23 July, 2007

এক নি:শব্দ আততায়ী

হাল্কা পাতলা ছিমছিমে গড়ন। মাথায় ছোট চুল, চোখে চশমা। লম্বা লম্বা পা ফেলে ক্যাম্পাসের এপাশ-ওপাশ দুমড়ে বেড়ান সারাদিন। সময়মতো ক্লাসে যান, রাস্তার পাশে খুপড়ি দোকানে চা খান। বিকেলে সাংস্কৃতিক সংগঠনের রিহার্সাল রুমে - 'নী-লা-ঞ্জ-না অই নীল নী-ল চোখে'। তবুও ক্লান্তি নেই কোনো। তার ব্যাক্তিত্বে আমি এবং আমরা অনেকেই ঈর্ষান্বিত।
তিনি আমাদের নাজমুল ভাই।
পড়ালেখায় আমার চেয়ে দু'বছরের সিনিয়র। ভাগ্যফেরে অ্যাপ্লাইড স্টাটিস্টিক কোর্স একসাথে করায় আমার সাথে নাজমুল ভাইয়ের সম্পর্ক খুব ভালো। দূর থেকে দেখলেই ডাক দেন - 'হাই ম্যান, কী অবস্থা?'
আমিও পাল্টা জবাব দিই।

সিনিয়র হলেও নাজমুল ভাইয়ের সাথে আমার খুব মিলে, কেবল একটি বিষয় ছাড়া; নাজমুল ভাই নারীসঙ্গ বিবর্জিত, নারী বিদ্বেষী, এন্টি-ফেমিনিস্ট। আমরা অনেকেই যখন শান্তা-কান্তা, সোনিয়া-তানিয়া, আয়েশা-মাঈশাদের হৃদয়ে অনবরত কড়া নাড়ায় ব্যাকুল, নাজমুল ভাই তখন মেয়েদের যন্ত্রণায় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন। সিনিয়রদের সাথে কথা বলেও নাজমুল ভাইয়ের সফল কিংবা ব্যর্থ প্রেমের অতীত খুঁজে পেলাম না। বরং জানলাম - নাজমুল ভাই কর্তৃক প্রত্যাখাত এক কণ্যার কানাডায় ক্রেডিট ট্রান্সফারের করুণ কাহিনী। নাজমুল ভাইয়ের মতাদর্শ আমাদের হতাশায় আশার আলো দেখায়। ছাত্রজীবনে প্রেম করার বাইরেও অনেক কিছু করার আছে কিংবা একজন নারী কখনো আলটিমেট ডেসটিনেশন হতে পারে না জাতীয় কথাগুলো আমাদের মনে বাণী চিরন্তনী হয়ে থাকে।

তবুও বয়সের ধাক্কায় পথভ্রষ্ট হই। সেমিস্টারের শুরুতে নতুন নতুন ফারা-সারাহ, নীপা-দীপাদের দেখে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। ক্লাস-ক্যুইজ-অ্যাসাইনমেন্ট কোনো কিছুতে মন দিতে পারি না। ক্যাফেতে মাথা নিচু করে আড়চোখে তাদের চটপটি-ফুচকা খাওয়া দেখি। টের পাইনা কখন নাজমুল ভাই পাশে এসে বসেন।
- শোনো ছোট ভাই, কিছু কথা বলি। মনে রাখার চেষ্টা করো।
- জ্বী বলেন। আমি জবাব দিই।
- একটা গার্লফ্রেন্ডের চাইতে একটা সাইকেল ভালো, আর একটা বৌয়ের চাইতে এক কাপ কফি ভালো।
- একটু খোলাসা করেন গুরু। নাজমুল ভাইয়ের কথা আমি বুঝতে পারি না।
- অন্তত: উনত্রিশটা কারণে একটা গার্লফ্রেন্ডের চাইতে একটা সাইকেল ভালো। কয়েকটা বলি এখন -

১) সাইকেল কখনো চায়নিজ খেতে চায় না
২) সাইকেল নিয়ে বেড়াতে গেলে কোনো খরচ হবে না
৩) তুমি অন্য কয়টা সাইকেলে দিকে তাকালে তা নিয়ে তোমার সাইকেল কোনো অভিযোগ করবে না
৪) সাইকেলের কোনো বাবা-মা অথবা মাস্তান কাজিন থাকে না, যে কিনা তোমাকে থ্রেট দিবে
৫) বন্ধুর সাইকেল নিয়ে যত বেশী বাইরে ঘুরতে পারো, কেউ কিছু মনে করবে না
৬) যখন খুশি তখন তুমি সাইকেল পাল্টাতে পারো
৭) সাইকেল চালানোর জন্য প্রতিদিন শেভ করা বা পারফিউম দেয়া লাগে না
৮) সাইকেল তোমার নির্দেশমতো সামনে-পেছনে, ডানে-বামে চলবে। উল্টা পাল্টা কিচ্ছু করবে না
৯) এর আগে তোমার কয়টা সাইকেল ছিলো তা নিয়ে বর্তমান সাইকেল কোনো প্রশ্ন করবে না বা সন্দেহ করবে না
১০) দিনরাত ২৪ ঘন্টা সাইকেল তোমার কাছাকাছি রাখতে পারো, নো প্রবলেম!!!

এটুকি বলে নাজমুল ভাই থামেন। আমি সাগ্রহে জিজ্ঞেস করি - তারপরে?
- নাহ বাকীগুলো তোমাকে বলা যাবে না। ইন্টারনেট থেকে পড়ে নিও। এই নাও টাকা, দু'কাপ কফি নিয়ে এসো।
আমি কফি নিয়ে আসি।
কফিতে চুমুক দিয়ে নাজমুল ভাই শুরু করেন, কেনো বৌয়ের চেয়ে কফি ভালো -
১) তুমি দোকান থেকে প্রতিদিন ফ্রেশ কফি কিনতে পারো
২) কফি আর সিগারেট একসাথে খাওয়া যায়
৩) দাঁত ব্রাশ না করেও কফিতে চুমুক দেয়া যায়
৪) কফি ঠান্ডা হয়ে গেলে নিজের পছন্দমতো রাত-বিরাতে গরম করা যায়
৫) কফি কখনো ইমোশনাল আচরণ করে না

নাজমুল ভাই কফিতে শেষ চুমুক দেন। বলেন -এখন ক্লাসে যাই। এই নাও ওয়েব সাইটের ঠিকানা, বাকীগুলো পড়ে নিও। আরেকটা কথা - শুক্রবারে পত্রিকায় তোমার লেখা গল্প পড়লাম।
- থ্যাংকস।
- কিন্তু ঐসব প্রেমের গল্প বাদ দিয়ে দেশের ব্যবসা-অর্থনীতি নিয়ে কিছু লিখো। ইকনোমিকসে তোমার মাথা ভালো।
- মানলাম, কিন্তু সবাই যদি আপনার মতো প্রেম-ডেটিং বন্ধ করে দেয় তাহলে ইকোনমির কি হবে ভেবেছেন?
- শোনো, ডেটিং হলো অপচয়মুলক ব্যয়। অর্থনীতির প্রয়োজন উন্নয়নমূলক ব্যয়। বোঝতে পারছো? বলে নাজমুল ভাই গটাগট বেরিয়ে যান।

সেদিন বিকেলে গিয়ে সাইকেল কফি বিষয়ক বাকী কারণগুলো পড়ে আমার চোখ-কান লাল হয়ে উঠে। নাজমুল ভাইকে গুরু মানি আর একটা সাইকেল কেনার প্ল্যান করি মনে মনে।

দিন বয়ে যায়। নাজমুল ভাই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে একটি বিদেশী ব্যাংকে জয়েন করেন। ক্যাম্পাসে আমি তার জায়গা দখলের চেষ্টা করি। তার মতো কর কথা বলি, লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটি। কাউকে কেয়ার করি না। অবিশ্বাস্যভাবে এই আমি পরপর তিনটা প্রেমের অফার প্রত্যাখান করি। খবর রাখি না - কেউ ক্ষোভে ক্রেডিট ট্রান্সফার করলো কিনা। তবে বুঝতে পারি - নাজমুল ভাইয়ের মতাদর্শের কারিশমা। সাইকেল কফি থিয়রী আমার জীবন পাল্টে দেয়। তারপর আর অনেকদিন আমাদের দেখা হয় না। প্রায়ই ভাবি তার বাসায় গিয়ে দেখা করে আসি। যাওয়া হয় না।

হঠাৎ একদিন মৌরি মেডিসিনে নাজমুল ভাইয়ের সাথে দেখা। অনেকগুলো মেডিসিন কিনছেন তিনি।
- কার অসুখ, ভাই?
- আর বলো না, তোমার ভাবীর শরীরটা ভালো না।
ভাবী! আমি অবাক হই।
- আপনার না পার্মান্যান্ট ব্যাচেলর থাকার প্রমিজ ছিলো?
- অইসব তো ইমোশনের কথা। বাস্তব জীবন অন্যরকম। বুঝলে -ভালোবাসা এক নি:শব্দ আততায়ী, বলে নাজমুল ভাই চশমায় ধাক্কা দেন।
- চিন্তা ভাবনা পাল্টালেন কবে? কীভাবে?
- না-মানে-আসলে কীভাবে কী-ভা-বে কী হয়ে গেলো বুঝতে পারলাম না।
নাজমুল ভাই আমতা আমতা করে মোটরসাইকেলে স্টার্ট দেন।
আমার মাথায় দুষ্টামি চাপে। জিজ্ঞেস করি
- এখনো কফি খান?
নাজমুল ভাই মুচকি হাসেন। বলেন
- বাসায় এসো, তোমার ভাবী খুব ভালো কফি বানায়।

নাজমুল ভাইয়ের মোটর সাইকেল আমার চোখের আড়াল হয়। কানের কাছে বাজতে থাকে - 'কীভাবে কী-ভা-বে কী হয়ে গেলো - - -'
আসলেই বোঝা যায় না!
ভালোবাসা এক নি:শব্দ আততায়ী।

Read more...

12 July, 2007

স্বপ্নপূরণ

আরমান বারবার মোবাইলে রিং করে যাচ্ছে। রিং হচ্ছে কিন্তু রোমানা রিসিভ করছে না। খানিকটা টেনশন হয়। আবার মেজাজও চড়ে উঠে। মানুষ এমন কেয়ারলেস হয়! রোমানা হয়তো এখন শপিংয়ে কিংবা মায়ের বাসায়। ব্যাগে মোবাইল বেজে চলেছে অবিরাম। সেদিকে রোমানার খেয়াল নেই। সে হয়তো গুলশান মার্কেটে হোলসেল শপে রেভলন - গার্নেয়ার - সিট্রাখুঁজে বেড়াচ্ছে অথবা স্কুল জীবনের বান্ধবীদের সাথে বাস্কিন এন্ড রবিন্সে আইসক্রীম খাচ্ছে! মোবাইলের রিং সে শুনতেই পাচ্ছে না। শেষে দেখা যাবে - টুয়েন্টি মিসড কল। তেমন সিরিয়াস কিছু না - কাজের ফাঁকে 'কী করছো' টাইপ টুকটাক কথা বলার জন্যই আরমানের ফোন করা।

দুই.
আরমানের প্ল্যান ছিল আজ সন্ধ্যায় আট্রিয়ামে ডিনার করবে। ওদের ব্যুফে ডিনারটা খুব ভালো। তাই একটু আগে আগে বাসায় এলো। রোমানা বাসায় নেই। ফোন করে জানা গেল - স্কুল ফ্রেন্ড সোমার ননদের গায়ে হলুদ, ওখানে গেছে। আসতে রাত হবে। আরমান ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রোমানা কোথায় যাবে, কী করবে - এসব আরমানকে জানানোর একটুও প্রয়োজন নেই! আরমান হয়তো 'না' করতো না, কিন্তু খানিকটা নিশ্চিত তো থাকতে পারতো - রোমানা নিরাপদে আছে, ভালো আছে। পাশাপাশি এরকম সারপ্রাইজিং প্ল্যান করে হতাশ হতে হতো না। ব্যালকনিতে বসে আরমান ভাবে -বুঝি মা-বাবাদের সময়টাই ভালো ছিল। বাবার পছন্দের খাবার বানিয়ে বিকেলে পাশে বসে মা হাতপাখার বাতাস করতো। এটা সেটা নানান কথার ফাঁকে মা বলতো - 'ভাবছিলাম আরমানকে নিয়ে ক'দিন নিশাখালী থেকে ঘুরে আসি'। শুনে বাবা চা'য়ে চুমুক দিয়ে আস্তেকরে মাথা নাড়তেন - 'যা-ও। সপ্তাহখানেক ঘুরে এসো'। মা তখন উচ্ছ্বাস লুকাতে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতো। ওদিকে আরমান নানাবাড়ী যাবার আনন্দে দিশেহারা।
ভাবনায় শৈশব কৈশোর ফিরে আসে। সময় ফিরে আসে না। সময়গুলো পাল্টে যায় ক্যামন করে, মানুষগুলোও!

তিন.
আরো কিছু সময় গেল মাঝে।
মোনার জন্ম হলো।
কিছুদিন উৎসব হলো, সবাই এলো গেলো।
---যেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।

চার.
ছোটখাটো এয়ারকন্ডিশনড রূমটায় তখন যেন শ্মশান বাড়ীর নীরবতা। চশমার কাঁচ পরিষ্কার করে আবার চোখে লাগালেন ডা. অজিত, অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে এমআরআই ফিল্মের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। নতুন ফিল্মের সাথে পুরনোগুলো মেলালেন। হাতের রিপোর্ট আবার পড়লেন। তারপর খনিক ভেবে জিজ্ঞেস করলেন - 'প্রেগন্যান্সির তখন কতো মাস চলছিল?'
- 'পাঁচ মাস'। আরমান দ্রুত জবাব দেয়।
- 'সাড়ে পাঁচ মাস'। পাশ থেকে শুধরে দেয় রোমানা।
ডা. অজিত এবার রোমানার দিকে তাকান, হুইল চেয়ারে বসে একপাশে মাথা কাত করে রোমানা বসে আছে। পাশের চেয়ারে আরমান উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে, টেবিলের উপর হাত রেখে নখ খুঁটছে। সিটি স্ক্যান রিপোর্ট হাতে নিয়ে নীরবতা ভাঙেন ডা. অজিত, রোমানাকে প্রশ্ন করেন
- চিকেন পক্স সারা শরীরে হয়েছিল?
- হুম, তবে মুখে ও মাথায় বেশী।
- জ্বর ছিল?
- হ্যাঁ, খুব জ্বর ছিল। সাথে ঘাঁড়ে ব্যথা।
- সমস্যাটা কী তখন থেকে শুরু?
- তখন এমন ছিল না। কেবল মাঝে মাঝে হাঁটতে গেলে এলোমেলো লাগতো। মনে হতো মাথাটা চক্কর দিচ্ছে, পড়ে যাচ্ছি। এমন লাগতো প্রায় দু'বছর।
- আর ব্যালান্স হারালেন …
- গত তিন মাস।
- আচ্ছা, দেখি - আমার আঙুলটা ধরুন তো, শক্ত করে ধরুন, আরো শক্ত করে। হুম, ঠিক আছে। এবার অন্য হাত দিয়ে ধরুন। শক্ত করে …। আরো জোরে, ওকে।
এবার আরমান কথা বলে - 'পাওয়ার ইজ হান্ড্রেড পার্সেন্ট ওকে'।
ডা. অজিত আরমানের দিকে তাকান - 'দেখুন মিস্টার আরমান, এ কেস নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমার প্রফেসর রিচার্ড নিয়ামের সাথেও মেইলে আলাপ করেছি। মেডিক্যাল টার্মে একে বলে - সেরিবেল্যার আর্টোফি। এটা হলে যা হয় - ব্রেইনের সাইজ ও কম্প্রেশান কমে যায় ধীরে ধীরে। ফলে শরীরের ব্যালান্স থাকে না। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো চিকেন পক্স থেকে এ রোগের শিকার হয় প্রতি চার হাজারে একজন। রোমানা হলেন সেরকম - চার হাজার জনের একজন।'
- 'এর কোন ট্রিটমেন্টনেই?' কাঁপা কাঁপা গলায় রোমানা জিজ্ঞেস করে। গলার শব্দ যেন কোথাও ধাক্কা খাচ্ছে। মনে হচ্ছে রোমানা এক্ষুণি হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়বে। বুঝতে পেরে ডা. অজিত সাহস দেয়
- না, না। হতাশ হবেন না, ট্রিটমেন্ট অবশ্যই আছে। গবেষণায় দেখা গেছে - ইনিশিয়াল স্টেজে ট্রিট মোটামুটি ২/৩ মাসেই পেশেন্ট এ রোগ থেকে সেরে উঠে। আমি আশাবাদী, আপনার ব্রেইনের অনেকগুলো কোষ এখনো একটিভ।
মেডিসিন দিয়ে কোষগুলোকে আরো সক্রিয় করা যায়, তবে দরকার - হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি, সাথে ফিজিও থেরাপি।
-'এটা কী বাংলাদেশে সম্ভব?' আরমান জানতে চায়।
-'না, এখনো নেই। ইন্ডিয়ার কোথাও কোথাও আছে, তবে সিংগাপুর অথবা ব্যাংকক নিলে সবচে ভালো হয়।'
আরমান-রোমানা যেন অন্ধকার টানেলের শেষে আলোর দেখা পায়। এখনো সব আশা ফুরিয়ে যায়নি, তবে যত দ্রুত সম্ভব রোমানাকে বিদেশে নিয়ে যেতে হবে - ডা. অজিত অমনটাই বললেন।

পাঁচ.
আরমান খুব দ্রুত খোঁজ-খবর নেয়। ইন্টারনেটে সার্চ করে জানার চেষ্টা করে কোন দেশে কেমন ট্রিটমেন্ট আছে। কোথাও কোথাও ই-মেল, ফ্যাক্স, ফোনও করে। সিদ্ধান্ত নেয় - রোমানাকে সিংগাপুর নিয়ে যাবে। আরমানের আগ্রহের কমতি নেই; সিংগাপুরের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে মেডিসিন কিনে রেগুলার। খুব দ্রুত সিংগাপুর যেতে হবে, কেবল - রোমানার পাসপোর্ট ভিসার অপেক্ষা। সপ্তাহ দুয়েকের ব্যাপার। তবে এরমাঝে উঠতি ব্যবসায়ী আরমানের জীবনে ঘটে অভাবনীয় এক ঘটনা। এমকে গ্রুপের তিনটি হাইরাইজ ভবন নির্মাণের কন্ট্রাক্ট পায় আরমানের কোম্পানী। আরমান কল্পনাও করেনি এত বড় বিজনেস ডিল পাবে। কন্ট্রাক্টের কাগজপত্র ফাইনাল করতে গিয়ে সিংগাপুর যাওয়া পেছাতে হয়। সে সন্ধ্যায় রোমানার হাত ধরে আরমান বলেছিল - 'প্লিজ রাগ করো না, কন্ট্রাক্টার উপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করছে। তোমার চিকিৎসা, আমাদের সচ্ছলতা, মোনার ভবিষ্যৎ - সব।
শুনে রোমানা হেসেছিল - 'তুমি এমনভাবে কথা বলছো যেন অনেক দূরের মানুষ আমরা! হোক না ক'সপ্তাহ দেরী, আমি তো আর মারা যাচ্ছি না।’
আরমান হাত দিয়ে রোমানার মুখ চেপে ধরে - 'ওভাবে বলো না, প্লিজ!'

ছয়.
এর পরের সময়গুলো খুব দ্রুত চলে যায়। কন্ট্রাক্ট ফাইনাল হলো হলো করে দু'মাস। আরমান তখন দারুণ ব্যস্ত। এক মাসের জন্য সিংগাপুর গেলে বিজনেস থমকে যাবে। তবুও রোমানার জন্য যত্ন কমে না। সিংগাপুরের ডাক্তারের সাথে ই-মেলে যোগাযোগ রাখে। অফিস থেকে ফেরার পথে লাজ ফার্মা থেকে রোমানার ঔষধ কিনে। মাঝে মাঝে আল-বাইক থেকে স্যুভ কিংবা ভেলপুরির চটপটি নিয়ে আসে। রোমানা তখন স্টাবল। হুইল চেয়ারে বাসায় থাকে সারাদিন, এটা ওটা রান্না করে, মোনাকে গল্প শোনায়। মাঝে মাঝে আরমান গাড়ি নিয়ে ড্রাইভে বের হয় - সাভার, আশুলিয়া কিংবা বুড়িগঙ্গা। এরকম দিনান্তরে আরমান এক নতুন রোমানাকে আবিষ্কার করে। কেন জানি মনে হয় - এ রোমানাকেই সে খুঁজছিল অনেকদিন। বিয়ের আগে যেরকম লক্ষ্মী-সংসারী বৌয়ের কল্পনা আরমান করেছিল - রোমানা মোটেও সেরকম ছিল না। যখন-তখন শপিংয়ে যাওয়া, কাউকে না জানিয়ে মায়ের বাসায় যাওয়া, বান্ধবীর বাসায় যাওয়া - আরমান পছন্দ করতো না একদম। অথচ অসুস্থ হওয়ার পর, বিশেষ করে হুইল চেয়ার নেয়ার পর রোমানা পাল্টে গেছে বেশ। আরমান পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে - মোনা এখন অনেক বেশী কেয়ার পাচ্ছে, রোমানা হুটহাট করে বাইরে চলে যাচ্ছে না, ঘরে থেকে টুকটাক রান্না করছে। এমন গৃহিনী আচরণ আরমান পছন্দ করে খুব, টের পায় - নিজের অজান্তেই নিজের ভেতর লালন করা একান্ত অনুগত বৌয়ের স্বপ্নটা সত্যি হয়ে এসেছে গত কয়েক মাসে। হেলভেশিয়ার চিকেন ব্রোস্টে গার্লিক সচ মিশিয়ে আলতো করে কামড় দিতে গিয়ে আরমান ভাবে - সিংগাপুর যাওয়াটা আরো পিছালে ক্ষতি কী, আপাতত: খুব জটিল কিছু তো হচ্ছে না। প্রতি রাতে ঘর্মাক্তও হওয়া যাচ্ছে বেশ অনায়াসে। সুতরাং, এভাবেই চলুক আরো কিছুদিন …।

______


অনলাইন ম্যাগাজিন 'বীক্ষণ' জুন ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশ।

Read more...

05 July, 2007

মনিকা - টাহির এবং ছোট্ট একটি দেশের গল্প

মনিকা পেট্রা প্রথমবার থাইল্যান্ড এসেছিল বছর পনেরো আগে। তখনও ব্যাংককের রাস্তাগুলো এতো প্রশস্ত হয়নি, ফ্লাইওভারগুলো বিস্তৃত হবে শোনা যাচ্ছে কেবল। সেবার শখের বশে বন্ধুর রেস্টুরেন্টে এক সন্ধ্যায় গান গেয়ে মনিকাকে নতুনভাবে ভাবতে হয়েছিল। নিজের কন্ঠশৈলীকে পেশা হিসেবে নেয়ার ভাবনা আগে কখনো আসেনি। থাইল্যান্ডে গান গেয়ে উপার্জনের প্রস্তাবটা হাল্কাচ্ছলে নিলেও জার্মানীর তুলনার স্বল্প খরচে জীবন-যাপন, অনুকূল আবহাওয়া - সব মিলিয়ে 'মন্দ কী' চিন্তাটা মনিকাকে আর দেশে ফেরায়নি। সন্ধ্যায় গান গাওয়ার পাশাপাশি দিনেও কিছু একটা করার চিন্তা জাগে মনে। এখানে ওখানে কাজ করে। বছর কয়েকের মধ্যে নিজে ছোটোখাটো একটা রেস্টুরেন্টও দেয়।


চল্লিশ পেরুনো মনিকার স্থায়ী সংসার করা হয়নি, যেমনটা করা হয় না ইউরোপ-এমেরিকার অনেক মানুষের। ফ্লায়িং বাটারফ্লাই হয়ে ফ্রিডম টু লিভ উপভোগ খুব আহামারী কিছু নয়। সুতরাং, গিভ অ্যান্ড টেকের একঘেঁয়ে ঐ গল্প থাক আপাতত:।

অর্ধ শতক বয়সের কাছে এসে মনিকার সাথে পরিচয় হয় পাকিস্তানি টাহির আহমাডের। টাহির আহমাড ভবঘুরে মানুষ। স্রোতে ভাসতে ভাসতে থাইল্যান্ডে। মনিকার রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে আলাপ জমে। টাহিরের জীবন-কাহিনী মনিকাকে স্পর্শ করে। এক সন্ধ্যায় টাহিরের হু হু কান্নায় মনিকা এলোমেলো হয়ে যায়। পেটান শরীর, শক্ত চোয়ালের এমন সুদর্শন পুরুষ কখন কাঁদে, কেনো কাঁদে? মনিকা টাহিরের কাঁধে হাত রাখে, সান্ত্বনা দেয়। টাহিরের প্রতিক্রিয়া ক্যামন যেনো বেমানান, ঠিক অন্য সব পুরুষের মতো নয়। টাহির যেনো কোনো একটা জায়গায় অন্যরকম। মনিকার মনে হয় এমন নির্বিষ পুরুষের উপর আস্থা রাখা যায় অনায়াসে। ঘনিষ্টতার ধাপগুলো পেরুতে সময় লেগেছে বেশ, কারণ টাহিরের 'আই অ্যাম মুসলিম, ক্যান নট - - -' বারবার বাঁধা দিয়েছে। জীবনে পোড় খাওয়া মনিকার কাছে এ বাধাটা ভালো লেগেছে বেশ। এবং এ ভালো লাগা স্থায়ী হয়েছে পরের বছরে বিয়ে, সংসার, দুজনে রেস্টুরেন্ট চালানো, ইকুয়্যাল শেয়ার। তবুও মাঝে মাঝে অনেক ব্যাপারে মনিকার অসহ্য লেগে উঠে। দুজনে মিলে কাজ করলেও টাহির পর্ক-স্টেক ছোঁবে না, পর্ক পরিবেশন করা থালা-বাসন ধোবে না, পারলে দুই আঙুলে নাক চেপে ধরে। রামাদান এলে টাহির সারাদিন কিছু খায় না। ক্লান্ত থাকে। একটু কাজ করে হাঁফিয়ে উঠে। তখন সব কাজ মনিকাকেই করতে হয়। সন্ধ্যার একটু আগে টাহির কোথায় ব্রেকফাস্ট করতে যায়, ফিরে এসে ঢকঢক কয়েক পেগ। মনিকা জিজ্ঞেস করে - 'ইজ ইট অ্যালাউড ইন ইসলাম'। টাহিরের ব্যাখ্যা - 'রামাদানে সারাদিন কিছু খাওয়া যাবে না, কিন্তু রাতে সমস্যা নেই'। একমাস রামাদানের পর টাহির তিন দিন শরাবে-শরাব ছিল। এটা নাকি রামাদান শেষের সেলিব্রেশন।

মনিকা টের পায়, টাহিরের যে সব সংস্কার দেখে মুগ্ধতা জেগেছিল সেগুলো নিতান্তই মোহ। এবং সে মোহ ভাঙতে খুব বেশী সময় আর লাগবে না। সম্পর্কের এ টানাপড়েন ঘনীভূত হওয়ার আগেই টাহির চম্পট। ব্যাংক একাউন্ট খালি, মনিকার জুয়েলারী বক্স খালি। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সে চড়ে টাহির তখন করাচী। মনিকা আর রেস্টুরেন্ট চালাতে পারেনি। একটা অফিসে পাবলিক রিলেশন অফিসারের চাকরী নিয়েছে।

আরো পরে:একদিন ঐ অফিসে জয়েন করে বাংলাদেশের এক ছেলে। বয়সের হিসেবে মনিকার অর্ধেকেরও কম। মনিকার ভাসাভাসা মনে পড়ে কোথায় যেনো জেনেছিল - বাংলাদেশ পাকিস্তান একসাথে ছিলো কিংবা আছে এখনো। টাহিরের কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশের ছেলেটা টাহিরের মতো সুদর্শন নয়, টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান চেহারাও নয়। খানিকটা চুপচাপ। মনিকা খুব বেশী কথা আগায় না। বাংলাদেশের ছেলেটা মাঝে মাঝে ফোনে বাংলায় কথা বলে। কিছু শব্দ মনিকার কানে আলপিনের মতো বিঁধে - "আচ্ছা আচ্ছা, জ্বী", টাহিরও বলতো অমন। ক'দিন আগে লবিতে কাকে যেনো 'সেলামালাকুম' বলছিল ছেলেটি। টাহিরও অনেককে ফোনে 'সেলামালাকুম' বলতো। একটা শংকা মনিকার মনে ভর করে। বাংলাদেশী ছেলেটির উপস্থিতি 'আনকমফোর্ট্যাবল' লাগে। মনিকা অফিস থেকে বেরোবার আগে নিজের ড্রয়ার দুবার চেক করে। তেমন কিছু নেই, তবুও 'বর্ন টু রাইড' এর ডিভিডিটা খোয়া গেলে মনিকা নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

ধীরে ধীরে সময় গড়ায়।

কফি ব্রেকে গল্প হয় কৈশোর পেরোনো ছেলেটার সাথে।

উন্মোচিত হয় টাহির-গল্প।পাকিস্তান প্রসংগ আসতেই মনিকা জানে এক নতুন কাহিনী।সেভেন্টি ওয়ান, সেভেন্টি ওয়ান, সেভেন্টি ওয়ান। মনিকা স্মৃতি হাতড়ায়, কোথায় ছিল সে ঐসময়! পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশে যুদ্ধ হলো, এতো লোক মারা গেলো। মনিকা একদিনও জানলো না?সংখ্যাটা কতো? থ্রি মিলিয়ন?মানে তিন এর সাথে ছয়টা শুন্য বসাতে হবে?ফিফটি টু-তে ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়েও কিলিং? মাই গড!

মনিকা টের পায় - বাংলাদেশের মানুষগুলো ইন্ডিয়ান কিংবা পাকিস্তানীদের থেকে আলাদা। গুগল ঘেঁটে করাপশন, পপুলেশন, পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট কিংবা এক্সট্রিম পোভার্টির পাশাপাশি পাওয়া গেলো এক সংগ্রামী ইতিহাসের কথা। মনিকা খেয়াল করেছে - সেভেন্টি ওয়ানের কথা বলতে গিয়ে সেদিন ছেলেটার চোখ-মুখ কেমন অন্যরকম হয়ে উঠেছিল। এ প্রত্যয়ে তো পলেস্তারা লাগানো কিছু নেই!

ছত্রিশ বছর খুব আহামারি সময় নয়।
ইতিহাসের হাত ধরে বাংলাদেশ এগুবে নিশ্চয়।
_____
সচলায়তনে প্রকাশ (০৫/০৭/২০০৭)

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP