31 December, 2007

পূর্বকথা

.
.
.



খুব অদ্ভুতভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে ২০০৭।
কোনো কোনো বিকেল অলস বসে থেকে, আকাশে না তাকিয়ে, গান না শুনে, কিছু না ভেবে, হয়তো চা'য়ে চুমুক দিয়ে পার করে দেয়া যেমন, ঠিক তেমন করেই গেলো ২০০৭। স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ছাড়া কিছু নেই।
বিশেষ কোনো দু:খ নেই, এটাই হয়তো একমাত্র আনন্দ।

সুনীল সাইফুল্লাহর কবিতার মতো:

অথচ নির্দিষ্ট কোন দুঃখ নেই
উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতি নেই
শুধু মনে পড়ে
চিলেকোঠায় একটা পায়রা রোজ দুপুরে
উড়ে এসে বসতো হাতে মাথায়
চুলে গুজে দিতো ঠোঁট
বুক-পকেটে আমার তার একটি পালক।


অথচ নির্দিষ্ট কোন দুঃখ নেই, উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতি নেই।
নির্দিষ্ট কোন দুঃখ প্রয়োজন নেই। উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতি দরকার নেই।
আনন্দ বেদনা ও স্বপ্নহীন পলায়নপর সময়গুলো কেটে যাক।
নামকরনে হোক না দুই হাজার সাত অথবা আট।

.
.
.

Read more...

23 December, 2007

'সিঁড়ি' পাঠ : শিশুদের সাহিত্য

বছর পাঁচেক আগে মফস্বলের এক উঠতি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বার্ষিক স্মরণিকা হাতে পেয়েছিলাম। এলাকার গণ্যমান্যদের কঠিন ভাষার বাণী, পাতা ভর্তি বিজ্ঞাপন, অজস্রবার শোনা কৌতুকের মাঝে একটি লেখা পড়ে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। কেজি ওয়ানের এক ছাত্রের লেখা গল্প:

"একদিন আমি স্কুল থেকে ফিরলাম বিকালে। বাসায় এসে দেখলাম আম্মু নাই। দাদু বললো - আম্মু নাকি মামার সাথে নানু বাড়ী চলে গেছে। আমার ছোট ভাইও গেছে। আমি কান্না শুরু করে দৌড়ে রাস্তায় চলে এলাম। আম্মুকে দেখলাম না। আবার কান্না করে করে দৌড়ে ঘরে চলে আসলাম। ঘরের কাছে আসতেই একটা ইটের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। হাঁটুর চামড়া অল্প কেটে গেল। ব্যথায় কান্না শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি আম্মু এসে আমাকে কোলে নিলো। আমি ভেবেছিলাম আম্মু আমাকে বকা দিবে। কিন্তু আম্মু বকা দিলো না। কোলে নিয়ে অনেক আদর করলো। আম্মু আমাকে ফেলে নানুর বাড়ী যায়নি। আমি খুব খুশী হলাম।"


এটুকুই বিবরণ। শিশু মনের কী চমৎকার বর্ণনা। স্কুল থেকে এসে মা'য়ের দেখা নেই। ছোট ভাইকে নিয়ে মামার সাথে নানুর বাড়ী গেছে শোনে আরও মন খারাপ। রাস্তায় দৌড়ে গিয়ে মা'কে না দেখা। আবার ঘরে ফিরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে আঘাত পাওয়া এবং কান্নার মাঝে মা'কে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে প্রাণবন্ত একটি লেখা!

কেনো জানি মনে হয় - শিশুদের খুব বেশী বেশী নৈতিকতা শেখানো কিংবা স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা থাকে পাঠাভ্যাসেও। সে কারণেই হয়তো শিশুদের লেখনীতে উঠে আসে -


সত্য কথা বলবো
ভালো কাজ করবো,
বেহেশতে যাবো
মজার ফল খাবো।

কিংবা
অন্তু হবে বড় ডাক্তার
গাড়ী ঘোড়া কিনবে
সব লোকে চিনবে
চোখে দিবে চশমা
চলে যাবে বার্মা।


কচি হাতের গল্পও মিথ্যাবাদী রাখালের চক্কর থেকে বের হতে পারে না। লোভে পাপ পাপে মৃত্যুর গল্পে নতুন ঢঙে লোভী লোকটি সেভেন আপ মনে করে কেরোসিনের বোতল মুখে ঢেলে দেয় ঢকঢক করে।

দৈনিক পত্রিকার শিশুদের পাতার সম্পাদকও ছড়ার ছন্দ-তাল নিয়ে কঠিন থাকেন। তাই তোমাদের চিঠি পেলাম বিভাগে ভাইয়্যা সুন্দর করে বলে দেন - "'বই'এর সাথে 'নেই' ছন্দ মিলেনি। আবারও লেখা পাঠাও। আগামীতে অবশ্যই ছাপা হবে।"

এসব ধরাবাধা নিয়ম কানুনে শিশুরা কতোটুকু স্বত:স্ফুর্ত হয়ে লিখতে পারে জানি না। তবে এবার বাংলাদেশ থিয়েটার অব অ্যারিজোনার প্রকাশনে 'সিঁড়ি' পড়তে গিয়ে শিশুদের চমৎকার কিছু লেখা পড়ে আবার মুগ্ধ হয়েছি।

আট বছর বয়েসী ফারহান রাহমান লিখেছে:
আমি জানি
এক ছিল রানী
ভালো লাগে তার
অনেক ঠান্ডা পানি।


আবার একই বলয়ে বেড়ে ওঠা সাত বছরের ফাতমা আবিদের ছড়া:
ছিল একটি রানী
সে খায় অনেক পানি
সে অনেক পচা
সেটা আমি জানি।


আরেকটু বড়, দশ বছরের শাইরা আহমেদ লিখেছে - মোটা মামা:
আমার মোটা মামা
নাম হলো তার গামা।
পরেন বিরাট জামা
এবার খাওয়া থামা।


তবে শাদীদ আহমেদের সাদামাটা কথা শিশুসুলভ ভাবনায় প্রকাশ পায় এভাবে:
ছিল এক প্রজা
সব সময় থাকে রোজা
তার নাই ক্ষুধা
জীবন খুব সোজা।


ভালো লেগেছে আফরা নাওয়ারের আমার আছে বাড়ি ছড়াটি :
আমার আছে বাড়ি
বাড়ির মধ্যে গাড়ী
গাড়ীর মধ্যে আমি
আমি পড়েছি শাড়ী।
বাড়ি গাড়ী শাড়ী
নিয়ে কাড়াকাড়ি।
কে চালাবে গাড়ী
কে পড়বে শাড়ী
কে নেবে বাড়ি
আমি কি বলতে পারি?


নয় বছর বয়েসী শাবাব সিদ্দিকের লেখাটি আরও সহজ:
আমি কবিতা পারি না
তাই লিখতে চাই না।
যখন বৃষ্টি দেখি
তখন কবিতা লিখি।


শাদিদ আহমেদের এ গল্পটিতে কল্পনার দূর্দান্ত মিশ্রণ:
এক দেশে ছিল একটি ছাগল। ছাগলটা অনেক অদ্ভূত, সবাই তাকে নাম দিয়েছে পাগল ছাগল। সে ঘরে থাকেনা। সে সবুজ ঘাস খায়না। সে হাঁটতে চায়না। সে থাকে পানির নিচে। সে খায় নীল ঘাস, সে সব সময় বসে থাকতে চায়। আর, তার একটি বন্ধু ছিল, তার নাম মাঠ। তার নাম মাঠ কারন সে সবসময়ই মাঠে থাকে। মাঠ আর পাগল ছাগল অনেক ভাল বন্ধু। একদিন তারা শহরে যাচ্ছে। পথে তারা পেয়েছে একটি বই। ছাগল বলল আমি এই বই খাব আমার খিদা লেগেছে। মাঠ বলল ঠিক আছে খা, কিন্তু তোমার কিছু হলে আমি কিছু করতে পারবনা। তারপর ছাগল বইটাকে খেয়ে ফেলল। সে বলল দেখ আমার কিছু হয় নাই, চল শহরে চল, পাগল ছাগল আর মাঠ শহরে আসল। সে বলল মাঠ আমার ভাল লাগছে না, আমি তোমার ঘরে যেতে পারব ? মাঠ বলল ঠিক আছে কিন্তু তোমার কিছু হলে আমি কিছু করতে পারব না। তারপর তারা মাঠের বাড়িতে আসলো। পাগল ছাগল বলল মাঠ আমার ভাল লাগছে না। মাঠ তাকে ধরল। “আহা তোমার গায় জ্বর, দাড়াঁও আমি শহর থেকে ঔষধ আনব” মাঠ শহরে চলে গেল আর পাগল ছাগল ঘুমিয়ে গেল। মাঠ শহরের পথে দেখল একটি বই। বইটা দেখছে সে। এই বইটা হল সে বই যেটা ছাগল খেয়েছে। মাঠ বই খুলে দেখল ভিতরে সব গুলি পাতাতে বিষ। মাঠ বলল “আহা!” সে তার বাড়িতে দৌড়ে গেল। যখন সে আসল, সে দেখল পাগল ছাগল মাটিতে। সে নিঃস্বাস ফেলছে না। সে মরে গিয়েছে। সেই জন্য তোমরা সবাই কোন জিনিস খাবে না যেটা তুমি জাননা। তা না হলে তুমি পাগল ছাগলের মত হয়ে যাবে।"


পানির নিচে ছাগলের বাস। মাঠের সাথে তার বন্ধুত্ব! শেষে বই খেয়ে ছাগলের মৃত্যু!! পাগলে কিনা বলে ছাগলে কিনা খায় প্রবাদটি কি শাদিদ জানে?

শেষে বলি তালহা আবিদের ছড়াটি:
আমি খাইনা ভাত
পাইনা কোন স্বাদ।
আমি খাইনা পানি
সেটা খারাপ জানি।
আমি খাই অনেক খিচুড়ী
আমার আছে ছোট ভূঁড়ি।
স্বপ্নে দেখি আবার
খাচ্ছি আমি খাবার।


সাহিত্যের অনেক প্রাজ্ঞজন হয়তো ভ্রু কুঁচকে অনায়াসে এ লেখাগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিবেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে ভিনদেশে বেড়ে ওঠা এ শিশুদল ভীষণ প্রতিভার অধিকারী। মুক্ত ভাবনায় লেখালেখির সুযোগ পেলে এদেরই কেউ কেউ সহজেই তুচ্ছ করে দিবে অনেক তথাকথিত শিশু সাহিত্যিককে।

শেষে সুন্দর একটি প্রকাশনার জন্য 'সিঁড়ি' সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।

.
.
.

Read more...

21 December, 2007

ক্লান্তির পথ ভুলে থাকা

কোনোদিন আলাদা কিছু নয়,
কোনো স্থান আলাদা কিছু নয়।
আমরা নিজেরাই স্থানকে আলাদা করে ফেলি
দিনকে আলাদা করে ফেলি,
নিজের মাঝেই দিন, নিজের মাঝেই স্থান।

প্রায়ই ফোনে বলি, এই যে আমি নয়শ' পঁচাশি মাইল দূরে এটা আলাদা দেশ, আলাদা সীমানা; একান্তই রাষ্ট্রীয় বর্ডারের কারণে। নয়তো ঢাকা টু কুমিল্লা; দুই ঘন্টা। তেমনটা ব্যাংককও। টু আওয়ার্স ডিসটেন্স।

এসব বোধের মাঝেও কেনো জানি ঈদে পার্বনে মন খারাপটা জেগে ওঠে। গত ঈদে যেমন একটানা তিনদিন বন্ধ ঘরে ছিলাম, কেউ জানলো না। অথচ এ দিনটিও সাধারণ একটি দিন হতে পারতো। সাদামাটা একটি দিন। সেইম ডে, ডিফারেন্ট ট্র্যাশ। তাই এবারের ঈদে নেমন্তন্ন পেয়ে 'না' করিনি। সুযোগটা যখন পাতায়া-ব্যাংকক ছাড়িয়ে থাই-গ্রামে ঈদ কাটানোর তখন নিসংকোচে হ্যাঁ বলা যায়। এবং আমি বললাম।

প্রাসান ইয়ামেনফিন যার অ্যারাবিক নাম রফিক মুরাদ আমার সহকর্মী। প্রথম থেকেই প্রাসানের সাথে আমার আলাপ জমতো ভালো। মনে হতো - আমার কুৎসিত ইংরেজী বোঝার লোক এই একজনই আছে। সাথে যখন ধর্ম এবং আধুনিকতার এক প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের সন্ধান পাই তখন মাইনরিটি সোসাইটির মুসলিম ব্রাদারহুডের একটা সীমানাও তৈরি হয়। বড় কারণ বোধ হয় - আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে দুই বছরের পড়ালেখার কারণে আমার সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রাসানের খানিক হলেও জানা শোনা। তবে ইজিপ্টের আল-আজহার ইউনিভার্সিটির এই গ্র্যাজুয়েটের ভাবনায় কাঠমোল্লাদের নির্যাতনে বিরক্ত আমার মুগ্ধতা। এসব ফ্যাক্টস অ্যান্ড ইনসাইটস আমাকে এতটুকু বিশ্বাস দেয় - নতুন জায়গায় ঘুরা কিংবা জানার জন্য অন্তত: ভাষাগত দেয়ালে আঁটকাবো না। তাই কুরবাণীর ঈদের দিনটিকে সাদামাদা একটি দিন রাখতেই, মন খারাপের গন্ডিতে নিজেকে না আঁটকাতেই যাত্রা শুরু।

কথা ছিল সকাল ছয়টায় রওনা দেবো পাতায়া থেকে, আটটায় ইকামাই বাস টার্মিনালে প্রাসান থাকবে অপেক্ষায়। তারপর তার গ্রামের বাড়ী। সুবেহ-সাদেক-তন্দ্রা বিলাসী আমার চোখে খোঁচা লাগে ছ'টা চল্লিশে। ঘুমেই এসএমএস টাইপ করলাম - "নামাজ শেষে আটটায় রওনা দেবো, দশটায় ইকামাই পৌঁছবো"। ফিরতি এসএমএস - "ওকে।"

পাতায়া বাস টার্মিনালে টিকিট কিনে দেখি আটটার বাসে জায়গা নেই। সাড়ে আটটার টিকিট কিনে অপেক্ষা। ঈদের দিন বলে নাস্তার ইচ্ছে জেগে ওঠে। মিনিমার্ট থেকে স্যান্ডউইচ, জুস কিনে অপেক্ষা। রঙ-বেরঙয়ের মানুষ দেখা। আইপডটা তখনও পকেটে। হাতে মার্ক টোয়েনের "প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার", হয়তো আমি। বাসও ছাড়লো এক সময়। সাত সকালে বইয়ে মন বসে না। আইপডে ভরসা। শাহনাজ রহমতউল্লাহ আর মাহমুদুন্নবীর গানের তালে তালে সূর্য্যের আলো গাঢ় হয়ে আসে। আসে ফোনকল। ঈদ মোবারক। ইকামাই পৌঁছলাম সোয়া দশটায়। ট্যাক্সী ক্যাব ঠিক করে প্রাসান অপেক্ষায়।

জানলাম - প্ল্যান পাল্টে গেছে। প্রথমে প্রাসানের বাসা, তারপর গ্রামে। আমার সমস্যা নেই। কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই। সুতরাং জনস্রোতে মিশে যেতে মন চায়। সকালে স্টেশনে ফুয়েল কিনতে গিয়ে প্রাসানের গাড়িতে খোঁচা লেগেছে, সামনে সামান্য ফাটল ধরেছে। এরপরও আয়েশ করে চালানো যাবে। বিয়াল্লিশ বছরের প্রাসান, তার তেইশ বছরের গাড়ীর বাইরে হঠাৎ আমার মনে হয় - গতরাতে কী স্বপ্নে দেখলাম? ভাঙা একটা গাড়ি অদ্ভুতভাবে চালাতে চালাতে আমি কিভাবে পৌঁছে যাই ফার্মগেট, সেখানে আরমান পারভেজ মুরাদ কিংবা অন্য কেউ! স্টেশন থেকে প্রাসানের বাসা পনেরো মিনিটের পথ। তবে ব্যাংককের চিরকালীন জ্যামে আরো আঁটকা। পাতায়া থেকে আসার পথে পথে দেখেছি বিভিন্ন ব্যানার সাইনবোর্ড। নির্বাচনী প্রচারণা। এখানে প্রতীক নেই। সবার ব্যালট নম্বর। ব্যাংককে নেমেও দেখি একই অবস্থা। প্রাসানের সাথে এবার নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়। নির্বাচনে মূলত: প্রধান দুই দল। ডেমোক্র্যাট দল বনাম পিপল পাওয়ার পার্টি। থাকসিন সিনাওয়াত্রার থাই রাক থাই পার্টি ব্যানড। দলের লোকজন আপাতত: সমবেত পিপল পাওয়ার পার্টি নামে। প্রাসানের ধারণা - থাকসিন এখনো গ্রামাঞ্চলে প্রচুর জনপ্রিয়। এটা সত্য - থাকসিন দূর্নীতিবাজ। তবে অনেক উন্নয়ন করেছে। এমন কী ডেমোক্র্যাটদের যে নির্বাচনী মেনিফেস্টো - সেটাও থাকসিনের ধারণার কপি-পেস্ট। আলাপে আলাপে আমি আরও কয়েকটা ফোন কল সারি। গুরুত্বপূর্ন ছিল ঢাকা অফিসের নিসার ভাইয়ের জন্মদিন। পথে সেভেন ইলেভেনে গাড়ী থামিয়ে প্রাসানের মেয়ের জন্য কিছু চিপস, জুস, চকোলেট, ক্যান্ডি কিনে নিই। পারামকাও এলাকায় প্রাসানদের বাসা। পারামকাও শব্দার্থটা নিজের জন্য নোট করে রাখি। 'পা'রাম' মানে রাজা রাম, 'কাও' মানে নয়। রাজা নয় নম্বর রাম। ব্যাংককে অনেক রাস্তার নাম 'রামা থ্রি/ রামা টু' এরকম। প্রাসানদের বাসার আশেপাশে পৌঁছতে পৌঁছতে জানলাম এক সময় এ পুরো এলাকার মালিক ছিল তার দাদা কিংবা দাদার বাবা। পরের কোন এক জেনারেশনে সেলার হয়ে যায়। এর পরেও বিশাল এলাকা নিয়ে বাড়ী ঘর। থাই স্টাইলের হাউজ, অনেক পুরনো আস্তানা, সাথে আধুনিক দো'তল বাড়ী। হঠাৎ করে আমার মনে হয় আমি কবি জসীম উদদীনের 'ছুটির অবসরে'র লেখকের মতো বিপদে পড়লাম। সাদামাটা প্রাসানকে দেখে মনে হয়নি এমন তাল্লুক পরিবারের ছেলে। উপহার আরেকটু বেশি কিছু আনা দরকার ছিলো।

থাই বাড়ীগুলোর একটা কমন ব্যাপার চোখে পড়লো। নিচ তলায় ছোটো ছোটো কামরা থাকে না। হলরুম টাইপের বিশাল ঘর। সাজানো গুছানো। এখানে ড্রয়িং ওখানে ডায়নিং। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখলাম কাঁচঘেরা ঘরে প্রাসানের নানী শ্বাশুড়ী। অক্সিজেন নিয়ে মুমূর্ষু। পারামকাও হসপিটালের ডাক্তার নিয়মিত এসে দেখে যাচ্ছে। অনেকদিন যাবত সংজ্ঞাহীন অবস্থা। এই ফাঁকে জানি - প্রাসানের শ্বশুর পরিবার তার আত্মীয়ের মাঝেই লিংকড। এই নব্বইয়ের বেশী বয়েসী রোগাক্রান্ত মানুষটি বিশাল সম্পত্তির খানিক দান করে গেছেন গরীবদের জন্য। সেখানে মুসলিম স্লাম এরিয়া গড়ে উঠেছে। প্রাসানের চার বছরের মেয়ে লীনা, দেড় বছরের ছেলে নাওভী'র সাথে দেখা হলো। কাঁচ ঘেরা শোকেসে আমি অনেক পুরনো দিনের বাসন কোসন দেখি। থাই সৌকর্য্যের বাহার। নাস্তার এন্তেজামে আরাম করে ফ্লোরে বসি। 'খানোম চীন'; চায়নীজ নুডুলস দিয়ে শুরু, তেহারী, থাই কারি'র, পায়েশ এর পাশাপাশি ফলাদি। নাওভী কান্নাকাটি করে রমনীদের অন্দর মহলে চলে গেছে। লীনা দৌড়ে দৌড়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। এরমাঝে হাতে ক্যামেরা এসেছে। লীনার দিকে ক্যামেরা তাক করতেই মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে নানান গল্প হয়। হিজাবী কিছু কিশোরী তরুণী আশেপাশে দেখা যায়। আমার চোখ গিয়ে তাদের জিন্সে আঁটকে যায়। বিশাল জ্ঞাতি-গোষ্ঠী নিয়ে পরিবার বসবাস।

নিচে কুরবানীর গরুর মাংশ কাটা হচ্ছে। পুরুষরা বড় অংশ কেটে ছোটো করে দিচ্ছে। পাশে মহিলারা গোল হয়ে বসে আরো কাটাকুটিতে ব্যস্ত। আমার মাথা তখন থাই হাউজের খুঁটিতে লেগে গেছে। শত বছরের পুরনো বাড়ীর ছাপ। কালের প্রবাহে গঠন-পূণর্গঠন হয়েছে। উঠোনে কড়া রোদ। ভাবলাম - পরে ছবি তুলবো। আপাতত: বাইর থেকে ঘুরে আসি।

সামনের বৈঠকখানার পাশে কামরাঙা গাছ। সাধারণ লোকজন নাকি কামরাঙা তেমন পছন্দ করে না, কিন্তু শহুরে নাগরিক দাম দিয়ে শপিং মল থেকে কামরাঙা কেনে। এখানেও গাছেই পঁচে যাচ্ছে কামরাঙা।

খাঁ খাঁ রোদে যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য সোয়ামপোন প্রভিন্স। ব্যাংকক থেকে ৭৫ কিলোমিটারের পথ। তেইশ বছরের গাড়ী। পারামকাও ছেড়ে চলছে নতুন রাস্তায় শহরের বাইরে হওয়ায় যানজট নেই। অনেকটা ঢাকার তেজগাঁওয়ের মতো রাস্তা। পথে পথে দেখছি পিকআপ ভ্যানে করে নির্বাচনী প্রচারণা।

মূল শহর থেকে বেরুতেই শুন্য রাস্তা। দু'পাশে কেবল ধানক্ষেত। অনেক দূরে ঘর বাড়ী। কাকতাড়ুয়ার বদলে প্লাস্টিকের লম্বা টুকরা বাতাসে উড়ছে পতপত করে। প্রধান রাস্তা থেকে উপ-শাহরিক পথে যেতে চোখে পড়ে গরু-ছাগল। শতশত বক। চিরায়ত গ্রাম। রাস্তা খানিকটা খারাপ। সাইনবোর্ড দেয়া আছে - ড্রাইভ কেয়ারফুলি। এক মোড়ের নাম - হান্ড্রেড ডেথ সার্কেল। এ মোড়ে নাকি প্রচুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়। মৃতের সংখ্যাও শতাধিক। ছবিটি ফেরার পথে তোলা। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় চলতে চলতে আমার মনে পড়ে ২০০৪। রাজবাড়ী-পাংশা-কুমারখালী-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর। এমনই রাস্তা। শুনলাম - থাই এমপি'রা নাকি অপেক্ষা করে আরেকটু রাস্তা নষ্ট হোক। আরেকটা বছর যাক। এ বছরের বাজেটটা বাঁচাতে পারলেই হয়। আগামী বছরের ভাগ বাটোয়ারায় জমা থাক। কমিশন আর পার্সেন্টেজের চর্চা বাংলাদেশের মতোই। তবে পরিমাণে কম। হঠাৎ পার হলাম চমৎকার কারুকাজের এক বৌদ্ধ মন্দির। ঠিক করলাম - ক্যামেরা অন রাখি। ছবি না তুললেই মিস।

অবশেষে ঢুকলাম গ্রামের রাস্তায়। পাঁকা সড়ক। বাংলাদেশী স্টাইলে ধান শুকোতে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ ধান নিংড়ে দিচ্ছে। মানুষের পোশাক আশাকে সাজ সাজ ভাব। ঈদের দিন। কয়েক জায়গায় গরু জবাই হচ্ছে। এলাকাটি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ। মাইনরিটি গ্রুপ ফিলিংয়ে একত্রে থাকা হয়তো নিরাপদ! অনেকেই শহর থেকে গ্রামে ঈদ করতে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো গ্রামগুলোর কোনো নাম নেই। গ্রামের মাঝে খাল বয়ে গেছে। চাষাবাদের পানি সাপ্লাইয়ে সরকারী উদ্দোগে অনেক আগে খাল খনন হয়েছে। এই খালের সীমানা ধরেই গ্রামের নাম। যেমন - প্রাসানদের গ্রামের নাম - ক্যানেল নাইনটিন। থাই নামটা মনে পড়ছে না এখন। প্রথম ক্লিকে ধরা পড়লো গোয়াল ঘর। বাইরে কড়া রোদ। গরুগুলো যেন গরমে হাঁফিয়ে উঠেছে।

মোটর সাইকেলের শব্দকে ছাপিয়ে প্রাসানের গাড়ী গিয়ে থামলো তার স্কুলের সামনে। প্রাইমারী স্কুল। তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছরে অনেক এগিয়ে গেছে। সুন্দর ভবন হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে।

সে সময় খালই ছিল যাতায়াতের প্রধান রাস্তা। নৌকা বেয়ে স্কুলে আসার স্মৃতিচারণে অপলক ধুলি ওড়ে। তিনটি সদ্য কিশোর দূর্দম সাহসে মোটরবাইকে টান দেয়।

গ্রামেও নির্বাচনী আমেজ। মোড়ে মোড়ে প্রচার।

থামলাম - এক ছোটোখাটোর চেয়ে একটু বড় এক দোকানে। পিপাসা লেগেছে খুব। ফ্রিজের কাঁচের ভেতর নতুন পানীয় হাতে নিই। চায়নিজজাত পানীয়ে চুমুক দিই। নিরিবিলি থাকার জন্য গ্রামের চেয়ে ভালো জায়গা নেই। আরেকটি গাড়ী এসে থামে দোকানের সামনে। শহুরে বেশভুষা। ঈদ উপলক্ষে গ্রামাগমন।

প্রাসানের সাথে ওরা সামান্য কথা বলে। আমি ক্যামেরায় দৃশ্য খুঁজি।

গাড়ী চলে। সাথে আমিও। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই। জমির আলের মতো কাঁচা পথ পেরিয়ে এক বাড়ীর সামনে। প্রাসানের মামা বাড়ী। সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ আতিথেয়তায় ঘরে নিয়ে গেলেন। তার ছেলে-বৌ নাতীরা গ্রামে ঈদ করতে এসেছে। ঘরের পেছন দিকে দাওয়া'র মতো খালি জায়গা। পাশে রান্না কর্নার। সোফা বাদ দিয়ে ফ্লোরে বসে আলাপ করি। নাকে ভেসে আসে আমাদের গ্রামের ঘ্রাণ। বাতাস বইছে তখন।
সিলিন্ডার গ্যাসের চুলায় খাবার তৈরি হয়। কুরবানীর মাংশ। গরম গরম পরিবেশনের আগে রুহ আফজা স্বাদে শরবত। বিশাল কেক। প্রাসানের মামীও এসে বসেন। আমার মনের কথাটাই মহিলা এক পর্যায়ে বলে ফেলেন - "আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমার সাথে আরো কথা বলি, কিন্তু ভাষা সমস্যার কারণে হচ্ছে না"।
প্রাসানের অনুবাদে বলি - "আমারও।"
কথায় কথায় কাঁচা বাঁধাকপির পাতা দিয়ে ঝুরঝুরে গরুর গোশতে কামড় দিই। এ কম্বিনেশনটা অসাধারণ। দেশে গিয়ে আবার ট্রাই দেবো। মামী এবার একটি বিয়ের কার্ড হাতে ধরিয়ে দেন। সামনের ২৫ জানুয়ারীতে মেয়ের বিয়ে। ব্যাংককে অনুষ্ঠান। আমি গেলে খুব খুশি হবেন। আমিও সবিনয়ে কৃতজ্ঞতা জানাই। খুব চেষ্টা করবো। পরম মমতার এ মানুষগুলোকে বিদায় জানিয়ে গাড়ীতে উঠতে আমার মনে হয় - কেনো এসব মানুষের সাথে দেখা হয়? আবার কখনো কি দেখা হবে? সময় বিকেল তিনটা।

এবার যাত্রা বিরতি ঈশা মাস্টারের বৈঠকে। প্রাসানের স্কুল শিক্ষক। ঝুলন্ত দোলনার উপর জমিদারী স্টাইলে বসে বসে ঝুলছে। পাশে তিনজন শ্রোতা। আমাদের নতুন চেয়ার দেয়া হয়। প্রাসান মন দিয়ে গুরুবাণী শোনে। কাঠের দোতলা বাড়ী। নিচটা খালি। উপরে নিবাস। কয়েক মিনিটের মাঝে ট্রে'তে করে পানি আসে, সাথে পুডিং টাইপ মিষ্টি। ঈশা মাস্টার আমাকে চমকে দেয় ইংরেজী বলে। থাইল্যান্ড কেমন লাগছে, ক'দিন আছি কিংবা থাকবো এসব আলাপ হয়। হঠাৎ এক ডেমোক্র্যাট দলের ক্যানভাসার এসে ভোট চেয়ে যায়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তাদের প্রতিশ্রুতি - মসজিদ হবে অনেক। ধর্ম কি সব খানেই রাজনীতির হাতিয়ার?

এবার শহরে ফেরা দরকার। বিকেল হয়ে গেছে। একই পথে ফেরা। প্রাসানকে বলা আছে - কোথায় কোথায় গাড়ী স্লো করতে হবে। ছবি তুলবো। কিছু দূর যেতেই দেখি রাস্তার পাশে একটি গাড়ী নষ্ট হয়ে আছে। মানুষগুলো পরিচিত মনে হয়। সে-ই দোকানে যাদের দেখেছিলাম। প্রাসান গাড়ী থামিয়ে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে, তবুও ঠিক হয় না। শেষে তিন রমণী দুই শিশু আমাদের সংগী হয়। আমার আইপডে সাউন্ড সমস্যা করছে। সুমেধা'র যাদু হায় যেনো অনেক দূরের স্টেডিয়াম থেকে ভেসে আসছে।

বিকেলের তীর্যক রোদ লাগছে চোখে। এ রোদের কারণেই বৌদ্ধ মন্দির কিংবা অন্য ছবিগুলো ভালো হলো না।

শহরের আগেভাগে নামিয়ে দিতে গেলাম সংগীসাথীদের। অনুরোধ রাখতে হলো, একটুর জন্য হলেও আতিথেয়তা গ্রহণ করুন। বাড়ীটি নির্মানাধীন। পরিচয় হলো - বাড়ীর ছেলে মাহদীনের সাথে। বামরুনগ্রাদের অ্যারাবিক ইন্টারপ্রেটার। ঘরের মহিলাগুলো ইতোমধ্যে খানাদানা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। শরবত-পেয়ারা-ফিসবল শেষে আরও কিছু হাতে ধরিয়ে দেয়া। আমি ভাবছি - পাতায়া ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

গোধুলী বিকেলে আকাশটা লাল হয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারের গাড়ীগুলো সারি বেঁধে শেষ মুহুর্তের আবেদনে ব্যস্ত। ইচ্ছে ছিল - অ্যাজাম্পশান (অ্যাবাক) ইউনিভার্সিটির ভালো একটি ছবি তুলবো, ট্রাফিক সিগন্যাল আর রোদের কারণে হলো না। বিশেষ করে বিশাল পতাকাটা মিস করলাম।

প্রাসানদের বাসায় ফিরে এখনকার হাউজের ছবি তুললাম। ফ্রেশ হয়ে খাবার না খেয়ে ঘরে ফেরার তাড়া। অনেকগুলো ছবি তোলা হলো না। অনেকগুলো গল্প হলো না। প্রাসানের বউ প্যাকেট করে রাতের খাবার দিয়ে দিয়েছে। ঘরে ফেরার জন্য এতো তাড়া কিসের জানি না।

দু'ঘন্টার পথ।
বকরবকর বাদ দিয়ে কানে আইপড চাপিয়ে দিই। ক্লান্তি লাগে।
আগামী কাল দেশে ঈদ।
কাঁচারী ঘরের সামনে কুরবানী।
শতশত পরিচিত মুখ - এসব থেকে দূরে সরে যাচ্ছি দিনদিন।
ঘরের সবাই এক সাথে কথা বলছে।
সরগরম আড্ডা।
মা-চাচীরা চা বানাতে বানাতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এ কোলাহলে বারবার আমার ঘুম ছুটে যায় - - -।

.
.
.

Read more...

15 December, 2007

এই আগুনে হাত

রাতের ঘুমের সমস্যা আবার শুরু হয়েছে। ভোর রাতে ঘুম জাঁকিয়ে আসে। অনেক দিনের ছ'টা চল্লিশ পাল্টে অ্যালার্ম সাতটা হয়েছে। তবুও পাঁচ মিনিটের বেহেশতী ঘুম আমাকে ছাড়ে না। সাতটা দশ, সাতটা পনেরো, পঁচিশ করে করে সাড়ে সাতটা। তারপর ব্রাশ, গোসল, তোয়ালে, ভেজা চুলে চিরুনী। সাতটা আটান্ন মিনিটে ক্লক ইন। কয়লা খনির ময়লা শ্রমিক। প্রয়োজনটা তখন আবশ্যিক হয়ে ওঠে, এক কাপ কফি। খুব বেশী হলে সাথে একটা পাউরুটি টুকরা, ভেতরে চিনি মাখন মেশানো থাকে। আধুনিক মানুষের ফাস্ট ব্রেকিং। কতোদিন নাস্তা করি না। নাস্তা মানে য়িউগার্ট কর্নের কনজ্যুমারিস্ট অখাদ্য নয়। নাস্তা মানে রুটি, নাস্তা মানে পরোটা, নাস্তা মানে সবজি ভাজি, নাস্তা মানে গরুর গোশত ভুনা। তারপর ঘন এক কাপ চা। নাস্তা মানে হাতের কাছে দৈনিক পত্রিকা, রেডিওতে মহানগর ম্যাগাজিন। নাস্তা মানে সারা দিনের তাড়া।

ইদানিং হাল্কা শীত পড়ছে। সন্ধ্যায় বাসা ফিরতে নাকে কুয়াশা লাগে। কেনো জানি না - বারবার ভাজা মাছের ঘ্রাণ ভেসে আসে। আমি হাঁটি। হাঁটতেই থাকি। আমার সাথে সাথে ভাজা মাছের ঘ্রাণ। মনে পড়ে - অনেক দিন আগে, ক'বছর? দশ? না, আরো বেশী সতেরো, আঠারো বছর আগে। অনিয়মে সন্ধ্যায় নাপিত ঘর হয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে কাঁপাকাঁপা শরীর নিয়ে ধোঁয়া ওঠা ভাত, সাথে ভাজা মাছ। সেদিন পড়ার টেবিলে বসিনি কেনো? অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্রয়ের সন্ধ্যাটা খুব জেগে ওঠে আজকাল।

খাটের অর্ধেক জুড়ে বই ছড়িয়ে আছে। গুনে দেখলাম - এক সাথে পড়ছি চারটি বই। তাই কোনোটিই শেষ হচ্ছে না। জর্জ এলিয়টের তিনটি উপন্যাস কেনাটাই শেষ, কখনো পড়া হবে কিনা জানি না। ইংলিশ ফর টুডে জ্ঞান দিয়ে কাজ হবে না। আঁটকে আছে শোহেইর খাসোগ্যির 'মিরাজ'। বাকীগুলো পাতা উল্টাই, প্রতি সন্ধ্যায়। আর শনিবারে হাউজ কিপার এসে গুছিয়ে যায়।

ডিসেম্বর চলে এলো। অর্ধেক শেষ। দেশে যাওয়া হলো না। ইচ্ছেরা মাঝে মাঝে পরাজিত হয়। ষোলই ডিসেম্বর, ঈদ, ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। ক্রিসমাস এলে জন গোমেজের কথা মনে পড়ে। কলেজের চমৎকার এক বন্ধু জন। বলেছিল - গার্জিয়ানের অনুমতি নিয়ে গেলে বাসায় শুকরের মাংশ খেতে দেবে। ক্রিসমাসে শুভেচ্ছা জানানোর কাউকে খুঁজে পাই না। কয়লা খনির সেন্ট্রাল সাউন্ড সিস্টেমে আজ মেরী ক্রিসমাসের গান চলছে। সান্তা ক্লজ এসেছিল লাল সাদা জামা আর চকোলেটের প্যাকেট হাতে। বাণিজ্যের প্রলেপটুকু এড়িয়ে সান্তা ক্লজের কাছে বলতে ইচ্ছে করে - এক পকেট স্বপ্ন দাও হে বুড়ো। বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমার ইদানিং মরে যেতে ইচ্ছে করে কেনো? তোমার যীশুকে জিজ্ঞেস করে দেখো। সান্তা ক্লজের মুখভঙ্গি দাঁড়ি ভেদ করে আমার চোখে আসে না। আমি চকলেট কামড়াই। নিয়তি আমাকে কামড়ায়।

গতরাতে মায়ের সাথে কথা হলো। কবে দেশে যাবো? নিয়ত প্রশ্নের জবাবে আমারও উত্তর - দেখি আগামী মাসে হয়তো। টুমরো নেভার কামস। ক'টা ঈদ গেলো এভাবে? আটটা? আমি হিসেব করি, না না - চারটা মাত্র। রাত তখন একটা।

আজ কফি বেশী হয়ে গেছে। ক্লান্তির মাঝেও ঘুম আসবে না। আবারও নিশি যাপন। সুকুমভিতের বুক চিড়ে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দের সাথে নিত্য সহবাস। চার চৌদ্দ ছাপ্পান্ন গুনে গুনে সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে গত সন্ধ্যায় মনে হলো - দ্য সান উইল রাইজ টুমরো।

.
.
.

Read more...

04 December, 2007

অন্তরবাদ্যি



সেই যে কবে ঈদগাহ মাঠের কৃষ্ণচূড়া গাছটিকে ভালোবেসেছিলাম। পুকুরপাড়ের আমগাছ কিংবা ঘরের পেছনের সোনালু গাছ কিছুই নেই আর। সব ভালোলাগা ভালোবাসাগুলো ফ্যাকাশে হয়ে গেলো সময়ের সাথে সাথে। এক হাঁটু ধুলো নিয়ে সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলো ঢুলোঢুলো চোখ, হারিকেনের আলো ভাগাভাগি নিয়ে খুনসুটি। মায়ের চোখ রাঙানি দেখে দাদার খাটে নিরাপদ আশ্রয়। আজ সব স্মৃতি। সব নকশীকাঁথায় নিপুণ গাঁথুনি। কৃষ্ণচূড়া-আমগাছ-সোনালু গাছগুলো নেই। বৈদ্যুতিক আলোর চাকচিক্যে হারিকেনগুলোও নিভে গেছে একে একে।

কৈশোর উত্তীর্ণ যৌবনের প্রথম সকালে উদভ্রান্তের মতো এলোমেলো হেঁটে গেছি লক্ষ্যহীন পথে। নি:শ্বাসের কালো ধোঁয়া মিশে গেছে মনের সবুজে। ইট পাথরেরে শহরে বিশ্বস্ত মুখ খুঁজেছি দিনরাত। 'হাত বাড়ালেই বন্ধু মিলে হাত বাড়ালেই সুখ, সুখের ঘরে হামলে পড়ে অসহ্য অসুখ'। এ অসুখে আক্রান্ত চেনাজানা স্বজনগুলোও পাল্টে গেলো একদিন। অবিশ্বাসের শ্যাওলায় ঢেকে গেছে বিন্দু বিন্দু করে জমানো বিশ্বাসের জলাভূমি। হলুদ খামের চিঠি পাই না অনেক দিন। ই-মেইলগুলোও খুব সংক্ষিপ্ত, দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা। মোবাইল ফোনে তিরিশ সেকেন্ড পালসের আগেই কথা শেষ হয়ে যায়। চারপাশে শুনি কেবল সুখী মানুষদের সুখের গল্প। বেগুনী-নীল-আসমানী স্বপ্নগুলো নাকি আকাশ থেকে নেমে চুপচাপ হেঁটে চলে তাদের ঘরের ঈষাণ কোণে। কেবল সাদা-কালো বৃত্তে বন্দী আমি নস্টালজিক দিন দিন প্রতিদিন।

সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ আড্ডায় বেসামাল গলায় চিৎকার করি শহীদ কাদরী - তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, ভয় নেই এমন দিন এনে দিবো'। আসলে কিছুই আনতে পারি না। ঘুম পাড়ানি মাসিপিসিকে ডেকে আনে রিলাক্সেন, সেডিল। আন্ত:নগর ট্রেনের সাথে স্বপ্নে দৌড়েছিলাম কতোকাল আগে! আর এখন স্বপ্ন মানেই সিঁড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছি আমি। পড়ে যাচ্ছি সাপের গর্তে। কিলবিল করা সাপগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে আমার পায়ে। নড়তে পারছি না একদম। অস্থিরতায় ঘুম ভেঙে যায়। কানে আসে প্রার্থনার পবিত্র আহ্বান। সাড়া দিই না। মন থেকে সাড়া দিতে পারি না।

বিছানায় এপাশ ওপাশ করে বেলা বেড়ে যায়। দুপুরের ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে হেঁটে যাই সবুজের সন্ধানে। - - - মনের সবুজ ফিরে আসে না। খাঁ খাঁ করছে মৃত সবুজের প্রাঙ্গণ, মরুভূমির বিরান জনপদ। জল সঞ্চারণ নেই একদম। অনেক আগেই সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে গেছে নীল আকাশ। গোমড়া মুখভার আকাশকে ঢেকে দিচ্ছে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। কেবল মনের দু:খগুলো জমাট বেঁধে আছে। কবিতার খাতায় ঝলমল করছে বিষন্নতার পংক্তিমালা।

বিভ্রান্ত সময়ে অস্থির চারপাশ ;একাকী - নি:সঙ্গ - বিষন্ন।

১৭/০৫/২০০৫

.
.
.

Read more...

28 November, 2007

হাজারদুয়ারী: ঐতিহ্য ও আগামীর যোগসূত্র

প্রচার ও প্রসারের সাথে সাথে অন্তর্জালে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে প্রতিনিয়ত। প্রথম থেকেই অনেকে ওয়েবে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিভাগ সংযোগ ও মান উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইউনিকোড ব্যবহার করে বিস্তৃতি পাচ্ছে বাংলা ব্লগিং কিংবা ফোরাম। বিশ্বায়নের ফলে আসন্ন পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার সংকটকে মলিন করে দিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে সাইবার সমাজ, সেখানে পিঁছিয়ে নেই বাংলাদেশের মানুষও। নিজেদের ভাবনা-প্রত্যাশাগুলোকে বিশ্বব্যাপী জানান দিচ্ছে কী-বোর্ডের দূরন্ত গতিতে। লেখালেখি ও ভাবনার এমনি এক আকাশ-উঠোন অনলাইন ম্যাগাজিন 'হাজারদুয়ারী' ।

গত একুশে ফেব্রুয়ারীতে যাত্রা শুরু করে প্রতি মাসের পনেরো তারিখে অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে হাজারদুয়ারী। সাদাকালোয় নির্মিত এ সাইটে ঢুকলেই মনটা ভীষণ নস্টালজিক হয়ে উঠে, 'ঐতিহ্য ও আগামীর যোগসূত্র' শ্লোগানটি যেন ভেতরকার শেঁকড় ধরে টান দেয়। হাজারদুয়ারী ইতোমধ্যে অনেকগুলো দুয়ার খুলে দিয়েছে - সদর দুয়ার, ভাবনা দুয়ার, নন্দন দুয়ার, দখিন দুয়ার, আকাশ দুয়ার এমনই চমৎকার সব নামের বিভাগ যোগ হচ্ছে প্রতি সংখ্যায়। হাজারদুয়ারীর সম্পাদক জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক মাসকাওয়াথ আহসান বলছিলেন - "আমরা নতুন লেখকদের খোঁজে। যারা ভাল লেখেন অথচ লেখা ফেরী করেন না, ডাকসাইটে সম্পাদকদের দপ্তরে ধর্ণা দিতে অনাগ্রহী - আমরা সেইসব প্রচারবিমুখ, নির্লিপ্ত অথচ অহংকারী লেখিয়েদের ভক্ত। …হাজারদুয়ারী আপনার ভাবনা প্রকাশের জায়গা, স্পষ্ট উচ্চারণের প্ল্যাটফরম। যারা লিখতে ভালোবাসেন, ভালোবেসে লিখেন তাদের জন্য হাজারদুয়ারীর সবগুলো দরজা খোলা। চলুন আমরা সবাই মিলে পন্ডিত লেখক এবং সেলিব্রেটি কলামিস্টদের মনোপলি ভেঙে দিই।"

প্রথম ছয়টি সংখ্যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হলেও ভাটা পড়েছে গত তিন মাসে। সর্বশেষ নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশিত হলো কিছুদিন আগে। জানা গেছে - সংশ্লিষ্টদের উৎসাহে কমতি নেই বরং সময় এবং সমন্বয় সংকটেই এ বিলম্ব। এরপরও প্রত্যয়-প্রত্যাশার আশাবাদী ছাপ দেখা গেছে প্রতিটি সংখ্যায়। গল্প-কবিতার পাশাপাশি থাকছে বেশ কিছু ভাবনা জাগানিয়া নিবন্ধ। প্রবাসে বাংলা চর্চা, বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক, সার্ক দিল্লী ঘোষণা, বাঙালীর বৈশাখ ভাবনা, স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কসহ চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো ঠাঁই পেয়েছে হাজারদুয়ারীতে। উঠে এসেছে প্রবাসে সফল বাংলাদেশী হিরোদের গল্প।

পাঠকদের সাড়াও আশাব্যঞ্জক। হাজারদুয়ারীর ওয়েব ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আসাদুজ্জামান রুমন জানালেন - হাজারদুয়ারী পরিব্রাউজে প্রতি মাসে অনেক পাঠক যোগ হচ্ছেন। নতুন অনেক লেখক লেখা পাঠাচ্ছেন, মতামত জানাচ্ছেন। পাঠক মতামতের উপর ভিত্তি করে প্রতি সংখ্যায় বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। ধীর গতির ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে যারা পেজ লোড টাইমিং সমস্যার কথা জানিয়েছেন তাদের জন্যই ইউনিকোড পেজ অপশন থাকছে, বাড়তি পলেস্তারা লাগাতে গিয়ে হাজারদুয়ারী আভিজাত্য হারাতে রাজী নয়, বরং সাদাকালো ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার ফন্টে ঝলমল করে আমাদের অহংকারী বর্ণমালায় সৃষ্ট ভাবনার মহীরুহ।

আগামী সংখ্যা হবে 'বিজয় দিবস' সংখ্যা। স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে যে কোনো রকম লেখা আহ্বান করছে হাজারদুয়ারী। সম্পাদকীয় ডেস্ক থেকে জানা গেছে - ২০০৮এ হাজারদুয়ারী আসবে নতুন আঙ্গিকে, নতুন সম্ভবনায়।

লেখক পাঠকের ধুসর ব্যবধান মুছে দিতে হাজারদুয়ারী আহ্বান জানাচ্ছে - একবার হলেও হাজারদুয়ারী ভিজিট করুন, অন্তত: একটি লেখা পাঠান। নিজের ভেতরের এদিক-ওদিকের ভাবনাগুলোকে জানান দিন হাজারদুয়ারীয়, নিয়মিত।

ইন্টারনেটে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশ ভাবনার এক অনন্য অঙ্গণ হয়ে উঠবে হাজারদুয়ারী ; এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
.
.
.

Read more...

19 November, 2007

নিরবধি পথ ছোঁয়ার শিল্পী; সঞ্জীব চৌধুরী

আমি তখন নচিকেতা-অঞ্জন-সুমনের গানের পাগল। দশ নম্বর গোল চক্করের চৌধুরী উদ্দোগে বলা ছিল - নচিকেতার নতুন অ্যালবাম আসলেই যেন আমাকে জানায়। মাঝে চিটাগাং গিয়ে হাতে পেলাম, দলছুটের অ্যালবাম - 'আহ!''সাদা ময়লা রঙীলা পালে আউলা বাতাস খেলে' নাকি বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান শুভেচ্ছায় প্রচারিত হয়ে বেশ লোকপ্রিয় হয়েছে ইতোমধ্যে। নতুন শিল্পীর গান প্রথমে শুনলে ভালো লাগে না, বারবার শুনতে হয়, কান পেরিয়ে মনে লাগতে সময় লাগে। অথচ, দলছুটের গান নিমিষেই মনে ধরে গেলো।

ক্যাসেট প্লেয়ারে বারবার এপিঠ ওপিঠ করে 'আহ!' শুনি। প্রয়াত বন্ধু শুভ্রর করা প্রথম গানের হামিংটা গুনগুন করি সারাদিন। এরপর অন্যান্য গান, একটার চেয়ে একটা প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায়ই নিজের অজান্তে বলে উঠি - ঐ অন্ধের চোখে কেনো সানগ্লাস? কিনে ফেলেছো কি স্বর্গের সিঁড়ি? কিংবা আমার মনেতে নাই সুখ, চোখের মধ্যে বসত করে অন্য লোকের চোখ। কিছু ভালোলাগা যেমন উড়িয়ে নেয় না, উথাল-পাথাল করে না, বরং - নরম এক আবেশে জড়িয়ে রাখে অনেকক্ষণ, অনেক দিন। সেরকম 'আহ!' অ্যালবামের গানগুলো আমার প্রিয় হয়ে থাকে।

আরও পরে, হয়তো বছর দু'য়েক পরে - ফ্র্যাগমেন্টেড বাক্যের উদাহরণে আশিক বলছিলো - গাড়ী চলে না, চলে না চলে না রে। এটা সম্ভবত: বিটিভি'র ইত্যাদিতে প্রচারিত হয়ে শ্রোতাপ্রিয়। তখন কী যেন ক্যামন একটা সময় ছিল, তাই 'হৃদয়পুর' কিনতে দেরী হয়। চলতি পথে কোথাও 'মেয়ে তুমি এভাবে তাকালে কেনো, এমন মেয়ে কিভাবে বানালে ঈশ্বর' যে হৃদয়পুরের গান সেটাও বোঝতে দেরী হয়। এবার মনে হয় 'আহ!'র স্পর্শ ছাড়িয়ে যায় 'হৃদয়পুর'আমি তোমাকে বলে দেবো, কী যে একা দীর্ঘ রাত আমি কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়, ছুঁয়ে কান্নার রং ছুঁয়ে জোছনার ছায়া! ভেবেছিলাম, বায়সিক অনুসঙ্গে এ মুগ্ধতা; কিন্তু এখন অনুভব করি - স্পর্শের ক্ষমতা যার আছে, সে গানের সময় কোনো ব্যাপার না - এখনও ঠিক একই রকমভাবে শিহরিত হই।

তারপর দুম করে এক বৈশাখে পাই - 'আকাশচুরি'। পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব-বাপ্পা বলছিলেন - বেশ এক্সপেরিমেন্ট আছে অ্যালবামে। আমি গানের তাল-মাত্রা বুঝি না। কথা ভালো লাগলে, সুর ভালো লাগলে চোখ বুঁজে শুনি বারবার। আকাশচুরি শুনে মনে হলো, আসলেই এক্সপেরিমেন্ট আছে। বাপ্পার 'জ্বরের ঘোরে ভালো থাকি, দেখতে আসো কেমন আছি, রাখো হাত কপালটায়, পুড়ে যাওয়ার কিছু থাকে না বাকী' যেমন ছেলেমানুষী মনে জ্বর প্রত্যাশী করে, তেমনি সঞ্জীবের 'আগুনের কথা বন্ধুকে বলি' দগদগে ক্ষত তৈরি করে, আমাকে নষ্ট শহরের নষ্ট ছেলে করে দেয়। ফরহাদ মজহারের লেখা এ গানে কোথায় যেনো আমি আমাকে খুঁজে পাই। দীর্ঘদিন যাবত আমার এমএসএনে নিক ছিলো - 'নষ্ট শহরের নষ্ট ছেলে'।

এরপর ২০০৩এর ডিসেম্বরে 'স্বপ্নবাজি' নিয়ে হাজির হন সঞ্জীব। এক পলকে চলে গেলো, আহ কি যে তার মুখখানা রিক্সা কেনো আস্তে চলে না? স্বপ্নবাজি খুব বেশী প্রভাব ফেলেনি, কারণ ব্যক্তিগত স্বপ্নময়তা কিংবা বাজির দরে তখন আমি ক্লান্ত, ম্যাটাডোরের লাল ষাঁড়। লাল কাপড়ের পেছনে দৌঁড়াতে দৌড়াতে থাইল্যান্ড এসে যখন থামলাম, তারও পরে দেশে যাবার সময় স্বপ্নবাজি ব্যাকুল করে দিলো। সেটা পরে বলছি।

একটা সময় ছিল বন্ধুসভার জন্য অপেক্ষা, বুধবার। ২০০১এ বন্ধুসভা 'মহানির্বাচন' আয়োজন করে সেরা লেখক বন্ধু ঠিক করলো। আমি বরাবরের মতোই পাঠক, অনুষ্ঠানেও গেলাম দর্শক হিসাবে একা। অনুষ্ঠানে নাম জানা অনেক লেখক-বন্ধুকে দেখলাম। দেশের দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাঠক পাতার প্রথম সম্পাদক হিসেবে আজীবন সম্মাননা দেয়া হলো সঞ্জীব চৌধুরীকে। চেয়ারে বসেছিলেন অনেকটা রাজার ভঙ্গিতে, মাথা উঁচু করে। শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইলেন। গাড়ী চলে না দিয়ে নাচিয়ে গেলেন। দলছুটের গান শোনার সুযোগ আসে আরেকবার পরের বছর আর্মী স্টেডিয়ামে। কোনো এক অসুস্থ শিশুকে সাহায্য করতে অন্তর শো বিজের আয়োজন। অঞ্জন-নচিকেতা-দলছুট-আজম খান-ওয়ারফেজ। আগ্রহটা বেশী ছিল অঞ্জন দত্ত আর নচিকেতার জন্য। বিশাল লাইন পেরিয়ে যখন আর্মী স্টেডিয়ামে ঢুকি তখন মঞ্চে দলছুট। প্রথম বারের মতো শুনলাম - তুমি আমার বায়ান্ন তাস। পরে রেডিও মেট্রোওয়েভে শুনলেও ঐ কনসার্টের স্টাইলটা মনে গেঁথে আছে। তুলনামূলক ধীর গতির সুরটাও।

স্বপ্নবাজির কথা বলছিলাম। দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি ও যাওয়া আমার কাছে বিশাল এক আনন্দের ব্যাপার। ছুটির আবেদন, প্লেনের টিকিট, বাসের টিকিট, বিমান বাংলাদেশ ৬/৭ ঘন্টা ডিলে হয়ে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা এসবই আনন্দের, ভীষণ আনন্দের। গত বছর জানুয়ারীতে দেশে যাবো। যাওয়ার আগের রাতে আমার ঘুম হয় না। খানিকটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। আবার মনে হয় ঘুমালে আমি অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে যাবো। এখানে আমাকে ডাকার কেউ নেই, ফ্লাইট মিস হবে! তাই রাত জেগে গান শুনি। আচমকা সঞ্জীবের 'যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন, যাই পেরিয়ে ব্যস্ত নদী অশ্রু আয়োজন' নতুনভাবে মুগ্ধতা জাগায়। বাকী রাত এ গান শুনে কাটিয়ে দিই। হেমন্তের 'পথের ক্লান্তি ভুলে' ছাড়া এমন বাড়ী ফেরার গান আর শুনিনি। আর কোনো গান এমন করে আমাকে ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল করতে পারেনি।

দলছুটের সঞ্জীব চৌধুরীর অনেক পরিচয়। পত্রিকায় দেখলাম ছাত্রজীবনে তুমুল তুখোড় ছিলেন, রাজনীতি করেছেন, কবিতা গানে অদম্য। এটিএনে এক ধারাবাহিক নাটকে (?সুখের লাগিয়া?) অভিনয়ও করেছেন। পরিচয়ে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তারুণ্যের প্রাধান্য দিতেন। গতকাল থেকে মনে পড়ছে আলী মাহমেদ শুভ'র একটা কথা। 'একালের রূপকথা' বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন - সঞ্জীব চৌধুরী লেখক বানাবার মেশিন।

দিনলিপি লিখতে ভালো লাগে না। খালি মন খারাপের কথা আসে। পরশু শনিবার মরার মতো ঘুমিয়েছি। সন্ধ্যায় কানে আইপড চাপিয়ে চিরচেনা নোরা রেস্টুরেন্টে খেতে বসি। রাস্তার পাশে খোলা আয়োজন। 'তোমার ভাঁজ খুলো আনন্দ দেখাও করি প্রেমে তরজমা' - অকারণ ভালো লাগা আনে। এমনটি আনে প্রায়ই সুবীর নন্দী, শাহনাজ রহমতউল্লাহ কিংবা নিয়াজ মোহম্মদ চৌধুরী। অধুনা শিরিন, হাবীব, শান্তারাও ভর করে। বাসায় ফিরে শুঁড়িখানা ব্লগে দেখি সঞ্জীব চৌধুরী অসুস্থ! এরপর নানা আপডেট। অনেকের মতো আমিও মিরাকলের আশায় থাকি। এখনো 'জোছনা বিহার' শোনা হয়নি। তৃষ্ণা মেটেনি। সঞ্জীবের গান আরও চাই, সঞ্জীবকে চাই। নানা গুজবও রটে সংবাদ অসংবাদের। পড়তে ইচ্ছে করে না। একজন মানুষ, প্রিয় শিল্পী এরকম করে কেনো চলে যাবে?

--- শেষে চলে যায়। কেনো যায়? এ প্রশ্নের জবাব আমি জানি না, ঈশ্বরের নিষ্ঠুরতায় নীরব হয়ে থাকি। সঞ্জীব চৌধুরী চলে গেছেন, যেখানেই যাক - ভালো থাকুক। তাঁর গানগুলো থাকুক আগামীর দিনগুলোয়, আমাদের মাঝে কালজয়ী হয়ে।
.
.
.

Read more...

08 November, 2007

পরোটা, সুচিত্রা সেন এবং সন্দেহ

কয়েক দিন আগে আয়নার সামনে যখন ব্যাপারটা চোখে পড়লো, তখনও সাত্তার মামা তেমন গুরুত্ব দেননি। মাথার হাজার হাজার চুলের মাঝে দু'য়েকটা সাদা হয়ে গেলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হয়! বরং দুপাশে জুলফির ওপরে সাদা চুল ঘন হয়ে আসলে খানিকটা আভিজাত্য আসে। ক্ষণিক সময়ে সাত্তার মামা ভাবছিলেন - আরো কিছু চুল সাদা হয়ে উঠুক, চশমার কালো ফ্রেমের সাথে মিলিয়ে নতুন গেট আপ মন্দ হবে না একেবারে। এ বয়সে স্মিত-সৌম্য চেহারা নিয়ে প্যাকেজ নাটকে নায়ক হওয়া যাবে না, বাংলালিংকের আপার ক্লাস প্যাকেজের মডেল হওয়া যাবে না, প্রমিত উচ্চারণে বিটিভি'র টক শো ও করা যাবে না। তবুও অন্তত: অফিসে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ধরে রাখা যাবে। পাশের ডেস্কের ত্রিশোর্ধ্ব লতিফ সাহেব যখন নীলক্ষেত থেকে কেনা ডেল কার্নেগী কিংবা ম্যালকম গ্লাডোয়েলের বাংলা সংস্করণ পড়ে সাফল্যের দরজা খুঁজছে, তখন সাত্তার মামা নিজেই কার্নেগী, কিংবা আরও বেশি কিছু হবেন। অফিসের বোর্ড মিটিংয়ে কল মানি রেট কিংবা এল সি নিয়ে আলোচনায় নিজস্ব মতামত শেষে চশমায় ধাক্কা দিয়ে সাদা চুলগুলোর উজ্জ্বল্য ফুটিয়ে তোলা যাবে। মনে হবে - সাদা চুলগুলো মোটেও বয়সের চিহ্ন নয়, বরং অভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ। অথচ মামার সমস্ত ভাবনাকে তুচ্ছ করে দিলো সেদিন মারিয়ার ছোট্ট একটি কথা।

মামা যে ব্যাংকে চাকরী করেন মারিয়া সেখানে ইন্টার্ণ। জানুয়ারী-মে-সেপ্টেম্বর মাস ধরে ধরে এরকম ইন্টার্ণরা আসে, চলে যায়। কারো কারো শেখার আগ্রহ, কারো টাইম পাস, আবার কারো কাছে ইন্টার্ণ কোর্স করতে হবে বলে করা। গত তিন বছরে মামার ব্রাঞ্চে ইন্টার্ণ হিসেবে মেয়েদেরই প্রাধান্য। বিভিন্ন প্রাইভেট য়্যূনিভার্সিটির ছেলে-মেয়েরা আবেদন করে। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছোটোখাটো ইন্টারভিউতে-ও বসেন। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে বাছাই করেন। এ প্রক্রিয়ায় সাত্তার মামা কখনোই নিজেকে জড়াতে চাননি, প্রোবেশনারী পিরিয়ডের জুনিয়র অফিসারদের মতো উথাল-পাথাল আগ্রহ নিয়েও ইন্টার্ণদের দিকে তাকাননি। মনের ভেতর একটা ধারণা ছিলো - ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের বুদ্ধি সুদ্ধি ভালো আছে। তুলনামূলকভাবে স্মার্ট মেয়েদের ইন্টার্ণ হিসেবে নিয়ে একদিকে অফিসের সৌন্দর্য্য বাড়ছে, আবার ঝিমুনিঅলা স্টাফরা মোটিভেটেড হচ্ছে। যেমন - লতিফ সাহেবের কথাই ধরা যাক, সকাল নয়টায় অফিস শুরু অথচ তিনি কখনো নয়টা দশের আগে আসতে পারেন না। হেলেদুলে যাও আসেন, নেক টাই পরিমাণে লম্বা অথবা বিশ্রী রকম খাটো হয়ে যায়। অনেক বলাবলিতেও লতিফ সাহেবের পরিবর্তনের লক্ষণ ছিলো না, অথচ - ইন্টার্ণ আসার সাথে সাথে লতিফ সাহেব ন'টা বাজার দশ মিনিট আগে অফিসে, পরিপাটি চুল, গায়ে ইদানিং খানিকটা ইনফিনিটিও মাখেন মনে হয়! আর প্রোবেশনারী পিরিয়ডের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনীরা লাঞ্চ ব্রেকের সময় কমিয়ে মন দিয়ে কাজ করে, কথাবার্তায়ও পরিমিত-মার্জিত হয়ে ওঠে। এতোদিন দূর থেকে মামা এগুলো দেখে নিজের মাঝে নিজে নানান বিশ্লেষণ করে আমোদিত হয়েছেন কেবল। কিন্তু এবার মারিয়া আসার পর মামাকেও জড়িয়ে পড়তে হলো। ফিন্যান্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কনসেন্ট্রেশনের মারিয়া কাজ করছে ইন্টার-ব্যাংক লোন রেট আর ফরেন কারেন্সী ম্যানেজমেন্টের উপর। সিনিয়র ব্যাংকার হিসেবে মামার উপরেই সব ঘাপলা। একটু পরপর মারিয়া এটা সেটা প্রশ্ন নিয়ে মামার ডেস্কে ঘেঁষে আসে। তত্ত্বীয় অনেক বিষয় ভুলে গেলেও মামা মোটামুটি জবাব দিয়ে কাজ সারতে পারেন। তবে ইদানিং প্রফেসর এম এ মান্নানের 'ব্যাংকিং যুগে যুগে' বইয়ে চোখ বুলান সামান্য। সাত্তার মামা আর মারিয়ার এ সংশ্লিষ্টতা কিংবা ঘনিষ্টতা নিয়ে অফিসে বেশ ফিসফাস গুজগুজ শোনা যায়। তরুণরা এ ব্যাপারে খানিকটা অস্থির কিংবা হিংসা বোধ করতেই পারে, সেটা সাত্তার মামার কাছে জটিল কিছু নয়। বরং লতিফ সাহেব যখন ইনিয়ে বিনিয়ে মামার বয়সের ব্যাপারটা আলোচনায় নিয়ে আসে, তখন মেজাজ আসলেই চড়ে ওঠে। এই যেমন সেদিন, ডলারের উর্ধ্বগতির সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক এবং সময়ের সাথে ব্যবসা বিধির পরিবর্তন নিয়ে মামা যখন মারিয়াকে চমৎকার জ্ঞান দিচ্ছিলেন, পাশ থেকে লতিফ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে অহেতূক জিজ্ঞেস করে - "সাত্তার ভাইয়ের ম্যাট্রিক তো বোধ হয় দেশ স্বাধীনের আগে, নাকি?"
সাত্তার মামা কিছু বলার আগেই মারিয়া বলে ওঠে - "সাত্তার ভাই তাহলে আমার ড্যাডিদের ব্যাচের হবেন।"
তখনি কোণার ডেস্ক থেকে সাকিল টিপ্পনী কাটে - "সাত্তার ভাইকে দেখলে সেরকম বয়েসী মনেই হয় না!"

এসব বিদ্রুপকে সাত্তার মামা নিতান্তই পরশ্রীকাতরতা ভাবেন। বরং লাঞ্চ আওয়ারে মারিয়ার সাথে একত্রে খেতে বসে হতভাগা তরুণদল কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী লাতিফ সাহেবের দিকে মুচকি হাসি ছুঁড়েন। খাবার টেবিলে মারিয়ার সাথে টুকটাক আলাপ হয়। ব্যাংকিং সেক্টর, ক্যারিয়ার, জেনারেশন গ্যাপ কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি শাড়ী-গহনার আলাপও জমে ওঠে। মারিয়া ইদানিং সাত্তার মামার টিফিন বক্সে হাত বাড়াচ্ছে। মামীর রান্না করা মিক্সড ভেজিট্যাবলের মৌতাত ঘ্রাণে মারিয়া লোভ সামলাতে পারে না। মামাও আগ্রহ নিয়ে কয়েক চামচ সব্জিভাজি তুলে দেন। বিনিময়ে মারিয়ার প্লেট থেকে মুরগির রান পাওয়া যায়।

মামীর রান্নার প্রতি মারিয়ার এ মুগ্ধতা মামা গোপন রাখতে পারেন না। বাসায় ফিরে মামীর কাছে মারিয়ার কথা ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড গল্প করেন। প্রথম প্রথম মামী তার স্বভাব সুলভ নম্রতায় 'কী আর এমন রান্না' বলে উড়িয়ে দিতো। প্রশংসায় গদগদ হয়ে পরে বেশ কয়েক দিন মামার টিফিন বক্সে মারিয়ার জন্য পরোটা-সব্জি পাঠিয়েছে। মামাও সন্ধ্যায় ফিরে এসে মারিয়ার গল্প বলেছেন নিয়মিত। মামার মুখে ক্রমাগত মারিয়ার গল্প শুনতে শুনতে মামীর সন্দেহ বোধটা জেগে ওঠে একদিন। সেদিন অফিসে মারিয়া সবুজ প্রিন্টের-কালো পাড়ের বালুচূড়ি কাতান শাড়ী পড়ে এসেছিল, রাপা প্লাজার যার দাম হাজার দুয়েকের মতো। মামীকে সেরকম একটি শাড়ী কিনে দেয়ার কথা বলার পর, মামীর মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটা নিমিষেই উধাও হয়ে যায় মামার এক সম্পূরক মন্তব্যে - 'মারিয়াকে শাড়ীতে আসলেই ভালো লাগছিল'। মামার এ প্রশংসা বাক্য মামীর কাছে আরও বেশী কিছু মনে হলো, এবং মারিয়া নামটা নিমিষেই এক ঘোর শত্রু-শব্দে রূপ নিলো। এ নিয়ে মামী কথা আগালো না, তবে সে রাতে ঘুমও ভাঙলো বেশ কয়েকবার। মাঝ রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে মামা অস্ফুট শব্দে 'মারিয়া' বললো নাকি 'মা রে' বললো সেটা মামী ঠিক নিশ্চিত হতে পারলো না। এ দু:শ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে পরদিন সকালে মামীর মাথা ব্যথা দেখা দিলো, বিছানা ছাড়তে দেরী হলো, এবং মামা সকালের নাস্তা না করে - টিফিন না নিয়ে বাসা থেকে বেরুলেন।

মামীর মাথা ব্যথার ব্যাপারটিকে সাত্তার মামা একেবারে তুচ্ছ মনে করলেন না। বিশ-বাইশ বছরের সংসার জীবনে মামা খেয়াল করেছেন, কোনো কিছু গড়বড় হলেই মামীর মাথা ব্যথা হয়, এবং সেটা প্রায়শই অভিমান-অনুযোগ-রাগ থেকে সৃষ্টি। গতকাল এমন কিছু হয়নি যে মামীর মাথা ব্যথাটা চড়ে উঠবে! মামার আরও অবাক লাগে - বালুচুড়ি কাতান শাড়ি কেনার ব্যাপারে মামী কোনো আগ্রহই দেখালো না! মামীর এ ভিন্ন আচরণে মামার মনে হলো দিনটাই মাটি হবে। এসব অস্থির ভাবনায় দুপুরে বাইরে খেতে যাওয়ার সময় মারিয়া ডাক দেয় - 'বাইরে যেতে হবে না, আমি আপনার জন্য খাবার এনেছি আজ।' মামা আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন সাকিল-লতিফরা কেউ শুনলো কিনা। মারিয়া সেদিন স্যান্ডউইচ আর কিমা পরোটা এনেছিল। খেতে খেতে নাটক সিনেমা নিয়ে গল্প হয়। গল্প হয় - সুচিত্রা সেনের সাম্প্রতিক অসুস্থতা নিয়ে। মারিয়া আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে চোখ রাখছে নিয়মিত। মামাও তার এক সময়কার স্বপ্নকণ্যা সুচিত্রা সেনের সিনেমা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। আনমনে নিজেকে আবার উত্তম কুমার মনে হয়। মামার চুলের স্টাইলটা এখনো সেরকম আছে অবিকল। ভাবনার ডানা প্রশাখা গড়িয়ে জুলফির উপরের সাদা চুলে যেতেই মারিয়া বলে উঠে - "সাত্তার ভাই, চুলে কালার করেন না কেনো?"
সাত্তার মামার মনে হলো কেউ যেনো তার দু'গালে চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে বসেছে। চোখ-কান গরম হয়ে আসে। তবুও হাসি দিয়ে সাত্তার মামা বলেন - "পাকা চুল কই? অল্প দুয়েকটা চোখে পড়ে!"
মারিয়া এবার হাসি দেয়, মনে হয় চরম বিদ্রুপের হাসি - "আয়নায় তাকিয়ে দেখেন, দুপাশের সব পাকা চুল উঁকিঝুকি দিচ্ছে, হি হি হি।"
জুলফির ওপরের পাকা চুল নিয়ে মামা যে আভিজাত্য ভাবনায় ডুবে ছিলেন কিছুদিন আগে, সেটা তুচ্ছ করে দিলো মারিয়ার এ ছোট্ট একটি কথা। আশেপাশে কেউ নেই, তবুও সাত্তার মামার মনে হয় - অফিসের সবাই এ কথা শুনে গেলো, এরপর সাকিল-লতিফরা কথায় কথায় পাকা চুলের কথা টেনে আনবে, মামাকে অপমান করবে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সাত্তার মামার মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। সকালে মামীর মাথা ব্যথা, দুপুরে মারিয়ার বিদ্রুপ সব মিলিয়ে বাজে একটি দিন গেলো। বাসাবো মোড়ে বাস থেকে নেমে কেনো জানি - সুচিত্রা সেনের কথা মনে পড়ে বারবার। মামীও উত্তম-সুচিত্রা জুটির ফ্যান। ভেবে চিন্তে মামা ঢুকলেন মিউজিক প্যালেসে। উত্তম সুচিত্রার তিনটি সিনেমার সিডি কিনে বাসার পথে রওনা দেন। মনটা উড়ুউড়ু হয়ে ওঠে মুহুর্তে। এ উড়ন্ত মনকে আরেকটু চটকে দেয় কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কংকন হেয়ার ড্রেসিং। মারিয়ার বিদ্রুপ ঢাকতে মামা সেলুনে ঢুকে চুলে কালার করান। নাপিত ছোকড়া যখন জুলফির ওপরে কালো রঙ করছিল, তখন মামার মনটাও রঙীন হয়ে উঠে।

বাসায় ফিরে মামীর কাছে চুল কালারের ঘটনা চেপে যান এবং মামীর মাথা ব্যথা সেরে গেছে জেনে মন আরও ভালো হয়ে যায়। মামীও উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখার আগ্রহে সন্ধ্যায় বাসার পুলি-পিঠা বানায়। সারাদিনের মন খারাপের মেঘ কেটে সাত্তার মামার মনের আকাশে রোদের ঝলকানি লাগে। রাতের খাবার শেষে আগ্রহ নিয়ে দু'জন সিনেমা দেখতে বসে। প্রথমে 'ইন্দ্রাণী'; মামীর প্রিয় ছবি।
এক পর্যায়ে সুচিত্রা সেন বলছে - 'বাড়ীটা একটু ছোটো হয়ে গেলো'।
উত্তম কুমার জানালার কাছে দাড়ানো। গুনগুন করে নায়ক গান শুরু করে - "নীড় ছোটো, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো"।
সুচিত্রা সেন ঘাঁড় ফিরিয়ে উত্তম কুমারের দিকে তাকায়। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটের দুপাশে হাসি আস্তে আস্তে বিস্তৃত হয়। সাত্তার মামার মনে হয় - যৌবনের সে-ই বুক ধুপধুপটা আবার শুরু হবে আজ!
মামা রি-ওয়াইন্ড করে আবার দেখেন, সুচিত্রার ভুবনজয়ী হাসি।
মামীকে বলেন - "দেখো, হাসিটা খুব দারুণ না!"
মামী চুপচাপ।
মামা পাশে তাকিয়ে দেখেন, মামী দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে।
গায়ে হাত দিয়ে মামা আস্তে করে ধাক্কা দেন - "কি হলো? সিনেমা দেখছো না? ঘুমাচ্ছো নাকি?"
- "খুব মাথা ধরেছে, ভালো লাগছে না"। মামীর এ মৃদূ জবাবে মামা কোনো পলেস্তারা খুঁজে পেলেন না। মামীর মাথা ধরার কারণ সন্ধানে না গিয়ে মামা আপাত: উত্তম-সুচিত্রার গভীর প্রেমের সংলাপে ডুবে যান। পছন্দ মতো রি-ওয়াইন্ড/ফরওয়ার্ডও করেন।

আরও সময় পরে, সিনেমা প্রায় শেষের দিকে যখন, মামা শুনতে পান - মামী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ কান্নার কি হলো? মামীর কপালে হাত রেখে মামা জিজ্ঞেস করেন - "কী হলো, দু:স্বপ্ন দেখছো?"
মামী এক ঝাপটায় মামার হাতটা দূরে সরিয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে - "পোড়া মিনসে, আমি সকালে এক্সট্রা পরোটা-সব্জি বানিয়ে দিই - আর সন্ধ্যায় উনি জামায় কাজলের দাগ নিয়ে ঘরে ফিরেন!"
মামা থতমত খান।
মামীর ফোঁসফোস কান্নাটা বেড়ে চলেছে।

মামা টিভি বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

.
.
. *****************************************


২০১৪ এডিটেড



কয়েক দিন আগে আয়নার সামনে যখন ব্যাপারটা চোখে পড়লো, তখনো তেমন গুরুত্ব দেননি সাত্তার মামামাথার হাজার হাজার চুলের মাঝে দু'য়েকটা সাদা হয়ে গেলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হয়! বরং দুপাশে জুলফির ওপরে সাদা চুল ঘন হয়ে এলে খানিকটা আভিজাত্য আসে। তাই সাত্তার মামা ভাবছিলেন, আরো কিছু চুল সাদা হয়ে উঠুক, চশমার কালো ফ্রেমের সাথে মিলিয়ে নতুন গেট আপ মন্দ হবে না একেবারে। এ বয়সে স্মিত-সৌম্য চেহারা নিয়ে প্যাকেজ নাটকে নায়ক হওয়া যাবে না, আকাশ-ঢাকা বিলবোর্ডে হাস্যজ্জ্বোল মডেল হওয়া যাবে না, প্রমিত উচ্চারণে টেলিভিশনের মধ্য রাতের টক-শোও করা যাবে না। তবুও, অন্তত: অফিসে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ধরে রাখা যাবে। পাশের ডেস্কের ত্রিশোর্ধ্ব লতিফ সাহেব যখন নীলক্ষেত থেকে কেনা ডেল কার্নেগী কিংবা ড্যান ব্রাউনের বাংলা সংস্করণ পড়ে সাফল্যের দরজা খুঁজছে, তখন সাত্তার মামা নিজেই কার্নেগী, কিংবা আরো বেশি কিছু হবেন। অফিসের বোর্ড মিটিংয়ে কল মানি রেট কিংবা লেটার অভ ক্রেডিট নিয়ে আলোচনায় নিজস্ব মতামত শেষে চশমায় ধাক্কা দিয়ে সাদা চুলগুলোর ঔজ্জ্বল্য ফুটিয়ে তোলা যাবে। মনে হবে - সাদা চুলগুলো মোটেও বয়সের চিহ্ন নয়, বরং অভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ। অথচ মামার সমস্ত ভাবনাকে তুচ্ছ করে দিলো সেদিন মারিয়ার ছোট্ট একটি কথা।

মামা যে ব্যাংকে চাকরী করেন মারিয়া সেখানে ইন্টার্ণ। জানুয়ারী-মে-সেপ্টেম্বর মাস ধরে ধরে এরকম ইন্টার্ণরা আসে, চলে যায়। কারো কারো শেখার আগ্রহ, কারো কাছে হাজিরা দেয়াটাই মূল। গত তিন বছরে মামার ব্রাঞ্চে ইন্টার্ণ হিসেবে মেয়েদেরই প্রাধান্য। বিভিন্ন প্রাইভেট য়্যূনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা আবেদন করে। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছোটোখাটো ইন্টারভিউতেও বসেন। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে বাছাই করেন। এ প্রক্রিয়ায় সাত্তার মামা কখনোই নিজেকে জড়াতে চাননি প্রোবেশনারী পিরিয়ডের জুনিয়র অফিসারদের মতো উথাল-পাথাল আগ্রহ নিয়েও ইন্টার্ণদের দিকে তাকাননি। মনের ভেতর একটা ধারণা ছিলো, ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের বুদ্ধি সুদ্ধি ভালো আছে। তুলনামূলকভাবে স্মার্ট মেয়েদের ইন্টার্ণ হিসেবে নিয়ে একদিকে অফিসের সৌন্দর্য্য বাড়ছে আবার ঝিমুনিঅলা স্টাফরা মোটিভেটেড হচ্ছে। যেমন - লতিফ সাহেবের কথাই ধরা যাক, সকাল নয়টায় অফিস শুরু অথচ তিনি কখনো নয়টা দশের আগে আসতে পারেন না। হেলেদুলে যা-ও আসেন, নেক টাই আকারে বিশ্রী রকম লম্বা অথবা খাটো হয়ে যায়। অনেক বলাবলিতেও লতিফ সাহেবের পরিবর্তনের লক্ষণ ছিল না অথচ ইন্টার্ণ আসার সঙ্গে সঙ্গে লতিফ সাহেব ন'টা বাজার দশ মিনিট আগে অফিসে আসেন। পরিপাটি চুল, গায়ে ইদানিং খানিকটা পারফিউমও মাখেন! আর প্রোবেশনারী পিরিয়ডের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনীরা লাঞ্চ ব্রেকের সময় কমিয়ে মন দিয়ে কাজ করে, কথাবার্তায়ও পরিমিত-মার্জিত হয়ে ওঠে।
এতদিন দূর থেকে  এগুলো দেখে সাত্তার মামা আপন মনে নানান বিশ্লেষণ করে আমোদিত হয়েছেন কেবল। কিন্তু এবার মারিয়া আসার পর মামাকেও জড়িয়ে পড়তে হলো। ফিন্যান্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কনসেন্ট্রেশনের মারিয়া কাজ করছে ইন্টার-ব্যাংক লোন রেট আর ফরেন কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের পর। সিনিয়র ব্যাংকার হিসেবে মামার উপরেই সব ঘাপলা। একটু পরপর মারিয়া এটা সেটা প্রশ্ন নিয়ে মামার ডেস্কে ঘেঁষে আসে। তত্ত্বীয় অনেক বিষয় ভুলে গেলেও মামা মোটামুটি জবাব দিয়ে কাজ সারতে পারেন। তবে ইদানিং প্রফেসর এম এ মান্নানের 'ব্যাংকিং যুগে যুগে' বইয়ে চোখ বুলান টুকটাক
সাত্তার মামা আর মারিয়ার এ সংশ্লিষ্টতা কিংবা ঘনিষ্টতা নিয়ে অফিসে বেশ ফিসফাস গুজগুজ শোনা যায়। তরুণ সহকর্মীরা এ ব্যাপারে খানিকটা অস্থির কিংবা হিংসা বোধ করতেই পারে, সেটা সাত্তার মামার কাছে জটিল কিছু নয়। বরং লতিফ সাহেব যখন ইনিয়ে বিনিয়ে মামার বয়সের ব্যাপারটা আলোচনায় নিয়ে আসে, তখন মেজাজ আসলেই চড়ে ওঠে মামার এই যেমন সেদিন, ডলারের উর্ধ্বগতির সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক এবং সময়ের সাথে ব্যবসা বিধির পরিবর্তন নিয়ে মামা যখন মারিয়াকে চমৎকার জ্ঞান দিচ্ছিলেন, পাশ থেকে লতিফ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে অহেতূক জিজ্ঞেস করে, সাত্তার ভাইয়ের ম্যাট্রিক তো বোধ হয় দেশ স্বাধীনের আগে, নাকি?’
            সাত্তার মামা কিছু বলার আগেই মারিয়া বলে ওঠে,  সাত্তার ভাই তাহলে আমার ড্যাডিদের ব্যাচের হবেন।  তখনি কোণার ডেস্ক থেকে ছোকড়া সাকিল টিপ্পনী কাটে, সাত্তার ভাইকে দেখলে সেরকম বয়েসী মনেই হয় না!
এসব বিদ্রুপকে সাত্তার মামা নিতান্তই পরশ্রীকাতরতা ভাবেন। বরং লাঞ্চ আওয়ারে মারিয়ার সঙ্গে এক টেবিলে  খেতে বসে হতভাগা তরুণদল কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী লাতিফ সাহেবের দিকে মুচকি হাসি ছোঁড়েনখেতে খেতে মারিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত বিষয়ে আলাপ করেন সাত্তার মামাব্যাংকিং সেক্টর, ক্যারিয়ার, জেনারেশন গ্যাপ কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি শাড়ী-গহনার আলাপও জমে ওঠে। মারিয়া ইদানিং সাত্তার মামার টিফিন বক্সে হাত বাড়াচ্ছে। মামীর রান্না করা মিক্সড ভেজিট্যাবলের মৌতাত ঘ্রাণে মারিয়া লোভ সামলাতে পারে না। মামাও আগ্রহ নিয়ে কয়েক চামচ সব্জিভাজি তুলে দেন। বিনিময়ে মারিয়ার প্লেট থেকে মুরগির রান পাওয়া যায়।
মামীর রান্নার প্রতি মারিয়ার এ মুগ্ধতা মামা গোপন রাখতে পারেন না। বাসায় ফিরে মামীর কাছে মারিয়ার কথা ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড গল্প করেন। প্রথম প্রথম মামী তার স্বভাব সুলভ নম্রতায় 'কী আর এমন রান্না' বলে উড়িয়ে দিতেনপ্রশংসায় গদগদ হয়ে পরে বেশ কয়েক দিন মামার টিফিন বক্সে মারিয়ার জন্য পরোটা-সব্জি পাঠিয়েছেন মামীমামাও সন্ধ্যায় ফিরে এসে মারিয়ার গল্প বলেছেন নিয়মিত। মামার মুখে ক্রমাগত মারিয়ার গল্প শুনতে শুনতে মামীর সন্দেহ বোধটা জেগে ওঠে একদিন। সেদিন অফিসে মারিয়া সবুজ প্রিন্টের-কালো পাড়ের বালুচূড়ি কাতান শাড়ী পড়ে এসেছিল, রাপা প্লাজার যার দাম সাত হাজার টাকার মতো। মামীকে সেরকম একটি শাড়ী কিনে দেয়ার কথা বলার পর, মামীর মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিমিষেই উধাও হয়ে যায় মামার এক সম্পূরক মন্তব্যে - 'মারিয়াকে শাড়ীতে আসলেই ভালো লাগছিল'মামার এ প্রশংসা বাক্য মামীর কাছে আরো বেশী কিছু মনে হলো এবং মারিয়া নামটা নিমিষেই এক ঘোর শত্রু-শব্দে রূপ নিলো। এ নিয়ে মামী কথা বাড়ালেন না তবে সে রাতে মামীর ঘুম ভাঙলো বেশ কয়েকবার। মাঝ রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে মামা অস্ফুট শব্দে 'মারিয়া' বললো নাকি 'মা রে' বললো সেটা মামী ঠিক নিশ্চিত হতে পারলেন না। এ নিয়ে দু:শ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে পরদিন সকালে মামীর মাথা ব্যথা দেখা দিলো, বিছানা ছাড়তে দেরী হলো, এবং মামা সকালের নাস্তা না করে - টিফিন না নিয়ে বাসা থেকে বেরুলেন।
মামীর মাথা ব্যথার ব্যাপারটিকে সাত্তার মামা একেবারে তুচ্ছ মনে করলেন না। বিশ-বাইশ বছরের সংসার জীবনে মামা খেয়াল করেছেন, কোনো কিছু গড়বড় হলেই মামীর মাথা ব্যথা হয়, এবং সেটা প্রায়শই অভিমান-অনুযোগ-রাগ থেকে সৃষ্ট গতকাল এমন কিছু হয়নি যে মামীর মাথা ব্যথাটা চড়ে উঠবে! মামার আরও অবাক লাগে - বালুচুড়ি কাতান শাড়ি কেনার ব্যাপারে মামী কোনো আগ্রহই দেখালো না! মামীর এ ভিন্ন আচরণে মামার মনে হলো আজ দিনটাই মাটি হবে। এসব অস্থির ভাবনায় দুপুরে বাইরে খেতে যাওয়ার সময় মারিয়া ডাক দেয় - 'বাইরে যেতে হবে না, আমি আপনার জন্য খাবার এনেছি আজ।'
মামা আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন সাকিল-লতিফরা কেউ শুনলো কিনা। মারিয়া সেদিন স্যান্ডউইচ আর কিমা পরোটা এনেছিল। খেতে খেতে নাটক সিনেমা নিয়ে গল্প হয়। গল্প হয় - সুচিত্রা সেনের প্রয়ান, রহস্যময় জীবন এবং এ নিয়ে বিভিন্ন গুজব নিয়ে। মারিয়া আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে পড়ে শোনাচ্ছিল সেদিনমামাও তার এক সময়কার স্বপ্নকন্যা সুচিত্রা সেনের সিনেমা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। আনমনে নিজেকে আবার উত্তম কুমার মনে হয়। মামার চুলের স্টাইলটা এখনো সেরকম আছে অবিকল। ভাবনার ডানা প্রশাখা গড়িয়ে জুলফির উপরের সাদা চুলে যেতেই মারিয়া বলে উঠে সাত্তার ভাই, চুলে কালার করেন না কেন?
সাত্তার মামার মনে হলো কেউ যেনো তার দু'গালে চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে বসেছে। চোখ-কান গরম হয়ে আসে। তবুও হাসি দিয়ে সাত্তার মামা বলেন পাকা চুল কই? অল্প দুয়েকটা চোখে পড়ে!
মারিয়া এবার হাসি দেয়, মনে হয় চরম বিদ্রুপের হাসি আয়নায় তাকিয়ে দেখেন, দুপাশের সব পাকা চুল উঁকিঝুকি দিচ্ছে, হি হি হি'
জুলফির ওপরের পাকা চুল নিয়ে মামা যে আভিজাত্য ভাবনায় ডুবে ছিলেন কিছুদিন আগে, সেটা তুচ্ছ করে দিলো মারিয়ার এ ছোট্ট একটি কথা। আশেপাশে কেউ নেই, তবুও সাত্তার মামার মনে হয় - অফিসের সবাই এ কথা শুনে গেল এরপর সাকিল-লতিফরা কথায় কথায় পাকা চুলের কথা টেনে আনবে, মামাকে অপমান করবে।
সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সাত্তার মামার মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। সকালে মামীর মাথা ব্যথা, দুপুরে মারিয়ার বিদ্রুপ সব মিলিয়ে বাজে একটি দিন গেলো। বাসাবো মোড়ে বাস থেকে নেমে সুচিত্রা সেনের কথা মনে পড়ে বারবার। মামীও উত্তম-সুচিত্রা জুটির ভক্তভেবে চিন্তে মামা ঢুকলেন মিউজিক প্যালেসে। উত্তম সুচিত্র জুটি অভিনীত সিনেমার ডিভিডি কিনে বাসার পথে রওনা দেন। মনটা উড়ুউড়ু হয়ে ওঠে মুহূর্তেএ উড়ন্ত মনকে আরেকটু চটকে দেয় কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কংকন হেয়ার ড্রেসিং। মারিয়ার বিদ্রুপ ঢাকতে মামা সেলুনে ঢুকে চুলে কালার করান। নাপিত ছোকড়া যখন জুলফির ওপরে কালো রঙ করছিল, তখন মামার মনটাও রঙীন হয়ে উঠে।
সাত্তার মামা বাসায় ফিরে মামীর কাছে চুল কালারের ঘটনা চেপে যান এবং মামীর মাথা ব্যথা সেরে গেছে জেনে মন আরও ভালো হয়ে যায়। মামীও উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখার আগ্রহে সন্ধ্যায় বাসা পুলি-পিঠা বানায়। সারাদিনের মন খারাপের মেঘ কেটে সাত্তার মামার মনের আকাশে রোদের ঝলকানি লাগে। রাতের খাবার শেষে আগ্রহ নিয়ে দু'জন সিনেমা দেখতে বসে। প্রথমে 'ইন্দ্রাণী'; মামীর প্রিয় ছবি।
এক পর্যায়ে সুচিত্রা সেন বলছে বাড়ীটা একটু ছোটো হয়ে গেল
উত্তম কুমার জানালার কাছে দাড়ানো। গুনগুন করে নায়ক গান শুরু করে - নীড় ছোটো, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো
সুচিত্রা সেন ঘাঁড় ফিরিয়ে উত্তম কুমারের দিকে তাকায়। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটের দুপাশে হাসি আস্তে আস্তে বিস্তৃত হয়। সাত্তার মামার মনে হয়, যৌবনের সে-ই বুক ধুপধুপটা আবার শুরু হবে আজ!
মামা রি-ওয়াইন্ড করে আবার দেখেন, সুচিত্রার ভুবনজয়ী হাসি।
মামীকে বলেন দেখো, হাসিটা কী সুন্দর!
মামী চুপচাপ।
মামা পাশে তাকিয়ে দেখেন, মামী দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে
গায়ে হাত দিয়ে মামা আস্তে করে ধাক্কা দেন কি হলো? সিনেমা দেখছো না? ঘুমাচ্ছো নাকি?
খুব মাথা ধরেছে, ভালো লাগছে না মামীর এ মৃদূ জবাবে মামা কোনো পলেস্তারা খুঁজে পেলেন না। মামীর মাথা ধরার কারণ সন্ধানে না গিয়ে মামা আপাত: উত্তম-সুচিত্রার গভীর প্রেমের সংলাপে ডুবে যান। পছন্দ মতো রি-ওয়াইন্ড/ফরওয়ার্ডও করেন।
আরও সময় পরে, সিনেমা প্রায় শেষের দিকে যখন, মামা শুনতে পান - মামী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেহঠাৎ কান্নার কি হলো? মামীর কপালে হাত রেখে মামা জিজ্ঞেস করেন কী হলো, দু:স্বপ্ন দেখছো?
মামী এক ঝাপটায় মামার হাতটা দূরে সরিয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘পোড়া মিনসে, আমি সকালে এক্সট্রা পরোটা সব্জি বানিয়ে দিই - আর সন্ধ্যায় উনি জামায় কাজলের দাগ নিয়ে ঘরে ফিরেন!
মামা থতমত খান।
মামীর ফোঁসফোস কান্নাটা বেড়ে চলেছে।
মামা টিভি বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।


Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP