30 May, 2008

মনসুর ভাইয়ের বাসায় আফগানী আখরোট খেতে গিয়ে...

অনেক বছরের সিনিয়র হলেও মনসুর ভাইয়ের সাথে একদিন আলাপটা একটু বেশি হয়ে গেলো। এই বেশি আলাপে আলাপে এও জেনে গেলাম, তার বাসা আমার বাসা থেকে দশ মিনিটের হাটার পথ। উনি ক্যাম্পাসের বড় ভাই পেরিয়ে এবার এলাকার বড় ভাই হয়ে গেলেন। আমিও ছোটোভাই। এই সুত্রে আমাকে দাওয়াত দিলেন যে কোনো দিন তার বাসায় যেতে - 'বাসায় আখরোট আছে, আম্মা আফগানিস্তান থেকে নিয়ে আসছে।'

এদিকে আমিও নানান ঝামেলায় থাকি। চলতি রিক্সায়, জ্যামের মধ্যে পাশাপাশি বাসের জানালায়, মনিরের দোকানের মোড়ে মাঝে মধ্যে দেখা হয়ে যায়। আর দেখা হলেই বলেন - 'কই তুমি, বাসায় তো আসলা না। তোমার জন্য আফগানী আখরোট আছে বাসায়'। আমিও 'হ্যাঁ, যাবো একদিন' বলে পার পাই।

সেবার রোজার মাসে সন্ধ্যার শেষে ক্লাস করে ঘামে ভিজে বাসায় এসে ইফতারের বুট-মুড়ির বাটিতে হাত চালাতে শুনি - মনসুর ভাই আমাদের বাসায় এসেছিলেন, আগামীকাল তার কি জরুরী পরীক্ষা - আমার জন্য দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করে চলে গেছে। বলে গেছে - যেভাবেই হোক আজ যেন তার বাসায় যাই।
জানতাম একটা জুনিয়র লেভেলের কোর্স উনি রি-টেক করছেন, যেটা আমি আগের সেমিস্টারে শেষ করছি; সপ্তাহ খানেক আগে এরকম কিছু আমাকে বলছিলেনও। তাই, মিনিট দশেক পরে তার বাসায় রওনা দিলাম। এবং লোকেশন মতো পানের দোকানে 'মনসুর ভাইদের বাসা কোনটা' জিজ্ঞেসের পরে ঠিকঠাক গেইটে পৌছলাম।

তাড়াতাড়ি বই এনে 'ইম্পর্ট্যান্ট কী কী' আলাপে আমি স্মৃতি হাতড়াই, টিক চিহ্ন মারি। উনি পেন্সিলে ভি-আই, ভি-ভি-আই লিখেন। সব শেষ হলে, আমাকে বলেন - 'আবার চ্যাপ্টারগুলা দেখো, কিছু মনে পড়ে কিনা দেখো'। আমি পাতা উল্টাই, চিন্তা করি, দুই একটা 'মে বি' চিহ্ন মারি। এই ফাঁকে উনি পিরিচে করে চানাচুর আর আখরোট নিয়ে আসছেন।

'তোমাকে বলছিলাম না, আম্মা আফঘানিস্তান থেকে আখরোট নিয়ে আসছে'।

আমি চিমটি দিয়ে আখরোট মুখে দিই, আর ভাবি - 'এইটার নাম আখরোট? এইটা আফগানিস্তানের জিনিশ?'
এর মধ্যে মনসুর ভাইয়ের মা আসলেন, আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমিও স্লামালাইকুম বলে দাড়ালাম কিংবা দাঁড়িয়ে স্লামালাইকুম বললাম। আন্টি কিছু না বলে চলে গেলেন।

আখরোটের পরে চা এলো। আমি চা'য়ে চুমুক দিই। আর মনসুর ভাই বলেন - 'তুমি আরেকটু ভালো করে ভাবো, কোনটা কোনটা পরীক্ষায় আসছিল মনে করো'।
আমি মাথা নাড়ি।

এর মাঝে পাশের রুমে কোলাহল গুঞ্জন বাড়ছে। নারী কন্ঠের গুনগুনানি। ওদিকে আড়চোখে দুয়েকবার তাকালামও।
মনসুর ভাই জানালেন, এলাকার ৩০-৪০ জন মহিলা জামায়াতে তারাবীর নামাজ পড়বেন। উনার মা ইমামতি করবেন। আমি বললাম - 'বাহ! বেশ ভালো'। এর বিশ কি পঁচিশ সেকেন্ডের মধ্যে পাশের রুম থেকে মনসুর ভাইয়ের মা আওয়াজ দিলেন, 'মনসুর, ওকে নামাজ পড়ে যেতে বল'।
আমার কাছে পরিস্থিতিটা খানিক অস্বস্তিকর মনে হলো।
একটু ইতিউতি করে বললাম, 'মনসুর ভাই, আমার মনে হয় সব দাগানো হয়ে গেছে। আমি আসি, আর মোবাইল তো আছে। দরকার হলে ফোন দিয়েন।' মনসুর ভাইও আমাকে বিদায় দেয়ার জন্য রেডি হলেন। পাশের রুমে গিয়ে মা'কে বললেন - 'আম্মা, ও তো এখন চলে যাবে।'
মনসুর ভাইয়ের আম্মা আরো জোর গলায় বললেন - "নাহ, ওকে নামাজ পড়ে যেতে বল"।

আমি পড়লাম মহা ফাঁকড়ায়। আমার মা-খালা-চাচীদের মধ্যে ভয়ংকর রাগীরাও আমাকে এরকম ধমক দিয়ে কোনোদিন কিছু বলেনি। খানিক ভয়ও পেলাম।

মনসুর ভাই মাতৃভক্ত। আমার কাছে এসে মিনমিন করে বললেন - 'বুঝো না, আম্মা তো যেতে দিবে না। আর সমস্যা হলো, তোমাকে এখন যেতে হবে ড্রয়িং-রুমের মাঝ দিয়ে, ওখানে তো এখন সবাই নামাজের জন্য বসে গেছে, তুমি বের হবা কীভাবে?'
আমি তখন, ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি। বললাম, 'ভাই দেখেন না, আমি জাস্ট বেরিয়ে যাবো; একটু ব্যবস্থা করেন'।
মনসুর ভাই অপারগ। এবার উনি আমার উপর আক্রমণাত্বক হলেন এই বলে "তুমি রোজা রাখো না? রোজা রাখলে তারাবীর নামাজ পড়তে হবে না?"
আমি গাঁইগুই করি, বলি, "হ্যাঁ তা তো অবশ্যই, আসলে আমার রেস্টের দরকার। এই বাসায় এসে শুনলাম আপনি আসতে বলছেন, তাই দৌড়ে চলে এলাম। ফ্রেশ হওয়াও দরকার।" আর মুখ দিয়ে এমন ভাব দেখালাম, আমার এই নাপাক-অপবিত্র শরীর দিয়ে নামাজের নামও নেয়া যাবে না।
এইবার মনসুর ভাই আরেক সমাধান নিয়ে এলেন। বললেন, "তুমি আমার বাসায় এক্ষুনি শাওয়ার নিয়ে ফেলো, আমার লুঙ্গি পরো। তারপরে চলো দুইজনে এই রুমে জামা'ত করি। একত্রে নামাজে দাড়াই।"
আমিও ওঁ-আঁ করি। বলি, ক্ষিদাও লাগছে। বাসায় খিচুড়ী রান্না করছে। মেহমানও আসবে। এই মেহমানের কারণে বাসায় ফেরাটা দরকার বেশি। (ছুতা বানাইতে দেরি হয় না।)

আমাদের এসব আলাপ মনে হয় পাশের রুম থেকে মনসুর ভাইয়ের বড় ভাবী শুনছিলেন। আচমকা মনসুর ভাইয়ের রুমে এসে আমাকে ডাক দিলেন, বললেন - 'আসেন আপনি এদিকে আসেন। কোনোদিকে তাকাবেন না, সোজা বের হয়ে যাবেন'।
আমি বললাম - 'আইচ্ছা'।
ড্রয়িং রুমে জামায়াতে নামাজের সব আয়োজনের শুরুতে লাইট নেভানো হলো, যাতে আমি কাউকে না দেখি।
বিশ পঁচিশ কিংবা তারও বেশি বোরখাময় সারি সারি নারীর মাঝখান দিয়ে আমি দমবন্ধ করে হাটা শুরু করলাম, মনে হলো কয়েক সেকেন্ডে আমি ড্রয়িং রুম পেরিয়ে এলাম।

বাইরে এসে আরেক সমস্যা। ঐ জমায়াতে শরীক অন্ততঃ ৩০ নারীর ৬০টা স্যান্ডেলের মাঝে আমার স্যান্ডেলও মিশে গেছে।
লাইট নেভানোয় এদিকটা অন্ধকার। মাথা নিঁচু করে চোখ বুলাই। আমার স্যান্ডেল খুঁজে পাই না। এরমাঝে ভাবী আবার তেড়ে এলো - 'আপনি এখনো কী করেন?'
'আমার স্যান্ডেল পাচ্ছি না।'
ভাবী এবার টর্চ লাইট নিয়ে এলেন। খুঁজে পেলাম দু'শ উনপঞ্চাশ টাকা আশি পয়সা দামের আমার বাটা স্যান্ডেল।

ভাবীকে থ্যাংক ইউ বলে গেটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আর তখনি মনসুর ভাইদের শেফার্ড কুত্তাটা আমার পিছনে ঘেউ ঘেউ ঘেউ...। আমি এবার দৌড়। জানপ্রাণ নিয়ে দৌড়...।

দশ কদমের গেইট পেরুতে মনে হলো দশ কিলোমিটার দৌড়ালাম।

.
-
.

Read more...

ঝড়, আকাশ, চাঁদ; দূরাশা সহসা

এরকম সন্ধ্যায় বিভ্রম জাগে। মনে হয় এই বৃষ্টি নামবে, কিংবা শীত শীত ভাব। অন্ধকার জাঁকিয়ে নামতেই বাতাস। খোলা জানালার পাশে রেইন ট্রির ঝপাত ঝপাত। অফিসে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে খেয়াল হলো, অনেকদিন আচমকা ঝড় দেখে জানালা বন্ধ করি না।
হায়, হঠাৎ বৃষ্টি। থেমে যাওয়া রাস্তা, জল-কাদার রাস্তা।
অপেক্ষা বাসায় ফেরার।
কবেকার অবসন্ন সন্ধ্যায় এক ব্যাগ সবজি কিনে ফিরে গেছে ঘর ফেরতা সংসারী। পাশ কাটিয়ে শাঁইশাঁই শব্দে মোটর বাইকে সুখী প্রেমিক-প্রেমিকা। মইনুল রোডে ডুবে যাওয়া সূর্য্য। ক্লান্তির পথ। এভাবে এখানে যদি অনেকদিন থাকি তাহলে আর ঝড় দেখে জানালা বন্ধ করা হবে না; কনকনে শীতে সুয়েটার গায়ে দেয়া হবে না; ডাল আর আলু ভর্তায় লেবু চিপে খাওয়া হবে না।
অনিশ্চয়তার, আচমকা প্রেম জেগে উথাল-পাথাল হবার দুপুর আসবে না।
-

সং পাসা থাই খুত পেট, রিজার্ভেশন টিকেটিং এন্ড সেলস; প্লিজ প্রেস ওয়ান, কান্ট্রি ম্যানেজার প্রেস টু। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আকাংখিত স্বর। কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়াল করা, আরেকটু দীর্ঘ হোক এ কল। দেশে যাওয়ার আনন্দটা আরেকটু লম্বা হোক। তারপর লাগেজের উপরে বাসার ঠিকানার জন্য স্টিকার টাইপ। এবার আর বিমানে হলো না। থাই এয়ারওয়েজ; এজেন্সি নাম্বার থ্রি টু ফোর ওয়ান।
আমার ব্যাগ যে টুয়েন্টি কিলোর বেশি হবে? এবারই চলে যাচ্ছি, আর থাকবো না এখানে। কার্গোর ঝামেলায় যেতে পারবো না।
তেমন কিছু নেই, বেশি বই।
তবুও বলে না, আচ্ছা একটু কনসিডার করবো।
ফেলেই গেলাম যা অচ্ছ্যুৎ, তোমাদের দেশে।
শেষ করা হয় না অনেক বই; লিপিস্টিক জাঙ্গল, পালপাসা ক্যাফে, ইয়ান মার্টেল, ব্লিংক, উড়াল মন।
-

সাতটা পঞ্চান্ন বেজে গেছে।
প্রিয় ডায়েরি, প্রিয় কলম, নোটপ্যাড।
ব্যাগে গুছাতে মনে হয় না আমি এবার ফিরেই যাচ্ছি।
-

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা। শহীদ কাদরীর কবিতায় আপাতঃ আশ্রয়। সঞ্জীব চৌধুরীর যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন। যাই পেরিয়ে ব্যস্ত নদী, অশ্রু আয়োজন। এই নষ্ট শহরে গেরুয়া খাম ডাকবাক্সের বাইরে যায় না। ভালোবাসার, বিষন্নতার, আকাঙ্ক্ষার, হতাশার নগরে যাচ্ছি ফিরে। হয়তো এবারও বৃষ্টি নামবে।
অনিশ্চয়তাটুকু আশা করে যাচ্ছি খুব।
আবার খুব দুমদাম একটা দুপুর, শোক-সন্তাপ ও প্রেমের।

হঠাৎ বৃষ্টি।

-
-
-

Read more...

23 May, 2008

দ্রোহের আগুনে জ্বলে দ্রোহীর জন্মদিনের মোমবাতি

শম্পার সাথে আমার ইটিশপিটিশ তখন শাহবাগের মৌরী, নাজিমুদ্দিন রোডের নীরব কিংবা অসংখ্য বাদামওয়ালা পেরিয়ে বনানীর নিউ ইয়র্কারে গিয়ে পৌঁছেছে। সেরকমই এক মংগলবারে মে মাসের ২৩ তারিখে বিকালে বসে দুইজনে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাই, সামনে বড় কফির মগ থেকে ধোঁয়া উড়ে। শম্পার সাথে এ পথ চলা এবং ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে শম্পার চেহারা পুরাটা এক মনে হয়। কেবলই ধোঁয়াটে। এসব যখন ভাবছিলাম, তখন শম্পা বলে – ‘তাড়াতাড়ি কফি শেষ করো, সোবাহানবাগ যাবো’।
আমি বুঝলাম না, হঠাৎ করে সোবাহানবাগের দরকার হলো কেনো? তবে চুপ থাকলাম, নিঃশব্দে কফিতে চুমুক দিই। আমার নীরবতা দেখে শম্পা বলে, ‘আপুর বাসায় যাবো, তুমিও যাবে, প্রোগ্রাম আছে।‘

এরপরের সময়টুকু কথা ছাড়াই কাটে। সিএনজি থামিয়ে সুমি’জ থেকে কেক কিনে, আমি একটু গা ঘেঁষে – ‘কার জন্মদিন’ জিজ্ঞেস করলে শম্পা ‘ভীতূর ডিম কোথাকার’ বলে ভেংচি কাটে। এই ভেংচির অর্থ হতে পারে – ‘তুই একটা গাধা’ অথবা ‘ওরে আমার গুডি বয় রে...’। এইসব সম্ভাব্য অর্থে হাবুডুবু খেয়ে বিজয় স্মরণী – শ্যামলী পেরিয়ে সোবাহানবাগে একটা বাড়ীর সামনে সিএনজি থামলে, শম্পা বলে – ‘নামো’।

আমি অনুগত ছাত্রের মতো তাকে ফলো করি। সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠি। কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে যায়। কিন্তু এ কী!
এমন শব্দ করে কোন যুবক কান্না করছে?
আমি চোখ কচলাই, স্বপ্ন দেখছি না তো?
দুই হাতে নিজের কানে চাপ দিই – বাইরের গাড়ীর হর্ণে কানের পর্দা ফাটেনি তো?
নাহ, ঠিকই আছে।
তাহলে, এরকম ভরাট গলার যুবকের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে কোত্থেকে?
‘আমি প্যান্টাসি কিন্ডমে যাবো, আমাকে নিয়ে যাও, আমি যাবো’ - বলে কান্না করছে কে?
আবার মনে হয়, টিভিতে নাটক হচ্ছে না তো, যে নাটকের সংলাপ শুনছি!
শম্পাও আমাকে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেলো। এবার নিশ্চিত হই এ কান্না – এ হাহাকার নাটকের সংলাপ হয়, কারণ – যুবকটি বলছে, ‘শম্পা, তোমার আপুকে বলো আমাকে প্যান্টাসি কিন্ডমে নিয়ে যেতে, আমি রুলার কুস্টারে চড়বো’। শম্পা কী বলে শুনি না, তবে আরেক অগ্নিকন্ঠা, দ্য এরাবিয়ান নাইটসের মালিকা হামিরার মতো, বলে – ব্যালকনিতে নিয়ে সোজা নিচে ফেলে দেবো, তখন বুঝবে রোলার কোস্টারের মজা। তখন যুবকটি ফ্লোরে হাত পা আছড়ে চলেছে। ভেঁউ ভেঁউ কান্না করছে।

আমি বাদাইম্ম্যা হয়ে বসে থাকি। একটু পর শম্পা আসে, সাথে ঐ অগ্নিকন্ঠা (তবে দেখতে শম্পার মতোই...) আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, এ হলো আমার আপু, আর আপু এর কথা তোমাকে বলেছিলাম, ও হলো...
শম্পা আর আমার নাম বলতে পারে না, বড় আপু বলে – ‘নাম জানি, এই ছোকড়া তুমি বিড়ি খাও?’
আমার হাঁটু ততক্ষণে কাঁপাকাপি শুরু করেছে।
আপু আবার বলেন, ‘বিড়ি না খেলে ঠোঁট এতো কালো কেনো? আজ কটা খেয়েছ বলো?’
আমি থতমত খেয়ে বলি, ‘আ-প-উ, আমি তো বিড়ি খাই না, শুধু শম্পার সাথে মাঝে মাঝে ফ্রেঞ্চ খাই?’
আপু হাতের খুন্তি উপরে তুলে বলেন, ‘কী খাস? কী ফ্রেঞ্চ...’
আমি তড়িৎ সামলে নিয়ে বলি – ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রা-ই খাই’।
এবার ভেতরে রুম থেকে হাত পা বাঁধা সে-ই যুবক, যাকে শম্পা একদিন দূর থেকে দেখিয়ে বলেছিলো - উনি আমার দূলাভাই, তিনি খুড়িয়ে হেটে বের হয়ে আসেন। ভদ্রলোক অনলাইনে দ্রোহী নিকে পরিচিত। আমি শম্পাকে বলি – ‘শম্পা আমি আসি’, শুনে দ্রোহী ভাই বলে – ‘ভাইরে, আমারে উদ্ধার করেন। আজ জন্মদিনে প্যান্টাসি কিন্ডমে যেতে চাইলাম বলে সারাদিন হাত পা বেধে রেখেছে, এই অত্যাচার...’।

আমি কিছু বলার আগেই আপু বলে, ‘এই শম্পা, তোর সাথে আসা বলদাটারেও ধর, দুইটারে একসাথে বান্ধা দরকার। ওদের হাড্ডি-গুড্ডি ভেঙে আমরা ফরিদপুরের ভাঙা থানার মান রক্ষা করবো। শম্পা আমার হাত ধরতেই আমি হাঁটুপানির জলদস্যু স্টাইলে যত্ন করে কামড় দিয়ে এক দৌড়ে ভোঁ... রাস্তার ওপারে।

হোটেল নীদমহলের সামনে দেখি অনুভূতিশুন্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে হেসে বলে – কী, ক্যামন দৌড়ানি দিলো? আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বলি – চলেন ৯নম্বর বাস আসছে উঠি। অনুভুতিশুন্য লোকটি আমাকে থামায় বলে দেখেন কে যায়। দেখি রিকশায় বসে পায়ের উপর পা তুলে এক হাতে হুড ধরে, আরেক হাতে খাজানার মিষ্টি নিয়ে শম্পাদের বাসার গলির দিকে যাচ্ছে ধুসর গোধুলী।

আমরা দুজনই বলি – ‘আল্লাহ জানে, ধুসরের কপালে আজ কি আছে। তবে রশি-বান্ধা ধোলাই নিশ্চিত।‘

এরপর তো অনেক কিছু ঘটে। আলাবামা কাহিনীর টুকটাক ব্লগেও প্রকাশিত হয়। মন্দ লোকেরা বলে, আলাবামায়ও সে-ই যুবক মাঝে মাঝে কাতর স্বরে কান্না করে। তবে আজ আমরা আর সে-সব দুষ্ট গল্প শুনবো না।

আজ ২৩ মে। আজ খুব চমৎকার একজন মানুষ – দূর্ধর্ষ ব্লগার দ্রোহীর জন্মদিন। জন্মদিনে অযুত নিযুত শুভকামনা।

অরল্যান্ডো ফ্লোরিডাতে ওয়াল্ট ডিজনী ম্যাজিক কিংডম, আর ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে তিন দিন আনন্দে কাটুক।

ভালো কাটুক সবসময়!

Read more...

11 May, 2008

চিলেকোঠা জলে জলময়

গত রাতে বৃষ্টি ছিলো, মনে হয় হাল্কা ধরণের। রাত তিনটায় যখন ঘুম ভাঙলো, বুঝিনি পিপাসায় নাকি বাতাসের শব্দে। অনেকদিন পরে রাত নয়টায় ঘুমানোর কথা মনে পড়ে তখন। মোবাইলে না পড়া মেসেজ; 'সন্ধ্যায় কেক কাটা হয়েছে, তোকে খুব মিস করেছি, তুই থাকলে আরো মজা হতো।'
রাত নয়টা পঞ্চান্ন।
বারোটার ঘর পেরুলে ১১ মে। ভাবছিলাম - আর কয়দিন! সাতাশ-আটাশ-নাকি উনত্রিশ? জানালার শাটার নামিয়ে এসব অহেতূক ভেবে আরো ঘন্টা পার। তারপর চোখ খুলে সকাল সাতটা চল্লিশ বা আরেকটু কম - ধুশশালা। ভো দৌড়।

আজ রবিবার।
কাজ তেমন নেই। শেষে আবার রাণী মাতার কবলে পড়েছি। কিছু রিপোর্ট বানাতে হবে। খালি পেটে পাউরুটি কফি দিয়ে মেইল, ব্লগে-পেপারে চোখ বুলিয়ে আইপিএলে চেন্নাই-পাঞ্জাবের স্কোর দেখছিলাম, তখন বাইরে তুমুল বাতাস। দো'তলার এ রূমে কাঁচের জানালা আছে, এক দিক খোলা যায়।
খানিক আকাশ, ওয়ার্ড বি'র বারান্দাগুলো, মুখোমুখি টিনশেডের ঘুপচি-বাসা। নিচের হাঁটার পথে টিনের ছাউনি। মাঝে দাঁড়িয়ে গোটা দশের রেইন ট্রি। উন্মাতাল বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দ।
কবেকার ফেলে আসা বাঁশ ঝাড়ের সে আওয়াজ ফিরে আসে।
কম্পুতে - কমলো মেঘেদের ওজন।
দিনটি কেবলই কফিময় হতে পারতো। খিচুড়ি-ডিম ভুনা না পাওয়ার রোমান্টিসিজমে মন খারাপ করা হতে পারতো। তারপর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'রেইনকোট' পড়া আরেকবার।
কিছুই হয় না।

কেবল স্মৃতিরা দুপদাপ হানা দেয় এমন দিনে।

Read more...

07 May, 2008

অবশেষে মঈণ - মিলা

-
হাসানের সাথে আজ আবার অনেকদিন পরে জি-টকে কথা হয়। শুরুতেই আমরা দুই দোস্ত মন খারাপ করি এই ভেবে যে, যাযাদি থেকে মি. রেহমান পদত্যাগ করেছে, গতকাল এক লেখায় গুডবাই-বিদায় বলে গেছে।

ব্যাপারটি এমন নয় যে, মি. রেহমানের লেখার আমরা বড় ফ্যান, এমনও নয় যে – দিনের পর দিনের জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম, তবে এটা নিশ্চিত – হাতের কাছে পেলে শুরুতেই একেবারে শেষ প্যারায় বলা গল্পটা পড়ে ফেলতাম। তারপরে প্রেমলীলা। রেহমানের কাছে আমরা এ জন্য ঋণী; ঐসব গল্প বন্ধুদের আড্ডায় বলে আমরা বাহবা কুড়াতাম।

আমাদের মধ্য কৈশোরে যায়যায়বিদ্যুৎ সংখ্যা এবং আরো পরে ক্যামেরা বা শাড়ী সংখ্যা আমরা অতি গোপনে পড়তাম, একটু বড় হয়ে গেছি ভাবতাম মনে মনে।

দৈনিক হওয়ার আগে মি. রেহমান বলেছিলেন – দৈনিক যাযাদি’র কাজ হবে মানুষকে প্রাপ্তমনষ্ক করা। হ্যাঁ, আমরা প্রাপ্ত মনষ্ক হয়েছি – দেখেছি কীভাবে মেটামরফসিস হয়, রঙ-চঙা শার্ট পড়ে একদা আপোষহীন সম্পাদক কীভাবে ট্রেন্ডি জুলফি নিয়ে লাল গুলাপী হয়। মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, এবার একটি – ম্যুভি ক্লিপ। এরপর খালি ম্যুভি ক্লিপ। পতনের তোড়ে এয়ারপোর্টে বিব্রতকর মুহুর্তগুলো বাংলা ইংরেজী তর্জমায় ছাপা হয়। সেটাও ম্যুভি ক্লিপ হয়ে যায়।

আজ আমি আর হাসান এসব আলাপ করি।
মঈণ-মিলার ফোনালাপ অথবা পরকীয়ার পরিণতি কী হবে সেটা নিয়ে ভাবি। তবে এতোদিনের ফোন বিল কতো এসেছিল, কতোটুকু বিল শোধ করা হয়েছিল সে জল্পনা কল্পনা করি। মি. রেহমান অন্য কোন পত্রিকায় মঈন মিলাকে ডিজুস কানেকশন সেট করে দিবেন বলেও ধারণা করি। কারণ, দেশের পোলাপাইনকে প্রেম পরীক্ষা অথবা জীবন জিজ্ঞাসার গাইড হিসাবে ঐ বিশেষ সংখ্যাগুলোর বিকল্প নেই। (ব্লগে এক মন্তব্যে বিখ্যাত ধুসর গোধুলীও এ ঋণ স্বীকার করেছেন)।

মঈণ-মিলাকে আমরা কতোদিন মিস করবো – আপাততঃ সেটা না জানলেও আজ হাসানের বলা গল্পটা এখানে বলে যাইঃ

“অনেকদিন পরে ফোনালাপের ক্লান্তি পেরিয়ে মঈন-মিলা লাভ রোডের অফিসে দেখা করে। একে অন্যের দিকে তাকায়।
কতোদিন পরে দেখা।
‘চোখ দুটো গেছে ক্ষয়ে গাল দুটো গেছে ঝুলে নিয়মিত অবহেলায়।‘
তবে মিলা অবহেলা করে না, ফৃজ থেকে শ্যাম্পেন নিয়ে এগিয়ে দেয়।
মঈন হাত নাড়ে, বলে – ‘নাহ, ওসব ছেড়ে দিয়েছি’।
মিলা অবাক, ‘কীভাবে’?
‘পাওয়ার অব উইল।‘ মঈণ চোখ উলটে জবাব দেয়।
এবার মিলা বলে, ‘তাহলে চলো – ড্রাইভে যাই। তোমার প্রিয় আশুলিয়া।‘
মঈণ এবারো হতাশ করে, বলে – ‘লং ড্রাইভে যাই না।‘
মিলা জিজ্ঞেস করে, ‘কী বলো, তোমার মতো ড্রাইভিং পৃয় মানুষ, কীভাবে ছাড়লে?’
মঈণ আগের মতোই বলে – ‘পাওয়ার অব উইল’।
মিলা হতাশ হয়। দেখে পুরনো সে-ই মঈণ আর নেই। ক্যামন যেন বদলে গেছে।
অনেক ভেবে চিন্তে মিলা এদিক ওদিক দেখে। কুক জন নেই। কোণায় লিভিং রূম সাজানো গুছানো। মিলা সেদিকে ইশারা করে - ইংগিতে বলে, ‘লেটস গো’।
মঈণ এবার মাথায় ঝোকায়।
মিলা জিজ্ঞেস করে – ‘সে কী! এটা ছাড়লে কী করে? এটাও পাওয়ার অব উইল?’
মঈণ জুলফিতে আঙুল বুলায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘নাহ, দ্যাটস ফেইল্যুর অব অ্যাবসল্যুট পাওয়ার।‘

-

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP