার ১ম অনুচ্ছেদের কিছু কথায় ভাবনায় পড়লাম।
অমিত লিখেছে -

প্রবাসী বাংলাদেশীদের দিনলিপি মার্কা ব্লগ পড়তে ইদানিং খুব ক্লান্ত লাগে। এসব ব্লগে অবধারিত ভাবেই দেশের স্মৃতিচারণ থাকবে। "আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম" উপলব্ধি থাকবে। নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস থাকবে। আর নিশ্চিত ভাবেই এমন কিছু থাকবে যাতে মন খারাপ হয়ে যাবে। তাই অনেক প্রিয় লেখকের ব্লগ পড়ার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবে পড়তে হয়। এমন কেনো? এটা কী প্রবাসের মূলধারার সাথে মিলে যেতে না পারার আক্ষেপ? নাকি ব্লগাররা খুব মন খারাপ হলেই কেবল দিনলিপি লেখেন?

ক্লান্তি লাগাটা অমিতের নিজস্ব বোধ। আপত্তি নেই মোটেও। অনেক ভালো কিছুতেও ক্লান্তি আসতে পারে। কিন্তু এর পরে অমিত খুব সিরিয়াস একটা বিষয় ধরেছে - প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্লগে স্মৃতিচারণ থাকবে, আগের দিন নিয়ে আক্ষেপ থাকবে। এবং অবধারিতভাবে পাঠকের মন খারাপ করানোর একটা ছোঁয়া থাকবে। ভেবে দেখলাম, এ পর্যবেক্ষণ আমারও। এরপর আমি অমিতের সাথে একমত হই তার করা শেষ দুটি প্রশ্নে। কারণ, প্রশ্নগুলো আমারও।

এটা কী প্রবাসের মূলধারার সাথে মিলে যেতে না পারার আক্ষেপ? নাকি ব্লগাররা খুব মন খারাপ হলেই কেবল দিনলিপি লেখেন?

অমিত এর পরে ৫ অনুচ্ছেদে একান্তই ডায়েরি লিখেছে। সিগারেট, বুরহানি, স্ট্রাইক, ম্যুভি। তবে আগের প্রশ্নগুলো উত্তরহীন রয়ে গেছে। বাংলা ব্লগস্ফিয়ারে আরও বছর দুয়েক আগে এক শক্তিমান ব্লগার লিখেছিলেন 'আজ বৃষ্টি হলো, বৃষ্টিতে ভিজলাম। আজ আমার মন ভাল নাই; এইসব বালছাল পড়তে ভালো লাগে না। ব্লগে এগুলো লিখবেন না।" বোঝা গিয়েছে তিনি নিজেই বিরক্ত ছিলেন ঐসব একঘেঁয়ে একান্ত দিনলিপির চক্করে। হতে পারে কম্যুনিটি ফোরামে এমন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ অনুভূতির প্রকাশ্য বয়ান কাম্য নয়। হতেই পারে। সমস্যার কিছু নয়। আপনার একান্ত ফ্যাঁচফ্যাঁচ কান্না আপনার ব্লগে ভেজান, আপনার বিরিয়ানী-বুরহানী না পাবার খিদা আপনার ব্লগেই ঢালেন, ঝমঝম বৃষ্টির জন্য রাত জাগার শব্দমালা আপনার নিজের ব্লগে নির্ঘুম করে লিখেন। আমজনতার আপত্তি নেই।
একমত অনেকাংশে।
আমার নিজের সুখ-দুঃখ নিয়ে কম্যুনিটি ব্লগে আজান দেবো কেনো?
এরচেয়ে বরং 'পেঁয়াজের দাম তিন দিনে বেড়েছে দশটাকা, আলু তিন টাকা' নিয়ে কমেন্ট্রি লেখা যায়। পারষ্পরিক আলাপের সুযোগ আছে এমন বিষয় নিয়ে কীবোর্ডে ঝড় তোলা যায়। আপলোডারদের কনুই মেরে ব্লগ সাহিত্য যে আগামীতে মূলধারায় জায়গা করে নেবে সেটা নিয়ে গম্ভীর আলাপ জুড়ে দেয়া যায়।
এমনটাই তো ভালো।

কথা হচ্ছে, এসব তো কম্যুনিটি ফোরামের কথা।
তাহলে একান্ত নিজের ব্লগ বলে পরিচিত ব্লগস্পটে লেখালেখির ধরণ কী রকম হবে?
এখানে কি আমি আমার সদ্য অথবা পুরনো বন্ধুবীকে দৈনিক চুমু খাওয়ার বর্ণনা অথবা স্মৃতি বা তার চলে যাওয়া, অথবা অন্যকোনো কারণে মন খারাপের কথা লিখতে পারবো? এ লেখা লিখতে গেলে কি পাঠকের চিন্তা আমার মাথায় আসবে?
যদি ধরে নিই, ব্লগস্পট আমার দিনলিপির জায়গা, আমার নিজের পাতা। তাহলে এখানে যা খুশি ইচ্ছা লেখার অধিকার আমার আছে। এটা আমার ডিজিটাল ডায়েরি।
তাই, এই ডায়েরি আমি খোলা পাতা রাখবো, নাকি বন্ধ করে রাখবো, সেটা আমার সিদ্ধান্ত।
প্রক্রিয়া জটিল কিছু নয়। আমার কথা আমি গোপন রাখতে চাইলে ব্লগ রিডারের জায়গাটা ক্লোজ করে দিতে পারি। কেবল সিলেক্টেড মানুষই আমার ব্লগ পড়তে পারবেন। কিংবা একান্তই আমি। কাগজ কলমে না লিখে কম্পিউটারে ডায়েরি লিখি।
এ জায়গাটা একেবারেই নিরাপদ। এরকম নিরাপদ জোন অপ্রকাশ্য থাকে, অপ্রকাশ্যই থাক। সেখানে ভালোবাসা থাক, ভালোলাগা থাক, অভিমান থাক, নিন্দা থাক। পরচর্চাও থাকুক। এবং সেটা গোপনই থাকুক।

কিন্তু, আমি যখন আমার ডায়েরি উন্মুক্ত রাখছি, তখন কী একেবারে স্বাধীনভাবে লিখতে পারছি। লিখতে গেলে কী একবারও ভাবছি যে অন্য কেউ এ লেখা পড়তে পারে? হায়দার নামক পাকি প্রফেসারকে আমি গত ১০ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্ধি চুত্মারানি-শুওরের বাচ্চা-মাদার্চুত এবং আরও কুৎসিত গালি দিই। আমার এ তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া-বোধ কিংবা অনুভব কি খোলা ডায়েরিতে লেখা যাবে? লেখার পর আমি প্রিয় কোনো ব্লগার এসে বলবে না তো - 'মাথা গরম করো না...'? আমার এই একান্তই নিজস্ব ব্যাপারগুলোতে অন্য কেউ এসে নাক গলাবে সেটা কি আমি পছন্দ করবো? ঘুরে ফিরে সে-ই কথাই চলে আসে, প্রকাশ্য ব্লগ কতোটা ব্যক্তিগত, কতোটা ভাগাভাগির?

এখানে দুটো অপশন থাকতে পারে, ১) আমার নিজের ব্লগে আমি লিখি, আমার ইচ্ছা তাই পাতা খোলা রাখি, তুমি পড়ো, কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমার লেখা পড়ে তোমার কান্না পেলো নাকি বিরক্তি লাগলো - থোড়াই কেয়ার করি। হু দ্য হেল ইয়্যূ আর? ভালো না লাগলে আমার ব্লগবাড়িতে আর এসো না।
২) আসলে এরকম মনে হলো, গতকাল ঘটনাটা ঘটলো, বা ছোটো ভাইটাকে কাল স্বপ্নে দেখলাম, ব্লগে তাই লিখলাম। এই মন খারাপটা হয়তো কেটে যাবে দ্রুত। কিন্তু মনে হলো, লিখে ফেলি। এই দূরদেশে কথা বলার লোক কই? নিজের সাথে নিজেই বলি, ব্লগেই লিখি। আর লিখতে গেলে মনটা আরও নরোম হয়ে আসে। যা ভেবেছি লিখতে গিয়ে তার চেয়ে আবেগী হয়েছি। ব্লগ লেখাটা এক রকম থেরাপী বলা যায়। সকালে এই পোস্ট লিখে বিকেলে ঠিকই ম্যুভি দেখে এলাম। সারাদিন আর এসব মনেই পড়েনি।

এই দুই অপশনের ১ম টা নিরাপদ।
কিন্তু, ২য়টা নিয়ে কথা থেকে যায়।
নিজের ব্লগপাতা একান্ত করে রেখে এবং লিখে, প্রিয় কিছু লিংক যখন রাখবো, চাইবো অন্যরা আমার লেখা পড়ুক। কে কে আসে না আসে সেটা দেখার জন্য স্ট্যাট কাউন্টার লাগাবো। রেফারিং ইউ আর এল নিয়ে গুতাবো। এই পাঠক মোহ যখন থাকেই, তখন নিজের মন খারাপের বয়ানে অন্যের বিরক্তি বা মন খারাপ করানোর অধিকার আমার কতোটুকু আছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা আপাততঃ কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

এক সময় ঘরকুনো বলে পরিচিত বাঙালী প্রবাসে ছড়িয়েছে কয়েক দশকেরও বেশি হলো। নেটিজেন হয়ে ফিজি থেকে আলবার্টা, ক্যামেরুন থেকে সুইডেনের দূরত্ব ভুলতে বসেছে। চিন্তায় আচরণে আধুনিক হতে পারছে, অনুভূতিগুলো ব্লগের পাতায় তুলছেও হয়তো। কিন্তু, সে-ই ঘর-বিরামীর রোমান্টিসিজম ভুলতে পারছে ক'জন?

প্রবাসের মূলধারার সাথে মেশা না মেশায় এইসব অনুভূতি পাল্টাবে কিনা সেটা আমার বড়ো সন্দেহ। কোথায় যেনো পড়েছিলাম, বিদেশী পাসপোর্ট পেয়ে বছর পেরিয়েছে অনেক। সবুজ পাসপোর্টটা তবুও কতো যত্ন করে রাখে আলমারীর ড্রয়ারে। মাঝে মাঝে হাতে নিয়ে আলতো করে পরশ বুলায় পাতায়, যেনো অনেক আগে চলে যাওয়া বাবার ফ্রেমবন্দী সাদাকালো ছবি।

অমিতের লেখা পড়ে বারবার ভাবছিলাম, প্রবাসী বাঙালীর এ অন্তর্জালিক নস্টালজিয়া, এ স্মৃতিকাতরতা আসলেই কী এড়ানো সম্ভব!

.
.
.
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ এখানে

Read more...

13 November, 2008

ভালো আছি, খুব ভালো আছি ?

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে
আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,
সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন
কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলই আপনাদের
ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর...

মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম
পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলো না।

পৃথিবীতে তবু কেউ আমার মতোন রাত জেগে
নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্র্যের এত অভিমান দেখলোনা!

আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা
সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম,
সুধীবৃন্দ, তবু জীবনে কয়বার বলুন তো
আমরা আমাদের কাছে বোলতে পেরেছি,

ভালো আছি, খুব ভালো আছি ?
__

(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন, আবুল হাসান)

.
.
.

Read more...

03 November, 2008

সান্ধ্যলিপিঃ সময় যায়...

এক সময় ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর জন্য ব্যাকুল ছিলাম। কেবল মনে হতো, কখন পরের পাতায় যাবো। বছরের শুরুতে সুন্দর ছবিওয়ালা পছন্দের পাতাগুলো সিলেক্ট করে রাখতাম। আর অপেক্ষায় থাকতাম কখন ঐ মাস আসবে। আবার এস.এস.সি-এইচ.এইস.সি'র মাসগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, কেমন সময় যাবে তখন!

আঙুলের কড়ে ষাট দিন পার হয়ে গেলো।
অক্টোবর শেষে নভেম্বর আসলো। এখনো ডেস্ক ক্যালেন্ডার পালটানো হয়নি। এত দ্রুত সময় যাচ্ছে, টের পাচ্ছি না কিছু। কোর্স ক্যালেন্ডারে তাকিয়ে দেখি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে সেভেন্টি পার্সেন্ট গেলো, মার্কেটিং'য়ে এখনো সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট বাকী। স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্টের ফার্স্ট রিপোর্টে বড়োসড়ো কোপানি খেলাম। ইন্টিগ্রিটিভ উইক ভালো না হলে এই কোপানিতে শুয়ে পড়তাম। ইন্টিগ্রিটিভের জোরে এখনো দাঁড়িয়ে আছি। বাকী ২টা রিপোর্টে ঢাল-তলোয়ার মারলে টিকে থাকার চান্স আছে।

ঘুমের অভ্যাস পাল্টানোর চেষ্টা করছি। তবুও ঠিক হচ্ছে না। গতরাতে ঘুমালাম ৪টায়। ঘুম ভাঙলো ঘড়িতে বারোটা। আগে হিসেব করা ছিলো আজ এক ঘন্টা কমে যাবে। উঠে সময় ঠিক করে নিলাম - সোয়া এগারোটা।

মাথার চুল লম্বা হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আজ সকালে বের হবো। হলো না। এখন ৫টা বেজে গেছে। বাইরে ঠান্ডা বাড়ছে। ৪ ডিগ্রি। বের হতে ইচ্ছে করতে না। চা খেতে খেতে বরং ইয়্যুটিউবে দারুণ একটা গান দেখা যায় -



.
.
.

Read more...

29 October, 2008

চক্কর

একটা চক্করে আঁটকে যাচ্ছি ক্রমাগতঃ। নিজের তৈরি চক্কর। প্রতিদিন ভাবি, রাত এগারোটায় ঘুমিয়ে যাবো, হয় না একবারও। এটা সেটা করতে করতে তিনটা চারটা। তারপর ভাবি, ক'ঘন্টা ঘুমানো যাবে সকাল অবধি। মোবাইল ফোন নেই, তাই অনেক দিনের অভ্যাস মোবাইল ফোনে এলার্ম দেয়া, এনি বাটন জ্বালিয়ে সময় দেখা নেই। কেমাওয়ানের দেয়া ছোট্ট লাল ঘড়িতে এলার্ম সেট করে ফেলে রাখি রুমের কোণায়, মনে হয় চোখ বুঁজলাম আর সাথে সাথে সকাল হলো। সকাল সাতটা দশ। সূর্যোদয় সকাল সাতটা উনপঞ্চাশ। কমফোর্টার সরিয়ে ঘড়ি হাতে নিই, মনে হয় পুরা শরীর কাঁপছে। বাইরে অন্ধকার। ঝিম মেরে বসে থাকি। সারাদিনে কী কী করতে হবে লিস্টি করি। এই ঘুম নিয়ে কীভাবে ক্লাসে যাবো, কাজ করবো, চিন্তা করি - সন্ধ্যার ক্লাস না করলে কী হয়! শেষমেষ যা হয় - গোসল ক্বাজা করতে হয়। চুলে ভেজা হাত বুলিয়ে ইতংবিতং শীতের জামা গায়ে চাপিয়ে বের হই।

হীম সকাল।
মনে হয় নাক-কান ফেটে যাবে। কনরয়তে বাস চলে গেলো মাত্র। তারপর দাঁড়িয়ে থাকি উলটোপথে মুখ করে। চোখ বুঁজলে মনে পড়ে গোসল করবো বলে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছি পুকুরের ঘাটে। অনেক পরে বাস আসে, ট্রেনে উঠি। নিত্য দেরী হয়। দুপুর পর্যন্ত ঘুমে থাকি, ঘুমে হাঁটি, ঘুমে ভাবি। কয়েক দফা কফির পরে মনে হয়, না থাকি। সন্ধ্যার ক্লাস করি। ক্লাসের শুরুতে আবার ঘুম পায়। "ঘুম ঘুম ক্লাস রুম, পাশে খোলা জানালা, ডাকছে আমাকে তোমার আকাশ"। ফাইন্যান্সের প্রফেসর এলান গস মজার লোক। সুযোগ পেলেই বৌয়ের গল্প নিয়ে আসে। বলে, "গতকাল বিকেলে শেয়ার বাজারে তোলপাড় ছিলো বলে, তোমরা ব্ল্যাকবোর্ড ডিসকাশনে নানান প্রশ্ন করেছো বলে, আমি কম্পিউটারে চোখ রেখে বসেছিলাম, নইলে বৌয়ের সাথে লনের ঘাস কাটতে হতো।" তারপর পড়াতে পড়াতে অন্য কী যেনো ভাবে, বলে - "আচ্ছা সোমবারে কী হবে? আসো বাজী ধরি।"
তখন আমার ঘুম পায়।

এখন যেমন পাচ্ছে।
বা'হাতি এলান বোর্ডে অংক করে চলেছে।
আমি ভাবছি বাসায় গিয়ে শাওয়ার নেবো, চুলে খুশকি হয়েছে, শ্যাম্পু করতে হবে, রুম গুছাই না তিন সপ্তাহ। টেবিলে কলম রাখার জায়গা নেই। খাটের অর্ধেক জুড়ে বই পত্র। কার্পেটে পত্রিকা। গুছাতে হবে।
তারও আগে আজ রাতে আরও দুটা এসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে।
ধন্যবাদ কফি আবিষ্কর্তা, আমি জেগে থাকি কফি খেয়ে।
আগামী সকাল পর্যন্ত। আবার পৌণপুনিকতা।

এ চক্করে আমি কীভাবে আঁটকে গেলাম!

.
.
.

Read more...

24 October, 2008

বৈয়াম-বন্দী সময়


অনেকদিন লেখালেখি হচ্ছে না। না গল্প, না ডায়েরী। অলস মানুষের মতো গান শুনছি সকাল রাত। একেবারে পৌণপুঁনিক সময়ে আঁটকে গেছি।

০২.
ব্যাপারটা প্রতিদিন ঘটে, সকালে এলার্ম দেয় ঘড়ি। আলগোছে বন্ধ করি। বাইরে অন্ধকার, ভাবি - আরেকটু বেলা হোক। শেষে বাস ট্রেন মিস করে ক্লাসে লেট।

০৩.
কানাডা আসলাম আজ পঞ্চাশ দিন হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে কতো দ্রুত যাচ্ছে দিন। নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছি না। ডায়েরী ভর্তি এসাইমেন্টের লিস্ট। মাথার ভেতর গিজগিজ। নেই বুক পকেটে জোনাকী পোকা।

০৪.
পরশু প্রথম তুষার পড়লো। চিনির মতো মিহিদানা। মন্দ না।

০৫.
মংগলবারে আলবিয়ন এভিনিউ থেকে বাসে উঠলো একটা ছেলে, চেহারা চেনা চেনা। আমাকেও চিনে নিলো। কায়সার; ৮ বছর পরে দেখা। শেষে বললো, 'দেখো উইন্টার আসলে কেমন লাগে...'

০৬.
এম পি থ্রি প্লেয়ার নষ্ট। কানের ভেতর গুঁজে দেয়ার কিছু নেই। বালাম-অনিলা-সুমন-তপু-সিমিন'দের গান শুনি ইদানিং। বই পড়ার সময় পাচ্ছি না।

০৭.
অবশেষে ফেইসবুকেও এডিক্টেড হলাম।

০৮.
বৃহষ্পতিবারে ক্লান্তি জড়িয়ে আসে। শনি-রবিবার যথেষ্ঠ না। ডিসেম্বর আর কতো দূরে?

০৯.
এশিয়ার দূরে যাওয়ার কারণে প্রিয় কিছু মানুষকে এখন অনলাইনে পাই না।
সময়ে দূরত্বে এইভাবে মানুষ আড়াল হয়?

১০.
...
কেটে গেছে কালিদাসের কাল।

.
.
.

Read more...

20 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র শেষ পর্ব)

আমি তখন বুঝে যাই সুদর্শন অমিত আহমেদের সাথে বাজারে উঠলে আমার ভাত নাই। কারণ, ঐ কিশোরী অপলক তাকিয়ে থাকে অমিতের দিকে। আর আমি তাকিয়ে থাকি কিশোরীর দিকে। 'এক পলকে চলে গেলো আহ কী যে তার মুখখানা'।
অমিত আমাকে বলে, 'বুঝছো, রাস্তাঘাটে নানান হাতছানি প্রলোভন আছে। এসবই পরীক্ষা। নিজেকে ঠিক রাখবা। দেখবা, সমস্যা হবে না।'
আমার তখন জরুরী কথা মনে পড়ে যায়। ডাউনটাউনের দিকে থাকবো জেনে দেশের এক সাবেক কানাডাবাসী বড়োভাই বলেছিলো জিরান স্ট্রীট নাকি জেরান্ড স্ট্রীটে যেতে। সেখানে নাকি দেশীয় উপমহাদেশীয় আপুনিরা কামিজ-লেহেঙ্গায় বৈকালিক ভ্রমণে বের হয়। টুকটাক টাংকিও নাকি মারা যায়। ইচ্ছে ছিলো, বন্ধু অমিতকে নিয়ে ওদিকে যাবো। এ স্থবির শহরে অন্য রকম বিকেল খুঁজে নিবো। কিন্তু, গত ৩/৪ ঘন্টার তব্ধায় এই প্রসংগ তুলতে সাহসই পেলাম না।

তারপর আমরা টিম হর্টনস কফি শপে বসি।
আগে যখন অমিতের সাথে দেখা হয়েছিলো চা-কফির সাথে সিগারেট না হলে অমিতের চলতোই না। এবার দেখি অমিত সিগারেট খাচ্ছে না। ছেড়ে দিয়েছে। এ কথা শুনে আমি এবার নিশ্চিতভাবে রঙীন পানি খাবার ইচ্ছাটা কবর দিয়ে দিই। তবে মিস করি দূর্দান্ত এক দৃশ্য, এটা কেবল অমিতকেই করতে দেখেছিলাম আগে; সিগারেট শেষ করে আঙুলের টোকায় শেষ টুকরা ছুড়ে মারা, আর টুকরাটা ডিগবাজি দেয় তিনবার। আমি আমার দেখা চরম এক স্মার্ট স্মোকারএর এ দৃশ্য আর দেখবো না ;
তখন অমিত আমাকে বলে, অপচয় জীবনের জন্য কতো ক্ষতিকর। মাদক-তামুক আরো বেশি খারাপ।
আমি চুপ থাকি।

কফি হাতে ছবি তোলার ইচ্ছে হলো। বিরিয়ানী খাওয়ার সময় দুজন একসাথে ছবি তুলতে পারিনি। এবার ভাবি, দুজনে এক সাথে ছবি তুলি।
কিন্তু কাকে রিকোয়েস্ট করা যায়?
আমাদের ডানে এক সত্তোরোর্ধ সিনিয়র, কাঁপা কাঁপা হাতে কফি খাচ্ছে।
অমিতের পেছনের টেবিলে দুই উদ্ভিন্না তরুণী, সম্ভবতঃ ব্লগার সংসারে সন্ন্যাসী'জির পাড়াতো ভাগ্নী।
আমি জিজ্ঞেস করি, ঐ পেছনের মেয়েটাকে বলি?
অমিত চোখ রাঙায়। বলে, 'পাশের সিনিয়র মাইন্ড করতে পারে।'
কী আর করা 'বুড়ো'কেই দিলাম ক্যামেরা। কাঁপা কাঁপা হাতে ছবি তুললো । ঝাপসা ছবি।

- ছবি তোলার পরে আমাদের কথা আর আগায় না। রাত বেড়েছে। সাবওয়ের শেষ ট্রেন চলে যাবে। ঠিক হয় একদিন অমিতের ওখানে যাবো। আরও কিছু ব্রাদার-সিস্টারের সাথে অমিত পরিচয় করিয়ে দিবে। আমার ভালো বন্ধুর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হবে। অমিত ঠান্ডা বাতাসে স্টেশনের দিকে হেঁটে যায়।

আমি বাসায় ফিরি। ততক্ষণে আমার মাথাটায় ড্রিল মেশিন ঘুরছে। কোথাও কী যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ অনুভূতি ঘিরে থাকে পরের আধ ঘন্টা। টের পাই, আমার অনেক চিন্তা পালটে যাচ্ছে। কোনো এক অবোধ্য শক্তি আমার উপরে ভর করেছে, আর বলছে - 'ভালো হয়ে যা, হে মানুষ। ঠিক হয়ে যা। দুইন্যা দুই দিনের।'
অমিতের এ পরিবর্তন কি আমার উপরও ভর করছে। নেজাম ডাকাত কিভাবে আউলিয়া হয়ে যায় সেটা নিজের মাঝে টের পাই। তাই সিদ্ধান্ত নিই, আমিও ভালো হয়ে যাবো। একেবারে পুরা ভালো মানুষ। কিন্তু আমার কে আমাকে গাইডলাইন দিবে? কে হবে আমার আলোর দিশারী? কোথায় পাবো তারে?

প্রথমেই কম্প্যুটার অন করি।
এফ ড্রাইভে হিডেন ফোল্ডারে উলটাপালটা কিছু জিনিশপাতি ছিলো। ওগুলো কন্ট্রোল প্লাস এ, শিফট প্লাস ডিলিট মারি। আর ঠিক করি কীভাবে মনকে শুদ্ধ করা যায়, চিন্তা শুদ্ধ করা যায়!
পরের সিদ্ধান্তটি হয় - আর ডেবু বাবুর সাইটে যাবো না, ওগুলো খারাপ। মনের শুদ্ধতা নষ্ট করে। ওকে, ঐটাও ডিটারমাইন্ড হলাম। আর ? আর কী? অস্থির লাগে খুব। মনে হয় জীবনের সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত।
৩ নম্বর সিদ্ধান্ত ছিলো, ১৮০ মিনিটের ক্লাসে টায়ার্ড লাগলে প্রায়ই সামনের সারিতে বসা চঞ্চলমতি টিংটিঙ্গা স্বল্প বসনা যে মেয়েটির এখানে ওখানে তাকাতাম, সেরকম আর তাকাবো না। অমিত বলেছে - নানান হাতছানি প্রলোভন, এ সবই পরীক্ষা...'।

রাতে কখন ঘুমিয়ে যাই জানি না।
তবে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হয় - আজ থেকে আমি অন্য মানুষ।
নিজেকে পরিশুদ্ধ মনে হয়।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। অটাম এসে গেলো। গাছের সব পাতা হলুদ থেকে লাল হয়ে যাচ্ছে।
অদ্ভুত সুন্দর লাগে এ পৃথিবী।
অসীম আর সসীমের মাঝে আমার নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। বড়ো তুচ্ছ।
অভ্যাসমতো কম্প্যুটারে মেইল চেক করতে গিয়ে দেখি ইনবক্সে অমিতের মেইল।

শিমুল,
গতকাল আমার আচরণে তুমি অবাক হয়েছো নিশ্চয়ই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কষ্ট পেয়ে থাকলে, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তুমি তো জানোই, আমি গল্প/উপন্যাস যা-ই লিখি অনেক ভেবে চিন্তে লিখি। গল্পের চরিত্র-চারপাশ বোঝার চেষ্টা করি। দরকারী তথ্যগুলো চেক করে নিই নানান সুত্রে। গত দু'মাস ধরে একটা গল্প নিয়ে আঁটকে গেছি। রাইটার্স ব্লক। কোনো ভাবেই আগাতে পারছি , শেষ করতে পারছি না। যেখানে আঁটকে গেছি তা হলো - একজন মানুষ তার কাছের বন্ধুটিকে একেবারে বদলে যেতে দেখলে কেমন রিয়্যাক্ট করে। আমার গল্পের চরিত্র বাংলাদেশের মানুষ। এই বিদেশ-বিভুইয়ে সেরকম মানুষ অবজারভ করার সুযোগ কই? আমার গল্পের এই চরিত্রটির সাথে তোমার খানিক মিল আছে। তাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম, তোমার সাথে টরন্টোতে প্রথম সাক্ষাতেই এই এক্সপেরিমেন্টটা করে নিবো। যথেষ্ট প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। ঐ ৩টা উপন্যাস জোগাড় করেছি অনেক কষ্টে। ঐ অভিনয়ের মহড়া নিজের সাথে নিজের অনেকবার দিয়েছি। তাই, তুমি গতকাল যেই আমাকে দেখেছো, আমি মোটেও সেরকম নই। এক বিন্দুও পাল্টাইনি। তবে নিজেকে পাল্টানোর ভাব করে গতকাল তোমার প্রতিক্রিয়াগুলো আমি মনে মনে টুকে নিয়েছি প্রতি মুহুর্তে। বিশ্বাস করবা না, গল্পের কোনো উপাদান বাকী ছিলো না। সব পেয়ে গেছি এখন। আজকালের মধ্যেই গল্পটা শেষ করে ফেলবো। আমার ধারণা, এই গল্পটা হবে আমার লেখা সেরা একটা গল্প। লেখা শেষ হলে, ১ম পাঠক হিসেবে গল্পটা তুমিই পড়বে। থ্যাংক্স এ লট, ব্রো! শেষে আবার ক্ষমা চেয়ে নিই, যদি একটুখানিও কষ্ট পেয়ে থাকো আমার আচরণে...। আরেকটা কথা, আগামী ১৯ তারিখ রোববারে মিলা-হায়দার হোসেন-নকুল কুমার আসবে একটা প্রোগ্রামে। যাবা? অন্ততঃ মিলার জন্য যাই, চলো। কী বলো?
- অমিত।


মেইল পড়ে আমি আবার তব্ধা খাই।
এবার কী করবো, কী ভাববো বুঝতে পারি না।
চিন্তাশক্তি একদম কাজ করে না।

তখন সাথে সাথে দেখি জি-টকে অমিত আহমেদ।
জিজ্ঞেস করি, 'গল্প লেখা শেষ হইছে?'
অমিত বলে, 'সিগারেটটা শেষ করে নিই। বি আর বি।'

-
(সমাপ্ত)

.
.
.

Read more...

19 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র ২য় পর্ব)


সন্ধ্যায় বিরিয়ানী খাবো ভেবে ভেবে দুপুরে খাইনি কিছু।
পেটে খিদায় চোঁ চোঁ। কিন্তু অমিতের কাছে রোজার কথা শুনে খাবারের নাম মুখে নিতে সাহস পেলাম না।
'বুঝলা শিমুল, রোজার মাস সিস্টেমটা এক্সিলেন্ট একটা জিনিস। শরীর মন অর্থ সব কিছুর জন্যই ভালো।'
আমি হু হু করি। আর ঘড়ি দেখি, বলি - 'আজ ইফতার কয়টায়? সাতটা পনেরো?'
অমিত বলে, 'সাতটা সতেরো।'
এরপর সে বিড়বিড় করে কী যেনো পড়ে। মনে হয় তজবী জপছে। আমার ধারণাই ঠিক হলো, অমিতের ডান হাতে ডিজিটাল কাউন্টার। আধুনিক তজবী। আমাকে দেখিয়ে বলে, 'খুবই দরকারী জিনিস, কমফোর্ট্যাবল।'

ভিক্টোরিয়া পার্কের সবুজ ঘাসে আমরা কোনাকুনি হেঁটে যাই। অমিতই পথ দেখায়।
আমি ভাবছি আরও ঘন্টা খানেক সময় বাকী আছে। খিদা সামলাই কীভাবে?
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছো?'
বললাম, 'না, তেমন না। এই ধরো, দশ পনেরো মিনিট।'
'আসরের নামাজ পড়েই তো বের হইছো মনে হয়, নাকি?'
'হুমম, ওরকম সময়েই।'
'আমিও নামাজ পড়ে রওনা দিছি।'
তারপর আমরা সামনে আগাই। ডানে ডেন্টোনিয়া পার্ক পার হই। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'সামনে নাকি সুন্দর একটা মসজিদ হচ্ছে?'
আমি জানাই, আমিও শুনেছি, বাংলা কাগজ/দেশের আলো পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু দেখিনি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'শুক্রবারে জুম্মার নামাজ কোথায় পড়ো?'
বলি, ঐ সময় তো আমি ক্যাম্পাসে থাকি।
এরপর ক্যাম্পাসের প্রেয়ার রুম নিয়ে কথা হয়। মুসলিম স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনে জয়েন করেছি কিনা অমিত সেটা জিজ্ঞেস করে। আর বলে, বিদেশ মানেই অন্য রকম। এখানে এসে মানুষ পালটে যায়। বিশেষ করে সাদা চামড়ার পোলা মাইয়্যাদের সংগ খুবই খারাপ। এরা আমার মতো সহজ সরল ছেলেকে একেবারে বিগড়ে দিতে পারে।
এরকম নানান সতর্কবাণী দিয়ে অমিত আমাকে সাহস দেয়, বলে - 'তেমন ভয়ের কিছু নাই। সময়ে সব বুঝে যাবা। খালি উপরওয়ালার উপর আস্থা রাখবা। মনে রাখবা তুমি কোত্থেকে আসছো। তোমার শেঁকড় কোথায়। এইসব একেবারে ভুলবা না।'

এইবার অমিত আমার বাসা নিয়ে জানতে চায়। বাড়ীর মালিক ঈমানদার মানুষ, আমাকে ভালো ইফতার দেয় শুনে অমিত বলে, 'তুমি আসলে খুব লাকী, বিদেশে এরকম পাওয়াই যায় না।'

ইফতারের প্রসঙ্গে আমার খিদা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে।
অমিতের এইসব কথাবার্তা ভালো লাগে না আমার।
এতোদিন পরে দুই বন্ধুর দেখা। কোথায় ব্লগ নিয়ে কথা বলবো, গল্প লেখা নিয়ে কথা বলবো, টুকটাক নিষিদ্ধ আলাপে মাতোয়ারা হবো। এবং আমার অনেকদিনের ইচ্ছা, অমিতের মতো যোগ্য বন্ধু পেলে হাল্কা শরাবী হবো। এসব চিন্তা মুহুর্তেই মাটি চাপা পড়ে গেলো।

ডেন্টোনিয়া পার্কের বেঞ্চিতে বসে আমাদের গল্প হয়। আমার পেটের মধ্যে ডজন খানেক ইঁদুর লাফালাফি করছে। যদি জানতাম অমিত রোজা রাখবে তাহলে আমিও রোজা রাখতাম। পেটের আগুনে সান্ত্বনা পেতাম খানিক। কী আর করা!

এখানে এসে বেশ কাঠবেড়ালী দেখি, গাছ থেকে নিচে নেমে কাছে চলে আসে। সাদা একটা কাঠবেড়ালী কাছে এসে ঘুরঘুর করলে আমি অমিতকে জিজ্ঞেস করি, 'অমিত এইটা কাঠবেড়াল, নাকি বিড়ালী?'
অমিত বুড়া আঙুলে তজবী কী টেপা বন্ধ করে। উলটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি সাদা মেয়েদের সাথে ফ্রেন্ডশীপ করতেছো?'
আমি তো অবাক! কোথায় কাঠবেড়াল, আর কোথায় সাদা মেয়ে...
বললাম, 'না তো, কেনো?'
অমিত বলে, 'ব্লগে এরকম কী যেনো লিখলা। বদ্দাও উস্কানি দিলো।'
আমি মাথা নাড়ি, 'না না, ওরকম কিছু না।'
'তবুও খেয়াল রাইখো, শাদা মাইয়্যাগুলা কথা বলার সময় গায়ে হাত দেয়, পিঠে চাপড় দেয়। এগুলা সবই উস্কানি।'
আমি গম্ভীর হয়ে বলি, 'আরে ধুর, আমি ম্যাচিওর্ড না?'

তখন রিমাইন্ডার বেজে উঠে অমিতের পিডিএ থেকে।
অমিত বলে, 'চলো উঠি। আজানের ৩ মিনিট আছে'।
সামনে হাঁটি।
'শিমুল, জিন্সের প্যান্ট কি দেশ থেকে কিনছো?'
বলি, 'হ্যা, নিউ মার্কেট থেকে।'
'ফিটিং করা লাগছে না?'
'হু, তা তো লাগেই। একেবারে পুরা তো ফিট হয় না'।
'তা যখন করলাই, নিচটা এতো লম্বা রাখলা কেনো?'
'মানে?' আমি অবাক হই, কারণ - এর থেকে ছোট করলে তো খুবই বাজে দেখাবে?
অমিত বলে, 'এখন ধরো তুমি নামাজ পড়বা, প্যান্ট নিচে গুটাতে হবে। ঝামেলা না?'
আমি দেখি, অমিতের প্যান্ট পায়ের গোড়ালির উপরে। প্রথম দেখায় ফ্যাশন কিংবা কেয়ারলেস ভাবলেও এখন বুঝি, কেনো অমিত পায়ের গোড়ালির উপরে উঠানো প্যান্ট পরে...'।
দুম করে তখন আমার মাথায় ক্লিক করলো, অমিত কেনো দিনে দেখা করতে চায়নি, কেনো ইফতারের পরে আড্ডা দিতে চেয়েছে...।'

এই অমিত কেনো এরকম হলো, কী জাদুমন্ত্রে অমিত পালটে গেলো; এ ভাবনা আমার মাথায় কাজ করে না। স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। সেবার বই মেলায় আলবাব ভাইয়ের কাছ থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে আড়ালে ফিশফিশ করে অমিত বলেছিল, 'যাবা নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে?'
কোথায় এবং কখন জিজ্ঞেস করলে অমিত বলেছিল এ-লেভেলসের তামান্না-মৌটুসী আরও কে কে থাকবে। চিটাগাং যাওয়ার কারণে সেই পার্ট মিস করেছি। ধারণা ছিলো, টরন্টোতেও এরকম কিছু ইয়ো ইয়ো পার্টির দাওয়াত পাবো। মজমা হবে। কিন্তু এ কী! অমিত আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

'ওজু করবা? নাকি করা আছে?' বায়তুল আমান মসজিদের সামনে এসে অমিত জিজ্ঞেস করে।
অমিতের এ প্রশ্নে আমি ইতিউতি করি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'নামাজ পড়বা না?'
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। বলি, 'আসলে গোসল করি নাই, শরীর একটু নাপাক আছে...'।
অমিত যেনো আকাশ থেকে পড়লো, 'ছিঃ শিমুল, ছিঃ। আসছো শুক্কুরে শুক্কুরে ১৫ দিন হয় নাই, এর মধ্যেই...?'
আমি অমিতের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করি, বলি অমিত যে রকম ভাবছে সেরকম কিছু নয়, সকালে উঠলেই ঠান্ডা লাগে, গোসল করতে ইচ্ছা করে না। গত চারদিন গোসল করি নাই, সাথে আরো কিছু অস্পষ্ট শব্দ এবং চোখের ইশারা যোগ করি, যাতে অমিত বুঝে যায় আমার এ শারীরিক অপবিত্রতায় গন্ধম ইফেক্ট নেই। আমি অমিতকে বুঝাই, স্বর্গের উদ্যানে এখনো নিপাট ব্রহ্মচারী হয়ে আছি।
অমিত হেসে বলে, 'আগে বলবা না? আমারে তো টেনশনে ফালায়ে দিছিলা মিঞা, আমার ভালো একটা বন্ধু কুপথে চলে যাবে ভেবে...।'
ভাবলাম, নামাজ পড়া থেকে মুক্তি বোধ হয় পেলাম।
কিন্তু, অমিত হাল ছাড়ে না। গোসল না করে কীভাবে বিশেষ ওজু করা যায়, শার্টের বাম দিকের কোণা ডান হাতে টেনে এনে আধ বিঘত পরিমাণ জায়গা পানিতে ভিজিয়ে কোন দোয়া পড়লে গোসলের মতো পবিত্রতা চলে আসবে সে তরিকা এবং ফজিলত অমিত আমাকে শেখায়। আমি অমিতকে অনুসরণ করি। মাথার ভেতর ঘুরঘুর করে - এ কোন নতুন অমিত?
হিন্দি সিনেমার জমজ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে।
ভাবি, একেবারে এক্সক্লুসিভ কথা জিজ্ঞেস করি, যাতে নকল অমিত হলে ধরে ফেলি...। কিন্তু, জিজ্ঞেস করা হয় না। আজান ভেসে আসে, আমি রোজা না রেখেও ইফতারে শামিল হই। হাঁটু গেঁড়ে কোন বিশেষ ভঙ্গিতে খানাহ-পিনাহ করতে হয়, কীভাবে ডান হাতে গ্লাস নিয়ে বাম হাতে নিচ থেকে ঠেস দিতে হয়। এসব জীবন চর্চায় অমিত আমাকে দীক্ষা দেয়। কেবলই ভাবি, হায় - বিরিয়ানী সন্ধ্যা কোথায় গেলো?

অমিত বিরিয়ানীর কথা ভোলেনি।
ড্যানফোর্থের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি বাঙালি পাড়া দেখি।
বাংলা দোকান , সাইন বোর্ড। মারহাবা স্টোর, সরকার ফুডস, প্রিয়তা স্টোর, ঢাকা কনভেনিয়েন্স, ঢাকা কাবাব কিংবা সোনালী ব্যাংক; দেশের টাকা পাঠান সহজে।
অমিত আমাকে দেখায় কোথায় কী আছে।
'ঘরোয়া বিরিয়ানী' পার হয়ে গেলে আমি আঙুল তুলি, 'এখানে খাবার ভালো না?'
অমিত ঠিক ভালো মন্দ বলে না। বলে, গেছিলাম একবার। তবে সামনে চলো, সামনে আরেকটা ভালো আছে।
চোখে পড়ে এটিএন মিউজিক। আমি জিজ্ঞেস করি, 'তুমি ইভা রহমানের গান শুনছো?'
(আমি আবার ইভা রহমানের ফ্যান, এটা অমিতকে বলেছি কিনা জানি না)।
অমিত জবাব না দিয়ে এটিএন মিউজিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ডানে ইভা রহমানের বিশাল পোস্টার, ভেবেছিলাম সেদিকে যাচ্ছে। কিন্তু না, বামে জাকির নায়েকের বক্তিমার সিডির পোস্টারের সামনে অমিত মনোযোগী পাঠক। আমি আড়চোখে ইভা রহমানের গোলাপী শাড়ী দেখি। একটু মুটিয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
অমিত মাথা নাড়ে, 'নাহ, এইটা তো আছে আমার কাছে।'
আমি ভাবি, অমিত কি জাকির নায়েকের ফ্যান হয়ে গেলো?

এভাবে রাস্তা সিগনাল পার হয়ে অমিত আমাকে নিয়ে যায় 'মক্কা বিরিয়ানী হাউজ'এর সামনে। জিজ্ঞেস করি, 'এটা কি ঘরোয়া বিরিয়ানীর চেয়ে ভালো?'
অমিত বলে, 'অলমোস্ট সেম, তবে ব্র্যান্ড নেম বলে একটা ব্যাপার তো আছে। তুমি মার্কেটিং্যের ছাত্র না?'
আমি এইবার বিরিয়ানির কাস্টোমার নিয়ে ভাবি, ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভাবি।
এসবের কী জবাব পাওয়া যায়?

অমিত মুরগীর বদলে ছাগলের বিরিয়ানি অর্ডার দিলো।
ইচ্ছে ছিলো, মুরগী খেলে কী সমস্যা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু, মুরগী থেকে চিকেন এবং চিকেন থেকে চিক'এ আলোচনা পৌঁছে গেলে অমিত আমাকে আবার হেদায়েত করবে, এই ভয়ে কথা বলি না। খাসির টুকরায় কামড় দিয়ে অমিত জিজ্ঞেস করে, শিমুল জিওম্যাট্রি কেমন বুঝতা?
বললাম, ভালো লাগতো না। আমি তো কমার্সে ছিলাম।
'বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য বুঝো?' এই প্রশ্নের জবাবে বলি জিওগ্রাফীতেও আমি ভালো না।
অমিত কেনো এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে তা আমার মাথায় ঢুকে না।
-

প্রিয় সচল বন্ধুরা, আপনারা ভাবছেন - আমি এসব গল্প করছি, সত্যি নাকি চাপাবাজী?
কী করে বুঝাই আপনাদের?
যেবার জার্মানী গিয়ে ধুসরের সাথে শালী-বাণিজ্য করে আসলাম, সেবারও আপনারা অনেকে আমাকে বিশ্বাস করেননি। কেউ কেউ বলেছেন, ফটো না দিলে বিশ্বাস নাই। একবারও তারা ভাবেননি, মানিব্যাগ হারিয়ে আমি কোন বিপদে পড়েছিলাম।
আর ছবি দিলেই কী হয়? অবিশ্বাসীরা কী আর লাইনে আসবে?
অমিত যখন, এই কিছুদিন আগে, ব্যাংকক ট্যুরের ছবি দিলো তখন অনেকেই বলে দিলো - এগুলো ফটোশপে করা। হায়, কী আর বলি! অবশ্য অমিত যে ফটোশপের কাজ ভালো পারে সেটা নিজেই স্বীকার করলো খাওয়ার টেবিলে। আমি ফটোশপের কিচ্ছু পারি না, ঐ বিরিয়ানীর ছাগ-হাড্ডির কসম লাগে, এইটা বিশ্বাস করেন সকলে...।

আমাকে এইবার চাপাবাজ যাতে বলতে না পারেন, সেইজন্য পোস্টে ফটো দিলামই দিলাম।

খাবার টেবিলে মনে হলো, ছবি তোলা দরকার।
দেশ থেকে অমিতের জন্য আনা 'পূর্ণমুঠি' দিলাম।
অমিত খুশি হলো।
এখন এইসব ঘটনা বিশ্বাস করাতে হলে বিরিয়ানী-বোরহানী-পূর্ণমুঠি-এবং আমি এক ফ্রেমে আসতে হবে।
অমিত এদিক ওদিক ট্রাই করে, ফ্রেমে আঁটে না।
আমি হাসিমুখে পোজ দিয়ে বসে আছি।

-
শেষে অমিত বিরক্ত হয়, ধুর মিয়া, মোটার মোটা হইসো - ফ্রেমেই তো আসো না।
মোটা গালি শুনে মন খারাপ লাগলেও মুখে হাসি ধরে রাখি।
শেষে অমিত ছবি তুললো দুটা। আমাকে দেখালো। এক ছবিতে বিরিয়ানী-বোরহানী-সালাদ-পূর্ণমুঠি আছে। আমার একাংশ আসছে, মাথা নেই। অন্য ছবিতে কেবল আমার মাথা। বললাম, হায়! এরকম কেনো?
অমিত বলে, দেখি মাথাটা ফটোশপে কিছু করতে পারি কিনা।

তবে, অমিতের ছবি তুলতে আমার কষ্ট হয় না।
একে ফটোজেনিক লুক, তার উপর শুকিয়ে গেছে, এটা আগেই বলেছি। ক্যামেরা ফ্রেমে চমৎকার মানিয়ে যায়। আমি চেয়ারে বসেই ছবি তুলি। ডানবাম করতে গিয়ে গ্লাসের পানি পড়লো ক্যামেরার লেন্সে। এরপরে ছবির এই অবস্থা।

-
এই ছবির মানুষটি অমিত আহমেদ না, তার হাতের বইটি এডিট করা হয়েছে, এমন কুৎসাও রটাবেন মন্দজনেরা। সেই তর্ক দূরে রাখি। বলি, অমিতের সাথে তারপর কী কথা হলো...

এর মাঝে অমিতের মোবাইলে ফোন এলো। এস এম মাহবুব মুর্শেদ ভাই। খাবার সময় বেশি কথা বলতে হয় না, তাই সামান্য মাসলা মাসালা বলে ফোন আমার কাছে দিলো। আমি মুর্শেদ ভাইয়ের সাথে কথা বলি, 'অমিতের সাথে ইফতার করতেছি, বস!'

দুষ্টলোকদের কথা বলছিলাম উপরে। অমিত অভিযোগ করলো, ব্লগে আমার বেশিরভাগ বন্ধুই নাকি দুষ্টু। আমি নাকি জাপান-জার্মানের কতিপয় বাঁদর-ব্লগারের সাথে বেশি বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখাই। এমনকি শালী বিষয়ক কমেন্ট করে নিজের ইমেজ খারাপ করছি। অমিত খবর পেয়েছে, অনেক শালীসমৃদ্ধ ব্লগার আমার লেখায় কমেন্ট করে না। আমার মতিগতি দেখে তারা নাকি শালী হারানোর শংকায় আক্রান্ত। কমেন্ট নসিহতের পাশাপাশি অমিত এবার আমার লেখা নিয়ে আলাপ করে। আমি বোরহানীতে চুমুক দিয়ে মনোযোগ দিই, ভাবি - এমনটাই তো চেয়েছিলাম। বন্ধু মানুষ, একে অন্যের লেখা নিয়ে আলাপ করবো।

কিন্তু, অমিত দেখি আমার লেখা নিয়ে খুবই বিরক্ত। গল্পের নামে আমি যা লেখার চেষ্টা করি এগুলো সবই মূল্যহীন। এগুলোর মাঝে সমাজ নেই, নীতি নেই, আদর্শ নেই। জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কী রকম?
অমিত বলে, আমার লেখায় শিক্ষণীয় কিছু নেই। মনে দাগ কেটে প্রভাব ফেলার কিছু নেই।
জিজ্ঞেস করলাম, অমিত নিজেই বা সেরকম কয়টা লেখা লিখেছে, তাহলে আমারও ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হয়। সে স্বীকার করে, তারও সেরকম কোনো লেখা নেই। তবে এখন পড়ালেখা করছে। এই কথা বলেই ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করলো সে। ইন্টারন্যাশনাল কুরিয়ারের সীল। ৩টা বইঃ
হামিদুর রহমানের উপন্যাস 'ফুটন্ত গোলাপ'।
কাশেম বিন আবু বকরের 'বোরকা পরা সেই মেয়েটি' আর 'বিলম্বিত বাসর'।

অমিতের মতো দূরন্ত লেখকের হাতে এই বই দেখে আমি আবার তব্ধা খাইলাম। জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি য়ে-ই সব বই পড়ো?'
অমিত দেখি উলটা খ্যাপা, 'নাক সিটকালা কেনো?'
বললাম, 'এই সব ছাইপাশ...', কথা শেষ করতে পারি না। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কাশেম বিন আবু বকরের বই পড়ছো? নাকি না পড়ে কথা বলতেছো?'
হাসি দিয়ে বলি, 'বাসর রাত' উপন্যাসটা পড়ছিলাম।
অমিত যেনো জোশ পেয়ে যায়, বলে - 'মনে আছে কিছু? কী নিয়ে লেখা?'
স্ম্বৃতি হাতড়ানো লাগে না, মুহুর্তেই বলে ফেলি, "শেষ প্যারাটায় নায়ক নায়িকার বিয়ে হয়ে গেছে, নায়ক বলছে - আসো এবার কাছে আসো, দেখি কে কতো বেশি কামড় দিতে পারে..."
অমিত মাথা নাড়ে, 'বাহ! এই না হলে শিমুল! তোমাদের সমস্যা কী জানো? মনের ভেতর ময়লা, উপন্যাস পড়বা আর সিলেক্টেড লাইন খুঁজবা, তাইলে আসল জিনিশ কই পাইবা?'
জিজ্ঞেস করি, কাবিআ বকরের বইয়ের ভালো দিক কি?
অমিত এবার খিলাল দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে খাসির গোশের ছুটাছাটা বের করে, বলে - 'তোমাকে দেখতে হবে সাহিত্য মানুষের জীবনকে কেমন প্রভাবিত করছে। আজিজের চিপায় সাদা-কালো কাউয়া মারা বা কাফকা-কামু-বোদলেয়ার মুখস্ত করে যারা বই লিখে তাতে পাঠকের কি?'
বললাম, 'বকরের বই পড়ে মানুষ কী জীবন দীক্ষা পায়?'
এরপর অমিত শরিয়ত সম্মত প্রেমের গল্প করে। সেখানে শরীরি ব্যাপার কীভাবে আসতে পারে তা বলে। পর্দার মধ্যে থেকেও প্রেম মহব্বত হলে আমাদের ইয়াং জেনারেশন কিভাবে ধ্বংসের কাছ থেকে ফিরতে পারে তা নিয়ে কথা বলে।

আমি তখন রবি কবির কাছে ধর্না দিই। 'তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি'।

জিজ্ঞেস করলাম, 'এই বইগুলা পাইলা কই? কে দিলো?'
অমিত এবার পোস্টেজের প্যাক দেখায়। প্রেমিকা, স্যরি, প্রেরিকার কী যেনো নাম মনে পড়ছে না। চিনলাম না। কিন্তু এটা জানলাম, অমিতের মারাত্মক ফ্যান। কিন্তু, অমিতও আগে একটু ডি-জুইস জেনারেশন নিয়ে লেখালেখি করছে। এইটা ঐ ফ্যান লাইক করে না। সে চায় অমিত 'উজ্জীবন' লেখা লিখুক। এসো তরুণ সত্যের পথে, আমাদের পতাকা হাতে, সংগঠনকে আঁকড়ে ধরো। এই টাইপ বিপ্লবী লেখা লিখুক সে।

এবার অবাক হই, বলি - কাহিনী কী? ডিটেইল বলো।
অমিত বলে, "সব উপরোয়ালার লীলাখেলা। মানুষ কখন কীভাবে পালটে যায় টের পাওয়া যায় না। সামান্য চ্যাটে এম এস এনে টুকটাক আলাপ করে আমাকে পালটে দিলো, ম্যান!"
হায়, এ কী কথা?
এতোক্ষণে, নতুন অমিতের কাহিনী বুঝলাম।
কে সেই অপরূপা কণ্যা, কুহেলিকা ছায়া?
তাহলে অমিতের জি-টকের বাদবাকী এতো এতো টুনটুনি পাখীর কী হবে? আমি হাত পাতি। উহু, অমিত করুণা করে না। বরং তার আরেক ফ্যানকে আমার কাছে গোছানোর চেষ্টা করে। বারবার বলে, 'ভয় পাচ্ছো কেনো? বোরখা পরে না তো?'
আমি রাজী হই না। বলি, যেই প্রোফাইল দিছো, বোরখা লাগবে না, এমনিতেই ভয় পাইছি। আসলে ঐটাইপের সাথে আমার রাশি মিলে না।'
এবার অমিত আমার জন্য নন-মুসলিম পাত্রী অফার করে। আমার সাথে নাকি খাপে খাপে মিলবে। তবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মুসলিম করে নিতে হবে।
আমি পাত্তা দিই না, 'ধুর মিয়া, অনেক লম্বা প্রজেক্ট। বাদ দাও। তৃণা টাইপ কেউ থাকলে বলো।'
অমিত এবার বিধর্মীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করলে কয়টা কুরবানীর সওয়াব পাওয়া যাবে তা নিয়ে কথা বলে। এই কথায় কথায় আমরা মক্কা বিরিয়ানী থেকে বের হয়ে আসি। (বিলটা অমিতই দিয়েছে, আমি নাকি তার মেহমান। মেহমানের খেদমত না করলে পরকালে...)

আলাপে আলাপে আমরা আবার রাস্তা ধরে হাঁটি।
গন্তব্য - কাছের কফি শপ।

তখন দেখি আমাদের বিপরীত দিক থেকে সালোয়ার কামিজময় এক পড়ন্ত বাঙালী কিশোরী আব্বু-আম্মুর সাথে হেঁটে আসছে। কার দিকে তাকিয়ে আছে সে? আমার দিকে নাকি অমিতের দিকে?

____

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

.
.
.

Read more...

অসহ্য গানের বিকাল

অ.
এখন আধুনিক হচ্ছি।
ওয়েদারের খবর রাখি, স্টারবাকসে উষ্ণ রাখি শরীর।
স্টক মার্কেটে কী হলো শেষে?
কী আর হয়? পুশকিন স্কয়ারে ম্যাকডোনাল্ডস প্রাসাদ গড়লো, বছর পনেরো আগে।
বাহাবা পেলো রাশিয়ার জনগণ। আর যখন মস্কো এরোস্টার হোঁচড় খায়?
শালার লুজারের দল সব।


ক.
সৌরভ জিগ্যেস করছিলো, ইদানিং অঞ্জন বেশি যন্ত্রণা করে কিনা।
খালি অঞ্জন না, আরও নানান জিনিশ যন্ত্রণা করে।
অসহ্য সুর, অসহ্য কথা; অসহ্য মানুষ, মানুষের মুখ।
নানান অসহ্য থেকে মুক্তির জন্য গান, অসহ্য গান।

____

০১. ভেসে যাওয়ার গান ।। হাসান মাসুদ

08 Bheshe Jaoar Ga...

__

০২. যাও পাখী বলো তারে ।। কৃষ্ণকলি

BDROCKSTAR_'Z-Jao_...


.
.
.

Read more...

16 October, 2008

হঠাৎ ভালো লাগা গান

আজকাল এক সময়কার ভালো-না-লাগা ব্যাপারগুলো ভালো লাগতে শুরু করেছে। হাবিব-অর্নবের গান শুনছি নিয়মিত।
তৌসিফের 'বৃষ্টি ঝরে যায়'এর পাঙ্খা হয়ে গেছি।
অনিলা-সুমনের গানও শুনি। রিপ্লে হয় ৪/৫ ঘন্টা একটানা।
সাথে আছে বালাম।
এফ এম ট্রেন্ড।

কোন প্রেমিকের কখন জেমস ভালো লেগেছিল, 'দুঃখিনী দুঃখ করো না', লিখেছিলো গল্পে। এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি সে।

এই ভিডিওটা চোখ-কান-মন তিনটারই ভালো লাগছে।

হু, সুজন-সুপ্রিয়।
খারাপ হয়ে যাচ্ছি, ছ্যাত...





মেয়েটার নামঃ Alizee
গানের শিরোনামঃ La Isla Bonita


Last night I dreamt of San Pedro
Just like I'd never gone, I knew the song
A young girl with eyes like the desert
It all seems like yesterday, not far away

Refrain:

Tropical the island breeze
All of nature wild and free
This is where I long to be
La isla bonita
And when the samba played
The sun would set so high
Ring through my ears and sting my eyes
Your Spanish lullaby

I fell in love with San Pedro
Warm wind carried on the sea, he called to me
Te dijo te amo
I prayed that the days would last
They went so fast

(refrain)

I want to be where the sun warms the sky
When it's time for siesta you can watch them go by
Beautiful faces, no cares in this world
Where a girl loves a boy, and a boy loves a girl

Last night I dreamt of San Pedro
It all seems like yesterday, not far away

(refrain x 2)

La la la la la la la
Te dijo te amo
La la la la la la la
El dijo que te ama
.
.

Read more...

15 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সূচনা পর্ব)

শহরের যে প্রান্তে আমি থাকি অমিত আহমেদ সেদিকে সচরাচর আসে না।
সে-ই কবে প্রথম আলো - আনন্দবাজারে ইলিশ মাছের ঘ্রাণ পেয়ে অমিত ড্যানফোর্থে আসলো। ইলিশ কিনে ব্যাগে ভরে মেট্রো ধরলো। মাঝ পথে কোন এক আন্টিকে দেখে চিন্তার ভারসাম্যে টান পড়লো; সে গল্প পড়লাম আরিজোনা থেকে ছাপা পত্রিকায়। এসবই অনেক আগের কথা।

এবার টরন্টো এসে অমিতকে ফোন দিলাম, টাইম মিলাও - দেখা করি।
আমার ইচ্ছে ছিলো, ছুটির দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অমিতের সাথে আড্ডা দেবো। ভারী এবং হাল্কা উভয় রকম খাবার খাবো। নানান বিষয়ে গল্প হবে। কিন্তু অমিতের টাইম মিলে না।
সময় যা-ও মিলে, অমিত কেবল সন্ধ্যার পরের কথা বলে। বড়ো জোর পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত আগায়। একবার এমনও বললো যে রাত নয়টা থেকে আড্ডা শুরু করতে।

কী আর করা?
নানান দিন তারিখ শেষে সময় ঠিক হলো।
পরের বুধবার বিকেল ৫টা ৩৫ এ দেখা হবে, ফাইনাল।
_

চেনা অচেনা সব শহরে আমি রাস্তা হারাই, এ আবার নতুন কী?
হাতে মোবাইল ফোন নেই, তাই কাগজে অমিতের ফোন নম্বর লিখে স্টেশনে অপেক্ষা করি।
অমিত আসে না।
৫টা ৩৫ পেরিয়ে পঞ্চাশ হয়।
পকেটের আধুলি পাবলিক ফোনে ফেলে ট্রাই করে যাচ্ছি। সংযোগ সম্ভব না।
রিডায়াল করি। আবার। আবার। এবং আবার। উত্তর একই, সংযোগ সম্ভব না।
রিসিভার রাখি না। কারণ, পয়সা ফেরত নেই। আমার পকেটেও আধুলি নেই।
স্টার বাটন টিপে টিপে তাই রিডায়াল করি। শেষে ভেসে আসে অমিতের গলা, 'হ্যাঁ, এসে গেছি। ২ মিনিট।'

অমিত এলো।
এসে হাত মিলিয়ে কোলাকুলি করলো।
তার আগে দূর থেকে হয়তো হাতও নাড়লো। আমি সেসব কিছুই দেখিনি।
কারণ, এ এক অন্য অমিত।
বই মেলায় সফেদ পাঞ্জাবীতে বাহারী চুলের যে অমিতকে দেখেছিলাম, এ অমিত সে অমিত নয়।
চুল ছোটো, পোশাক বেশে পাল্টেছে, তবে শুকিয়ে গেছে আরও বেশি।
প্রাথমিক তব্ধাবস্থা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এরকম শুকিয়ে গেছো কেনো?'
অমিত একটু গম্ভীর হয়ে বললো, 'কই নাতো? এরকমই হয়, রোজার মাসে একটু শুকিয়ে যাই।'
আমি বললাম, 'ওহ, আচ্ছা।'
এবার অমিত জিজ্ঞেস করে, 'শিমুল, তুমি রোজা রাখো না?'

...(চলবে)

____

আগামী পর্বে থাকবেঃ
সচিত্র বিরিয়ানী-বুরহানী-কফি, পূর্ণমুঠি-বোরখা পরা সেই মেয়েটি-বিলম্বিত বাসর-ফুটন্ত গোলাপ, প্রেম-বন্ধুত্ব-বিয়েশাদি নিয়ে জীবন ঘনিষ্ঠ আলাপ, এবং একটি তব্ধা খাওয়া ই-মেইল।


.
.
.

Read more...

13 October, 2008

শেখ জলিলের জায়গীরনামা

রাসেল আমাদের সাথে বিকেলে খেলতো না। স্কুল শেষে বাড়ী গিয়ে খেয়ে, একটু শুয়ে আবার মাস্টারের কাছে পড়তে বসতো। বুঝতাম না - বিকেলে খেলার সময় মাস্টার কেনো পড়াবে? পড়ালেখা তো রাতে করতে হয়! আবার শুনতাম, রাতে মাস্টার নিজে পড়ালেখা করে। মাস্টার কলেজে পড়ে, থাকে রাসেলদের কাঁচারী ঘরে। ক্লাস টু-থ্রি পড়ুয়া মন এসব জটিলতা বুঝতো না। কেবল ভেবে নিতো, রাসেলদের খুব কঠিন একজন মাস্টার আছে যে শিখিয়ে দেয় কীভাবে খাতায় মার্জিন টানতে হবে, কীভাবে হাতের লেখা সুন্দর করতে হবে। টিফিনের সময় সবুজ মাঠের আকাশে কাগজের প্লেন উড়িয়ে আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতাম, সেই কাগজের প্লেনের পেছনে লেজ বানিয়ে উপরের দিকে তুলে দিলে, দেখতে আরো একটু সত্যি প্লেনের মতো মনে হয়, আকাশে আরেকটু বেশি সময় নিয়ে ভাসে, সেটা আমাদের দেখিয়েছিল রাসেল। আর রাসেল শিখেছিলো তার মাস্টারের কাছে। এসব মিলিয়ে নানাভাবে রাসেলদের মাস্টারের গল্প শুনি। আরও অনেকদিন পরে কোনো এক দুপুরে দূর থেকে দেখি হ্যাংলা শরীরের এক তরুণ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, রাসেল বলে – ‘উনি আমাদের লজিং মাস্টার’। এতোদিনের কল্পিত মানুষটিতে মিল পাই না, কারণ – এরকম অল্প বয়সের মানুষ মাস্টার হয় কীভাবে? ক্লাস ফোরে সেই মাস্টার চলে গিয়েছিলো অন্য কোথাও, অন্য কলেজে কিংবা নিজের দেশে। মাস্টার না থাকায় রাসেলের পরীক্ষা ভালো হয়নি।

আমার শৈশবে এসব যখন ঘটছিলো, তার চৌদ্দ পনেরো বছর আগে শেখ জলিলের জায়গীরনামা শুরু। লেখকের জবানীতে - সিদ্ধান্ত নিজের ছিলো না, ‘বাবা ঠিক করলেন- আমাকে জায়গীর করে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন'| কারণটা স্পষ্টতঃ অর্থনৈতিক। রাসেলদের মাস্টার তাও কলেজের ছাত্র ছিলো, কিন্তু শেখ জলিল তখন মাত্র ক্লাস সিক্সের ছাত্র। বুঝা যায়, পরবর্তী দশক সময়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। ‘জায়গীর’এর পরিবর্তে ‘লজিং মাস্টার’ মানুষের মুখে জায়গা করে নিয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে লজিং মাস্টারের সামাজিক অবস্থান। কিন্তু শেখ জলিলের সময়টা অন্যরকম। অর্থনৈতিক মন্দার বছর তখন, তাই হাটকয়েড়া গ্রামের মাজম মেম্বারের গেরস্থ বাড়িতে শান শওকত কিংবা নামের বাহার থাকলেও ভেতরের সংকট প্রবল হয়ে উঠে। দশ-এগারো বছরের জায়গীরকে বারোমাসী কামলার সাথে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এটাই হয়তো বাস্তবতা। রিলিফের আটা-চিনি-দুধ হাতিয়ে নেয়া শাসক শ্রেণীর ছড়ি সমাজ নিয়ন্ত্রণ শেষে ক্লান্ত বিকেলে এসে পড়ে জায়গীরের উপরে।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে, সমগ্র জেলায় ফার্স্ট হয়ে, ক্ষণিক আদৃত হলেও উঠতি কিশোরটিকে যেতে হয় নতুন জায়গীরবাড়ীর সন্ধানে। গন্তব্য কুড়িপাড়া, সঙ্গী জনৈক লতিফ ভাই –


"দু'জন মিলে সারাদিন হাঁটি। সমতল ছেড়ে যখন পাহাড়ে উঠলাম তখনই দুপুর গড়িয়ে গেলো। পাহাড়ি পথ আর ফুরায় না। সমতলে মানুষ, এরকম হাঁটাপথে অভ্যস্তও তেমন ছিলাম না। মাঝে মাঝে থামি, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। পেটে ক্ষুধা, রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি খাই আবার হাঁটি।"


বদলে যায় রাজা, থেকে যায় ছায়া। তাই প্রথম দিনেই তামাক ক্ষেতে পানি দিয়ে, শরীরে ব্যথা-পেটে খিদা নিয়ে কৌতুহলী রাত শেষ হয়। লতিফ ভাইয়ের সাহসে মধুপুর গড় পেছনে ফেলে শেখ জলিল ফিরে আসেন। শেষ হয় একদিনের জায়গীর জীবন। প্রশ্ন জাগে, লতিফ ভাই না থাকলে শেখ জলিল কি ঐ জায়গীর বাড়ী ছাড়তে পারতেন? বয়স এবং প্রতিকূল সময়ে মানুষ সহনশীল হয়ে উঠে, কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সীমাবদ্ধতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ বেশি ছিলো কি? আগের মাজম মেম্বারের বাড়ীর কামলাদের নাম মনে থাকলেও কুড়িপাড়ার এ পরিবারটির পরিচয় অস্পষ্ট রেখেছেন লেখক। হয়তো স্মৃতিভ্রম, তবে এতো সময় পরে এসেও সামাজিক দায়ের কৌশল হলে সেই সীমাবদ্ধতার কথাটিই মনে করি আবার। অবশ্য, জায়গীরপ্রভুর নাম-সাকিন জানা পাঠক হিসেবে খুব জরুরী কিছু নয়।

‘যদি কেউ রাগ করে, যদি কেউ মারে ধরে, ভয় শুধু ভয়, শুধু ভয়, ...বাড়ছে না বয়স, পনেরোতে গেছে আঁটকে’ – অঞ্জন গেয়েছে আরও পরে। শেখ জলিল ঐ বয়সে খয়েরপাড়ার লালু সরকার আর হরিপুরের হাতেম আলী আকন্দ বাড়ী শেষে বোর্ডিং স্কুলের গন্ডি পেরুনোর সময়। সাথে চলছে জায়গীর জীবন। বয়ঃসন্ধির উৎসুক সময়, শরীরি নিষিদ্ধ আলাপ-অভিজ্ঞতা, খানিক দূরন্তপনায় রাস্তার পাশে বুট পুড়িয়ে খাওয়া, সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকে মোহনলালের পার্ট, ভাটার ইট চুরি করে কনক সিনেমা হল অথবা যাত্রাপালায় প্রিন্সেসের গায়ে কাগজ ছুড়ে মারার ইচ্ছেটুকু আঁটকানোর সাধ্য ছিলো না কারো। মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর ‘আমি এক দূরন্ত যাযাবর’ গলায় চেপেছে তারও আগে। এসব দিন যাপনের গল্পে উনিশ’শ ছিয়াত্তরের গণবাহিনীর উৎপাত এবং পরিণতি প্রসঙ্গও আসে।

অধুনাপতিত এক সাপ্তাহিক সম্পাদক একবার লিখেছিলেন, চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষ বাংলা সাহিত্যে তেমনভাবে আসেনি। তার সে আফসোস কলামে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট থাকলেও শেখ জলিলের জায়গীরনামা পড়তে গিয়ে আবার মনে পড়ে গেলো, সাথে যোগ হলো এবার গণবাহিনী প্রসঙ্গ। এরশাদের প্রথমদিকের সময় এসেছে এভাবে –

"উনিশ শ’ বিরাশি সাল। এরশাদের সামরিক শাসন সবেমাত্র শুরু হয়েছে। চারদিকে থমথমে গুমোট পরিবেশ। লোকজনের কথাবার্তাতেও নিচু স্বর। রাস্তাঘাটে মহিলাদের চলাচলেও চলছে খবরদারি। পরীক্ষার হলগুলোতে চলছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এমতাবস্থায় শুরু হলো আমার এইচএসসি পরীক্ষা।"


জায়গীর জীবনের শেষ অধ্যায় ঢাকা শহরে।
গ্রামের মেঠো পথের বদলে ইট সুরকির দালান। হাঁফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠা। চারদিকে শহুরে মানুষ, শহুরে ভাষা, তবুও ভেতরে কোথায় যেনো সেই গ্রামীণ মন। স্যান্ডেল পরে কলেজে যাবার, বিকেলে নিচ থেকে বন্ধুদের ডাকাডাকি, এসব ঘটনার মাঝে একটা ‘হারানো দিন’ ভাব আছে। দৃশ্য কল্পে মনে হয় ‘নীল আকাশের নীচে’ বা ‘প্রফেসর’ সিনেমার নায়ক। সাদাকালো জীবন, মনের ভেতরে রঙীন ইচ্ছা। তবে সব কিছুর প্রকাশের ভঙ্গী বদলেছে, বদলায়নি জীবনচর্চা। শেখ জলিল এই সময়কে ভিন্নভাবে দেখেছেন, দেখার চেষ্টা করেছেন অন্য চোখে। বলেছেন, নিজের যাপন বদলানোর কথা। ধারণা করি, বয়সটাই অমন। নানান সংকটেও আশাবাদী থেকেছেন। স্থায়ী জায়গীরের বদলে বেড়েছে প্রাইভেট টিউশন। প্রসঙ্গতঃ চলে আসে পড়ন্ত কৈশোরের অপ্রকাশ্য প্রেম-বিরহের কথা। সে-ই কবে কুতকুত খেলতে গিয়ে একটু বয়সী দোলার সাথে জড়াজড়ি, স্পর্শ, না-ভোলা-স্মৃতি। পালাক্রমে আফরোজার প্রতি মুগ্ধ বিষ্ময়, শ্যামলা বর্ণের মেয়ে ঝিনুক, শান্ত মেয়ে সাথী, স্মার্ট বিরু, অথবা ইমা। এসব মুগ্ধতা শেষতক ভালোলাগাই রয়ে গেছে, ভালোবাসা হয়নি, কিংবা শেখ জলিল বাঁধনে জড়াতে চাননি। বরং এড়িয়েছেন শেফালী কিংবা সাদমাকে বিয়ে করার বণিকী প্রস্তাব।

জায়গীরনামার গল্প করতে গিয়ে লেখক নিজের জীবনের গল্প বলেছেন সাবলীলভাবে। এসেছে নানান চরিত্র। বানোয়াট নয় বলেই হয়তো প্রতিটি ঘটনা গল্পের ব্যাপকতাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে শেখ জলিল প্রথম দিকের ঘটনা বিস্তারে আত্মকেন্দ্রীক থেকেছেন, কেবল নিজের গল্প বলেছেন। বিশেষ করে মফস্বল জীবনের সময়কে ছাড় দিয়ে গেছেন। তাই নিজের মাঝেই টেনেছেন স্মৃতির শেষ রেখা। এ রেখা তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত করতে পারতো, এখনো পারে – যদি জায়গীরনামায় স্মৃতিছুরি চালানো হয়। জলিল ভাই কি অমন করবেন?

খুব সম্ভবনা থাকে – আত্মজীবনীর এসব চেষ্টায় চাপা পড়ে কষ্টের কথা, বেদনার কথা, হতাশার কথা, লজ্জার স্মৃতি। সেটা হতে পারে সচেতন লেখনী কৌশল কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ‘জায়গীরনামা’ এদিক থেকে অনেক মুক্ত।
স্মৃতি হাতড়ে সাত বছরের জীবন এসেছে রঙীণ কাঁচের ছোঁয়াচবিহীন ভাবে। ঘটনা বর্ণনে চাতুর্য্য নেই, আছে নিটোল সারল্য। জীবন সংগ্রাম তাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। হার-না-মানা দৃঢ়তা আসে নগর জীবনের নিত্য সংকটে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যাওয়ার বলাকা এক্সপ্রেসে শেখ জলিল তাই একা থাকেন না, সাথে থাকে সংগ্রামী অভিজ্ঞতা, আশাবাদী প্রত্যয়।
যার পুরো প্রেরণাই জায়গীরনামা।

.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP