30 January, 2007

ভালোবাসার এপাশ ওপাশ

"গত ছয় মাসে লন্ড্রি সাবানের বিক্রি কমলেও ডিটারজেন্ট পাউডারের বিক্রি বেড়েছে আগের তুলনায় প্রায় টুয়েন্টি পার্সেন্ট। নতুন আইটেম হিসেবে আমাদের কোম্পানীর ডিটারজেন্ট পাউডার যে মার্কেট পেয়েছে - এরকম চললে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমরা টোটাল মার্কেটের ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার করে ফেলবো - - -।"
শুনে ভ্রু কুঁচলে উঠে আদিল রহমানের।
ইশারায় থামায় মোহাইমেন চৌধুরীকে। মোহাইমেন চুপ হয়ে যায়।
"ডিটারজেন্ট পাউডার এসে যদি লন্ড্রি সাবানের মার্কেট দখল করে তাহলে লাভ কি? যোগ বিয়োগ করে ফলাফল তো একই হলো" - কিছুটা রাগত:স্বরে বলে আদিল রহমান; কোম্পানীর প্রমোশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন চীফ।
ওয়াশিং ক্যাটাগরী ম্যানেজার মোহাইমেন নিজেকে সামলে নেয়, বলে - "স্যার, এটাকে আমরা 'ক্যানিবালিজম ইফেক্ট' বলতে পারি। নতুন কোন প্রোডাক্ট প্রাথমিক পর্যায়ে সমগোত্রীয় অন্য প্রোডাক্টের মার্কেট ডাউন করতে পারে, কিন্তু লং টার্মে সব ইকুলিব্রিয়াম পয়েন্টে অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে।"
নিজের ঠোঁট দুটো সুক্ষ্ম করে মাথা নাড়ে আদিল - "নো, নেভার। আমি বারবার বলেছি, আমাদের ফোকাস হবে সাসটেইনেবল গ্রোথ। এ অবস্থায় যদি কোন কারণে ডিটারজেন্ট পাউডার মার্কেট হারায়, তবে আমরা লন্ড্রি সাবানের মার্কেটও আর ফিরে পাবো না! য়্যূ শু্যড রি- ফরমুলেট য়্যূর স্ট্র্যাটেজি, মি মোহাইমেন!"
মোহাইমেন মন খারাপ করে চেয়ারে বসে পড়ে।
তারপর প্রেজেন্টেশন শুরু করে সুলতানা আফরিনি; কোম্পানীর ফুড ক্যাটাগরী ম্যানেজার। মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনে পাই চার্ট, বার চার্ট, টাইম সিরিজ এনালাইসিস টপাটপ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে। মার্কেটে ফুড ক্যাটাগরীর অবস্থা খুব ভালো।
আদিল ঘড়ি দেখে। বারোটা সাত। আরো চারজনের প্রেজেন্টেশন বাকী। প্রতি ছয় মাস পরপর প্রোডাক্ট ক্যাটাগরী রিভিউ মিটিং (পিসিআরএম) হয়। তখন খুব টেনশন যায়। কারণ, সব প্রোডাক্টের বিস্তারিত আদিলই উপস্থাপন করবে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছে। মূল ধাক্কাটা তার উপর দিয়েই যাবে।
সুলতানার প্রেজেন্টেশন প্রায় শেষের দিকে, আদিলের বুক পকেটে মোবাইলের ভাইব্রেশন। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে 'ফারা'। বুকটা ধুকধুক করে খানিক। ইসঃঃ, খেয়ালই ছিল না পিসিআরএম-এর কথা। ফারা উইম্পিতে অপেক্ষা করছে। গতরাতে ফারার সাথে কথা বলার সময় একবারও মনে পড়লো না! নিজের উপর খুব বিরক্তি লাগে। মোবাইলটা কেঁপে চলেছে নি:শব্দে। অবশেষে 'এক্সকিউজ মি' বলে বোর্ডরুমের বাইরে যায় আদিল। দ্রুত পায়ে নিজের রুমে চলে আসে, দরজাটা ধাক্কা দিয়ে - "হ্যাল্লো ডিয়ার! প্লিজ একটু ওয়েট করো, প্লিজ! - - - প্রমিজ, দেড়টার মধ্যে চলে আসবো, জাস্ট একটু বে-বি - - -।'
হালকা চনমনে মেজাজে আদিল ফিরে আসে মিটিংয়ে। একের পর এক প্রেজেন্টেশন চলে। আদিল ঠিক কনসেনট্রেট করতে পারে না। মোবাইলটা বারবার কাঁপছে। ফারার মিসকল। এসএমএসও এলো কয়েকটা। আদিলের মনে তখন ফারার কাটাকাটা চোখ, চঞ্চল মুখ। মার্কেট শেয়ার, গ্রোথ, প্ল্যান কিছু আর ভালো লাগছে না। প্রেজেন্টেশনগুলো ফ্যাকাশে হয়ে আসে। ক্যাটাগরী ম্যানেজারদের রিপোর্টের হার্ড কপিগুলো ভালোভাবে পড়তে হবে। মাথার কোষগুলো আপাতত: ফারায় ছেয়ে গেছে। ফারা একটি উইমেন ম্যাগাজিনের পাবলিশার কাম এডিটর। সব সংখ্যার শেষ পৃষ্ঠায় আদিলের কোম্পানীর বিজ্ঞাপন যায়। আগামী সংখ্যায় বোধ হয় মাঝের দু'পাতায় বিজ্ঞাপন লাগবে, রঙীন। গতরাতে ফারা এমনটাই তো বলছিল বোধ হয়! আদিল গতরাতের কথা মনে করতে পারছে না কেনো? হুইস্কির মাত্রাটা কি বেশী হয়ে গিয়েছিল! শায়লাটা খুব দুষ্টু। আদিলকে এলোমেলো করে দিতে ভালোবাসে। শায়লা কি করছে এখন? আদিলের হাসি পায়। অসময়ে ভুল মানুষের কথা মনে আসে কেবল!
- - -দ্রুত পায়ে উইম্পিতে ঢোকে আদিল। মিল্ক শেকের স্ট্র-তে ঠোঁট লাগিয়ে বসে আছে ফারা।
- স্যরি ডিয়ার, টু মিনিটস লেট! বলে আদিল ঘড়ি দেখে।
ফারা মুচকি হাসে।


দুই
সকালটা অমনভাবে শুরু হবে ভাবেনি আদিল। সাদিয়ারই বা দওষ কোথায়! সারাদিন কত্তো খাটাখাটনি করে। বাচ্চা দুটোকে দেখাশোনা করা, স্কুলে নেয়া, টিউটর ঠিক করা, রান্নাবান্না - সব সাদিয়াকেই করতে হয়। আজ সকাল আটটার আগে অফিসে আসতে হবে এ কথাটা সাদিয়াকে বলাই হয়নি। আদিল কিছুটা আত্মগ্লানিতে ভোগে। একদিন সকালে বাসায় নাস্তা না করলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হয়? ফ্রিজে স্যান্ডউইচ তো ছিলই, গরম করে খাওয়া ক্সেতো! আর যার জন্য সকাল সকাল অফিসে আসা, সে-ই তো এলো না! ঘড়িতে সকাল দশটা দশ। উর্মিলা চৌধুরীর কোন দেখা নেই। সাদিয়াকে ফোন করে স্যরি বলে নেয়া যায়। ভেবেচিন্তে সাদিয়ার মোবাইলে ফোন করে আদিল
- হ্যালো কি করছো?
এই তো পুনম-প্রেমাকে স্কুলে নামিয়ে দিলাম।
এখন যাচ্ছি ডেন্টিস্টের চেম্বারে। পূনমের দাঁতে ব্যথা ছিল গতকাল। দেখি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় কিনা। বাসায় ফ্রিজের মিস্ত্রী আসবে দুপরে। ডীপফ্রিজ কাজ করে না ঠিকমতো।
- আমাকে জানাওনি কেন এসব?
- তোমাকে জানানোর সময় পেলাম কই? বাসায় ফেরো রাত বারোটায়, আবার সকাল সাতটায় অফিসে যাও
- আচ্ছা রাখি এখন। আদিল কি বলবে ভেবে পায় না।
শুধু অবাক মনে ভাবতে থাকে সাদিয়া কী অসাধারণ এক মেয়ে ! এমনভাবে কথা বললো যেন কিছু হয়নি। অথচ সকাল বেলার বিচ্ছিরি ঝগড়াটা আদিল এখনো ভুলতে পারছে না। মনের ভেতর কেবল খচখচ করে। আবার মোবাইল বাজে। সাদিয়ার ফোন
- প্লিজ নাস্তাটা করে নিও। আর দুপুরের খাবার ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দেবো। কি খাবে দুপুরে?
আদিলের মনটা কেন জানি ভালো হয়ে যায়। বলে, কচুশাক খাবো, কচুশাক ভাজি চিংড়ি মাছ দিয়ে।
সাদিয়া হেসে উঠে
- কচুশাকের তো এখন অফ-সিজন। তবুও দেখি পাওয়া যায় কিনা। ড্রাইভারকে কারওয়ান বাজার পাঠাবো। ওখানে না পেলে মিরপুর ছয় নম্বর বাজারে।
- না, না! অতো কষ্ট করতে হবে না। বাসায় যা আছে পাঠিয়ে দিও, অসুবিধা নেই।
- লেট মি হ্যাভ অ্যা ট্রাই স্যার! সাদিয়া হাসি দিয়ে লাইন কাটে।
আদিল আবার চোখ রাখে কম্পিউটারে। একসেস ফাইলে গত সপ্তার সেলস রিপোর্ট। নারিকেল তেলের বিক্রি বেড়েছে খুব। বিস্কিটের বিক্রিও বেড়েছে। লন্ড্রি সাবানের অবস্থা এ সপ্তাহে আরো খারাপ। মোহাইমেনকে ঝাড়ি দিতে হবে। সফট ড্রিংকসের অবস্থা স্টাবল। আবার উর্মিলার কথা মনে পড়ে। কোম্পানীর সফট ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মডেল। আগামী মাসে নেপালে শু্যটিং। আজ ফাইনাল অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন হবে। পাশের ডেস্কে রাখা রিসেন্ট ম্যাগাজিনগুলো হাতে নেয় আদিল। প্রায় সব বিনোদন ম্যাগাজিনে উর্মিলার ছবি আছে। ফটো সুন্দরী উর্মিলা, শোবিজের নতুন সেনসেশন। হঠাৎ মোবাইল বাজে। ফারার ফোন।
- হাই ডিয়ার
- হ্যালো
- তোমার অ্যাডের ডেমো পেলাম না এখনো! আহ্লাদী স্বরে ফারা বলে।
- ডোন্ট ওয়ারি, আজই পাঠিয়ে দিবো। কোনটা দেবো, নারিকেল তেল নাকি সফট ড্রিংকস?
- না, না। এবার শ্যাম্পুরটা দাও। মাঝে দু'পৃষ্ঠা।
- কালার যাবে তো?
- হুম, কালার।
- ওকে ফারা, এভরিথিং উইল বি ফাইন।
- ওহ! শোনো, ম্যাগাজিন নেক্সট ইস্যু মার্কেটে আসা পর্যন্ত আমি খুব বিজি থাকবো। তাই দেখা হবে না।
- ওকে, আমিও নেপাল যাবো এর মাঝে। শু্যটিং আছে।
- তাহলে ফোন করো রেগুলার - - -
- শিউর, আই উইল।
- গুড বাই।
- বা-ই - -- !
তারপর দরজার সামনে কাঙ্ক্ষিত মুখ। উর্মিলা চৌধুরী।
আদিল ইচ্ছা করেই গম্ভীর হয়, বলে - কাম ইন প্লিজ!
- আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি, আদিল ভাই।
- কেন?
- এই যে দেরি করে ফেললাম---। উর্মিলা আমতা আমতা করে।
- আসার কথা আটটায়। আসলে এখন, আবার স্যরি বলো?
- খুব ঝামেলায় ছিলাম আদিল ভাই। নেক্সট টাইম এমন হবে না আর।
- বি ফোকাসড উর্মিলা। অন্তত: নিজের ক্যারিয়ারের জন্য কমিটমেন্ট রাখো, পাংচুয়াল হও।
আদিল ঘড়ি দেখে। একটা গানের সুর মনে ভাসছে, ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার অথচ কথাগুলো মনে পড়ছে না। বারবার চেষ্টা করেও মনে আসছে না। এমন হচ্ছে কেন আজকাল? আইবিএ থেকে ইন্টার্নশীপ করতে আসা ছেলেটা এই নিয়ে তিনবার দরজার ওপাশ থেকে উঁকি দিলো। ছেলেটাকে কড়া ঝাড়ি দেতে হবে, মোহাইমেনকে যা দেয়া হবে তারচেয়েও বেশি মাত্রার ঝাড়ি।
এমডির রুমে প্রায় ঘন্টাখানের আলাপের পর উর্মিলাসহ আদিল বেরিয়ে আসে। দুজনের মুখে হাসি। নেক্সট উইকে ফ্লাইট। তিনদিন শু্যটিং চলবে।
-চলেন আদিল ভাই, বাইরে লাঞ্চ করি।
- থ্যাংকসঃঃ, আজ না। আরেকদিন।
- প্রবলেম কি? চলেন না প্লিজ! উর্মিলা ক্লাস সেভেনে পড়া কিশোরীর মতো হাত নাড়ে।
- না! আজ অফিসে অনেক কাজ। আদিল মাথা নাড়ে।
- জাস্ট ওয়ান আওয়ার লাগবে, এই তো! প্লিজ চলেন!
উর্মিলার ধারালো চোখে তাকিয়ে আদিল আর না করতে পারে না। ইদানিং কাজের ফাঁকে ঐ চোখদুটো বারবার উঁকি মারে আদিলের মনে। তবে নগদে প্রতিদান নেয়াটা আদিলের ভালো লাগে না। নেপাল ট্যুর শু্যড বি অ্যা গুড চান্স - -- -।


তিন
সন্ধ্যা পর্যন্ত খুব কাজের চাপ যায়। সাড়ে সাতটায় শায়লা আসলো অফিসের সামনে। শায়লার বাসায় যায় আদিল। শায়লা একটি অ্যাড ফার্মের কর্পোরেট ক্লায়েন্ট অফিসার। আদিল শায়লাকে প্রতি মাসে অনেকগুলো বিজ্ঞাপনের অর্ডার দেয়। অফিসে শায়লার পারফরম্যান্স সব সময় সেরা। আদিল তার সাফল্যের সিঁড়ি। আজ সন্ধ্যায় ঐ সিঁড়ির আরো এক ধাপ এগোনোর লাফ দেবে শায়লা। ড্রয়িং রুমে বসে থাই স্যুপ আর অন্থন খেতে খেতে এলোমেলো গল্প হয় দু'জনের মাঝে। দুপুরে ভুলে যাওয়া গানের লাইনগুলো আদিলের মনে পড়ছে এখন - "দেওয়াল ঘড়িতে এগারোটা বেজে কুড়ি/জানালার কাছে রাত জাগে একা উর্মিলা চৌধুরী"। আদিলের আবারো হাসি পায়। অসময়ে ভুল মানুষের কথা মনে আসে কেবল! তবুও সন্ধ্যার আধো আলো-আধো অন্ধকারে ভায়োলেট রোমান্টিসিজম ঘিরে রাখে দুজনকে। সিডি প্লেয়ারে বাজছে ডন ম্যাকলিনের 'ক্যাসেল ইন দ্য এয়ার'।
রাত এগারোটায় কম্পিউটার অফ করে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আদিলের হঠাৎ চোখ যায় রুমের ডেস্কের উপর টিফিন বক্সে। সারা শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। আদিল এক এক করে বক্স খুলে দেখে ভাত, সর্ষে ইলিশ, কচুশাক-চিংড়ি মাছ ভাজি, কুঁচি কুঁচি করা সালাদ। এক টুকরা আমের আচার। দুপুরের খাবার। মনটা খারাপ হয়ে যায়। সব খাবার টয়লেটে ফ্লাস করে দেয় আদিল।
বাসায় ফিরতে রাত বারোটা পার। পূণম-প্রেমা ঘুমিয়ে পড়েছে। সাদিয়া টেবিলে খাবার গরম করে দেয়। আদিল আস্তে আস্তে খায়।
- দুপুরে কচুশাক স্বাদ হয়েছিল? সাদিয়া নীরবতা ভাঙে।
- হুম, খুব টেস্ট হয়েছিল! সাথে আমের আচার হওয়াতে আরো ভালো লেগেছে - - -।
- সালাদটা ফ্রেশ ছিল?
- সালাদ ঠিক ছিল, তবে ইলিশ মাছে লবণ একটু বেশী হয়েছে।
- হায় হায়! কী বলো! খেতে পারোনি?
আদিল হাসি দেয়।
মন খারাপ করছো কেন? খারাপ হয়েছে বলিনি তো! তবে লবণ আরেকটু কম হলে ভালো হতো, এই যা!
- আগামী দিন দেখো, লবণ একটুও কম-বেশী হবে না! সাদিয়া মুখটা অপরাধীর মতো করে রাখে।
আদিলের কষ্ট হয়। এরকম একটি অসাধারণ মেয়ে আদিলের বউ; আদিল ভাবতেই পারে না!
বিছানায় যেতে যেতে প্রায় একটা বেজে যায়। আদিলের খুব ক্লান্তি লাগে, দু'চোখের ওপর যেন পাথর চাপা পড়ছে। সারাদিনের ঘটনাগুলো দ্রুতগামী ট্রেনের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠে। শায়লা-ফারা-উর্মিলা-এমডি-মোহাইমেন সব যেন ট্রেনের এক একটা বগি। আদিল জানে, ওি বগিগুলোর কোনটায় আদিলের জায়গা নেই। পুরোটাই অভিনয়। জীবনের জন্য - জীবিকার জন্য অভিনয় করে যাওয়া। আপোস করে যাওয়া। মাঝে কেবল কিছু ভুল মানুষ-ভুল চোখ-ভুল হাসি-ভুল দুপুর-ভুল সন্ধ্যা। আপন কিছুই নয়। আদিলের আপন কেবল পূণম-প্রেমা, এ বিছানা বালিশ, বাম পাশের বালিশে শোয়া সাদিয়া। বুঁজে আসা চোখ দুটো খুলে আদিল তার কর্পোরেট খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বাম পাশে ফিরে আদিল আশ্রয় খোঁজে। ঝড়ে ভিজে যাওয়া উদভ্রান্ত কাক যেমন করে গৃহস্থ ঘরের ছাউনিতে আশ্রয় খোঁজে, তেমন করে আদিল আশ্রয় খোঁজে সাদিয়ার মাঝে। আশ্রয় পেয়ে কাক গা ঝাড়া দেয়, ভিজে যাওয়া পালকগুলো আলগা হয়ে যায়। জড়ানো কন্ঠে আদিল বিড়বিড় করে - "আমি মরে যাবো তোমার রক্তিম/মাংসের আগুনে কেঁদে কেঁদে, প্রিয়তমা!/নরম গোলাপী মাংস আমাকেও হত্যা করে যাবে!/তীক্ষ্ণ নখে ছিঁড়ে নেবে রক্তের বিষণ্ন চিবুক"। ঝড় থেমে গেলে ফরসা আকাশে কাক উড়াল দেয়। হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে বিহ্বল হয়। ততোক্ষণে রাত আরো গভীর হয়েছে। নাইট গার্ডের হুইসেলকে উপেক্ষা করে স্ট্রীট লাইটের আলোয় নেড়ি কুকুরগুলো একটানা ডেকে চলেছে। আদিল সাদিয়ার ঘরে বইছে শীতল বাতাস।

Read more...

15 January, 2007

শেষ রাতের শীতবস্ত্র

মফস্বলে এ সময়টায় খুব শীত পড়ে। আসার সময় বৌ যত্ন করে জ্যাকেট, শাল, সুয়েটার গুছিয়ে দিয়েছিল। সাথে দিয়েছিল তুশকা কাশির সিরাপ। দু'তিন দিনের ব্যাপার - তবুও সতর্কতা, যদি ঠান্ডা লেগে যায়! শেষ মুহূর্তে বড় মেয়ে যত্ন করে গলায় মাফলার জড়িয়ে বলেছিল - একদম অবহেলা করবে না!


দুই.
অবহেলা করার সময়টুকুও নেই। ভীষণ তাড়াহুড়া। অনেকগুলো মিটিং করতে হচ্ছে। টেবিল মিটিং, পথসভা, সমাবেশ, মহাসমাবেশ - পত্রিকার ভাষায় জনসংযোগ। মফস্বলে মিটিংয়ের চেয়ে কাজ বেশী, কোলাকুলি বেশী। এবার সময়টাও খুব গোলমেলে। তবে ভাগ্যজোরে শীত সিজনে ইলেকশন, কিংবা ইলেকশন সিজনে শীত! আহ্, কী অপূর্ব সমন্বয়! তাই শীতবস্ত্র বিতরণ চলছে জোরেশোরে। মাইকিং হচ্ছে, পোস্টারিং হচ্ছে। নামের আগে জনদরদী, সমাজসেবক, এলাকার নয়নমণি যোগ হচ্ছে হরহামেশা। শীর্ণ শরীরের হাড্ডিসার মানুষের হাতে হাসিমুখে রিলিফ তুলে দিয়ে বেশ তৃপ্তি পাওয়া যায়। পাশ থেকে সাঙ্গপাঙ্গের দল বলে দেয়
- "জিনিস নেও, তয় ভোটের সময় নিমক হারামী কইরো না..."
শুনে নেতা মুচকি হাসে।
দরকারী কথাগুলো দরকারী মুহূর্তে বলা খুব প্রয়োজন।


তিন.
শীতকালে হাঁসের মাংস খুব স্বাদ হয়। ঘন মসলা দিয়ে রান্না করা তরকারীটাও ভালো ছিল। খিদের চোটে গপগপ করে খাওয়ায় বারবার ঢেকুর উঠছে। লবঙ্গ দিয়ে রং চা বানানো হয়েছে। ডাকবাংলোর বৈঠকখানায় বসে নেতা আস্তে আস্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। গলাটা ঠিক রাখতে হবে। এই শীতে গলা বসে গেলে সমস্যা। চিৎকার করে ভাষণ না দিলে হাততালিও আসে না তেমন।
...রাত প্রায় এগারোটার মতো। পরদিনের প্রোগ্রাম ঠিক করে কর্মীরা ঘরে ফিরে গেছে। দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক বসে আছে - যদি দু'চুমুক লাল পানি পাওয়া যায়, শীতের রাতে শরীরটা গরম হতো খুব! কিন্তু নেতার ভাবভঙ্গী সুবিধার ঠেকছে না। বুঝতে পেরে নেতা নিজেই বললেন
- ঢাকায় আইসো, তখন জমবো নে। বুঝো না, এখন ইলেকশনের সময় কোন দিক দিয়ে কোন কথা বের হয় আবার...!
- তাইলে গেলাম আজকে। সাধারণ সম্পাদক চেয়ার ছাড়ে।
- ঠিক আছে যাও, কালকে সকাল সকাল চলে আইসো। বাকী সব ঠিক আছে তো?
- ঠিক মানে? পুরা ঠিক! কোন টেনশন কইরেন না।
দুজনেরই ঠোটের কোণায় তখন লুকানো হাসি।


চার.
শেষ রাতের দিকে ক্যামন যেন একটা খোঁচাখুচিতে নেতার ঘুম ভেঙে যায়। গায়ের উপরের লেপটা কে যেন টান দিয়ে নিতে চাইছে। ঘুমঘুম ভাব নিয়ে নেতা বলেন
- অ্যাই, কী হইছে?
- খুব শীত করতাছে।
ডিমলাইটের হাল্কা আলোয় নেতা দেখে - পাশে শোয়া মেয়েটি শীতে কুঁকড়ে আছে। খানিকটা মায়াও হয় - অনভ্যস্ত শরীরের উপর ধকলটা বোধ হয় একটু বেশী হয়ে গেছে।
নেতা কিছু বলার আগে জড়ানো গলায় মেয়েটি আবার বলে - খুব শীত করতাছে, লেপের এই পাশটা একটু দিবেন!

Read more...

09 January, 2007

আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ


অনুগ্রহ করে জুতা খুলে প্রবেশ করুন

এক.
প্রতিদিন সকালে অফিসে পা দেয়ার আগেই নোটিশটি আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আপনিও। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে অপলক...।
আজ তিন বছর পূর্ণ হলো; আপনি জুতা খুলছেন, অফিস করছেন নিয়মিত। অথচ আপনি বসে আছেন সে-ই একই চেয়ারে। এক বছর - দুই বছর করে তিন বছর কেটে গেছে...।
আবার কাজ শুরু করলেন আজ...।
সাইলেন্স প্লিজ!
চুপ করুন।
সবাই চুপ থাকুন, প্লিজ!

দুই.
কাজ করতে বসে কেবলই নোটিশটির দিকে চোখ যায়।
নোটিশটিও তাকিয়ে থাকে আপনার দিকে।
অন্য দিকে চোখ সরিয়ে, ঘাঁড় ফিরিয়ে আবার কাজে মন দেয়ার চেষ্টা...।
আজ সকালে অফিস আসার আগে আপনি গোসল করেননি। গত রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, খানিকটা শীত শীত ভাব ছিল। চাদর গায়ে সারারাত নাক ডেকে ঘুমিয়েছেন। আলসেমি করে ফ্যান বন্ধ করা হয়নি...।
অফিসের সিদ্ধান্তগুলো আপনি একা একা নিতে পারেন। মাঝে মাঝে এর ওর উপর খবরদারি করতেও ভালো লাগে। চেয়ারের হাতলে ভার দিয়ে আস্তে করে মাথাটা তুলে চারপাশে তাকিয়ে দেখেন - সবাই কাজে মগ্ন।

তিন.
কাজ শেষে আজ ম্যুভি দেখতে যাবেন।
তারও আগে - ঠিক বারোটায় লাঞ্চে যেতে হবে।
কিন্তু এখনো অনেকটা সময় বাকী...।
"বেসিনে টিস্যু পেপার ফেলবেন না।
আপনার চারপাশ পরিষ্কার রাখুন।"

চার.
জলত্যাগে যেতে হবে।
আজ সকালে কয় গ্লাস পানি খেয়েছিলেন?
তিন গ্লাস!
আপনি সোজা টয়লেটের দরজা বরাবর হেঁটে গেলেন। সারা অফিস যেন আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। এই তাকানোর মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করে না, একটুও...।

পাঁচ.
জুতা পরার দরকার নেই।
মাত্র কয়েক মিনিটই তো থাকবেন ওখানে!
টয়লেটে ঢুকলেন। দরজাটা ধাককা দিয়ে রাখলেন কেবল, হুক লাগানো হলো না। ...খানিকটা স্বস্তি বোধ করলেন।
ছোটখাটো ঘরটায় কিছুটা কসরত, কিছুটা অ্যাডজাস্টমেন্ট। তারপর টান মেরে অন্তর্বাস উপরে তোলা। ইলাস্টিকটা বোধ হয় ঢিলে হয়ে এলো...।
জিপার টেনে বেলট ঠিক করলেন। হাত ধুয়ে আয়নায় তাকালেন - মাথার চুলগুলো হাল্কা হয়ে আসছে!
...নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করলেন।
পরপর কয়েকবার লম্বা লম্বা শ্বাস নিলেন, ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়লেন। কেন জানি একটু আগের স্বস্তিবোধটা কাটতে শুরু করেছে। কেন?

ছয়.
আবার অফিসে ঢুকলেন।

সাত.
অনুগ্রহ করে জুতা খুলে প্রবেশ করুন।
সাইলেন্স প্লিজ!
বেসিনে টিস্যু পেপার ফেলবেন না।
আপনার চারপাশ পরিষ্কার রাখুন।
প্লিজ কিপ দ্য ডোর ক্লোজড।
বিকেল পাঁচটায় অফিস ছুটি হয় - অকারণে অফিসে বসে থাকবেন না।
টাইম ফর অ্যা ম্যুভি!

*********
থাই ছোট গল্প "Following Instruction" অবলম্বনে।


Read more...

03 January, 2007

অনুবীক্ষণে 'বীক্ষণ'

বাংলা সাহিত্য ও সমাজ চিন্তাকে পালটে দেয়ার বিপ্লবী ভাবনা নয়, বরং সাহিত্য ইতিহাসে সাক্ষী হওয়ার সুকোমল বিশ্বাস নিয়ে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে ই-পত্রিকা ’বীক্ষণ’। সমাজ ও সংস্কৃতির সমকালীন ছায়ার পাশাপাশি জনপদ ছোঁয়ার স্বার্থক প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে বীক্ষণের প্রথম সংখ্যায়। সুখপাঠ্য সব কবিতা, গল্প আর নিবন্ধের এ সংকলন নিঃসন্দেহে আগ্রহী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

এগারো জন কবির বাইশটি কবিতা স্থান পেয়েছে বীক্ষণের সূচনা সংখ্যায়। উত্তরাধুনিক ভাবনায় বিমূর্ত কবিতা নির্মাণে জটিল শব্দ প্রয়োগে কবিতা যাদের কাছে বোধগম্যতার বাইরে বিষয় হয়ে যায়, কিংবা (আমার মতো) যারা কবিতা কম বুঝেন তাদের কাছেও ভালো লাগবে বীক্ষণের কবিতাগুলো। জয়িতা গাংগুলীর ’রান্নাঘরে সুচেতনা’, শরত চৌধুরীর ’ব্রøান্ড’, কৌশিক আহমেদের ’আমি তোমাকেই জনমত ভাববো’ কিংবা রোহণ কুদ্দুসের ’পিতা’; সাধারণ পাঠকের মন ছুঁয়ে যাবে নিমিষে।

গল্প পড়ুয়াদের জন্য রয়েছে চারটি দূর্দান্ত ছোট গল্প। বিপুল দাসের ’কান্নায় আলাদা মাত্রা এনে দেয়’ ও সুমেরূ মুখোপাধ্যায়ের ’বন্দুকের নলই ক্ষমতার প্রকৃত উতস’ গল্পের সুবিনয়-সুমনরা পাঠকের সামনে অনেক গুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। জীবনের ভগ্নাংশ প্রকাশ পায় অন্য মাত্রায়। এ রকমই আরেকটি গল্প ’রাহেলা’; নিঘাত সুলতানা তিথির ঝরঝরে গদ্যে উঠে এসেছে সামাজিক কাঠামোয় নিপীড়িত নারী জীবন। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে হাসান মোরশেদের ’শুন্য কড়চা’ জ্বলজ্বল করে বীক্ষণের গল্প ভান্ডারে। অসাধারণ ভাষাশৈলী, গল্প বলার দূর্দান্ত দক্ষতা পাঠককে প্রথমেই কব্জা করে। এক পর্যায়ে "...অরুনারে কতো বুদ্ধ, কতো মুহম্মদ, কতো যীশু এলেন গেলেন। সমুহ বিপন্নতা থেকে তবু মানুষের পরিত্রান হলো কই? কতো দর্শন, কতো ধর্ম, কতো তন্ত্র! তবু হত্যা, তবু ধবংস তবু হাহাকার" পড়ে পাঠক চমকে যায়। আবার প্রথম থেকে পড়া শুরু করে। এরপরও মনে হয় - কী জানি কি বাকী রয়ে গেল! গল্পের মুগ্ধতার রেশ থেকে যায় অনেকক্ষণ...।

অনলাইনে বসে বড় লেখা পড়ার অভ্যাস আপাতঃ দৃষ্টিতে দূর্লভ। এছাড়াও প্রবন্ধ পড়ার প্রতি পাঠকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে; কথাটি স্বীকার করেই পাঁচটি নিবন্ধ ছপিয়েছে বীক্ষণ। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সবকটি লেখাই উঁচু মানের। গবেষণা ধর্মী লেখাগুলো চমতকারভাবে সামাজিক সংকট ও সম্ভাবনাকে প্রকাশ করে। বিশেষভাবে অভিজিত মজুমদারের " ’উন্নয়নের’ সন্ত্রাসবাদঃ এক উত্তর বঙ্গীয় উপাখ্যান" এবং সব্যসাচী সরকারের "তাড়িত আর্সেনিক" পাঠকের মনে চিন্তার খোরাক যোগাবে। সীমানা পেরিয়ে সমস্যা সমাধানে সহযোগী নিবন্ধগুলো প্রকাশ অব্যাহত থাকবে - এমনটাই পাঠকের প্রত্যাশা।

কবিতা, গল্প আর নিবন্ধের সাথে রয়েছে ’প্রতর্ক্য’ ও ’মনের ঘুড়ি’ বিভাগ; যেখানে স্থান পেয়েছে অন্তরবাদ্যি বাজানো তিনটি লেখা। লেখক পরিচিতি দেয়া হয়েছে নতুন আঙ্গিকে। পাঠকদের কাছ থেকে লেখা আহবান করার পাশাপাশি মতামতও চাওয়া হয়েছে।
ওয়েব ডিজানিংসহ সামগ্রিকভাবে যথেষ্ঠ প্রতিশ্রুতির ছাপ রয়েছে বীক্ষণের প্রথম সংখ্যায়। এ প্রত্যয়ের উপর ভিত্তি করেই আগামীতে বীক্ষণ তার নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করে নিবে। ঝকঝকে অফসেটে ছাপা লিটল ম্যাগ যখন ব্যবসায়িক স্বার্থবৃত্তির অভিযোগে হারিয়ে যেতে বসেছে, অনলাইনে রুচিশীল সাহিত্য পত্রিকার সংকট যখন প্রকট হয়ে উঠেছে - তখন বীক্ষণ বেঁচে থাক আগামীর দিন গুলোয়, সৃজনশীলতার নতুন মাত্রায়।

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP