26 February, 2008

বই মেলার ম্যালা গল্প

ভীড় নেই তেমন, লাইনে সামনে দশ-পনেরো জন। সবুজ জামা পরা লুৎফর রহমান রিটন আগে আগে গেলেন, সাথে বিটিভির এক সেলিব্রিটি অভিনেতা। ঘড়িতে সময় চারটা পঁচিশ। আলবাব ভাই বলেছিলেন - বিকেল চারটায় সবাই আসবে। চেহারা দেখে চিনবো অনেককে এই ভরসায় সামনে হাঁটি। লিটল ম্যাগ চত্বর ঘুরে জনান্তিক-জাগৃতিতে যাই। যাদের খুঁজছি তারা কেউ নেই। অবধুতের সামনে সুমন্ত আসলাম দুই কিশোরীকে অটোগ্রাফ দিচ্ছে। মাইক্রোফোন হাতে বাংলাভিশন চ্যানেল। শেষে আলবাব ভাইকে ফোন দিই - উত্তরে "শিমুল, তুমি লিটল ম্যাগ চত্বরে যাও, ওখানে পিয়াল ভাইরা আছেন। আমি দশ মিনিটে আসবো"

দূর থেকে পিয়াল ভাইকে চিনলাম। অমি রহমান পিয়াল। কাছে এগিয়ে যেতেই আরেকটি মুখ - অলৌকিক হাসান, সাথে কুয়াশা ভাবী। চমকে গেলাম পরিপাটি থার্ড আইকে দেখে। সকালেই লন্ডন থেকে এসেছেন। পিয়াল ভাইয়ের পাশে আরেকজন ব্লগার সুচিত্রা। টুকটাক কথা হয়। অলৌকিক হাসান দারুণ মিশুক মানুষ। অল্প সময়েই নানান গল্প জমে। থার্ড আই চকলেট বার বের করেন। মাঝে ঘুরে যান - ব্রাত্য রাইসু।

তারপর চশমা পড়া সৌম্য - অচেনা বাঙালী। এই মানুষটির সাথে দেখা করার ইচ্ছে অনেকদিনের। লিকলিকে শরীরের অয়ন (মুনতাসির অয়ন) কখন এলো ঠিক মনে পড়ে না। তবে অয়নই দেখিয়ে দেয় - সামনে আসছে উনি রাসেল ভাই। রাসেল (--------)।

অচেনা বাঙালী আর অয়ন সহ শুদ্ধস্বর স্টলে গেলাম। আলবাব ভাইয়ের বউ, বাটা, বলসাবান কিনবো। সামনে লীলেন ভাই। মাহবুব লীলেন, চেহারা দেখেই চিনলাম। শিমুল শুনে বললেন - আনোয়ার সাদাত শিমুল? বললাম - 'জ্বী, সুলতানা পারভীন শিমুল না'। লীলেন ভাই বললেন - 'না, ঐ শিমুলকে আমি ভালো করেই চিনি'। এই গোলকধাধা লীলেন ভাই'র সাথে আরেক দিন খেলেছিলাম সচল আড্ডাঘরে। কথায় কথায় এটাও জানিয়ে রাখলাম - লীলেন ভাই'র লেখা পড়ে আমি কেবল যতিচিহ্ন কমা (,)খুঁজি। কারণ, তিনি কমা ব্যবহার করেন না। স্টলে বসা আহমেদুর রশীদ। এই ভীড়েই একজন এসে লীলেন ভাইয়ের সাথে পরিচিত হলেন। খুব শীতল গলার আওয়াজ। জলিল ভাই, কবি শেখ জলিল। প্রশিকা স্টলে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন ভাবীর সাথে, জারীফ আর হৃদিকেও দেখলাম।

হঠাৎ চেহারায় হাসি হাসি ভাব নিয়ে সফেদ পাঞ্জাবীতে এলো অমিত আহমেদ। হাত বাড়িয়ে বললাম - 'আপনি অমিত? অমিত আহমেদ?'
'জ্বী'।
'কেমন আছেন?'
'ভালো'।
'আপনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। আপনার গন্দম কিনবো, কিন্তু শর্ত হচ্ছে - এক পৃষ্ঠা পুরো কিছু লিখতে হবে'।
অমিতের মুখে তখনো হাসি। বললো - 'আপনার নাম কি?'
বললাম - 'নাম দিয়ে কি হবে? অটোগ্রাফ দিবেন না?'
পাশে অয়ন হাসতেই আছে।
এবার অমিত বললো - 'চিনেছি, আপনি শিমুল।'
'কিভাবে চিনলেন?'
'কথা শুনে বুঝা যায়'।
হা হা।
অমিতকে ভড়কে দেয়ার পরিকল্পনাটা ওখানেই থামাতে হয়।

এরপর আমরা লিটল ম্যাগ স্টলের আশেপাশেই থাকি।
আরিফ ভাই এলেন, আরিফ জেবতিক।
একটু পর নজমুল আলবাব।
দু'জনকেই দেখলাম সাত বছর পর। আগেরবার বন্ধুসভার এক অনুষ্ঠানে দূর থেকে দেখা, কথা হয়নি। এবার মনে হলো - দেখা তো প্রতিদিনই হয় - - -।

ছোটোখাটো শরীরের একজন অচেনা বাঙালীর পাশে। নাম জানলাম - একরামুল হক শামীম। চেনা নাম। আরও দু'জন এসে আলবাব ভাইয়ের সাথে হাত মেলালেন। আলবাব ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার সাথে। জিজ্ঞেস করলাম - 'আপনার নাম?'
'আমি পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট।'
হ্যাংলা পাতলা শরীরে মজার মানুষ। জানলাম, তার নাম ফাহিম। ব্লগে মনিটর। পাশের জন মেন্টাল (আসল নামটা ভুলে গেছি)। দু'জন ঘুরতে ঘুরতে দাঁড়কাক স্টলে গেলেন। অপরবাস্তব-২ কিনলেন।

এর মাঝে সন্ধ্যা নেমেছে টের পাইনি।
এলেন প্রিয় মোরশেদ ভাই। পাঠক ফোরাম, বন্ধুসভার মুগ্ধতা জাগানো লেখক, প্রিয় ব্লগার - হাসান মোরশেদ। মুন্নী ভাবী আর মৃন্ময় আছে সাথে। আলবাব ভাই শুরু করলেন বিয়ের গল্প। সিলেট-চিটাগাং সংকট সমন্বয়ে প্রস্তাবক। পরে অমিত যখন এলো তখনও তিনি আবিয়াইত্যাদের লেজ কাটার পরিকল্পনায় মত্ত। আমার ধারণা এই মানুষটি ঘটক পাখি ভাইয়ের লাইনে ঢুকার চেষ্টা করছে।

আড্ডা এবার গ্রুপ-সাবগ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। পিয়াল ভাই'র সাথে কথা হয় কিছুক্ষণ। বন্ধুবৎসল আলাপী - নিরহংকার মানুষ। অলৌকিক ভাই ভাবী এবং থার্ড আই চলে গেলেন। মাসকাওয়াথ ভাই এলেন আসরে। আগেরদিন দেখা হয়েছিল। ছ'বছরে মানুষের গঠন পাল্টায় বৈকী! সাথে ইউরোপের ঠান্ডা বাতাসে শ্যামবর্ণ হয়েছেন বেশ।

পরিচয় হয় মুজিব মেহদী, জামাল ভাস্কর, কৌশিক আহমেদ, পথিক, রাহা, নুরুজ্জামান মানিকের সাথে। গ্রীণ টাইগার আবু মুস্তাফিজও এলেন। আলবাব ভাই'র সাথে থাকা নীরব মারিযাদ হারুণ নামটা পাঠক ফোরামের বদৌলতে অনেক চেনা।

অমিত, আলবাব ভাই, অয়নসহ জাগৃতিতে গেলাম। 'গন্দম'এ অটোগ্রাফ দিলো অমিত। আরিফ ভাই ব্যস্ত ছিলেন তাই অটোগ্রাফাশীর্বাদ পেয়েছি একটু পরে।
তবে অটোগ্রাফের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলাম নজমুল আলবাবের সামনে। আমার সিরিয়াল এগারো নম্বর। ভদ্রলোক অক্লান্তভাবে স্বাক্ষর দিয়ে যাচ্ছেন। আমি যখন গেলাম তখন অন্য পাশে অয়নও অপেক্ষায়।

শুদ্ধস্বরের সৌজন্যে মুড়ি-মোয়া আসে। আলাপ চলে অবিরাম।
লম্বা গড়নের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এলেন একটু পরে। অচেনা বাঙালী নিজেকে হোসেইন পরিচয় দিলেন। প্রত্তু বললেন - 'না, না, আপনি হোসেইন না।'
অচেনা বাঙালী বললেন - 'কেনো হোসেইন না কেনো?'
প্রত্তু কনফিডেন্ট, 'আপনি অন্য কেউ হবেন, হোসেইন না'।

মোরশেদ ভাইয়ের সাথে আলাপ হয় আরও কিছু। অপ্রকাশিত 'শমন-শেকল-ডানা'র গল্প শুনি। ডানে ডাক শুনে এগিয়ে যাই - আপন তারিক, সাথে ছোটোভাই। এক সময়কার নিয়মিত ব্লগার কিছুটা বিব্রত এই ভেবে এখনকার অনেকেই তাকে চিনবে না।
আপনের সাথে অনেক পুরনো ব্লগস্মৃতি চাঙা হয়। আলভী, অন্ধকার, সৌরভ আর কনফুসিয়াসকে নিয়ে আলাপ হয়। আপনকে ব্লগে নিয়মিত থাকার অনুরোধ করি।

রাত আটটা পার হয়ে গেছে। সবাই ঘরে ফিরছে। আলবাব ভাই আর মোরশেদ ভাইয়ের সিলেট নিমন্ত্রণে এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। অমিত কানাডা ফিরবে তারও আগে। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলাম দু'জন ব্লগারের জন্য, আসেননি; দৃশা এবং হোসেইন।

অয়ন শ্যামলী যাবে, আমি মিরপুর। ভুট্টায় কামড় বসিয়ে দু'জন রিক্সা চড়ে নীলক্ষেত আসি। বাসের জন্য মানুষের ভীড়। ইডেন পার হয়ে আজিমপুর যাই। 'সেফটি পরিবহনে' অয়ন ওঠার পর ট্রাফিক পুলিশ এসে বাসের কন্ডাক্টারকে পেটানো শুরু করলো। ড্রাইভার দিলো টান। আমি উঠতে পারলাম না। কাঁধে ব্যাগ হাতে ভুট্টা নিয়ে দৌড়াই। বাস থামে না, আমিও থামি না। আধা মিনিট পরে বাস থামলো। নানান জ্যামেও শ্যামলী আসতে দেরী হলো না। কথার মাঝেই 'আমি নামবো' বলে অয়ন নেমে গেলো।

এরকম অনেক কথা অসমাপ্ত রয়ে গেলো অনেকের সাথে।
.
.
.

Read more...

24 February, 2008

ঘরে ফেরার গান

বিজি জিরো এইট ফাইভ। ব্যাংকক থেকে ছাড়ার কথা রাত দশটা চল্লিশে। সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টায় সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে পৌঁছে আইপডে কান পাতি। বইয়ে মন বসে না। মাঝে মাঝে ঘড়ির কাটা কেমন যেন অলস হয়ে যায়। সময় কাটে না।
রাত আটটায় বোর্ডিং পাস নিয়ে জিজ্ঞেস করি - 'বিমান ডিলে হবে না?'
কাউন্টারের নাক বোঁচা মেয়েটি হাসি দিয়ে বলে - 'না, আজ ঠিক টাইমেই ছাড়বে'।
মনে হলো - ঘন্টা কয়েক ডিলে হলে ক্ষতি কী ছিল? দেশে ফেরার এ অপেক্ষাটা ভীষণ সুখকর।
এরপর ভেতরে চক্কর মারি।

নতুন এ এয়ারপোর্ট যেন মেলার মাঠ। বুকাজিনে চোখ বুলাই। বেনেজিরের আত্মজীবনী চারশ' পঁচানব্বই বাথ, প্রায় এক হাজার টাকা। পকেটে সইবে না। এরপর ই-সিক্স গেইট খুঁজি। আচমকা ডানে দেখি বিশাল এক সাদা বোর্ড। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে সবাই নিজের মতো করে লিখে যাবে। জ্যাক যোগ জুলি, আন্যা যোগ কার্ল, এরকম অসংখ্য প্রেমের স্মৃতি চিহ্ন। সুইডিশ আর চায়নিজ অথবা কোরিয়ান কিছুও লেখা আছে।
একটি লাইন ভালো লাগলো খুব - "আই লাভ ইউ, নট বিকজ ইউ আর বিউটিফুল। ইউ আর বিউটিফুল, বিকজ আই লাভ ইউ"। এর মাঝে এক খরগোশ সাইজ ছেলে এসে গটাগট কি যেনো লিখে গেলো। হয়তো কোরিয়ান কিংবা জাপানীজ।
আমি আলগোচে ব্যাগ থেকে কলম বের করি।
লিখতে চেষ্টা করি - "বাংলাদেশ"।
স্পষ্ট হলো না। ঐ প্লাস্টিক বোর্ডে লেখার জন্য মার্কার দরকার। খুঁজে পেলাম না আর। সেই মুহুর্তে একটি ক‌্যামরাঅলা মোবাইল আমার খুব প্রয়োজনীয় মনে হয়। কত কিছুই না হারিয়ে যায় স্মৃতি থেকে।

বিজি জিরো এইট ফাইভ, সিংগাপর থেকে ঢাকা। মাঝে ব্যাংককে বিরতি। সব মিলিয়ে ব্যাংকক থেকে উঠলাম পনেরো বিশ জনের মতো। সিংগাপুরের ভাইয়েরা এর মাঝে ফটো সেশনে ব্যস্ত। আমার সীট জে-টুয়েন্টি থ্রি; জানালার পাশে। বিমানে গান চলছে - "ধুম-মা-চলে, ধুম মা চলে। ধুম ধুম ধুম।"
এরপরে - "আআ গলে লাগ যা - - -"।

"স্যার, ও স্যার, এতো করে ডাকি শুনেন না।"
আমার পেছনের সীটের যুবক ভাই কাতর স্বরে ডাকছে। ছুটে এলো এয়ার ক্রু; তোমার ভাবী এইটা নিতে কইছে বিজ্ঞাপনের ফেমিকন হাজবেন্ডের মতো চেহারা। উনার নাম তৈমুর - "কী ভাই, কি সমস্যা?"
"স্যার, এতবার বললাম - মাথা ব্যাথার একটা ট‌্যাবলেট দেন, কেউ কথা শুনলেন না। এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে - - -"
তৈমূর ভাই ভালো লোক, "এক ঘন্টা হয়ে গেছে? কি বলেন?"
"জ্বী স্যার, ঐ ম্যাডামরে বললাম। ম্যাডাম বললো - মাথা ব্যাথা করলে ঘুম দেন, ভালো লাগবে।"
তৈমুর ভাই ছুটে গেলেন ট্যাবলেট আনতে।
আমি 'ঐ ম্যাডাম'কে দেখি। নীল শাড়ি পড়া আন্টি। কপাল কুঁচকে আছে। মনে হচ্ছে আজ সারাদিন রান্না করতে করতে উনি ক্লান্ত ভীষণ। তার উপর এতো উটকো মেহমানের ঝামেলা!
তৈমুর ভাই একটা ট্যাবলেট নিয়ে এলেন। সাথে এক গ্লাস পানি - "নেন ভাই, খেয়ে নেন"।
"স্যার, থ্যাংক ইউ স্যার। গত দুইরাত ঘুমাই নাই। মায়ের শরীর খারাপ, জরুরীভাবে দেশে যাইতেছি।"
আমি পেছনে তাকাই। আহারে, মা!

ছাড়ে ছাড়ে করে ছাড়লো এগারোটায়। আমার জানালা দিয়ে বিমানের ডানা দেখা যাচ্ছে। বিমান সাধারণত: ছাড়ার দু'মিনিট আগে থেকে ভিডিও ডেমনস্ট্রেশন দেখায়; বিটিভি'র মডেল সুইটি নির্দেশনা দিতো একসময় - বিমানে কিভাবে বসবেন, সীল্ট বেল্ট কীভাবে বাঁধবেন, অক্সিজেন মাস্ক কোথায় আছে, লাইফ জ্যাকেট কিভাবে পরতে হয়, ইমার্জেন্সি এক্সিট কোথায়; এসব। তারপর কোনো এক আয়াত পাঠ, সাথে বাংলা অনুবাদ যার কিছু লাইন এরকম - "আমাদের সফরের কষ্ট লাঘব করে দাও, সফরে বেদনাদায়ক দৃশ্য থেকে হেফাজত করো। পরিবার পরিজনের দায়িত্ব - - -"। এগুলো পড়তে পড়তে বিমান ওড়া শুরু করে।
এবার আর সুরা-কালাম পড়লো না। ভিডিও নেই। দুজন ক্রু লাইভ অভিনয় করে দেখালো - কিভাবে মাস্ক পড়তে হয়, কিভাবে লাইফ জ্যাকেটে বাতাস দিতে হয়।
সাউন্ড সিস্টেমে শোনা গেলো - ক্যাপ্টেন নুসরাতের গলা।
তিনি পরম করুণাময়ের কাছে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য দোআ প্রার্থণা করলেন।
আমি অপেক্ষায় থাকি কখন খাবার আসবে। খিদে লেগেছে বেশ।

চল্লিশ মিনিট পরে খাবারের ট্রলি এলো। নুডুলস, কেক আর চা/কফি। মন পেট কোনোটাই ভরলো না। সিটের পাশে হেডফোনের প্লাগ আছে। সুঠাম শরীরের ক্রু রায়ান (নাম ভুল হতে পারে) সাহেবকে ডাক দিলাম। হাসি দিয়ে জানালেন - "জ্বী না, হেড ফোনের ব্যবস্থা নেই।"
কী আর করা। জানালায় বাইরে তাকাই।
চাঁদের আলো পড়েছে বিমানের ডানায়।
হঠাৎ মাথার মধ্যে 'ধুলি মাখা চাঁদ' শব্দগুলো ঘুরপাক খায়। আরিফ ভাই'র উপন্যাসটা বইমেলায় কিনতেই হবে।
তারপর তৈমুর ভাই আমার সামনে। হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করি - "কেমন আছেন?"
ব্যাপারটা মনে হলো তার কাছে অপ্রত্যাশিত - "কিছু বলবেন?"
আমি বললাম - "আপনারা বিমানে কি সব সময় হিন্দি গান বাজান?"
পরিপাটি গোঁফেল চেহায়ার হাসি ফুটে ওঠে - "আসলে আমাদের এখানে সিস্টেম করা আছে। যখন প্লেন চলে তখন গান চালানো সম্ভব না, শুধু ট্রানজিটের সময়।"
বুঝলাম, আমার প্রশ্ন ঠিক হয়নি। আমার প্রশ্ন করা উচিত ছিল অন্য ভাবে, তাই আবার জিজ্ঞেস করি - "আপনারা কি শুধু হিন্দি গানই বাজান? নাকি বাংলা - ইংরেজিও?"
তৈমুর ভাই মনে হলো খুব খুশি - "আমরা বাংলা হিন্দি ইংরেজি, সব গান বাজাই।"
আমি মাথা নাড়ি - "আচ্ছা, আচ্ছা।"

দু'ঘন্টা দশ মিনিটের পথ যায় ধীরে ধীরে।
"আমরা আর দু'মিনিটের মাঝে ঢাকা জিয়া বিমান বন্দরে নামবো" ক্যাপ্টেন ইসরাতের গলা। ঠিক বুঝতে পারলাম না, নামটা কি - নুসরাত নাকি ইসরাত?
দেশের রানওয়েতে বিমানের চাকা ছুঁতেই মনে হয় - 'এ আমার দেশ। আমার মাটি।"
লাইটে কুয়াশার ছাপ। বিমান পুরোপুরি স্থির না হওয়া পর্যন্ত সবাই সীটে বসে থাকুন।
কিন্তু কে শোনে কার কথা?
আমি মোবাইলে সীম পাল্টাই। আমার অতি প্রিয় গ্রামীণের নাম্বারটি স্থগিত করা হয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেলো। বেরুবার পথে গেটে দাড়ানো তৈমুর ভাই হাসি দিয়ে - খোদা হাফেজ বললেন। আমিও।

দ্রুত হেঁটে ইমিগ্রেশনে যাই।
তারপর লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা। সবার ব্যাগ আসে আমারটা আসে না। না আসার সম্ভবনা বেশি। কারণ, যতবারই এসেছি ততবারই আমার ব্যাগ হয় হারিয়েছে, না হয় ভেঙে গেছে, না হয় অন্য কোনো ফ্লাইটে চলে গেছে। নানানজনের মাল-সামানা আসে। টেলিভিশন, অনেকগুলো কম্বল।
দাউদ মিয়া, জেলা মাদারীপুর।
মাসুদ করিম, চান্দিনা।
বিপ্লব বিশ্বাস, বাংলাদেশ।
শেষে আমার ব্যাগও আসে।
আবার সিক্যুরিটি চেকের লাইনে অপেক্ষা। দু'জন সামনে কৌশলে মেশার চেষ্টা করছে। সচেতন এক ভাই আওয়াজ দেন - হেই ভাই, লাইন ভাঙেন কেনো?
রাত একটা চল্লিশেও লোকজন করিৎকর্মা।

সিক্যুরিটি পার হলাম। শেষ গেইটে আরেকজন তেড়ে এলো - "ব্যাগে কি আছে?"
"বইপত্র জামা কাপড়।"
সাথের মহিলা এগিয়ে এলেন - "যান, আপনি যান সমস্যা নাই।"

ঢাকার ঠান্ডা বাতাস নাকে লাগছে।
শিরশির শীতল ভাব।
আর একটু দ্রুত হাঁটি, দৌড়াতে ইচ্ছে করছে। সামনের গেটেই উষ্ণতা।
অপেক্ষায় প্রিয় স্বজন।
.
.
.

Read more...

23 February, 2008

গন্দম: নিষিদ্ধ মোহের অনিশ্চিত হাতছানি

দমদম এয়ারপোর্টে ঋতু এবং রাজীব যখন অনেকগুলো অনিশ্চিত প্রশ্নের মুখোমুখি, আশাবাদী ভাবনায় সান্ত্বনা খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টায় দু'জনই জানে - আর দেখা হবে না, তখন নিষ্ঠুর ভগবানের অবিচারের পৃথিবী এবং সামাজিক কাঠামোয় দায়বদ্ধতা চাপিয়ে গন্দম কাহিনীর ইতি ঘটে। তবে এই সমাপ্তি কেবল মলাট বন্দী ছাপার অক্ষরেই সীমিত, কারণ ততক্ষণে পাঠকের মনে অনেকগুলো প্রশ্নের দগদগে ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে। পাঠকের চিন্তায় কড়া নাড়ার এ কৌশলী দক্ষতা উপন্যাস 'গন্দম' কিংবা লেখক অমিত আহমেদের মূল কারিশমা।

'গন্দম' প্রচলিত কাঠামোয় বিন্যস্ত নয়। সব চরিত্রের সম্মিলিত অংশগ্রহণে সময়-তারিখ ধরে কাহিনী সামনে এগোয়। কোলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দীপনের জন্য ঋতুর অপেক্ষা এবং রাজীবের সাথে দেখা নিয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে যে গল্পের সূচনা, পরের অধ্যায়ে গিয়ে সে গল্প চলে আসে ঢাকায় - সময়ের হিসাবে পিঁছিয়ে যায় আরও এক বছর। কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব, মহাখালীর তিস্তা গ্রুপ, বনানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, এবং গুলশানের সিমেন্স অফিসের ঘটনা পরম্পরায় রাজীব ফিরে আসে কাহিনীতে, সাথে উঠে আসে একদল তরুণপ্রাণ। সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজীবের সহযাত্রী। এ চরিত্রগুলোর জীবন কিংবা জীবনের আকাঙ্খা বর্ণন সুদূর অতীত কিংবা ফ্যান্টাসীর আগামী নয়, চলতি সময় এবং স্বপ্ন নিয়েই তাদের জীবনাচরণ। গ্র্যাজুয়েশন শেষে সবাই ক্যারিয়ারিস্ট হয় পারিবারিক ব্যবসায়, কর্পোরেট অফিসে, এনজিও কিংবা অন্য কোথাও তখন সম্পর্কের সংকট প্রবল হয়ে ওঠে। কর্পোরেট কিক-আউটের ঝাপসা কাঁচের ওপাশে শিশুতোষ ভালোবাসার প্রকাশ বড়জোর বয়:সন্ধির অস্থিরতা। চরিত্রগুলো এ সংকট অতিক্রম করতে পারে না। এরা এক নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি, প্রেম-ভালোবাসা সংজ্ঞায় এরা অস্থির। ক্রমান্বয়ে রাজীব এবং তৃণার সম্পর্ক যখন একই পথে গতি পায়, তখন কাহিনী আবার কোলকাতায় ফিরে যায়। চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, পার্ক স্ট্রীট, রাফি আহমদ রোডে ঋতু-রাজীবের বিচরণ পাঠককে বর্তমানে নিয়ে আসে। দুটি ভিন্ন সময়কে দুই-স্তরে বয়ান পাঠককে ধরে রাখে। ঢাকার রাজীব কিভাবে কোলকাতায় গেলো, তৃণার সাথে তার সম্পর্কের পরিণতি কী হয়েছিল এসব জানতে উল্টাতে হয় পাতার পর পাতা।

ঢাকা-কোলকাতার ভিন্ন প্রেক্ষাপট অথবা সময় ব্যবধান পাঠককে বিরক্ত করে না মোটেও। বরং ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরে গল্প বলায় পাঠক হয়ে ওঠে গল্পেরই একজন। ঢাকা কাহিনীর তুলনামূলক দ্রুততা পাঠককে ইংগিত দেয় - এ দুটো ধারা কোনো এক মোহনায় মিলবেই মিলবে। কিন্তু, সেই কাঙ্খিত মোহনার স্রোতে ভাসবে কে! রাজীব-তৃণা, রাজীব-ঋতু, নাকি ঋতু-দীপক? রাজীবের বড় ভাই সজীব এবং ইশিতার ঘর বাধার পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তব হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর লেখক দিতে একটু সময় নেন বটে, তবে সেটা যতটা না গল্পচ্ছলে তার চেয়ে বেশী গতকাল-আজ-এবং পরশুর সময় প্রবাহে। সৌরভের বিশ্বকাপ দলভুক্তি, উত্তপ্ত নন্দীগ্রাম, ইউনূসের নোবেল, বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেন, ইয়াবা কালচার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্যর্থতার মতো সমকালীন ঘটনার ছাপ থাকে পরতে পরতে। খুব শংকা থাকে এসব রিপোর্টিং মূল কাহিনীতে জড়তা নিয়ে আসবে, মনে হবে স্পুনফিডিং অথবা আরোপিত চেষ্টা। কিন্তু গন্দম কাহিনীর দ্বি-স্তর যখন একই সরল রেখায় মিলতে শুরু করে, ঢাকা-কোলকাতা নিকটবর্তী হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে - যে সময়কে এবং সময়ের মানুষগুলোকে অমিত আহমেদ ধরতে চেয়েছেন সে চেষ্টা এইসব সামষ্টিক ঘটনাপঞ্জী ছাড়া নিতান্তই সাদামাটা থাকতো।

বাক্য গঠন বা শব্দ বিন্যাসে 'জিজ্ঞাস'/'আর্ধেক' এর মতো কথ্যরূপ, 'টা/টি' প্রত্যয়ের অতি ব্যবহার চোখে পড়লেও ঢাকা/কোলকাতা ভেদে লেখকের ভাষা নির্বাচন পাঠককে মুগ্ধ করে। যেমন - ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে - "---আকাশের দিকে তাকায় ঋতু। আকাশে শাদা-কালো মেঘের ঘনঘটা, বাতাসটাও ভারি - জল করবে নাকি!"
এই "জল করবে নাকি" ঢাকায় ইশিতা, নওরীণ কিংবা তৃণার ভাবনায় হয়তো হয়ে যেতো - "বৃষ্টি হবে নাকি?"
আবার কোলকাতায় রতনদের বাসায় রতন বলে - "আরে যাহ শ্লা"। কোলকাতার সহজাত সংলাপ, একই প্রেক্ষিতে ঢাকায় নিপুনদের বাসায় রাজীবের সংলাপ - "আরে নাহ মানে কি? যাস নাই?" আবশ্যিকভাবে ঢাকার বর্ণিত প্রজন্মের নতুন বচন।

চরিত্র সৃষ্টি নিয়ে লেখকের সাহসী প্রয়াসকে সাধুবাদ না জানালেই নয়। দারিদ্র্য-প্রপীড়িত ক্ষয়িষ্ণু সমাজ অথবা মধ্যবিত্তের নিত্য জীবন যখন সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা রূপ পায়, তখন অ্যাফ্লুয়েন্ট সোসাইটির টাইলস মোড়ানো বাসা এবং ভাষা নিয়ে লেখা চোখে পড়ে কম। কিংবা যারা লিখেছেন, তাঁদের বেশিরভাগই বাইরের চাকচিক্যের আলোকছটার বিবরণে ক্ষান্ত। ঠিক এ জায়গাটিতেই অমিত আহমেদ দু:সাহসী। রঙ-মেশাল ধনীক মানুষগুলোর ড্রয়িং-ডায়নিং, গেদারিং আর রেস্টুরেন্টে তার বিচরণ। কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ বা বারিধারা হাউজিংয়ের ধুলো পড়া পথে লেখক দ্রুত হেঁটে যাননি, বরং নিজ হাতে ধুলো ওলোট-পালোট করে পৌঁছে গেছেন স্বপ্ন ও সংঘাতের অলিগলিতে। অনভ্যস্ত পাঠক অভিযোগ করতেই পারেন - এসব আমরা নই, আমাদের চেনাজানা মানুষ নয়। লেখকের নিজস্ব ব্যাখ্যার অপেক্ষায় না থেকেও আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি - ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ের বিভ্রম প্রজন্ম প্রলয় বন্ধ থাকবে না মোটেও, অন্ধ থাকার ভান যতো কম করা যায় তত বেশিই বোধের জয়।

উপন্যাসের সমাপ্তিটিও যথার্থ ম্যাচিওর্ড। শুধু একদিন আগে সজীবের হঠাৎ কোলকাতা পৌঁছানো, কয়েক সংলাপে ফেলুদার মতো সব সমস্যার গটাগট সমাপ্তি টানাকে তাড়াহুড়া মনে হয়েছে। মনে হয়েছে - একটি সৌম্য গতির গল্পে অহেতূক নাটকীয়তা। ঋতু-রাজীবের ঘরবন্দী ঘনিষ্টতা নিয়ে সজীবের প্রতিক্রিয়া খাপছাড়া মনে হয়। একই পরিণতির জন্য সজীব কোলকাতায় না গিয়ে ই-মেইলও করতে পারতো। কাহিনীর সময় পরিধি ঢাকা থেকে শেষ দৃশ্যে পৌঁছতে লেগেছে প্রায় এগারো মাস। বিপরীতে কোলকাতার ঘটনা মাত্র পাঁচ দিনের। পাঁচ দিনে পরিচয়, ভালো লাগা, জানা শোনা শেষে পার্ক হোটেলে ঘনিষ্টতাকে দ্রুত পরিণতি মনে হয়েছে। রাজীবের কোলকাতা থাকাকে, পাঁচ দিনের বদলে অন্তত: একমাস, প্রলম্বিত করা যেতো নির্ভাবনায়। গল্পের ধারাপাতে পরিবর্তন হতো না মোটেও। আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায় - যে পরিস্থিতিতে রাজীব ঢাকা ছেড়ে কোলকাতা এসেছিলো, সেখানে মানসিক চাপ থাকাটা স্বাভাবিক। ঋতুর সাথে রাজীবের দেখা কিংবা স্বগত: সংলাপে সেরকম ইংগিত অনুহ্য।

অমিত আহমেদের গদ্যরীতি ইতোমধ্যে পাঠকের (বিশেষ করে ব্লগে) প্রশংসা কুড়িয়েছে। 'গন্দম' রচনায় মানসিক প্রস্তুতি এবং পাঠকের ধৈর্য্য নিয়ে লেখক যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কোন জায়গায় থামাতে হবে, কোথায় পাঠককে অপেক্ষা করাতে হবে, কখন কারণ দর্শাতে হবে; এসবে মুন্সিয়ানা ছিল ব্যাপক। সময়কে ধরার কাজটি অমিত করে গেছেন সুচারুভাবে। আমাদের শহরের রাজীব শেষ পর্যন্ত কোলকাতায় আবার যাবে কিনা, তৃণার মানসিক পরিবর্তন স্থায়ী কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের চেনাজানা জগতেই পেয়ে যাবো। তবে গন্দম পাঠক হিসেবে কখনো কোলকাতায় গেলে ঋতু সেনকে খুঁজে বেড়াবো অচেনা রাস্তায়, মানুষের ভীড়ে। কারণ, পাঠের পর মনে হয় - এখানে সেখানে আমিও ছিলাম, আছি, অথবা থাকার কথা ছিল। কীভাবে কীভাবে যেনো অমিত আহমেদ সেটা জেনে গেছেন!
.
.
.

Read more...

14 February, 2008

দ্বীনের পর দ্বীন

ইদানিং ঢাকায় শীত পড়েছে।
সাথে বৃষ্টি।
টিপ টিপ টিপ।
গতকাল পহেলা ফাগুন ছিল।
এমন সময়ে বৃষ্টি হওয়া তেমন স্বাভাবিক না।
লাভ-ক্ষতি রোডের অফিসে বসে মুইন ভাবছিল জীবনের বছরগুলো কতো দ্রুতই না চলে যায়। কানের লতির কাছে আনা ট্রেন্ডি জুলফিতে আঙুল বোলাতে বোলাতে কতো কথা মনে পড়ে যায়। ল্যাপটপে গান বাজছিল -
"প্রেম নদীতে ঝাপ দিও না
সই গো সাতার না জেনে,
তুমি প্রাণে নাহি বাঁচিবা,
ডুবিয়া মরিবা ভাসিয়া যাইবা
শেষে স্রোতের তোড়ে"।
শিরিনের পাঞ্জাবিঅলা।
কুক জোশেফ পরশু নন্দন থেকে তরমুজ কিনেছে।
মুইন ভাবছিল তরমুজের জুস খাওয়া যায়।
বরফকুচি দিয়ে তরমুজের জুসে চুমুক দিয়ে ১২৮ পৃষ্ঠার হায়হায়রাত পড়া যেতে পারে।

ঠিক তখনি মোবাইলে নীলার ফোন
- হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন
- সেম টু ইউ।
- কি করছো?
- শিরিনের গান শুনি। ভাবছি তরমুজের জুস খাবো একটু পরে।
- ঠান্ডা পড়েছে কিন্তু বেশ।
- হুমম, গলাটাও বসে গেছে। তুমি কি করছো?
- কিছু করছি না, বাসায় পিয়াকে পাহারা দিচ্ছি আজ।
- কেন পাহারা দেয়ার কি হলো?
- আর বলো না, ইদানিং ছেলেদের সাথে বেশি বন্ধুত্ব তার। আজ আবার ভ্যালেন্টাইন ডে, কোথায় কি অঘটন ঘটিয়ে বসে - - -
- ও-নো-ও, গিভ হার ফৃডম।
- আরে না, পাগল নাকি? তুমি হায়হায়রাতে কি সব উল্টা পাল্টা গল্প লিখো। ছেলেপেলের মাথা খেয়েছো।
মুইনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বলতে ইচ্ছে করে - 'তুমি প্রাণে নাহি বাচিবা, ডুবিয়া মরিবা'।
মুইন প্রসংগ ঘুরিয়ে বলে - 'একরাম কোথায়?'
- অফিসে গেছে।
- বইমেলায় গিয়েছিলে এবার?
- এখনো যাইনি। দেখি একুশের পরে একবার - - -। রাজনীতি নিয়ে কি ভাবছো? ইলেকশন হবে?
মুইনের মনটা খারাপ হয়ে যায়।
ল্যাপটপের স্কৃনসেভারে বেগম সাহেবা আর ছোটসাহেবের ছবি। কতোদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই। এবার দুই ঈদে সালাম করা হলো না। সালামীও পাওয়া গেলো না। এসব ভাবনার মাঝে মুইন বলে - 'রাজনীতি বাদ দাও। রান্নার কি খবর? আজ ভ্যালেন্টাইন মেনু কি?'
নীলা তড়পড়িয়ে ওঠে - 'ভালো কথা মনে করেছো, চুলায় খিচুড়ি দিয়ে এসেছি। একরাম আজ বাসায় লাঞ্চ করবে। এখন রাখি।'
মুইনের রাখতে ইচ্ছে করে না।
শেষ বয়সে ব্যবসাপাতির সব কিছু ক্যামন যেনো এলোমেলো হয়ে গেলো। মুইন নীলাকে বলে - 'তোমার কাছে ফাগুন চেয়েছে কৃষ্ণচূড়া। একটা জোকস শুনবে?'
নীলা বিরক্ত হয় - 'ভাড়ামি ছাড়ো। এক পা কবরে গেছে, এবার আল্লা-খোদার নাম নাও'। খটাস করে ফোন রেখে দেয়।
মুইনের বুকটা ছ্যাত করে ওঠে।
প্রেম পীরিতের এমন হাল, কত ধানে কত চাল।

অ্যাপয়ন্টমেন্ট ডায়েরীতে দেখে সন্ধ্যায় ইটিয়েন চ্যানেলে লাইভ শো। বিশেষ ভ্যালেন্টাইন প্রোগ্রাম। কী বলবে না বলবে ভাবতে ভাবতে মুইনের ঝিমুনি আসে।

বিশাল সিংহাসনে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন বসে আছে। সামনে জমায়েত অসংখ্য তরুণ-তরুণী। মুইনের হাত পেছনে বাধা। সমবেত মানুষের চিৎকারে মনে হচ্ছে কানের পর্দা ফেটে যাবে। পাশের দুজন রক্ষী মুইনকে সামনে নিয়ে যায়। লম্বা চুলের একজন আইনজীবি মুইনকে জেরা করে - 'আপনি অস্বীকার করবেন, আপনি এসব ছেলেপেলের মাথা খারাপ করেন নি?'
মুইন নিশ্চুপ।
আইলাভইউ টি-শার্ট পরা একজন তরুণ চিৎকার দেয় - 'এই লোকটি আমাদের ভুল ভালোবাসা শিখিয়েছে।'
আরেকজন তরুণী এগিয়ে আসে - 'এই লোকটি একজন কিশোরীকে অহেতূক রমনী ভাবতে শিখিয়েছে। '
একজন সৌম্য অধ্যাপক আওয়াজ তোলেন - 'সমাজ বিনির্মানের নামে এই লোকটি সামাজিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করেছে।'
এবার মানুষ চেনা যায় না। চারপাশ থেকে কেউ বলে ওঠে - "এই লোকটি পরকীয়া প্রমোট করেছে। এই লোকটির আয়োজন অনাকাঙ্খিত প্ররোচনা শিখিয়েছে। এই লোকটি দিনের পর দিন - - -"

এরকম চিৎকার অসহ্য হয়ে উঠলে ঘুম ভেঙে যায়। ঝিমুতে ঝিমুতে মুইনের ঘুম পেয়েছিল খুব। আবার ফোন বাজে - 'মুইন সাহেব বলছেন?'
- ইয়েস
- আমি বাংলাভাই বলছি জান্নাতুল ফেরদাউস থেকে, হায়হায়রাতে এসব কী ছাপাইছেন ভাই। মানুষকে দ্বীনের পথ থেকে সরানোর এ চেষ্টা থামাবেন কবে?
রিসিভার ধরে মুইন কাপতে থাকে।

একে দু:স্বপ্ন, তার উপর এই ফোনালাপ। মুইনের গলা শুকিয়ে যায়।
তরমুজ-জুসের তৃষ্ণাটা জেগে ওঠে আবার।
মুইন তাড়াতাড়ি ল্যাপটপে টাইপ শুরু করে - 'দ্বীনের পর দ্বীন'।

(কাল্পনিক)

.
.
.

Read more...

13 February, 2008

ভালোবাসার ডিজুস সময়

শেন্টুদের বাড়ীর পার্কিং এরিয়ায় কার থেকে নামতেই ওদের শেফার্ড জিমি ঘেউঘেউ করে ওঠে। সেকেন্ড ফ্লোরের ব্যালকনিতে শেন্টু লাভ বার্ডগুলার সাথে খোঁচাখুচি করতেসিল। আমাকে দেখে শাউট করে - 'ম্যাক্স, ই-য়ো ম্যা-এ-ন! এতো আর্লি আর্লি কাহিনী কি?'
আমি জিমির দিকে তাকাই - 'দোস্ত, তোগো জিমি কি বান্ধা আছে?'
-'কাওয়ার্ড ম্যা-এ-ন!!! কিশসু হবে না, সোজা কাম ইন।'
এই হালাদের বাসায় আসা বহুত ঝামেলা, কুত্তা জিমির ঘেউঘেউ, মেইন গেইটে কেডস খুলে তারপর হাঁটা লাগে। আমার এইসব ভালো লাগে না অ্যাট অল। খালি পায়ে টাইলসের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে ঊঠতে নার্ভাস লগে, আই ফিল, স্লিপ করে পড়ে যাবো। শেন্টুর রুমে ঢুকে দেখি আগের ডিভানটা নাই। ফ্লোরে ম্যাট্রেজ বিছানো, কুশনের পাশে ল্যাপটপ, রুমের রাইট কর্নারে টোশিবা সাউন্ড সিস্টেম, ওয়ালে টুয়েন্টি ফোর ইঞ্চি সনি ফ্লাটস্ক্রীন টিভি। টাইলসগুলোও নতুন নতুন লাগতেসে। কুশনটা সরায়ে বসতেই আই ওয়াজ লাইক থান্ডার্ড। শেন্টু তার মিস্টিরিয়াস হাসিটা আমাকে ছুড়ে বলে - 'হো-য়া-ট-স আপ, বাডি। এমুন টাশকি খাইলি ক্যানো?'
পৃষ্ঠা উল্টাই পাল্টাই - 'এই রেয়ার কালেকশন, হাউ কাম?'
- নোরা।
- হোয়াট? এই জিনিশ নোরা দিসে?
- ইয়াপ।
- আজকাল খুব লাল হইতেসো মনে হয়!

এইচবিও'তে 'বর্ন টু রাইড' চলতেসে। স্কীন টাইট স্ক্র্যাচ জিন্সের জিপার টেনে শেন্টু পেছনে আন্ডারওয়্যারের রিবনটা বের করে দেয়। রুবার , স্পষ্ট পড়া যায়। আসল ব্র্যান্ড। ওর প্যান্টটা মনে হয় নিউ - 'এইটা ব্যাক রজারস, নাকি গ্যাজস?'
- 'স্যর-ই মাইট, ঐসব ক্ষ্যাত জিনিশে আমি নাই। এইটা লেটেস্ট - স্পিরিট নেক্সট।' মেটালিক বেল্টের হুক সেট করতে করতে শেন্টু লাইটারটা শো করে। বেল্টের সাথে কালার ম্যাচ করা, ব্লু ফেম। পুরা জোস। পয়জন'র ঘ্রাণটা পুরা রুমে ছড়িয়ে পড়ে। রাইট দ্যাট মোমেন্ট ঝনঝন করে বাজে - দরদে ডিসকো দরদে ডিসকো ওম শান্তি ওম, শেন্টুর এইচ-পি আই প্যাক এস ডব্লিউ সিক্স ফাইভ ওয়ান ফাইভ। নোরার ফোন।
- 'ইয়াপ, জা-ন। হোয়াট? রিয়েলী! ঝা-ক-কা-স হইসে, ঝা-ক-কা-শ।'
শিন্টুরে এক্সসাইটেড মনে হইতেসে - 'হোয়াট'স আপ? হইসে কী?'
- নিশিতা ইজ ব্যাক ফ্রম ব্যাংকক ।
- 'ক-ঠি-ন'।
- 'লেটস মুভ, ইয়ার ।'


দুই
ডমিনাসের ব্যূফেতে আজ ক্রাউড নেই তেমন। শেন্টু নোরাকে ফোন দিচ্ছে, কুইক জা-ন। নিশিতা দূর থেকে দৌড়ে এসে আমাকে সফটলি হাগ করে - 'তুই ফ্যাট গেদার করলি কবে দোস্ত?' আমি মাসলটা কার্ভ করে বলি - 'ফ্যাট কই? দেখ! তুই স্লিম হইলি ক্যামনে? ব্যাংককে খাস কি?'
- 'আর কইস না দোস্ত, ফুড ইজ অ্যা রিয়েল প্রব দেয়ার। ঠু স্পাইসি।'
- হট?
- ইয়াপ।
- লাইক য়্যূ, অর মোর?
- অই কুত্তা, শুওর, বান্দর। ডি জি এম।
- হোক্কে সুইট হার্ট।
- তাইলে খাস কি?
- লাঞ্চে 'টেস্ট অব ইন্ডিয়া'। কাঁচা মরিচ দিয়ে ডাইল-ভাত খাই। ডিনারে হোস্টেলের ফ্রায়েড রাইস। খাই আর কান্দি। খাই আর কান্দি।
শেন্টু গল্পে জয়েন করে - 'হাউ অ্যাবাউট ব্যাংকক?'
- লটজ অব ফান। ফ্রিডম। ফ্রেন্ড।
- গ্র্যাড কবে?
- দেরী আছে রে, দুইবার প্রোবেশন খাইসি।
- তারপরে এমবিএ?
- আরে না। পড়ালেখার গুষ্টি কিলাই। তোরা দেশে অনেক মৌজ মাস্তি করোস। আই ডোন ওয়ান্যা মিস মোর - - -
আমি এবার নিশিতার পাশের চেয়ারে বসি - 'দোস্ত আমারে ব্যাংকক নিয়ে যা। অ্যাবাক-এ ক্রেডিট নিবে না?'
- 'এই লাস্ট মোমেন্টে কি গিয়ে কি করবি? তোর ইন্টার্ন কবে?'
- 'ও-নো- ও, দিল্লী দূর আছে ইয়ার। আমারে ব্যাংকক নিয়ে যা। এইসব ক্যাচাল আর ভাল্লাগে না। '
- 'ডোন্ট অ্যাক্ট লাইক অ্যা কিড, হে-ই হোয়াটস আপ?' নিশিতা ভ্রু কুঁচকায়।
- 'বাপের ঘ্যানঘ্যান ভাল্লাগে না। হি আন্ডারস্ট্যান্ডস নাথিং।'
শেন্টু খ্যাকখ্যাক করে হাসে - 'শুরু হইসে?'
নিশিতার অ্যাটেনশন আমার দিকে।
'বাপরে কইলাম, তুমি রি-রোলিং স্টিল কারখানার মানুষ, ওখানেরই থাকো, এর বাইরে আইসো না। আমারে আমার মত চলতে দাও। বাপ বালছাল কিসসু বুঝে না। সারাদিন প্যানপ্যান। এত টাকা কই নিই, কিসে খরচা করি। এইসব ভাল্লাগে না।'
- 'পুঅর ফেলো!'
নিশিতার নি:শ্বাসটা একেবারে আমার বুকের ডেপথে টাচ করে।
'কী তোমরা আমারে বাদ দিয়া ধুমাইয়া আড্ডা দিতেসো?' লিকলিকে শরীরের নোরা 'ইউঊউ, ফেয়ারী উইচ' চিৎকারে কুঁকিয়ে ওঠে। নিশিতা উঠে নোরাকে লাইট কিস করে।
- 'সৌ লং টাইম - - -। '
- ' তোমরা কী এতো আলাপ করলা?'
- 'এমনিতে, কিসু না। ফাও গ্যাজাইতেছি।'
নোরাকে পেয়ে শেন্টুর মুখে হাসি ফুটছে। এই সুযোগে আমাকে কিক-কমেন্ট করে - 'আমাগো ম্যাক্সের মন উদাস, একটা চিক দরকার।'
নোরা আঁতকে উঠে - 'ক্যা, রিপার খবর কি?'
- 'হু ইজ রিপা?' নিশিতাও কিওরিয়াস।
আমি ব্রোকেন হার্ট, বুক চাপড়াই - 'নাইটমেয়ার, অল নাইট মেয়ার।'
- 'দোস্ত তুই টোটাল কয়টা ড্রপ আউট করলি, হিশাব আছে?'
- ' হাইড আউট শেষ?' নোরাও খোঁচা দেয়।
- 'আবার জিগস? রোমিও নেভার ক্রাইস।' নিশিতা আমার পিঠে চাপড় দেয়।
- 'আয়্যাম হাঙরী।'
- 'মী ঠু।'
ডমিনাসে তখন ব্রায়ান অ্যাডামস - 'আই উ'ন্ট কুইট, অ্যা উইল গো ডাউন উইথ মাই শীপ, আনটিল আই ফাইন্ড য়্যূ।'


তিন
নিশিতাদের রুফটপে সুইমিং পুল। আমাদের এবারের গেদারিংটা অনেকদিন পর। হাল্কা শীত শীত লাগতেসে। নোরা সাভারিয়া জ্যাকেট পরেছে। নতুন ট্রেন্ড।
- 'তোরা কেউ বইমেলায় গেসিলি?'
- 'হোয়াট?'
- 'বই মেলা। একুশের মেলা।' নিশিতা মাথা তুলে তাকায়।
- 'য়্যূ গট ট্র্যাশ ইন ব্যাংকক, প্যাল। হোয়াট দ্য হেল দেয়ার? বেটার গো এটসেট্রা, বুক ওয়র্ম; য়্যূ উইল ফিল বেটার।'
- 'আমি গেসিলাম ওয়ান্স, প্রোগ্রাম ইভেন্ট।' নোরা একটি প্রাইভের রেডিওর জকি। হেভবী পপুলার। পোলাপাইন পুরা পাংখা। রিসেন্টলি একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়ে পড়তেসে। ফেব্রুয়ারী মাসে মিউজিক ট্র্যাকের ফাঁকে ফাঁকে একুশে নিয়ে ইনফো দেয়া লাগে।
শেন্টু ব্যাগ থেকে হ্যানিক্যান বের করে - 'ক্যান য়্যূ ম্যানেজ সাম হট ওয়াটার?'
নিশিতা তুচ্ছ হাসি হেসে ভেতরে যায়।
- 'ইটস গন্যা বি অ্যা মেমোরঅ্যাবল নাইট আউট'। শেন্টু গুনগুন করে সুর তোলে।
নিশিতা আসতেই নোরা চিৎকার দেয় - 'ও-ই য়ে। পু-উ-রা জটিল, গুরু।'
আমি তাড়াতাড়ি হান্ড্রেড পাইপার্স হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করি - 'ফ্রম ব্যাংকক?'
- 'হোয়াটস আপ ড্যুড? লেভেল পড়ে দ্যাখ, জি বি জি' নিশিতা ধমক দেয় - 'অনেক কষ্টে কাস্টমস পার হইসি'।
- 'ফা-টা-ই-য়া ফেলছোসরে দোস্ত - - -'। শেন্টুর উল্লাস।

রাতের গভীরতা বাড়লে কুয়াশার কারণে চাঁদ দেখা যায় না। আমরা পারস্পরিক ঘন হয়ে আসি আর রুমের ক্যান্ডেলগুলো রোমান্টিক হয়ে ওঠে ক্রমাগত। নিশিতা আমার কানের কাছে ফিসফিশ করে - 'উইল য়্যূ বি মাই ভ্যালেন্টাইন?' কিউপিডের তীর এবার আমাকে অবশ করে দেয় - 'লেটস মেইক আউট টু নাইট - - ?'

ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁলে গ্লাসের টুং-টাং শব্দে চিয়ার্স ধ্বনিত হয়।
শেন্টু-নোরা আমাদের ভ্যালেন্টাইন উইশ করলো কিনা সেটা মনে পড়ে না।
.
.
.
_______________________

ফুটনোট:
ছবিটি এখান থেকে নেয়া।
গল্পটির অনুপ্রেরণা, বছর দুই আগের সাপ্তাহিক২০০০ এর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন 'জেনারেশন ডিজুস'।
.
.
.
লেখাটির কিছু কিছু শব্দ নতুন মনে হতে পারে। তাদের জন্য 'সরল ডিজুস ডিকশনারী':
১) আবার জিগস = পুনরায় জিজ্ঞাসা
২) হোয়াট'স আপ ড্যুড! = বন্ধু কি খবর?/কি হয়েছে?
৩) ই-য়ো ম্যা-এ-ন = আরে তুমি?
৪) হেই হোয়াটস আপ = কুশল জিজ্ঞাসা
৫) পু-উ-রা টশকি = হতভম্ব হওয়া অর্থে
৬) ফাও গ্যাজানো = অহেতূক আড্ডা
৭) আজাইরা প্যাচাল = কারণবিহীন বকবক
৮) ও-ই য়ে = আশ্চর্য হ্যাঁ-বোধক অর্থে
৯) ও-নো-ও = না বোধক
১০) ফা-টা-ই-য়া ফেলসি = দারুণ বা অসাধারণ অর্থে
১১) প্যাল = কাছের বন্ধু সম্পর্ক
১২) জোশ = মুগ্ধতা প্রকাশ
১৩) নাইট আউট = রাতের পার্টি (সারারাত ব্যাপী)
১৪) ড্রপ আউট = প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া
১৫) ধুমাইয়া আড্ডা = দীর্ঘক্ষণ আড্ডা
১৬) মেইক আউট = অতি ঘনিষ্টতার সম্পর্ক
১৭) হাইড আউট = ঘনিষ্টতার স্থান/ রোমান্স স্পট
১৮) পাংখা = ভক্ত, অনুরক্ত/ অতিরিক্ত স্মার্ট
১৯) খুব লাল = রোমান্টিকতার মাত্রা বোঝাতে
২০) ক-ঠি-ন = মুগ্ধতা প্রকাশ।
২১) ঝাক্কাস = চমৎকার
২২)চিক = বান্ধবী
২৩) ডি জি এম = দূরে গিয়া মর
২৪) জি বি জি = গাধার বাচ্চা গাধা
২৫) ক্ষ্যাত = রুচিহীন/পুরোনো


.
.
.

Read more...

07 February, 2008

সিনে-মারি-ভিউ : মহুয়া মুভিজের 'মেয়েরাও মাস্তান'

মফস্বল থেকে সরকারী চাকরীর বদলী সূত্রে অধ্যাপিকা শায়লা চৌধুরী তিন মেয়েসহ ঢাকা আসেন সিনেমার প্রথম দৃশ্যে। বড় মেয়ে মুনমুন, মেজো মেয়ে সোনিয়া, ছোটো মেয়ে নবাগতা। (বাণিজ্যিক বাংলা ছবির ব্যবসা সফল কম্বিনেশন। পরিচালক স্বপন চৌধুরী নি:সন্দেহে বুদ্ধিমান মানুষ।)

ঢাকায় নতুন আসা পরিবারটির জন্য বাসা বাড়ীর ব্যবস্থা করে অধ্যাপিকার প্রাক্তন ছাত্র নাসিম - আজাদ। নাসিম (নায়ক নাঈম) নামকরা আইনজীবি। যদিও মাফিয়া চক্রের বড়বড় মামলা ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহ নেই, টাকার সাগরে তার নিত্য গোসল। গোলগাল মার্বেল শরীর নিয়ে আইনের প্যাঁচে কিভাবে মামলা জিততে হয় সেটা নখদর্পনে। নাঈমের সাথে মুনমুনের একটু ইটিশপিটিশ চলছে, সেটা প্রাথমিক সংলাপেই আইডিয়া দেয়া আছে। (অতএব, দর্শক অপেক্ষা করে থাকো, দেখো কী হয়)। আকর্ষণ শেষ হয়নি এখনো। নাঈমের ছোটো বোন পলি আসে দৃশ্যে। (নায়িকা সংখ্যা তিন থেকে চার। পরিচালক অবশ্যই বাহবা পাবেন।)

অন্য ছাত্র আজাদ (আলেকজান্ডার বো) জাদরেল পুলিশ ইনস্পেক্টর। কাঁধ পর্যন্ত চুল, সাজানো গোঁফ। ভীষণ ন্যায়বান। হঠাৎ ফোন পেয়ে ছুটে যায়, এক মহিলা খুন হয়েছে পার্কে। গিয়ে দেখে নায়িকা সোনিয়া মাটিতে পড়ে আছে। হতবাক বো ছুটে গিয়ে মৃত সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। ভেঁউ ভেঁউ। কিন্তু এ কী কান্ড! মৃত সোনিয়া এবার বো'কে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে। (বুঝা গেল, এটা নায়িকা সোনিয়ার সাজানো নাটক)। নায়ক ভীষণ বিরক্ত, কারণ তিনি পুলিশ অফিসার, এসব পিতলা পিরীত পুলিশি পোশাকে মানায় না। সেজন্যই (?) রাগের বশে সোনিয়াকে টেনে ধরে ভীষণ গাঢ় চুম্বন। তারপরে? তারপরে আর কি? যা হবার তাই হলো - গান। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গান - এক ঝাঁক পাখি ওড়ে আকাশে, ভোরে ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে, চলো দুজন আজ হারিয়ে যাই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে, এখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই। আইউব বাচ্চুর গগন বিদারী কন্ঠের সাথে ক্যামেরাম্যানের দুষ্টু চোখের উঁকিঝুকি।

মাত্র গেলো সিনেমার পনেরো মিনিট।
দর্শক ধরার প্রাথমিক কাজ শেষ।
এবার শুরু হয় অ্যাকশন পর্ব। মুনমুন-সোনিয়া জুটি ঢাকা শহরে শার্ট-প্যান্ট-স্কার্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। ছিনতাইকারী পকেটমারদের ধরে আস্ত ধোলাই দেয়। সমবেত পুরুষদের লজ্জায় ফেলে কড়া সংলাপে - "আপনারা কাপুরুষের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছেন, আপনারা ভয় পান বলেই সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করতে সাহস পায়। প্রতিবাদ করতে না পারলে ঘরে বসে থাকেন। মেয়েরা এখন আর অবলা নেই। আপনরা পুরুষরা যেটা পারেন না, সেটা এখন আমরা মেয়েরা পারি।" (এই কাহিনী সংলাপ এর মালিক যোশেপ শতাব্দী)।

দুই নায়িকা শুধু রাস্তায় ঘুরে - দেখালে কাহিনী গাঁজাখুরি হয়ে যায়। সেজন্যই মুনমুন-সোনিয়া একটি কলেজে পড়ে, নাম বিদ্যারত্ন কলেজ। কলেজের ক্যাডার 'হিটলারের' সাথে প্রথম দিনেই বচসা বাধে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুনমুনের জিহাদ ঘোষণা, এবং সম্মিলিত মারামারিতে হাজির হয় নায়ক মেহেদি। মারামারি শেষ, মেহেদির বুকে মাথা রেখে পলির বিনীত প্রেম নিবেদন। উঁহু, মেহেদি মোটেও সেরকম নয়। বিএসসি পাস করেও মোটর মেকানিক মেহেদি হাত জোড় করে মাফ চায়, পলির জ্বালাতন থেকে মুক্তি চায়। এই ক্লাইমেক্সে আসে চিরাচরিত সংলাপ : 'ধনী আর গরীবের ভালোবাসা হয় না। আমি বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চাই না।' ইংরেজী সংলাপ : "আই হ্যাভ নো উইকনেস টু ইউ - আপনার প্রতি আমার কোন দূর্বলতা কখনো ছিল না, এখনো নেই।" অথচ পলি মেহেদির কাছে শুধু মনই চায়।

পরের দৃশ্যে পলি পুরুষ সেজে মেহেদির মোটর মেকানিক দোকানে যায়। গাড়ীর মনে হইতাছে করবোলেটরে তেল আইসে টাইপ সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে কিছু যৌথ ভাঁড়ামি। সাথে পাবেন - বিটিভির শুভেচ্ছা খ্যাত এবং মোল্লা সল্টের বিজ্ঞাপনের সেই, হ্যাঁ সে-ই পাপ্পুর কিছু কাতুকুতু দেয়া অভিনয়।

গেলো তিরিশ মিনিট।

এবার ভিলেনের আগমন। "ফুল - বেলাডিফুল, তুই আমার কথা শুনোছ নাই, তুই আমার ল্যাঞ্জায় পাড়া দিসোছ" - বলে আস্তে আস্তে এগিয়ে জ্যান্ত একটা মানুষকে বাঁকা ছুরি দিয়ে খুন করে ফেলে বাসু, শীতল সংলাপের কালো মাথার বড় বড় চোখের ভিলেন - ডিপজল। ডিপজলেরই ছোট ভাই কলেজের ক্যাডার হিটলার।

এবার চরিত্রগুলোর একটা লিংক পাওয়া গেলো। কাহিনীতে ড্রামা-সাসপেন্স আসে ক্রমাগত। মুনমুন-সোনিয়া-পলির শত্রু হিটলার, হিটলারের বড় ভাই ডিপজল, ডিপজলের প্রাইভেট ল'ইয়ার নাঈম, সরকারী পক্ষের পুলিশ নায়ক বো। এখানে নাঈম জয়ী, বো ট্রান্সফারড বান্দরবানে। তাহলে এখন কী হবে? কাহিনী কোনদিকে যাবে?

দর্শকের অপেক্ষার অবসান ঘটায় মুনমুনের অভিমান। এ অভিমান ভাঙাতে নায়ক নাঈমের ব্যাঙ লাফানি নাচ। আর নাচুনি বুড়ি মুনমুন ঢোলের বাড়ি পেয়েই চাকবুম-চাকবুম। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাক, অনন্তকাল চলে যাক, সূর্যটা ডুবে যাক পৃথিবী ঘুমিয়ে থাক, ওগো সোনার মেয়ে তোমাকেই ভালোবাসি, ওগো অবুঝ ছেলে আমি তো তোমারই আছি। আইউব বাচ্চু - কনকচাঁপার মেলোডিয়াস গানের বিধ্বস্ত দৃশ্যায়ন। দশ্যি মেয়ে পৃথুলা মুনমুনকে ক্যামেরার ফ্রেমে আনার চেষ্টা স্পষ্টত:ই ব্যর্থ। অন্যদিকে লাফালাফির কবলে কুমড়াকৃতির নাঈমকে খুঁজে পাওয়া মুসকিল।

নাচ হলো, গান হলো, মারামারি হলো। এবার কি? হ্যাঁ কৌতুক সস্রাট দিলদার আর অয়োময়ের পাখাল আফজাল শরীফ হাজির। দুজনেই পুলিশের হাবিলদার। কলা খায় বেশী। প্রেমিকার খোঁজে উতলা। দিলদার খোজ পায় নাছরিনের। দু'জনের গভীর প্রেমের স্থুল সংলাপ। হাসানোর প্রানান্ত চেষ্টা, একটানা পঁচিশ মিনিট।

সিনেমা অর্ধেকে আসতে আসতে আরও কিছু মারামারি এবং মেহেদী-পলির বিয়ে। সাগরের ঢেউ হয়ে আছো তুমি মিশে, আমি আছি আকাশে, বাতাসে মিশে আমি আছি পাশে। বাসর সজ্জার ঘনিষ্ঠতায় এক চরম বিরহের গান। দর্শককে সুষ্পষ্ট ইংগিত দেয় সামনে বিপদ আছে। ঠিক। সে রাতেই সন্ত্রাসীদের হামলা, ছুরিকাঘাতে খুন হয় মেহেদী। আদালতে দফারফা। বোনের স্বামী খুনীকে অপরাধী প্রমাণে ব্যর্থ নাঈম মদের বোতলে শরাবময়। আর ভিলেন ডিপজল নিশি-উৎসবে মেতে ওঠে। সখী পরিবৃতা হয়ে "আমার রাজ্যে আমি আমি রাজা, ব্লাডি ফুল ফুল ফুল" নাচে গানে জলসা জমে।

এদিকে তিন নায়িকা একত্র হয়। স্বামী হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া পলি। আইনের উপর তাদের আস্থা নেই। আবারও যোশেপ শতাব্দীর পর্দা কাঁপানো সংলাপ - দেশে আইন বিক্রি হয় সেদেশে আইনের কোন মূল্য নেই, আমরা আইন মানি না, আমরা যা করবো সেটাই হবে আইন। শত্রুর মোকাবেলা হবে আমাদের প্রথম কাজ। প্রথম অভিযান হকি স্টিক দিয়ে শুরু। ডিপজলে সাংগপাংগ পরাজিত। প্রতিহিংসায় ডিপজল হানা দেয় মুনমুন-সোনিয়ার বাসায়। মুনমুনের মা অধ্যাপিকা শায়লা চৌধুরী খুন, ছোটো মেয়ের সম্ভমহানি এবং আত্মহনন। এসব ঘটনা পরম্পরায় মুনমুন-সোনিয়া-পলি অগ্নিরূপ ধারণ করে। কালো পোশাকে রাত হলেই অপারেশন। যেখানে অন্যায় অবিচার সেখানেই হানা। পত্রিকায় গরমাগরম রিপোর্ট। কারা এই লেভি রেমবো‌? পুলিশ ডিপার্টমেন্টে তোলপাড়।

সিনেমার নামকরণের সার্থকতা প্রমাণিত হলো - মেয়েরাও মাস্তান,।রাতভর অপারেশন। খুন হয় হিটলার। ভাই হত্যার প্রতিশোধে এবার ডিপজলও 'কোলোজ করা' (মেরে ফেলা) শুরু করে। লেডি রেম্বোরাও আগ্রাসী। তারা গেরিলা হামলায় পৌঁছে যায় ডিপজলের মদের আনন্দ জলসায়। ঝলমলে আলোয় আইটেম সং - "আমি দিওয়ানি, আরো কাছে এসো না, এই জওয়ানী লুটে নাও না"। নাচ গান শেষ করেই মাতাল ডিপজলের ওপর হামলা। ঢাকার রাস্তায় মাইলের পর মাইল দৌড়ানি। গুলি খেয়ে খুন হয় ডিপজল।

আদালতে কাঠগড়ায় হাজির তিন মেয়ে, সাজগোজে তখনো লেডি রেম্বো। আইনের কাছে সহজ স্বীকারোক্তি। তবে আইনজীবিদের লড়াইকে ম্লান করে দেয় তিন নায়িকার ঝাঁঝালো সংলাপ। তারা কেনো মাস্তান হলো, কেনো রেম্বো হলো এসব দগদগে ডজন খানেক প্রশ্ন বিচারকের কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। বিচারক অবশ্যই প্রাজ্ঞ মানুষ, তাই রায় হয় - যেহেতু অভিযুক্ত তিনজন সমস্ত অপরাধ করেছে সমাজে শান্তি আনা ও সন্ত্রাস দমনের জন্য সেহেতু আসামীদের সুস্থ জীবনের সুযোগ করে দিয়ে মৃত্যুদন্ডের বদলে পাঁচ বছরের কারাদন্ড প্রদান করে।

আশা করা গিয়েছিল - শেষ দৃশ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিন নায়িকা বের হয়ে আসবে, ফুলের মালা হাতে নায়করা এগিয়ে যাবে, আবার গান এবং সমাপ্ত লেখা ভেসে উঠবে পর্দায়। তেমন কিছু হলো না। আদালতের রায়ের পর স্কৃনে ভেসে ওঠে - বিবেকের বাণী - "দেশের আইন নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। সমগ্র দেশবাসীকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে হবে"।

আড়াই ঘন্টার সিনেমায় আমরা যা শিখলাম:
১) ছেলেরা আগে মাস্তান ছিলো, এখনও আছে। তবে এবার ছেলেরা একা নয়, সাথে মেয়েরাও মাস্তান।
২) কিছু করার না থাকলে স্লো ইন্টারনেট স্পিড নিয়ে আড়াই ঘন্টায় ডাউনলোড এবং আড়াই ঘন্টায় সিনেমা দেখা মিলিয়ে মোট পাঁচ ঘন্টা সময় কাটানোর অনেক উপকরণ এখন আমাদের হাতের নাগালেই - - -।
৩) টিকিট না কেনায় পয়সা উসুলের চিন্তা নেই। তবে পাঁচ ঘন্টার ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স হিসেবে আরও এক ঘন্টায় একটা রিভিউ লিখতেই হয়। :)

.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP