29 November, 2006

সুঁচ ফুটানো অসুখ

একটু একটু করে খবরটা ছড়ালো।
প্রথমে একজন দুইজন জানলো - তারপর আশেপাশের কয়েক গ্রাম।
খবরের চমকে যতটা না শংকা ছিল তারচেয়ে বেশী ছিল গোপনীয়তার চেষ্টা।
কেউ কেউ না বুঝে এড়িয়ে গেলেও মোটামুটি সবাই জানলো মুন্সী বাড়ীর বড় ছেলে মাসুদ মুন্সীর খারাপ অসুখ হয়েছে। এই খারাপ অসুখটা ঐ তল্লাটের কারো কোন দিন হয়নি। একবার যখন হলো - তখন ভয়টা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না, তাই আগেরদিনের মুরুব্বিদের কথামতো অসুখটার নাম মুখে নেয়া থেকেও বিরত থাকলো কেউ কেউ। তবে সবাই দুঃখ পেলো এমন পরিণতিতে - "আহারে - কী জোয়ান সামর্থ্য পোলা, জাহাজে চাকরী করতো, দেশ বিদেশ ঘুরে ঘুরে বছর ফিরলে বাড়ী আসতো, আদব লেহাজেরও কমতি ছিল না। আহারে, খোদা কার মউত ক্যামনে রাখছে..."

মাসুদের বাবা মকসুদ মুন্সী একদম চুপ মেরে আছে। খোদার কাছে সন্তানের জীবন ভিক্ষা চাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। মাসুদের মা মাঝে মাঝে হাউমাউ করে উঠে। খোদার দরবারে দুহাত তুলে অভিশাপ দেয় অই সর্বনাশকারীকে যে নিউমার্কেটে ভীড়ের মধ্যে মাসুদের জীবনটা শেষ করে দিলো। নামাজ শেষ করে মাসুদের খাটে বসে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফুঁ দিয়ে দেয় মা। মাথায় হাত বুলায়, ছেলের হাড়-জিরজিরে শরীর স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আবার চিতকার করে অভিশাপ দেয়।
...আর মাসুদ চোখ বুঁজে ভাবে অন্যকিছু। দেশান্তরী হয়ে দেশ বিদেশে তরী ভিড়িয়ে খেয়ালে বেখেয়ালে জীবনের অন্য পিঠের শখ গুলো উলটে পালটে নেয়া...। তারপর একদিন কোম্পানীর অ্যানুয়াল হেলথ চেক আপে এইচআইভি পজিটিভ রিপোর্ট পেয়ে টার্মিনেশন লেটার নিয়ে দেশে ফেরা। ইচ্ছে ছিল দেশে ফিরে কাউকে কিছু বলবে না। নীরবে চলে যাবে ওপারে। কিন্তু একদিন ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়া গুজবটিকে পুঁজি করে গ্রামে ফিরে মাসুদ -

"নিউ মার্কেট গেছিলাম - মা’র জন্য শাড়ী আর বাবার জন্য পাঞ্জাবী কিনতে। ঈদের বাজার। মানুষের ভীড়ে হাঁটা মুশকিল। হঠাত মনে হইলো কে যেন পেছন থেকে আমার পিঠে সুঁচ ফুটায়ে দিলো। আশে পাশে আরো কয়েকজন চিককর দিলো, ওরাও গুতা খাইছে। তারপর শুনলাম একটা দল বাইর হইছে - অরা এইডসের রোগী। রোগটা আরো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এই বদ মতলব...।"
এতটুকু বলেই মাসুদের চোখ দুটো ভিজে উঠে।
মনে মনে পরম করূণাময়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় - ইয়া মাবুদ, তুমি দয়ার সাগর, আমারে তুমি মাফ করে দিও।
মাসুদের মা আবার আহাজারি করে উঠে। দোজখের আগুনে জ্বলার অভিশাপ দিয়ে যায়...।

মাসুদের বলা ঘটনাই এলাকার সহজ-সরল মানুষগুলোর মুখে মুখে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহআলম চৌধুরী তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলের কাছে চিঠি লিখে -
"খবর পাইলাম - ঢাকা শহরে সুঁচের মাধ্যমে খারাপ খারাপ সব অসুখ ছড়ানো হইতেছে। আমাদের এলাকার মকসুদ মুন্সীর বড় ছেলে মাসুদ এখন মৃত্যু শয্যায়। তুমি সাবধানে থাকিও। বিনা প্রয়োজনে বাইরে ঘুরাঘুরি করিও না। এই মুসিবত থেকে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুক..."

২৯ নভেম্বর, ২০০৬

Read more...

22 November, 2006

ছুটির পাখির ডাক

এক সময়ের আলোচিত সিনেমা ’ছুটির ঘন্টা’ দেখে অনেকেই মন খারাপ করেছেন, চোখ ভিজিয়েছেন। শিশুদের জন্য তৈরী এ ছবির একটি গান শিশুতোষ আনন্দের প্রকাশ হিসেবে কালজয়ী হয়ে আছে। ঢাকা শিশুপার্কের রাইডগুলোয় কিংবা বিটিভি-তে শিশুদের অনুষ্ঠানে এখনো জনপ্রিয় গান - “একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো, নীল আকাশে সবুজ ঘাসে, খুশিতে হারাবো“।

ছুটির আনন্দের কথা এসেছে নানানভাবে; ছড়ায়, কবিতায়, গল্পে আর গানে। ’মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি, আজ আমাদের ছুটিরে ভাই আজ আমাদের ছুটি’ কিংবা ’ছুটির দিনে মামার বাড়ী আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে রঙীণ করি মুখ’ - আহারে ছুটি, আহারে মামা বাড়ী! বিদেশের বাচ্চাদের বোধ হয় মামা বাড়ী নেই। তাই তারা ’ছুটির অবসরে’ রেস্টুরেন্টে কাজ করে। কবি জসীম উদদীনের লেখা গল্পটি ছিল আমাদের ক্লাস থ্রি-এর বাংলা বইয়ে। এর কিছুদিন পর ’বড়বোনের বিবাহ উপলক্ষ্যে তিনদিনের ছুটি চাহিয়া প্রধান শিক্ষকের নিকট দরখাস্ত’ লেখা শিখতে হয়েছে। বাংলাটা না হয় সহজ ছিল। কিন্তু আরেকটু বড় হয়ে যখন ’লীভ অব অ্যাবসেন্স’ শিখতে হলো তখন ’আই বেগ মোস্ট রেসপেক্টফুলি টু স্টেট দ্যাট’ শিখতেই দিন পার। পরদিন ইংরেজী ক্লাসে কশ্যাত কশ্যাত বেতের বাড়ি। এরপরও ছুটির মোহ কাটেনি। অদ্ভুত লাগতো যখন বাংলা দি্বতীয় পত্রে বন্ধুর কাছে পত্র লেখা - ’এবারের বার্ষিক পরীক্ষার পর ছুটির দিন গুলোয় আমি আমাদের এলাকার কিছু দরিদ্র ছেলেকে বিনা পয়সায় পড়াবো’ টাইপ ডাহা মিথ্যা কথা শিখতে হতো। অবশ্য ওটা কতোক্ষণই বা আর মনে থাকতো! ’এতদ্বারা সকলের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে - ... উপলক্ষ্যে আগামী ... তারিখ হইতে ... তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয় বন্ধ থাকিবে’ - শোনার পর সবাই ক্লাস থেকে ছুউউটিইই বলে দৌড়, কার আগে কে স্কুলের মাঠ পার হতে পারে...!

ছুটিগুলো মাঝে মাঝে অন্যরকম হয়ে উঠে। ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পৃথিবী থেকে অভিমানী কবি তার কবিতাকে ছুটি দিয়ে দেয়। অথবা কবি নিজেই ছুটি নেয়। কেউ ছুটি নিয়ে নেয় বড্ড অসময়ে, অনেকের অজান্তে। অফিসের ব্যস্ত মানুষটি যখন এলপিআর-এ যান, তখন তার অস্থির সময়ের শঙ্কা। অফিস ছুটির পাশাপাশি জীবন ছুটির সময়ও বুঝি ঘনিয়ে এলো...।


দামী একটি ছুটিঃ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম.এ.আজিজ অবশেষে ছুটি নিতে রাজী হয়েছেন। বাজারে মিথ্যা গুজব আছে - ছাত্রজীবনে তিঁনি খুব অধ্যবসায়ী ছিলেন। ছাত্রনং অধ্যয়ন তপঃ-তে বিশ্বাসী হয়ে তিঁনি ছুটির দিন গুলোতেও নাকি স্কুলের বারান্দায় ঘুরঘুর করতেন। লাইব্রেরী খোলা থাকলে ওখানে গিয়ে পড়তেন। ছুটির ব্যাপারটি তাঁর একদম পছন্দ হতো না। ভীষণ প্রজ্ঞাবান এই “ভদ্রলোকের এক কথা“ - “সীতা ধ্যান, সীতা জ্ঞান, সীতা চিন্তামণি, সীতা ছাড়া আমি যেন মণিহারা ফণী। আমার চিন্তা শুধু ইলেকশন, ইলেকশন আর ইলেকশন।“ ক’মাস পরেই ইলেকশন। এ সময় ছুটি নেয়া যায়! নেয়া কি উচিত? কিন্তু সিইসি আজিজকে অবশেষে তিনমাসের জন্য ছুটি নিতে হচ্ছে। খবরে প্রকাশ - ছুটিটা একটু ’কস্টলি’ হয়ে গেছে; মাত্র ৬৭টি জীবন ও সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা...

Read more...

19 November, 2006

বিষণ্নতার শহরের কথা

“নাগরিক জীবন প্রতিবন্ধীত্বের জীবন। মানুষ তার শেঁকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিণত হয় বনসাই মানুষে। তাই শহর এত বিষণ্ন। “বিষণ্নতার শহর“-এ সেইসব মানুষের জীবনের টানাপোড়েন চিত্রিত হয়েছে নতুন এক ধারায়। বিনয় ঘোষের মেট্রোপলিটন মনকে আরো গভীরে গিয়ে চর্চা করেছেন লেখক। নাগরিক বিচ্ছিন্নতাকে দেখতে চেয়েছেন নিজের জীবনের ব্যাখার মাঝ দিয়ে। আমরা সবাই আছি বিষণ্নতার শহরে। কিন্তু সেই আমি বড় নি:সঙ্গ। নি:সঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে নিজেকে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। সত্যের মুখোমুখি হতে গিয়ে নিজেকে উপায়হীন মনে হয়। ক্ষয়ে যাওয়া গ্রামীণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আক্রান্ত করে আধুনিক শহরকে। শহরের খেলনা মানুষদের ভিড়ে এখনো যারা নিজেকে আলাদা করে রাখতে চান, তাদের জন্য অন্যধারার এ গ্রন্থটি আশা জাগানিয়া হয়ে উঠার সম্ভবনা ধারণ করে।“

বইয়ের ফ্লাপে এভাবেই বর্ণনা পেয়েছে মাসকাওয়াথ আহসানের দি্বতীয় প্রকাশিত বই “বিষণ্নতার শহর“; নাগরিক জীবনের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে আরেকটি দূর্দান্ত সৃষ্টি। গ্লোবালাইজেশন প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির সবুজ ঘাসফুল মাড়িয়ে হাইওয়ে হলো, মাটি পুড়িয়ে ইট হলো, এলোমেলো বিক্ষিপ্ত শহর হলো - কিন্তুতৈরি হলো কিছু শুন্যতা, না পাওয়ার বেদনা। শহরের একদল মানুষ যখন অ্যাফ্লুয়েন্ট কনজ্যুমারিস্ট সোসাইটির গোলাপী মাছির পেছনে হনহন করে ছুটছে, আরেকদল মানুষ তখন অতীতচারী হয়ে কেবলই সোনালী কিছু স্বপ্নকে লালন করে চলছে। শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি আর প্রতিদিনকার সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা যখন স্ট্যাটাস সিম্বল সর্বস্ব হয়ে উঠে, আসল চেহারা লুকিয়ে ছদ্মবেশী মানুষ যখন শহরে রাজত্ব করে যায়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের শৈথিল্য যখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে প্রকট করে তুলে - তখন নিয়ন আলোর ঝলমলে শহরের শিরা-উপশিরায় কিছু ’মানুষ’ নিজেদের একাকীত্বকে বিষণ্নতার মোড়কে ঢাকার চেষ্টা করে। এলিয়েনেশনের শিকার সেই সব মানুষদের কথা ’বিষণ্নতার শহর’-এ এক ব্যতিক্রমী অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তুলে ধরেছেন লেখক মাসকাওয়াথ আহসান । একই সাথে আধুনিকতার মুখোশ পরা ফাঁপা শুন্য মানুষদের হাস্যকর সব আচরণকে লেখনীর সুঁচ দিয়ে ক্ষত-বিক্ষতও করেছেন । চব্বিশটি অণূগল্পের পাশাপাশি প্রথম ৩৪ পৃষ্ঠার ’প্রারম্ভ’ পড়ে বারবার চমকে উঠবেন আপনি। মনে হবে এ যেন আপনারই কথা, আপনার আশেপাশের মানুষদেরই কথা। ...খোঁচাগুলো নিজের গায়ে লাগলে মাঝে মাঝে মনে হবে - বড় নিষ্ঠুর, বড় নির্দয় এ লেখনী! আসলে মাসকাওয়াথ আহসানের লেখার স্টাইলটাই এমন। নির্মোহ-নির্লোভ জীবনাকাঙ্খার ছবি আঁকার পাশাপাশি অনায়াসে তুলে ধরেন স্থুল জীবনাচরণের ভুল প্রয়াসগুলো; যেখানে আমরা খুঁজে পাই আমাদেরই অন্য সত্ত্বাকে। চোখের সামনে তখন খুলে যায় ভাবনার এক নতুন দুয়ার! আপাতঃ হতাশার ছায়া থাকলেও বইটি পড়ে আপনার মনে হবে - ’জীবনের পুরোটাই নৈরাশ্যের নয়’, আশাবাদী হওয়ার অনেকগুলো সূত্রও হয়তো আপনি পেয়ে যাবেন...।

সংগ্রহে রাখার মতো অসাধারণ বইটি পাবেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে, জনান্তিক-এর প্রকাশনায়।

Read more...

07 November, 2006

দূর্নীতি ও কানা বগীর ছা

এখনো বেশ মনে পড়ে। বাংলা বইয়ের বাম পাশের কোন এক পৃষ্ঠায় ছিল কবিতাটি। কবিতা নাকি ছড়া? জানি না। ভাবিনি কখনো। কী দরকার কবিতা নাকি ছড়া তা ভেবে সময় কাটানোর! ভীষণ আনন্দে শব্দ করে পড়ার পাশাপাশি বিষ্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম ছবিটির দিকে। কী চমতকার ছবি। বিশাল লম্বা একটি তালগাছ। পেছনে গ্রাম। ঘরবাড়ী। তালগাছের নিচে এক পায়ে একটি সাদা বক দাড়ানো। বকটি উচ্চতায় তালগাছের প্রায় অর্ধেক! বক এতো বড় হয়? নাহ! এসব জটিল ভাবনা আসতো না মনে। ক্লাস ওয়ানে সবাই শব্দ করে পড়তাম-
"ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ঐ আমাদের গাঁ
ঐখানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা।
ও বগী তুই খাস কি?
পানতা ভাত চাস কি?
পানতা আমি খাই না
পুঁটি মাছ পাই না,
একটা যদি পাই, অমনি ধরে -
ঘাপুস ঘুপুস খাই।"
গত কয়েক দশক ধরে কবিতাটি ক্লাস ওয়ানে পাঠ্য। আমাদের সময়ের স্যারেরা খুব জটিল মনের ছিলেন না বোধ হয়। পরীক্ষায় সহজ প্রশ্ন করতেন - ’যে কোন কবিতার প্রথম চার লাইন লিখ’। মনে মনে আবৃতি করতে করতে পরীক্ষার খাতায় লিখে দিতাম গোটা গোটা অক্ষরে। বানান ভুল না হলে দশে দশ পাওয়া যেতো।
এখন সময়টা হয়তো খুব জটিল। বছর তিনেক আগে ঢাকার এক নামকরা স্কুলে ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল - "কানা বগীর ছা কোথায় বাস করে?"
আহারে! ক্লাস ওয়ানের দেবশিশুরা কী কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীনই না হয়েছিল! কেউ লিখলো - কানা বগীর ছা আমাদের গাঁয়ে বাস করে। কেউ লিখলো - তাল গাছের নিচে বাস করে। কেউ লিখলো - তাল গাছের উপরে বাস করে। কেউ বা বুদ্ধি খাটিয়ে লিখলো - কানা বগীর ছা আমাদের গাঁয়ের তাল গাছের নিচে বাস করে। ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রটি লিখেছিল - কানা বগীর ছা ঐখানেতে বাস করে।
জটিল সময়ের জটিল টিচারের জটিল প্রশ্নের জটিল উত্তর। অথবা স্মার্ট আনসার! পরীক্ষায় কোন উত্তরটিকে সঠিক ধরা হয়েছিল তা আর জানা হয়নি।


প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তর জানা নেইঃ
বলা নেই- কওয়া নেই, আমরা হঠাত করে প্রথম হয়ে গেলাম। পত্রিকাগুলো খুব ফলাও করে প্রকাশ করলো। তখন ছিল আমাদের ’জিম্মাদার’ পরিবর্তনের সিজন । বিরাট এক ইস্যু। ’তাঁদের’ চেয়ার পরিবর্তন হলো। হৈ চৈ হলো - শ্বেতপত্র বের হবে, এই হবে - ঐ হবে। ...বছর ঘুরলো। কিন্তু ’তাঁদের’ লুটপাটের খেলার শিরোপাটা আমাদেরই রইলো। একবার, দুইবার, তিনবার। হ্যাট্রিক হলো। রাজপথের ’সংগ্রামী’রা আওয়াজ দিলো - দূর্নীতিবাজ সরকারে পতন চাই। চেয়ারে বসা মুরুব্বিরা ধমক দিলেন। দেশ দে্রাহীতার মামলা হবে। হাইকোর্টও দেখানো হলো। তবুও থামাথামি নেই। পরপর পাঁচবার আমরা চ্যাম্পিয়ান। গতবার অবশ্য ’চান’ মিয়া আমাদের সাথে যৌথভাবে প্রথম হয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা থার্ড হয়ে গেলাম। ’হাতি’ ফার্স্ট হলো। কেউ কেউ বলছে - আমাদের পারফরম্যান্স খারাপ না, অন্য দেশগুলো আমাদের এ পদক ছিনিয়ে নেয়ার জন্য অনেক সাধনা করেছে, শ্রম দিয়েছে। ইরাকে রিলিফ নিয়ে ’মেজবান’ হয়েছে, সুদানে ডায়মন্ড পাচার হয়েছে। তাহলে আমাদের কী হবে? আমাদের কি বসে থাকা মানায়? ভাবনা নেই, আমাদের বসে থাকা লাগবে না...
"তুমি ভালোবাসো কি-না তা আমি জানি না, আমার কর্ম আমি করিয়া রে যাবো..." - থিয়রী ফলো করে আমাদের কালো গাউন পরা ’বিবেক’রা গতকাল একটি আদেশ কার্যকর করিয়েছেন। তিন মাস মেয়াদী এই রক্ষণাবেক্ষণকারীর আমলে দূর্নীতি দমন কমিশনে কোন তদন্ত হবে না, অনেক কর্মকর্তাকে সাময়িক বিরতি দেয়া হয়েছে। ভোটের পর ৫ বছরের জন্য দেশকে নতুনভাবে লীজ নেয়ার পর সব চালু হবে আবার। দূর্নীতি দমন কমিশন চালু হবে, ব্যবসা বাণিজ্যের কমিশনও চালু হবে। চ্যাম্পিয়ান না হলেও মেরিট লিস্টে থাকতে হবে সবসময়।
’ঐখানেতে’ বাস করা ’কানা বগীর ছা’-রা ঘাপুস ঘুপুস করে সব খেয়ে যাবে অবিরাম...। আর শিরোপাটা আমাদের হাতেই তুলে দিবেন ’তাঁরা’।

Read more...

04 November, 2006

পাকমন পেয়ার

রাসেদের আব্বি-আম্মি বছরের এসময় করাচী চলে যায়। নানুভাইয়া-মামারা সবাই ওখানে থাকে। বড়মামা লাহোর ইউনিভার্সিটির টিচার। ছোটমামা ইসলামাবাদে সিরামিকসের বিজনেস করে। ছোটমামীর মা নাকি বেনজীর ভূট্টোর খালাতো বোনের ভাসুরের মেয়ে। আব্বি-আম্মি পাকিস্তানে খুব ব্যস্ত সময় কাটায়। নানুভাইয়ার এন.জি.ও এখন মুজাফফারাবাদে কাজ করছে গত বছরের ভূমিকম্পের ভিকটিমদের নিয়ে। প্রজেক্টটিতে আব্বি-আম্মি বড়সড় ফান্ড দিয়েছে। এবার পিটিভি-র মীনাবাজার হ্যাভ অ্যা নাইস ডে লাইভে আব্বির একটি ইন্টারভিউ আছে। পাক-বাংলাদেশ রিলেশন নিয়ে ডিসকাশন। আম্মিরও রেকর্ডিং আছে পিটিভি ওয়ানের ’কারিনা ইন করাচী’ প্রোগ্রামে। শবনম মাজীদ আর শাহিদা মিনির একটা কালচারাল নাইটেও অ্যাটেন্ড করবেন তারা।


দুই.
আজকের গেট টুগেদারটা জমজমাট ছিল। রাসেদের বন্ধুরা এ-লেভেল দিয়েছে এবার। স্যাট-টোফেল কিংবা আইইএলটিএস এর প্রিপারেশান নিচ্ছে সবাই। এক ফাঁকে রাসেদের বাসায় এ আয়োজন। ফ্যান্টাস্টিক ফোর আর গ্যাংস্টার দেখে কুলসুন ম্যাকারনী খেতে খেতে অনেক গল্প হয়। তাহসান-হাবীব বিতর্কে লোমেলা চেঁচামেচি করে উঠে যায়। এরপর সামী ইউসুফের সুরে বাংলা গানে নতুন জোয়ার সৃষ্টির স্বপ্নে বিভোর শাকেরও চলে গেলে আড্ডাটা ঝিমিয়ে আসে। সন্ধ্যার পর কেবল সাফরীন আর জাবের থেকে যায়।


ভার্সিটি অ্যাডমিশনের অবসরে ওরা একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরি করছে। সাফরীন কাজ করছে উইমেন রাইটস অ্যান্ড লীডারশীপ সেকশনে। শরীয়া আইন যে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে, ধর্মীয় অনুশাসনে থেকেও আধুনিকতার সাথে তাল মিলানো যায়; এ ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করছে সাফরীন। প্রচুর পড়তে হচ্ছে, ওয়েবের জন্য লিখতেও হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে ব্যারন্স স্যাটের হাই ফ্রিকোয়েন্সী আর হট প্রসপেক্টিভ ওয়ার্ড লিস্টে চোখ বুলিয়ে নেয়। সাফরীনের আম্মু একটি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়।
জাবের কাজ করছে হিস্ট্রি সেকশনে। একাত্তরের গন্ডগোলের ঝাপসা কনসেপ্টগুলো জাবের নতুনভাবে জাস্টিফাই করছে। জাবেরের মামা এ বিষয়ে প্রচুর রেফারেন্স দিয়ে হেল্প করছেন। মামা একসময় হলিডে আর এভিডেন্সে লিখতেন, এখন নয়াদিগন্তে লিখেন রেগুলার। রাসেদের কাজটা একটু জটিল। ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি প্রায় চারশ মেম্বারের ইয়াহুগ্রুপটিও তাকে দেখাশুনা করতে হয়। মেম্বারদের বেশীরভাগই ও-লেভেল স্টুডেন্ট। প্রতি মাসে মেম্বার সংখ্যা বাড়ছে। সব ই-মেল মন দিয়ে পড়া, রেফারেন্স ঘেঁটে ঘেঁটে এনকোরারিগুলো রিপ্লাই দেয়া, গ্রুপ ডিবেট কো-অর্ডিনেট করা, উফ! অনেক ঝামেলা। বেশী কঠিন ইস্যু হলে করাচীতে বড় মামা কিংবা নানুভাইয়াকে মেইল করে জেনে নেয়া যায়। আব্বি-আম্মিও হেল্প করেন মাঝে মাঝে।



তিন.
রাসেদ-সাফরীন আর জাবেরের টীমওয়ার্ক খুব ভালো। কাজের প্রতি ভীষণ কমিটেড আর সিনসিয়ার। ওয়েবের ফোরাম সেকশনের পাশাপাশি ব্লগ অপশন রাখার প্লøান করছে রাসেদ। জাবের রিলেটেড সাইটগুলোর লিংক অ্যাড করবে, সাথে একটি ফান সেকশনও দেখবে সে। মুসলিমম্যানিয়াক থেকে ট্রান্সলেট করে কাজ চালাবে প্রথমে, পরে গ্রুপ মেম্বাররাই লিখবে। গ্রুপের বেশীরভাগ মেম্বারই ছেলে। সাফরীন নতুন অ্যাসাইনমেন্ট ঠিক করে - ক্লাস এইট নাইনের গার্লসদের ই-মেল অ্যাড্রেস কালেক্ট করতে হবে। ওদের প্রাইমারী কাউন্সেলিংয়ের কাজটা সাফরীন নিজেই করবে।
তারা যে গ্রুপকে টার্গেট করে এগুচ্ছে, ওরাই আগামীর লিডিং জেনারেশন। এরাই পালটে দিবে আধুনিকতার ট্রেন্ড। এরকম অনেকগুলো অ্যাকশন প্লøান ফরমুলেট করতে করতে জাবের হাঁফিয়ে উঠে -
- লেটস হ্যাভ অ্যা ব্রেক!
- হোয়াট অ্যাবাউট সাম ফান? প্রশ্ন ছুঁড়ে রাসেদ কম্পিউটার অন করে। উইন্ডোজ মিডিয়া প্লেয়ারে তখন অ্যাডাম অ্যান্ড ঈভ প্রোডাকশনের ’হেডমাস্টার টু’।
সাফরীন আঁতকে উঠে - ওয়াও... জ্যাজমিন!
জাবের সাফরীনের পাশে গিয়ে বসে - ইয়াপ, শী ইজ আওয়ার প্রাইড...।
মাথার স্কার্ফ সরিয়ে সাফরীন তখন ছোট ছোট চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে - হুমম... শী ইজ বেটার দ্যান ক্যাথি...
জাবেরের চেহারাটা লাল হয়ে আসছে।
ভলিউম বাড়িয়ে রাসেদ সাফরীনের দিকে তাকায়।
জাবেরটা একটু বেশী ফাজিল...।

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP