23 April, 2008

আগামীর আলুময় জীবনে যখন যাবতীয় সম্ভবনা, তখন...

-
তর্ক-বিতর্ক যা-ই হোক, এবার আর উপায় নেই। চালের দাম কমবে, কমবে মানে আগের মতো ১৬-২০ টাকা হবে ব্যাপারটি হাবিবুল বাশার সুমন আবার ফর্মে এসে টানা সেঞ্চুরি করে আশরাফুলের পজিশন কেড়ে নিয়ে, অধিনায়ক হয়ে, ২০১১ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলকে চ্যাম্পিয়ন করে দিবে; একই পর্যায়ের। এ দুটি স্বপ্ন আপাততঃ একই রাতে একই ঘুমে দেখা সম্ভব। এবং মাঝ রাতে অথবা সকালে ঘুম ভেঙে ঐ স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বলে মেনে নেয়া যাবে চোখ না কচলে, ‘সোলেমানি খাবনামা ও তাবীর’ না দেখে।

চালের দামের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব ফেললো সেটা নিয়ে বিদেশি মিডিয়া রমরমা। ধনী-গরীব অনেক দেশে চালের সংকট। তাই বলে তারা কি বসে আছে? তারা কি ভাত খাবো-ভাত দাও-চালের দাম কমাও বলে কান্না করছে? মোটেই না। সুব্লগার সুবিনয়ের দেয়া লিংকে ক্লিক করে দেখি – আফ্রিকার কালো মানুষ কী মজা করে স্প্যাগাটি খাচ্ছে। (আচ্ছা spaghetti বাংলায় ক্যামনে লিখে? ভাতের কসম লাগে, আমি স্প্যাগাটি কোনোদিন খাই নাই, ছবি যা-ও দেখছি; মনে হয় নুডুলসের মতো কিছু একটা হবে। কারণ, আমি ভাতের হোটেলেই বেশি গেছি। অথবা হোটেলে গেলে ভাত বেশি খাইছি।)

তবে নুডুলস ক্যামন জানি খাইতে অসুবিধা, হাঁস যেমন কিলবিল করে কেঁচো খায়, তেমন করে নুডুলস খাওয়ার স্টাইলটা সুবিধার মনে হয় না। এই ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত খাবার হিসাবে আলু ঠিক আছে। ঠিক আছে মানে পুরা ঠিকাছে। আমাদের দেশীয় শস্য, ফলন ভালো হয়। ডাক্তারেরা বলে পুষ্টিমান ভালো, ভাতের চেয়েও নাকি ভালো। ইতোমধ্যে যারা টুকটাক আলুভ্যাস করে ফেলছেন, তাদের কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, আলু খেলে শরীর হাল্কা লাগে, পেট ভারী লাগে না, রাতে ভালো ঘুম হয়, হুদামিছা আমরা ভাতের জন্য পাগল হয়ে থাকি। বন্ধু কমলকান্ত বললো – রিকি পন্টিং নাকি জীবনেও ভাত খায় নাই, তাহলে – হাবিবুল বাশারের জন্য গোপন একটা রহস্যও উন্মোচিত হলো।

তাহলে আসুন, আলুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে টপাটপ কিছু রেসিপি দেখিঃ

পোড়া আলুঃ
এটা মূলতঃ পোড়া কপাইল্যা মানুষের খাবার।
বিবিসিনিউজ সাইটে বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোফাইল যেটা দেয়া আছে, সেখানে বলা আছে দেশের অর্ধেকের মতো মানুষ ডেইলী ১ ডলারের কম আয় করে। গত তিন বছরে এই বাক্যটা পালটানো হয় নাই। আবার ইকনোমিস্টরা বলে – বাংলাদেশে অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। বছরান্তে হিসাব উলটাপালটা হতে পারে। তবে অতি নিন্ম আয়ের মানুষ, যারা আগে এক/দুইবেলা ভাত খেতো তাদের জন্য এ মেন্যু। পোড়া আলু প্রস্তুত প্রণালী খুব সহজ কাঠ-কয়লার আগুনে আলু পোড়ানো হবে, এবং ৫ মিনিট পরপর কাঠি দিয়ে গুতিয়ে দেখা হবে কেমন পুড়লো। তারপরে বাতাসে রেখে আলু একটু ঠান্ডা করে মুখে পুরে দিতে হবে। কেউ কেউ বলেন –আলুর খোসায় কি একটা বিশেষ পুষ্টি আছে, সুতরাং খোসাসহ খান। পেট শান্তি, জগত শান্তি।

__

সিদ্ধ আলুঃ
আয়-রোজগার একটু ভালো আছে, নিন্ম/মধ্যবিত্ত ট্যাগ লাগানো মানুষদের জন্য এ পদ্ধতি।
আলু পোড়ানোর চেয়ে সিদ্ধ করলে দেখতে ফরসা লাগে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হয়। গ্যাস-হিটারের চুলায় আলু পোড়ানো খানিক ঝামেলা, তাই পানির পাত্রে আলু সিদ্ধ করতে হবে। খুন্তি অথবা চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে হবে – কেমন নরম হলো।
হয়ে গেলে পানি থেকে আলুকে আলাদা করে রাখুন, একটু ঠান্ডা হোক।
তারপরে বিটিভিতে সংগীতানুষ্ঠান বাঁশরী/মালঞ্চ, সাধ্যে কুলালে জিটিভি তে ‘ঘর কা লক্সমি বেটিয়া’ অথবা ‘কাসম সে’ দেখতে দেখতে আলুর খোসা ছিলে ফেলুন।
তারপর আলুতে সামান্য লবণ, কাঁচা মরিচ (গূড়া মরিচও চলবে), পিয়াজ অর্ধেক মিশিয়ে নিন। তবে মাসের প্রথম সপ্তায় বেতন হাতে থাকার দিনগুলোয় সিদ্ধ আলুর সাথে টমেটো কেচাপ মিশিয়ে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে আলু সেদ্ধ করার আগে খোসা ছিলে নিতে হবে।

বিশেষ নোট -
খোসা ছিলায় স্বামী/স্ত্রী দু’জন অংশ নিতে পারেন।
রান্নার কাজ ভাগাভাগির মাধ্যমে নারী-পুরুষের সাম্য সৃষ্টি হবে। আলুর খোসা ছিলতে ছিলতে মিল-মহব্বত-পেয়ারের খুনসুটি হবে। রোমান্স ঘন হয়ে ওঠবে, এবং আলু ভোজনের পরে তা উতলিয়ে যাবে।
নারী নীতি নামক কাগুজে ব্যাপারকে আঙুল দেখিয়ে আলু প্রমাণ করে দিবে – ‘অর্ধেক খোসা ছিলিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

__

ব্যুফে পটেটো এট ফাইফ ফিফটি ফাইভঃ
নিচের মেন্যুগুলো শহরের আলোকিত চটকদার মানুষদের জন্য।
এরা সাধারণতঃ পাঁচ তারার শেফের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত। প্রয়োজনে পারিবারিক আয়োজনে রেডিসন-শেরাটনের শেফ ডেকে ছাদের উপরে পটেটো নাইট করতে পারে। এছাড়াও – এরিস্টোক্রেট, ই-ফেস, নিনফার্জ, আট্রিয়াম, ব্লু ওশান, মেস্কিট গ্রিল রেস্টুরেন্টগুলোয় ব্যুফে থাকবে, পটেটো এট ফাইভ ফিফটি ফাইভ। পাঁচশ পঞ্চান্ন টাকায় প্যাকেজ, সাথে সার্ভিস চার্জ – ভ্যাট থাকবে।
সিদ্দিকা কবীরের বইয়ে এসব খাবার বানানোর টেকনিক নাই।
ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, তবে বাংলা অনুবাদে সমস্যা। নেটে পেলাম পটেটো গ্রাটিন (Potato Gratin) রান্না করতে লাগে 15 garlic cloves, smashed / 4 large thyme sprigs /2 bay leaves/ teaspoon freshly grated nutmeg। এগুলার বাংলা নাম কী?
তবে ছবিতে দেখি, কোনটা কী। (কৃতজ্ঞতা গুগুল মিঞা)
__
এটার নাম নাকি ক্রিমি পটেটো গ্রাটিন:


__
ম্যাশ পটেটো:

__
হয়তো দিশি পটেটো কারী:

___

এবার দেখি, আলুর অন্য প্রভাব কেমন পড়বে?

।। বৌ ভাত নামক অনুষ্ঠান বদলে যাবে, নতুন নাম – বৌ আলু

।। নবান্ন উৎসব হবে নবালু উৎসব

।। দৈনন্দিন জীবনের সংলাপ হবেঃ

অতিথি আপ্যায়নঃ কী বলেন, এই ভর দুপুরে না খেয়ে যাবেন? একটা আলু খেয়ে যান...

পাড়াবেড়ানো আলাপঃ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবো ভাবী, চুলায় আলু দিয়ে এসেছি...

ফোনালাপঃ শুনো, আমার আসতে দেরী হবে, ফ্রিজে আলু আছে, ওভেনে গরম করে নিও।

মেয়েদের আড্ডাঃ ইশিতার আম্মু না, যা ভালো আলু রান্না করে না – পুরা জোসস। আর চুমকিদের বাসার আলু যা তা - জঘন্য। এ-ই, শোন, এটা আবার বলে দিস না। নে, আলুর চাটনি খা, ভাবী বানালো আজ।

বয়স্কদের আলাপঃ বয়েস বেড়ে যাচ্ছে, কিছু খেতে ইচ্ছে করে না, ঐ আলু সেদ্ধটাই একটু ভালো লাগে।

শিশুতোষ আলাপঃ তুমি বাল্লো না, তুম্মি পঁচা, আমি ভালু- আমি আলু খাই।

।। দৈনিক পত্রিকার স্বাস্থ্য কলামঃ
‘ভালো থাকুন’, নাম পালটে হবে – “দিন শুরু হোক আলু দিয়ে।“ এতে সাত সকালে এক গ্লাস পানির সাথে কোন টাইপের আলু খেলে কৌষ্ঠ্যকাঠিন্য কমে সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হবে।

___

।। নতুন গানের এলবাম ।।

শিরিনের - লাল আলুওয়ালা

হাবিব ওয়াহিদের - এসো তবে আলু পোড়াই

মিলার - রূপভানে নাচে আলু খাইয়্যা

শুভ্রদেবের - আমি হ্যামিলনের সেই আলুওয়ালা

জেমস আইয়ুব বাচ্চু (ডুয়েট) - আলু ৫০০ মিলিগ্রাম

___

।। বই মেলায় নতুন বই।।

হুমায়ুন আহমেদের – হিমুর হাতে কয়েকটি কাঁচা আলু

তসলিমা নাসরিনের – তুমি আমায় ডেকেছিলে আলুর নিমন্ত্রণে

আনিসুল হকের – তোর জন্য, আলু ভর্তা

রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা সিরিজ – আলু উধাও

কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজ – আলুর খামার ১-২-৩

এবং
মাহবুব লীলেনের – আলুর চোকলাবাছা দিন

___

বাজারে হরেক রকম আলুর ব্রান্ড আসবে।
রেডিও টিভিতে বিজ্ঞাপন হবে।
_
বিজ্ঞাপন - ০১
সুদর্শন তরুণ-তরুণীরা নেচে গেয়ে বলবে – ‘আলু খাই দিনে, আলু খাই রাতে, অনেকে আলু খাই ভোর দুপুরে। এটাই তো দেশ সেরা প্রিয় খাবার, প্রিয় আলু – সেএএ আছে ভালু, যে রোজ খায় শুধু আলু।
আমরা তো খাচ্ছি আলু – তোমাদের কী খবর বলো?
ভালো থাকার ইচ্ছে হলে, আমাদের সঙ্গে চলো।
পেট ভর হয়ে যায় আলুয় আলুয়, নানা মুনির মতে কী আসে যায়?
মেদ নিয়ে টেনশন আর করি না, প্রোটিন মেশানো আছে – আর নেই ভাবনা।
আলু আলু আলু বাংলামিল্কআলু, আমরা আছি ভালু – তোমাদের কী খবর বলো?
বাংলামিল্কআলু – এখন মিনি প্যাকেও পাওয়া যাচ্ছে।
_

বিজ্ঞাপন – ০২
টিভি টক শোর জনপ্রিয় উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে – আমি এখন এসেছি খুলনায়, মিসেস রহমান আপনি কোন আলু খান?
মিসেস রহমান হাসি দিয়ে বলবেন, কেনো – মেরিলালু?
এখন এসেছি রাজশাহীতে – 'মিসেস আহমেদ আপনার প্রিয় আলু কোনটি?'
জবাবে- ‘আলু? আমি তো চোখ বন্ধ করে মেরিলালু খাই’।
মেরিলালু, একটি স্কয়ার প্রোডাক্টস।
_

বিজ্ঞাপন - ০৩
স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান।
প্রধান শিক্ষক মাইকের সামনে ঘোষণা করছেন – ‘আমাদের এবারের সেরা ছাত্র...’
এরপর শুনসান নীরবতা।
ক্যামেরা চলে যাবে দর্শক সারিতে। উদ্বিগ্ন অভিভাবক সারি।
চশমা খুলে প্রধান শিক্ষক আবার বলবেন, ‘এবার শতভাগ নম্বর, শতভাগ উপস্থিতি, এবং সব স্পোর্টসে প্রথম হয়েছে –‘
আবার দর্শক সারি। ছাত্রছাত্রীদের বড় বড় চোখ। টেনশন।
প্রধান শিক্ষক ঘোষণা করবেন – ‘এবার সেরা ছাত্র হয়েছে – পাপ্পু’!
পাপ্পুর বাবা-মা পাপ্পুকে নিয়ে হাত উঁচু করে দাড়াবেন।
পাপ্পুর মা’কে পাশের মহিলা জিজ্ঞেস করবেন, ‘এই ধুলা-ধোঁয়ার শহর, বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, সেখানে পাপ্পু একদিনও এবসেন্ট না? শতভাগ মার্ক? কীভাবে?’
পাপ্পুর বাবা – টিফিন বক্স থেকে আলু সেদ্ধ বের করে বলবেন – ‘নিন খান, আলু খান, পরীক্ষা পাসের আলু’।
চারদিক থেকে সবাই বলবে – ‘আলু? কোন আলু?’
বিজ্ঞাপন কন্ঠ ঘোষণা দিবে – ‘স্টারালু, সাফল্যের শতভাগ নিশ্চয়তা, মতি-আনাম ব্রাদার্স, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।‘
_

চলমান আলু সমাজ, চলমান বাংলাদেশঃ
থামাথামি নেই।
এখন থেকে মিস্টার চৌধুরী আলু খাবেন, মিসেস চৌধুরীও কম যাবেন না।
আলাল খাবে, দুলাল খাবে।
রাজু আর রিংকী তো এখন সারাক্ষণ আলু খাওয়া খাওয়ি করবে।
এমন কী মোটকু মফিজ? সেও এখন আলু খাবে।
আমাদের রুমা খাবে, সোমা খাবে।
জিপিএ ফাইভ বল্টু, সে-ও আলু খাবে।
হ্যাঁ ভাই, চালের দাম বাড়তিতে আলুর দাম কমেছে।

এখন তো সারা বাংলাদেশ আলু খাবে।

-

Read more...

22 April, 2008

আলোচনা পোস্টঃ অণুগল্পের বিষয় - বিস্তৃতি এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ

সচলায়তনে অণুগল্প ই-বুক সংকলনের জন্য লেখা আহ্বানের পোস্টে একজন অতিথি লেখক প্রশ্ন করেছিলেন – “টেস্ট, ওয়ানডে'র পর যেমন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট.. "অণু গল্প" ও কি বাংলা গল্পে ওরকম নতুন কোন ধারা সংযোজনের চেষ্টা?”

খানিকপরে সচল মুজিব মেহদী বলেছেন – “...অণুগল্প চর্চার ইতিহাস বাংলাভাষায়ও খুব অল্পদিনের নয়। বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯)-এর বিস্তর গল্প এই ধারার। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প 'নিমগাছ'ও কিন্তু একটা অনুগল্পই। তখন এসবকে অণুগল্প বলা হয় নি। তাঁর গল্পগুলো আয়তনে ছোট কিন্তু উপন্যাসের ব্যাপ্তি ওর মধ্যে পুরে দেয়া আছে-- ইত্যাদি বলা হতো। তাঁর একটা গল্পের নাম 'সংক্ষেপে উপন্যাস'। এটা অবশ্য আয়তনে একটু বড়ো-- দেড় পৃষ্ঠা।খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, অণুগল্পকে অন্য বিভিন্ন নামে ডাকার রেওয়াজও আছে। যেমন মোহাম্মদ রফিক একে বলেন 'উপমাগল্প', চৌধুরী জহুরুল হক বলেন 'চোঙাগল্প', হুমায়ুন মালিক বলেন 'কাব্যগল্প', জাহেদ মোতালেব বলেন 'বিচ্ছুগল্প', আমি বলি 'পুঁচকেগল্প'।"

অণুগল্প ই-বুকের প্রস্তাবক-প্রকাশক অমিত আহমেদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – অণুগল্পকে তিনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন। অমিত আহমেদ ৫০০ শব্দের একটি সীমারেখা টেনেছেন। পরে ‘দিয়াশলাই’ মুখবন্ধে – ফিফটিফাইভ-ফিকশন, ড্রাবল, সিক্সটিনাইনার্স টাইপ লেখাগুলোর উল্লেখসহ সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ইতিহাস টেনে অণুগল্পকে একটি ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করেছেন।

লেখা আহবান পোস্টে সচল সংসারে এক সন্ন্যাসী ৫০০ শব্দে অণুগল্প সংজ্ঞার সাথে খানিক দ্বিমত ছিলেন, তিনি বলেছেন – “অণুগল্প নামটায় আমার খুব একটা সায় নেই। "অণু" শব্দটি শুনলে যে-আকারটি ভেসে ওঠে অন্তত আমার মনে, ৫০০ শব্দের গল্প সেই তুলনায় অনেক বড়ো।“

বইয়ের নাম প্রস্তাবনা নিয়ে মন্তব্যে সচল আরিফ জেবতিক বলেছেন – “অনুগল্প অনেকটা হাউয়াই মিঠাইর মতো ; খেতে কষ্ট নেই ,মুখে দিলেই অনায়াসে গলে যায় , কিন্তু স্বাদ লেগে থাকে অনেক্ষন ।“

এই অণুগল্প ই-বুক ‘দিয়াশলাই’ প্রকাশনা-সম্পাদনার সাথে জড়িত থেকে অমিত আহমেদ, কনফুসিয়াস এবং আমি পরে মেইলে – জিটকে অণুগল্প বিষয়ে নিয়ে আরো আলাপ করেছি, আমাদের মনে হয়েছে সচলায়তনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলাপ হতে পারতো। বিশেষ করে, সংকলনের জন্য পাওয়া লেখাগুলো পড়তে গিয়ে আমরা খেয়াল করেছি লেখকরা অণুগল্প ধারণাটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছেন। ৫০০ শব্দের গন্ডিতে সীমিত থাকলেও বিষয়-বিস্তৃতি-গভীরতায় অনেকক্ষেত্রে গল্পগুলোকে সমগোত্রীয় করা যায় না। কয়েকজন লেখক গল্পের সাথে মেইলে আলাদা করে এমনটিও লিখে দিয়েছিলেন – ‘অণুগল্প ব্যাপারটি নিয়ে আমি এখনো স্পষ্ট নই’। এবং আমরা সংশ্লিষ্ট তিনজন এ নিরেট বাস্তবতার সাথে একমত হয়েছি।

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে – যখন সচল মুহম্মদ জুবায়ের ‘দিয়াশলাই’-এর গল্পগুলি : এক পলকে একটু দেখা পোস্টে প্রকাশিত গল্পগুলোকে পরমাণু, অণু, স্বয়ংসম্পূর্ণ, বনসাই– এরকম শ্রেণীতে ভাগ করে ‘অণুগল্প’ সংজ্ঞাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। তিঁনি বলেছেন – “আমি যা বুঝি তা অনেকটা এরকম: পরিসরে অবশ্যই ছোটো, কিন্তু এতে থাকতে হবে পাঠককে সচকিত করে তোলার মতো কিছু একটা। থাকবে তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতা। তীরের মতো ঋজু ও লক্ষ্যভেদী। স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠা কোনো অনুভূতি। কোনো ধোঁয়াশাময় বর্ণনা নয়। হয়তো স্কেচ, কিন্তু স্পষ্ট দাগে আঁকা। অল্প কথায় অনেক কথা বলে যাওয়া, তবে পাঠককে যেন বোঝার আশা জলাঞ্জলি দিতে না হয়।“

এর বাইরে “পাঠপ্রতিক্রিয়া ।। 'অস্তিত্বের অন্ধকার'-শোহেইল মতাহির চৌধুরীর অণুগল্প” পোস্টে আমরা দেখেছি সচল হাসান মোরশেদ, মুজিব মেহদী এবং শোহেইল মতাহির চৌধুরীর কিছু মন্তব্য প্রতিমন্তব্য।

ঠিক এ অবস্থানে থেকে -
সম্মানিত সচল ব্লগার/লেখকদের কাছে জানতে চাইবো – অণুগল্প নিয়ে কে কী ভাবছেন? অণুগল্পের শরীর – দৈর্ঘ্য – প্রস্থ –পরিসীমা অথবা বিস্তৃতি-গভীরতা অথবা ‘অন্যকিছু’ কেমন হয় কিংবা হওয়া উচিত? এক কথায় – অণুগল্প নিয়ে আপনার মতামত জানান। পরিপূরক কিংবা সম্পূরক মতামতে আলাপ এগিয়ে যাক। পোস্টে নাম ধরে আমন্ত্রণ জানাতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ নাম ভুলে যাওয়ার সম্ভবনা থাকবে ব্যাপক। তাই সবাইকে, যাঁরা 'দিয়াশলাই'য়ে লিখেছেন বা লিখেননি, সচলের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি খোলামেলা আলাপে। বিষয় – অণুগল্প।

শুভেচ্ছা।
_____

এ পোস্টের উল্লেখযোগ্য মন্তব্যগুলোঃ
-

আনোয়ার সাদাত শিমুল | মঙ্গল, ২০০৮-০৪-২২ ১৫:২৩
শুরুতে ৩ জন ব্লগারকে ইয়াদ করি। (আরো করা হবে, এবং সবাই এরকম ডাকাডাকি করতে পারেন )
১) সংসারে এক সন্ন্যাসী
২) সুমন চৌধুরী
৩) হিমু;
আপনারা তিনজনই অতিক্ষুদ্র গল্প লিখেন, এবং রসাত্মক হয়। মাঝে মাঝে তাতে বেদনা-বিদ্রুপও লুকায়িত থাকে।
এক্ষেত্রে প্রচলিত 'কৌতুক/চুটকি/জোকস' থেকে 'অণুগল্প'কে আপনারা কীভাবে আলাদা করে দেখবেন বা আদৌ আলাদা করার দরকার আছে কি? প্রাসঙ্গিক মতামত...
___

সুমন চৌধুরী | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ০২:১১
অতিক্রুদ্রাকৃতির গল্প অবশ্য গত শদেড়েক বছরের মধ্যে চেখভও লিখেছেন। আরো পেছনে গেলে মুখে মুখে প্রচলিত ঈশপ,বীরবল, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, গোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পগুলিও এই তালিকায় পড়বে। আকার যদি মানদন্ড হয় তবে কাফকা আসেন এক নম্বরে। সমস্যা হচ্ছে এই গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত একধরণের ছোটগল্প। ছোটগল্পের শর্ত বা গঠণ উপাদানের মধ্যেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার বাস। আজকে যেসব গল্পকে আমরা অণুগল্প বলছি সেগুলো একধরণের ফুড়ুৎ প্রতিক্রিয়া রেখে যায়, যেটা একই সাথে ছোটগল্পে থাকাও জরুরি। সুতরাং অমিত আহমেদ যে শব্দের সীমারেখা টেনেছেন, দৃশ্যত ছোট গল্পের সাথে অণুগল্পের তার বাইরের অন্য পার্থক্য বের করা শক্ত।
তবে আমার কেমন মনে হয় যেসব গল্প শেষ হতেই, অ্যা!/ও/ধ্যাৎ/হায়হায়/হুম/কছ কি! প্রতিক্রিয়া একেবারে রিফ্লেক্স অ্যাকশানে বেরিয়ে আসে সেগুলোই মোক্ষম অণুগল্প।

___

হিমু | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ০৩:১৫
আমি মুশকিলেই পড়লাম। অণুগল্প লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে রেহাই পেয়ে যাবো ভেবেছিলাম, কিন্তু সম্পাদক শিমুল হান্টার হাতে তাড়া করেছেন আবারও।
আমার কাছে মনে হয়, গল্প যদি হয় সাতাশ বছর বয়েসী যুবতী, ছোট গল্প যদি একুশ বছরের তরুণী হয়, তাহলে অণুগল্প হচ্ছে পনেরো কি ষোলো বছরের কিশোরী (যদিও জিজ্ঞাসার উত্তরে আসে, বায়ো কি তেয়ো, মা বলে আয়ো কম)। অর্থাৎ, গল্পে যা যা কিছু পাওয়া যায়, তার সব অণুগল্পে আশা করা ঠিক নয়, আবার খেয়াল না করলে অণুগল্প বেড়ে ছোটগল্প হয়ে যায়। অণুগল্প হচ্ছে আঁটোসাঁটো, ছোটখাটো, কিন্তু ... একেবারেই অন্যরকম !
___

সংসারে এক সন্ন্যাসী | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ০৩:৫৯
‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍সাহিত্য বিষয়ে কোনও পড়াশোনা নেই। তাই যা এখন লিখবো, তা একান্তই আমার ধারণাপ্রসূত অথবা অনুমানজাত। অজস্র অণুগল্প পড়েছি আমি। সংগ্রহেও আছে যথেষ্ট পরিমাণ।
ছোটগল্প, উপন্যাস বা কবিতার সুনির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই বলেই আমি জানি। থাকা সম্ভবও, বোধ হয়, নয়। তাই অণুগল্পের সংজ্ঞা নিধারণের উদ্যোগ না নেয়াটাই উচিত হবে।
নাম যেহেতু অণুগল্প, তাই আকারের ব্যাপারটা অবশ্যই উপেক্ষণীয় নয়। তবে কতো শব্দের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, সেই বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গে না গিয়ে বলি: আমার মনে হয়, অণুগল্পের আকার হওয়া উচিত এমন, যাতে একজন গড় পাঠক তা পড়ে ফেলতে পারেন তিরিশ-চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে
অণুগল্পের শরীর হবে নির্মেদ, বাহুল্যবর্জিত। শেষে থাকবে হয় কোনও টুইস্ট অথবা এমন কোনও বাক্য, যা পাঠককে ভাবাবে/হাসাবে/মনোকষ্ট দেবে।
কৌতুকের সঙ্গে অণুগল্পের মূল পার্থক্য কী? অনুভব করতে পারি, বলতে পারি না। আকারে অনেক কৌতুকের চেয়ে ক্ষুদ্রতর হলেও নিচের গল্পটিকে কৌতুক বলা কি উচিত হবে?

মোটর সাইকেল
একটা মোটর সাইকেলের স্বপ্ন ছিলো ইভানত্সভের। বন্ধুরা একটা মোটর সাইকেল উপহার দিলো তাকে।
এর পর বহুদিন হা-হুতাশ করলো ইভানত্সভ। কাউকে কাছে পেলেই অভিযোগের সুরে বলতো:
- আমাকে আমার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে!

আর লেকচার দিতে পারবো না। এইসব গুরুগম্ভীর কথা বলতে গিয়ে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে আমার। হালকা চরিত্রের মানুষের ধাতে সয় না এমন ভারি কথাবার্তা।
___

আরিফ জেবতিক | মঙ্গল, ২০০৮-০৪-২২ ১৫:৫০
অণুগল্প টার্মটা যতোদূর মনে পড়ে গিয়াস ভাইই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন "পাঠক ফোরাম" এর পাতায় । এর আগে কোথাও এই নামকরন আমার চোখে পড়ে নি । কারো কাছে তথ্য থাকলে অবগত করলে খুশী হব ।
নামকরন পরে হলেও , এ ধরনের গল্পের ব্যবহার অনেক আছে । বনফুল এই ধারায় গুরু । তার প্রায় সবগুলো গল্পই আজকের বিচারে অণূগল্প ।
আমার মনে হয় ছোটগল্পের যে সংজ্ঞা রবিঠাকুর ব্যবহার করেছেন ( শেষ হইয়াও হইল না শেষ ) সেই সংজ্ঞা অণুগল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।
একই সাথে গল্পে টুইস্ট ব্যবহারের যে কৌশল আছে , সেটাও অণূগল্পে আশা করি ।
সাদামাটা গল্প হিসেবে অণূগল্পকে দেখতে প্রস্তুত নই ।
___

নজরুল ইসলাম | মঙ্গল, ২০০৮-০৪-২২ ১৬:০৮
ফাইজলামি সংজ্ঞা: অণু নামধারী তরুণীদের দ্বারা লিখিত গল্পকে অণূগল্প বলে।
বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা: গল্পে শুধুই কেবল অণু থাকিবে... কোনও পরমাণু থাকিতে পারিবে না।
ব্যাকরণিক সংজ্ঞা: প্রশ্নপত্রে যে বাক্যগুলোর ভাব সম্প্রসারণ করিতে দেওয়া হয় সেগুলোকে অণুগল্প বলিয়া অভিহিত করা যায়।
এইটা কিন্তু হইতে পারে... কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে... এইটাই একটা গল্প হইতে পারে... সেই গল্পের সম্প্রসারণে আমরা দেখবো নায়িকা নায়করে বলতেছে আমারে ফুল আনিয়া না দিলে তোমারে বাদ দিয়া আমি করিমের লগে সম্পর্ক পাতুম... তখন নায়ক রহিম বীরদর্পে আগায়ে যায় কমল তুলিবারে... কিন্তু সেইখানে গিয়া দেখে অনেক অনেক কাঁটা... সে ভয় খায়... বার দুই চেস্টা কইরা তারপরে কয়... ধুর শালা... পারুম না... তুই যা গা করিমের লগে... আমিও তাইলে বিলকিসের লগে সম্পর্ক পাতি... সে ফুল চায় না... দুই ট্যাকা দিলেই খুশি...
তবে আমার ফারুক ওয়াসিফের অণুগল্পগুলা ভালো লাগছিলো বেশ... দিয়াশলাই এখনো পড়া হয় নাই... ভাবতেছি আজকাই পইড়ে ফেলবো।
___

তীরন্দাজ | মঙ্গল, ২০০৮-০৪-২২ ১৮:১৭
থাকুক না অণুগল্প পাঁচশো শব্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ! ক্ষতি কি? বাকীটা লেখকদের হাতে ছেড়ে দিলে তো হলো! আর কোন সংজ্ঞার দরকার আছে বলে আমার মনে হয়না।
আমরা অনেক সময় সংজ্ঞাবদ্ধতার বেড়াজালে নিজেদের বন্দী করে ফেলি বড্ডো সহজেই। এতে স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিতে হয় অনেকখানি।
___

অছ্যুৎ বলাই | মঙ্গল, ২০০৮-০৪-২২ ২০:৩৫
অণুগল্প একপ্রকার ফাঁকিবাজি।
_
সুমন চৌধুরী | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ০২:১৩
ঠিক।
___

অমিত আহমেদ | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ০৩:১১
"অণুগল্প" টার্মটা গিয়াস ভাই-ই জনপ্রিয় করেছিলেন। এর আগে টার্মটা ব্যবহৃত হয়েছে কি-না আমার জানা নেই। "দিয়াশলাই" প্রকাশের আগে অণুগল্পের ধারণাটি নিয়ে সামান্য পড়ালেখা করেছিলাম। যা জেনেছি তা এখানে শেয়ার করা যায়।
আন্তর্জাতিক প্রকাশকরা ইদানিং শব্দ সংখ্যা ধরেই অণুগল্প (সর্বোচ্চ ২০০০ শব্দ, সাধারণত সর্বোচ্চ ১০০০ শব্দ), গল্প (২০০০ শব্দ থেকে সর্বোচ্চ ১০০০০ শব্দ), উপন্যাসের (১০০০০ শব্দের উপরে) ভেদ করেন।
প্রথাগত অণুগল্পকারেরা সাধারণত একটি ফরম্যাট অনুসরণ করে অণুগল্প রচনা করে থাকেন। সে ফরম্যাট অনুযায়ী হিমু ভাইয়ের "হাতিসোনা" একটি সফল অণুগল্প। তাই সে গল্পটি মাথায় রেখেই ফরম্যাটটি আলোচনা করা যাক -
১) গল্পের প্লটটা হতে হবে এমন যা সীমিত শব্দের মধ্যে প্রকাশ করা যায়। বড় প্লট অণুগল্পে আঁটানোর চেষ্টা করাটা একটা বদঅভ্যাস।
২) প্রথম প্যারাতে ছোট্ট করে পেক্ষাপট বর্ণনা। হাতিসোনায় যেমন, আমার বয়স তখন আট, ওর নয়...
৩) পেক্ষাপট বর্ণনার পর পরই কাহিনীতে চলে যাওয়া। কাহিনী শুরু হবে কোনো কিছুর মাঝ খান থেকে। হাতিসোনায় যেমন, সেদিন বিকেলেই খেলার মাঠে বুক ঠুকে এগিয়ে গেলাম। ‘হাতিসোনা, তুমি ক্রিকেট খেলবে আমাদের সাথে?’...
৪) লোকেশনের বর্ণনাটা হতে হবে পোক্ত। এক লাইনেই যেন একটা ধারণা পাওয়া যায়। এখানে ট্রিক হলো চেনা লোকেশন ব্যবহার। যেটা নিয়ে বেশি বর্ণনা দেয়া লাগবে না। যেমন হাতিসোনায়, বই কিনতে গিয়েছিলাম, পাশের ছোট্ট পেস্ট্রির দোকানটায় ও আর ওর মা বসে কফি পানে ব্যস্ত।
৫) লেখা জুড়ে এমন একটা টানটান ভাব থাকতে হবে যেন পাঠক গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত কল্পনা করতে থাকে শেষটা কি হতে যাচ্ছে। সফল অণুগল্পকার শেষে একটা টুইস্ট রেখে দেবেন। যেনো পাঠক শেষে এসে একটা ধাক্কা খায়। এ কথাটিই বদ্দা তাঁর কমেন্টে বলেছেন, "...যেসব গল্প শেষ হতেই, অ্যা!/ও/ধ্যাৎ/হায়হায়/হুম/কছ কি! প্রতিক্রিয়া একেবারে রিফ্লেক্স অ্যাকশানে বেরিয়ে আসে..." হাতিসোনার শেষে যেমন দেখি, "মেজদাকে শুধু বাড়ি ফিরে বললাম, ‘হাতিরা ভোলে না।’"
এর পরেও কিছু ট্রিক আছে। যেমন ধরা যাক লেখায় ঐতিহাসিক কিংবা জনপ্রিয় কিছুর রেফারেন্স। এতে লেখার আকার কমে। যেমন আমি লিখলাম, "লোকটাকে দেখে সুমো পালোয়ানের কথা মনে আসে।" এই এক লাইনের লোকটার দৈহিক বর্ণনা দেয়া হয়ে গেলো।
তবে এই প্রথার বাইরেও ইদানিং অণুগল্প লেখা হচ্ছে সেটা অন্তর্জালে ব্যস্ত পাঠকদের জন্য। কাজের ফাঁকে চট করে একটা গল্প পড়ে নেয়া যায়, এটাই প্রধান কারণ। তাই সব ধরনের পাঠকদের কথা মাথায় রেখেই নানান ফরম্যাটের অণুগল্প লেখা হচ্ছে। তাদের অবস্থান তীরন্দাজ ভাইয়ের মতো, "থাকুক না অণুগল্প পাঁচশো শব্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ! ক্ষতি কি? বাকীটা লেখকদের হাতে ছেড়ে দিলে তো হলো..." যেমন "দিয়াশলাই" থেকে মাশীদ আপুর "অণু-পরমাণু" গল্পটির উদাহরণ দেয়া যায়। উপরে বর্ণিত ফরম্যাটের বিন্দুমাত্র অনুসরণ করা না হলেও আধুনিক অণুগল্পকাররা এটাকে অণুগল্পই বলবেন।
___

আনোয়ার সাদাত শিমুল | বুধ, ২০০৮-০৪-২৩ ১৭:০২
ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দের দুটি অণুগল্প 'বউ বাটা বলসাবান', লিখেছেন নজমুল আলবাব।
আরেকটি '...অতঃপর!' - লিখেছেন নিঘাত তিথি।
এবার এ দু'জনের মতামত চাইবো।

আলবাব ভাইঃ
আপনি যদিও স্বীকার করেন না যে আপনি অণুগল্প লিখেন, আপনি বলতে চান - আপনি কেবল গল্পই লিখেন। সেটাকে অণু করতে চান না। কিন্তু পাঠক হিসাবে আমার (এবং আরো অনেকের) মনে হয় - অণুগল্প হিসাবে আপনার বেশ কিছু গল্প মানিয়ে যায়। 'দিয়াশলাই' আলোচনা পোস্টে জুবায়ের ভাইও এমনটি বলেছেন।
বউ বাটা বলসাবান, বিভিন্ন মিতভাষণ - গল্প দুটি আকারে খুবই ছোট, বিষয়ে সুগভীর। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ। আপনি আপনার এ ২টি গল্প নিয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত দিন। পোস্টে প্রস্তাবিত অণুগল্প বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?
_
নিঘাত তিথিঃ
আপনার '...অতঃপর!' গল্পটি অনেক বড় হতে পারতো। কিন্তু তা না করে আপনি এমন অল্প কথায় মুঠোবন্দী করলেন কেনো? অণু হওয়াতে গল্পের তেজ বেড়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু - অণুগল্পে নেয়ার প্রধান কারণ কী? 'দিয়াশলাই'এ প্রকাশিত 'বন্ধু'ও পাঠক প্রিয় হয়েছে। আমার মনে হয়েছে 'বন্ধু' বড় গল্পের উপাদানে ভরপুর ছিলো। কিন্তু, এটিও আপনি অণু করেছেন।
প্রশ্নঃ - অণুগল্প লেখার সময় আপনি কী কী খেয়াল রাখেন, কৌশল কী?
অন্যের লেখা অণুগল্প পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কী থাকে?
দু'জনকেই আগাম ধন্যবাদ।
___

নিঘাত তিথি | রবি, ২০০৮-০৪-২৭ ২০:০১
আমার "...অতঃপর"কে প্রিয় তালিকায় রেখে এবং মাঝেসাঝেই তার উল্লেখ করে শিমুল আমাকে বড়ই বিব্রত করেন।
শিমুলের প্রশ্নগুলোর উত্তর সামগ্রিকভাবে বলছি।
আমার কিশোরবেলার একটা বড় সময় কেটেছে "ভোরের কাগজ"এর "পাঠক ফোরাম" নিয়ে মাতামাতি করে। সেই সময়েই "অণুগল্প" শব্দটি প্রথম জানলাম, এই শব্দটি গিয়াস ভাইই প্রথম চালু করেছিলেন বলে মনে পড়ে। পাঠক ফোরামে ফিচার লেখারও খুব চল ছিলো। খুব স্বাভাবিকভাবে ভীষন প্রভাবিত ছিলাম "পাঠক ফোরাম" এবং পরে "বন্ধুসভা"য়। তো যখন লিখালিখির খানিক সাহস করলাম, দেখা গেলো সেই প্রভাব ভালোভাবেই আছর করলো। লিখতে গেলে অণুই হয়, বড় হয় না। এইভাবে শুরু।
"...অতঃপর" লিখেছিলাম ২০০২ সালে নিজেদের একটা পত্রিকার (যুযুধান) জন্য। গল্পের কোন সীমাবদ্ধ আকার ছিলো না, তবু সেই অণুগল্পই লিখে ফেললাম। তবে আমার অণুগল্প লেখার পেছনে একটা ব্যাপার কাজ করতো যে খুব টানটান বা তীব্র কিছু লিখতে চাইতাম কেন যেন। পরপর কয়েকটা গল্পে এবং অন্য যাই লিখতে গিয়েছি তাতে এমন হয়েছে যে, আমি অনেক কিছু লিখে ফেলেছি, তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে সেটাকে কেটেছেটে এমন কিছু করতে চেয়েছি যাতে বক্তব্যটা থাকে কিন্তু বাহুল্যটা বাদে। "...অতঃপর"-এ ওই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ভালোই প্রভাব ফেলেছে, যেজন্য এত বাদ দিয়েও অনেক বাহুল্য থেকে গেছে, আরো টানটান হতে পারতো।
সামান্য যা কিছু লিখি তাতে এই "অল্প কথায় বেশি বলা" ভাবধারায় আমি খুব বেশি আচ্ছন্ন হয়ে আছি এখনও। তবে এটাকে একটা সময় পর্যন্ত খুব ভালো কিছু মনে করলেও এই মুহুর্তে নিজের খুব বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা মনে হয়। সাহিত্যের একটি অন্যতম বড় সৌন্দর্য সম্ভবত স্বার্থক-সুন্দর বর্ণনা, গল্প বা উপন্যাস এবং তার লেখক, এই সব কিছুকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যায় যা। কাছের মানুষ কনফুসিয়াসের বর্ণনা আমি মুগ্ধ হয়ে পড়ি। মনে হয় শুধু কাটছাট করলেই দারুণ কিছু হয়ে যায় না, সেটা একটা ধরণ; তবে তার বাইরে আরো অনেক বড় সৌন্দর্য আছে...এইসব ভেবে অনেক দিন থেকেই ঠিক করে আছি, এরপরে বড় কিছু লিখার চেষ্টা করব। ঠিক সেই সময়েই অমিত-শিমুল-কনফুসিয়াসের "অণুগল্প" প্রোজেক্টে লেখা আহবান পেয়ে মনে হলো অণু দেখি আমাকে ছাড়ে না। "অণুগল্প"র প্রতি পুরনো ভালোবাসা থেকেই আরেকবার চেষ্টা করেছি, তার ফলশ্রুতিতেই "বন্ধু"। শিমুলের মতে "বন্ধু" বড় গল্পের উপাদানে ভরা ছিলো, যদিও আমার মূল বক্তব্য ছিলো গল্পের শেষ প্যারাটি। সেইটুকু বলার জন্যই বাকি অংশের অবতাড়না।
নিজে লিখতে গিয়ে যা ভাবি অন্যের "অণুগল্প" পড়তে গিয়েও প্রথমেই তাই আশা করি, যেন কাঠামোগতভাবে একটি গল্প হয়, অণু করতে গিয়ে যেন "না-গল্প" হয়ে না যায়! এটিই বড় প্রত্যাশা, যেন অণুগল্পের অপব্যবহার না হয়। তারপরে একেকজন একেকভাবে লিখেন নিজস্বতায়। তবে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যেমন, একটি বড়গল্পকে যেন জোর করে অণুতে আঁটানো না হয়, এটা গল্পের সর্বনাশ করে দিতে পারে। অণুগল্পে একটা আলাদা চমক থাকতেই হবে বলে অনেকেই মনে করেন, আমার কেন যেন এরকম কোন আশা নেই। বরং অল্পে যা বলা হলো তা তীব্র হলেই আমি খুশি।
এই তো।
___

নজমুল আলবাব | বিষ্যুদ, ২০০৮-০৫-০১ ০০:১১
গল্প, যা আমি লিখার চেষ্টা করি ( যদিবা হয়) তা নিয়ে ভাবনা, ভঙ্গি এবং অন্যান্য মতামত একাধিকবার প্রকাশ করেছি ইতিমধ্যে। শেষবার বলেছি জুবায়ের ভাইয়ের পোস্টে
বউ বাটা বলসাবান আমার নিজেরও প্রিয় একটা গল্প। হ্যা গল্প। অনুগল্প নয়। এ নিয়েও নতুন কিছু বলার নাই। আস্তা একটা পোস্টই আছে, সেই পোস্টেই বিভিন্ন মিতভাষণ নিয়াও কথা বলেছি। এখন আবার বলতে বসলে চর্বিত চর্বণ হবে। অন্যে এমন করলে কষে গাইল দেই। সুতরাং আমি সেই কাজ করব কেন?
আমি বরং গল্প অনুগল্প এই টার্মে থাকি।
কিছু একটা বলতে চাই। সেটা মুখে হতে পারে, লিখেও হতে পারে। এখন আমি যা বলতে চাই তা কিভাবে বলব? হতে পারে গদ্যে। গদ্য মানে গল্পই ধরলাম। আমি একটা গল্প বলতে চাই তাহলে। গল্পটা হল একটা পরিবারের। গল্পটা একজন তরুণী বধুর। এইসবই আটপৌরে পরিচিত উপাদান। সেই মেয়েটার বিয়েতে তার বাবা যৌতুক দিতে পারেনি ভাল করে। নতুন সংসার তাকে মাপছে আসবাবের মাপে। এই বিষয়গুলোত খুবই পরিচিত আমাদের কাছে। যারা বাংলা পড়েন তাদের কাছে। আর আমি লিখছি বাংলায়। এই অঞ্চলের মানুষ টে বল্লে টেংরা বুঝে ফেলে। সুতরাং তাকে কেন বলে দিতে হবে মেয়েটা বড় কষ্টে আছে। সেটাতো সে বুঝেই যাচ্ছে। এখন এই সময়ে এসে, একটি মেয়ে কি চেষ্টা করেতে পারেনা এতসব ঝামেলা নিয়েও সংসারে মানিয়ে নিতে... করবে মনে হয়। মেয়েরা চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সবসময়ই আলোর মুখ খুঁজে পায়না। পত্রিকা খুললেই খবর পাওয়া যায়। যৌতুক কিভাবে কেড়ে নেয় একেকটা প্রাণ। কিভাবে ভেঙে যায় সংসার। এই যায়গায় এসে নজমুল আলবাব আর এগুতে পারেনা। সে ভয়ানক দুর্বল চিত্তের মানুষ। চমৎকার এক তরুনীকে মেরে ফেলতে কিংবা তার সংসার ভেঙে দিতে সে ব্যার্থ হয়। তবে যেহেতু পাঠকের জন্য লেখাটা দাড় করানো হয়, তখন তাকে কিছুটা দায় দিয়ে দিতেই হয়। বাবা পাঠক, জননী আমার, বন্ধুগণ আপনারা যা ইচ্ছা তাই করুণ। মেয়েটারে মারুন, কাটুন নয়ত তাড়িয়ে দিন আমার কিচ্ছু করার নাই। আমি সরে যাই নিরাপদ দুরত্বে। তবে এও বলে যাই মেয়েটারে বাঁচাতে হলে আপনাকে প্রথমেই বাবার জুতা, মায়ের সাবানের সমান গুরুত্ব যাতে মেয়েটা পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে! এখন যদি নারিবাদীরা সাবানের লগে মানুষের তুলনায় ক্ষেপে যান আমার কিছু করার নাই। যেদিন আপনারা সংস্কার করতে পারবেন এইসব ধারণার সেদিন আলবাব, শিমুল এবং তার মতো নিরিহ কলমবাজেরা আর এভাবে তুলনা করবেনা কথা দিলাম। তো এই পর্যায়ে থেমে গেলাম বলে যদি গল্পটারে কেউ অনু ট্যাগ লাগিয়ে দেয়, দিক। আমার আপত্তি নাই। গল্পটা বুঝতে পারছেনতো আপনি? ট্যাগ লাগানো মানুষ, আমি কিন্তু চাই আপনি গল্পটা বুঝুন। আর ফাঁকে বলি আপনার ট্যাগ কিন্তু আমি মানিনা। আমি গল্প লিখেছি। সেটা পরমানু, অনু কিংবা বড় কিছুই নয়। শুধুই গল্প। বেয়াড়া আমারে বলতেই পারেন। আব্বা সবসময় বলে আমি গোয়ার। শব্দটা এখন ভোতা হয়ে গেছে আমার কাছে ।
আমি বাচালের মত বকে যাচ্ছি খেয়াল করছেন আপনারা? কিন্তু গল্পগুলোতে এভাবে বলিনা কেন? এই প্রশ্ন আসতেই পারে। ভদ্র সচলেরা আমার, কি করব বলেন, আমি লিখতে চাই কিন্তু পারিনা। শব্দ আমার চেয়ে শত মাইল দুরে পালিয়ে যায়। এমন সময় হয়ত অন্যরা শব্দের পেছন পেছন দৌড়ে দরকার হলে চীন দেশেও যেতে পারেন। কিন্তু আমি পারিনা। আমার এত দম নাই। আমার ৮০ সিসি মোটর সাইকেলেরও নাই। তাই আমার গল্প থেমে যায়। পরিচিত শব্দ, যারা সবসময় আমাকে ঘিরে থাকে তাদেরকে আর তাদের ডাকে সাড়া দেয় যেসব আড়ম্বরহীণ দুরাগত শব্দ আমি তাদের নিয়েই খেলি, গল্পের ঘর সংসার গড়ি।
শব্দ সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়টাও আমার কাছে আরোপিত কিছু একটা মনে হয়। অমিত আহমেদ তার মন্তব্যে দেখলাম গল্প উপন্যাসের আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণী শব্দ সংখ্যা উল্লেখ করে দিয়েছেন।
আমি অংক করতে পারিনা। একবার অংক পরীক্ষায় ১০০ এর মাঝে ০৬ পেয়েছিলাম। সারা বছরে একবারই অংক পরীক্ষায় পাশ করতাম। সেটা বার্ষিক পরীক্ষায়। ৩৫ থেকে ৪৫ এর মধ্যে থাকতো আমার নাম্বার। আমার জীবনের সবচে আনন্দের মূহুর্তের একটা হলো মেট্রিক পরীক্ষায় অংক পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়া। আমি যখন বুঝলাম পাশ করে ফেলব। কি শান্তি। আর কোনদিন অংক পরীক্ষা দিতে হবেনা এই কথা ভেবে আমি স্কুলের মাঠে নেচেছি। তিন সত্যি দিয়ে বলছি, আমি নেঁচেছি। নাঁচ দেখে স্কুলের স্যাররা হেসেছেন। এখন সেই আমাকে যদি কেউ বলে শব্দ গুনে গুনে লিখতে হবে তাইলেতো বিপদ। ভাই আমি মাপ চাই। এই জীবনে আমার আর লেখক হওয়া হবেনা ।
শব্দের এই হিসাব মানলে রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় 'র কি হবে? লাল সালু? কিংবা বাঁকা জল। ইমদাদুল হক মিলনের এই ৪৮ পাতার বইটাই যে আমার সবচে প্রিয় হয়ে আছে একযুগ ধরে। জানিনা বাবা, ভাবতে ভাল লাগছেনা।
আচ্ছা কবিতায়তো মহাকাব্য বলে একটা বিষয় আছে। গল্পে আছে অনু, পরমানু, মাইক্রোস্কোপিক, বড় গল্প নানা টার্ম। উপন্যাসেও কি এমন আছে। থাকলে খোয়বনামা কি মহাপোন্যাস তকমা পাবে? কিংবা প্রথম আলো? আলোচনা ভিন্নখাতে নিতাছিনা কিন্তু...
ধন্যবাদ সবাইকে।
___

আনোয়ার সাদাত শিমুল | বুধ, ২০০৮-০৪-৩০ ১৫:৫০
নিঘাত তিথি, আলবাব ভাই - দু'জনকেই ধন্যবাদ।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা তাঁদের মন্তব্যে এসেছে। সম্পূরক প্রসঙ্গে আরো কথা আসতে পারে।

আপাততঃ কনফুসিয়াসের কাছে প্রশ্ন রাখছি -
অণুগল্প বিষয়ে আমার ধারণা ছিলো - ছোট/বড়্গল্প বিষয়-বিন্যাসে আরো ছোট হয়ে আসবে, যেমন ছোট গল্পের প্রতি প্যারা অণুগল্পে এসে এক লাইন হয়ে যাবে। বক্তব্য থাকবে একই রকম। পাঠকের কাছে একই ইমেজ যাবে, তবে ক্ষেত্র বিশেষে পাঠকের স্বাধীনতা থাকবে নিজের মতো করে গল্পের পরিণতি বা অন্য বিষয় সাজিয়ে নেয়ার।
কিন্তু আপনার 'বনসাই' পড়ে মনে হয়েছে - ছোট/বড় গল্পের হঠাৎ এক ঝলক কিংবা এক অংশ এসে অণুগল্প হয়ে উঠতে পারে। এর আগে অনেক কিছু হয়তো ঘটে যেটা অণুগল্পে এসে পাঠক জানতে আগ্রহী হয় না। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
সাথে অন্যান্য প্রসঙ্গে - - -
___

কনফুসিয়াস | শনি, ২০০৮-০৫-০৩ ১৮:৩৫
আমি যেটা বুঝলাম, শিমুল মুশকিলে ফেলতে খুব ওস্তাদ। সংকলনে দিতে হবে বলে অনেক কসরত করে একটা অণুগল্প লিখবার চেষ্টা করেছি। সম্পাদকদের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে সেটা দিয়াশলাইয়ে ঠাঁই পেল দেখেই আমি খুশি। কিন্তু এখন যদি আবার সেটা নিয়ে আলাপ চালাতে হয়, তবে তো ধরা খেয়ে যাবো!
অণুগল্প, আসলে, ঠিক আমার কম্মো নয়। আমি বেশী কথার মানুষ, খুব অল্প করে গুছিয়ে কিছু বলতে পারি না, কোন সাধারণ ছোট কথা বলতে গেলেও আমি সাতকান্ড রামায়ন ফেঁদে বসি। এ কারণে অণুগল্পের কলেবরে একটা গল্পকে ঠিকঠাক আঁটানো আমার জন্যে বেশ কষ্টসাধ্য।
অণুগল্প বলতে কি বোঝায়- এটা নিয়ে এর মধ্যে অনেকেই নানা অভিমত দিয়েছেন। আমার আর নতুন কিছু যোগ করার নেই। কিন্তু আমি ঠিক এই কথায় একমত নই যে, অণুগল্পে বড় গল্পই বিষয় বিন্যাসে ছোট হয়ে আসবে অথবা প্রতিটা প্যারার বক্তব্য এক লাইনে চলে আসবে। আমার বরং মনে হয়, অণুগল্প হবে একটা বিদ্যুতচমকের মতন একটা কিছু। খুব ছোট একটা জায়গায় হঠাৎ করে তীব্র আলো ফেলার মত। একটা গল্পের ছোট একটা অংশ, যেখানে পূর্ণাংগ কোন গল্পের আমেজ থাকবে না, শুরু বা শেষ থাকবে না, পড়তে পড়তে হুট করে গল্পটা চোখের সামনে থেকে নেই হয়ে যাবে, আর তখন বদ্দার কথামতন, মুখ থেকে একাকখরী কোন অনুভুতি বেরিয়ে আসবে!
বনসাই- আমার মতে- অণুগল্প হিসেবে একেবারেই সফল নয়। আমার নিজের ফর্মূলা অনুযায়ীও এটা ঠিক সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। যেটা চাইছিলাম, শুরুহীন-শেষহীন একটা গল্প, সেটা আমি করতে পারিনি। গল্পের মাঝে বর্ণনার মতন একটা আমেজ চলে এসেছে আপনাতেই, যেটা পাঠকের ভাবনাকে এই গল্পের পূর্বের ও পরের ঘটনার কাছে নিয়ে যাবে, এটা আমার মতে- অণুগল্পে হওয়া একেবারেই উচিৎ নয়।
অণুগল্পের ভবিষ্যত বেশ ভাল, দিয়াশলাই বেরুবার পরে সচলায়তনে পাঠক এবং লেখকদের উচছাস সেরকমই আভাস দিয়েছে। তো পাঠকগ্রুপে বসে আমি ভবিষ্যতেও অনুগল্পের অনুরাগী হয়ে থাকবো, সন্দেহ নেই। কিন্তু ২য় অর্থ্যাৎ লেখকগ্রুপে থেকে আমি তার জন্যে- সম্ভবত একরাশ শুভকামনার বাইরে তেমন কোন অবদান রাখতে পারবো না।
শিমুলকে এই আলচনা পোস্টের জন্যে সাধুবাদ জানাই।
___

হাসান মোরশেদ | রবি, ২০০৮-০৫-০৪ ২০:২৫
যদি ইতিমধ্যে এই আলোচনা তামাদি না হয়ে যায়, তাহলে আমার দু পয়সা দু যোগ করি সবিনয়েঃ
বড়কর্তা তো ছোটগল্পের সার্বজনীন সংজ্ঞা দিয়ে ফেলেছেন বহু আগে- 'হইয়াও হইলোনা শেষ' । তাহলে অনুগল্পের সংজ্ঞায়িত রূপ কি হতে পারে? এমন না যে তখনো অনুগল্পে তখনো লেখা হয়নি । কিন্তু বড়কর্তা বা তার সমসাময়িক সময়ে আলাদা করে সম্ভবতঃ 'অনুগল্প ' ক্যাটাগরাইজ করা হয়নি ।
এখন আমরা দেখি,বনফুলের অনেক গল্পই উৎকৃষ্ট অনুগল্প,মানে আমরা এখনকার পাঠকরা যে গল্পকে অণুগল্প বলছি সেসব নহু আগেই লেখা হয়েছে ।
মনে পড়ে ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামের পাতায় গিয়াস ভাই ই প্রথম এই টার্ম ব্যবহার করেছিলেন । এরকম আরো কিছু মজার টার্ম ছিলো তখন -এক দু লাইনের পাঠকদের চিঠিকে বলা হতো-'ঊনপত্র'
মুলধারার সাহিত্যে যদি কোনদিন 'অণুগল্প' টার্ম প্রতিষ্ঠা পায় সেদিন যেনো গিয়াস আহমদের নামটা বিস্মৃত না হয় ।
পাঠক ফোরাম ও পরের বন্ধুসভার পাতায় গিয়াস ভাইয়ের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক যেসব ফিচার প্রকাশিত হতো, এখন বুঝতে পারি তার মধ্যে অনেকগুলোতেই উৎকৃষ্ট অণুগল্পের মালমশলা ছিলো । আফসোস, সেই সময়ের নিজের লেখাগুলো এবং বন্ধুদের লেখাগুলোকে ও বড় অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি ( কি আর করা তখন তো আর সচলায়তন ছিলোনা!) । আফরিন আহমেদ,শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস,সুমন সুপান্থ, সুমন্ত আসলাম, ফারহানা শাম্মু, নজমুল আলবাব এদের প্রায় সকলের লেখাগুলোই এ পর্যায়ের ছিলো ।
অনেক আলোচনা,চুলচেরা বিশ্লেষন হয়ে গেছে । যদি পুনরাবৃত্তি হয় ক্ষমাপ্রার্থী ।
আমি সহজভাবে অণুগল্প বলতে আকারে ছোট(নির্দিষ্ট কত শব্দ? এটাকে ফ্লেক্সিবল রাখতে চাই) সেই গল্পকে বুঝি যা ছোট বলেই খন্ডিত কিংবা আংশিকঅসম্পুর্ন নয় , অণুর মধ্যে যেমন পদার্থের সকল বৈশিষ্ট বিদ্যমান তেমনি অণুগল্পের মাঝে ও থাকবে পুর্ণগল্পের পুরো শক্তিমত্তা সেই সাথে বিস্তারের সমুহ সম্ভাবনা ।
'মায়িশার আম্মার সাথে দায়িত্বশীল দুপুর'-সংকলনভুক্ত এই গল্পে আমার কিছু ফাঁকিবাজী আছে । এটা আলাদা কোন গল্প নয় । আমার যে উপন্যাস গত বইমেলায় প্রকাশ হবার কথা ছিলো সেই 'শমন শেকল ডানা'র একটি অংশ মাত্র । নিজের লেখা উপন্যাস লেখার সময় তীব্র আবেগ এবং ঝোঁকের বশে লিখেছি,প্রকাশ না হওয়ার অবসরে পড়ছি এবার সময় করে সমালোচকের ভঙ্গীতে ।
পড়তে গিয়ে দেখলাম কথিত উপন্যাস কিংবা বড়গল্পের মধ্যে আসলে কয়েকটি গল্প আছে । এই গল্পগুলো প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা সম্পুর্ন গল্প হয়ে উঠার সম্ভাবনা আছে আবার সবগুলো পরস্পর সন্নিহিত হয়ে আরেকটা নিজস্ব গল্প ও হয়ে যেতে পারে ।
এটা হতে পারে অনেকটা অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং এর মতো । প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা অবজেক্ট, প্রত্যেকের সোল আইডিন্টিটি , এট্রিবিউট থাকবে, মেইন ফাংশন দিয়ে কল করে আবার আলাদা স্বয়ংসম্পূর্ন প্রোগ্রাম ও হতে পারে ।
জুবায়ের ভাই তার বিখ্যাত আলোচনা পোষ্টে প্রতিটি গল্প নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষন করেছেন । আলাদা করে ধন্যবাদ জানানো হয়নি । এইখানে জানিয়ে গেলাম ।
আর আনোয়ার সাদাত শিমুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ব নিয়ে এই আলোচনা শুরু ও সঞ্চালনের জন্য ।
শিমুল শুরু না করলে নিঃসন্দেহে আমরা সাধারন পাঠকেরা গুরুত্বপুর্ন মন্তব্যগুলো থেকে বঞ্চিত হতাম ।
___

আনোয়ার সাদাত শিমুল | সোম, ২০০৮-০৫-০৫ ১০:০৮
স্বপ্ন দেখবো বলে দুহাত বাড়িয়ে ব্লগে কখনো হতাশ হইনি। অগ্রজ সচলরা আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। সবিনয় কৃতজ্ঞতা প্রিয় মোরশেদ ভাই, আপনার কাছ থেকে এরকম কিছু কথাই আশা করছিলাম। আলোচনা তামাদি হয়নি, আপনার মন্তব্যে হীরন্ময় হয়েছে আরো। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
শেষে সবার প্রতি শুভেচ্ছা-ভালোবাসা, আপনাদের মতামত-অবস্থান বিশ্লেষণে অণুগল্প নিয়ে উপকারী কিছু কথা এ পোস্টে উঠে এসেছে।
সবাই ভালো থাকুন!


-

Read more...

14 April, 2008

অণুগল্পঃ দৈনন্দিন

গুজব হিসেবে কথাটা আগেও কানে এসেছিলো, কিন্তু আজ সকালে পাশের বাসার নঈম চাচা হাতেনাতে ধরার পর আমরা ব্যাপারটি নিয়ে ভাবি। মেজো ভাইয়া বলছে, ‘এক মুহূর্তও দেরি করার দরকার নেই, এক্ষুণি বিদায় করে দাও।’ বড় ভাইয়া কিছুটা নমনীয় হয়ে বললেন, ‘বেশি হৈ-হল্লা করো না, কিছু ধমক দিয়ে শাসিয়ে দাও।’ আমিও বুঝতে পারি, এরকম করিৎকর্মা লোক পাওয়া সহজ না। তবুও - গত দু’মাস ধরে শুনছিলাম আমাদের বাসার দারোয়ান মাসুদের ঘরে মেয়েছেলে আসে মাঝরাতে এবং খুব ভোরে চলে যায়। নঈম চাচার চিল্লাচিল্লিতে আজ পাশের তিন বাসার লোক জড়ো হয়েছে। বড় ভাবী লজ্জায় রুম থেকে বেরই হচ্ছেন না। ভদ্র এলাকার ভদ্র বাড়ির সম্মান আর থাকলো না! আমি সরাসরি বলে এলাম, ‘সন্ধ্যায় এসে যেনো মাসুদের চেহারা না দেখি, দরকার হলে আমি রাতে বাসা পাহারা দেবো।’

রুবার আঙুলগুলো ছুঁয়ে আমি ক্রমশ শিশু হয়ে উঠি। তার হাত দুটো নিয়ে আমার চোখে-মুখে, ঘ্রাণ নিই। এরকম প্রায়ই হয়, সপ্তায় একবার কিংবা মাসে পাঁচবার অথবা তারও বেশি। আজ রুবা চুপচাপ, বলছিল, ওর বাবার হেমোডায়ালাইসিসের মাত্রা বাড়বে আগামী মাস থেকে, বাড়বে খরচও। তখন আমার নাক রুবার চিবুক পেরিয়ে গলায়, খানিক নিচে। অফিসে প্রতিদিন নয়টা-পাঁচটা কাঁচের ওপাশের রুবা, সিল্কের শাড়ির স্বচ্ছতায় ফরসা পেট, মৃদু পারফিউম - সব আমার হাতের নাগালে এলে আমি শিশু থেকে দানব হয়ে উঠি। ব্যাচেলর অনুপের নিরাপদ বাসা-বিছানা-বাতি ক্রমশঃ আপন হয়ে আসা পরিবেশে আমি দূরন্ত পারঙ্গম কৌশলী পুরুষ। রুবার হয়তো দমবন্ধ লাগে, তাই চোখ বুঁজে থাকে। এভাবেই অল্প সময়টুকু শেষ হয় দ্রুত। ...আরও পরে মাথা নিঁচু করে রুবা বলে, ‘এবারও এক হাজার?’ আমি বিরক্তি নিয়ে মানিব্যাগ থেকে একশ’ টাকার একটি মলিন নোট তুলে দিই রুবার হাতে।

মাসুদকে তাড়ানো হয়নি। শেষে নঈম চাচার সুপারিশেই ক্ষমা করা হয়েছে। বড় ভাইয়া, মেজো ভাইয়াও মাফ করে দিয়েছেন। রাতে মাসুদ আমার পা ধরে মাফ চাইলে আমার মেজাজ চরমে উঠে যায়, কষে চড় মেরে বলি, ‘আর যদি একবার এসব শুনি... ব্যাটা হারামজাদা, বদমায়েশ!’
.
.
.
সচলায়তন অণুগল্প সংকলন "দিয়াশলাই"-এ প্রকাশিত।
.
.

Read more...

12 April, 2008

বউ, বাটা, বলসাবান এর আয়নায় দেখা নজমুল আলবাব

নজমুল আলবাবের লেখা ছোটগল্প পড়ার সুযোগ পেয়েছি বিভিন্নভাবে; ব্লগ, রাইটার্স ফোরাম এবং এক সময় বন্ধুসভার পাতায়। অল্প কথায় গল্প বলার কৌশলে তার লেখা পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়, সে স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন প্রায় বছর দশেক আগে। তবে এবার গল্প সংকলন 'বউ, বাটা, বলসাবান' পড়তে গিয়ে আলবাবের গল্প গাঁথা এবং বলনশৈলী জানার সুযোগ হয়েছে এক মলাটে তেরোটি গল্পে।

নজমুল আলবাবের গল্প শরীর বিস্তারে বপু নয়। অন্ততঃ ছয়টি গল্প বেশ পরমাণু সদৃশ। বাকীগুলো তুলনামূলকভাবে বড়ো, তবে নির্ঝঞ্ঝাট ও বাহুল্য বর্জিত। নাম ভূমিকার 'বঊ বাটা বলসাবান' শব্দ সংখ্যায় তিনশ'রও নিচে, অথচ প্রথম পাঠেই মুগ্ধ করে। আরোপিত সামাজিক সংলাপ কিংবা ধারাভাষ্য নেই, সাবলীলভাবে বলে যাওয়া কথা- 'বল সাবান কিংবা বাটার জুতা বদলানো অসম্ভব, কিন্তু বঊ বদলানো কোনো ব্যাপারই না'। ঠিক পরের গল্পটি, 'বিভিন্ন মিতভাষণ'ও কাছাকাছি পর্যায়ের - দর্শক হয়ে বলে যাওয়া, খুব কাছে থেকে দেখা মানুষ - তাদের আচরণ নিয়ে টুকটাক করে বলে যাওয়া। লেখকের ভাষায় - 'যখন যে ঘটনা ঘটেছে চোখের সামনে অথবা মনে, তখনই মাথায় জন্ম নেয়া শব্দ আর বাক্যগুলো অবিকল বেরিয়ে গেছে কলমের ডগা দিয়ে'।

গল্পের প্লটের জন্য লেখক নিজের চারপাশকেই বেছে নিয়েছেন, এজন্যই আমরা দেখি তার বেশিরভাগ গল্প উত্তম পুরুষে বলা - হয়তো আলবাব এভাবেই সাবলীল বোধ করেন, আর গল্পগুলো মূলতঃ সংসারের চৌকাঠে এবং এর মানুষগুলো ধারণ করে। 'কাল ঘুম নেমে আসে তার চোখে' এবং 'বুকের ঊপর সাপের রাস্তা...' এ দুটি গল্পের কথক পরিপূর্ণ সংসারী মানুষ, তবে নানান জটিলতা ঘিরে রাখে চারপাশ এবং এ জটিলতার সমাধান চরিত্রটি দিতে পারে না। তাই আমরা দেখি জহির শুক্রবার বিকেলে ঘর থেকে বের হয়ে যায় - রুপা একা কান্না লুকায়, কিংবা সুমনার স্বামী হতভম্ব হয়ে রাত জাগে। এখানে মূল চরিত্রের ব্যর্থতা - না পারার কষ্ট, পাঠকের সমুদয় সমর্থন আদায় করে নেয় গল্প শেষ হওয়ার আগেই। এসব সীমাবদ্ধতা আরো স্পষ্ট হয় - 'আমার কোনোদিন দুধ চা খাওয়া হবে না' গল্পে, মোকাম্মেল নামের মানুষটি তার মধ্যবিত্ত সীমানা ডিঙাতে পারে না। চারপাশের চতুর মানুষদের কাছে সে বারবার হেরে যায়; মুহিভাইয়ের বাক্স বয়ে নেয়া, আপন সংসারে গুরুত্বহীন হয়ে থাকা, এবং শেষে বাণিজ্যে দৌড়ে ছোটোভাইয়ের কাছে হেরে মোকাম্মেল পাঠকের কাছে সকরুণ প্রশ্ন রেখে যায় এই বলে যে - আমার বৌও ক্ষেপেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, যে লোক বৌয়ের রিকশাভাড়া দিতে পারে না তার আবার এত লম্বা কথা কেন? এ প্রশ্নের ঊত্তর পাঠকেরও জানা নেই, কারণ মোকাম্মেল সৎ , নীতিবান - নির্লোভ মানুষ। চাতূর্য্যের জীবনে ঠেলে দেয়া নয় বরং নির্মোহ থাকার সুস্পষ্ট ইংগিত গল্পে পূর্ণতা দেয়।

এ পাঁচটি গল্পের তুলনায় 'সে রাতে পূর্ণিমার সাথে আমি তোমাকেও দেখেছি' নিতান্তই ভালোবাসার গল্প, প্রেমের গল্প। এখানেও আলবাব সংসারী মানুষের কথা বলেন, মুমুর সাথে অদ্ভুত পূর্ণিমা দেখা শেষে হাসপাতালে অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় পায়চারি। অথচ প্রবল ইচ্ছা সত্বেও মুমুর গাল ছোঁয়া হয় না, বলা হয় না পাশে থাকার কথা। কারণ, চেনা-অচেনা কতোজন তখন মুমুকে ঘিরে ধরে। সে-ই সামাজিক বেস্টনী, চৌকাঠ ভালোলাগা। অন্যদিকে 'ব্যক্তিগত ব্যাখ্যান' গল্পে দেখি - শৈশব-কৈশোর স্মৃতির দুমদাম হানা। শোলক বলা কাজলাদিদির মতো বেলা'দি-বড় আপুকে খুঁজে ফিরে অপু, কল্পনায় আসে সবুজ প্রকৃতি, রঙীন পেন্সিল আর আকাশী জামা কিংবা উজ্জ্বল আকাশের স্বপ্ন। এ বাসনা নিশ্চিতভাবে হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা, এবং দ্রোহের আগুনে বর্তমান পোড়ানোর খেদ।

তবে 'দেয়ালে দাগ', 'হাবিব আলীর পতাকা পূরাণ', 'আমাদের ক, খ, গ, ঘ, এবং ঙ' গল্প তিনটিকে আলাদা করে রাখা যায় বিষয় বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতার জন্য। 'হাবিব আলীর পতাকা পূরাণ' গল্পের হাবিব আলী বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ঊছিলায় ওড়ায় পেয়ারে পাকিস্তানের পতাকা, এবং শেষে আমরা দেখি - হাবিব আলী অপার্থিব এক ভালোলাগায় নতজানু হয় চাঁদতারা খচিত পতাকার সামনে। কী ভয়ংকর এক বাস্তবতা, নিপুঁণ লেখনীতে উঠে আসে পাঠকের সামনে। গল্পটি সম্ভবতঃ ১৯৯৯ সালে লেখা, তবে আশ্চর্যজনকভাবে গল্পের সত্যতা আমরা দেখেছি চার/আট বছর পরে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মৌসুমে - হয়তো দেখবো দু'হাজার এগারো সালেও, হাবিব আলীদের বংশ বিস্তার ও সাম্প্রতিক প্রবণতা সে ইংগিতই দেয়! অন্য গল্প 'আমাদের ক, খ, গ, ঘ, এবং ঙ' রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের প্লট তবে সেটা অনেকদিন পরে পারিবারিক সংকট উত্তরণে বর্ণিত - আব্বা দাদাজানের কথা শুনেছিলেন। আমাদের সময় এখন সবসময় সূর্যরাঙা, আমরা ভালো আছি, ভালো থাকি...। এখানেও দেশের রাজনৈতিক কৌশলের ছাপ পাঠক পায় পরোক্ষভাবে। তবে আচমকা থেমে চমক দিয়েছে 'দেয়ালের দাগ'। বন্ধুর খোঁজে গিয়ে হতভম্ব হওয়া রনজুর প্রতিক্রিয়া পাঠক না জানলেও দেয়ালের ওপাশে ছাপান্নটি দাগ দেয়া মানুষটির কষ্ট পাঠককে স্পর্শ করে। গল্পটি আরো বড়ো হতে পারতো - 'চিলেকোঠার সেপাই'য়ের ওসমান যেমন বন্ধু কবিরকে খুঁজে পায়নি, তেমনি রনজু কাহিনীও আরো বিস্তৃতি পেতে পারতো - হতে পারতো একটি বড়সড় গল্প।

নজমুল আলবাব বড় গল্পের স্বাদ মিটিয়েছেন 'এই মেঘ, রাত ও রৌদ্র'তে। কবি ময়নুল মোশাররফ গৎবাঁধা যাপিত দিনে শাহানার ফ্ল্যাটে হাজির হয়। ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছিলাম - এক বৃষ্টিময় দুপুরে অপু গিয়েছিলো শাহানার ফ্ল্যাটে - 'বৃষ্টি পিয়াসি আমি আর শাহানা' গল্পে। দুটো গল্পেই দ্বিধাময় মনে নায়ক ফিরে আসে। তবে পাঠকের সাথে শাহানার পরিচয় হয় আরো আগে 'আপন ভূমিকা' গল্পে, যেখানে- ইউরোপ প্রবাসী স্বামী পায় শাহানা, ...আর কারো হুতাশ হয় - সব শালারাই বুঝি রুচি বদল করার জন্য বারবার ফিরে আসে। এই 'আপন ভূমিকা'কে প্রথম পর্ব ধরলে একটি চলমান স্রোত আমরা দেখি পরের দু'গল্পে বয়ে গেছে। শাহানা ফিরে আসে লন্ডন থেকে, দেয়ালে তার মেয়ের ছবি - অপু কিংবা ময়নুল শাহানার ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়, অথচ কাছে যেতে পারে না। অপু তাকিয়ে থাকে শাহানার সে-ই আশ্চর্য সুন্দর তিলটার দিকে আর ময়নুল ভুলে কবিতার খাতা রেখে আসে শাহানার বাসায়। তিনটি গল্পে শাহানাকে পাই বলে নয়, শাহানার বদলে যদি মোনা কিংবা রুপাও নাম হতো - পাঠক ঠিকই যোগসুত্র টেনে নিতো, আর বলতো - শাহানা আখ্যান আরো লম্বা হোক উপন্যাসের পাতায়। নজমুল আলবাব কি বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?

এই তো গেলো আলবাবের গল্পের মানুষদের গল্প।
কিন্তু তিনি গল্প বলেন কীভাবে? আলবাবের ভাষায় জটিলতা নেই, ভীষণ সাবলীল বর্ণনা, তবে - কৌশলে আলবাব খুব নির্মম। চোখ বুলিয়ে বাকল স্পর্শের উপায় নেই, বরং পুরো মনোযোগ নিয়ে গল্পের নির্যাস দেয়ায় লেখক উদার। আলবাব গল্প শুরু করেন কিছু বিক্ষিপ্ত কথা বলে, মনে হতে পারে অপ্রয়োজনীয় তথ্য, মনে হতে পারে নামগুলো মনে রাখার দরকার নেই। অথচ খেই হারালে আবার মন দিতে হয় প্রথম থেকে। 'আপন ভূমিকা' আর 'কালঘুম নেমে আসে তার চোখে' গল্পদুটি এ কৌশলের সেরা উদাহরণ। প্রথমদিকের সৃষ্ট জটিলতা খুলতে থাকে পরের বাক্যে বর্ণনে এবং শেষ লাইন পর্যন্ত চলে এ খেলা। আগে যেমন বলেছি - 'দেয়ালের দাগ' গল্প আচমকা থামিয়ে আলবাব পাঠককে চমকে দিয়েছেন। এর বাইরে হুট করে চমকানোর বা ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা আর কোনো গল্পে আমরা দেখি না। 'বিভিন্ন মিতভাষণ' উত্তম পুরুষে বলা - বাগানের নির্জনে পেয়ারা গাছ পাওয়া, আশফাক ভাইয়ার গেমস তৈরি কিংবা সিপ্রাদি'র পায়েশ রান্না শেষে, গল্পের একেবারের শেষ বাক্যের আগের বাক্যে আমরা জানতে পারি - কথক একজন মেয়ে! প্রথম তিন প্যারায় কোনো ইংগিত না থাকায়, এবং লেখক পুরুষ বলে পাঠকের কাঠামোবদ্ধ মন ভেবে নেয় - এ পুরুষের গল্প। শেষে চমকানোর সুযোগ থাকলেও তা নগন্য হয়ে যায় অন্য কারণে - 'সন্তানের মন নাকি মায়েরা বোঝেন সবচে' সহজে'। এই শেষ লাইনের বিশ্লেষণে আগের প্রতিটি চরিত্র-ঘটনা বোঝা পাঠকের জন্য আবশ্যিক হয়ে ওঠে; এ কৌশলটির কথা বলছিলাম একটু আগেই।

লেখক আলবাব মূল কাহিনীর একজন হয়েও কাহিনীতে অংশ নেন না, বরং দর্শক হিসেবে খুটিনাটি জেনে পাঠকের কাছে যেনো চুপিসারে আসেন গল্পের ভান্ডার নিয়ে যেখানে জীবন্ত থাকে - আব্বা-আম্মা-দাদাজান-বড়ভাই- আমাদের সংসার ও চারপাশ। আলবাব গল্প লিখেন ছোট ছোট বাক্যে। তাড়াহুড়ো থাকে না। চোখে খটকা লাগলেও আসোলে/বল্ল/নরোম এর মতো ভিন্ন বানান তিনি নিজের করে নিয়েছেন।

শেষে যেটা না বললেই নয় - নজমুল আলবাবের গল্পগুলোয় 'আমরা'র প্রাধান্য ব্যাপক। সে কারণেই যৌথ জীবন যাপনের সংশয় সংকট সত্ত্বেও চরিত্রগুলো আমাদের আপন হয়ে উঠে, সাথে গল্পগুলোও।
_

আগ্রহী পাঠকের জন্য নজমুল আলবাবের ৩টি গল্পের লিংক:
- বউ, বাটা, বলসাবান
- বিভিন্ন মিতভাষণ
- বৃষ্টি পিয়াসি আমি আর শাহানা


-

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP