24 September, 2006

সম্প্রীতির সন্দেশ

ডিসি অফিসে বছরের এই সময়ে এরকম একটা মিটিং হয়। মকসুদআলী আর শাহাবুদ্দির পাশাপাশি নারায়ণ নাথ-কেও বসতে হয়। এবারো অমনটা হলো।

ডিসি খায়রুজ্জামান কিছুটা তৃপ্তির হাসি হাসেন
- বুঝলেন নারাণবাবু, ঘটনা তেমন কিছু না। গত ক’বছর ধরে এমনটা হচ্ছে। রোজা-পূজা একসাথে। এবারো উপরের অর্ডার আসছে - সেহরী, তারাবীর নামাজ আর ইফতারের সময় বাদ্য-বাজনা-মাইক বাজানো যাবে না।
-জ্বী স্যার, বুঝতে পারছি। নারাণ সম্মতি দেয়।
পাশ থেকে মকসুদআলী চোখ ঘুরিয়ে বলে - কেবল আপনি বুঝলে তো হইবো না বাবু, পোলাপাইনেরেও বুঝাই কইয়েন। শয়তান কিছু আছে - তারাবীর জামাতের সময় মসজিদের পাশে গিয়া পটকা ফুটায়।
- ওসব কিন্তু মুসলমানের পোলাপাইনও করে। নারাণ জবাব দেয়।
শাহাবুদ্দি কম যায় না - আমি কইলাম ধরতে পারলে এইবার খতনা করাই ছাড়বো। গতবার হারাণের পোলারে ধরছিলাম না!
নারাণ আমতা আমতা করে - সাথে কিন্তু আপনের ভাগিনাও ছিল।

ডিসি এবার থামায় সবাইকে।
- দেখেন আপনারা হইলেন এলাকার গণ্যমান্য লোক। আপনারা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, উতসবগুলো সমস্যা ছাড়া কেটে যাক। সামনে ইলেকশন আছে। এ সময় ঝামেলা যত কম হবে, তত ভালো।
- আমরা তো সবসময় শান্তিই চাই। কেবল এই পূজার কয়েকটা দিন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহায়তা দরকার। কিছু পোলাপাইন এবারো সমস্যা করতে পারে।
শাহাবুদ্দি গলা খাকারি দেয় - নারাণবাবু, আপনেরা সহজ বিষয়টা জটিল করে ফেলেন। পোলাপাইন চা-নাস্তার জন্য কিছু চাইলে দিয়া দিয়েন...
-ঐটা তো প্রতি বছর দিই।
- তাইলে আর চিন্তা কইরেন না, আমরা তো আছি। কোন গন্ডগোল হইবো না। খালি ঢোল বাজনাটা একটু হিসাব কইরা কইরেন। মকসুদমিয়া সাহস দেয়।

নারাণবাবু এবার হাত কচলায় - আরেকটা কথা ছিল, ডিসি স্যার।
বলেন নারাণবাবু, বলেন।
- সেহরীর সময় তো মাইকে হুজুরেরা ডাকে। মোটামুটি সবার ঘরে অ্যালার্মঅলা ঘড়িও আছে। এরপরও কিছু ছেলেপেলে গেইটে এসে পিটাপিটি করে। ওরা তো জানে -এইটা হিন্দু বাড়ী । এরপরও পিটাপিটি না করলে হয় না? বাড়ীতে অসুস্থ বুড়া মানুষজন আছে। বাচ্চাকাচ্চা আছে...
মকসুদমিয়া চেয়ার নেড়ে বসে - এর লাইগা কয়, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। সামান্য ক’টা রাত - কী এমন ডিস্টার্ব হয়? একটু সহ্য করবার পারেন না?
শাহাবুদ্দি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে - পোলাপাইনরে ক্ষেপায়ে লাভ আছে? ক’টা দিন সহ্য করে যান। আপনেরা ভালো থাকেন। আমরাও ভালো থাকি।

...ভালো থাকাটা খুব দরকার।
ডিসি সাহেব সবাইকে চা-সিঙ্গাড়া খাইয়ে মিটিং শেষ করেন।

পরদিন সংবাদপত্রেঃ
... গতকাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সাথে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আসন্ন রোজা ও পূজা শান্তিপূর্নভাবে পালনের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়...।

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৬

Read more...

20 September, 2006

মিলিটারি ক্যু

রাত সাড়ে বারোটায় ছোট ভাইয়ার ফোন কল।- কেমন আছো তুমি?- হুমম... কে ভাইয়া? ভালো আছি... (তখনো 90% ঘুমভাব)- কোন সমস্যা হচ্ছে?- না তো, কোন সমস্যা নাই!- মিলিটারী গন্ডগোল তোমাদের ওদিকে আছে?- ওগুলো মূলত: সাউথ থাইল্যান্ডের দিকে। সারা বছর টুকটাক ওরকম হয়... (এগুলো আমার মুখস্ত কথা, সবাই জিজ্ঞেস করে, আমি একই কথা বলি)- না! আজকে যে মিলিটারি ক্যু হইলো, তার কথা বলছি। এবার আমি চোখ কচলাই।
- তাই নাকি?
- হঁ্যা, বিবিসি নিউজ দেখো...
তারপর সামান্য আলাপের পর আমাদের কথোপকথন শেষ হয়।

বিবিসি নিউজে দেখি - ব্রেকিং নিউজ - থাইল্যান্ডে ক্যু - সংবিধান বাতিল - মিলিটারি সব দখল করে নিয়েছে - প্রধান মন্ত্রী থাকসিন জাতিসংঘের সম্মেলনে নিউ ইয়র্কে আছে - ওখান থেকে তিনি ঘোষনা করেছেন, তিনি এখনো প্রধান মন্ত্রী। বিবিসি-র ব্যাংকক রিপোর্টার জোনাথনকে দেখলাম মাথায় ছাতা দিয়ে লাইভ রিপোর্ট দিচ্ছে। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি। থাই চ্যানেলগুলোয় দেশাত্ববোধক গান চলছে।সকালে অফিসে আসলাম। গুটি কয়েক কলিগ টেলিভিশনের সামনে খবর দেখছে। আর সামান্য ক'জন নিউজপেপার পড়ছে। আমি এর সাথে কথা বলি, ওর সাথে কথা বলি, কেউ কিছু বলতে পারে না। যারা পারে - তাদের আইডিয়াও খুব লিমিটেড। ব্যাংককে গন্ডগোল হয়েছে। ব্যাস... এর বেশী কিছু নয়। আমার অবাক লাগে। দেশে এত বড় ঘটনা ঘটছে - কারো কোন বিকার নেই, প্রতিক্রিয়া নেই। শেষে কথা বললাম - ফিলিপিনো কলিগ নেইলের সাথে। ও বললো - থাইল্যান্ডে মিলিটারি "কুপ" (!) নতুন কিছু নয়। সাধারণ জনজীবনে এর কোন প্রভাব পড়বে না, কেবল প্রশাসনিক লেভেলে পরিবর্তন আসবে।
এরপর বাংলাদেশ থেকে ঘনঘন কয়েকটা ফোন কল পাই। উদ্্বিগ্ন নিকটজনরা পরিস্থিতি জানতে চায়। আমি তখন কাদির কল্লোল কিং বা ওয়ালিউর রহমান মিরাজ-- হঁ্যা। ক্যু হয়েছে। ব্যাংককের পরিস্থিতি কিছুটা আশংকাজনক। কি হচ্ছে তা এখনো ঠিকমতো বলা যাচ্ছে না। বিদ্্রোহী মিলিটারী গ্রুপ বলছে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে থাকসিন এখনো তার কর্তৃত্ব প্রকাশ করছে। খবরে দেখলাম ব্যাংককের বড় রাস্তাগুলোয় মিলিটারী পাহারা আছে। সরকারী অফিসগুলো আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।- সাধারণ জনজীবনের কী অবস্থা?- ব্যাংককের কথা ঠিক বলতে পারছি না। তবে পাতায়ায় সবকিছু স্বাভাবিক। প্রাইভেট অফিসগুলো খোলা আছে। তেমন কোন শংকা দেখা যাচ্ছে না।- মানুষের প্রতিক্রিয়া কি?- তেমন রাজনীতি সচেতন কারো সাথে এখনো কথা হয়নি। তবে আজকের প্রধান সংবাদপত্রগুলোর হেডিং -এ কেবল একটি শব্দ - "ক্যু"। ওখানে পাবলিক রিঅ্যাকশন কলামে দেখা যাচ্ছে অনেকেই খুশি। থাকসিনের কথিত দূর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক মানুষ ক্ষুব্ধ!- তাহলে এ মিলিটারী শাসন কি সাসটেইন করবে?- এটা এখনো ঠিক বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী থাকসিন এখন নিউ ইয়র্কে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকসিনের জন্য প্লাস পয়েন্ট। দেশের বাইরে থাকায় থাকসিন বিশ্ব জনমত আদায়ের সুযোগ পেয়ে গেল। সুতরাং পুরো ব্যাপারটা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বলয়ে আঁটকে গেলো।- দোআ করি - ভালো থাকো।

সুপত ও হামিদের গল্প:
এখানে আমি যে লজে থাকি, সেখানে একজন গার্ড আছে, নাম সুপত। ছোটখাটো মানুষ। ইংরেজী যতটুকু পারে - তাতে করে আমার অনেকগুলো অবসর সময় ওর সাথে আলাপী আড্ডায় চলে যায়। সে এখন বাংলা 1 থেকে 10 পর্যন্ত গুনতে পারে। সালাম, খোদা হাফেজ, ভালো আছি - বলতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে সুখী মনে করে সে। কাজ শেষে নিজের মোটরবাইকের পেছনে বৌ-কে বসিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চাটা স্কুলে পড়ে। সুপতের ইচ্ছা - ওর বাচ্চা ভালো ইংরেজী বলবে। তাই এখন থেকে ইংরেজী ওয়ার্ড বুক কিনে দেয়। ছুটির দিনে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। কারাওকে-তে গান করে। এ.টি. এম কার্ড ইউজ করে। মোবাইলে এম.পি. থ্রি-তে গান শুনে। রাজনীতি কিংবা সমাজ নিয়ে তার কোন ভাবনা নেই। মিলিটারি কূ্য হলে তার কি এসে যায়? বেশ তো, চলছে যেমন চলুক না!
সুপতকে দেখে আমাদের ঢাকার বাসার গার্ড হামিদের কথা মনে পড়ে। দেশ বিদেশের সব খবর হামিদের জানা। ইরাকে কয়জন মারা গেল, আফগানিস্তানে কয়টা হামলা হলো, গায়ক আসিফ বিএনপি থেকে নমিনেশন চাইতে পারে, সৌরভ গাংগুলী কবে দলে ফিরবে কিংবা পূর্ণিমা-রিয়াজের মাঝে বিয়ে হবে কিনা - সব ব্যাপারে সে আপডেটেড। প্রায়ই সন্ধ্যায় আমি বাসায় ফিরতেই সে খবর দিতো - ভাইয়্যা, কালকে আবার হরতাল দিসে। বাজার থেকে এসে বলতো - বাজারে আগুন, দাম কমার কোন লক্ষণ নাই! সব নাকি সিন্ডিকেট। তেল খাওয়া বাদ দিতে হইবো।সুপতের কাছে যেগুলো জীবনের বেসিক চাহিদা, হামিদের কাছে ওগুলো স্বপ্ন। দেশ বিদেশের খবর রেখে এত্তো কিছু জেনে - কি হবে হামিদ? ভোট দিয়ে সরকার পালটাবা, হৈ চৈ করবা - কিন্তু তুমি কি কখনো এ.টি.এম কার্ডে টাকা তুলে মোবাইল হেডসেট লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে বৌ-বাচ্চা নিয়ে ভালো একটা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবা!

Read more...

18 September, 2006

বস্ত্রবালিকা ও অন্যান্য

রবিউল যখন খবরটা দিলো তখনো বিশ্বাস হয়নি। ফালানির মা ভুরু কুঁচকে বলেছিল - ধুররো মফিজ, তোর মাথা খারাপ হই গেছে? কিন্তু গতকাল ফ্যাক্টরিতে সবাই যখন বিষয়টা আলাপ করছিল তখন বিশ্বাস জন্মায় আস্তে আস্তে। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, কাটিং মাস্টার জুলফিকার শার্টের পকেট থেকে খবরের কাগজটা বের করে যখন জোরে জোরে পড়ে শোনায় আশেপাশের চোখগুলো তখন জ্বলজ্বল করে উঠে। কেউ একজন বলে উঠে - আরে বুঝোনা, এগুলান হইলো ভোটের কেরামতি। সাথের জন গলা খাকারি দেয় - ভোট হউক, যা-ই হোক মিয়ারা; বেতন বাড়বো - ঐটাই বড় কথা। জুলফিকার এবার আওয়াজ দেয় - ওই থাম তোরা। এই বাড়ায় লাভ আছে? জিনিসপত্রের যে-ই দাম, সংসার চলে? তিন হাজার না করলে আবার আগুন জ্বলবো কইলাম, রেডি থাইকো সবাই। দূরে দাড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলো ফালানির মা।


সেদিন বিকাল থেকে ফালানির মা মনে মনে কী যেন একটা হিসাব করে। ঠিক একটা হিসাব না, অনেকগুলো হিসাব এসে আশেপাশে ঘর-বসতি করে। তবে মাঝে মাঝে সন্দেহও জাগে। হঠাত কী এমন হইলো যে নয়শো তিরিশ থেকে ষোলশ’ চার টাকা হইবো? ক’দিন আগে যে গন্ডগোল হইছে তার বদলে বড় জোর হাজার-বারোশ’ হইতে পারতো। কিন্তু ষোলশ’ চার টাকার ব্যাপারটা খটকা লাগে। চার টাকা আবার কোন হিসাব? রবিউল অবশ্য এই কথাও বলছিল যে - এইটা একুশ শ’ সতের টাকা পঁঞ্চাশ পয়সা হইবো দুই বছর পর। আবারো সতের টাকা পঁঞ্চাশ পয়সার পঁ্যাচ!


এ সব পঁ্যাচ-গোচ পেরিয়ে ফালানির মা কি জানি কি ভাবে আর গোপনে মনের ভেতর একটা সুখের স্বপন জাগে। ফালানিও এমকে অ্যাপারালসে কাজ করে। দুইজনের যদি মোট চৌদ্দশ’ও বাড়ে - কম কি? ফালানির বাপের হাঁফানির অসুদটা এইবার রেগুলার কেনা যাবে, মাসে একদিন ভালো মন্দ খাওয়া যাবে, খোলা তেলের বদলে টিভি-তে দেখায় ওরকম একটা সুগন্ধি তেলের বোতল কেনা যেতে পারে, ফেয়ার এন্ড লাভলি ইন্ডিয়ানটার দাম বাংলাদেশীটার চেয়ে দশ টাকা বেশি - এইবার ফালানি ইন্ডিয়ানটাই কিনুক ! আহারে, এই বয়সের মেয়েদের কত শখ থাকে! ফালানির বিয়ের জন্য মাসপ্রতি শ’দুয়েক করে টাকা জমানোও দরকার। ছোট বাচ্চা দুইটারে শাহ আলী মার্কেট থেকে দুইটা ভালো হাফ প্যান্ট কিনে দিতে হবে। ওদের ন্যাংটা থাকার দিন বোধ হয় ফুরালো। ... এসব ভাবতে ভাবতে মুখটা শুকিয়ে যায়। বেতন বাড়লে হাকিমপুরী জর্দাটা মনে হয় সব সময় কেনা যাবে।


পাড়ার মোড়ের দোকানে পান কিনতে গিয়ে রইসুদ্দি-র কথা শুনে ফালানির মা চমকে যায়।
- হ চাচী, খবর পাইছি আমরা। আর কি কও? তোমাগো অহন সুদিন। সরকার তো বেতন বাড়াই দিলো।
- কী কস রইসু? এখনো বাড়ায় নাই। ঐসব খবর বাতাসের কানাকানি।
- না চাচী, ডরাইও না। মিষ্টি খাইবার চামু না। তয় - এইবার কইলাম আর বাকী দিবার পারুম না।
পান মুখে দিয়ে আঙুলের আগায় লাগানো চুনটা দাঁতে লাগিয়ে যখন ঘরে ফিরছিল তখন দেখা বাড়িঅলা আকবর মহাজনের সাথে। ফালানির মাকে দেখে এগিয়ে আসে।
- দেখা হয়ে ভালোই হইলো, শুনো - তিন বছর ভাড়া বাড়াই নাই। শুনলাম তোমাগো বেতন বাড়ছে, সামনের মাস থেইক্যা তিনশ টাকা বাড়াই দিবা।
- ম’জন, বেতন তো এখনো বাড়ে নাই। খালি পেপারে কি জানি লিখছে...
- আরে পেপার না, আইজকা টেলিভিশনেও খবরে শুনলাম। ...যাউক, আর কথা বাড়াইও না। আগামী মাস-থন তিনশ টাকা বেশি দিবা...।


পরদিন সকালে বড় স্যারদের সাথে গার্মেন্টসের জমিদার স্যাররা আসে। কাজ থামিয়ে সবাইকে জমায়েত করে। এক স্যার পাঞ্জাবীর হাতাটা গুটিয়ে জুলফিকারের মাথায় হাত রাখে
- আমরা হইলাম ছোট ফ্যাক্টরীর মানুষ। তোমরা জানো আমরা সাব-কনট্রাক্টে কাজ করি। কারেন্ট না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রডাকশন বন্ধ থাকে। হরতালের কারণে অর্ডার ক্যানসেল হইলে লাখ লাখ টাকা লস যায়। ...আমি তোমাদের সব সময় আমার ঘরের মানুষের মতো করে দেখেছি। সুখে দুঃখে তোমরা আমাদের সাথে ছিলা, আমিও ছিলাম। আগামীতেও থাকার চেষ্টা করবো। ক’দিন আগে বেতন বাড়ানোর একটা গুজব বাইর হইছে। আমার বিশ্বাস - তোমরা কেউ ঐসবে কান দিবা না। আমি কথা দিলাম - এখন থেকে প্রতি মাসে টাইমলি বেতন পাইবা সবাই। আর ঈদের বোনাসও কইলাম, খোদার কসম, ঈদের এক সপ্তাহ আগে দিয়া দিমু। এখন সবাই কাজে যাও। ...সব কাজকর্ম ঠিক মতো চলবো।


দ্রুত গতিতে বোতাম সেলাই করতে গিয়ে বারবার মন ছুটে যায় ফালানির মার। এই নিয়ে তিনবার আঙুলে সুঁচ লাগলো। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠে - দেইখো, দেইখো - আল্লার গজব পড়বো...।


১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৬

Read more...

12 September, 2006

এই মানুষ, সেই মানুষ

নয় বছরের বিদেশ পর্ব শেষে খন্দকার আনিসুল ইসলাম আনিস যখন ঢাকা বিমান বন্দরে নামে তখন বিকাল প্রায় শেষ শেষ। আকাশে সূর্যের দেখা নেই। কালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে ঢাকার আকাশে। সেদিন শ্রাবণ মাসের আঠারো তারিখ। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মরূজীবনের শুষ্কতা ছাড়িয়ে আনিস একটু একটু করে কিশোর দিনের ঘ্রাণ নিচ্ছিল নাকে-মুখে-বুকে।

বিমান বন্দরে বড় ভাই, বড় ভাইয়ের ছোট শালা আর শালার বন্ধুরা সবাই স্বাগত জানায় খন্দকার আনিসুল ইসলাম আনিসকে। বড় বড় লাগেজ-ব্যাগ নিয়ে মাইক্রোবাস যখন ঢাকা ছেড়ে মফস্বলের দিকে চলে তখন আনিসের হাল্কা ঘুম পায়। বড় ভাইয়ের নানান প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আনিস আধো ঘুমে আধো জাগরণে গড়িয়ে পড়ে। নয় বছর, আহ! নয় বছর যেন ধুম করে চলে গেল আনিসের জীবন থেকে। আনিস তখন মায়ের কথা ভাবে। কেমন আছে মা, দেখতে কেমন হয়েছে! মায়ের শেষ চিঠিটা আনিস কতবার পড়েছে হিসেব নেই। চিঠির প্রতিটি শব্দ-প্রতিটি লাইন মুখস্ত হয়ে গেছে –

বাবা আনিস,
আমার অন্তরের অন্ত:স্থল হইতে দোয়া ও ভালবাসা নিও। অদ্য নয় সন হইতে চলিল তুমি বিদেশ যাপন করিতেছ। আশা করিতেছি খোদার ফজলে কুশলে আছ। তোমার পাঠানো টাকা, চিঠি, তেল-সাবান, জায়নামাজ-তজবী, টেপ রেকর্ডার পাইতেছি নিয়মিত। তোমার পাঠানো টাকায় আল্লার রহমতে তোমার দুই বোনের বিবাহ দিয়াছি। তাহারা সুখে সংসার করিতেছে। বড় মিয়াদের সহিত আমারও দিনকাল ভালো কাটিতেছে। তবুও বুকটা জ্বলিয়া পুড়িয়া যায়। তোমাকে বিবাহ করাইয়া- এই সংসার গুছাইয়া দিয়া পরকালে যাইবার বন্দোবস্ত করিতে চাই। মুন্সী বাড়ির মেজ ছেলে হায়দার দুই বছর অন্তর: বাড়ী আসে। তাহার মুখে শুনিলাম - তুমি এই বছর বাড়ী আসিতে পার। ইহা শুনিয়া আমার আর আনন্দের সীমা নাই। বড় ভাইজানও তাড়া দিতেছেন। সিলভিয়া এইবার ডিগ্রি পরীক্ষা দিবে। ভাইজানরা আর অপেক্ষা করিতে রাজী না। অতি শীঘ্রই বাড়ী আস। তোমার পথ চাহিয়া রইলাম।
ইতি - তোমার দুঃখীনি মা, আয়েশা খাতুন।


আনিস মনে মনে ভাবে - মাকে আর দুঃখ দিবে না। বড় মামার মেয়ে সিলভিয়া বেগমকে বিয়ে করে সংসারী হবে। নয় বছরে সিলভিয়াও নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে। আনিসের বুকটা এবার ধুকধুক করে। মনের ভেতর - মাথার ভেতর একটা নাম কেবল ঘুরপাক খায় - সিলভিয়া সিলভিয়া সিলভিয়া। মাইক্রো বাসের ক্যাসেট প্লেয়ারে হিন্দি গান বাজছে - হাম তুমারি হ্যায় তুমারি সনম হ্যয়...ম্যায়নে তুমসে প্যায়ার হে...। গানের কথাগুলো মুছে গিয়ে সুরের সাথে সিলভিয়া নামটি মিলে যায় আর বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়ায়।গাড়ী ছুটছে খাল-বিল পেরিয়ে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। মানুষ হাট থেকে ঘরে ফিরছে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোয় মিটিমিটি সাঁঝবাতি জ্বলছে।

দুই.
মাঝরাতে বাড়ী ফিরে পাড়া প্রতিবেশীর সাক্ষাত, সালাম আদাব শেষে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে যায়। তবুও সকালে আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে আনিস অভ্যাস মতো মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। জামায়াতে নামাজ শেষে গ্রামের মুরুবি্বদের সাথে দেখা হয় - মোলাকাত হয়। এত বড় গ্রামে ফজরের নামাজে মাত্র পনের-বিশজন মুসল্লি দেখে আনিস অবাক হয়। মুসল্লিদের সবাই প্রায় বৃদ্ধ। কিশোর-যুবক কিংবা আনিসের বয়সী কেউ নেই। অথচ সৌদি আরবে জোয়ান মানুষদের ধাক্কায় বৃদ্ধরা সামনে জায়গাই পেতো না। এরকম আরো নানান ভাবনা বুকে নিয়ে আনিস হেঁটে চলে রাণীরদিঘির বাম পাশ দিয়ে। সকালের শীতল বাতাস তার লম্বা পাঞ্জাবী-মাথার পাগড়ি উড়িয়ে নিতে চায়। পঞ্চশীলা গ্রামে চলতে চলতে আরো অনেকের সাথে দেখা হয় - আলাপ হয়।পরের দিনগুলোয় তেরো-চৌদ্দ পদের মাছ-তরকারী, পিঠা পায়েশ খেয়ে আনিস হাঁফিয়ে উঠে। বড় খালা-মেজ খালা-ছোট খালা-বড় মামা-ছোট মামা-দুই বোনের শ্বশুরবাড়ি-বড় ভাবীর বাবার বাড়ী - সব জায়গায় ঘুরে, দাওয়াত খেয়ে - উপহার দিয়ে পনের বিশ দিন কেটে যায়। কেবল সিলভিয়া বেগমের দেখা মিলে না। স্বভাবসুলভ লজ্জায় আনিসও ঐ বাড়ীর দিকে পা বাড়ায় না।

শ্রাবণ মাস শেষ হলেও বৃষ্টি থামেনি। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা ঝমঝম বৃষ্টি। ঘরে শুয়ে গান শোনা আর ঘুমানো ছাড়া কিছু করার নেই। একদিন টিনের চালে ঝমঝম শব্দের মাঝে হঠাৎ দরজার পর্দার আড়ালেও যেন রিমঝিম শব্দ হয়।-আছেন কেমন, কি করেন?এ শব্দ যেন পুরো বৃষ্টির শব্দকে ম্লান করে দেয়। ঘরে যেন আরো অনেকগুলো চুড়ি ভেঙে ভেঙে যায়। রিমঝিম - রুমঝুম - রিনিঝিনি। এরকম আরো অনেক শব্দ। খাট থেকে নেমে দাড়িয়ে আনিস কি বলবে ভেবে পায় না।
"আনিস, তোমার ঘরে সিলভিয়া গেল" - পাশের রুম থেকে বড় ভাবীর আওয়াজ।কলাপাতা রঙের সালোয়ার কামিজে হাল্কা লিকলিকে শরীর। বেনী করা চুল। কপালে সবুজ টিপ। লিপিস্টিক নেই। সিলভিয়া! সৌদি জীবনের প্রথম দিকে কোম্পানীর মালিকের বোন সেহারিনাকে দেখে মনে হয়েছিল - এই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। অথচ আজ এই মুহূর্তে আনিসের মনে হয় - সিলভিয়ার কাছে ঐ সেহারিনা কিচ্ছু না। তবে সিলভিয়া মাথায় ঘোমটা দিলে আরো ভালো লাগতো।- কথার জবাব দেন না কেন? বিদেশে থাইকা কি ভদ্রতাও ভুইলা গেছেন?
সিলভিয়ার কাটাকাটা কথায় আনিস থতমত খায় - ভাল আছি, আমি ভাল আছি। তুমি কেমন আছ?- ভাল না থাকলে এই ঝড় বাদলার মধ্যে এইখানে ক্যামনে আসলাম?
আনিস আবারো ধাক্কা খায়। সিলভিয়ার চাতুর্য্যে কিছুটা মুগ্ধও হয়।- শুনেন, দিন নাই-রাত নাই, সব সময় এই লম্বা জোব্বা পরে থাকেন কেন?
- অসুবিধা কি? আনিস সাহস করে প্রশ্ন করে।
-অসুবিধা আছে। আমার ভালো লাগে না। আরবের জামা আরবে পরবেন, বাংলাদেশে না। বুঝতে পারছেন?
সিলভিয়া আর কথা বাড়ায় না। গটাগট চলে যায়। আনিসের মনটা কেমন উড়ুউড়ু হয়ে উঠে। লম্বা জোব্বা পরার ব্যাপারটা সিলভিয়া পছন্দ করছে না। সংসার শুরু করার আগে তার পছন্দ-অপছন্দ জানতে হবে। মেট্রিক ফেল হলেও -খুব বেশী উঁচু সমাজে না মিশলেও আনিস অন্তত: এতটুকু বুঝতে পারে - সংসার জীবনে পারষ্পরিক মিলমিশটা খুব দরকার।
তিন.
সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের সামান্য আলাপচারিতা আনিসের মনে সাহসের জোয়ার আনে। সিলভিয়াদের পুকুর ঘাটে "লাভ মী" কিংবা "আই অ্যাম ওকে, আর ইউ?" লেখা লাল-নীল গেঞ্জী পরে অপেক্ষা করে। চা-চানাচুরের পাশাপাশি সিলভিয়ার সাথে গল্প জমে। অথচ আনিস তার প্রিয় কথাগুলো বলতে পারে না, সিলভিয়ার কথাগুলোও জানা হয় না। আনিসের বাবা আর সিলভিয়ার মা বিয়ের আয়োজন শুরু করে। বৃষ্টির মওসুম শেষ হোক। পঁচিশে কার্তিক বিয়ে, পরদিন বৌ-ভাত।
পুকুর ঘাটের বিকেলগুলো যেন চোখের পলকে চলে যায়। আনিসের পরের সন্ধ্যাগুলোয় এক ধরনের একাকীত্ব পেয়ে বসে। এর চেয়েও বড় একটি ভাবনা আনিসকে বিষন্ন করে আজকাল। ইদানিং তার আছরের নামাজটা কাজা হয়ে যাচ্ছে। সিলভিয়া আনিসকে যেতে দেয় না, সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে বলে। আনিসের ভালো লাগে না। গত নয় বছর সৌদি আরবে সময়মতো নামাজ পড়ার যে অভ্যাস রপ্ত হয়েছে বাংলাদেশে এসে সিলভিয়ার জন্য তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আনিস ভেবে পায় না সিলভিয়া কেন নামাজ পড়ে না! মুসলমানের মেয়ে পরকালের চিন্তা ছাড়া কীভাবে চলে? গ্রামের মানুষগুলো থেকে কি আল্লাহ খোদা উঠে গেল? সিলভিয়াকে এত্তো করে বলার পরও মাথায় ঘোমটা দেয় না।
একদিন জোর করে বলায় সিলভিয়া ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল - আপনার হুজুর হুজুর ভাব নিয়া আপনি চলেন, আমি পারব না। হুজুরের সাথে হুজুরাইন সাজার ইচ্ছা আমার নাই।শুনে আনিসের খুব কষ্ট হয়, বলে - নামাজ পড়লে, ঘোমটা দিলে হুজুর হয়ে যায়? আল্লাহ খোদা না মাইনা তুমি ক্যামনে চলবা? তোমার মরণের ডর নাই?
এবার সিলভিয়া খিলখিল করে হাসে। হাসি আর থামতে চায় না। হাসির শব্দে বাতাস যেন উলটা দিকে বয়। পুকুরে ঢেউ উঠে। হাসি থামিয়ে সিলভিয়া বলে - আপনি দেখি মজিদের ছোট ভাই। হি:হি:হি: না, আপনি ছোট ভাই না... হি:হি: আপনি হি:হি: আপনি নিজেই মজিদ। হি:হি:হি:হি: - শুনেন মজিদ ভাই, আমার সাথে কথা বইলা আর কাম নাই। আজান দিছে, যান - মসজিদে গিয়া নামাজ পড়েন, আল্লাহ-বিল্লাহ করেন। বেগানা নারীর সাথে আড্ডা জমাইয়েন না। হি:হি:হি:হি:...আনিস কী বলবে ভেবে পায় না। মসজিদের দিকে হেঁটে চলে। পেছনের সিলভিয়া বেগমের খিলখিল হাসি। আনিস বুঝতে পারে - সিলভিয়া অনেক পড়ালেখা করা মেয়ে, অনেক কিছু জানে। কিন্তু এই মজিদ লোকটা কে? আনিস ছোটবেলার কথা ভাবে - গ্রামের মজিদ নামের কারো কথা মনে পড়ে না। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝেও মজিদ নামের কেউ নেই। মজিদ কি তবে সিনেমার কোন গুন্ডার নাম? নাকি সিলভিয়ার প্রেমিক! এ ভাবনার আনিস কোন দিশা খুঁজে পায় না।
অবশেষে রাতে সিলভিয়ার মোবাইলে ফোন করে- মজিদ লোকটা কে?আবার সিলভিয়ার হি:হি:হি:হি: হাসির শব্দ। কী করেন মজিদ ভাই? নামাজ শেষ হইছে? হি:হি: অজু করছিলেন নামাজের আগে? হি:হি:হি:

চার.
আনিসের স্কুল জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধু- বর্তমানে লোকাল কলেজের ইংরেজীর মাস্টার আব্দুল আহাদের কাছে মজিদের কথা বলার পর আনিস যা শোনে - তাতে তার রক্ত গরম হয়ে যায়, মাথায় খুন চাপে। খোদাভীতির কারণে আনিস নামাজ পড়ে। সিলভিয়াকেও তাই নামাজ পড়তে আর মাথায় ঘোমটা দিতে বলেছিল সে। কিন্তু আজ আহাদ লালসালু-র যে মজিদের কথা বললো - আনিস নিজেকে সেরকম ধর্মীয় লেবাশ সমৃদ্ধ নারী লোলুপ-লম্পট মনে করে না। আর আনিস দেখেছে - সৌদি আরবের পর্দানশীল মেয়েরা কত্তো সুখী। আল্লার রহমত তাদের নিত্যসংগী।
সিলভিয়া বেগমের এ অস্থির আচরণের সাথে আনিস নিজেকে মিলাতে পারে না। আনিস চেয়েছিল শান্ত-শিষ্ট-বাধ্যগত একটা বৌ। সংসারী একটা বৌ - যে বৌ ঘরে থাকবে, ভালো ভালো রান্না করবে, নিত্য নতুন সেলাই করবে, বাচ্চাকাচ্চা আর শ্বাশুড়ীর যত্ন নিবে। অথচ সিলভিয়া পুরোপুরি অন্যরকম। ডিগ্রি পাশের পর সে নাকি চাকরি করবে। গৃহস্ত বাড়ীর বৌ কেন চাকরি করবে - তার উত্তর আনিসের জানা নেই। আনিস উলটা পালটা অনেক কিছু ভাবে। সিলভিয়াকে ফোন করে না আর। সিলভিয়া ঘোষণা দেয় - সে আনিসকে বিয়ে করবে না। মেট্রিক ফেল - অশিক্ষিত - একগুঁয়ে - ব্যাকডেটেড আনিসের কোন যোগ্যতা নেই সিলভিয়াকে বিয়ে করার। আনিসও বেঁকে বসে। দুই পরিবারের মুরুবি্বরা এসব শুনে হাসে, বলে - পোলাপানের পাগলামি।

পাঁচ.
আশ্বিন মাস পেরিয়ে কার্তিকের শুরু। তখনো আনিস সিলভিয়ার মনোমালিণ্য কমেনি। দুই পরিবার বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। কার্ড ছাপিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দেয়া শুরু হয়েছে। আনিস মায়ের মুখে তাকিয়ে কিছু বলতে পারে না। ওদিকে ঘটনা ঘটায় সিলভিয়া। আনিসের সাথে জোর করে বিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে বিয়ের আগের মংগলবার বিষ খায় সে। হাসপাতালে নিয়ে অনেক কষ্টে বাঁচানো যায়। থানা পুলিশ নিয়ে সে এক ধুন্দমার কান্ড। সব আয়োজন ভেস্তে যায়। আনিস পরদিন ঢাকা রওনা দেয়। প্লেনের টিকিট রি-কনফার্ম করে। মা জিগ্গেস করে - আর কবে আসবি বাবা?

আনিস জবাব দিতে পারে না।প্লেন ছাড়ার পর মায়ের কথা খুব মনে পড়ে।প্লেনের ঝিঝি শব্দের মাঝে সিলভিয়ার চঞ্চল হাসিটা বারবার ফিরে আসে। আনিস চোখ মোছে।

Read more...

06 September, 2006

চোখ (অপকাব্য)

চোখের ভেতর বসত করে
লক্ষ হাজার রাগ
চোখের ভেতর সাত সমুদ্দর
চোখের নিচে দাগ।

চোখের নিচের কালিগুলো
অনেক আগের মরচে পড়া
কেউ বা ভাবেন শখের বশে
বেখেয়ালে সৃষ্টি করা।

অনেক কিছু দেখছি কিন্তু
চোখ দিয়ে চোখ যায় না দেখা
তাই বলে আর হচ্ছে নাকো
রূপ-চর্চার কাব্য শেখা।

কেউ কেউ হঠাৎ চমকে উঠে-
কালি কেন চোখের নিচে ?
সত্যি কথা শুনেও ভাবে
বলছি আমি নিছক মিছে!

ভাবছি এবার থাকবো জেগে
চোখ দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে
কালো চোখের স্বপ্নগুলো
ধরতে হবে হাত বাড়িয়ে।

Read more...

03 September, 2006

নাদিয়ার গান

সময়টা 1940 এর মাঝামাঝি। মিশরে তখন বৃটিশ লোকজন চুটিয়ে ব্যবসা করে নিচ্ছে। এরকমই একজন কটন ব্যবসায়ী হেনরী অস্টেন; স্ত্রী ক্যাথেরিন ও একমাত্র কিশোর সন্তান চার্লসকে নিয়ে আলেকজান্ডৃয়ায় রাজত্ব করে চলেছে। প্রভাব প্রতিপত্তি, বিশাল বাগান - ব্যবসা, রাজকীয় বাড়ী, চাকর-বাকরের কমতি নেই।কিশোর চার্লস ছোটবেলার খেলার সাথী কারিমা-র প্রেমে পড়ে যায়। অথচ সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারটি তারা দু'জনই বুঝতে পারে । হেনরির অফিসের গাড়ীর ড্রাইভার কারিমার বাবা মোস্তফা। কারিমাও চার্লসদের বাসায় ফুট-ফরমায়েশ খাটা মেয়ে, সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে যার অবস্থান। এরপরও পারষ্পরিক ভালো লাগা বেড়ে চলে।বছর খানেকের মধ্যে দ্্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামাদোল লেগে যায়। বাবা-মা'র ইচ্ছায় চার্লস অ্যামেরিকা চলে যায় পড়ালেখা করতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষাশেষি চার্লস ফিরে আসে মিশরে। কৈশোর উত্তীর্ণ যৌবনে চার্লস ও কারিমা পরষ্পরকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে। লোকচক্ষুর আড়ালে অবিরাম নিশি প্রণয় শেষে চার্লস তার বাবা-মা'র কাছে কারিমার কথা বলে। জগতের স্বাভাবিক নিয়মে হেনরী সন্তানের ইচ্ছার বিরূদ্ধে দাড়ায়। অস্থির আসহায় চার্লস মাতাল অবস্থায় গাড়ী চালাতে গিয়ে কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। শোক কাটিয়ে কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কারিমা নিজের ভেতর অনুভব করে আরেকজনের অস্তিত্ব, চার্লসের স্মৃতি, অনাগত প্রজন্ম!পারিবারিক নির্যাতন পেরিয়ে সামাজিক অবহেলার আগেই এগিয়ে আসে কারিমার ভাই ওমরের বন্ধু মুনির আহমেদ। স্ত্রী-কণ্যা হারানো নি:সঙ্গ মুনির সব জেনে শুনে কারিমাকে বিয়ে করে। কিছুমাস পর জন্ম নেয়া নাদিয়া-কে নিজের সন্তান বলে মেনে নেয়। অসাধারণ মানুষ মুনিরের সংসারে কারিমা সুখে থাকে - নাদিয়ার মাঝে চার্লসের ছোঁয়া খুঁজে পায়। হঠাৎ একদিন মুনিরের বন্ধু, মিউজিক ব্যবসার সাথে জড়িত, স্পিরস কারিমার টুকটাক গান গাওয়ার ব্যাপারটি জেনে যায়। তারপর ঘটনাক্রমে কারিমা হয়ে উঠে মিশরের আলোচিত সঙ্গীত শিল্পী, নাইটিংগেল, কারাওয়ান। মিশরের এক নম্বর শিল্পী উম্মে-কাথলুম- এর পর কারিমা মানুষের মন জয় করে নেয়। একটানা কনসাটে কনসার্টে কারিমার তখন জয় জয়কার অবস্থা।1952 সালের 26 জানুয়ারীর ঐতিহাসিক "ব্ল্যাক স্যাটার ডে" হামলায় কনসার্ট চলাকালীন সময়ে মানুষের হুড়োহুড়িতে নাদিয়া হারিয়ে যায়। নাদিয়াকে খুঁজে পায় সন্তানহীন দম্পতি মিশরীয় তারিক মিস্ত্রী ও ফরাসী সিলন। তারপর নাদিয়া বড় হতে থাকে ফ্রান্সে, অন্য পরিবেশে, অন্য নামে; গ্যাবি মিস্ত্রী।ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে যায় নিয়ম মতো। সন্তান হারিয়ে কারিমা-মুনিরের বিষন্ন জীবন এগিয়ে চলে। মৃত্যূর আগে মুনিরের শেষ ইচ্ছা মতো কারিমা গান গেয়ে যায়। পুরা আরব দুনিয়ার আলোচিত শিল্পী হয়ে উঠে। গানে গানে প্রকাশ পায় বুকের ভেতর জমে থাকা নাদিয়ার জন্য হাহাকার - "কোথায় গেলি খুকু তুই?তোকে ছাড়া ভীষণ একাকী আমি - চোখ বুঁজলেই তোকে দেখি,কোন গোলাপ সুরভী দেবে না - কোন বাতি আলো দেবে না আমার ঘরেযতদিন তুই দূরে দূরে..."আরো কিছু বছর পর সিলনের মৃত্যূর পর নাটকীয় ভাবে তারিক আবিষ্কার করে গ্যাবির (নাদিয়া) আসল পরিচয়। গ্যাবি ততদিনে নামকরা সাংবাদিক। অবশেষে মায়ের কোলে মেয়ে ফিরে আসে। কাহিনী আরো কিছুটা আগায়। কারিমার অস্বাভাবিক মৃত্যূ, নাদিয়া কিডন্যাপ হওয়া-সহ পর্যায়ক্রমে ধরা পড়ে কারিমার ভাই ওমর। পাপের পতন পূণ্যের জয় হয়। "নাদিয়া'স সং" মিশরীয় লেখিকা সোহেইর খাসোগ্যি-র তৃতীয় উপন্যাস, প্রকাশিত হয়েছিল 1999 সালে। 1995 সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস "মিরাজ" বাজারমাত করেছিল বেস্ট সেলার হয়ে। মাঝে প্রকাশিত হয় 2য় উপন্যাস "মোসাইক"।নাদিয়া'স স ং -এর কাহিনী শুরু হয় 1940 সালে। তারপর নানা ঘটনা প্রবাহ এগিয়ে গেছে ইতিহাসের সাথে সমান তালে। মিশরের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘনঘটার ছোঁয়া লেগেছে কাহিনীর পরতে পরতে। 1990 সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের শেষে এসে নাদিয়া'স সং শেষ হয়েছে। নাগিব, নাসের, সাদাতসহ বিভিন্ন নেতারা ঘুরে ফিরে কাহিনীতে বিচরণ করেছে নানান প্রেক্ষিতে। কারিমার ভাই ওমরের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি, মুসলিম ব্রাদারহুডের নিষিদ্ধ কর্মকান্ড, কুসংস্কার, মিশরীয় নারী জাগরণের পথিকৃৎ হুদা - আল- শারাবি, সুয়েজ খালের রাজনীতিসহ নাদিয়ার সাংবাদিক জীবনের বিভিন্নদিক উপন্যাসে স্থান পেয়েছে।লেখকরা সাধারণত: ইতিহাসের বৃত্তের বাইরে থেকে সময়কে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সোহেইর ইতিহাসকে বাদ দিতে চাননি। ইতিহাস বাহুল্যে প্রায় সাড়ে চারশ' পৃষ্ঠার এ উপন্যাস মাঝে মাঝে জোর করে পড়ে যেতে হয়েছে শেষ পরিণতি জানার জন্য। তবুও 1940 থেকে 1990 - এই 50 বছরের মিশরীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার এক অনবদ্য আখ্যান - "নাদিয়া'স সং"।

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP