23 April, 2008

আগামীর আলুময় জীবনে যখন যাবতীয় সম্ভবনা, তখন...

-
তর্ক-বিতর্ক যা-ই হোক, এবার আর উপায় নেই। চালের দাম কমবে, কমবে মানে আগের মতো ১৬-২০ টাকা হবে ব্যাপারটি হাবিবুল বাশার সুমন আবার ফর্মে এসে টানা সেঞ্চুরি করে আশরাফুলের পজিশন কেড়ে নিয়ে, অধিনায়ক হয়ে, ২০১১ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলকে চ্যাম্পিয়ন করে দিবে; একই পর্যায়ের। এ দুটি স্বপ্ন আপাততঃ একই রাতে একই ঘুমে দেখা সম্ভব। এবং মাঝ রাতে অথবা সকালে ঘুম ভেঙে ঐ স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বলে মেনে নেয়া যাবে চোখ না কচলে, ‘সোলেমানি খাবনামা ও তাবীর’ না দেখে।

চালের দামের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব ফেললো সেটা নিয়ে বিদেশি মিডিয়া রমরমা। ধনী-গরীব অনেক দেশে চালের সংকট। তাই বলে তারা কি বসে আছে? তারা কি ভাত খাবো-ভাত দাও-চালের দাম কমাও বলে কান্না করছে? মোটেই না। সুব্লগার সুবিনয়ের দেয়া লিংকে ক্লিক করে দেখি – আফ্রিকার কালো মানুষ কী মজা করে স্প্যাগাটি খাচ্ছে। (আচ্ছা spaghetti বাংলায় ক্যামনে লিখে? ভাতের কসম লাগে, আমি স্প্যাগাটি কোনোদিন খাই নাই, ছবি যা-ও দেখছি; মনে হয় নুডুলসের মতো কিছু একটা হবে। কারণ, আমি ভাতের হোটেলেই বেশি গেছি। অথবা হোটেলে গেলে ভাত বেশি খাইছি।)

তবে নুডুলস ক্যামন জানি খাইতে অসুবিধা, হাঁস যেমন কিলবিল করে কেঁচো খায়, তেমন করে নুডুলস খাওয়ার স্টাইলটা সুবিধার মনে হয় না। এই ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত খাবার হিসাবে আলু ঠিক আছে। ঠিক আছে মানে পুরা ঠিকাছে। আমাদের দেশীয় শস্য, ফলন ভালো হয়। ডাক্তারেরা বলে পুষ্টিমান ভালো, ভাতের চেয়েও নাকি ভালো। ইতোমধ্যে যারা টুকটাক আলুভ্যাস করে ফেলছেন, তাদের কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, আলু খেলে শরীর হাল্কা লাগে, পেট ভারী লাগে না, রাতে ভালো ঘুম হয়, হুদামিছা আমরা ভাতের জন্য পাগল হয়ে থাকি। বন্ধু কমলকান্ত বললো – রিকি পন্টিং নাকি জীবনেও ভাত খায় নাই, তাহলে – হাবিবুল বাশারের জন্য গোপন একটা রহস্যও উন্মোচিত হলো।

তাহলে আসুন, আলুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে টপাটপ কিছু রেসিপি দেখিঃ

পোড়া আলুঃ
এটা মূলতঃ পোড়া কপাইল্যা মানুষের খাবার।
বিবিসিনিউজ সাইটে বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোফাইল যেটা দেয়া আছে, সেখানে বলা আছে দেশের অর্ধেকের মতো মানুষ ডেইলী ১ ডলারের কম আয় করে। গত তিন বছরে এই বাক্যটা পালটানো হয় নাই। আবার ইকনোমিস্টরা বলে – বাংলাদেশে অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। বছরান্তে হিসাব উলটাপালটা হতে পারে। তবে অতি নিন্ম আয়ের মানুষ, যারা আগে এক/দুইবেলা ভাত খেতো তাদের জন্য এ মেন্যু। পোড়া আলু প্রস্তুত প্রণালী খুব সহজ কাঠ-কয়লার আগুনে আলু পোড়ানো হবে, এবং ৫ মিনিট পরপর কাঠি দিয়ে গুতিয়ে দেখা হবে কেমন পুড়লো। তারপরে বাতাসে রেখে আলু একটু ঠান্ডা করে মুখে পুরে দিতে হবে। কেউ কেউ বলেন –আলুর খোসায় কি একটা বিশেষ পুষ্টি আছে, সুতরাং খোসাসহ খান। পেট শান্তি, জগত শান্তি।

__

সিদ্ধ আলুঃ
আয়-রোজগার একটু ভালো আছে, নিন্ম/মধ্যবিত্ত ট্যাগ লাগানো মানুষদের জন্য এ পদ্ধতি।
আলু পোড়ানোর চেয়ে সিদ্ধ করলে দেখতে ফরসা লাগে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হয়। গ্যাস-হিটারের চুলায় আলু পোড়ানো খানিক ঝামেলা, তাই পানির পাত্রে আলু সিদ্ধ করতে হবে। খুন্তি অথবা চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে হবে – কেমন নরম হলো।
হয়ে গেলে পানি থেকে আলুকে আলাদা করে রাখুন, একটু ঠান্ডা হোক।
তারপরে বিটিভিতে সংগীতানুষ্ঠান বাঁশরী/মালঞ্চ, সাধ্যে কুলালে জিটিভি তে ‘ঘর কা লক্সমি বেটিয়া’ অথবা ‘কাসম সে’ দেখতে দেখতে আলুর খোসা ছিলে ফেলুন।
তারপর আলুতে সামান্য লবণ, কাঁচা মরিচ (গূড়া মরিচও চলবে), পিয়াজ অর্ধেক মিশিয়ে নিন। তবে মাসের প্রথম সপ্তায় বেতন হাতে থাকার দিনগুলোয় সিদ্ধ আলুর সাথে টমেটো কেচাপ মিশিয়ে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে আলু সেদ্ধ করার আগে খোসা ছিলে নিতে হবে।

বিশেষ নোট -
খোসা ছিলায় স্বামী/স্ত্রী দু’জন অংশ নিতে পারেন।
রান্নার কাজ ভাগাভাগির মাধ্যমে নারী-পুরুষের সাম্য সৃষ্টি হবে। আলুর খোসা ছিলতে ছিলতে মিল-মহব্বত-পেয়ারের খুনসুটি হবে। রোমান্স ঘন হয়ে ওঠবে, এবং আলু ভোজনের পরে তা উতলিয়ে যাবে।
নারী নীতি নামক কাগুজে ব্যাপারকে আঙুল দেখিয়ে আলু প্রমাণ করে দিবে – ‘অর্ধেক খোসা ছিলিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

__

ব্যুফে পটেটো এট ফাইফ ফিফটি ফাইভঃ
নিচের মেন্যুগুলো শহরের আলোকিত চটকদার মানুষদের জন্য।
এরা সাধারণতঃ পাঁচ তারার শেফের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত। প্রয়োজনে পারিবারিক আয়োজনে রেডিসন-শেরাটনের শেফ ডেকে ছাদের উপরে পটেটো নাইট করতে পারে। এছাড়াও – এরিস্টোক্রেট, ই-ফেস, নিনফার্জ, আট্রিয়াম, ব্লু ওশান, মেস্কিট গ্রিল রেস্টুরেন্টগুলোয় ব্যুফে থাকবে, পটেটো এট ফাইভ ফিফটি ফাইভ। পাঁচশ পঞ্চান্ন টাকায় প্যাকেজ, সাথে সার্ভিস চার্জ – ভ্যাট থাকবে।
সিদ্দিকা কবীরের বইয়ে এসব খাবার বানানোর টেকনিক নাই।
ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, তবে বাংলা অনুবাদে সমস্যা। নেটে পেলাম পটেটো গ্রাটিন (Potato Gratin) রান্না করতে লাগে 15 garlic cloves, smashed / 4 large thyme sprigs /2 bay leaves/ teaspoon freshly grated nutmeg। এগুলার বাংলা নাম কী?
তবে ছবিতে দেখি, কোনটা কী। (কৃতজ্ঞতা গুগুল মিঞা)
__
এটার নাম নাকি ক্রিমি পটেটো গ্রাটিন:


__
ম্যাশ পটেটো:

__
হয়তো দিশি পটেটো কারী:

___

এবার দেখি, আলুর অন্য প্রভাব কেমন পড়বে?

।। বৌ ভাত নামক অনুষ্ঠান বদলে যাবে, নতুন নাম – বৌ আলু

।। নবান্ন উৎসব হবে নবালু উৎসব

।। দৈনন্দিন জীবনের সংলাপ হবেঃ

অতিথি আপ্যায়নঃ কী বলেন, এই ভর দুপুরে না খেয়ে যাবেন? একটা আলু খেয়ে যান...

পাড়াবেড়ানো আলাপঃ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবো ভাবী, চুলায় আলু দিয়ে এসেছি...

ফোনালাপঃ শুনো, আমার আসতে দেরী হবে, ফ্রিজে আলু আছে, ওভেনে গরম করে নিও।

মেয়েদের আড্ডাঃ ইশিতার আম্মু না, যা ভালো আলু রান্না করে না – পুরা জোসস। আর চুমকিদের বাসার আলু যা তা - জঘন্য। এ-ই, শোন, এটা আবার বলে দিস না। নে, আলুর চাটনি খা, ভাবী বানালো আজ।

বয়স্কদের আলাপঃ বয়েস বেড়ে যাচ্ছে, কিছু খেতে ইচ্ছে করে না, ঐ আলু সেদ্ধটাই একটু ভালো লাগে।

শিশুতোষ আলাপঃ তুমি বাল্লো না, তুম্মি পঁচা, আমি ভালু- আমি আলু খাই।

।। দৈনিক পত্রিকার স্বাস্থ্য কলামঃ
‘ভালো থাকুন’, নাম পালটে হবে – “দিন শুরু হোক আলু দিয়ে।“ এতে সাত সকালে এক গ্লাস পানির সাথে কোন টাইপের আলু খেলে কৌষ্ঠ্যকাঠিন্য কমে সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হবে।

___

।। নতুন গানের এলবাম ।।

শিরিনের - লাল আলুওয়ালা

হাবিব ওয়াহিদের - এসো তবে আলু পোড়াই

মিলার - রূপভানে নাচে আলু খাইয়্যা

শুভ্রদেবের - আমি হ্যামিলনের সেই আলুওয়ালা

জেমস আইয়ুব বাচ্চু (ডুয়েট) - আলু ৫০০ মিলিগ্রাম

___

।। বই মেলায় নতুন বই।।

হুমায়ুন আহমেদের – হিমুর হাতে কয়েকটি কাঁচা আলু

তসলিমা নাসরিনের – তুমি আমায় ডেকেছিলে আলুর নিমন্ত্রণে

আনিসুল হকের – তোর জন্য, আলু ভর্তা

রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা সিরিজ – আলু উধাও

কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজ – আলুর খামার ১-২-৩

এবং
মাহবুব লীলেনের – আলুর চোকলাবাছা দিন

___

বাজারে হরেক রকম আলুর ব্রান্ড আসবে।
রেডিও টিভিতে বিজ্ঞাপন হবে।
_
বিজ্ঞাপন - ০১
সুদর্শন তরুণ-তরুণীরা নেচে গেয়ে বলবে – ‘আলু খাই দিনে, আলু খাই রাতে, অনেকে আলু খাই ভোর দুপুরে। এটাই তো দেশ সেরা প্রিয় খাবার, প্রিয় আলু – সেএএ আছে ভালু, যে রোজ খায় শুধু আলু।
আমরা তো খাচ্ছি আলু – তোমাদের কী খবর বলো?
ভালো থাকার ইচ্ছে হলে, আমাদের সঙ্গে চলো।
পেট ভর হয়ে যায় আলুয় আলুয়, নানা মুনির মতে কী আসে যায়?
মেদ নিয়ে টেনশন আর করি না, প্রোটিন মেশানো আছে – আর নেই ভাবনা।
আলু আলু আলু বাংলামিল্কআলু, আমরা আছি ভালু – তোমাদের কী খবর বলো?
বাংলামিল্কআলু – এখন মিনি প্যাকেও পাওয়া যাচ্ছে।
_

বিজ্ঞাপন – ০২
টিভি টক শোর জনপ্রিয় উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে – আমি এখন এসেছি খুলনায়, মিসেস রহমান আপনি কোন আলু খান?
মিসেস রহমান হাসি দিয়ে বলবেন, কেনো – মেরিলালু?
এখন এসেছি রাজশাহীতে – 'মিসেস আহমেদ আপনার প্রিয় আলু কোনটি?'
জবাবে- ‘আলু? আমি তো চোখ বন্ধ করে মেরিলালু খাই’।
মেরিলালু, একটি স্কয়ার প্রোডাক্টস।
_

বিজ্ঞাপন - ০৩
স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান।
প্রধান শিক্ষক মাইকের সামনে ঘোষণা করছেন – ‘আমাদের এবারের সেরা ছাত্র...’
এরপর শুনসান নীরবতা।
ক্যামেরা চলে যাবে দর্শক সারিতে। উদ্বিগ্ন অভিভাবক সারি।
চশমা খুলে প্রধান শিক্ষক আবার বলবেন, ‘এবার শতভাগ নম্বর, শতভাগ উপস্থিতি, এবং সব স্পোর্টসে প্রথম হয়েছে –‘
আবার দর্শক সারি। ছাত্রছাত্রীদের বড় বড় চোখ। টেনশন।
প্রধান শিক্ষক ঘোষণা করবেন – ‘এবার সেরা ছাত্র হয়েছে – পাপ্পু’!
পাপ্পুর বাবা-মা পাপ্পুকে নিয়ে হাত উঁচু করে দাড়াবেন।
পাপ্পুর মা’কে পাশের মহিলা জিজ্ঞেস করবেন, ‘এই ধুলা-ধোঁয়ার শহর, বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, সেখানে পাপ্পু একদিনও এবসেন্ট না? শতভাগ মার্ক? কীভাবে?’
পাপ্পুর বাবা – টিফিন বক্স থেকে আলু সেদ্ধ বের করে বলবেন – ‘নিন খান, আলু খান, পরীক্ষা পাসের আলু’।
চারদিক থেকে সবাই বলবে – ‘আলু? কোন আলু?’
বিজ্ঞাপন কন্ঠ ঘোষণা দিবে – ‘স্টারালু, সাফল্যের শতভাগ নিশ্চয়তা, মতি-আনাম ব্রাদার্স, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।‘
_

চলমান আলু সমাজ, চলমান বাংলাদেশঃ
থামাথামি নেই।
এখন থেকে মিস্টার চৌধুরী আলু খাবেন, মিসেস চৌধুরীও কম যাবেন না।
আলাল খাবে, দুলাল খাবে।
রাজু আর রিংকী তো এখন সারাক্ষণ আলু খাওয়া খাওয়ি করবে।
এমন কী মোটকু মফিজ? সেও এখন আলু খাবে।
আমাদের রুমা খাবে, সোমা খাবে।
জিপিএ ফাইভ বল্টু, সে-ও আলু খাবে।
হ্যাঁ ভাই, চালের দাম বাড়তিতে আলুর দাম কমেছে।

এখন তো সারা বাংলাদেশ আলু খাবে।

-

3 মন্তব্য::

Anonymous,  11 March, 2009  

হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেল!

আনোয়ার সাদাত শিমুল 11 March, 2009  

ধন্যবাদ, এনোনিমাস...

Anonymous,  11 March, 2009  

Hahahahahha

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP