24 December, 2006

একজন গরুর গল্প

দিশাদের ড্রয়িং রুমে বসে আছি প্রায় ঘন্টা দু’য়েক হবে। এর মাঝে দুইবার চা দেয়া হয়েছে। সবাই হুড়াহুড়ি ছোটাছুটি করছে। আমার দিকে কারো খেয়াল নেই।
দিশার মা একবার এসে - "স্যার, আপনাকে চা দেয়া হয়েছে?" বলেই অন্য দিকে চলে গেলো।
আমি বসে বসে চা খাচ্ছি। সাথে দেয়া চানাচুরের পিরিচ থেকে একটা একটা করে বাদাম মুখে দিচ্ছি। অপেক্ষা করছি কখন খামটা হাতে পাবো। খামটা হাতে পেলেই বিসিএস কম্পিউটার সিটি; এক গিগার আইপড কিনবো। বাকী টাকা দিয়ে সিল্কের পাঞ্জাবী...।


এর মাঝে দিশা এলো দৌড়ে - "স্যার, হ্যাভ য়ূø সীন আওয়ার কাউ?"
দিশা সামনে ও-লেভেল দিবে । আমি ওকে ম্যাথ আর জিওগ্রাফি পড়াই। এই পড়ানোর পারিশ্রমিক আটকে আছে দুমাস ধরে। গত মাসে লজ্জায় চাইতে পারিনি। এবার তাই ড্রয়িং রুমে বসে আছি। টাকা না নিয়ে উঠবো না; এমন ভাব করছি। দিশার প্রশ্নে ধ্যান ভাঙলো
- দেখিনি, যাওয়ার সময় দেখে যাবো।
দিশা এবার ভুরু তুলে গড়মড় করে বলে
- য়ূø মাস্ট নট মিস ইট, ...দ্য মোস্ট এক্সপেনসিভ কাউ অব দ্য ইয়ার।
- শিউর!
দিশা চলে যায়।


আমি বসে থাকি। সামনে রাখা সানন্দা-য় চোখ বুলাই। পূজা স্পেশালে শাড়ী পরার নানান বাহার দেখি। কারো আসার শব্দ শুনলে টুপ করে পাশ থেকে ইত্তেফাক হাতে নিই। এভাবেই সময় কাটে। আর কেউ আসে না, আমার খামেরও খবর নেই। বাইরে তখন যোহরের আজান দিচ্ছে। একটু পর দুপুরের খাবার সময়। আমি বুঝতে পারছি না - এসময় কারো বাসায় বসে থাকা ভদ্রতার কোন লেভেলে পড়ে! তবুও বসে থাকি। টাকাগুলো আমার খুব দরকার।

আরো কিছু সময় পরে খাম হাতে দিশার মা আসে হাসি মুখে
- ’স্যার, দুইমাসের টাকা আছে, পাঁচশ’ কম। ঈদের গরু কিনতে গিয়ে অনেক খরচ হয়ে গেলো। ভাইবেন না - সামনের মাসে মিলায়ে দিমু নে...।’
নাঃ আন্টি, কী যে বলেন, অসুবিধা নাই - বলে বিনীত হয়ে হাসি দিয়ে খামটি নিলাম। ঘর থেকে বাইরে এসে খাম খুলে দেখি বেশীর ভাগ পঞ্চাশ টাকার নোট। সব গুলো নোট যেন একটু আগে কারওয়ান বাজারের মাছের আড়ত ঘুরে এসেছে!


খামটা পকেটে ঢুকিয়ে গেট পার হবো এমন সময় দিশার বাবা ইদি্রস আলী আমাকে ডাকে
- ’স্যার গরুটা এক নজর দেখে যান’।
পাঁচশ টাকা কম পেয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। তবুও কাছে এগিয়ে যাই। গাবতলী হাটের সবচেয়ে দামী গরু; এক লাখ বিশ হাজার টাকা। ইদি্রস আলী খুব যত্নেকোরবানীর গরুর গায়ে হাত বুলাচ্ছেন। গরু তার বড় বড় চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর যেন বলছে - ৫০০টাকার জন্য মন খারাপ করিস না মানুষ। তারপর যেন মিষ্টি করে একটা হাসি দিচ্ছে। চরম বিদ্রুপ মেশানো সে হাসি।


...সারা শহরের মানুষ হাসতে হাসতে খুন।
পত্রিকায় সবচে’ দামী গরু ও তার ক্রেতার ছবি ছাপা হয়েছে। কিন্তু ক্যাপশন গেছে পালটে। ইদি্রস আলীর ছবির নিচে ছাপানো হয়েছে - ’এই গরুটির দাম এক লাখ বিশ হাজার টাকা"। আর গরুর ছবির নিচে লেখা হয়েছে - "ইনি জনাব ইদি্রস আলী যিনি পাশের গরুটিকে কিনেছেন।" পেপারটি হাতে নিয়ে দিশা ভেউভেউ করে কাঁদছে।


...কান্নার শব্দ আরেকটু বাড়লে আমার ঘুম ভেঙে যায়। বিজয় স্বরণীর জ্যামে বাস আঁটকে আছে। হঠাত রিনির ফোন কল
- কখন দেখা হবে?
- আইডিবি-তে চলে এসো বিকেল চারটায়।
- আইপড?
- হুম, আইপড। কেনো বিশ্বাস হচ্ছে না?
- য়ূø আর সো সু-ই-ট ডিয়ার...
- আসলেই?
তখন জ্যাম ছাড়িয়ে বাসটা নড়েচড়ে উঠেছে।

Read more...

18 December, 2006

খুন হয়ে যাই

তখনো সূর্য দেখা যায়নি। শীতের কুয়াশা আর শিরশির বাতাসে আমি অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। আমাদের ছোটখাটো উপজেলা সদরটা পালটে গেছে অনেক। অন্ততঃ বছর দশেক তো হবেই; পরিচিত দোকান গুলোয় যাওয়া হয় না, আড্ডা দেয়া হয় না। মেরিনা কুলিং কর্ণার আর ক্যাফে ডিলাক্স বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজমীর হোটেল কিংবা শরীফ হোটেল আছে কিনা জানি না। এক টাকায় বড় বড় সিঙাড়া, দুই টাকার ডালপুরি কেটে দুই ভাগ করে দুই বন্ধু খাওয়া। আহ! পুরনো দিন গুলোর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছিল বারবার। হঠাত দেখি - অ্যাশ কালারের চাদর গায়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হেটে আসছেন একজন। আমাদের প্রফুল্ল স্যার। ক্লাস ফাইভে অংক পড়াতেন। ভীষণ ভয় পেতাম। "দুইটি সংখ্যার যোগফল থেকে তাদের বিয়োগফল বাদ দিলে ফলাফল হবে ছোট সংখ্যার দি্বগুণ" - এইটা ক্যামনে হবে কিভাবে হবে ব্যাখ্যা করার জন্য সারাদিন সময় দিয়েছিলেন। বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোচিং ক্লাসে কলম মুখে দিয়ে আমরা সারাদিন বসেছিলাম।
...প্রফুল্ল স্যারকে দেখে এগিয়ে গেলাম। পায়ে ধরে সালাম করলাম। সহজ সরল এই মানুষটি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। নানান কথা হলো। কিন্তু আমি আর কথা এগুতে পারছিলাম না। ক্রমশঃ নিজের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। অল্প সময়ের জন্য দেশে গেলেও ঘটনাটা শুনেছি -
...গতমাসে কারা জানি (আসলেই?) কোন এক কারণে (আসলেই?) মাঝরাতে স্যারের ঘরের দরজায় লাত্থি মারে। এত রাতে কে এসেছে জানতে চেয়ে দরজা খুলতে দেরী হওয়ায় তারা নাকি ঘরের বেড়া কাটা শুরু করেছিল। শেষমেশ দরজা খুলতে হয়েছিল।
"আমি শিক্ষক মানুষ, আমার কাছে কি পাবা বাবারা..."
কথা শোনার সময় হয়তো ছিলো না। যার জন্য ’বাবা’রা এসেছিল, সে তখন সীমান্তের ওপারে। ঈশ্বর মানুষটা অতো খারাপ না। ঘরে কিছুনা পেয়ে মোবাইলটা নিয়ে গেছে। সিমকার্ড রেখে গেছে দয়াপরবশ হয়ে। আল্লাহ অবশ্যই বিপদশঙ্কুলদের হেফাজত করেন।
আমি প্রফুল্ল স্যারের চোখে তাকাতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। এক সময়কার ভয় এখন ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। বাস ছাড়ার পর কেমন যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল নিজেকে। ক্লাস এইটে ফেল করে পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়া আমাদের বন্ধু; এখনকার মুদি দোকানী সেলিমকে খুব হিংসে হয়। এই আগুন বাজারে সে হয়তো স্যারের কাছে খানিকটা কম দামে জিনিস বেচে। ফার্মেসীর দোকানদার ইকবাল হয়তো স্যারকে ডাকে - স্যার, আসেন প্রেশারটা একটু চেক করে দিই। ...আর আমি? আমি কি করছি?
আমি এখনো দৌড়াচ্ছি। মেরিনা কুলিং কর্ণারের তিন টাকার ড্যানিশ/প্যাটিসের বদলে আমি এখন ম্যাকমামা আর কেএফসি দাদুর ভক্ত। সিজলার্স, এমকে, ফুজি শেষ করে সেনানিগামসের ফোর হানড্রেড গ্রামের বীফ স্টেকে কামড় দিই আয়েশ করে। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার একটা ’ধান্ধা’ করছি অনেকদিন ধরে। হবে হবে করেও হচ্ছে না। কারেন্সী রেট ভায়োলেট করে অফিসে কিভাবে নতুন প্রজেক্ট পাস করানো যাবে ঐ চিন্তাটা মাথায় ঘুরে সারাদিন। আহারে প্রফুল্ল স্যার - আপনিই আমাকে যত্ন করে অংক শিখিয়েছিলেন। আপনার আশীর্বাদ আমার পাথেয়...।



ষোলইডিসেম্বরঃ
এবারের ষোল তারিখ সারাদিন আমি একজন বাবুরাম সাপুড়ের সাথে ছিলাম। ভীষণ ক্ষমতার এই মানুষটি আমার দেশেরই নাগরিক। বিদেশে এসেও তার হম্বিতম্ভির কমতি নেই। সারাদিন তার সাথে আমাকে থাকতে হয়েছে। বিনীত হয়ে কথা বলতে হয়েছে। অনেক অযৌক্তিক কথায় রাইট রাইট বলে যেতে হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটা অফিসিয়াল। আমার মেরুদন্ড সারাদিন বাঁকা হয়ে ছিল। টিকটিকি হয়ে যাচ্ছিলাম প্রতি মুহূর্তে। তবুও সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিলাম, বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রামে যাবো...।
পাতায়ায় বাঙালী কম্যুনিটি খুব বড় নয়। ১৬০/১৭০ জনের মতো বাঙালী। আগের সন্ধ্যায় আফজাল ভাইয়ের দোকানে শুনেছি বেশ ভালো প্রোগ্রাম হবে। বিকেলে রেডি হলাম প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য। এবার যখন দেশে গেলাম তখন একজন ব্লগারের সাথে প্রথম দেখা হলো। প্রথম দিনই তিঁনি আমাকে চমতকার একটি টি-শার্ট গিফট করেছেন। শার্টের বুকে বিভিন্ন বাংলা বর্ণ। নিচে লেখা - "এক একটি বাংলা অক্ষর একেকটি জীবন"। খুব আগ্রহ করে টি-শার্টটি পরলাম। তখনই ফোন পেলাম - গ্রুপিং হওয়ায় বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রাম হচ্ছে না, একটা গ্রুপ ব্যাংককে চলে যাচ্ছে। প্রোগ্রাম হবে কিনা অনিশ্চিত। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো।
এটিএন বাংলায় বিজয়ের গান চলছে - ’জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো...’
মা!

Read more...

29 November, 2006

সুঁচ ফুটানো অসুখ

একটু একটু করে খবরটা ছড়ালো।
প্রথমে একজন দুইজন জানলো - তারপর আশেপাশের কয়েক গ্রাম।
খবরের চমকে যতটা না শংকা ছিল তারচেয়ে বেশী ছিল গোপনীয়তার চেষ্টা।
কেউ কেউ না বুঝে এড়িয়ে গেলেও মোটামুটি সবাই জানলো মুন্সী বাড়ীর বড় ছেলে মাসুদ মুন্সীর খারাপ অসুখ হয়েছে। এই খারাপ অসুখটা ঐ তল্লাটের কারো কোন দিন হয়নি। একবার যখন হলো - তখন ভয়টা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না, তাই আগেরদিনের মুরুব্বিদের কথামতো অসুখটার নাম মুখে নেয়া থেকেও বিরত থাকলো কেউ কেউ। তবে সবাই দুঃখ পেলো এমন পরিণতিতে - "আহারে - কী জোয়ান সামর্থ্য পোলা, জাহাজে চাকরী করতো, দেশ বিদেশ ঘুরে ঘুরে বছর ফিরলে বাড়ী আসতো, আদব লেহাজেরও কমতি ছিল না। আহারে, খোদা কার মউত ক্যামনে রাখছে..."

মাসুদের বাবা মকসুদ মুন্সী একদম চুপ মেরে আছে। খোদার কাছে সন্তানের জীবন ভিক্ষা চাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। মাসুদের মা মাঝে মাঝে হাউমাউ করে উঠে। খোদার দরবারে দুহাত তুলে অভিশাপ দেয় অই সর্বনাশকারীকে যে নিউমার্কেটে ভীড়ের মধ্যে মাসুদের জীবনটা শেষ করে দিলো। নামাজ শেষ করে মাসুদের খাটে বসে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফুঁ দিয়ে দেয় মা। মাথায় হাত বুলায়, ছেলের হাড়-জিরজিরে শরীর স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আবার চিতকার করে অভিশাপ দেয়।
...আর মাসুদ চোখ বুঁজে ভাবে অন্যকিছু। দেশান্তরী হয়ে দেশ বিদেশে তরী ভিড়িয়ে খেয়ালে বেখেয়ালে জীবনের অন্য পিঠের শখ গুলো উলটে পালটে নেয়া...। তারপর একদিন কোম্পানীর অ্যানুয়াল হেলথ চেক আপে এইচআইভি পজিটিভ রিপোর্ট পেয়ে টার্মিনেশন লেটার নিয়ে দেশে ফেরা। ইচ্ছে ছিল দেশে ফিরে কাউকে কিছু বলবে না। নীরবে চলে যাবে ওপারে। কিন্তু একদিন ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়া গুজবটিকে পুঁজি করে গ্রামে ফিরে মাসুদ -

"নিউ মার্কেট গেছিলাম - মা’র জন্য শাড়ী আর বাবার জন্য পাঞ্জাবী কিনতে। ঈদের বাজার। মানুষের ভীড়ে হাঁটা মুশকিল। হঠাত মনে হইলো কে যেন পেছন থেকে আমার পিঠে সুঁচ ফুটায়ে দিলো। আশে পাশে আরো কয়েকজন চিককর দিলো, ওরাও গুতা খাইছে। তারপর শুনলাম একটা দল বাইর হইছে - অরা এইডসের রোগী। রোগটা আরো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এই বদ মতলব...।"
এতটুকু বলেই মাসুদের চোখ দুটো ভিজে উঠে।
মনে মনে পরম করূণাময়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় - ইয়া মাবুদ, তুমি দয়ার সাগর, আমারে তুমি মাফ করে দিও।
মাসুদের মা আবার আহাজারি করে উঠে। দোজখের আগুনে জ্বলার অভিশাপ দিয়ে যায়...।

মাসুদের বলা ঘটনাই এলাকার সহজ-সরল মানুষগুলোর মুখে মুখে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহআলম চৌধুরী তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলের কাছে চিঠি লিখে -
"খবর পাইলাম - ঢাকা শহরে সুঁচের মাধ্যমে খারাপ খারাপ সব অসুখ ছড়ানো হইতেছে। আমাদের এলাকার মকসুদ মুন্সীর বড় ছেলে মাসুদ এখন মৃত্যু শয্যায়। তুমি সাবধানে থাকিও। বিনা প্রয়োজনে বাইরে ঘুরাঘুরি করিও না। এই মুসিবত থেকে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুক..."

২৯ নভেম্বর, ২০০৬

Read more...

22 November, 2006

ছুটির পাখির ডাক

এক সময়ের আলোচিত সিনেমা ’ছুটির ঘন্টা’ দেখে অনেকেই মন খারাপ করেছেন, চোখ ভিজিয়েছেন। শিশুদের জন্য তৈরী এ ছবির একটি গান শিশুতোষ আনন্দের প্রকাশ হিসেবে কালজয়ী হয়ে আছে। ঢাকা শিশুপার্কের রাইডগুলোয় কিংবা বিটিভি-তে শিশুদের অনুষ্ঠানে এখনো জনপ্রিয় গান - “একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো, নীল আকাশে সবুজ ঘাসে, খুশিতে হারাবো“।

ছুটির আনন্দের কথা এসেছে নানানভাবে; ছড়ায়, কবিতায়, গল্পে আর গানে। ’মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি, আজ আমাদের ছুটিরে ভাই আজ আমাদের ছুটি’ কিংবা ’ছুটির দিনে মামার বাড়ী আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে রঙীণ করি মুখ’ - আহারে ছুটি, আহারে মামা বাড়ী! বিদেশের বাচ্চাদের বোধ হয় মামা বাড়ী নেই। তাই তারা ’ছুটির অবসরে’ রেস্টুরেন্টে কাজ করে। কবি জসীম উদদীনের লেখা গল্পটি ছিল আমাদের ক্লাস থ্রি-এর বাংলা বইয়ে। এর কিছুদিন পর ’বড়বোনের বিবাহ উপলক্ষ্যে তিনদিনের ছুটি চাহিয়া প্রধান শিক্ষকের নিকট দরখাস্ত’ লেখা শিখতে হয়েছে। বাংলাটা না হয় সহজ ছিল। কিন্তু আরেকটু বড় হয়ে যখন ’লীভ অব অ্যাবসেন্স’ শিখতে হলো তখন ’আই বেগ মোস্ট রেসপেক্টফুলি টু স্টেট দ্যাট’ শিখতেই দিন পার। পরদিন ইংরেজী ক্লাসে কশ্যাত কশ্যাত বেতের বাড়ি। এরপরও ছুটির মোহ কাটেনি। অদ্ভুত লাগতো যখন বাংলা দি্বতীয় পত্রে বন্ধুর কাছে পত্র লেখা - ’এবারের বার্ষিক পরীক্ষার পর ছুটির দিন গুলোয় আমি আমাদের এলাকার কিছু দরিদ্র ছেলেকে বিনা পয়সায় পড়াবো’ টাইপ ডাহা মিথ্যা কথা শিখতে হতো। অবশ্য ওটা কতোক্ষণই বা আর মনে থাকতো! ’এতদ্বারা সকলের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে - ... উপলক্ষ্যে আগামী ... তারিখ হইতে ... তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয় বন্ধ থাকিবে’ - শোনার পর সবাই ক্লাস থেকে ছুউউটিইই বলে দৌড়, কার আগে কে স্কুলের মাঠ পার হতে পারে...!

ছুটিগুলো মাঝে মাঝে অন্যরকম হয়ে উঠে। ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পৃথিবী থেকে অভিমানী কবি তার কবিতাকে ছুটি দিয়ে দেয়। অথবা কবি নিজেই ছুটি নেয়। কেউ ছুটি নিয়ে নেয় বড্ড অসময়ে, অনেকের অজান্তে। অফিসের ব্যস্ত মানুষটি যখন এলপিআর-এ যান, তখন তার অস্থির সময়ের শঙ্কা। অফিস ছুটির পাশাপাশি জীবন ছুটির সময়ও বুঝি ঘনিয়ে এলো...।


দামী একটি ছুটিঃ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম.এ.আজিজ অবশেষে ছুটি নিতে রাজী হয়েছেন। বাজারে মিথ্যা গুজব আছে - ছাত্রজীবনে তিঁনি খুব অধ্যবসায়ী ছিলেন। ছাত্রনং অধ্যয়ন তপঃ-তে বিশ্বাসী হয়ে তিঁনি ছুটির দিন গুলোতেও নাকি স্কুলের বারান্দায় ঘুরঘুর করতেন। লাইব্রেরী খোলা থাকলে ওখানে গিয়ে পড়তেন। ছুটির ব্যাপারটি তাঁর একদম পছন্দ হতো না। ভীষণ প্রজ্ঞাবান এই “ভদ্রলোকের এক কথা“ - “সীতা ধ্যান, সীতা জ্ঞান, সীতা চিন্তামণি, সীতা ছাড়া আমি যেন মণিহারা ফণী। আমার চিন্তা শুধু ইলেকশন, ইলেকশন আর ইলেকশন।“ ক’মাস পরেই ইলেকশন। এ সময় ছুটি নেয়া যায়! নেয়া কি উচিত? কিন্তু সিইসি আজিজকে অবশেষে তিনমাসের জন্য ছুটি নিতে হচ্ছে। খবরে প্রকাশ - ছুটিটা একটু ’কস্টলি’ হয়ে গেছে; মাত্র ৬৭টি জীবন ও সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা...

Read more...

19 November, 2006

বিষণ্নতার শহরের কথা

“নাগরিক জীবন প্রতিবন্ধীত্বের জীবন। মানুষ তার শেঁকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিণত হয় বনসাই মানুষে। তাই শহর এত বিষণ্ন। “বিষণ্নতার শহর“-এ সেইসব মানুষের জীবনের টানাপোড়েন চিত্রিত হয়েছে নতুন এক ধারায়। বিনয় ঘোষের মেট্রোপলিটন মনকে আরো গভীরে গিয়ে চর্চা করেছেন লেখক। নাগরিক বিচ্ছিন্নতাকে দেখতে চেয়েছেন নিজের জীবনের ব্যাখার মাঝ দিয়ে। আমরা সবাই আছি বিষণ্নতার শহরে। কিন্তু সেই আমি বড় নি:সঙ্গ। নি:সঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে নিজেকে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। সত্যের মুখোমুখি হতে গিয়ে নিজেকে উপায়হীন মনে হয়। ক্ষয়ে যাওয়া গ্রামীণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আক্রান্ত করে আধুনিক শহরকে। শহরের খেলনা মানুষদের ভিড়ে এখনো যারা নিজেকে আলাদা করে রাখতে চান, তাদের জন্য অন্যধারার এ গ্রন্থটি আশা জাগানিয়া হয়ে উঠার সম্ভবনা ধারণ করে।“

বইয়ের ফ্লাপে এভাবেই বর্ণনা পেয়েছে মাসকাওয়াথ আহসানের দি্বতীয় প্রকাশিত বই “বিষণ্নতার শহর“; নাগরিক জীবনের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে আরেকটি দূর্দান্ত সৃষ্টি। গ্লোবালাইজেশন প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির সবুজ ঘাসফুল মাড়িয়ে হাইওয়ে হলো, মাটি পুড়িয়ে ইট হলো, এলোমেলো বিক্ষিপ্ত শহর হলো - কিন্তুতৈরি হলো কিছু শুন্যতা, না পাওয়ার বেদনা। শহরের একদল মানুষ যখন অ্যাফ্লুয়েন্ট কনজ্যুমারিস্ট সোসাইটির গোলাপী মাছির পেছনে হনহন করে ছুটছে, আরেকদল মানুষ তখন অতীতচারী হয়ে কেবলই সোনালী কিছু স্বপ্নকে লালন করে চলছে। শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি আর প্রতিদিনকার সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা যখন স্ট্যাটাস সিম্বল সর্বস্ব হয়ে উঠে, আসল চেহারা লুকিয়ে ছদ্মবেশী মানুষ যখন শহরে রাজত্ব করে যায়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের শৈথিল্য যখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে প্রকট করে তুলে - তখন নিয়ন আলোর ঝলমলে শহরের শিরা-উপশিরায় কিছু ’মানুষ’ নিজেদের একাকীত্বকে বিষণ্নতার মোড়কে ঢাকার চেষ্টা করে। এলিয়েনেশনের শিকার সেই সব মানুষদের কথা ’বিষণ্নতার শহর’-এ এক ব্যতিক্রমী অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তুলে ধরেছেন লেখক মাসকাওয়াথ আহসান । একই সাথে আধুনিকতার মুখোশ পরা ফাঁপা শুন্য মানুষদের হাস্যকর সব আচরণকে লেখনীর সুঁচ দিয়ে ক্ষত-বিক্ষতও করেছেন । চব্বিশটি অণূগল্পের পাশাপাশি প্রথম ৩৪ পৃষ্ঠার ’প্রারম্ভ’ পড়ে বারবার চমকে উঠবেন আপনি। মনে হবে এ যেন আপনারই কথা, আপনার আশেপাশের মানুষদেরই কথা। ...খোঁচাগুলো নিজের গায়ে লাগলে মাঝে মাঝে মনে হবে - বড় নিষ্ঠুর, বড় নির্দয় এ লেখনী! আসলে মাসকাওয়াথ আহসানের লেখার স্টাইলটাই এমন। নির্মোহ-নির্লোভ জীবনাকাঙ্খার ছবি আঁকার পাশাপাশি অনায়াসে তুলে ধরেন স্থুল জীবনাচরণের ভুল প্রয়াসগুলো; যেখানে আমরা খুঁজে পাই আমাদেরই অন্য সত্ত্বাকে। চোখের সামনে তখন খুলে যায় ভাবনার এক নতুন দুয়ার! আপাতঃ হতাশার ছায়া থাকলেও বইটি পড়ে আপনার মনে হবে - ’জীবনের পুরোটাই নৈরাশ্যের নয়’, আশাবাদী হওয়ার অনেকগুলো সূত্রও হয়তো আপনি পেয়ে যাবেন...।

সংগ্রহে রাখার মতো অসাধারণ বইটি পাবেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে, জনান্তিক-এর প্রকাশনায়।

Read more...

07 November, 2006

দূর্নীতি ও কানা বগীর ছা

এখনো বেশ মনে পড়ে। বাংলা বইয়ের বাম পাশের কোন এক পৃষ্ঠায় ছিল কবিতাটি। কবিতা নাকি ছড়া? জানি না। ভাবিনি কখনো। কী দরকার কবিতা নাকি ছড়া তা ভেবে সময় কাটানোর! ভীষণ আনন্দে শব্দ করে পড়ার পাশাপাশি বিষ্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম ছবিটির দিকে। কী চমতকার ছবি। বিশাল লম্বা একটি তালগাছ। পেছনে গ্রাম। ঘরবাড়ী। তালগাছের নিচে এক পায়ে একটি সাদা বক দাড়ানো। বকটি উচ্চতায় তালগাছের প্রায় অর্ধেক! বক এতো বড় হয়? নাহ! এসব জটিল ভাবনা আসতো না মনে। ক্লাস ওয়ানে সবাই শব্দ করে পড়তাম-
"ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ঐ আমাদের গাঁ
ঐখানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা।
ও বগী তুই খাস কি?
পানতা ভাত চাস কি?
পানতা আমি খাই না
পুঁটি মাছ পাই না,
একটা যদি পাই, অমনি ধরে -
ঘাপুস ঘুপুস খাই।"
গত কয়েক দশক ধরে কবিতাটি ক্লাস ওয়ানে পাঠ্য। আমাদের সময়ের স্যারেরা খুব জটিল মনের ছিলেন না বোধ হয়। পরীক্ষায় সহজ প্রশ্ন করতেন - ’যে কোন কবিতার প্রথম চার লাইন লিখ’। মনে মনে আবৃতি করতে করতে পরীক্ষার খাতায় লিখে দিতাম গোটা গোটা অক্ষরে। বানান ভুল না হলে দশে দশ পাওয়া যেতো।
এখন সময়টা হয়তো খুব জটিল। বছর তিনেক আগে ঢাকার এক নামকরা স্কুলে ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল - "কানা বগীর ছা কোথায় বাস করে?"
আহারে! ক্লাস ওয়ানের দেবশিশুরা কী কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীনই না হয়েছিল! কেউ লিখলো - কানা বগীর ছা আমাদের গাঁয়ে বাস করে। কেউ লিখলো - তাল গাছের নিচে বাস করে। কেউ লিখলো - তাল গাছের উপরে বাস করে। কেউ বা বুদ্ধি খাটিয়ে লিখলো - কানা বগীর ছা আমাদের গাঁয়ের তাল গাছের নিচে বাস করে। ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রটি লিখেছিল - কানা বগীর ছা ঐখানেতে বাস করে।
জটিল সময়ের জটিল টিচারের জটিল প্রশ্নের জটিল উত্তর। অথবা স্মার্ট আনসার! পরীক্ষায় কোন উত্তরটিকে সঠিক ধরা হয়েছিল তা আর জানা হয়নি।


প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তর জানা নেইঃ
বলা নেই- কওয়া নেই, আমরা হঠাত করে প্রথম হয়ে গেলাম। পত্রিকাগুলো খুব ফলাও করে প্রকাশ করলো। তখন ছিল আমাদের ’জিম্মাদার’ পরিবর্তনের সিজন । বিরাট এক ইস্যু। ’তাঁদের’ চেয়ার পরিবর্তন হলো। হৈ চৈ হলো - শ্বেতপত্র বের হবে, এই হবে - ঐ হবে। ...বছর ঘুরলো। কিন্তু ’তাঁদের’ লুটপাটের খেলার শিরোপাটা আমাদেরই রইলো। একবার, দুইবার, তিনবার। হ্যাট্রিক হলো। রাজপথের ’সংগ্রামী’রা আওয়াজ দিলো - দূর্নীতিবাজ সরকারে পতন চাই। চেয়ারে বসা মুরুব্বিরা ধমক দিলেন। দেশ দে্রাহীতার মামলা হবে। হাইকোর্টও দেখানো হলো। তবুও থামাথামি নেই। পরপর পাঁচবার আমরা চ্যাম্পিয়ান। গতবার অবশ্য ’চান’ মিয়া আমাদের সাথে যৌথভাবে প্রথম হয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা থার্ড হয়ে গেলাম। ’হাতি’ ফার্স্ট হলো। কেউ কেউ বলছে - আমাদের পারফরম্যান্স খারাপ না, অন্য দেশগুলো আমাদের এ পদক ছিনিয়ে নেয়ার জন্য অনেক সাধনা করেছে, শ্রম দিয়েছে। ইরাকে রিলিফ নিয়ে ’মেজবান’ হয়েছে, সুদানে ডায়মন্ড পাচার হয়েছে। তাহলে আমাদের কী হবে? আমাদের কি বসে থাকা মানায়? ভাবনা নেই, আমাদের বসে থাকা লাগবে না...
"তুমি ভালোবাসো কি-না তা আমি জানি না, আমার কর্ম আমি করিয়া রে যাবো..." - থিয়রী ফলো করে আমাদের কালো গাউন পরা ’বিবেক’রা গতকাল একটি আদেশ কার্যকর করিয়েছেন। তিন মাস মেয়াদী এই রক্ষণাবেক্ষণকারীর আমলে দূর্নীতি দমন কমিশনে কোন তদন্ত হবে না, অনেক কর্মকর্তাকে সাময়িক বিরতি দেয়া হয়েছে। ভোটের পর ৫ বছরের জন্য দেশকে নতুনভাবে লীজ নেয়ার পর সব চালু হবে আবার। দূর্নীতি দমন কমিশন চালু হবে, ব্যবসা বাণিজ্যের কমিশনও চালু হবে। চ্যাম্পিয়ান না হলেও মেরিট লিস্টে থাকতে হবে সবসময়।
’ঐখানেতে’ বাস করা ’কানা বগীর ছা’-রা ঘাপুস ঘুপুস করে সব খেয়ে যাবে অবিরাম...। আর শিরোপাটা আমাদের হাতেই তুলে দিবেন ’তাঁরা’।

Read more...

04 November, 2006

পাকমন পেয়ার

রাসেদের আব্বি-আম্মি বছরের এসময় করাচী চলে যায়। নানুভাইয়া-মামারা সবাই ওখানে থাকে। বড়মামা লাহোর ইউনিভার্সিটির টিচার। ছোটমামা ইসলামাবাদে সিরামিকসের বিজনেস করে। ছোটমামীর মা নাকি বেনজীর ভূট্টোর খালাতো বোনের ভাসুরের মেয়ে। আব্বি-আম্মি পাকিস্তানে খুব ব্যস্ত সময় কাটায়। নানুভাইয়ার এন.জি.ও এখন মুজাফফারাবাদে কাজ করছে গত বছরের ভূমিকম্পের ভিকটিমদের নিয়ে। প্রজেক্টটিতে আব্বি-আম্মি বড়সড় ফান্ড দিয়েছে। এবার পিটিভি-র মীনাবাজার হ্যাভ অ্যা নাইস ডে লাইভে আব্বির একটি ইন্টারভিউ আছে। পাক-বাংলাদেশ রিলেশন নিয়ে ডিসকাশন। আম্মিরও রেকর্ডিং আছে পিটিভি ওয়ানের ’কারিনা ইন করাচী’ প্রোগ্রামে। শবনম মাজীদ আর শাহিদা মিনির একটা কালচারাল নাইটেও অ্যাটেন্ড করবেন তারা।


দুই.
আজকের গেট টুগেদারটা জমজমাট ছিল। রাসেদের বন্ধুরা এ-লেভেল দিয়েছে এবার। স্যাট-টোফেল কিংবা আইইএলটিএস এর প্রিপারেশান নিচ্ছে সবাই। এক ফাঁকে রাসেদের বাসায় এ আয়োজন। ফ্যান্টাস্টিক ফোর আর গ্যাংস্টার দেখে কুলসুন ম্যাকারনী খেতে খেতে অনেক গল্প হয়। তাহসান-হাবীব বিতর্কে লোমেলা চেঁচামেচি করে উঠে যায়। এরপর সামী ইউসুফের সুরে বাংলা গানে নতুন জোয়ার সৃষ্টির স্বপ্নে বিভোর শাকেরও চলে গেলে আড্ডাটা ঝিমিয়ে আসে। সন্ধ্যার পর কেবল সাফরীন আর জাবের থেকে যায়।


ভার্সিটি অ্যাডমিশনের অবসরে ওরা একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরি করছে। সাফরীন কাজ করছে উইমেন রাইটস অ্যান্ড লীডারশীপ সেকশনে। শরীয়া আইন যে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে, ধর্মীয় অনুশাসনে থেকেও আধুনিকতার সাথে তাল মিলানো যায়; এ ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করছে সাফরীন। প্রচুর পড়তে হচ্ছে, ওয়েবের জন্য লিখতেও হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে ব্যারন্স স্যাটের হাই ফ্রিকোয়েন্সী আর হট প্রসপেক্টিভ ওয়ার্ড লিস্টে চোখ বুলিয়ে নেয়। সাফরীনের আম্মু একটি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়।
জাবের কাজ করছে হিস্ট্রি সেকশনে। একাত্তরের গন্ডগোলের ঝাপসা কনসেপ্টগুলো জাবের নতুনভাবে জাস্টিফাই করছে। জাবেরের মামা এ বিষয়ে প্রচুর রেফারেন্স দিয়ে হেল্প করছেন। মামা একসময় হলিডে আর এভিডেন্সে লিখতেন, এখন নয়াদিগন্তে লিখেন রেগুলার। রাসেদের কাজটা একটু জটিল। ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি প্রায় চারশ মেম্বারের ইয়াহুগ্রুপটিও তাকে দেখাশুনা করতে হয়। মেম্বারদের বেশীরভাগই ও-লেভেল স্টুডেন্ট। প্রতি মাসে মেম্বার সংখ্যা বাড়ছে। সব ই-মেল মন দিয়ে পড়া, রেফারেন্স ঘেঁটে ঘেঁটে এনকোরারিগুলো রিপ্লাই দেয়া, গ্রুপ ডিবেট কো-অর্ডিনেট করা, উফ! অনেক ঝামেলা। বেশী কঠিন ইস্যু হলে করাচীতে বড় মামা কিংবা নানুভাইয়াকে মেইল করে জেনে নেয়া যায়। আব্বি-আম্মিও হেল্প করেন মাঝে মাঝে।



তিন.
রাসেদ-সাফরীন আর জাবেরের টীমওয়ার্ক খুব ভালো। কাজের প্রতি ভীষণ কমিটেড আর সিনসিয়ার। ওয়েবের ফোরাম সেকশনের পাশাপাশি ব্লগ অপশন রাখার প্লøান করছে রাসেদ। জাবের রিলেটেড সাইটগুলোর লিংক অ্যাড করবে, সাথে একটি ফান সেকশনও দেখবে সে। মুসলিমম্যানিয়াক থেকে ট্রান্সলেট করে কাজ চালাবে প্রথমে, পরে গ্রুপ মেম্বাররাই লিখবে। গ্রুপের বেশীরভাগ মেম্বারই ছেলে। সাফরীন নতুন অ্যাসাইনমেন্ট ঠিক করে - ক্লাস এইট নাইনের গার্লসদের ই-মেল অ্যাড্রেস কালেক্ট করতে হবে। ওদের প্রাইমারী কাউন্সেলিংয়ের কাজটা সাফরীন নিজেই করবে।
তারা যে গ্রুপকে টার্গেট করে এগুচ্ছে, ওরাই আগামীর লিডিং জেনারেশন। এরাই পালটে দিবে আধুনিকতার ট্রেন্ড। এরকম অনেকগুলো অ্যাকশন প্লøান ফরমুলেট করতে করতে জাবের হাঁফিয়ে উঠে -
- লেটস হ্যাভ অ্যা ব্রেক!
- হোয়াট অ্যাবাউট সাম ফান? প্রশ্ন ছুঁড়ে রাসেদ কম্পিউটার অন করে। উইন্ডোজ মিডিয়া প্লেয়ারে তখন অ্যাডাম অ্যান্ড ঈভ প্রোডাকশনের ’হেডমাস্টার টু’।
সাফরীন আঁতকে উঠে - ওয়াও... জ্যাজমিন!
জাবের সাফরীনের পাশে গিয়ে বসে - ইয়াপ, শী ইজ আওয়ার প্রাইড...।
মাথার স্কার্ফ সরিয়ে সাফরীন তখন ছোট ছোট চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে - হুমম... শী ইজ বেটার দ্যান ক্যাথি...
জাবেরের চেহারাটা লাল হয়ে আসছে।
ভলিউম বাড়িয়ে রাসেদ সাফরীনের দিকে তাকায়।
জাবেরটা একটু বেশী ফাজিল...।

Read more...

31 October, 2006

শহরের মৃত্যুর পোট্রেট

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সংগ্রামী মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নব্য ধনীক শ্রেণীর পারষ্পরিক ব্যবধান-বৈষম্যের মাঝে মুকিতের বসবাস। মাস্টার্সে থার্ডক্লাস পেয়েও বিচলিত নয় সে; বরং বাইশ বছরের শীর্ণ শরীর আর প্রত্যয় নিয়ে প্রচলিত সিস্টেমকে পালটে দেয়ার স্বপ্ন দেখে অবিরাম। আমাদের চিরচেনা শহরের পরিচিত মানুষগুলোর মুখোশ টুপটাপ খসে পড়ে মুকিতের ধারালো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। বড়লোক বন্ধু শুভর ফোর রানার হুইলে চাপা পড়ে এক কবির মৃত্যু মুকিতের ভাবনাগুলো ওলট-পালট করে দেয়। মুকিতের চারপাশে ভীড় করে একবিংশের একদল উদ্ভ্রান্ত তরুণ প্রাণ; যাদের কেউ প্রেম-অপ্রেমের সাপলুডু খেলায় হতবিহবল, কেউ প্রতারিত প্রেমিক-প্রেমিকা, ব্যর্থ কবিদল, নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী-সুবিধাবাদী নাট্যগুরু, পঁূজিবাদের পেশীর কাছে পরাজিত স্বাপ্নিক চলচ্চিত্র নির্মাতা, পদক ব্যবসায়ী অথবা পলিটিক্যাল ফিশিংয়ের হাউজ অব ডেথ পেরুনো কর্পোরেট থিংকট্যাংক আর সুশীল সমাজের ছদ্মবেশ ধরা হিংস্র সব মানুষ।

স্বচ্ছল জীবনের হাতছানিতে বিভ্রান্ত শেহনাজ-ফারাদের মোহ কাটিয়ে মুকিত বিয়ে করে ভিন্ন ধর্মের ধনীকণ্যা সিনডেরেলাকে। বিয়ের পর সামাজিক ফরম্যাটে সংসারী হওয়ার চেষ্টায় মুকিত হাঁফিয়ে উঠে। নাগরিক জীবনের উচ্ছ্বাস উতসবের পহেলা বৈশাখ, শেরাটনে সুমনের গান, সংখ্যালঘুর যন্ত্রণা, বিবৃতিবাজ বুদ্ধিজীবি, ভন্ড পলিটিশিয়ান আর রটেন অ্যাফলুয়েন্ট সোসাইটির নরম রঙীন কার্পেটের তলায় স্তর জমা নাগরিক ধুলোবালি মুকিত উন্মোচন করে দেয় এক ঝাপটায়। একঘেঁয়ে বিরক্তিকর মানুষদের ভীড়ে সহজ-সরল হারূ মিয়া কিংবা হিজড়াদের সংস্পর্শে এসে মুকিতের মনে হয় এখনো একটি আকাশ আছে, কেবল জানালা খোলার বাকী!

তারপর একদিন কবি হত্যাকারী শুভ ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসা উপলক্ষে শুভর বাবা উতসব আয়োজন করে; নৌ-বিহারে শহরের আলোকিত ঝলমলে মানুষদের ভীড়ে পুরনো ভাবনাগুলো আবার ফিরে এলেও তীর্থ যাত্রার আত্মসংশোধন পর্ব ভেবে মুকিত কিছুটা আশাবাদী হয়। সিনডেরেলার সাথে ভালোলাগার মুহূর্তগুলো শিহরণ জাগায়। তবে স্বপ্ন ভঙ্গ হতেও দেরী হয় না। সামাজিক দানবদের শহরে ফেরার প্রস্তুতি দেখে আশঙ্কায় মুকিতের বুক শুকিয়ে যায়। নস্টালজিয়া ঘেরা ভালোবাসার শহরে মৃত্যু দানবদের সাঁজোয়া বহরের নিচে প্রাণ দিবে কবি-পরাজিত মেঘদল-অসহায় কালো মানুষ! মুকিতের আকাঙ্খার শহর তখন কেবলই মৃত জোনাকীর থমথমে চোখ। ...কোথায় যাবে সে!

’মৃত্যুর শহর’ মাসকাওয়াথ আহসানের প্রথম উপন্যাস। এক অভিনব স্টাইলে লেখক মুকিতকে নিয়ে গেছেন শহরের পরতে পরতে বিচিত্র সব মানুষদের মনের গোপন কামরায় যেখানে অ্যাফলুয়েন্ট সোসাইটির পলেস্তারা লাগানো জীবনের খাঁ খাঁ শূণ্যতার পাশাপাশি উঠে আসে নিম্ন মধ্যবিত্তের আটোসাঁটো জীবনক্ষরা। সোডিয়াম আলোর বিভ্রম এড়িয়ে পরিশুদ্ধতার প্রত্যয়ে নাগরিক জীবনের এক অনবদ্য আখ্যান ’মৃত্যুর শহর’। টানটান গদ্যে লেখা বইটি প্রকাশ করেছে পড়ুয়া, ৪৫ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

Read more...

26 October, 2006

ব্যাংকক পোস্টে বাংলাদেশ

সকাল বেলা Bangkok Post এর প্রথম পেজ দেখেই বুকটা ধক করে উঠলো। না জানি কী রিপোর্ট! গত বছর ব্যাংকক পোস্টে একটা ছবি ছাপা হয়েছিল - অবরোধের দিন ঢাকার রাস্তায় পুলিশি পাহারায় একদল শীর্ণ শরীরের মানুষ নামাজ পড়ছে। ...তাই আজ সকালের শংকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আজকের পত্রিকার হরাইজনস সেকশনের কভার স্টোরি বাংলাদেশ নিয়ে। রবার্ট লা বুয়া- রিপোর্টটি পড়ে ক্যামন যেন ভালো লাগা জাগলো মনের ভেতর। ব্লগের আগ্রহী পাঠকদের জন্য মূল অংশগুলো আমার নিজের মতো করে ভাবগত অনুবাদের চেষ্টাঃ

* বাংলাদেশে যদি আপনি আগে গিয়ে থাকেন, তবে হয়তো দেশটি সম্পর্কে ভাবলে - প্রবল দারিদ্রø, মৌসুমী বন্যা আর লঞ্চ ডুবির কথা মনে পড়বে প্রথমেই । তবে সাথে সাথে আপনাকে অবশ্যই দেশটির অমায়িক জনগণ, হাসিখুশি মুখ এবং পুরুষ প্রধান সমাজের সাথেও পরিচিত হতে হবে। বিভিন্ন সূত্র দেখে ভেবেছিলাম জঘণ্যতম অপরাধ, জনসংখ্যা, ভীড়, আবাসনের চড়া দামই দেখবো।
* বাস্তবে, বিদেশী মিডিয়াগুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা দেয় তা চমতকার দেশটির বাস্তব প্রতিচিত্র নয়। (যা শিখলামঃ সংবাদে আপনি যা পড়েন, শুনেন বা দেখেন তার সব কিছু বিশ্বাস করবেন না)। আমি বাংলাদেশের যেখানেই গেছি বেশ নিরাপদ বোধ করেছি, এশিয়ার অনেক শহরের চেয়ে বাংলাদেশের আকাশকে বেশী নীল মনে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
* বাংলাদেশ কি সাংঘাতিক গোলযোগপূর্ণ , প্রপীড়িত এবং অভুক্ত মানুষে ভরা? না। অমনটি নয়। মানুষজন গরীব হতে পারে, কিন্তু অতোটা দুর্দশাগ্রস্ত নয়। পাশ্চাত্য স্টান্ডার্ডে গরীব হলেও এখানকার মানুষগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক সুখী।
* বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলেও যারা রয়েল বেঙল টাইগার দেখেছেন, পার্বত্য উপজাতীয়দের সাথে থেকেছেন, চা বাগান কিংবা প্রাচীন মন্দিরগুলো দেখেছেন তাদের কাছে দেশটি তেমন জনবহুল মনে হবে না।
* ইন্টারন্যাশনাল প্রেস আমাদের যে রকম ধারণা দেয়, বাংলাদেশ তার চেয়েও অনেক বেশি সভ্য দেশ। এখানকার লোকজন আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে অনেক বেশী সচেতন। প্রধান নগরী ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩৬টির মতো দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, যার ৯টি ইংরেজী দৈনিক।
* বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান দেখার আগে ঐতিহাসিক মুঘল সাম্রাজ্যের নিদর্শন লালবাগের কেল্লা, শাঁখারি বাজার, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরসহ ঢাকার আরো কিছু দর্শনীয় স্থান দেখা উচিত।
* থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশও বিশ্বের অন্যতম পোশাক প্রস্তুতকারক দেশ, যেখানে কম দামে জামা কাপড় কেনা যায়। প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে পান্থপথে রয়েছে অত্যাধুনিক বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টার। এর বাইরে বনানী ও গুলশানের বিপনীগুলো বিদেশিদের খুব পছন্দের আকর্ষণ।
* বিশাল জনসংখ্যার কারণে সংগতভাবেই বাংলাদেশ এখনো নদী বিধৌত কৃষিভিত্তিক সমাজ। প্রাকৃতিক আকর্ষণের মাঝে সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্ক নিঃসন্দেহে অন্যতম। বিশ্বের বৃহত্তম এ ম্যানগ্রোভ বন ইউনেস্কো ঘোষিত ’ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সুন্দরবন গেলে কমপক্ষে ৫ দিনের জন্য যাওয়া উচিত। শীতকালে বাংলাদেশে যাওয়ার সেরা সময়, তবে আপনি এপ্রিলে গেলে মাওয়ালিদের মধু উতসব দেখতে পাবেন।
* দেশের ২য় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। উপনিবেশিক আমলের বেশ কিছু দালান দেখতে পাবেন এখানে। শিপব্রেকিং এরিয়া এখানকার আরেকটি দেখার মতো জায়গা, তবে সেখানে ছবি তোলা নিষেধ। আরেকটু দক্ষিণে আছে কক্সবাজার; বিশ্বের দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার) সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম থেকেই যাওয়া যায় চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে। বাংলাদেশের মূলধারা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে এখানে রয়েছে অনেকগুলো উপজাতি গ্রাম।
* বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দেশের চা বাগানের প্রধান এলাকা। সেখানে গিয়ে চা উতপাদনের পদ্ধতি দেখা যায়; যার জন্য মার্চ- ডিসেম্বর সবচে ভালো সময়।
* দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দির। রাজশাহীর পুঠিয়া শহরে রয়েছে বেশ কিছু হিন্দু রাজবাড়ী ও দালান। দেশের প্রাচীনতম যাদুঘর ’বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ অন্যতম স্থাপত্যকলার এক নিদর্শন। এছাড়াও এখানে রয়েছে হিন্দু দেব-দেবীর অনেক মুর্তি। উত্তরবঙ্গের কান্তনগরের মন্দির আরেকটি ছোট কিন্তু চমতকার স্থান।

এক সংগ্রামী ইতিহাসের দেশ; বাংলাদেশ

Read more...

22 October, 2006

বাড়ী বদলে যায়

আজ কোন মিটিং সমাবেশ নেই।
দর্শনার্থী নেই।
দফতরের কাজকর্মও স্থগিত করা হয়েছে। তবুও সকাল থেকে তার মনটা খুব ভার হয়ে আছে। আহ! পাঁচ বছর কেটে গেলো! মনে হলো এই তো সেদিনের ঘটনা। সবাই মিলে কি হৈ হুল্লোড় করে এ বাড়ীতে উঠেছিল। আজ বাড়ীটা ছেড়ে দিতে হবে। বিশাল লন, খোলা বারান্দা, চাকর-বাকর-খানসামায় সয়লাব। চা-য়ের কেটলী চুলা থেকে নামতো মাঝরাতে। কত লোক এর আসা যাওয়া! কতো দেন-দরবার, শলা পরামর্শ, কতো স্মৃতি! এরকম লোকে গমগম এই বাড়ীটা আজ থেকে বেশ কয়েক মাস খাঁ খাঁ করবে। আগামীতে কে আসবে জানে না কেউ।


...বিপরীতে নতুন ভাড়া নেয়া গুলশানের তিন হাজার স্কয়ার ফিটের অ্যাপার্টমেন্টের কথা ভাবলে ভীষণ অস্বস্তি লাগে। কেমন যেন দমবন্ধ গুমোট ম্যাচবক্স বাসা। এরকম খোলা হাওয়া কই? এরপরও এ বাড়ী ছেড়ে ম্যাচবক্স জীবনে যেতে হবে! রোজাদারের দোয়া সবার আগে কবুল হয়। তাইতো এবার প্রতিদিন ইফতার সামনে নিয়ে চোখ বুঁজে বারবার বলেছেন - হে পরওয়ারদেগার, হে সর্বশক্তিমান, তুমি দয়ার সাগর। তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করো, যাকে ইচ্ছা তাকে নিঃস্ব করো। ইয়া রাহমানির রাহিম, পাঁচ বছরে অনেক ভুল-ত্রুটি করেছি - হে মাবুদ, তুমি ক্ষমা করে দিও, ...আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই; কেবল আর একবার ইলেকশনে জিতায়ে মন্ত্রী বানায়ে দিও...।

...এসব ভাবতে ভাবতে তিনি পিক-আপ ভ্যানগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একে একে সব মালপত্র উঠানো হচ্ছে। শংকা হয় - নতুন অ্যাপার্টমেন্টে এতো জিনিসের জায়গা হবে তো! গিন্নিও বিষণ্ন মুখে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে ছিল ঈদটা এই বাড়ীতেই করবে! অথচ সরকারের অর্ডার...। আরেকটু দূরে পোষা বিড়াল ছানা কোলে নিয়ে তাদের আট বছর বয়েসী মেয়ে বসে আছে। তারও এই বাড়ী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। অথচ যেতে হবে! মা-কে অনেক বুঝিয়ে বিড়াল ছানাটা নেয়া যাচ্ছে। বাবা বলেছিল - অ্যাপার্টমেন্টে বিড়াল নেয়া যাবে না। পরে কান্নাকাটি করায় বাবা রাজী হয়েছে। এখন ইচ্ছে করছে - সামনের আম গাছে ঝুলানো দোলনাটা নিয়ে যেতে। মা-কে বলার পর চোখ রাঙানো দেখে আর কথা বলার সাহস হয় না। বাবাও গম্ভীর মুখে চেয়ে আছেন।
অবশেষে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে তিনজন গাড়ীতে উঠে বসে। তখন হঠাত মোবাইল বাজে
- মিনিস্টার সাব, জাকাতের কাপড় নিয়া হেভি গ্যাঞ্জাম লাগছে। ঠেলাঠেলিতে কয়েকজন মারাও গেছে। এতো লোক সামাল দেয়া মুশকিল।
-আহারে জ্বালা! এই শেষ ক’টা দিনও কি তোরা আমারে শান্তি দিবি না? যেমনে পারিস সামাল দিয়ে যা। আমি ঈদের আগের রাতে আসবো..। হুম... হুমম... ঠিক আছে, ঠিক আছে...।

ফোনের লাইন কেটে মিনিস্টার সাহেব শেষ বারের মতো বাড়ীটার দিকে তাকান। আম গাছে ঝোলানো দোলনাটা আপন মনে বাতাসে দুলছে।
বুকটা হু হু করে উঠে...।

Read more...

16 October, 2006

আর্চিস গ্যালারী পেরিয়ে

মাধবী কখনো সিডিউল মিস করে না। তপুই বরং মাঝে মাঝে দেরী করে। কিন্তু আজ উলটো ঘটনা। তপু পনের মিনিট আগে এসে অপেক্ষা করছে। এ সময়টায় আর্চিস গ্যালারীর ভেতরে ভীড় হয়। তপু-মাধবী ঈদকার্ড কিনবে, কিন্তু শর্ত হলো ঈদের সকাল ছাড়া খোলা যাবে না। ঈদের সকালে ফোনে ’ঈদ মোবারক’ বলতে বলতে খাম খুলতে হবে। গত কয়েকটা ঈদে এমন হচ্ছে।
একটু পর মাধবীর রিকশা এসে থামে।
- উঠ, রিকশায় উঠ...।
- কোথায় যাবি? এখানেই তো আসার কথা ছিল।
- আহ! উঠ তো, তারপর দেখবি কই যাই। মাধবী তাড়া দেয়।
তপু উঠে বসে।
রিকশা চলতে শুরু করলে মাধবী মাথায় ওড়না তুলে ঘোমটা দেয়। তপু হাসে - ’কীরে হঠাত মাথায় ঘোমটা দিলি’।
- মাথায় রোদ লাগে।
- এতক্ষণ রোদ লাগেনি, আমি পাশে বসার সাথে সাথে রোদ লাগা শুরু হলো?
- বুঝিস যখন - তখন এতো কথা বলিস কেন?
- এক কাজ কর, রিকশার সীটটা অনেক বড়। তোর ব্যাগটা আমাদের দুজনের মাঝখানে রাখ...
- চুপ করবি?
...রিকশা চলতে থাকে।



দুই.
মাধবীর কথাবার্তা তপু ঠিক বুঝতে পারে না। আবারো জিজ্ঞেস করে - ’আমি তোকে কত টাকা দামের কার্ড দিবো ওটা আমার ব্যাপার...’
- বললে সমস্যা কি?
- আমি কি তোকে জিজ্ঞেস করছি - তোর বাজেট কতো! তুই দিনদিন ছোটলোকের মতো কথা বলছিস...
- ঠিক আছে, আমি ছোটলোক। শোন, আমি তোকে ৫০ টাকার ঈদকার্ড দিবো। এখন বল - তুই কত টাকার দিবি?
- ওকে ধর, আমিও ৫০টাকার কার্ড দিবো। তপু জবাব দেয়।
- গুড, এখন আমাকে ৫০ টাকা দে।
তপু পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে দেয়।
মাধবী হাসে, বলে - তোর ৫০ আর আমার ৫০ মোট ১০০ টাকার গিফট কিনলাম একজনের জন্য।
- কার জন্য?
- জানি না। এখনো খুঁজে চলেছি।
রিকশা তখন কচুক্ষেত - ইব্রাহিমপুর - তের নাম্বার মোড় পেরিয়ে গেছে।
- চাচা, থামেন, থামেন, একটু থামেন। হঠাত মাধবী রিকশা থামায়।
তপুও রিকশা থেকে নামে। রাস্তার পাশ দিয়ে এক ময়লা কুড়ানো ’টোকাই’ হেঁটে যাচ্ছিল। ওকে থামিয়ে মাধবী তার সাথে গল্প জুড়ে দেয়। নাম মিলন। কোথায় থাকিস, কী করিস, বাপ-মা কী করে...। এইসব। এই গল্পগুলো প্রায় একই রকম। তারপর মাধবী তার ব্যাগ থেকে শার্ট-প্যান্ট দুটো বের করে দেয়। নতুন জামা পরে মিলন ভূবন ভুলানো এক হাসি দেয়, জিজ্ঞেস করে - আফা, আপনে কে? কি করেন?
জবাব না দিয়ে - মাধবী তপুর হাত ধরে রিকশায় উঠে বসে।
তপু পেছন ফিরে দেখে - মিলন হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তাদের রিকশার দিকে। এ যেন এক দেবশিশু স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে, হাসছে...।



তিন.
মিনিট দুয়েকের নীরবতা ভেঙে তপু খোঁচা দেয় - ’ভালোই লাগছে, মাদার তেরেসার সাথে নগর ভ্রমণ...’
মাধবী হাসি দেয় - আচ্ছা তপু, তুই তো প্রায়ই বলিস, আমরা স্টুডেন্ট মানুষ - এইসব বঞ্চিত মানুষদের জন্য আমরা কী-ই বা করতে পারি!
- হুম বলি...
- কিন্তু, এই যে আমাদের অহেতুক লোক দেখানো ফরমালিটিসের ঈদকার্ড দেয়া নেয়া; এই অভ্যাসটা কি আমরা পরিবর্তন করতে পারি না? ভেবে দেখ - তোর আর আমার ১০০ টাকা একজনের মুখে যে হাসি আনন্দ এনে দিলো, এটা কী খুব কঠিন কিছু?
- না কঠিন কিছু না। কিন্তু তোর কথাগুলোকে এই মুহূর্তে খুব কঠিন মনে হচ্ছে। ...তোর মাথার ঘোমটা কই?
মাধবী মুচকি হাসে।
’এখন রোদ লাগছে না’ - বলে আরেকটু কাছে ঘেঁষে বসে।

Read more...

10 October, 2006

বায়েজীদ স্যার

সেই পুরনো কথাগুলো আমাকে আবারো বলতে হয়। একঘেঁয়ে মুখস্ত কথা, ইতিহাস জ্ঞান পরীক্ষার মতো - আনোয়ার সাদাত মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিল।
এবার তিনি আমার দিকে আরো একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেন - মারা গিয়েছিল কিভাবে জানো?
- জ্বী স্যার, ৬ অক্টোবর ১৯৮১ সালে - ন্যাশনাল ডে-র প্যারেডে।
- রাইট! হি ওয়াজ গান শ্যুটেড। এনিওয়ে, য়্যূ আর মাই নিউ টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট।
এটা ছিল স্যারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত। ড. আবুল কাশেম বায়েজিদ স্যারের কথা বলছি। সময়টা জানুয়ারী ২০০৩। স্যারের কাজে টুকটাক সাহায্য করি। সাথে চলে মজার সব আলোচনা। ঐ সেমিস্টারে এম.বি.এ ক্লাসে স্যার "ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস" কোর্স পড়াচ্ছিলেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৈষম্যের ব্যাপারে স্যার ছিলেন শোচ্চার। ধনী দেশগুলোর অন্যায্য আচরণের তীব্র সমালোচনা করতেন দারূণ দারূণ সব ধারালো বিশেষণ দিয়ে। বাণিজ্যের পাশাপাশি গ্লোবালাইজেশনের নামে তাদের কালচারাল আগ্রাসনেরও বিপক্ষে ছিলেন তিনি। মনে পড়ে - একদিন কথার মাঝখানে আমি মাসকাওয়াথ আহসানের একটা বই থেকে কোট করে বলছিলাম - সভ্যতার চিমনীর কালো ধোঁয়া আমাদের শরতের আকাশটুকু কেড়ে নিবে। সাথে সাথে স্যার চমকে উঠলেন - চমতকার কথা, অসাধারণ। বইটার দাম কতো?
সাথে সাথে আমাকে টাকা দিলেন বইটি কেনার জন্য।
পরদিন কিনে আনলাম।
শুনেছি অ্যামেরিকায় যখন ছিলেন তখন তাঁর গাড়িতে একটা ছোটখাটো লাইব্রেরী ছিল।
এরপর ঈদের ছুটি ছিল। ঈদের পর ক্যাম্পাসে এসে শুনি স্যার অসুস্থ। একদিন খবর পেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে আছেন। অথচ বেড নাম্বার কেউ জানে না। তবুও গেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে। রোস্টার চেক করে দেখি - এই নামে কোন রোগী নেই। একজন পরামর্শ দিলো - ’সবগুলো ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। রোস্টারে সব থাকে না’। এরপর শুরু হয় আমার হসপিটাল চককর। ৫০/৬০জন রোগীর চেহারা চেক করি, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত সবাই, কিন্তু স্যার নেই। ঘন্টা তিনেক ঘুরেও বায়েজিদ স্যারকে পেলাম না। পরের সপ্তায় জানলাম - স্যার নাকি পিজি হসপিটালে আছেন। এবার বেড নাম্বার কালেক্ট করি। গিয়ে দেখি - ঐ বেডে অন্য মানুষ শোয়া। কথা না বলে চলে এলাম। আবার সেই একই চক্র। রোস্টার চেক করা। অনেক অনুনয় বিনয়। শেষে দেখা গেলো - বেড নাম্বার ঠিক আছে। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করলাম - এ তো বায়েজিদ স্যারই! শরীর সাংঘাতিক ভেঙে গেছে। শেভ না করায় মুখে লম্বা দাড়ি। চেনার উপায় নেই। কিছুক্ষণ কথা বললাম। স্যারের ’বোন ক্যান্সার’ ধরা পড়েছে। নিজের বয়স ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সত্বেও বললাম - ’মনে সাহস রাখেন স্যার, আপনি ভালো হয়ে যাবেন’।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন - ’তুমি আমাকে সান্তনা দিচ্ছো? ’
সে সন্ধ্যায় খুব মন খারাপ নিয়ে পিজি হসপিটালের বাইরে এলাম। দিনটা মনে থাকবে অন্য আরেকটা কারণে - সেদিনই বুশ ইরাক আক্রমণ শুরু করে। সপ্তাহ খানেক পর আবার পিজি হসপিটালে গিয়েছিলাম - স্যারকে দেখতে। সেদিন দেখলাম স্যার খুব আশাবাদী, সুস্থ হয়ে উঠবেন। বললেন - তুমি যে বইটা কিনেছিলে ওখানে একটা শব্দ আছে - ’লোলিতলোভনকান্তি’। আমরা সবাই এখানেই আঁটকে আছি...।
স্যারের চিকিতসা সাহায্যার্থে ছাত্রেরা একটি কনসার্টও আয়োজন করেছিল। সবাই কামনা করছিলেন - স্যার ফিরে আসুক!
পরের সেমিস্টারে সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যার ক্যাম্পাসে ফিরলেন। ভীষণ দূর্বল। ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটেন। বসে বসে ক্লাস নেন। শুনেছি - যাদুকরী কথাবার্তার কমতি ছিল না তখনো। স্যারের রুমে টেবিলে তখন বইয়ের পাশাপাশি ১৫/১৬ রকম অসুদ থাকতো। ক্লাস রুটিনের পাশাপাশি অসুদ খাবারও একটা রুটিন ছিল। আমি দেখা করতে গেলাম। আবার সেই আলোচনা। পশ্চিমা আগ্রাসন - গ্লোবালাইজেনশন থ্রেট...। মনেই হচ্ছিলো না - নিজের ভেতরে কী অসুখ নিয়ে তিনি কথা বলছেন!
বায়েজিদ স্যার জীবনের একটা গুরূত্বপূর্ণ সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। ওয়েস্টার্ণ লাইফের জৌলুসের মোহ কাটিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। মীরপুরের পল্লবীর ছোটখাটো বাসায় থেকে তাঁর প্রিয় শহর ঢাকাকে ভালোবেসে কাছে থাকতে চেয়েছেন। অবসর সময়টুকু ছাত্রদের মাঝে কাটিয়ে টুকরো টুকরো ভাবনাগুলো শেয়ার করতে চেয়েছেন। মরণব্যাধি নিয়ে বারবার হসপিটালে ভর্তি হয়েও প্রচন্ড মানসিক শক্তির জোরে ফিরে এসেছেন ক্যাম্পাসে।
...ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়মকে এবার আর এড়াতে পারলেন না। জুলাই ২০০৬। স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা রয়ে গেলাম অসাধারণ এক মানুষের অপূরণীয় ঋণ ও ভালোবাসা নিয়ে!


ঃঃঃ আজ ৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ড. বায়েজিদ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Read more...

তাহাদের ঈদী ফোনালাপ

রাত বারোটার দিকে হঠাত মিসকল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
নাম্বারটির দিকে তাকিয়ে খালেদা মুচকি হাসলো। ভাবলো সেও মিসকল দিবে। কিন্তু কী ভেবে জানি ফোন করে বসলো।
ফোন রিসিভ করেই ওপাশে হাসির মাতম। হাসি থামিয়ে হাসিনা বলে
- কী গো বইন ডরাইছো?
- না, ডরামু ক্যান। তুমি মনে করছো তোমার নম্বর আমি জানি না?
- নম্বর জানলে ফোন করো না ক্যান?
- এই তো করলাম।
- হ করলা... আমি মিসকল দিলাম বইলাই তো করলা।
- মিসকল দিলে কী সবাই কলব্যাক করে কও? তোমার নম্বর দেইখাই কল ব্যাক করলাম।
-যাউক আর কথা বাড়াইও না আছো ক্যামন? হাসিনা জিজ্ঞেস করে।
খালেদা কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে - ভালো থাকতে আর দিলা কই কও, কীসব সংস্কার-ফংস্কার নিয়া গ্যাঞ্জাম শুরু করছো, শেষের ক’টা দিন শান্তিতে থাকবার দিছো?
- শুনো বইন, রাইত বিরাতে ফাউল কথা কইও না। বিলাই শুনলেও হাসবো। প্রথম যদি আমার কথার গুরুত্ব দিতা, তাইলে আইজ আর এরকম হইতো না।
- অই, কী কইলা? আমার কথা শুনলে বিলাই হাসবো? বিলাই হাসবো? আর তোমার কথা শুনে তো জগত হাসে, ঐটা বুঝো?
- মুখ সামলাও কইলাম...
- তুমি মুখ সামলাও...
- তুমি
- তুমি
- তুমি তুমি
- তুমি তুমি তুমি - - - -
(টেলিফোনে - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। তারপর অপারেটরের আওয়াজ - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের কলটি স্থগিত করা হলো। অনূগ্রহপূর্বক দুই মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর কল অ্যাকটিভেটেড হবে। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে - পরবর্তী সংঘাতমূলক আলোচনার জন্য কল পাঁচ মিনিট স্থগিত করা হবে। ধন্যবাদ।)
দুই মিনিট পর লাইন রি-কানেক্টেড।
- হ্যালো।
- হ্যালো। আছো তাইলে। হাসিনা জিজ্ঞেস করে।
- হুম আছি। শোন - পলিটিক্স বাদ দাও। আসো অন্য কথা কই।
- ঠিক কইছো বইন। তো আছো ক্যামন? শরীর ভালো? পায়ের ব্যাথার কী অবস্থা?
- আর কইওনা। মাঝে মাঝে খুব ব্যাথা করে। ডাক্তার পেইন কিলার দিছে। খাইতে মন চায় না। তারাবীর নামাজ পড়ার পর হাল্কা পাতলা ব্যাথা করে।
- অসুদ-পত্র ঠিকমতো খাও। আলসেমী কইরো না।
- এইবার তোমার কথা কও। কানের কী অবস্থা?
- এখনো পুরাপুরি ভালো হয় নাই। মাইকের আওয়াজে প্রবলেম হয়। মাঝে মাঝে ঝিঝি শব্দ শুনি।
- ঈদের ছুটিতে বিদেশে গিয়া ডাক্তার দেখায়ে আসো। এরপর ইলেকশনের ঝামেলা শুরু হইলে সময় পাইবা না।
- হঅ আমিও তাই ভাবছিলাম। দেখি কী হয়।
হাসিনা এবার প্রসংগ পালটায়।
- ভাবতেছি একটা একটেল জয় প্যাকেজ নিবো। তোমারে জয় পার্টনার করবো। কথা কইতে খরচ কম পড়বো।
- ভালো হইবো। আচ্ছা, তোমার ছেলে জয় কেমন আছে?
- আছে, ভালোই আছে।
- ভালো থাকলো ক্যামনে? পেপারে তো দেখি সব আজব খবর। একদিন দেখলাম ক্রিস্টিনারে ডিভোর্স দিবো, মিশরীয় কোন মাইয়ার লগে নাকি নতুন সম্পর্ক হইছে। পরদিন শুনলাম আবার তুমি দাদী হইবা।
- তোমার এই এক দোষ। পেপারে যা লিখে সব বিশ্বাস করো। অন্যের পোলার কী হইছে খবর না নিয়া নিজের পোলার দিকে তাকাও।
- কী হইছে? আমার পোলা কী করছে? আমার পোলা দেশেই আছে। আমি তো খারাপ কিছু দেখি না।
- নিজে না দেইখা পাবলিক কি কয় ওগুলাও একটু শুনো।
- আমার শুনতে হইবো না। আমার পোলা তো আর তোমার পোলার মতো বিদেশী মাইয়া গো লইয়া...
- হিসাব কইরা কথা কও কইলাম। তুমি কিন্তু আমার কইলজ্যার ভিতর হাত দিতেছো।
- তুমিও আমার কইলজ্যা নিয়া টানাটানি করতাছো।
- তুমিই তো শুরু করলা।
- আমি করছি? নাকি তুমি?
- তুমি
- তুমি
- তুমি - তুমি
- তুমি - তুমি - তুমি
(টেলিফোনে আবার - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। ...অপারেটরের ঘোষণা - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের কলটি স্থগিত করা হলো। অনূগ্রহপূর্বক পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর কল অ্যাকটিভেটেড হবে। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে - পরবর্তী সংঘাতমূলক আলোচনার জন্য আপনাদের ফোন কানেকশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হবে। ধন্যবাদ।)
পাঁচ মিনিট পর লাইন রি-কানেক্টেড।
- হ্যালো।
- হঁ্যা, শোনো - পলিটিক্সের কথা আর কইওনা। এইবার লাস্ট চান্স।
- আমিও ঐটাই ভাবছিলাম। হাসিনা জবাব দেয়।
- ঈদে কী করবা?
- কী আর করবো। ঘরেই থাকবো। টিভি চ্যানেলগুলায় ভালো প্রোগ্রাম আছে। দেখতে হবে।
- ভালো কথা মনে করাইচো। সুন্দর কোন প্রোগ্রাম দেখলে আমারে এসএমএস দিয়া জানাইও।
- আচ্ছা। ঈদের কেনাকাটা করা শেষ?
- টুকটাক কিনছি। আমি তো আবার শিফন ছাড়া অন্য কিছু তেমন লাইক করি না। আচ্ছা বইন, তোমারে একখান কতা জিগাই।
- কও।
- হাসবা না তো?
- হাসবার হইলে হাসুম না?
- ঠাট্টা করলা?
- আচ্ছা হাসুম না। কও কী কতা।
- ২০০১ এর ইলেকশনের দিন তুমি একখান শাড়ি পড়ছিলা, খেয়াল আছে - নৌকা প্রিন্ট করা...
- হুম আছে। ক্যান কী হইছে?
- না মানে - কোত্থেকা কিনছিলা? আমিও ভাবছিলাম ধানের শীষ প্রিন্ট করা এইরকম একটা শাড়ি কিনমু।
- ও এই কথা? ঐগুলান তো রেডিমেট পাওয়া যায় না। অর্ডার দিতে হয়।
- কোন কোম্পানী?
- থাক, ভাইবো না। তুমি যখন কইচো - আমি তোমার জন্য ধানের শীষ প্রিন্টঅলা ক’খান শাড়ী অর্ডার দিমু। তোমারে আমার ঈদ গিফট। ঈদের আগের দিন পৌঁছায়া দিমু। কাউরে কইও না বইন।
- ঠিক আছে, কাউরে কমু না। তয় আমি কইলাম তোমার জন্য ঈদে আমার রান্না করা সেমাই পাঠামু। ফিরাই বা না তো?
- আচ্ছা ফিরামু না।
- এইটাও কাউরে কইও না।
- আচ্ছা কমু না। কিন্তু বইন, আমি ভাবছিলাম অন্য কথা।
- ক্যান, কী হইছে?
- না মানে, ঐ যে শাড়ী কোম্পানিটা। ঐটা কুফা কোম্পানী। গতবার ইলেকশনের দিন ওদের বানানো শাড়ী পইরা কুফা লাগছিল। কী হারা হারলাম।
- ধুররো, কী যে কও। শাড়ী কী আর ভোট আনে? ভোট আনে উন্নয়ন। দেইখো, এইবারও আমাদের চারদল ক্ষমতায় আইবো।
- বেশি স্বপন দেইখোনা, পরে পস্তাইবা। নাজিম কামরানের রিপোর্ট পড়ছো?
- ঐসব হিসাব পাবলিক খাইবো না। আর আমি পস্তাইবো? হা হা... তোমার আরো কঠিন দিন আসতাছে। রেডি থাইকো।
- কী কইলা, আমার কঠিন দিন? আসলে তোমার কঠিন দিন আসতাছে।
- তোমার
- তোমার তোমার
- তোমার তোমার তোমার
- তোমার তোমার তোমার তোমার ...
(টেলিফোনে আবারো - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। ...অপারেটরের ঘোষণা - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের ফোন কানেকশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হলো। আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।)

Read more...

08 October, 2006

ভুল মিসটেকের ফাঁদে

কয়েকটা পোস্টের লিংক পাঠিয়েছিলাম। ভার্সিটির ক্লাসমেট অংকন মেইল করেছে - ’এতো ডিপ্রেসিং লেখা লিখিস না। মানুষের জীবনে তো কষ্টের শেষ নাই, আরো মন খারাপ করিয়ে দিয়ে কী লাভ?’
তাই এবার হাসার কিংবা হাসানোর - সাথে সাথে মন ভালো করার একটা ভুল চেষ্টা। সব প্রিন্ট মিসটেক আর টাইপিং এররে ভুলে ভুলে ভরা -



সংযমঃ
গত রমজানের কথা।
আমি দেশের বাইরে আসার পর প্রথম রমজান। ঈমাণী জোশে অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ ক’জন বন্ধু ই-গ্রিটিংস কার্ড পাঠালো। এক বন্ধু মেইল করলো - ড়থশথষ-প ংথলস শসয়স ঢ়ভসষবসশ ঢ়থনভসষথ রসড়স...
আমি রিপ্লাই করলাম - নাউজুবিল্লাহ!!!



ছাপাখানার ভূতঃ
১৯৯৭/৯৮ সালে দৈনিক ভোরের কাগজের ম্যাগাজিন ’অবসর’-এ পড়েছিলাম। একবার এক জায়গায় পুলিশ-জনগণ সংঘর্ষ হলো। তিনজন মারা গেলো। পরদিন একটি পত্রিকা নিউজ করলো - পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত। কিন্তু ছাপাখানার ভূতের কেরামতিতে পত্রিকায় ছাপা হলো - "পুলিশের গু-তে তিনজন নিহত"!
পরদিন বিশাল হৈচৈ। হাসাহাসি। প্রতিবাদ।
পত্রিকা কতৃপক্ষ ক্ষমা প্রার্থনা করলো। পরদিন সংশোধনী ছাপালো - এই ছাপাজনিত বিভ্রাটের কারণে আমরা দুঃখিত।
কিন্তু আবারো ছাপাখানার ভূতের কারসাজি। ’ছাপা’ উলটে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো - "এই পাছাজনিত বিভ্রাটের কারণে আমরা দুঃখিত" !!!



মিস য়ূøঃ
আমার এক দোস্ত একবার ইয়াহু চ্যাটরুমে একটা মেয়ের সাথে পরিচিত হলো। মেয়ে বাবা-মাসহ ক্যানাডায় থাকে। বিবিএ পড়ছে। দোস্ত বেশ ভালোই গল্প গুজব জমালো। অনেক কথা। ঐ মেয়ে নাকি সাংঘাতিক ইম্প্রেসড। বারবার বলছে - নেটে অনেকদিন পর ভদ্র কথা বলা কোন ছেলে দেখলাম, আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো, আমার ঢাকার বন্ধুদের খুব মিস করি, মাঝে মাঝে এরকম কথা হবে।
এসব শুনে আমার দোস্ত বিশাল পাংখা!
ঘন্টা দু’য়েকের চ্যাটিংয়ের শেষের দিকে - গুড বাই, গুড নাইট, টেক কেয়ার এর সাথে আমার দোস্ত লিখতে চাইলো - মিস য়ূø। কিন্তু অতি উতসাহে দ্রুত টাইপ করতে আঙুল ফসকে লিখলো - কিস য়ূø!!! টাইপিং এরর।
এরপর ঐ মেয়ের ঝাড়ি কে দেখে - ’ছিঃ ছিঃ আপনি শেষে এসে এরকম একটা বাজে কথা বললেন? আই ক্যান্ট ইমাজিন! য়ূø অল বয়েজ আর সেইম... কালপ্রিট..."
আমার দোস্ত ’প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড...’ লিখার আগেই ঐ মেয়ে লগ আউট।
টাইপিং এররে অনলাইন বিচ্ছেদ।



আবারো ছাপাখানার ভূতঃ
এ ব্যাপারটা প্রতি বছর ঘটে। কোরবানীর সবচে দামী গরুর ছবি ছাপা হয় পত্রিকায়, সাথে সাথে যিনি গরুটি কিনেছেন তারও হাস্যোজ্জ্বল ছবি ছাপা হয় পাশাপাশি।
একবার জনৈক ইদি্রস আলী ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে গাবতলী গরুর হাটের সবচে’ দামী গরুটি কিনলো । সাংবাদিকরা তার বাসায় ভীড় করলো। গরুর ছবি তুললো, গরুর ক্রেতার ছবিও। পরদিন পত্রিকায় দুজনেরই ছবি ছাপা হলো। কিন্তু ছবির ক্যাপশন উলটা-পালটা হয়ে গেলো।
ইদি্রস আলীর ছবির নিচে ছাপা হলো - এই গরুটির দাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর গরুর ছবির নিচে ছাপা হলো - পাশের গরুটিকে কিনেছেন এই ভদ্রলোক, নাম - জনাব ইদি্রস আলী !!!
.........
টাইপিং এররে একবার আমার মান-ইজ্জত পুরা ডুবতে বসেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি! ...ব্যাপারটির বিবরণ ডিসেন্সীর লাইন ক্রস করবে বলে এখন শেয়ার করতে পারছি না! সুযোগ পেলে অন্য কোনদিন...

Read more...

02 October, 2006

স্বপ্নের জল

বড় মামা এসে হুটহাট করে সব আয়োজন করলেন। বাবা-মা রাজী। ছেলে নৌ-বাহিনীর অফিসার, ফ্যামিলিও ভালো। বিয়ের পর বৌসহ গভর্মেন্ট কোয়ার্টারে থাকবে। বড় মামার পকেট থেকে সুদর্শনের ছবি বাবা-মা’র হাত ঘুরে নীলুর কাছে আসে। এক পলকের ঝলকানি!
মাঝে মাঝে বুঝি স্বপ্নেরা এমন করে ধরা দেয়। কৈশোরের এলোমেলো ভাবনার গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলো সত্যি হয়ে যায়। তখন নীলুর কেবল নিজেকে নিজের মাঝে লুকাতে ইচ্ছে করে আর কলেজ পেরুনো মনে উথাল পাথাল শিহরণ জাগে। ... সে-ই যে কবে বাসায় পুরনো ম্যাগাজিনের পেছনে নেভী সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেখে মোহ লেগে যায়। কল্পনায় স্বপ্নের বুননগুলো রঙিন হয়ে উঠে। জাহাজের ডেকে দাড়ানো লম্বা সুদর্শন - সাদা পোশাক - মাথায় হ্যাট। পাশে আকাশী শাড়ী পরে নীলু দাড়ানো। শিরশির বাতাসে শাড়ীর আঁচল উড়ে যায়। তারপর...। নীলু জানে না - তারপর কি! দৃশ্যটা কেন জানি এখানেই থেমে যেতো, আবার শুরু হতো প্রথম থেকে - পড়ন্ত বিকেলে জাহাজের ডেক, পাশাপাশি দু’জন, বাতাসের শব্দে ভালোলাগার নীরবতা...।


বিয়ের পর মোহিত বেশ ক’বার নীলুকে নিয়ে সমুদে্র গিয়েছে। স্পীড বোটের তুমুল গতিতে সাদা সাদা ফেনারাশিতে অদ্ভুত ভালো লাগা। মলির জন্মের পর আর সমুদ্র বিহারে যাওয়া হয়নি। প্রমোশন পেয়ে মোহিতেরও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। দিন-সপ্তাহ পেরিয়ে মাসের পর মাস সমুদে্র। ল্যান্ডে ফিরে এলে শুধুই বিরহ যাতনার অবিরাম ফিসফাস...।


...তারপর আচমকা ২৯ এপ্রিল, ১৯৯১। প্রকৃতির বৈরিতার সাথে তিনদিন লড়াই করে মলিকে কোলে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মোহিতের খবর কেউ জানে না, জানা যায়নি আরো অনেকের খবর। অনেকেই আর ফিরেনি, মোহিতও ফিরেনি!
এতদিন পর মাঝে মাঝে নীলুর মনে হয় - কৈশোরের ভাবনাটা হয়তো এই নিষ্ঠুর পরিণামের জন্যই একটা জায়গায় এসে আঁটকে যেতো...। ঈশ্বর কেন এমন খেলা খেলে! খবরটা গতকাল টিভি নিউজে একটু করে শুনেছে নীলু। আজ সকাল থেকে পত্রিকার একটা পাতা চোখের সামনে নিয়ে বসে আছে। বারবার পড়ছে আর চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে -
"আকস্মিক ঝড়ে উপকূল লন্ডভন্ডঃ পাঁচ হাজার জেলেসহ তিনশ’ ট্রলার নিখোঁজ, ২৭ লাশ উদ্ধার, ফ্রিগেট নিমজ্জিত, ক্যাপ্টেন ফিরোজ কবীরের খোঁজ মেলেনি"।

নীলু টের পায় না কখন মলি কলেজ থেকে ফিরে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক ঝাপটায় মায়ের হাত থেকে পেপারটা নিয়ে দূরে ছুড়ে দেয় - ’এইসব মন খারাপের খবর না পড়লে তোমার দিন কাটে না, চলো - খেতে চলো’।
নীলু ভেজা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
...আরো একজন মোহিত ফিরলো না!

Read more...

24 September, 2006

সম্প্রীতির সন্দেশ

ডিসি অফিসে বছরের এই সময়ে এরকম একটা মিটিং হয়। মকসুদআলী আর শাহাবুদ্দির পাশাপাশি নারায়ণ নাথ-কেও বসতে হয়। এবারো অমনটা হলো।

ডিসি খায়রুজ্জামান কিছুটা তৃপ্তির হাসি হাসেন
- বুঝলেন নারাণবাবু, ঘটনা তেমন কিছু না। গত ক’বছর ধরে এমনটা হচ্ছে। রোজা-পূজা একসাথে। এবারো উপরের অর্ডার আসছে - সেহরী, তারাবীর নামাজ আর ইফতারের সময় বাদ্য-বাজনা-মাইক বাজানো যাবে না।
-জ্বী স্যার, বুঝতে পারছি। নারাণ সম্মতি দেয়।
পাশ থেকে মকসুদআলী চোখ ঘুরিয়ে বলে - কেবল আপনি বুঝলে তো হইবো না বাবু, পোলাপাইনেরেও বুঝাই কইয়েন। শয়তান কিছু আছে - তারাবীর জামাতের সময় মসজিদের পাশে গিয়া পটকা ফুটায়।
- ওসব কিন্তু মুসলমানের পোলাপাইনও করে। নারাণ জবাব দেয়।
শাহাবুদ্দি কম যায় না - আমি কইলাম ধরতে পারলে এইবার খতনা করাই ছাড়বো। গতবার হারাণের পোলারে ধরছিলাম না!
নারাণ আমতা আমতা করে - সাথে কিন্তু আপনের ভাগিনাও ছিল।

ডিসি এবার থামায় সবাইকে।
- দেখেন আপনারা হইলেন এলাকার গণ্যমান্য লোক। আপনারা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, উতসবগুলো সমস্যা ছাড়া কেটে যাক। সামনে ইলেকশন আছে। এ সময় ঝামেলা যত কম হবে, তত ভালো।
- আমরা তো সবসময় শান্তিই চাই। কেবল এই পূজার কয়েকটা দিন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহায়তা দরকার। কিছু পোলাপাইন এবারো সমস্যা করতে পারে।
শাহাবুদ্দি গলা খাকারি দেয় - নারাণবাবু, আপনেরা সহজ বিষয়টা জটিল করে ফেলেন। পোলাপাইন চা-নাস্তার জন্য কিছু চাইলে দিয়া দিয়েন...
-ঐটা তো প্রতি বছর দিই।
- তাইলে আর চিন্তা কইরেন না, আমরা তো আছি। কোন গন্ডগোল হইবো না। খালি ঢোল বাজনাটা একটু হিসাব কইরা কইরেন। মকসুদমিয়া সাহস দেয়।

নারাণবাবু এবার হাত কচলায় - আরেকটা কথা ছিল, ডিসি স্যার।
বলেন নারাণবাবু, বলেন।
- সেহরীর সময় তো মাইকে হুজুরেরা ডাকে। মোটামুটি সবার ঘরে অ্যালার্মঅলা ঘড়িও আছে। এরপরও কিছু ছেলেপেলে গেইটে এসে পিটাপিটি করে। ওরা তো জানে -এইটা হিন্দু বাড়ী । এরপরও পিটাপিটি না করলে হয় না? বাড়ীতে অসুস্থ বুড়া মানুষজন আছে। বাচ্চাকাচ্চা আছে...
মকসুদমিয়া চেয়ার নেড়ে বসে - এর লাইগা কয়, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। সামান্য ক’টা রাত - কী এমন ডিস্টার্ব হয়? একটু সহ্য করবার পারেন না?
শাহাবুদ্দি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে - পোলাপাইনরে ক্ষেপায়ে লাভ আছে? ক’টা দিন সহ্য করে যান। আপনেরা ভালো থাকেন। আমরাও ভালো থাকি।

...ভালো থাকাটা খুব দরকার।
ডিসি সাহেব সবাইকে চা-সিঙ্গাড়া খাইয়ে মিটিং শেষ করেন।

পরদিন সংবাদপত্রেঃ
... গতকাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সাথে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আসন্ন রোজা ও পূজা শান্তিপূর্নভাবে পালনের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়...।

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৬

Read more...

20 September, 2006

মিলিটারি ক্যু

রাত সাড়ে বারোটায় ছোট ভাইয়ার ফোন কল।- কেমন আছো তুমি?- হুমম... কে ভাইয়া? ভালো আছি... (তখনো 90% ঘুমভাব)- কোন সমস্যা হচ্ছে?- না তো, কোন সমস্যা নাই!- মিলিটারী গন্ডগোল তোমাদের ওদিকে আছে?- ওগুলো মূলত: সাউথ থাইল্যান্ডের দিকে। সারা বছর টুকটাক ওরকম হয়... (এগুলো আমার মুখস্ত কথা, সবাই জিজ্ঞেস করে, আমি একই কথা বলি)- না! আজকে যে মিলিটারি ক্যু হইলো, তার কথা বলছি। এবার আমি চোখ কচলাই।
- তাই নাকি?
- হঁ্যা, বিবিসি নিউজ দেখো...
তারপর সামান্য আলাপের পর আমাদের কথোপকথন শেষ হয়।

বিবিসি নিউজে দেখি - ব্রেকিং নিউজ - থাইল্যান্ডে ক্যু - সংবিধান বাতিল - মিলিটারি সব দখল করে নিয়েছে - প্রধান মন্ত্রী থাকসিন জাতিসংঘের সম্মেলনে নিউ ইয়র্কে আছে - ওখান থেকে তিনি ঘোষনা করেছেন, তিনি এখনো প্রধান মন্ত্রী। বিবিসি-র ব্যাংকক রিপোর্টার জোনাথনকে দেখলাম মাথায় ছাতা দিয়ে লাইভ রিপোর্ট দিচ্ছে। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি। থাই চ্যানেলগুলোয় দেশাত্ববোধক গান চলছে।সকালে অফিসে আসলাম। গুটি কয়েক কলিগ টেলিভিশনের সামনে খবর দেখছে। আর সামান্য ক'জন নিউজপেপার পড়ছে। আমি এর সাথে কথা বলি, ওর সাথে কথা বলি, কেউ কিছু বলতে পারে না। যারা পারে - তাদের আইডিয়াও খুব লিমিটেড। ব্যাংককে গন্ডগোল হয়েছে। ব্যাস... এর বেশী কিছু নয়। আমার অবাক লাগে। দেশে এত বড় ঘটনা ঘটছে - কারো কোন বিকার নেই, প্রতিক্রিয়া নেই। শেষে কথা বললাম - ফিলিপিনো কলিগ নেইলের সাথে। ও বললো - থাইল্যান্ডে মিলিটারি "কুপ" (!) নতুন কিছু নয়। সাধারণ জনজীবনে এর কোন প্রভাব পড়বে না, কেবল প্রশাসনিক লেভেলে পরিবর্তন আসবে।
এরপর বাংলাদেশ থেকে ঘনঘন কয়েকটা ফোন কল পাই। উদ্্বিগ্ন নিকটজনরা পরিস্থিতি জানতে চায়। আমি তখন কাদির কল্লোল কিং বা ওয়ালিউর রহমান মিরাজ-- হঁ্যা। ক্যু হয়েছে। ব্যাংককের পরিস্থিতি কিছুটা আশংকাজনক। কি হচ্ছে তা এখনো ঠিকমতো বলা যাচ্ছে না। বিদ্্রোহী মিলিটারী গ্রুপ বলছে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে থাকসিন এখনো তার কর্তৃত্ব প্রকাশ করছে। খবরে দেখলাম ব্যাংককের বড় রাস্তাগুলোয় মিলিটারী পাহারা আছে। সরকারী অফিসগুলো আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।- সাধারণ জনজীবনের কী অবস্থা?- ব্যাংককের কথা ঠিক বলতে পারছি না। তবে পাতায়ায় সবকিছু স্বাভাবিক। প্রাইভেট অফিসগুলো খোলা আছে। তেমন কোন শংকা দেখা যাচ্ছে না।- মানুষের প্রতিক্রিয়া কি?- তেমন রাজনীতি সচেতন কারো সাথে এখনো কথা হয়নি। তবে আজকের প্রধান সংবাদপত্রগুলোর হেডিং -এ কেবল একটি শব্দ - "ক্যু"। ওখানে পাবলিক রিঅ্যাকশন কলামে দেখা যাচ্ছে অনেকেই খুশি। থাকসিনের কথিত দূর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক মানুষ ক্ষুব্ধ!- তাহলে এ মিলিটারী শাসন কি সাসটেইন করবে?- এটা এখনো ঠিক বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী থাকসিন এখন নিউ ইয়র্কে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকসিনের জন্য প্লাস পয়েন্ট। দেশের বাইরে থাকায় থাকসিন বিশ্ব জনমত আদায়ের সুযোগ পেয়ে গেল। সুতরাং পুরো ব্যাপারটা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বলয়ে আঁটকে গেলো।- দোআ করি - ভালো থাকো।

সুপত ও হামিদের গল্প:
এখানে আমি যে লজে থাকি, সেখানে একজন গার্ড আছে, নাম সুপত। ছোটখাটো মানুষ। ইংরেজী যতটুকু পারে - তাতে করে আমার অনেকগুলো অবসর সময় ওর সাথে আলাপী আড্ডায় চলে যায়। সে এখন বাংলা 1 থেকে 10 পর্যন্ত গুনতে পারে। সালাম, খোদা হাফেজ, ভালো আছি - বলতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে সুখী মনে করে সে। কাজ শেষে নিজের মোটরবাইকের পেছনে বৌ-কে বসিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চাটা স্কুলে পড়ে। সুপতের ইচ্ছা - ওর বাচ্চা ভালো ইংরেজী বলবে। তাই এখন থেকে ইংরেজী ওয়ার্ড বুক কিনে দেয়। ছুটির দিনে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। কারাওকে-তে গান করে। এ.টি. এম কার্ড ইউজ করে। মোবাইলে এম.পি. থ্রি-তে গান শুনে। রাজনীতি কিংবা সমাজ নিয়ে তার কোন ভাবনা নেই। মিলিটারি কূ্য হলে তার কি এসে যায়? বেশ তো, চলছে যেমন চলুক না!
সুপতকে দেখে আমাদের ঢাকার বাসার গার্ড হামিদের কথা মনে পড়ে। দেশ বিদেশের সব খবর হামিদের জানা। ইরাকে কয়জন মারা গেল, আফগানিস্তানে কয়টা হামলা হলো, গায়ক আসিফ বিএনপি থেকে নমিনেশন চাইতে পারে, সৌরভ গাংগুলী কবে দলে ফিরবে কিংবা পূর্ণিমা-রিয়াজের মাঝে বিয়ে হবে কিনা - সব ব্যাপারে সে আপডেটেড। প্রায়ই সন্ধ্যায় আমি বাসায় ফিরতেই সে খবর দিতো - ভাইয়্যা, কালকে আবার হরতাল দিসে। বাজার থেকে এসে বলতো - বাজারে আগুন, দাম কমার কোন লক্ষণ নাই! সব নাকি সিন্ডিকেট। তেল খাওয়া বাদ দিতে হইবো।সুপতের কাছে যেগুলো জীবনের বেসিক চাহিদা, হামিদের কাছে ওগুলো স্বপ্ন। দেশ বিদেশের খবর রেখে এত্তো কিছু জেনে - কি হবে হামিদ? ভোট দিয়ে সরকার পালটাবা, হৈ চৈ করবা - কিন্তু তুমি কি কখনো এ.টি.এম কার্ডে টাকা তুলে মোবাইল হেডসেট লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে বৌ-বাচ্চা নিয়ে ভালো একটা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবা!

Read more...

18 September, 2006

বস্ত্রবালিকা ও অন্যান্য

রবিউল যখন খবরটা দিলো তখনো বিশ্বাস হয়নি। ফালানির মা ভুরু কুঁচকে বলেছিল - ধুররো মফিজ, তোর মাথা খারাপ হই গেছে? কিন্তু গতকাল ফ্যাক্টরিতে সবাই যখন বিষয়টা আলাপ করছিল তখন বিশ্বাস জন্মায় আস্তে আস্তে। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, কাটিং মাস্টার জুলফিকার শার্টের পকেট থেকে খবরের কাগজটা বের করে যখন জোরে জোরে পড়ে শোনায় আশেপাশের চোখগুলো তখন জ্বলজ্বল করে উঠে। কেউ একজন বলে উঠে - আরে বুঝোনা, এগুলান হইলো ভোটের কেরামতি। সাথের জন গলা খাকারি দেয় - ভোট হউক, যা-ই হোক মিয়ারা; বেতন বাড়বো - ঐটাই বড় কথা। জুলফিকার এবার আওয়াজ দেয় - ওই থাম তোরা। এই বাড়ায় লাভ আছে? জিনিসপত্রের যে-ই দাম, সংসার চলে? তিন হাজার না করলে আবার আগুন জ্বলবো কইলাম, রেডি থাইকো সবাই। দূরে দাড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলো ফালানির মা।


সেদিন বিকাল থেকে ফালানির মা মনে মনে কী যেন একটা হিসাব করে। ঠিক একটা হিসাব না, অনেকগুলো হিসাব এসে আশেপাশে ঘর-বসতি করে। তবে মাঝে মাঝে সন্দেহও জাগে। হঠাত কী এমন হইলো যে নয়শো তিরিশ থেকে ষোলশ’ চার টাকা হইবো? ক’দিন আগে যে গন্ডগোল হইছে তার বদলে বড় জোর হাজার-বারোশ’ হইতে পারতো। কিন্তু ষোলশ’ চার টাকার ব্যাপারটা খটকা লাগে। চার টাকা আবার কোন হিসাব? রবিউল অবশ্য এই কথাও বলছিল যে - এইটা একুশ শ’ সতের টাকা পঁঞ্চাশ পয়সা হইবো দুই বছর পর। আবারো সতের টাকা পঁঞ্চাশ পয়সার পঁ্যাচ!


এ সব পঁ্যাচ-গোচ পেরিয়ে ফালানির মা কি জানি কি ভাবে আর গোপনে মনের ভেতর একটা সুখের স্বপন জাগে। ফালানিও এমকে অ্যাপারালসে কাজ করে। দুইজনের যদি মোট চৌদ্দশ’ও বাড়ে - কম কি? ফালানির বাপের হাঁফানির অসুদটা এইবার রেগুলার কেনা যাবে, মাসে একদিন ভালো মন্দ খাওয়া যাবে, খোলা তেলের বদলে টিভি-তে দেখায় ওরকম একটা সুগন্ধি তেলের বোতল কেনা যেতে পারে, ফেয়ার এন্ড লাভলি ইন্ডিয়ানটার দাম বাংলাদেশীটার চেয়ে দশ টাকা বেশি - এইবার ফালানি ইন্ডিয়ানটাই কিনুক ! আহারে, এই বয়সের মেয়েদের কত শখ থাকে! ফালানির বিয়ের জন্য মাসপ্রতি শ’দুয়েক করে টাকা জমানোও দরকার। ছোট বাচ্চা দুইটারে শাহ আলী মার্কেট থেকে দুইটা ভালো হাফ প্যান্ট কিনে দিতে হবে। ওদের ন্যাংটা থাকার দিন বোধ হয় ফুরালো। ... এসব ভাবতে ভাবতে মুখটা শুকিয়ে যায়। বেতন বাড়লে হাকিমপুরী জর্দাটা মনে হয় সব সময় কেনা যাবে।


পাড়ার মোড়ের দোকানে পান কিনতে গিয়ে রইসুদ্দি-র কথা শুনে ফালানির মা চমকে যায়।
- হ চাচী, খবর পাইছি আমরা। আর কি কও? তোমাগো অহন সুদিন। সরকার তো বেতন বাড়াই দিলো।
- কী কস রইসু? এখনো বাড়ায় নাই। ঐসব খবর বাতাসের কানাকানি।
- না চাচী, ডরাইও না। মিষ্টি খাইবার চামু না। তয় - এইবার কইলাম আর বাকী দিবার পারুম না।
পান মুখে দিয়ে আঙুলের আগায় লাগানো চুনটা দাঁতে লাগিয়ে যখন ঘরে ফিরছিল তখন দেখা বাড়িঅলা আকবর মহাজনের সাথে। ফালানির মাকে দেখে এগিয়ে আসে।
- দেখা হয়ে ভালোই হইলো, শুনো - তিন বছর ভাড়া বাড়াই নাই। শুনলাম তোমাগো বেতন বাড়ছে, সামনের মাস থেইক্যা তিনশ টাকা বাড়াই দিবা।
- ম’জন, বেতন তো এখনো বাড়ে নাই। খালি পেপারে কি জানি লিখছে...
- আরে পেপার না, আইজকা টেলিভিশনেও খবরে শুনলাম। ...যাউক, আর কথা বাড়াইও না। আগামী মাস-থন তিনশ টাকা বেশি দিবা...।


পরদিন সকালে বড় স্যারদের সাথে গার্মেন্টসের জমিদার স্যাররা আসে। কাজ থামিয়ে সবাইকে জমায়েত করে। এক স্যার পাঞ্জাবীর হাতাটা গুটিয়ে জুলফিকারের মাথায় হাত রাখে
- আমরা হইলাম ছোট ফ্যাক্টরীর মানুষ। তোমরা জানো আমরা সাব-কনট্রাক্টে কাজ করি। কারেন্ট না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রডাকশন বন্ধ থাকে। হরতালের কারণে অর্ডার ক্যানসেল হইলে লাখ লাখ টাকা লস যায়। ...আমি তোমাদের সব সময় আমার ঘরের মানুষের মতো করে দেখেছি। সুখে দুঃখে তোমরা আমাদের সাথে ছিলা, আমিও ছিলাম। আগামীতেও থাকার চেষ্টা করবো। ক’দিন আগে বেতন বাড়ানোর একটা গুজব বাইর হইছে। আমার বিশ্বাস - তোমরা কেউ ঐসবে কান দিবা না। আমি কথা দিলাম - এখন থেকে প্রতি মাসে টাইমলি বেতন পাইবা সবাই। আর ঈদের বোনাসও কইলাম, খোদার কসম, ঈদের এক সপ্তাহ আগে দিয়া দিমু। এখন সবাই কাজে যাও। ...সব কাজকর্ম ঠিক মতো চলবো।


দ্রুত গতিতে বোতাম সেলাই করতে গিয়ে বারবার মন ছুটে যায় ফালানির মার। এই নিয়ে তিনবার আঙুলে সুঁচ লাগলো। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠে - দেইখো, দেইখো - আল্লার গজব পড়বো...।


১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৬

Read more...

12 September, 2006

এই মানুষ, সেই মানুষ

নয় বছরের বিদেশ পর্ব শেষে খন্দকার আনিসুল ইসলাম আনিস যখন ঢাকা বিমান বন্দরে নামে তখন বিকাল প্রায় শেষ শেষ। আকাশে সূর্যের দেখা নেই। কালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে ঢাকার আকাশে। সেদিন শ্রাবণ মাসের আঠারো তারিখ। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মরূজীবনের শুষ্কতা ছাড়িয়ে আনিস একটু একটু করে কিশোর দিনের ঘ্রাণ নিচ্ছিল নাকে-মুখে-বুকে।

বিমান বন্দরে বড় ভাই, বড় ভাইয়ের ছোট শালা আর শালার বন্ধুরা সবাই স্বাগত জানায় খন্দকার আনিসুল ইসলাম আনিসকে। বড় বড় লাগেজ-ব্যাগ নিয়ে মাইক্রোবাস যখন ঢাকা ছেড়ে মফস্বলের দিকে চলে তখন আনিসের হাল্কা ঘুম পায়। বড় ভাইয়ের নানান প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আনিস আধো ঘুমে আধো জাগরণে গড়িয়ে পড়ে। নয় বছর, আহ! নয় বছর যেন ধুম করে চলে গেল আনিসের জীবন থেকে। আনিস তখন মায়ের কথা ভাবে। কেমন আছে মা, দেখতে কেমন হয়েছে! মায়ের শেষ চিঠিটা আনিস কতবার পড়েছে হিসেব নেই। চিঠির প্রতিটি শব্দ-প্রতিটি লাইন মুখস্ত হয়ে গেছে –

বাবা আনিস,
আমার অন্তরের অন্ত:স্থল হইতে দোয়া ও ভালবাসা নিও। অদ্য নয় সন হইতে চলিল তুমি বিদেশ যাপন করিতেছ। আশা করিতেছি খোদার ফজলে কুশলে আছ। তোমার পাঠানো টাকা, চিঠি, তেল-সাবান, জায়নামাজ-তজবী, টেপ রেকর্ডার পাইতেছি নিয়মিত। তোমার পাঠানো টাকায় আল্লার রহমতে তোমার দুই বোনের বিবাহ দিয়াছি। তাহারা সুখে সংসার করিতেছে। বড় মিয়াদের সহিত আমারও দিনকাল ভালো কাটিতেছে। তবুও বুকটা জ্বলিয়া পুড়িয়া যায়। তোমাকে বিবাহ করাইয়া- এই সংসার গুছাইয়া দিয়া পরকালে যাইবার বন্দোবস্ত করিতে চাই। মুন্সী বাড়ির মেজ ছেলে হায়দার দুই বছর অন্তর: বাড়ী আসে। তাহার মুখে শুনিলাম - তুমি এই বছর বাড়ী আসিতে পার। ইহা শুনিয়া আমার আর আনন্দের সীমা নাই। বড় ভাইজানও তাড়া দিতেছেন। সিলভিয়া এইবার ডিগ্রি পরীক্ষা দিবে। ভাইজানরা আর অপেক্ষা করিতে রাজী না। অতি শীঘ্রই বাড়ী আস। তোমার পথ চাহিয়া রইলাম।
ইতি - তোমার দুঃখীনি মা, আয়েশা খাতুন।


আনিস মনে মনে ভাবে - মাকে আর দুঃখ দিবে না। বড় মামার মেয়ে সিলভিয়া বেগমকে বিয়ে করে সংসারী হবে। নয় বছরে সিলভিয়াও নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে। আনিসের বুকটা এবার ধুকধুক করে। মনের ভেতর - মাথার ভেতর একটা নাম কেবল ঘুরপাক খায় - সিলভিয়া সিলভিয়া সিলভিয়া। মাইক্রো বাসের ক্যাসেট প্লেয়ারে হিন্দি গান বাজছে - হাম তুমারি হ্যায় তুমারি সনম হ্যয়...ম্যায়নে তুমসে প্যায়ার হে...। গানের কথাগুলো মুছে গিয়ে সুরের সাথে সিলভিয়া নামটি মিলে যায় আর বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়ায়।গাড়ী ছুটছে খাল-বিল পেরিয়ে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। মানুষ হাট থেকে ঘরে ফিরছে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোয় মিটিমিটি সাঁঝবাতি জ্বলছে।

দুই.
মাঝরাতে বাড়ী ফিরে পাড়া প্রতিবেশীর সাক্ষাত, সালাম আদাব শেষে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে যায়। তবুও সকালে আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে আনিস অভ্যাস মতো মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। জামায়াতে নামাজ শেষে গ্রামের মুরুবি্বদের সাথে দেখা হয় - মোলাকাত হয়। এত বড় গ্রামে ফজরের নামাজে মাত্র পনের-বিশজন মুসল্লি দেখে আনিস অবাক হয়। মুসল্লিদের সবাই প্রায় বৃদ্ধ। কিশোর-যুবক কিংবা আনিসের বয়সী কেউ নেই। অথচ সৌদি আরবে জোয়ান মানুষদের ধাক্কায় বৃদ্ধরা সামনে জায়গাই পেতো না। এরকম আরো নানান ভাবনা বুকে নিয়ে আনিস হেঁটে চলে রাণীরদিঘির বাম পাশ দিয়ে। সকালের শীতল বাতাস তার লম্বা পাঞ্জাবী-মাথার পাগড়ি উড়িয়ে নিতে চায়। পঞ্চশীলা গ্রামে চলতে চলতে আরো অনেকের সাথে দেখা হয় - আলাপ হয়।পরের দিনগুলোয় তেরো-চৌদ্দ পদের মাছ-তরকারী, পিঠা পায়েশ খেয়ে আনিস হাঁফিয়ে উঠে। বড় খালা-মেজ খালা-ছোট খালা-বড় মামা-ছোট মামা-দুই বোনের শ্বশুরবাড়ি-বড় ভাবীর বাবার বাড়ী - সব জায়গায় ঘুরে, দাওয়াত খেয়ে - উপহার দিয়ে পনের বিশ দিন কেটে যায়। কেবল সিলভিয়া বেগমের দেখা মিলে না। স্বভাবসুলভ লজ্জায় আনিসও ঐ বাড়ীর দিকে পা বাড়ায় না।

শ্রাবণ মাস শেষ হলেও বৃষ্টি থামেনি। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা ঝমঝম বৃষ্টি। ঘরে শুয়ে গান শোনা আর ঘুমানো ছাড়া কিছু করার নেই। একদিন টিনের চালে ঝমঝম শব্দের মাঝে হঠাৎ দরজার পর্দার আড়ালেও যেন রিমঝিম শব্দ হয়।-আছেন কেমন, কি করেন?এ শব্দ যেন পুরো বৃষ্টির শব্দকে ম্লান করে দেয়। ঘরে যেন আরো অনেকগুলো চুড়ি ভেঙে ভেঙে যায়। রিমঝিম - রুমঝুম - রিনিঝিনি। এরকম আরো অনেক শব্দ। খাট থেকে নেমে দাড়িয়ে আনিস কি বলবে ভেবে পায় না।
"আনিস, তোমার ঘরে সিলভিয়া গেল" - পাশের রুম থেকে বড় ভাবীর আওয়াজ।কলাপাতা রঙের সালোয়ার কামিজে হাল্কা লিকলিকে শরীর। বেনী করা চুল। কপালে সবুজ টিপ। লিপিস্টিক নেই। সিলভিয়া! সৌদি জীবনের প্রথম দিকে কোম্পানীর মালিকের বোন সেহারিনাকে দেখে মনে হয়েছিল - এই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। অথচ আজ এই মুহূর্তে আনিসের মনে হয় - সিলভিয়ার কাছে ঐ সেহারিনা কিচ্ছু না। তবে সিলভিয়া মাথায় ঘোমটা দিলে আরো ভালো লাগতো।- কথার জবাব দেন না কেন? বিদেশে থাইকা কি ভদ্রতাও ভুইলা গেছেন?
সিলভিয়ার কাটাকাটা কথায় আনিস থতমত খায় - ভাল আছি, আমি ভাল আছি। তুমি কেমন আছ?- ভাল না থাকলে এই ঝড় বাদলার মধ্যে এইখানে ক্যামনে আসলাম?
আনিস আবারো ধাক্কা খায়। সিলভিয়ার চাতুর্য্যে কিছুটা মুগ্ধও হয়।- শুনেন, দিন নাই-রাত নাই, সব সময় এই লম্বা জোব্বা পরে থাকেন কেন?
- অসুবিধা কি? আনিস সাহস করে প্রশ্ন করে।
-অসুবিধা আছে। আমার ভালো লাগে না। আরবের জামা আরবে পরবেন, বাংলাদেশে না। বুঝতে পারছেন?
সিলভিয়া আর কথা বাড়ায় না। গটাগট চলে যায়। আনিসের মনটা কেমন উড়ুউড়ু হয়ে উঠে। লম্বা জোব্বা পরার ব্যাপারটা সিলভিয়া পছন্দ করছে না। সংসার শুরু করার আগে তার পছন্দ-অপছন্দ জানতে হবে। মেট্রিক ফেল হলেও -খুব বেশী উঁচু সমাজে না মিশলেও আনিস অন্তত: এতটুকু বুঝতে পারে - সংসার জীবনে পারষ্পরিক মিলমিশটা খুব দরকার।
তিন.
সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের সামান্য আলাপচারিতা আনিসের মনে সাহসের জোয়ার আনে। সিলভিয়াদের পুকুর ঘাটে "লাভ মী" কিংবা "আই অ্যাম ওকে, আর ইউ?" লেখা লাল-নীল গেঞ্জী পরে অপেক্ষা করে। চা-চানাচুরের পাশাপাশি সিলভিয়ার সাথে গল্প জমে। অথচ আনিস তার প্রিয় কথাগুলো বলতে পারে না, সিলভিয়ার কথাগুলোও জানা হয় না। আনিসের বাবা আর সিলভিয়ার মা বিয়ের আয়োজন শুরু করে। বৃষ্টির মওসুম শেষ হোক। পঁচিশে কার্তিক বিয়ে, পরদিন বৌ-ভাত।
পুকুর ঘাটের বিকেলগুলো যেন চোখের পলকে চলে যায়। আনিসের পরের সন্ধ্যাগুলোয় এক ধরনের একাকীত্ব পেয়ে বসে। এর চেয়েও বড় একটি ভাবনা আনিসকে বিষন্ন করে আজকাল। ইদানিং তার আছরের নামাজটা কাজা হয়ে যাচ্ছে। সিলভিয়া আনিসকে যেতে দেয় না, সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে বলে। আনিসের ভালো লাগে না। গত নয় বছর সৌদি আরবে সময়মতো নামাজ পড়ার যে অভ্যাস রপ্ত হয়েছে বাংলাদেশে এসে সিলভিয়ার জন্য তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আনিস ভেবে পায় না সিলভিয়া কেন নামাজ পড়ে না! মুসলমানের মেয়ে পরকালের চিন্তা ছাড়া কীভাবে চলে? গ্রামের মানুষগুলো থেকে কি আল্লাহ খোদা উঠে গেল? সিলভিয়াকে এত্তো করে বলার পরও মাথায় ঘোমটা দেয় না।
একদিন জোর করে বলায় সিলভিয়া ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল - আপনার হুজুর হুজুর ভাব নিয়া আপনি চলেন, আমি পারব না। হুজুরের সাথে হুজুরাইন সাজার ইচ্ছা আমার নাই।শুনে আনিসের খুব কষ্ট হয়, বলে - নামাজ পড়লে, ঘোমটা দিলে হুজুর হয়ে যায়? আল্লাহ খোদা না মাইনা তুমি ক্যামনে চলবা? তোমার মরণের ডর নাই?
এবার সিলভিয়া খিলখিল করে হাসে। হাসি আর থামতে চায় না। হাসির শব্দে বাতাস যেন উলটা দিকে বয়। পুকুরে ঢেউ উঠে। হাসি থামিয়ে সিলভিয়া বলে - আপনি দেখি মজিদের ছোট ভাই। হি:হি:হি: না, আপনি ছোট ভাই না... হি:হি: আপনি হি:হি: আপনি নিজেই মজিদ। হি:হি:হি:হি: - শুনেন মজিদ ভাই, আমার সাথে কথা বইলা আর কাম নাই। আজান দিছে, যান - মসজিদে গিয়া নামাজ পড়েন, আল্লাহ-বিল্লাহ করেন। বেগানা নারীর সাথে আড্ডা জমাইয়েন না। হি:হি:হি:হি:...আনিস কী বলবে ভেবে পায় না। মসজিদের দিকে হেঁটে চলে। পেছনের সিলভিয়া বেগমের খিলখিল হাসি। আনিস বুঝতে পারে - সিলভিয়া অনেক পড়ালেখা করা মেয়ে, অনেক কিছু জানে। কিন্তু এই মজিদ লোকটা কে? আনিস ছোটবেলার কথা ভাবে - গ্রামের মজিদ নামের কারো কথা মনে পড়ে না। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝেও মজিদ নামের কেউ নেই। মজিদ কি তবে সিনেমার কোন গুন্ডার নাম? নাকি সিলভিয়ার প্রেমিক! এ ভাবনার আনিস কোন দিশা খুঁজে পায় না।
অবশেষে রাতে সিলভিয়ার মোবাইলে ফোন করে- মজিদ লোকটা কে?আবার সিলভিয়ার হি:হি:হি:হি: হাসির শব্দ। কী করেন মজিদ ভাই? নামাজ শেষ হইছে? হি:হি: অজু করছিলেন নামাজের আগে? হি:হি:হি:

চার.
আনিসের স্কুল জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধু- বর্তমানে লোকাল কলেজের ইংরেজীর মাস্টার আব্দুল আহাদের কাছে মজিদের কথা বলার পর আনিস যা শোনে - তাতে তার রক্ত গরম হয়ে যায়, মাথায় খুন চাপে। খোদাভীতির কারণে আনিস নামাজ পড়ে। সিলভিয়াকেও তাই নামাজ পড়তে আর মাথায় ঘোমটা দিতে বলেছিল সে। কিন্তু আজ আহাদ লালসালু-র যে মজিদের কথা বললো - আনিস নিজেকে সেরকম ধর্মীয় লেবাশ সমৃদ্ধ নারী লোলুপ-লম্পট মনে করে না। আর আনিস দেখেছে - সৌদি আরবের পর্দানশীল মেয়েরা কত্তো সুখী। আল্লার রহমত তাদের নিত্যসংগী।
সিলভিয়া বেগমের এ অস্থির আচরণের সাথে আনিস নিজেকে মিলাতে পারে না। আনিস চেয়েছিল শান্ত-শিষ্ট-বাধ্যগত একটা বৌ। সংসারী একটা বৌ - যে বৌ ঘরে থাকবে, ভালো ভালো রান্না করবে, নিত্য নতুন সেলাই করবে, বাচ্চাকাচ্চা আর শ্বাশুড়ীর যত্ন নিবে। অথচ সিলভিয়া পুরোপুরি অন্যরকম। ডিগ্রি পাশের পর সে নাকি চাকরি করবে। গৃহস্ত বাড়ীর বৌ কেন চাকরি করবে - তার উত্তর আনিসের জানা নেই। আনিস উলটা পালটা অনেক কিছু ভাবে। সিলভিয়াকে ফোন করে না আর। সিলভিয়া ঘোষণা দেয় - সে আনিসকে বিয়ে করবে না। মেট্রিক ফেল - অশিক্ষিত - একগুঁয়ে - ব্যাকডেটেড আনিসের কোন যোগ্যতা নেই সিলভিয়াকে বিয়ে করার। আনিসও বেঁকে বসে। দুই পরিবারের মুরুবি্বরা এসব শুনে হাসে, বলে - পোলাপানের পাগলামি।

পাঁচ.
আশ্বিন মাস পেরিয়ে কার্তিকের শুরু। তখনো আনিস সিলভিয়ার মনোমালিণ্য কমেনি। দুই পরিবার বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। কার্ড ছাপিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দেয়া শুরু হয়েছে। আনিস মায়ের মুখে তাকিয়ে কিছু বলতে পারে না। ওদিকে ঘটনা ঘটায় সিলভিয়া। আনিসের সাথে জোর করে বিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে বিয়ের আগের মংগলবার বিষ খায় সে। হাসপাতালে নিয়ে অনেক কষ্টে বাঁচানো যায়। থানা পুলিশ নিয়ে সে এক ধুন্দমার কান্ড। সব আয়োজন ভেস্তে যায়। আনিস পরদিন ঢাকা রওনা দেয়। প্লেনের টিকিট রি-কনফার্ম করে। মা জিগ্গেস করে - আর কবে আসবি বাবা?

আনিস জবাব দিতে পারে না।প্লেন ছাড়ার পর মায়ের কথা খুব মনে পড়ে।প্লেনের ঝিঝি শব্দের মাঝে সিলভিয়ার চঞ্চল হাসিটা বারবার ফিরে আসে। আনিস চোখ মোছে।

Read more...

06 September, 2006

চোখ (অপকাব্য)

চোখের ভেতর বসত করে
লক্ষ হাজার রাগ
চোখের ভেতর সাত সমুদ্দর
চোখের নিচে দাগ।

চোখের নিচের কালিগুলো
অনেক আগের মরচে পড়া
কেউ বা ভাবেন শখের বশে
বেখেয়ালে সৃষ্টি করা।

অনেক কিছু দেখছি কিন্তু
চোখ দিয়ে চোখ যায় না দেখা
তাই বলে আর হচ্ছে নাকো
রূপ-চর্চার কাব্য শেখা।

কেউ কেউ হঠাৎ চমকে উঠে-
কালি কেন চোখের নিচে ?
সত্যি কথা শুনেও ভাবে
বলছি আমি নিছক মিছে!

ভাবছি এবার থাকবো জেগে
চোখ দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে
কালো চোখের স্বপ্নগুলো
ধরতে হবে হাত বাড়িয়ে।

Read more...

03 September, 2006

নাদিয়ার গান

সময়টা 1940 এর মাঝামাঝি। মিশরে তখন বৃটিশ লোকজন চুটিয়ে ব্যবসা করে নিচ্ছে। এরকমই একজন কটন ব্যবসায়ী হেনরী অস্টেন; স্ত্রী ক্যাথেরিন ও একমাত্র কিশোর সন্তান চার্লসকে নিয়ে আলেকজান্ডৃয়ায় রাজত্ব করে চলেছে। প্রভাব প্রতিপত্তি, বিশাল বাগান - ব্যবসা, রাজকীয় বাড়ী, চাকর-বাকরের কমতি নেই।কিশোর চার্লস ছোটবেলার খেলার সাথী কারিমা-র প্রেমে পড়ে যায়। অথচ সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারটি তারা দু'জনই বুঝতে পারে । হেনরির অফিসের গাড়ীর ড্রাইভার কারিমার বাবা মোস্তফা। কারিমাও চার্লসদের বাসায় ফুট-ফরমায়েশ খাটা মেয়ে, সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে যার অবস্থান। এরপরও পারষ্পরিক ভালো লাগা বেড়ে চলে।বছর খানেকের মধ্যে দ্্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামাদোল লেগে যায়। বাবা-মা'র ইচ্ছায় চার্লস অ্যামেরিকা চলে যায় পড়ালেখা করতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষাশেষি চার্লস ফিরে আসে মিশরে। কৈশোর উত্তীর্ণ যৌবনে চার্লস ও কারিমা পরষ্পরকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে। লোকচক্ষুর আড়ালে অবিরাম নিশি প্রণয় শেষে চার্লস তার বাবা-মা'র কাছে কারিমার কথা বলে। জগতের স্বাভাবিক নিয়মে হেনরী সন্তানের ইচ্ছার বিরূদ্ধে দাড়ায়। অস্থির আসহায় চার্লস মাতাল অবস্থায় গাড়ী চালাতে গিয়ে কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। শোক কাটিয়ে কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কারিমা নিজের ভেতর অনুভব করে আরেকজনের অস্তিত্ব, চার্লসের স্মৃতি, অনাগত প্রজন্ম!পারিবারিক নির্যাতন পেরিয়ে সামাজিক অবহেলার আগেই এগিয়ে আসে কারিমার ভাই ওমরের বন্ধু মুনির আহমেদ। স্ত্রী-কণ্যা হারানো নি:সঙ্গ মুনির সব জেনে শুনে কারিমাকে বিয়ে করে। কিছুমাস পর জন্ম নেয়া নাদিয়া-কে নিজের সন্তান বলে মেনে নেয়। অসাধারণ মানুষ মুনিরের সংসারে কারিমা সুখে থাকে - নাদিয়ার মাঝে চার্লসের ছোঁয়া খুঁজে পায়। হঠাৎ একদিন মুনিরের বন্ধু, মিউজিক ব্যবসার সাথে জড়িত, স্পিরস কারিমার টুকটাক গান গাওয়ার ব্যাপারটি জেনে যায়। তারপর ঘটনাক্রমে কারিমা হয়ে উঠে মিশরের আলোচিত সঙ্গীত শিল্পী, নাইটিংগেল, কারাওয়ান। মিশরের এক নম্বর শিল্পী উম্মে-কাথলুম- এর পর কারিমা মানুষের মন জয় করে নেয়। একটানা কনসাটে কনসার্টে কারিমার তখন জয় জয়কার অবস্থা।1952 সালের 26 জানুয়ারীর ঐতিহাসিক "ব্ল্যাক স্যাটার ডে" হামলায় কনসার্ট চলাকালীন সময়ে মানুষের হুড়োহুড়িতে নাদিয়া হারিয়ে যায়। নাদিয়াকে খুঁজে পায় সন্তানহীন দম্পতি মিশরীয় তারিক মিস্ত্রী ও ফরাসী সিলন। তারপর নাদিয়া বড় হতে থাকে ফ্রান্সে, অন্য পরিবেশে, অন্য নামে; গ্যাবি মিস্ত্রী।ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে যায় নিয়ম মতো। সন্তান হারিয়ে কারিমা-মুনিরের বিষন্ন জীবন এগিয়ে চলে। মৃত্যূর আগে মুনিরের শেষ ইচ্ছা মতো কারিমা গান গেয়ে যায়। পুরা আরব দুনিয়ার আলোচিত শিল্পী হয়ে উঠে। গানে গানে প্রকাশ পায় বুকের ভেতর জমে থাকা নাদিয়ার জন্য হাহাকার - "কোথায় গেলি খুকু তুই?তোকে ছাড়া ভীষণ একাকী আমি - চোখ বুঁজলেই তোকে দেখি,কোন গোলাপ সুরভী দেবে না - কোন বাতি আলো দেবে না আমার ঘরেযতদিন তুই দূরে দূরে..."আরো কিছু বছর পর সিলনের মৃত্যূর পর নাটকীয় ভাবে তারিক আবিষ্কার করে গ্যাবির (নাদিয়া) আসল পরিচয়। গ্যাবি ততদিনে নামকরা সাংবাদিক। অবশেষে মায়ের কোলে মেয়ে ফিরে আসে। কাহিনী আরো কিছুটা আগায়। কারিমার অস্বাভাবিক মৃত্যূ, নাদিয়া কিডন্যাপ হওয়া-সহ পর্যায়ক্রমে ধরা পড়ে কারিমার ভাই ওমর। পাপের পতন পূণ্যের জয় হয়। "নাদিয়া'স সং" মিশরীয় লেখিকা সোহেইর খাসোগ্যি-র তৃতীয় উপন্যাস, প্রকাশিত হয়েছিল 1999 সালে। 1995 সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস "মিরাজ" বাজারমাত করেছিল বেস্ট সেলার হয়ে। মাঝে প্রকাশিত হয় 2য় উপন্যাস "মোসাইক"।নাদিয়া'স স ং -এর কাহিনী শুরু হয় 1940 সালে। তারপর নানা ঘটনা প্রবাহ এগিয়ে গেছে ইতিহাসের সাথে সমান তালে। মিশরের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘনঘটার ছোঁয়া লেগেছে কাহিনীর পরতে পরতে। 1990 সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের শেষে এসে নাদিয়া'স সং শেষ হয়েছে। নাগিব, নাসের, সাদাতসহ বিভিন্ন নেতারা ঘুরে ফিরে কাহিনীতে বিচরণ করেছে নানান প্রেক্ষিতে। কারিমার ভাই ওমরের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি, মুসলিম ব্রাদারহুডের নিষিদ্ধ কর্মকান্ড, কুসংস্কার, মিশরীয় নারী জাগরণের পথিকৃৎ হুদা - আল- শারাবি, সুয়েজ খালের রাজনীতিসহ নাদিয়ার সাংবাদিক জীবনের বিভিন্নদিক উপন্যাসে স্থান পেয়েছে।লেখকরা সাধারণত: ইতিহাসের বৃত্তের বাইরে থেকে সময়কে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সোহেইর ইতিহাসকে বাদ দিতে চাননি। ইতিহাস বাহুল্যে প্রায় সাড়ে চারশ' পৃষ্ঠার এ উপন্যাস মাঝে মাঝে জোর করে পড়ে যেতে হয়েছে শেষ পরিণতি জানার জন্য। তবুও 1940 থেকে 1990 - এই 50 বছরের মিশরীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার এক অনবদ্য আখ্যান - "নাদিয়া'স সং"।

Read more...

29 August, 2006

মংগা সেলিব্রেশান



অ্যাটেনশান, ইয়োর অ্যাটেনশান please... প্রতি বছর আসে, প্রতি বছর যায়। তাই নিয়মমতো আবার আসছে - আশ্বিনের মংগা...।

মাসের হিসাবে আর বেশী দূরে নেই। সো, গেট রেডি ফর সেলিব্রেশান!!!

অ্যাটেনশান - ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ওয়েক আপ!! আংগুলের কড়ে আর হিসাব করা যাবে না, ক্যালকুলেটরেও কূলাবে না। এক্স-পি কিংবা এসপিএসএস নিয়ে বসে পড়ুন। বিশাল ভাগাভাগি হবে, কাড়াকাড়ি হবে। ইলেকশনের আগে শেষ সুযোগ! কোন লেভেলে কত দেয়া লাগবে, নিজে কত পাবেন ঠিক করে নিন, কুইক! ইয়ার-এন্ড-ট্রিপে আর কক্সবাজার রাঙামাটি নয়, এবার সিংগাপুর কিংবা মরিশাসের কথা ভাবতে পারেন।

অ্যাটেনশন অনারেবল পলিটিশিয়ানস, এটাই চরম সুযোগ। সোনায় সোহাগা। জনদরদী হওয়ার, জনগণের কাছে যাবার মোক্ষম চান্স! লংগরখানা আর রিলিফ সেন্টারের লোকেশন গুলো ঠিক করে নিন। আপনাদের পটু সহধর্মীনিদের জন্য জামদানী-কাতানের বদলে সুতির শাড়ী কিনে নিন। মংগা আক্রান্ত বুভূক্ষ মহিলাদের পাশে আপনাদের রমনীরা পাবলিক রিলেশন আর মাস-কম্যুনিকেশনে বিরাট ভূমিকা রাখবে। ওদের ভোটগুলো এখনই কনফার্ম করে নিন! ডোন্ট মিস ইট!

সমুদয় "যথাযথ কর্তৃপক্ষ" এবার হিসাবটা অন্যরকম হবে। মংগার সাথে আসবে রমজান! কী অপূর্ব সমন্বয়! ইহকাল-পরকালের মাল সামানা এবার গুছিয়ে নিন। ভাগ-বাটোয়ারায় ছাড় দিবেন না একদম!

সো কল্ড "পিপলস'স পার্লামেন্ট" এর সম্মানীয় সম্পাদকবৃন্দ - এবার বিশেষ সম্পাদকীয় লিখুন - "এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আলীদিঘী গ্রামের আম্বিয়া খাতুন সাত দিন না খেয়ে রোজা রাখছে, কচু সিদ্ধ দিয়ে ইফতার করছে...।" বাট please ডোন্ট ফরগেট টু পার্টিসিপেট কালারফুল ইফতার পার্টিস ইন ফাইভ স্টারস! ইলেকশনের আগে দরাদরির কাজটাও সেরে নিন। পাওয়ার অব মিডিয়া দেখানোর ধমক দিন।

"অংপুরের ছাওয়াল" আনিসুল হক, আপনি এবারো "অরণ্য রোদন" করবেন। ভালো কিছু লেখা লিখবেন। পাঠক পড়ে মন খারাপ করবে। ...এটুকুই!

অনারেবল পলিসিমেকারস্, সেল্ফ প্রোক্লেইমড পেট্রিঅটস - আশ্বিনের মংগা আসছে। সাদরে বরণ করা দরকার।

...সুতরাং দেরী নয় আর। গেট রেডি - কাউন্ট ডাউন...

Read more...

08 August, 2006

মুখোশহীন মুখ

পরপর দুটো খুনের ঘটনা নামকরা সাইকোঅ্যানালিস্ট ড. স্টিভেন জুড-এর জীবনটা অস্থির করে তুলে। সকালে খুন হয় এক রোগী জন হ্যানসন; জুডের চেম্বার থেকে বেরুনোর কয়েক মিনিটের মধ্যে। হ্যানসন পরা ছিল জুডের রেইনকোট। পুলিশ অফিসার ম্যাকগ্রেভির সন্দেহের চোখ পড়ে জুডের উপর। সকালের ধকল না কাটাতেই সন্ধ্যায় অফিসে বিভৎসভাবে খুন হয় জুডের সেক্রেটারি ক্যারোল। এবার ম্যাকগ্রেভির সন্দেহ আরো দৃঢ় হয়, কিন্তু প্রমাণের অভাবে গ্রেফতার করে না। ম্যাকগ্রেভির সাথে জুডের একটা পূর্ব শত্রুতার ব্যাপার ছিলো। আরেক পুলিশ অফিসার অ্যানজেলি বারবার জুডকে সাহায্য করে যায়, সতর্ক করে দেয়; ম্যাকগ্রেভি সুযোগের অপোয় আছে, যে কোন মুহুর্তে ফাঁদে ফেলতে পারে।

জুড খুব চেষ্টা করে সব দু:শ্চিন্তা বাদ দিয়ে স্বাভাবিক কাজ কর্মে থাকতে, তাই নিয়মিত রোগী দেখে যায়। কিন্তু অজানা শত্রু তার পিছু ছাড়ে না। রাস্তায় গাড়ি চাপা দেয়ার চেষ্টা করে - ভাগ্য জোরে জুড বেঁচে যায়। অথচ ম্যাকগ্রেভি বিশ্বাস করে না, বলে - সব জুডের সাজানো নাটক। অ্যানজেলি জুডকে মানসিক সার্পোট দিয়ে যায়, পুলিশ বিভাগের বড় কর্তাদের কাছে জুডের সাথে ম্যাকগ্রেভির শত্রুতার কথা ফাঁস করে। তবুও জুড নিরাপত্তা পায় না। কারা যেন ইলেকট্রিসিটি অফ করে জুডের অফিসে হামলা করে, কিন্তু খুন করতে পারে না। পুলিশ এগিয়ে আসে না।

অবশেষে জুড প্রাইভেট ডিটেক্টিভ নিয়োগ করে মোডিকে। রহস্যজনকভাবে মোডি ও খুন হয় খুব দ্্রুত। অ্যানজেলি সতর্ক করে দেয় বারবার, সময় আর বেশী নেই। এরপর জুড মরিয়া হয়ে উঠে । শত্রুর তালিকায় কাউকে ফেলতে পারে না। তবুও মোডির দেয়া সূত্র ধরে এগিয়ে যায়। রহস্যময় রোগী অ্যানির সাথে কোথায় যেন একটা সম্পর্ক খুঁজে পায়। কিন্তুবেশী কিছু জানা যায় না। তারপর এগিয়ে আসে অ্যানজেলি। সাহায্যের কথা বলে নিয়ে যায় অপরিচিত এক জায়গায়। সেখানে দেখে মাফিয়া দলের প্রধান মাইকেল; অ্যানির স্বামী। অ্যানজেলির আসল রূপ তখন বেরিয়ে আসে, সে মাইকেলের সহচর। মাইকেলের ধারণা ছিল, অ্যানি তার অবৈধ ব্যবসার কথা জুডকে বলে দিয়েছে। তাই ভুলক্রমে প্রথমে খুন করে হ্যানসনকে। তারপর অ্যানির সাথে জুডের কথকথার টেপ আনতে গিয়ে খুন করে ক্যারোলকে। পরের সব ঘটনার আড়ালে ছিল অ্যানজেলি। একে একে সব মুখোশ খসে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় - জুডকে খুন করা হবে। মাইকেল কুট কৌশলে প্রথমে খুন করা হয় অ্যানজেলিকে। তারপর জুডের এক সাইকোলজিক্যাল গেমে পরাজিত হয় মাইকেল। নিজের পাতা ফাঁদে মারা যায়। ম্যাকগ্রেভির সহায়তায় অ্যানিও রক্ষা পায়। (অত:পর সবাই সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিলো)।

দি ন্যাকেড ফেস, সিডনী শেলডনের প্রথম উপন্যাস। অবশ্যই বেস্ট সেলার! শেলডনের মাত্র দুটো উপন্যাসের প্রধান চরিত্র পুরুষ। তাই জুড ছিল শেলডনের যত্নে গড়া এক চরিত্র। অথচ পাঠক জানেনি জুডের বয়স কতো, প্রয়োজনও ছিল না তেমন। আমার মতো যারা শেলডনের "ইফ টুমরো কামস" কিংবা অন্য কোন বই পড়েছেন - তাদের কাছে দি ন্যাকেড ফেস কিছুটা পানসে মনে হতে পারে। তবুও চমকের কমতি ছিল না। একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে রাখা খুব কঠিন! এখানেই শেলডনের সাফল্য !

Read more...

07 August, 2006

তোর জন্য

দুপুরে এসে সকালের ছেলে মানুষী
ভুল সব কান্ড-কারখানা
ধোঁয়া উঠা ভাতের বদলে
পায়েশ কিং বা ছানা।
ব্যবধান বেড়ে তুই আর আমি
এবং আমরা চতুর্ভূজ
বিচ্ছিন্ন দ্বীপ
মাঝে বয়ে যায় কষ্টের নদী।
কোন সাঁকো পারবে না
করবে না সংযোগ,
কেবলই আমাদের কাছে আসা
এক হওয়া
বড্ড প্রয়োজন - অতএব
ভুল করিস্ না আর;
জেনে রাখিস
সোডিয়াম লাইট খুব বিভ্রম সবসময়,
সব যায়নি এখনো
আমিও যাইনি যেমন -
একটি মোমবাতি হাতে
অন্তত:তোর ফেরার অপেক্ষায় - - -

Read more...

01 August, 2006

আপনি, তুমি ও তুই

আপনাকে আমি চিনতাম না কখনো
হঠাৎ একদিন দেখা হলো
পরিচয় হলো
অনেক অনেক কথা হলো।

কথার পিঠের কথকথায়
তুমি আমাকে চিনলে
কাছে নিলে
আপন ভেবে ভালোবাসলে।

ভালোবেসে দেখলে - আমি একটা অপদার্থ।
তারপর তুই আমাকে
চড় দিলি
গলা ধাক্কা দিলি
লাথ্থি দিলি
থুতু দিলি,

জানি না - তুই কী পেলি
কিন্তু - আমার সব কেড়ে নিলি!

Read more...

30 July, 2006

ধারা - ১৬৪

মহামান্য আদালত,
আমি নিশ্চিত এ আমার পূর্ব জন্মের পাপ। চলমান জনমে আমি এমন কোন অপরাধ করিনি যে অদেখা ঈশ্বর আমাকে এরকম শাস্তি দিয়ে যাবেন। এখনকার এই আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ, অনেক মানুষের চেয়ে কম পাপ করেছি বলে জানি। তবুও ঈশ্বরের অভিশাপ আমার উপর। আমি হলফ করে বলছি - এ নিতান্তই অন্যায়! এ আমার উপর গুরুদন্ড। আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন - আমি তেল চর্বিযুক্ত খাবার বেশি পছন্দ করি না। মাঝে মাঝে পোলাও খেতে ভালোবাসি। সাকী -শরাবে কোন আগ্রহ নেই। খুব আরাম করে ঘুমাতে ভালো লাগে। অথচ, মহামান্য আদালত - আপনি জানেন না - আমি ইদানিং অনেক রাত না ঘুমিয়ে কাটাই। ঈশ্বর জানতেন - আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি, তাই তিনি আমাকে কেবল দুঃস্বপ্নের মাঝে ফেলে দেন। আর আমি গড়াগড়ি দিই। এ বিরাট অন্যায় আচরণ। নষ্ট মানুষরা আমাকে পুল সিরাত পার হতে দেখে হাততালি দিবে - মহামান্য আদালত - আমি এতো কষ্টের ভার নিয়ে কিভাবে পুল সিরাত পার হবো? আপনি জানেন - অনেকগুলো বিষণ্নতার ভার আমি বয়ে চলেছি, অনেকগুলো আকাঙ্খা আমাকে পেছন থেকে ধাককা দিচ্ছে। প্রচন্ড রোদে আমি পুড়ে যাচ্ছি, মহামান্য আদালত - আপনি দেখছেন - কিন্তু কথিত অন্তর্যামী ঈশ্বর দেখতে পাচ্ছে না।


মহামান্য আদালত, আপনি নিশ্চয় মোহসেন আলী, টিনা গাজী, আসমতউলাহ মাঝি-দের নাম শুনেছেন, কিন্তু দেখেন নি। আমি ও দেখিনি। অথচ আপনার মতো - আমিও জানি - উনারা আমার পূর্ব পুরুষ। আমি আরো জানি - তাঁরা আমার চেয়ে বিশুদ্ধ মানুষ ছিলেন। আমি নিশ্চিত - তাঁদের কোন পাপের ফল আমি ভোগ করছি না। উনাদের নীল রক্ত আমাকে অহংকারী করেছে, আভিজাত্য দিয়েছে; আমি তাঁদের কাছে ঋণী! অতএব আসুন আমরা নিরাপদ জানি - এ আমার পূর্বপুরুষের পাপ নয়।

আমি আবারো বলছি - ইয়োর অনার - এ আমার পূর্ব জন্মের পাপ। হয়তো আমি কোন ধর্মজাযক ছিলাম। কোন এক বিকেলে স্নিগ্ধ স্নাত নান-কে দেখে আমার চোখদুটো লোভী হয়ে উঠেছিল। হয়তো বা আমি কোন শুদ্ধ মহামানব ছিলাম। আশ্রমের সামনের অনাথ শিশুকে আমি অবহেলা করে ভুল করেছি। হতে পারে আমি কোন - সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক ছিলাম। নিজের ভুলে জাহাজ ডুবিয়ে মৃতদের অভিশাপ নিয়ে আজকের এই অভিশপ্ত আমি। যা-ই হোক না কেন, এ আমার পূর্ব জন্মের পাপ।

এ অস্থির জীবন একদিন শেষ হবে, আমি জানি - আপনিও জানেন - আমি আবার জন্ম নেবো। আমার এই পরাজিত আনা-কড়ি-পাই নিয়ে আমিকি আবারো মানুষ হবো? মহামান্য আদালত, আপনার কাছে আমার একান্ত আর্জি -আপনি ঈশ্বরের কাছে বলুন, আমার সমস্ত সত স্বত্তার দোহাই লাগে, আপনি বলুন - আমি যেন পরজন্মে মানুষ না হই। টিকটিকি হতে রাজী আছি মহানন্দে। ইব্রাহিম নবীর আগুনে ফুঁ দেয়ার অপরাধে কামেল মানুষরা আমাকে মারতে চাইবে, আমি দেয়ালে দেয়ালে দৌড়ে বেড়াবো, হয়তো একদিন কামেল কোন মানুষের ঈমাণী যোশে খুন হয়ে যাবো। তবুও মহামান্য আদালত - সে অনেক শান্তি।

পরজন্মে আমি মানুষ হতে চাই না। মানুষ হলে - আমি অন্য মানুষকে ভালোবাসতে চাইবো। স্বজনদের কাছে রাখতে চাইবো, বন্ধনে জড়াতে চাইবো। এখন এ সবই অপরাধ, সবই ভুল, মানুষ জীবন খুব নির্মম - ইয়োর অনার - আমায় ক্ষমা করবেন, আমি মিসফিট সৃষ্টি হয়ে আসতে চাই না আর। মহামান্য আদালত - আমি করজোড়ে প্রার্থনা করছি, আপনি একবার ঈশ্বরের কাছে বলুন - - -

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP