03 December, 2009

পাঠ প্রতিক্রিয়া : আজগুবি রাত

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা নিয়ে নির্মোহ মন্তব্য প্রকাশে বরাবরই আমি ব্যর্থ। এর মূল কারণ – শুরুতেই এমন একটি ধারণা নিয়ে পড়া শুরু করি, মনে হয় – পাঠক হিসেবে আমার প্রত্যাশার সবটুকুই পূর্ণ হবে। এ তীব্র পক্ষপাতের ঘোরতর সমস্যাটি হলো, একবার হতাশ হলে আরেকবার মুগ্ধ হওয়ার সম্ভবনা বিলীন হয়ে যায়। পাঠক হিসেবে আমার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে একজন জনপ্রিয় এবং আরেকজন সম্ভবনাময় তরুণ লেখকের গদ্য পাঠে।

এবার যখন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাস ‘আজগুবি রাত’ পড়া শুরু করলাম, অদ্ভুতভাবে মনে হতে লাগলো – মুগ্ধতার পরিসমাপ্তি এবার ঘটতে যাচ্ছে। হুমায়ুন আহমেদ যেমন বিভিন্ন নামে একই উপন্যাস লিখে যান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও সম্ভবত সে পথ ধরেছেন। আগে পড়া তাঁর ‘আধখানা মানুষ’ উপন্যাসের শুরুর সাথে, যেখানে প্রবল গতিতে তেড়ে আসা নদীর ঢেউ আঘাত করে গ্রামের সীমান্তে – ভাঙনের শব্দ শুনেও মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না এ কীসের শব্দ – গ্রামের মাঝখানের কুলিং কর্ণারে বসে একটু আগে কোক খাওয়া মানুষটি ভেবেছিলো বুঝি তার পেট থেকে কোকের ঢেকুর উঠছে, ঠিক এরকমই মনে হয় ‘আজগুবি রাত’এর শুরুর একটু পরের অংশকে। প্রবল বেগে আসছে ঘূর্ণিঝড় সারিকা। দুবলার চরে ‘সমুদ্রকন্যার মন’ ছবির শ্যুটিং করতে আসা একদল ফিল্মী মানুষকে ‘আধখানা মানুষ’এর গ্রামবাসী মনে হয় তখন। অবশ্য ‘আজগুবি রাত’এর সূচনা অন্যভাবে। চতুর্থ পরিচ্ছেদ পড়ার পর জেগে ওঠা হতাশাকে যাচাইয়ে আবার প্রথম থেকে পড়া শুরু করি –

“বলেশ্বর দিয়ে ভাসতে ভাসতে নূর বানুর কাটা হাত পাথরঘাটার খেয়াঘাটে এসে ঠেকল। অন্তত দুদিন হাতটি নদীতে ভেসেছে – ভেসেছে কেন, ডোবাই তো উচিত ছিল – সে এক রহস্য।“

শুরুতে এমন রহস্য এবং কিছু প্রশ্ন রেখে উপন্যাসের শুরু। এরপর দ্বিস্তর বিশিষ্ট বয়ানে একদিকে থাকে নূর বানু ও তার স্বামী ইকবালুর রহমানের সংসার, আদর ও অনাটনের সংকট। অন্যদিকে বলেশ্বরের এক মাইল উজানে নূর বানুর কাটা হাত পেয়ে দ্বিধায় পড়া মাঝি তোশাররফ, জনৈক সজ্জন, আরো সময় পরে - থানার ওসি, এ সময়ের হার্টথ্রব নায়ক ফিল্মের হিরো লাকি খান। কাটা হাতটি কার হতে পারে এমন নানা জল্পনায় সংকট প্রবল হয় ঘূর্ণিঝড় সারিকার আগমনী সংকেতে। সারিকা মোকাবেলায় করণীয় এবং প্রস্তুতিতে প্রতিমন্ত্রীর ফোন, ঘটনাক্রমে থানার কাছে থাকা দূর্যোগ সচিব, ইউ এন ও, সোনারবাংলা টেলিভিশন চ্যানেলের রিপোর্টার সাবরিনা – আসলাম এবং এরকম আরো অনেকে থানায় হাজির হলে সারিকা নয় বরং কাটা হাতটি কার, কেনো এ হাত কাটা, কোত্থেকে এলো এ হাত – এসব প্রশ্ন প্রধান হয়ে ওঠে। আরো অদ্ভুতভাবে উপস্থিত সকলে সঙ্গোপনে কাটা হাতটির সঙ্গে নিজের জীবনের কোনো এক ঘটনার মিল পায়, দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

নুর বানুর কাটা হাতের রহস্য উন্মোচনে উপন্যাসে যতোটা গতি এবং অস্থিরতা – ঠিক ততোটাই স্থির নুর বানু আর ইকবালের সংসারী জীবন। নুর বানুর ঘরে, উঠানে এবং বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায় কী হয় না হয় তার সবই দেখে কানা রাইসু। কানা রাইসু, যার বয়স এখন দশ, নিরবে নির্জনে বসে থাকে নুর বানু ও ইকবালুর রহিমের বাড়ির উঠানের উলটা দিকে অঘন জঙ্গলের পাশের বিলাতি আমড়া গাছের নিচে বছরের পর বছর। কানা রাইসু সেখানে বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজে, আবার পরদিন রোদে শুকায়। কখনো ঘুমায় কিনা তার ঠিক নেই, তবে কানা রাইসু সব দেখে। দেখে - নুর বানুর সংসারের সকাল-দুপুর বিকাল, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত। নুর বানুকে বেশ কয়েকবার কানা রাইসুর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু অন্য কেউ কি কানা রাইসুকে দেখে না? নাকি দেখলেও তুচ্ছতার কারণে মনোযোগ দেয় না? উপন্যাসটি পড়তে পড়তে হঠাৎ করে মনে হয়, কানা রাইসু হয়তো কোনো মানুষ নয়। কালের স্বাক্ষী হয়ে থাকা কোনো গাছ, ঘাট কিংবা অন্য কোনো জড়বস্তুর কল্পিত মানবরূপ! সারিকার তান্ডবের সূচনায় ‘আজগুবি রাত’ এর আখ্যান শেষ হয়। নূর বানুর কাটা হাতের রহস্যময়তা এবং অন্যান্য সমূহ সংকটের কিছু কিছু সমাপ্তিও হয়তো হয়, কিন্তু পাঠকের মনে দাগ কেটে যায় কানা রাইসু – সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এক দূর্দান্ত সৃষ্টি এই কানা রাইসু। অভিনন্দন জানুন, লেখক!

‘আজগুবি রাত’ পড়েছি প্রায় মাসখানেক হলো।
পড়ার পরপরই দুটো বিষয়ে প্রশ্ন জাগে। মনে হয় – এ নিতান্তই লেখকের অমনোযোগীতা। প্রথমতঃ উপন্যাসের একেবারে শুরুর এ অংশ –

“...আর নূর বানুর হাত যে নূর বানুর হাত, সে কথাটাও এক কানা রাইসু ছাড়া -এবং আমি ছাড়া - কেউ-ই তো জানে না। আর কানা রাইসুর জানা আর আমার জানা তো একই কথা, যদিও তার বয়স মাত্র দশ, আমার যেখানে...। যা হোক, বয়সের কথা থাক... নূর বানুর বয়সের কথাই না হয় বলি।”

এটি উপন্যাসের চতুর্থ বাক্য। স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে উত্তম পুরুষে বলা হবে বাদবাকী গল্প। কিন্তু, কথক নিজের বয়স না বলে যেখানে থামলো, তারপর আর ফিরলো না – সারিকার তান্ডবেও না।

অন্য প্রশ্নটি –
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পের মানুষগুলোর নাম বরাবরই যথার্থ মনে হয়। নূর বানু গরীবের মেয়ে, লাকি খান ফিল্মের হিরো, ভিলেন সম্রাট আনজাম, বিউটি কুইন আলপনা; নামগুলো শুনলে মনে হয় – এমনই তো হওয়ার কথা। লেখকের এ সচেতনতার কারণেই উপন্যাস বয়ানে পড়ি – লাকি খান ‘দেখলেন’, ওসি ‘বললেন’, সচিব ‘শুনলেন’ এবং এই ধারাবাহিকতায় নূর বানু এবং তার গরীব স্বামী ইকবালুর রহমান ‘দেখল’/’বলল’/’শুনল’। অথচ, উপন্যাসের একেবারে শেষ প্যারায় –

“শুধু ইকবাল দেখলেন, তিনি নূর বানুর আঙুলে আঙুল বুনে পাথরঘাটার আকাশ দিয়ে উড়ছেন। তাঁর পেছনে অজগরের সে ফনা।”

হতাশ হওয়ার যে শংকা শুরুতেই জেগেছিলো মনে, যে শংকা মনোযোগ বাড়িয়েছে পাঠে, তা কেটে গেছে মাঝামাঝি পর্যায়ে। কানা রাইসুর কারণে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের অন্যান্য উপন্যাস (যা পড়েছি) থেকে ‘আজগুবি রাত’কে এগিয়ে রেখেছি। কিন্তু, প্রশ্ন দুটি অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছিলো। সপ্তাহ খানেক আগে, সম্ভবত ট্রাফিক জ্যামে বসে বসে অপেক্ষায়, এ দুটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি নিজের মনে।

লেখকের জন্য তাই আরো এক দফা অভিনন্দন।

Read more...

27 November, 2009

পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা...

অভিযোগটা করেছেন, নজমুল আলবাব – ‘তুমি বিদেশেই ভালো ছিলা, দেশে এসে উধাও’। এক বিন্দুও ভুল নেই এই অভিযোগ অথবা অনুযোগে। আড়াই মাসের বেশি সময় চলে গেলো, অথচ মনে হয় - টেরই পেলাম না। ব্যস্ততায়, কোলাহলে, ঘনিষ্ঠতায় – এমনই হয়তো স্বাভাবিক। ভার্চুয়াল জগতে উধাও হওয়ার পেছনে দুটো শক্ত কারণ আলবাব ভাইকে বলার পরে তিনি মেনে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘যত দ্রুত পারো নেটে রেগুলার হও’। আমিও শনিবার রবিবার হাঁকাই, এখানে সেখানে - ফেসবুকে। এ সপ্তাহ নয়তো অন্য সপ্তাহ। নকিয়া সিক্স জিরো টু জিরোর ডাটা কেবল কেনা হয় না, যেমন পাইনা ব্রডব্যান্ডের নির্ভরযোগ্য লাইন। চারিদিকে কিউবি’র বিজ্ঞাপন। আসছে অথবা এসে গেছে বাংলালায়ন। আরো কেউ কেউ আসবে সামনে। ‘হায় চিল, সোনালী ডানার চিল’।

দুই-
প্রশ্নটা অস্বাভাবিক নয়।
প্রবাসী কেউ দেশে ফিরলে বন্ধু-স্বজন মিষ্টি মিষ্টি মুখে জিজ্ঞেস করেন – ‘কেমন লাগছে দেশ’, ‘কেমন লাগছে ঢাকা শহর’? অল্প সময়ের জন্য আসলে হয়তো খানিকটা রোমান্টিসিজম কাজ করে। তাই ভালো লাগে – ধুলো, ধোঁয়া, যানজট, দারিদ্র্যের অগমে দুর্গমে থাকা মানুষের মুখ। ক্যামেরার ক্লিকে ধরা পড়ে ১৫ নম্বর রুটের বাস – মিরপুর টু সায়েদাবাদ, বিবর্ণ শরীর, ভাঙা গাল-চোয়ালের হেলপার। ঝাল মুড়ি আর বাদামের ঠোঙা হাতে ট্রাফিক জ্যামে বসে অনায়াসে বার্গার কিং’কে তুচ্ছ করা যায়। সিগন্যালে ফুলঅলা শিশুকে বিশ টাকা দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিজেকে স্পষ্ট করা যায়। করা যায় - এরকম আরো অনেক কিছু। কিন্তু, ফেরা যখন স্বল্প দিনের নয় – জীবন ও জীবিকার জন্য যখন সকাল সন্ধ্যা ছুটতে হয়; তখন ক্লান্তি আসে সহজে। সন্ধ্যায় সারি সারি গাড়ি, ঘর ফেরতা মানুষ, রাস্তার পাশে বিধ্বস্ত পঙ্গু ভিক্ষুক – মাটির শানকিতে পানতা ভাত – পাশে বসা নেড়ি কুকুরের অপলক চাহনি, একটু এগিয়ে কানাডিয়ান হাইকমিশন ভবনে আলো ছায়ার খেলা, ট্রাফিকের অপ্রয়োজনীয় লাল-হলুদ-সবুজ সংকেত। ১২ কিলোমিটার পথ পেরুতে দুই ঘন্টা পার। এসবের কোনো সমাধান যখন জানা থাকে না তখন একটাই হয়তো বলার থাকে – জানি না কী হবে, তবে এসব নিয়েই চলতে হয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যেমন তাঁর কলামে লিখেছেন – ‘ট্রাফিক জ্যামে বসে বসে মুখস্ত হয়ে গেছে দোকানের নাম, সাইনবোর্ড, মোড়ের পুলিসের চেহারা’। গত সপ্তায় বন্ধু-সহকর্মী রাকিব জিজ্ঞেস করছিলো একই প্রশ্ন, ‘কেমন লাগছে ঢাকা’? জবাবে বলি – ‘অপ্রত্যাশিত কিছু নেই। এই জ্যাম, এই লোডশেডিং – এসবই আমাদের। আমাদের ঢাকার’।

তিন-
ডে-লাইট সেভিং’এর সিদ্ধান্তে সময় পরিবর্তনে খুশী হয়েছিলাম প্রথমে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যুক্তিটি ভালো লেগেছিলো। আশাবাদী ছিলাম – হুট করে হয়তো আহামারী ফলাফল পাওয়া যাবে না। তবে পাঁচ সাত বছর পরে হয়তো বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমবে। তাই টেলিফোনে হেসে উড়িয়েছি – এই পরিবর্তন না মানা মানুষের গোয়ার্তুমিকে। এমনও বলেছি – আমাদের দেশের মানুষ পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না। অথচ দেশে ফেরার পরে টের পেয়েছি – সমস্যাটা অন্য কোথাও। কেনো এই সময় পরিবর্তন, কোন কোন সময়ে সময় পালটানো হবে – সেসব নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই, ব্যাখ্যা নেই। সেপ্টেম্বরের ১৯ অথবা অক্টোবরের একে পুরনো সময়ে ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো। ফেরা হয়নি। স্কুল-অফিসের সময় পালটিয়ে ডে-লাইট সেভিং টাইমকে চিরস্থায়ী করা হয়েছে। ব্যাপারটি হয়ে গেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাই ‘ডিজিটাল টাইম’ জাতীয় কটাক্ষে আর অবাক হই না। অবাক হই, এখনো অনেকে ঘড়ির সময় পাল্টায়নি। ‘ভাই, ক’টা বাজে?’ প্রশ্নের জবাবেও বিদ্রুপ – ‘কোনটা বলবো? আল্লার টাইম না বান্দার টাইম?’ ‘এখনকার সময় নাকি আগের সময়’ জাতীয় কথাও হরহামেশা কানে ভেসে আসে। পত্রিকায় পড়ছিলাম – ধানমন্ডির এক গৃহবধুর লেখা চিঠি - স্কুলে তাঁর বাচ্চার ক্লাস শুরু হয় সাতটায়। রওনা দিতে হয় সাড়ে ছয়টায়। আগের সময়ে – ভোর সাড়ে পাঁচটা। নভেম্বর/ডিসেম্বরে শীতের সকালে সাড়ে পাঁচটা মানে অন্ধকার! কেউ কি পড়েছেন সে চিঠি? নীতি-নির্ধারকদের কেউ কি ভাবছেন কিছু? সকাল সাড়ে সাতটায় বিবিসি বাংলার ‘প্রত্যূষা’ অনুষ্ঠানে পত্রিকা পর্যালোচনা পর্বে প্রতি সকালে একজন অতিথি আসেন আলোচক হিসেবে। সৌজন্যস্বরূপ বিবিসির সংবাদ পাঠককে প্রায়ই বলতে শুনি – ‘এত ভোরে – সূর্য ওঠার আগে প্রায় অন্ধকারে কষ্ট করে আপনি আমাদের স্টুডিওতে এসেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ’।

চার-
সিএনজি চালিত বেবি-ট্যাক্সি কিংবা কালো ক্যাবে জ্যামে বসে বসে ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প জুড়ি। বাজার দর, যানজট, মলম পার্টি – বিক্ষিপ্ত আলাপ। এ সপ্তায় সরকারী নির্দেশ এসেছে - সব সিএনজি ট্যাক্সি পেছনে দরজা লাগাতে হবে। ক’দিন আগেই ডেইলি স্টারে ছবি এসেছে উলটে যাওয়া সিএনজি বেবি-ট্যাক্সি থেকে এক মহিলাকে বের করা হচ্ছে। দরজা লাগানো হলে এ উদ্ধার কতটা সহজ কিংবা জটিল হবে সেসব জিজ্ঞেস করি। এক ড্রাইভারের শংকা অন্য জায়গায় – আগে লোকজন মাথা বের করে বমি করতো, এখন দরজা বন্ধ থাকার কারণে ভেতরেই বমি করতে হবে, তার গাড়ি নষ্ট হবে। খেয়াল করে দেখলাম – বেশির ভাগই দরজা লাগানোর হুকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ড্রাইভারের হাতে। যাত্রীর নিজের হাতে খোলার সাধ্য নেই। ব্যাপারটি স্বস্তিকর লাগলো না। পত্রিকার পাতায় হয়তো অন্যরকম ছিনতাইয়ের খবর আসবে সামনে। তবে যাত্রী ছিনতাই নয়, বেবি-ট্যাক্সি ছিনতাইয়ের গল্প শুনলাম – গাইবান্ধার হাসনাতের কাছে। হাসনাতের মেসবন্ধু বারীও বেবি-ট্যাক্সি চালায়। একদিন বারীর গাড়িতে ওঠে রূপবতী তরুণী। ভাসানটেক বেড়ি বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তরুণী থামতে বলে। আরো বলে – ‘একা একা ভালো লাগে না, একটু পেছনে এসে বসেন’। বারী বেসামাল হয়ে পেছনে গিয়ে বসে। তারপর তার চোখে মুখে কী একটা স্প্রে করে তরুণী। এরপরের ঘটনা আর মনে নেই। বারীর জ্ঞান ফেরে রাত দশটায়, বাঁধের দক্ষিণ পাশে। বেবি-ট্যাক্সি হাওয়া।

পাঁচ-
টিভি খুললেই শারমিন লাকী।
হেন কোনো পণ্য নাই যার বিজ্ঞাপনে শারমিন লাকী নাই।
আলু যেমন সব তরকারীতে মানায়, মওদূদ যেমন সব দল করে, শারমিন লাকী তেমনি সব...

ছয় -
মিরপুর থেকে বসুন্ধরা আ/এ যাওয়ার শর্টকাট পথ হলো ভাষানটেক হয়ে জিয়া কলোনী দিয়ে বের হওয়া। মূল রাস্তায় উঠতেই র্যাুডিসন। যানজট না থাকায় – সময় লাগে বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট। কিন্তু, অলিভ-এম্পায়ারের সামন্তদের প্রতাপ ভালো লাগে না। হুট করে একদিন গাড়ি ঘুরিয়ে দিলো। কোনো কারণ নেই, ব্যাখ্যা নেই। একটা সমাধান পাওয়া গেলো – যাওয়া কিংবা ফেরার পথে ‘মানিকদী বাজার যাবো’ বললেই পথ ছেড়ে দেবে। দুয়েকদিন ওরকম বলে - আসলাম এবং গেলাম। পরে আর ভালো লাগলো না। মিথ্যে বলার অপরাধবোধের চেয়েও আরেকটা গভীর হীনমন্যতা কাজ করে, নিজের কাছে নিজেকে ছোটো মনে হয় খুব। একরকম বিষাদ এবং অস্বস্তি ভর করে। কোথায় যেনো একটা দেয়াল লিখন দেখলাম - ‘খুন ও ক্ষরার অবেলায়, এতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই’।

সাত-
ঢাকায় হুট করে কালিজিরার চাহিদা বেড়ে গেছে, অথবা বিক্রি বেড়ে গেছে। কিংবা চাহিদা-বিক্রি নয়, বেড়েছে কেবল বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে আছে – মহানবীর বাণী, “একমাত্র মৃত্যুরোগ ছাড়া যাবতীয় রোগের মহৌষধ এই কালিজিরা”। উপযোগিতা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ মার্কেটিং মিক্সের ভাইটাল এলিমেন্ট হবে ধর্ম। স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে গাড়ির পেছনে ফেসিয়াল টিস্যুবক্সের পাশে সানন্দা এবং আমলে নাযাতের সহাবস্থান পুরনো হয়েছে অনেক আগে। সেদিন একটা মাইক্রোবাসে স্টিকার দেখলাম – ‘There is no god except prophet muhammad’. জ্ঞানহীন ধনীক সমাজের জীবনচর্চায় ধর্ম হয়তো এভাবেই থাকে। অবাক হই না।ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক রোকসানা রহমানকে শিমরাইলের পটেটো চিপস ফ্যাক্টরীতে বেশি সময় দিতে হয় আজকাল।

আট-
এফ এম রেডিও জকিদের খলবলানি কমেনি।
মেয়েলি কন্ঠের পুরুষ এবং ন্যাঁকা কন্ঠের নারী আর-জে বাড়ছে প্রতিদিন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপিত হচ্ছে আর-জে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। রেডিও টুডের আর-জে লিরব নাস্তানাবুদ হলো লাইভ ফোন কলে। লক্ষ্মীপুরের শফিকুল দরাজ কন্ঠে ঘোষণা করলো – ‘লিরব ভাই, আপনার কন্ঠ আমার খুব ভালো লাগে, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি, আপনার সাথে আমি প্রেম করতে চাই’।
আর-জে লিরব পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত, ‘না ভাই, এসব কী বলেন! আমি ওরকম না, আমি ভীষণ স্ট্রেইট ভাই’।
শফিকুল নাছোড়বান্দা, ‘আপনি যা-ই বলেন, আমি শুনবো না। আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনার সাথে প্রেম করতে চাই’।
শেষ পর্যন্ত ফোনের লাইন কেটে গান ছেড়ে পালালো আর-জে লিরব।
চ্যানেলগুলোর মাঝে আলাদা বিশেষত্ব নেই। কেবল এবিসি রেডিও বাংলা শব্দের প্রতি যত্নশীল। আর-জের বদলে কথাবন্ধু, এসএমএস এর বদলে ক্ষুদেবার্তা, মোবাইল ফোনের বদলে মুঠোফোন...। তবে নিয়মিত শ্রোতা হয়ে উঠেছি রেডিও ফূর্তির অনুষ্ঠান ‘ফুর ফুর ফুর্তি’র। ছড়াকার অনীক খান ও কার্টুনিস্ট শাহরিয়ার শরিফ জুটি জমিয়ে রাখে রাত বারোটা থেকে দুটা; রবি সোম মঙ্গল বুধ – এই চারদিন।

নয়-
পত্রিকা খুললেই বিজ্ঞাপন। ইউকে, সাইপ্রাস, সুইডেন যেন পাড়ার মোড়ের গলি। আইইএলটিএস সহ/ছাড়া, স্টাডি ব্রেক এলাউড, স্পন্সর সাপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিটসহ স্টুডেন্ট ভিসা, এয়ারটিকিট ফ্রি, ল্যাপটপ ফ্রি, থাকার ব্যবস্থা, এয়ারপোর্ট পিক আপ, ল্যান্ডিং এর পরে মোবাইল ফোন কানেকশন, এ টায়ার কলেজ, ৪ ঘন্টায় অফার লেটার, তিনদিনে ভিসা লেটার। কী নেই!

দশ-
এক সন্ধ্যায় রায়হান ফোন করে বলে – ‘চলেন এক সাথে বাসায় ফিরি’। এক ঠোঙায় চারটা সিঙ্গাড়া কিনে রাস্তায় গাড়ি খুঁজি। নীল ক্যাব পেয়ে দুজন চেপে বসি। সিঙ্গাড়ায় কামড় দিই, ট্রাফিক জ্যামে দেয়াল লিখন দেখি। সারা দেয়ালময় মতিউর রহমান আর লতিফুর রহমানের ছবি। বক্তব্য – “নাস্তিক প্রথম আলোর আলপিন ম্যাগাজিনে আমাদের প্রিয় মহানবীকে নিয়ে ‘ব্যাঙ্গাক্তক’ ছবি প্রকাশ কারীদের ফাঁসি চাই” – প্রচারে ধর্মপ্রাণ জনগণ। রায়হান আমাকে জিজ্ঞেস করে, “প্রথম আলো আর বসুন্ধরার লাগালাগি খেয়াল করছেন?”
বললাম, “হু, বসুন্ধরাও তো সম্ভবত পত্রিকা নিয়ে আসতেছে সামনে”।
“কিন্তু এতদিন পরে আলপিন নিয়ে টানাটানি কেন?” রায়হানের জিজ্ঞাসা।
উত্তরে গলা চড়িয়ে বসে ট্যাক্সি ড্রাইভার – “না ভাই, প্রথম আলো কাজটা ঠিক করে নাই...”
জিজ্ঞেস করলাম, “কোন কাজ?”
মাথার টুপিটা সামাল দিয়ে ড্রাইভার বলে, “আমাদের নবীজির কোনো ছবি কি আছে দুইন্যায়? তারা কোন সাহসে ছবি ছাপাইলো?”
আমার মজা লাগে। জামাল্গোটা তাহলে কেউ কেউ খায়।
রায়হান বেশ বিরক্ত, “ভাই, আপনি নিজের চোখে ঐ ছবি দেখছেন?”
সামনের রিক্সাকে পাশ কাটিয়ে ড্রাইভার পেছনে তাকায়, চেহারায় জেল্লা ফুটে উঠেছে – “আমি দেখি নাই, তবে এই কথাটা তো হাওয়া থেকে আসে নাই, অবশ্যই তারা ছবি আঁকছে”।
রায়হান কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো। আমি থামাই, “না, না। ঠিক আছে, মামা। আমিও শুনছি, ছবি আঁকছে। তারা কাজটা ঠিক করে নাই”।
রায়হান প্রথমে অবাক হলেও, বুঝে যায় পর মুহূর্তে।
আমার সাপোর্ট পেয়ে ড্রাইভার রায়হানের দিকে আঙুল তোলে – “এই দেশে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়, প্রথম আলোর সাম্বাদিকদেরও হবে। ৪টা সাম্বাদিকের ছবি দেখছেন না? ঐ চারটারে...”
রায়হান মুচকি হাসে, আস্তে করে আমাকে বলে – “দুইরকম পোস্টার দেখে চারজন মনে করছে”।
আমি আবার উস্কানি দিই, “মামা, মতিউর রহমান আর লতিফুর রহমান কি ভাই নাকি?”
ড্রাইভার চুপচাপ।
রায়হান কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে, আমি গুতা মেরে থামাই। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, “মামা কোন দল করেন, জামাত নাকি ইস্লামি ঐক্যজোট?”
“আমি কোনো দলে নাই। তবে তারা নবীজির ছবি এঁকে ভালো করে নাই”।
খানিক পরে আবার জিজ্ঞেস করি – “পত্রিকা কোনটা পড়েন – ইনকিলাব নাকি সংগ্রাম?”
“ঠিক নাই, যখন যেইটা পাই”।
বলি, “সংগ্রাম পইড়েন, ঐটা কিছুটা সঠিক খবর দেয়, নয়াদিগন্তও লাইনে আছে”।
রায়হান হাসি আঁটকাতে পারে না, বলে – “মানবজমিনও পড়তে পারেন, রঙিণ আছে”।
ড্রাইভার রায়হানের ওপরে চ্রম ব্রিক্ত। আমার সাথেও কথা বলছে না। শেষে নামার সময় ভাড়া দিয়ে বলি – “ঠিক আছে মামা, আসি। প্রথম আলো পইড়েন না, গুনাহ হবে”।
রায়হান হাসতেই আছে, “এই রকম করলেন কেন?”
“ধুর মিয়া, এই লম্বা যানজটে এরকম বিনোদন কই পাবা?”

এগারো -
টেলিভিশন চ্যানেলে নবাগত দেশ টিভি। অন্যগুলোর তুলনায় ভালো অনুষ্ঠান করে। সংবাদ, বিশেষ করে স্পোর্টস রিপোর্টিং’এ বেশ বিস্তারিত। দেশ টিভির খবর ভালো লাগার অন্য কারণটি পাপিষ্ঠ শিরোমণিদ্বয় ধুসর গোধুলি এবং পান্থ রহমান রেজা সহজেই অনুমান করতে পারবেন। সংবাদের মাঝেও অনন্য বিনোদন খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে বিয়েনপির নেত্রীকে বলি – এই বয়স্ক মানুষটিকে একটু অবসর দিন, মাথাটা ঠান্ডা করুক তিনি, বড়ো বেশি কথার চাপ। তাই অনেক বেশি অসংলগ্ন। ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টের প্রতিবাদে যে দু’দুটি চিঠি খন্দকার দেলোয়ার লিখেছেন, তার বিপরীতে ডেইলি স্টার যে জবাব দিয়েছে – স্কুল বিতর্কের নবীশরাও লজ্জা পাবে। কিন্তু দেলোয়ার কি থামবেন! “তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি”।

বারো –
“টুপুর ঐ মেইলের রিপ্লাই দেয়নি।
কিন্তু সেই ভোরবেলা যখন একাকী আমি, চরাচরে গভীর শুন্যতা তখন হঠাৎ করেই নিজের কাছে আমি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম – এই মেয়েটা যদি সত্যি কোনো দিন ডাকে আমাকে আমার মতো করে, আমি কি ফেরাতে পারবো?” (শমন শেকল ডানা, হাসান মোরশেদ)

তেরো-
নয় নভেম্বর, সকাল নয়টা। চলে গেলেন ছোটোদাদু, দাদী’মা আমার। যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন শুয়ে শুয়ে পাঁচ বছর। আগেরবার ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে যখন ফোন করি, জিজ্ঞেস করেন – “তুমি আসবা বলে কই গেলা?” বলেছিলাম, “অপেক্ষা করেন, আমি আসবো”। প্রবাসের অসংখ্য মুহূর্তে শংকা জেগেছে। দেখা হলো তবে এবার। মৃত্যুর পরে পত্রিকায় শোক কলামে লেখা হয়েছে – “১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন...”। শোক কিংবা সন্তাপের শব্দবন্ধ নয়। কেবলই অনুভব। আমার শৈশব, কতো কতো বিদ্যুৎহীন রাত, রূপকথা – রাজা-উজির-নাজির...। কতো কতো দুপুর, ভাত মেখে পাখির ডিম বানিয়ে একটা একটা করে খাওয়া - কবুতর, কোয়েল, টিয়া এবং চড়ুইয়ের ডিম। আহ! সেই ঘ্রাণ, স্পর্শ, মমতা। এভাবে চলে যাচ্ছে প্রিয় সব মুখ। “এই বাড়ির এইখানে এলে মনে পড়ে, কে যেনো কে নেই”।

চৌদ্দ-
অনেকদিন পরে কোরবাণীর ঈদ করছি দেশে। গ্রামে যাবো কাল সকালে। থাকার চেয়ে না থাকার অনুভবগুলো তীব্র হয়। সেইসব অনুভূতি নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। গল্প, দিনলিপি – অথবা নিছক ঝালমুড়ি। কোনো এক নামহীন পাঠক ব্লগস্পটে অনুযোগ করেছিলেন – কেবল মন খারাপের কথাই কেনো লিখি, কেনো আনন্দের ভালো লাগার কথা আসে না, ফেসবুকে গরুর মতো গল্প কেনো কম। ইচ্ছে ছিলো – মন ভালো করা একটা গল্প লিখবো, গরু-ফেসবুক কিংবা অন্য কিছু নিয়ে। লিখি লিখি করে আর লেখা হলো না। কখনো লেখা হবে কিনা জানি না। তবুও আশাবাদী হতে চাই। ব্লগিং’এ তুমুলভাবে নিয়মিত থাকতে চাই...

সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে – “অনেক দিনের পরে মিলে যাবে অবসর, আশা রাখি পেয়ে যাবো বাকী দু’আনা...”

Read more...

26 October, 2009

ঘরে ফেরার পরে

কোনো নতুন ছাইপাশের আশায়, আমার বিভ্রম অনুভূতির অস্পষ্ট দিনলিপি পাঠ, অথবা অন্য কোনো কারণে, হয়তো পথ ভুলে - ভুল ক্লিকে আপনি আমার এ পাতায় আসেন।
নতুন কোনো লেখা নেই, এই কারণে যদি বিরক্ত হয়ে থাকেন, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রতি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে ফিরতে আমি ঘরমুখী ক্লান্ত মানুষের মুখ দেখি। দেখি সারি সারি বিশীর্ণ চেহারা।
আর ভাবি - এরা প্রতিদিন ঘরে ফেরে, আবার পথে নামে; আমারই মতো।

ঘরে না ফেরা মানুষের অনেক না বলা কথা থাকে।
কিন্তু, ঘরে ফেরা মানুষের?

.
.
.

Read more...

08 September, 2009

মৃতগল্প এবং সোডিয়াম স্বপ্নের জন্য এলিজি

গল্পটির নাম ‘মৃত্যুর তারিখসমূহ জেনে যাওয়ার পর’।
শুরুতে ভেবেছিলাম, এ গল্প লেখা খুব কঠিন হবে না। ক্রমাগত মাথার ভেতর যন্ত্রণা করে গেলে, একটা দৃশ্যের পর আরেকটা দৃশ্য, ঘটনা এবং সংলাপ ফিরে এলে দ্রুত গল্প সাজানো যায়। আমি হয়তো কনরয় স্টপেজে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি – তখন গল্পের একটা মোড় আসে। অথবা ট্রেন শেপার্ড স্টেশনে পৌঁছে গেছে – আমাকে নামতে হবে, তখন আবার গল্পের প্রথম অংশকে মাঝে এনে শুরুটা অন্যভাবে করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু শুরুটা পালটে দিলে শেষটায় কী হবে, এসব ভেবে ভেবে ম্যাডিসন স্কয়ারের ২৩০৬ নম্বর রুমে চলে যাই। এরপর আরো ৮ ঘন্টা একটানা কাজে পার হলে ঘরে ফিরি। এভাবেই গল্প থাকে মাথার ভেতর।

গল্পের নামটি বেশ লম্বা। তবে নামের মধ্যে একটা আহবান আছে, গল্প পাঠের প্রস্তুতি আছে। সম্ভবনা থাকে গল্পের নাম দেখেই পাঠক অনুমান করবে – কেউ একজন মৃত্যুর তারিখ জেনে গেছে এবং এরপরে কী হবে তা নিয়ে গল্প। এখানে একটু খটকা থাকে, বলা আছে ‘তারিখসমূহ’ – অর্থ্যাৎ মৃত্যুর একাধিক তারিখ জেনে গেছে। খুব সম্ভবত একদল মানুষ তাদের মৃত্যুর তারিখ জেনে গেছে। আরোগ্য সম্ভবনাহীন মানুষ যদি জেনে যায় তার মৃত্যুর তারিখ, কিন্তু তখন আর কী-ই বা করার থাকে? কতোটুকুই বা সাজানো যায় জীবন? এরচেয়ে বরং একদল সুস্থ মানুষ জেনে যাবে তাদের মৃত্যুর তারিখ, প্রথমে কেউ কেউ বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে থাকবে, কিন্তু দেখা যাবে সত্যি সত্যি মানুষ তার জেনে যাওয়া তারিখে মারা যাচ্ছে। তখন কোলাহল হবে, জীবন সাজানোর গতিময়তা বাড়বে। গল্পের ভেতরে কী হবে সেটা পরে বলছি। আগে বলি, গল্পের শুরুটি কেমন হতো।

আচ্ছা, তারও আগে বলে রাখি – যেহেতু এই লেখকের কব্জির জোর নেই, সেহেতু গল্পটি উত্তম পুরুষে বর্ণিত হবে। চিন্তার-চৌবাচ্চারা (থিংক ট্যাঙ্ক এর অনুবাদ হলো কি?) বলে থাকেন - উত্তম পুরুষে লেখা সহজ। উত্তম পুরুষের বাইরে গিয়ে লিখতে হলে নাকি কব্জির জোর লাগে। আমার কব্জিতে জোর নেই, পারলে যা আছে ঐ সামান্য জোরটুকু মোহাম্মদ আশরাফুলকে দিয়ে দিতে পারি অনায়াসে – আকাশে ভাসিয়ে দেয়া বল যেনো আরো ভেসে, আমার কব্জির জোর পেয়ে, সীমানাটুকু পার হয়।

গল্পের শুরু এভাবে –
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই শুনি আব্বার চিল্লাচিল্লি। ড্রয়িং রুমে বসে টেলিভিশনের চ্যানেল পাল্টাচ্ছেন আর চিৎকার করে যাচ্ছেন – ‘যতো সব ফালতু অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার’। হাতের কাছে রাখা খবরের কাগজটাও ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন। সব জায়গায় এক খবর – ‘কী সব টেস্ট ফেস্ট করে মানুষ জেনে যাচ্ছে কে কবে মরবে’। আব্বার দিকে যেতে আমার সাহস হয় না। আমি চুপেচুপে রান্নাঘরে আম্মার কাছে যাই। আম্মা একচুলায় পরোটা ভাজছেন, অন্য চুলায় ভুনা গরুর গোশত। ঘ্রাণে আমার পেট মোচড় দিয়ে ওঠে। আম্মাকে বলি, ‘আব্বা, এমন চিল্লাচিল্লি করছে কেনো? সারা দুনিয়া মেনে নিলো, আব্বার কেবলই আপত্তি’।

আম্মা শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মোছেন। বিড়বিড় করেন, কী বলেন বোঝা যায় না। আম্মার চেহারায় তাকিয়ে অনুমান করি, আম্মা বলছেন – ‘তোর আব্বা তো সারাজীবন এরকম’।
ফ্লোরে পড়ে থাকা পেপার কুড়িয়ে আমি বাথরুমে ঢুকি।

অনেক আগে যেবার বাসায় ইন্টারনেট কানেকশন নিলাম, আব্বা এলেন আমার রুমে। আমি ইয়াহুতে নিউ ইয়র্কে থাকা কাজিনের সঙ্গে চ্যাট করছি। আব্বা এসে আমার পাশে বসলেন, দেখলেন – আমি টাইপ করছি – ha ha.
আব্বা জিজ্ঞেস করলেন – হা হা মানে কী?
বললাম, হাসছি।
শুনে তাঁর চোখ যেনো কপালে উঠে গেলো, ‘তুই তো গম্ভীর হয়ে বসে আছিস, আর টাইপ করছিস – হাসছিস কই?’
আমি আব্বাকে কী করে বোঝাই - এসব চ্যাট, এসব অনুভূতি অন্যরকম।
সেদিন কিছু না বলে চলে গেলেন। এরপর আরো অনেকদিন আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, ফোনে অন্য কাউকে বলছেন – ‘কী আর বলবো বলেন, মুখ গম্ভীর করে টাইপ করে আর বলে হাসছি, একটা বিশাল জেনারেশন গ্যাপ, হা হা হা’।
আব্বা এরকমই। পরিবর্তন মেনে নিতে পারেন না।
আমাদের বাসায় ডিশ এন্টেনার সংযোগ নেয়ার পর আম্মা নিয়মিত খানা খাজানা দেখে, আমার ছোটো ভাই মুকুল কার্টুন নেটওয়ার্ক, আর আমি রিমোটের বাটন চেপে চেপে আমিশা প্যাটেল খুঁজি।
আব্বা কোত্থেকে শুনে এলেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে প্রকৃতির নানান আজব জিনিশ দেখায়, দূর্লভ সব নাকি ব্যাপার স্যাপার। আব্বা অফিস থেকে ফিরে টানা কয়দিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখলেন। সপ্তাহ খানেক পরে সাত্তার মামা আমাদের বাসায় এলে আব্বা বললেন, ‘লেদা পোকা কী খায়, এইটাও মানুষের আগ্রহের বিষয়?’

পত্রিকার প্রথম পাতা – শেষ পাতা – বিশেষ সম্পাদকীয় পড়া শেষে আমি আব্বার এসব কথা ভাবছিলাম। এই যে আজ এক মাস সব মিডিয়া তুলকালাম কান্ড করে দিচ্ছে, সামান্য একটা টেস্ট করে মানুষ জেনে যাচ্ছে সম্ভাব্য মৃত্যুর তারিখ – আব্বা এটাকে বিশ্বাস তো করছেই না, বরং পুরো ব্যাপারটিকে তুচ্ছ করে মানুষের ওপর ক্ষেপে যাচ্ছে। আমিও প্রথমে আব্বার মতো অবিশ্বাস করতাম। কিন্তু, সেদিন রিন্টু যখন ভার্সিটির ক্যাফেতে এসে বললো – তার এক ফুপা বাইপাস সার্জারি করতে সিঙ্গাপুর যাবে, লাখ বিশেক টাকার মতো খরচ হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে ঢাকায় ঐ ডেথ-টেস্ট করালো, দেখা গেলো বাঁচবেন আর ৯ দিন। এরপরও রিন্টুর ফুপাকে সিঙ্গাপুর নেয়া হলো, অপারেশনের আগের রাতে আবার স্ট্রোক করে মারা গেলেন। রেন্টু আঙুলের কড়ে গুনে গুনে দেখিয়ে দিলো রবিতে রবিতে আট আর পরের দিন সোমবার মিলিয়ে ৯ দিনই ছিলো। সোমবারে ফুপা মারা গিয়েছিলেন।

রাতে বাসায় ফিরে খাবার টেবিলে রিন্টুর ফুপার ঘটনা বলার সাহস আমি পাইনি। কারণ, এর আগেই আম্মা বলছিলেন, আমারদের বাসার তিন ব্লক পরে সাদী কাকার মামা শ্বশুর এ টেস্ট করেছিলেন, টেস্টে দেখা গেছে বাঁচবেন আর ৬ দিন। পুরোদস্তুর সুস্থ মানুষটি ঠিক ৬ দিনের মাথায় বাজার করে ফেরার পরে রিকশার ঝাঁকুনিতে রাস্তায় পড়ে গেলেন। হাসপাতালে নেয়ার পর – ডাক্তার বললো, ব্রেইন হ্যামারেজ।
আম্মার কথা আব্বা মন দিয়ে শোনলেন, আম্মাকে বললেন – ‘কাল সকালে বের হয়ে সব ক’টা টিভি চ্যানেলে যাবে, রিপোর্টারের কাজ খুঁজবে, আর কোন বাসায় কী হলো সেসব লাইভ টেলিকাস্ট করবে’।
আব্বার এরকম প্রতিক্রিয়ায় আম্মা চুপ মেরে গেলেন। আব্বা বলেই যাচ্ছেন –
‘...ঘুরে ঘুরে পশ্চিম পাইকপাড়ায় যাবে, বের করবে কার বাসার তরকারী পুড়ে গেছে। ঐটা রেকর্ড করে রাস্তায় দাঁড়াবে, বলবে – তরকারী পুড়ে পশ্চিম পাইকপাড়ার এ বাসায় এখন তীব্র গন্ধ, লতিফুন্নেসা, একুশে টেলিভিশন, পশ্চিম পাইকপাড়া’।
আম্মা চুপ, আমিও চুপ। আব্বা আর কথা না বলে - ভাত খাওয়া শেষ করলেন। রিন্টুর ফুপার ঘটনাটি তাই সে রাতে আর বলা হয়নি।


এতটুকুকে ভূমিকা হিসেবে মন্দ মনে হয় না। নাকি?
শিরোনামের চমকে পাঠক গল্পে যাবে, গিয়ে দেখবে – আজব এক ঘটনা ঘটছে, কী এক ডেথ-টেস্ট করে মানুষ মৃত্যুর তারিখ জেনে যাচ্ছে, এবং এরপর লৌকিক বা অলৌকিক যেভাবেই হোক না কেনো মানুষ ঠিক ঐ তারিখেই মারা যাচ্ছে। গল্পের কথক এবং তার মা এরকম দুটো ঘটনা জেনে গেছে। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলেও রিপোর্ট হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে গল্পকে কীভাবে আগানো যায়?
সমস্যা দেখা দেয় দুটি।
এক – এরকম ঘটনা কি শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে? তাহলে বাকী বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী? অন্য দেশে এই ডেথ-টেস্ট সফল হলে, সেখানকার বিজ্ঞানীরা কী বলছে?
দুই – এটা কী সায়েন্স ফিকশন, নাকি নিছক কল্পগল্প।

ঠিক এ জায়গায় এসে গল্পকার হিসেবে আরামদায়ক জায়গা হলো কল্পগল্পকে বেছে নেয়া। যেহেতু বাকী বিশ্বে এ ঘটনা ঘটে গেছে বলে দিলে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জটিল হয়ে যাবে, ঢাকা শহরের নানান চমকের জীবনে এ ঘটনা চমক পাবে না। আরো সমস্যা আমি তেমনভাবে সায়েন্স ফিকশনের পাঠক না, সুতরাং এ প্লটে গল্প আগানো আমার জন্য বেশ কঠিন। যদিও আমার ধারণা - এরকম প্লটে সায়েন্স ফিকশন হয়েছে, কিংবা হয়ে থাকার সম্ভবনাই ব্যাপক।

এখানে এসে গল্প আঁটকে যায়।
আমার কিছু অচেনা উঠতি বয়েসী বন্ধু-বান্ধবী আছে, যারা সময়ে অসময়ে আমাকে ইয়াহু মেসেঞ্জারে টোকা দেয়। কেউ কেউ তাদের রিসেন্ট ব্রেক আপ এবং তৎসংক্রান্ত ক্রাইসিসের কথা বলে। আমি শুনি, কারণ - আমি মনোযোগী শ্রোতা। তারাও এপ্রিশিয়েট করে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমি সংকটে পড়ে যাওয়া মানুষকে ব্যাপক সান্ত্বনা দিতে পারি,বিজনেস কেইস এনালাইসিসের মতো করে একাধিক সমাধান বলি, তারপর একটা ডিসিশন ম্যাট্রিক্স করতে বলি। বলি, “এ বয়সটা ভুল করারই বয়স, ভুল থেকে শিখে নাও, আরো বড়ো হলে পরে আর শিখতে পারবে না”। প্রায়ই দেখেছি – এ কথা এখনকার উঠতি জেনারেশন পছন্দ করে। যাবতীয় ভুল সিদ্ধান্ত তাদের মনে অপরাধবোধ জাগায়। সে প্রেক্ষিতে আমি যখন বলি – ভুল জীবনের অংশ, ভুল করা মানে জীবনের শেষ নয়; তখন তারা আমাকে পছন্দ করে। ঠিক আমাকে নয়, আমার কথাকে পছন্দ করে।

‘মৃত্যুর তারিখসমূহ জেনে যাওয়ার পর’ নামের গল্পটি যখন আঁটকে গেলো তখন আমি সারাদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে ঘাপটি মেরে থাকি। আমার সেই অচেনা উঠতি বয়েসী বন্ধু-বান্ধবীদের জন্য অপেক্ষা করি। নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে টোকা দেই। তাদের কেউ বিআরবি বলে যায় – আর আসে না, কারো গার্লফ্রেন্ড ম্যাঙ্গো ক্যাফেতে ওয়েইট করছে, কাউকে আম্মু বকা দিচ্ছে এতক্ষণ নেটের সামনে বসে থাকার জন্য, তাই জিটিজি। আমি মন খারাপ করি, তবুও অপেক্ষা করি। ডেথ টেস্টে মৃত্যুর তারিখ জেনে গেলে, এবং টেস্ট করা সকল সুস্থ-অসুস্থ লোক যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় মারা গেলে কী হতো আমাদের প্রতিক্রিয়া; ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির তাসিফ মেহমুদ, সানিডেলের মৌমিতা অথবা মোহাম্মদপুর কিংস কলেজের কেমেস্ট্রি অনার্সের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম কী ভাবতো – কী করতো; সেসব আমার জানতে ইচ্ছে করে। আমার বরাবরই মনে হয় – তাদের সঙ্গে কথা বললে আমি গল্প আগাতে পারবো। অথচ তারা কেউ অনলাইনে আসে না। তখন রকিকে মনে পড়ে।

রকি আমার পুরনো বন্ধু। কোপেনহেগেন স্কুল অব বিজনেসে এমবিএ করছিলো সেবার।
সামারে থাইল্যান্ড গিয়েছিলো ব্রেকে।
আমি খুশি হয়েছিলাম, আমার পুরনো বন্ধুদের কেউ কেউ এখনো আমাকে মনে করে, ভিনদেশে গিয়ে ফোন করে বলে – আসো দেখা করি।
কড়া রোদের এক দুপুরে ৩০১ সুকুমভিত রোড ঠিকানা থেকে ৭ মিনিট হাঁটার দূরত্বে আমরা ম্যাকডোনাল্ডসে বসি। রকি তখন ম্যাক-ইনডেক্স নিয়ে আলাপ তোলে। জেফ জার্ভিসের ব্লগ থেকে ব্যাখ্যা দেয়। আমি গল্প শুনি, আমার ভালো লাগে। রকি আমাকে বোঝায় – গ্লোবাল সিটিজেন শব্দটি কেবল একাডেমিন পারপাসে না রেখে পারসোনাল লাইফে নিয়ে আসতে হবে, দেশের জন্য কিছু করা মানে দেশে থাকতে হবে এমন কিন্তু নয়। আমি মাথা নাড়ি। খুব আলগোছে খেয়াল করি, একদা লাজুক-নীরব আমার এ বন্ধুটি এখন সৌম্য হয়ে গেছে। অনায়াসে সে এখন ঢাকার এক কর্পোরেট অফিসে ফিরতে পারে। কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থার তরুণ, কিছু ওয়ান্না-বি-মডেল কিছু টেন্ডারবাজ রকির পেছন পেছন ঘুরবে। সকাল আটটা সাতান্ন মিনিটে অফিসে যাবে রকি, নয়টা দশ মিনিটে তার অফিসে মর্ণিং ব্রিফিং হবে, সেখানে বাইশ বয়েসী এক উদ্ভিন্না ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনী কথা না শুনে রকির ধারালো চিবুকে অপলক তাকিয়ে থাকবে, কিংবা দুপুরে লাঞ্চের পরে অকারণে রকির রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবে সে। কাঁচ ঘেরা তাপশীত-নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে রকি এসবই দেখবে। তারপর সন্ধ্যা ছয়টা এক মিনিটে অফিসের ডেস্কটপ বন্ধ করে, নিজের ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে ইন্টারকমে ডাক দেবে সেই সকালের উদাসীন এমটিকে। চারকোণা মোটা ফ্রেমের চশমা মুছতে মুছতে রকি মেয়েটির চোখে চোখ রেখে বরফ শীতল গলায় বলবে – “এন অফিস, ইজ এন অফিস, ইজ এন অফিস, বিকজ দিস ইজ এন অফিস”।
এ কথাতেই মেয়েটি বুঝে যাবে – কর্পোরেটের কেউ কেউ জুতো পা অবস্থায় মরতে চায়, কাজ করতে করতে মরতে চায়। রকি আর কথা আগাবে না। এরপর সে সন্ধ্যায় পিয়াসীতে যাবে, সেখানে কিছু ব্যাংকার, কিছু টেলিকম গুরু, কিছু অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা গোল হয়ে বসবে। রকি মন দিয়ে সব শুনবে, আবার আড় চোখে দেখে নেবে রোডস এন্ড হাইওয়েজের এক ইঞ্জিনিয়ার দূরের টেবিলে কাঁপা কাঁপা হাতে নেশা করে, আর হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে – তার বৌ ভেগে গেছে এক মেট্রিক পাশ কন্ট্রাক্টরের সাথে। রকি সব দেখবে, নেশা করবে, কিন্তু তাল হারাবে না। কারণ রাত বারোটা এক মিনিটে তাকে এটিএন বাংলার লীড নিউজে যেতে হবে, জুনিয়র চেম্বার্সের প্রতিনিধি হিসেবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং সাম্প্রতিক ব্যবসায়ের হাল হকিকত নিয়ে কথা বলবে সে। এ অনুষ্ঠানে রকি ভুলেও কোনো ইংরেজী শব্দ বলবে না, চাহিদা-যোগান-সমন্বয়-প্রান্তিক চাষী-লভ্যাংশ-বিপনন-বন্টন-ভূর্তকী-মোদ্দাকথা; এসব শব্দে বুঝিয়ে দেবে বিদেশে পড়লেও সে বাংলার মানুষ, এদেশে কর্পোরেটের মার্বেল পাথর কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলের বৈঠকী স্টেজ; সব তার জন্যই।

অথচ এসব আমার কল্পনাতেই থাকে।
বার্গার শেষ করে তখন ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস চিবুচ্ছি। রকি আমাকে চমকে দিয়ে বলে সে আর দেশে ফিরবে না। রকি জীবনের হিসেব করে ফেলেছে। আটাশে বিয়ে, তিরিশে বাবা হবে। পঞ্চাশে সন্তানের বয়েস হবে বিশ, ভার্সিটির ছাত্র। ততদিনে এখনকার সবুজ পাসপোর্টটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে, রকি এবং তার পরিবার হবে কল্যাণ রাষ্ট্রের নাগরিক, যেখানে রাষ্ট্র সব দায়িত্ব নেবে, যেখানে সন্তানের জন্য ডিপিএস করে সারা মাসের সঞ্চয় থেকে টাকা সরাতে হবে না। রকি তখন অনায়াসে অবসরে যেতে পারে কিংবা মারাও যেতে পারে। বেঁচে থাকলে নিদেনপক্ষে ইউএন এর কোনো অংগসংস্থার কনসাল্ট্যান্ট হয়ে বাংলাদেশে হলিডে কাটাতে যেতে পারে। রকির হিসেবে ভুল নেই। আমি তখন স্মৃতিকাতর হই, টেস্ট পেপারে দেয়া রাজশাহী মডেল কলেজের একাউন্টিং সেকেন্ড পার্টের ফাইনাল একাউন্ট যখন কেউ মেলাতে পারেনি, তার পরদিন রকিদের বাসায় গেলে সে আমাকে ব্যালকনি থেকে চিৎকার দিয়ে বলে – ‘সংরক্ষণশীলতার নিয়ম অনুযায়ী হিসাববিজ্ঞান সব সময় ক্ষতির দিক চিন্তা করে, তাই বাজারমূল্য কম থাকলেও সেটাকে আসল বিবেচনা করতে হবে’।
কোকের গ্লাসের তলানীতে আর কিছু নেই, তবুও আমি স্ট্রতে টান দিই, বাতাসের ফুরৎ ফুরৎ শব্দ হয়।
রকি জিজ্ঞেস করে – ‘তোমার প্ল্যান কী?’
আমি তখন সুকুমভিতের বুক চিড়ে যাওয়া গাড়ি দেখি, বলি – ‘তুমি কি ভুলে গেছো, কোনো পরীক্ষাতেই আমি এইম ইন লাইফ রচনা লিখিনি...’
রকি আর কথা বাড়ায়নি।

‘মৃত্যুর তারিখসমূহ জেনে যাওয়ার পর’ নামের গল্পটির জন্য আমি রকিকে খুঁজি। ডেথ-টেস্ট সত্যি হয়ে গেলে তার জীবন পরিকল্পনায় কী প্রভাব পড়তো সেটা নিয়ে জানা যেতো। ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে রকিকে আমার গল্পের নায়ক বানিয়ে দিতাম। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে – গল্পের সূচনায় একজন তরুণকে দেখা যাচ্ছে, যে ভার্সিটিতে যায়, ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, বাবাকে খানিক ভয়ও পায়। ঠিক এরকম একটি চরিত্রকে ধরে এই অবস্থায় গল্প সামনে আগানো দুঃসাধ্য মনে হয়। তবুও অনেকগুলো সম্ভবনা রাখি, যার একটা এরকম: ডেথ-টেস্ট সফল। মানুষ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করছে। জানাজার নামাজ কিংবা ফিউনারেলের ইনভাইটেশন কার্ড চলে যাচ্ছে আগে। গল্প কথক তরুণটি তার দূর সম্পর্কের মামা ও ভার্সিটির শিক্ষক, যারা কিনা একই দিন মারা যাবে, তাদের কাকে শেষ বারের মতো দেখতে যাবে – তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে। শহরের প্রেমিক প্রেমিকারা এখন জেনে নিচ্ছে কে কবে মারা যাবে। কাছাকাছি সময়ে মরে যাওয়ার মানুষগুলো সম্পর্কে জড়াচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলো নতুন নতুন বিনিয়োগ স্কীম নিয়ে আসছে। জীবনের তখন আর অনিশ্চয়তা নেই, কারণ – মৃত্যুর নিশ্চয়তা আছে। মানুষের মৃত্যুতে শোক নেই – ব্যথাতুর কিংবা সন্তপ্ত হওয়ার অনুভূতি নেই...।

এগুলো হলো – গল্পের মাঝামাঝি পর্যায়ের মাল মসলা।
কিন্তু, শেষটায় কী হবে?
ধরা যাক - আমাদের গল্পকথক যে কিনা একটি ভার্সিটিতে পড়ে, তার একজন প্রেমিকা আছে, মেহরীন, – যে নিজের মৃত্যুর তারিখ জেনে গেছে, কিন্তু প্রেমিক গল্পকথকেরটা জানা হয়নি। আমাদের গল্পকথকের তখন ভীষণ ব্যস্ত সময়। তাহলে আসুন, গল্পের “হতে-পারতো-শেষ-অংশটা” পড়ি –

“টানা তিনদিনে তিনটা ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে আসে। মনে হয় – কতো রাত ঘুমাইনি। বাসায় বলে রেখেছিলাম, ১৮ ডিসেম্বর আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে দরজার হুক বন্ধ করে একটানা ঘুম দেবো, কেউ যেনো আমাকে এই তিনদিন না ডাকে, আমাকে যেনো খাবারের জন্যও না ডাকা হয়। আজ সব ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে রিন্টুরা যখন রাঙ্গামাটি যাচ্ছে, তখন আমি বাসায় ফিরি। কলিংবেল চাপতে গিয়ে দেখি দরজা খোলা। আমি ভেতরে পা দিতেই আম্মা এসে আমাকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আম্মার কান্নায় যতো না অবাক হই, তারচেয়ে বেশি অবাক হই যখন দেখি সোফায় মেহরীন বসা। আমাদের বাসায় আগে সে কখনো আসেনি, তার কথা আমার বাসায় জানাইনি এখনো।
আমি মেহরীনের দিকে তাকাই, আম্মা আমাকে ছাড়ছে না। শক্ত করে জড়িয়ে হাউমাউ কান্না বেড়েই চলেছে। এবার মেহরীন এসে যোগ দেয়। তার আগে আমার হাতে দেয় একটি সাদা খাম। খুলে দেখি – আমার ডেথ-টেস্ট রিপোর্ট। ভুলে গিয়েছিলাম দু’সপ্তাহ আগে মেহরীনের জোরাজুরিতে টেস্টে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে দেখি – আজই আমার মারা যাওয়ার কথা, স্পষ্ট লেখা এ বছরের তারিখ, আজই – আজ ১৮ ডিসেম্বর। জানি না কেনো, আমার অদ্ভুত ভালো লাগে। আমার হাসি পায়। আম্মা আর মেহরীনকে সরিয়ে আমি আমার রুমে চলে আসি। দরজার হুক লাগিয়ে বলি – “আমি ৩ দিন ঘুমাবো, কেউ আমাকে ডাকবে না”।


সমাপ্তি হিসেবে এ অংশটুকু কেমন তা আমার জানা নেই।
কারণ, গল্পের মাঝটা আমি লিখিনি। আসলে মাঝে কী হবে তা আমি জানি না। আমি ইচ্ছে করেই আর সমূহ অচেনা বন্ধু, রকি অথবা অন্য কাউকে খুঁজিনি। কে যেনো একবার আমাকে বলেছিলো – দলবদ্ধ জীবনে তোমাকে মানুষ বরাবরই একটি ‘শো-কজ’ লেটার ধরিয়ে দেবে। মনে পড়ছে না – কে বলেছিলো, কিংবা কোথায় পড়েছিলাম। তবে, সংঘবদ্ধতার কারণ-দর্শানো নোটিসে ইদানিং জীবন ভরপুর। পরামর্শের কমতি নেই – একজন বারটেন্ডার বলছে – ‘এমবিএ করেছো মার্কেটিং এ? ভুল করেছো – ফাইন্যান্স ভালো হতো’। একজন গবেষক পরামর্শ দিচ্ছে, ‘এমবিএ কেনো, এমএস করলেই পারতে’। একজন যশোপ্রার্থী লিটল ম্যাগ কর্মী বলছে – ‘ব্লগে লিখো? বাদ দাও ওসব, সিরিয়াস কিছু লিখো’। এখন সমালোচক জ্ঞান দিচ্ছে – ‘আগে ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্স শেষ করো, তারপরে লিখো’। একজন প্রবাসী ধিক্কার দিচ্ছে – ‘এখনো পিআর নাওনি? থেকে যাও এখানে - কী করবে আর? অথবা, ওয়ার্ক পারমিট নিচ্ছো না কেনো?’ নিজের ইচ্ছে মতো জীবন সাজানোর উপায় আর নেই – নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে অনেক কিছু – একজন বিকম ফেল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী একাধিক ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হয়ে গেছে, কিছু অধ্যাপক তার হারেমের সেবাদাস হয়ে আছে, নিত্যনতুন বানর নাচ চলছে সেখানে। আর এখানে স্বপ্নেরা সব ধুসর হয়ে আছে।
‘তোমার মুক্তি নেই, তোমাকে র‌্যাটরেসে আসতেই হবে’।

মূলত এসব কারণেই ‘মৃত্যুর তারিখসমূহ জেনে যাওয়ার পর’ নামের গল্পটি মারা যায়।
থেকে যায় এলিজি - গল্পের জন্য এবং স্বপ্নের জন্য।

Read more...

22 August, 2009

আবারো অহেতূক অকারণ

গত সন্ধ্যায় টর্ণেডোর মতো হলো, কিংবা পূর্ণ টর্ণেডো। আজ মেট্রো নিউজ লিখেছে - বেশ কিছু বাড়ি ধ্বসে গেছে, এক কিশোর মারা গেছে। সে সময় বাসায় ফিরে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ তুমুল ঝড় তুফানের শব্দ। উঠে জানালা বন্ধ করলাম। বাইরে, মনে হচ্ছিলো, বিশাল বিশাল গাছ উড়ে যাবে বাতাসে। জানালা বন্ধ করে আবার ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠলে ফ্রেশ লাগে। রাত জেগে বই পড়া যায়, সিনেমা দেখা যায়, ব্লগ লেখা যায়, ব্লগ পড়া যায়। অথচ কোনোটাই হলো না। প্রথমে 'মাটির জাহাজ', তারপর 'বাংলাদেশের ছোটগল্প জীবন ও সমাজ', তারপর 'লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা' এবং শেষে 'পেইনলেস স্পীকিং' পড়ার চেষ্টা করলাম। মন বসে না। কম্পিউটারে বেশ কিছু ম্যূভি নামানো আছে - 'মাটির ময়না', 'টার্মিনাল', 'লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা', ডিভিডিতে আছে - 'চিত্রা নদীর পাড়ে', 'বড় ভালো লোক ছিল', '৩৬ চৌরঙ্গী লেন', 'দেব-ডি', কিংবা আবার দেখা যায় 'হীরক রাজার দেশে', 'গোপী বাইন বাঘা বাইন', 'গোপী বাঘা ফিরে এলো'। অথবা আধ দেখা - 'দ্য কাইট রানার'...।
আগ্রহ পেলাম না একেবারে...।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর 'স্পার্টাকাস-৭১' দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম খুব।
সিক্যুয়েল 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি' এসেছে গত ঈদে। আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে ঐ সময়। নানান কারণে দেখা হচ্ছিলো না, দেখলাম এই ফাঁকে গত সপ্তায়। এ পর্বে ফারুকীয় চাতুর্য্য আছে, কৌশল আছে। দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা এমন করে নীরব থাকতে পারেন কিনা সেটা নিয়েও দ্বিমত হতে পারে। আপত্তি নেই। তবে রাজাকারের সন্তানের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর যে চেষ্টা ফারুকী করলো, তা মেনে নিতে পারছি না কোনোভাবেই। বাংলাদেশে ক'টা রাজাকারের ছেলে প্রকাশ্যে বলেছে যে তারা তাদের বাবার কৃতকর্মের জন্য দুঃখিত লজ্জিত? বরং সাপের বাচ্চা সাপ হওয়ার মতো করেই আধুনিকতার বেশে রাজাকারের ছেলেপুলে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

হুমায়ূন আহমেদের 'শ্যামল ছায়া' দেখেছিলাম রিলিজের সময়ই। ২০০৪ এর ডিসেম্বর সম্ভবত।
৭১এ ইঞ্জিন নৌকা ছিলো কি ছিলো না, সে তর্ক এবং নির্মাণের দূর্বলতা বাদ দিলে ভালোই লেগেছিলো। একই বছর একই সময়ে মুক্তি পেয়েছিলো তৌকিরের 'জয়যাত্রা'। অনেককেই বলতে শুনেছি 'শ্যামল ছায়া'র চেয়ে 'জয়যাত্রা' ভালো করেছে। দেখার সুযোগ মিলেনি। টরেন্ট থেকে নামিয়ে রেখেছিলাম, দেখলাম পরশু। কাহিনীর গতি এবং পথ বেশ মসৃণ। একই চরিত্রের মুখে গ্রাম্য এবং শহুরে সংলাপের মিশ্রণ আছে। কিন্তু, নানান জায়গায় আমি বারবার 'শ্যামল ছায়া'র সঙ্গে মিল পাচ্ছিলাম। দুটো ছায়া কোথাও মিলে গেলে ছায়া শিকারী হতে আর ইচ্ছে করে না।

রিসার্চ পেপারের কাজে লাইব্রেরী ঘুরে ক্লান্ত হলে যেতাম বিজনেস সেকশনে। মিসনের বলা কিছু বই এনে পড়লাম গত তিন মাসে। একটার চেয়ে আরেকটা দূর্দান্ত। লেখকদের নাম খুঁজে খুঁজ়ে আরো কিছু পেলাম, এবং পড়লাম। লেভিটের মার্কেটিং মায়োপিয়া দিয়ে শুরু, অন্ততঃ এর পরের গতির ক্রেডিট মিসনেরই প্রাপ্য। দু'সপ্তাহ আগে কৃতজ্ঞতা আর ধন্যবাদটুকু জানিয়েছি মেইলে, বলেছি - শান্তিময় ও সফল জীবন কামনা করছি। টিআরএসএম নিডস মোর পিপল লাইক ইউ!

রিসার্চ পেপার ডিফেন্স ছিলো গত ১০ তারিখে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে ৫৪ জনের মধ্যে আমার ডাকই পড়লো শুরুতে। ডিফেন্স কমিটি প্রথমবারই বললো - 'কনগ্র্যাটস'। মাইনর কিছু রিভিশন ছিলো। জমা দিলাম গত সোমবারে। আজ সকালে প্রফেসর ইউ'র মেইল পেলাম, 'এবার প্রিন্ট আউট জমা দিতে পারো'। কো-অর্ডিনেটর আলিসিয়া মেইল করছে - সফট কপিও দেয়া লাগবে। ইবলিশ গ্লোরিয়ার সঙ্গেও মেইল চালাচালি হলো। কনভোকেশনে থাকো আর না থাকো, এপ্লাই করতে হবে। সঙ্গে ৪০ ডলার গচ্ছা।

ইন্টার্ণশীপ শেষ হয়ে এলো প্রায়।
অফিসের এলাকাটা মিস করবো খুব। আজ ক্যামেরা নিয়ে বের হয়েছিলাম। ইয়াং স্ট্রীটের ছবি তুললাম কিছু। টিম হর্টনসে সেই স্যুপ কম্বো খেলাম অনেক দিন পরে। লাইব্রেরীর বই ছিলো, জমা দেয়ার কথা আজ। একটার হিসাব মেলে না। ৮টা জমা দিলাম, একটা ভুলে রয়ে গেছে বাসায়, কাল দিয়ে আসতে হবে।

ইন্টারনেটে ঘুরে দেখছিলাম - বিশ্বের সবচে' বড় বইয়ের দোকান আমার স্কুল থেকে খুব দূরে নয়।
আজ গিয়ে মাথা চক্কর দেয়ার অবস্থা।
কিছু বই কেনার বাজেট ছিলো, কিনে নিলাম - 'মার্কেটিং ওয়ারফেয়ার', 'পজিশনিং; দ্য ব্যাটেল ইন দ্য মাইন্ড', 'অন ওয়ার', 'ইন সার্চ অব এক্সিলেন্স', 'ব্রান্ডিং', ম্যালকমের ৩টা বই (প্রিয়র জন্য গিফট) এবং শেষ মুহূর্তে 'পোস্টমর্ডানিজম'। ক্যাশের মেয়েটা জোর করে একটা আই-রিওয়ার্ড কার্ড গুছিয়ে দিতে চাইলো। বারবার বললো - 'আর ইউ শিউর'! শেষে আমার অবস্থান ও গন্তব্য শুনে বললো - 'ঠিকাছে'।
গত ১১ মাসে কোল, ইন্ডিগো আর চ্যাপ্টার আমার ডেবিট কার্ডের বড়ো অংশ খসিয়েছে...।

গতকাল প্রিয়-রুমকি ফোনে জানালো সিনেমা দেখতে যাবে।
'লাভ আজকাল' চলছে এক সিনেমা হলে। ম্যাককাউন থেকে বাসে ৪ কিলোমিটার।
ভিপি'তে দেখা করে রওনা দিলাম। সিদ্ধান্ত বদলে - 'কামিন' দেখলাম। উড সাইড সিনেমা হল। তামিল ছবির জন্য আলাদা কাউন্টার। চারশ'র বেশি লোক বসার জায়গা আছে। কিন্তু, দর্শক সর্বসাকুল্যে দুই ডজনেরও কম। পরের শো'তে একটু ভীড় বেশি মনে হলো। সব মিলিয়ে মনে হলো - মহারাষ্ট্রের কোনো এক হলে সিনেমা দেখতে গেলাম। সিনেমা হিসেবে 'কামিন' খারাপ না, চলে...। আহামারী কিছু না। বিনোদন, স্রেফ বিনোদন।

আগামীকাল রোজা শুরু হচ্ছে।
টানা চতুর্থ বছর বাইরে আছি এ সময়। ওহ, গতবার ১ম রোজা দেশে ছিলাম, ২য় রোজার দিন ফ্লাইট।
ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে রেখে চর্চাটুকু ন্যূনতম থেকে আরো ন্যূনতম হচ্ছে ক্রমশঃ।
এরপরও রোজা আসলে নানা অনুভূতি ভীড় করে। স্মৃতিরা দুপদাপ হানা দেয়। শৈশব - কৈশোরের স্মৃতি। চোখ বুঁজলেই একটা দৃশ্যকল্প মনে ভাসে - সময় বিকেল ৪টা ৪৫, রান্নাঘর থেকে বুট-পেঁয়াজো-বেগুনি-চপ ভাজার ঘ্রাণ ভেসে আসছে, বিটিভিতে মহাবিরক্তিকর অনুষ্ঠান - 'মাহে রমজান'। কিছু মৌসুমী ধার্মিক কিশোর যুবা মাথায় টুপি দিয়ে মহল্লায় গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথিত ভাবগাম্ভীর্য, মহাত্ম্য, দ্রব্যমূল্যের আকাশ ছোঁয়া দাম, পাঁচ তারার ব্যুফে ইফতার আর দারিদ্র্যের অগমে দূর্গমে থাকা মানুষের ফাস্ট ব্রেকিং'এর চরম স্পষ্ট ব্যবধান, এই সব অসহায়ত্ব, মধ্যবিত্ত সীমাবদ্ধতা। তবুও উৎসব, তবুও ভালোলাগা। অপেক্ষায় পত্রিকার ঈদসংখ্যা, আপার জন্য ঈদ ফ্যাশন সংখ্যা কেনা। ২৯ রোজার দিন সকালে পত্রিকার শিরোনাম আগাম বলে দেয়া, 'আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ'।

পরবাসী মানুষ নাকি স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে।
আর আমার অতীতচারিতা তো আরো নিন্দিত।
তাই কেবলই ঘ্রাণ পাই - ফেলে আসা দিনের, আমাকে রেখে চলে যাওয়া কোনো এক ট্রেনের।
'"ইফ ইউ মিস দিস ট্রেন আয়্যাম অন, ইউ উইল নো দ্যাট আয়্যাম গন, ... হান্ড্রেড মাইলস, ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস এওয়ে..."

আম্মা ফোনে জিজ্ঞেস করলো গতকাল, "প্লেনের টিকিট কাটছো?"
"পেপারটা ফাইনাল হোক, মা। তারপরে জানাবো।"

Read more...

12 August, 2009

ধুসর গোধূলীর জন্মদিনে...

সঠিক বানান কোনটি? ধুসর নাকি ধূসর, কিংবা গোধুলী নাকি গোধূলী?
আবার বলা হয় – নামের বানানে ভুল নেই।
ভুল থাকুক আর না থাকুক, এটাও বলা হয় – নাম দিয়ে যায় চেনা, নামেই পরিচয়।
বাংলা ব্লগ জগতে তেমনি একটি নাম ধুসর গোধুলী।
বিরামহীন কমেন্ট, হাসি মজায় ভরপুর, ক্লাসিক শালী শিকারী এই ধুসর গোধুলীকে নিয়েই বোধ হয় বাংলা ব্লগে সবচে’ বেশী ফ্যান্টাসী লেখা হয়েছে।
নিকের পেছনের মানুষটির বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ আছে অন্ততঃ ৩৭টি।
ইচ্ছে ছিলো – ৩৭টি অভিযোগ নিয়ে ধুসর গোধুলীর ৩৭তম জন্মদিনে বিশাল একটি পোস্ট ছাড়বো। কিন্তু, একটু আগে জানতে পারলাম – এবার ৩৭তম নয়, ৩৮তম জন্মদিন তার। তাই অভিযোগ টভিযোগ বাদ।
একটা সত্য গল্প বলি।
আজ সকালে ফোনে রুমার কাছ থেকে শুনলাম এ গল্প।
_
ছাত্র জীবন থেকে ধু-গো মহা বাজিগর।
বাজি ধরে আর জিতে। ধরে আর জিতে। ধরে আর জিতে।
হারাহারি নাই।
একটি বহুজাতিক কোম্পানীর ঢাকা অফিসে ধু-গো যখন জয়েন করলো, তখন সবাইকে নাজেহাল করে ছাড়লো। এটা নিয়ে বাজি, ওটা নিয়ে বাজি। প্রত্যেকবার ধু-গো জিতে।
অফিসের বিগবস অতিষ্ট হয়ে ধু-গো কে চিটাগাং ট্রান্সফার করে দিলো।
চিটাগাং অফিসে যাওয়ার পরপর ওখানে বিশাল হৈ-হল্লা পড়ে গেলো। হেড অফিস থেকে সেই মহা বাজিগর চিটাগাং অফিসে জয়েন করেছে।
চিটাগাং অফিসের বস ধু-গো’কে রুমে ডাকলো, “আচ্ছা, ধু-গো আপনি নাকি বাজি ধরেন আর জিতেন, সত্য নাকি?”
ধু-গো মিটিমিটি হাসে, বিনয়ী হয়ে বলে “জ্বী স্যার”।
বস্‌ এবার আগ্রহ নিয়ে বলে, “দেখি আমার সঙ্গে ধরেন তো একটা বাজী।“
ধু-গো বলে, “বাদ্দেন স্যার, পারবেন না”।
বস বলে, “আরে না, ধরেন – অসুবিধা কী?”
ধু-গো রাজী হলো, ৫০০ টাকার বাজী, বললো – “স্যার আপনার দুই পায়ের তালুতে মোট ১৫টা তিল আছে”।
বস এবার হা হা করে হাসে। বলে, “ধুর কী বলেন? ৫০০ টাকা তো হারালেন!”
ধু-গো হাল ছাড়ে না, বলে – “স্যার আমি শিউর – ১৫টা তিল আছে, আপনি জুতা মোজা খোলেন”।
বস জুতা মোজা খুললো। দেখা যায় কোনো তিল নাই।
সবাই হাত তালি দেয়। ধু-গো পকেট থেকে ৫০০ টাকা বের করে বসের হাতে তুলে দেয়।

খানিক পরে ঢাকা অফিস থেকে ফোন।
ঢাকা অফিসের বিগ বস করেছে চিটাগাং অফিসের বসের কাছে, “হ্যালো, আপনার ওখানে ধু-গো জয়েন করেছে? আজই তো যাওয়ার কথা।“
চিটাগাং অফিসের বস হো হো করে হাসে, “হ্যাঁ হ্যাঁ জয়েন করেছে, তবে বেচারা বাজীতে ৫০০ টাকা হেরে মন খারাপ করে বসে আছে, হে হে হে”
“কী বলেন, কী হয়েছে?” ঢাকা অফিসের বসের প্রশ্ন।
“আর বলবেন না, আমার দুই পায়ের তালুতে নাকি ১৫টা তিল আছে, এই বাজী ধরে ৫০০ টাকা হেরে এখন চুপচাপ ডেস্কে বসে আছে”।
ঢাকা অফিসের বস হাহাকার করে ওঠেন, “হায় হায় এটা কী হলো? সর্বনাশ!”
চিটাগাং এর বস জিজ্ঞেস করেন, “কেনো স্যার, কী হয়েছে?”
ঢাকার বস বলেন “আর বলবেন না, ধু-গো ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে বাজী ধরে গেছে, চিটাগাং অফিসে গিয়ে ৩০ মিনিটের মধ্যে আপনার দুই পায়ের জুতা মোজা খুলিয়ে ছাড়বে, ৫০০০ টাকার বাজী ছিলো, আমি তো হেরে গেলাম!”
“এঁ!” চিটাগাং এর বস থ মেরে থাকে।

তো এই হলো ধুসর গোধুলী।
রুমার বলা এই গল্পটা সত্যও হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে। তবে এ কথা ১০০ ভাগ সত্য – আজ ধু-গো’র জন্মদিন।
এমন শুভদিনে জা-কা-জা এবং সমগ্র সচলসঙ্গীর পক্ষ থেকে ধুগো’কে সীমাহীন শুভকামনা। শুভ জন্মদিন।
_
বিঃদ্রঃ – রুমা কে – জানতে হলে আজ থেকে ২ বছর আগের এই দিনের পোস্টে চোখ বোলাতে হবে।

Read more...

04 August, 2009

বন্ধু

অগাস্ট এসে গেলো।

"যত দূরে-দূরে যাবে বন্ধু
একই যন্ত্রণা পাবে
একই ব্যথা ডেকে যাবে
নেভা নেভা আলো যতোবার জ্বালো
ঝড়ো হাওয়া লেগে তার শিখা নিভে যাবে"


পুরনো কথা। আবারো বন্ধুত্বের দিবসীয় আনুষ্ঠানিকতা। কে কবে বলে কয়ে বন্ধু হতে পেরেছিলো - এফ্ল্যুয়েন্ট সাইবার সোসাইটি কি জানে?

বরং এবার নতুন করে একলব্য শুনি -

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

_
সঞ্জীব চৌধুরীর হাতের পরশ -
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

_
এবং সামিনা চৌধূরীর - বন্ধু তোমার পথের মাঝে-
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

.

Read more...

01 August, 2009

পোস্টারায়তন: ওরা ৩ জন যৌবনমুখী

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।
বাহারী কথার চমক।
ফ্রিডম টু চুজ।

এর মধ্যে সচলায়তনে চলছে -
পোস্টে পোস্টে পোস্টার্মারামারি।
___

গানের জগতে অন্যতম পরিচিত নাম ইবা রহমান। গান গেয়ে তিনি দর্শকদের হৃদয়ের কোটরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। গান গেয়ে তিনি জাপান-বাংলা কালচারাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড, ইন্দোবাংলা কালা মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সিজেএফবি অ্যাওয়ার্ড, বিবিএসএস অ্যাওয়ার্ড, কালাকার অ্যাওয়ার্ডসহ আরো অনেক সম্মাননা পেয়েছেন।

তার এই মিউজিক ভিড্যু এলবামটা এখনো দেখি নাই।
ইউট্যুবেও পাইলাম না কিছু।
কেউ কিনলে/পাইলে ইউট্যুবে তুলে দিবেন প্লিজ।
-
01- POSTAR FINAL

___

নোটঃ কোলাজের ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে নেয়া। লিংক এখন পাচ্ছি না।
.

Read more...

30 July, 2009

নিছক চিন্তাজট

Persuasion শব্দটিকে বলা হচ্ছে আগামীর বিজনেস চ্যানেল। ভোক্তা ও ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এতো বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ, তথ্যপ্রবাহের এতো বেশি যন্ত্রণা, রঙ এবং ছলনার এতো বেশি পলেস্তারা যে বিজ্ঞাপন সমাজের নাগরিক দল চিৎকার করে উঠছে আর বলছে - দ্যাটস এনাফ, 'উই আর লিভিং ইন এন ওভার কম্যুনিকেটেড সোসাইটি'। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে ছাপার মাধ্যমের সীমানা পেরিয়ে রেডিও-টিভি অথবা বিলবোর্ড সব হয়ে উঠেছে বিজ্ঞাপনের জমিন।
সকালের টুথব্রাশ কিংবা পেস্ট থেকে রাতের নিরোধক বিজ্ঞাপিত হচ্ছে ২৪/৭।
কিংবা ঘুমেও মুক্তি নেই - আপনি ঘুমাচ্ছেন রিলাক্সেন ১০০ মিলিগ্রামের সৌজন্যে।
সুমনের গান - 'ছলাৎছল ছলাৎছল ছলাৎছল - ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জল'।
এতো এতো গল্প - কালো মেয়ে ফর্সা বানানোর ফেয়ারনেস ক্রীম, ম্যান্দামারা পুরুষকে সুদর্শন বানানোর আফটার শেভ, শক্ত হাড্ডির বাচ্চা বানাতে ফুল ক্রীম মিল্ক, শেষ জীবনের ইনস্যুরেন্স - এইসব বিজ্ঞাপন গত দশকে বিগত হয়েছে। আর তাই এখন বলা হচ্ছে - মার্কেটিং চ্যানেলগুলো বড্ডো সেকেলে, ভোক্তার এতো সময় কই? টিভি বক্স মিথ্যেয় ভর্তি, ই-মেইলের পাশের বিজ্ঞাপন স্পাম পাঠাবে পরদিন। তাই - এই সময়ে ভোক্তার আচরণ পাল্টানোর কোনো ব্যবসায়িক চিন্তা হবে সবচেয়ে বড়ো বোকামি।
এখন মানুষকে পাঠাতে হবে মানুষের কাছে।
মানুষের মুখ দিয়ে বলাতে হবে - আপনার ইনস্যুরেন্স আছে তো?
হয়তো সকালের অফিসগামী বাসে পাশের সহযাত্রী আলাপ শুরু করবে কৌশলে, "আর বলবেন না বাজারের যা অবস্থা", তারপর জেনে নিবে আপনি কী খান, কী পরেন - আর অন্য কোনো ছলে আপনার মাথায় গেঁথে দেবে কোনো পণ্যের তথ্য, বিজ্ঞাপিত হবেন আপনি পথে ঘাটে কাজে।
মার্কেটিং ওয়ারফেয়ার। রাইজ এন্ড ট্রাউট ইনকর্পোরেশন।
মানুষের মগজে তুমুল যুদ্ধ খেলে যাচ্ছে বণিকদল। ডিফেন্সিভ অফেন্সিভ কৌশলে চলছে জায়গা দখল। বিজ্ঞাপন চ্যানেলের খলবলানিতে ভোক্তা যখন নিরিবিলি ব্যালকনি খোঁজে, তখন টোকা দেয় আকাশ বিজ্ঞাপন। রাস্তা ভর্তি মানুষ এক একটি পণ্যের ব্র্যান্ড এম্বাসাডার। কৌশলে চাপানো হবে পণ্যের তথ্য, হাওয়াই মিঠার মতো মাথা ব্যথার ক্যাপসুল।

তীব্র পরিমাণে বিরক্ত আছি কিছু লোকের ওপরে। ৫ জন মানুষের ফোন নম্বর, ই-ঠিকানা দিতে ৫ সপ্তাহ সময় নিলো, আর আমার রিপোর্ট পিঁছিয়ে পড়লো ৩য় বারের মতো ডেডলাইনে। এখন হাতে সময় ১৩ ঘন্টা, কাজ বাকী আছে যা তা লিখলে ২৫ পৃষ্ঠা (ধন্যবাদ - ডবল স্পেস, ফন্ট ১২, টাইমস নিউ রোমান), রেফারেন্স ঠিক করতে ৪ ঘন্টা। ধরে নিয়েছি - পারবো না। এরপরেও কিছু একটা হয়ে যাবে। কিছু একটা করে জমা দিতে হবে।
পারসুয়েশনের কথা বলছিলাম শুরুতে। ব্যাপারটিকে সামাজিক এবং দলগত প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে যতো দেখানো হয়, তার চেয়ে বেশি বোধ হয় ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে বেশি ব্যবহার দরকার। আমার উচিত ছিল ৩ সপ্তাহ আগে হাউকাউ করা, লোকগুলোকে বোঝানো - আমি ভদ্র না, আমাকে হেল্প না করলে আমি নাই। তাহলে আজ এই ১১তম ঘন্টায় বারোটা বাজার অপেক্ষা করতে হতো না।
আসলে ঠিক হাউকাউ না। অন্য কিছু দরকার ছিলো।
'দ্য বেস্ট ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজী ইজ দ্য কারেজ টু এটাক ইউরসেলফ'। কার্ল ভন ক্লজউইটস।

গত তিনমাসে ব্যাপক হারে সিনেমা দেখছি।
দ্বিতীয়বারের মতো দেখলাম উত্তম-সুচিত্রার 'পথে হলো দেরী'। ১৯৫৬ সালের ছবি।
ইন্টারনেটে অনেক ঘুরেও সুচিত্রার ভালো রেজ্যুলেশনের ছবি পেলাম না।
খবরে যা পেলাম তা কেবলই অসুস্থতার কথা।
'এমন মেয়ে কী করে বানালে ঈশ্বর!' সঞ্জীব চৌধুরী।
সুচিত্রাকে দিয়ে এখন কীসের বিজ্ঞাপন করানো যেতো ভাবছি। অথবা কী করানো যেতো না?
সম্ভবতঃ ২০০৭এ সুচিত্রা সেনের অসুস্থতার খবর টানা সংবাদ শিরোনাম হলে অর্কুটে লিখেছিলাম - 'ভালোবাসার ভালোলাগার সুচিত্রা সেন, ভালো থাকুন - সুস্থ থাকুন'।

বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল রাখার চেষ্টা করি ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের তালি এবং গালির দর্শকের কাতারে থাকি।
গত সপ্তায় অন্তর্জালে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে পত্রিকায় ছাপানো একটি বিজ্ঞাপন
এমন বিজ্ঞাপন গ্রহণে আমাদের ভোক্তা সমাজ এখনো মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়, নাকি আমাদের চিন্তাশীলতার-চৌবাচ্চারা কয়েক ধাপ এগিয়ে; সেটা ভাবছি, এবং ভাবছি।

ডেভ ক্যারল কানাডার শিল্পী।
গত বছর ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সে করে হ্যালিফেক্স থেকে নেব্রাস্কা যাচ্ছিলো। ক্রুদের গাফলতিতে তার গিটার ভেঙে গেছে। ক্ষতিপূরণ চেয়েও পায়নি। পরে গান গেয়েছে এ নিয়ে। ইউট্যুবে এই গান ব্যাপক জনপ্রিয়। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের টনক যখন নড়েছে তখন ক্যারলের অবস্থা চাঙ্গা। ক্ষতিপূরণ নেয়নি। গানটির জনপ্রিয়তার সাথে সাথে ইউনাইটেডের ব্যবসায় আঘাত কেমন আসে সেটাই এখন দেখবে দেখিয়ে-দল। ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে আরো বিস্তারিত।



I flew United Airlines on my way to Nebraska
The plane departed, Halifax, connecting in Chicago's "O'Hare".
While on the ground, a passenger said from the seat behind me,
"My God, they're throwing guitars out there"

The band and I exchanged a look, best described as terror
At the action on the tarmat, and knowing whose projectiles these would be
So before I left Chicago, I alerted three employees
Who showed complete indifference towards me

United...(United...)You broke my Taylor Guitar
United...(United...)Some big help you are

You broke it, you should fix it You're liable, just admit it
I should've flown with someone else, Or gone by car

'Cause United breaks guitars.
When we landed in Nebraska, I confirmed what I'd suspected
My Taylor'd been the victim of a vicious act of malice at O'Hare

So began a year long sagan, of "pass the buck", "don't ask me", and "I'm sorry, sir, your claim can go no where".
So to all the airlines people, from New York to New Deli
Including kind Ms. Irlweg, who says the final word from them is "no".

I heard all your excuses,
And I've chased your wild gooses
And this attitude of yours, I say, must go

United... (United...) You broke my Taylor Guitar
United... (United...) Some big help you are

You broke it, you should fix it
You're liable, just admit it
I should've flown with someone else
Or gone by car

'Cause United breaks guitars.
Well, I won't say that I'll never fly with you again,
'Cause, maybe, to save the world, I probably would,
But that won't likely happen,
And if it did, I wouldn't bring my luggage
'Cause you'd just go and break it,
Into a thousand pieces,
Just like you broke my heart

When United breaks guitars.

United... (United...)
You broke my Taylor Guitar
United... (United...)
Some big help you are

You broke it, you should fix it
You're liable, just admit it
I should've flown with someone else
Or gone by car

'Cause United breaks guitars.
Yeah, United breaks guitars.

বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড দেশিএমসির গান নিয়ে আগে লিখেছিলাম কোনো এক পোস্টে।
তাদের তারুণ্যের উদ্দামতা, আগুন, ক্ষোভ, চিৎকারে তারা কি পারে না সাড়া তুলতে?
চিৎকার করে এমেনেম থেকে ধার করা শব্দে গালি দিয়ে বলতে পারে না -
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, তোর বাবা জামাতি - তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব নাই!
কিংবা যানজট - ঘুষ - দুর্নীতির বিপক্ষে সাহসী আওয়াজ?

পারসুয়েশনটা ভোক্তার মগজেই দরকার।
আজ এবং এই মুহূর্তে।
.
.
.

Read more...

17 July, 2009

সকাল বেলার খিদে: কী আশায় বাঁধি খেলাঘর

এসবই তোমার সকাল বেলার খিদে, সন্ধ্যে বেলা যাবে ফুরিয়ে, দেখতে দেখতে আরো একটা দিন চলে যাবে – জীবন থেকে যাবে হারিয়ে: হ্যাঁ অঞ্জন দত্তের গান। সংবাদপত্রের নানান খবর – সঙ্গতি – অসঙ্গতি নিয়ে ব্লগে সকাল বেলার খিদে প্রথম লিখি দুই বছর আগে, দ্বিতীয় পর্ব লিখি তারও এক বছর পরে। আজ অনেকদিন পরে তৃতীয় বারের মতো সকাল বেলার খিদে সিরিজে লিখতে গিয়ে দেখি, বাংলা সংবাদপত্র এখন আর সকাল বেলার খিদে নেই, অনেকটা বিকেলের নাশতা হয়ে গেছে। উত্তর আমেরিকা আসার পর থেকে - দুপুরের খাবারের পর থেকে মন উসখুশ করে, কখন ওয়েবে বাংলা পত্রিকা আপডেট হবে – তার অপেক্ষা। চায়ের তৃষ্ণার মতো ভীষণ তীব্র এ অপেক্ষা !

কোনটা খবর হবে আর কোনটা হবে না – এ নিয়ে তর্কের শেষ নেই। গত সপ্তায় একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদক কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন, আমেরিকার এক হাসপাতালে কন্যার জন্ম হয়েছে। এমন সময়ে স্ত্রী-কন্যার পাশে তিনি থাকতে পারেননি। দেশে বসে তিনি খবরটি শিরোনাম করেছেন তার পত্রিকার প্রথম পাতায়। দোয়া চেয়েছেন পাঠকের কাছে। তবে পাঠক বড়ো বেশি দুষ্টু। পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে খবরের সাথে মন্তব্য যোগ করার জায়গায় ইচ্ছেমতো ঝেড়ে এসেছে দলে দলে। পরদিন সম্পাদক অন্য কোনো বিবৃতি দিয়েছিলেন কিনা জানার সুযোগ হয়নি।
থাক, সে প্রসঙ্গ থাক।
আগের সংবাদ অনেকটা বাসী টোস্ট বিস্কুটের মতো অখাদ্য মনে হতে পারে। বরং আজ শুরুতেই রূপচানের খবরটির দিকে তাকাই। মনে হয় এ যেনো রূপকথার রূপচান। বেঙ্গল প্যাসিফিক প্রাইভেট লিমিটেডের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বৃষ্টিভেজা দিনে রিক্সা করে নীলক্ষেত নামার সময় আড়াই লাখ টাকার প্যাকেট ভুলে ফেলে যায়। এত টাকা হারানোর পরেও তার অফিসের এমডি তাকে বরখাস্ত করেনি, বরং “তিনি জাহাঙ্গীরকে দুশ্চিন্তা না করে অফিসে যেতে বলেন। ঝামেলা এড়াতে থানা পুলিশও করতে রাজি হননি তিনি।” এই আড়াই লাখ টাকা কুড়িয়ে পেয়েছিলো রিক্সাচালক রূপচান। এতো টাকা পেয়েও সে লোভে পড়েনি। সোজা গেছে থানায়। থানার লোকজনও এতো টাকা পেয়ে বেহাত করার কুচিন্তা মাথায় আনেনি। খবর দিয়েছে টিভি চ্যানেলে। সেই খবর দেখে টাকার আসল মালিক থানায় যোগাযোগ করেছে। আসল মালিক টাকা পেয়ে রূপচানকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে পুরষ্কার, আর সাথে পুলিশ কমিশনার দিয়েছে আরো ৫ হাজার।

৫৫ হাজার টাকা রূপচানের জীবন পালটে না দিলেও কিছুটা স্বচ্ছলতা দেবে, এমনটাই আশা রাখি। ওদিকে টেলিফোনে মিছে প্রেমের অভিনয় করে জনৈক শাহীনকে প্রতিপক্ষ ডাকাত দলের হাতে তুলে দিয়ে অপহরণের মামলায় আঁটক হয়েছে – ইয়াসমিন। পুলিসকে ইয়াসমিন বলেছে ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে সে টেলিফোনে শাহীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিলো। কিন্তু চরমপন্থী সালাম ডাকাত গ্রুপ তাকে কোনো টাকা তো দেয়ইনি, উলটা সে এখন পুলিসের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি। শাহীনকে উদ্ধার করা হয়েছে পাবনা থেকে।
পরিস্থিতি আসলেই ব্যাপক চিন্তার। অনামিকা-নীলাঞ্জনাদের ফোনকল মিসকলে রাত বারোটার পরে ২৫ পয়সা মিনিটের কলে এখন সতর্ক থাকতে হবে!

বাজার পরিস্থিতিও খারাপের দিকে। বাড়ছে পানির দামগ্যাসের দাম
কাঁচা মরিচের ঝাল বেড়ে গেছে মারাত্মক। প্রতি কেজির দাম দু’শ টাকা। আগামী কয়েক সপ্তায় জিনিশপত্রের দাম আরো বাড়বে নিশ্চয়। কারণ আর কিছু নয় – অশেষ নেকী হাসিলের সঙ্গে সঙ্গে বরকতময় মুনাফা লাভের মাস রমজান আসতে আর দেরী নেই। পাঁচতারার ঝলমলে ইফতার পার্টিও চলবে নিশ্চয়। ইফতার পার্টির নামে লুটপাটে ফেঁসে যাচ্ছে ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার। খবরে প্রকাশ - এক ইফতার পার্টিতেই ২ হাজার ২০০ জনের আয়োজন করে বিল তোলা হয় ৩ হাজার ৯৯১ জনের। ইফতার বাবদ বিল দেওয়া হয় ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা।

আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে খেলতে নামছে বাংলাদেশ। আশার কমতি নেই। সঙ্গে যোগ হচ্ছে নানান অত্যাশা। আশরাফুলের ৫০ তম টেস্ট, সাকিবের প্রথম টেস্ট অধিনায়কত্ব, আর মাশরাফি বলছে – ‘আমাদেরই সিরিজ জেতা উচিত’। ওদিকে এক জনমত জরিপে ৭৪ভাগ পাঠক বলছে – বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বর্তমান সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে না। তবুও শুভকামনা - বাংলাদেশ।

শুরুতে রূপচানের খবরে যতোটা বিমোহিত হলাম, তার চেয়ে বেশি আক্রান্ত হলাম মধ্যযুগীয় আরেক বিচার ব্যবস্থায়। মোবাইল চুরির অভিযোগে ১৫ বছর বয়েসী মিরু বেপারীর শাস্তি কার্যকর হয়েছে। খুব সাদামাটা শাস্তি – দুটি চোখ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর নগদ জরিমানা ৩০ হাজার টাকা। প্রথম আলোর রিপোর্টে ফরিদপুর থেকে অজয় দাশ জানাচ্ছে – সমাজপতিদের এ রায় কার্যকর করার দায়িত্ব ছিলো মিরু বেপারীর বাবা সুলতান বেপারীর হাতে। নয়তো বাবা-ছেলে দুজনেরই চোখ তুলে নেয়ার হুমকি ছিলো।

বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে শালিসী ব্যবস্থা কতোটুকু আইনসিদ্ধ কিংবা বৈধ – সে ব্যাপারে আমি জানতে ইচ্ছুক। কোনো সচল জেনে থাকলে – জানাবেন দয়া করে...।
---

প্রতিদিন পত্রিকায় ভেতর পাতা বাহির পাতা পড়ার সময় একটি খবরে চোখ বুলাই। প্রসঙ্গঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। হিমু ভাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে মাস ভিত্তিক ক্যালেন্ডার করছিলেন। অনেকদিন পত্রিকায় এ প্রসঙ্গে কোনো খবর চোখে পড়ে না। সরকারও চুপ হয়ে গেছে। তবে আজ দৈনিক আমাদের সময়ে চোখ আঁটকালো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যহত থাকলে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ তার প্রতিবাদের রাস্তায় নামবে – এমন হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মূসলিম সংগঠন মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা (মূনা)। এ খবর গত পরশু ছাপিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোর অন্যতম ওয়াশিংটন টাইমস। সাংবাদিক চেসি ফ্লেমিং লিখিত ‘বাংলাদেশ প্রোবস টার্গেটস ৭১ ফোজ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে মুনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে এলেই কংগ্রেসের সদস্য এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট/হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করে থাকে এই সংগঠনটি।


মূনার কার্যক্রম আর বিচার প্রক্রিয়ার স্থবিরতা দেখে দীর্ঘশ্বাসই ফেলতে হচ্ছে...।

Read more...

09 July, 2009

আধখানা মানুষ

মনে হচ্ছে এ যেনো স্বর্গ থেকে পতন। আহ! কী শান্তিতেই না ছিলাম এই দুই মাস...। কাজের চাপ ছিলো অফিসে, চিন্তা ছিলো হালকা, কিন্তু আগের ৮ মাসের মতো যন্ত্রণা ছিলো না। কোর্সওয়ার্ক শেষ হওয়ার পরে যেটা ভালো লাগলো বেশি তা হলো একগাদা মেইল থেকে মুক্তি। ৫ কোর্সের ৫টা টীম, ৫টা মাস্টার আর ক্যারিয়ার সেন্টারের মেইল। সঙ্গে ছিলো - টিএ শীপের কাজ, তার মেইল। হাঁফিয়ে উঠেছিলাম।
এ জন্যই ভীষণ আরামের মনে হলো - গত মে-জুন।
আহ, নায়াগ্রা ফলস, আহ!
আহ, উইন্ডজর ট্রিপ, আহ!
কী করে ভুলি এইসব দিন। ঝামেলাহীন এমন সোনালী সময়, কেনো এমন পলকেই চলে যায়!

গত দু'মাসে মুভি দেখছি হাফ ডজন।
বই পড়েছি এক ডজন। এখন হাতে আছে আগুন পাখি, লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা, হোয়াট গুগল উড ডু, দ্য লং টেইল, দ্য কাইট রানার, কালো বরফ, মাটির জাহাজ। এর বাইরে দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট সম্ভবত ধরতে পারবো না।
জীবন খুব ছোটো।
খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়। পড়ছিলাম ধীরাজ ভট্টাচার্যের 'যখন পুলিস ছিলাম'। টেকনাফের মাথিনের কুপের ধীরাজ। তার আরেকটা বই 'যখন নায়ক ছিলাম'। কতো আগের লেখা, কিন্তু মারাত্মক স্বাদু গদ্য। পড়া হলো না ওসব।
গতকাল মনজুরের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিলো, বিষয় - আবার যদি আঠারো বয়সে ফিরে যেতে পারতাম!
হায়, ঈশ্বর - 'কে হায় প্রায়শ্চিত্তের পেয়ে গেলো অবসর, আমার তো পাপ করবার সময়টুকুও নেই!' কার লেখা? আনন্দ নারায়ন মুল্লা?

অবস্থা যেই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে টেনশনে হা হুতাশ করার কথা।
এরপরেও দাঁতে দাঁত চিপে আছি।
হাতে সময় ৬ দিন।
এখনো মেজর রিসার্চ পেপারের ৫০ ভাগ কাজ বাকী।
অফিসের জিম-ক্রিস্টিন বলছে ডোনার সার্ভে হয়ে যাবে। কিন্তু আমি লিখবো কখন?
এইসব তুমুল চাপে মাথায় আসে গল্প উপন্যাসের প্লট। মাথাটা কিরকির করে যন্ত্রণা দেয়। কাজের চাপ কমলে গল্পেরা মারা যায়। ফেসবুক ডিএক্টিভেট করেছি ১ মাসের জন্য। তবুও কাজ আগালো না। শরীরের ওজন না বেড়েও যেমন মুখের আয়তন বাড়ে...

ইয়াহু একাউন্টে এখন কেউ তেমন মেইল করে না। প্রথম পাতায় ইনবক্সে ২০০ মেইল দেখায়। ওখানে ২০০৭ সালের মেইল পর্যন্ত আছে। কিন্তু ২০০৬-২০০৫ সালের দিকে এক মাসেই ২০০'এর মতো মেইল পেতাম ইয়াহুতে। আজ হঠাৎ কী জানি মনে হলো ভাবলাম আগের বছরগুলোয় জুলাই মাসে পাওয়া মেইলগুলো পড়ি। পড়লাম বেশ কিছু।
আমার ধারণা ভুল ছিলো।
সব কিছু মনে থাকে না। কতো কিছুই ভুলে যাই।
অন্যরকম ভালো লাগলো, চেষ্টা না করেই কতো সহজেই ভুলে গেলাম কতো কিছু!
...কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?হায় চিল, সোনালী ডানার চিল...

ইয়্যুটিউবে ঘুরছিলাম।
সুমেধা কারমাহির প্রতি দীর্ঘদিনের জমে থাকা মোহ এবার কি আসমা মোহাম্মদ রাফি কাটিয়ে দেবে?
ভেবে দেখলাম, উত্তরটা সম্ভবত - 'হ্যাঁ'।
_

_

Read more...

01 July, 2009

তুমি না থাকলে...

২০০৭ সালের ১৬ আগস্ট আমার কাছে ভীষণ মন খারাপের সকাল। আমার সে সময়কার অফিস দীর্ঘদিন ম্যানেজারহীন হয়ে থাকার পরে আমাদের কলিগদের মাঝে যে ‘টীম ওয়ার্ক’ গড়ে ওঠেছিলো তা ‘শ্যাষ’ হয়ে যাবে সেদিন। শুনেছি ইউএনডিপি-তে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে নেপাল থেকে আসছে নতুন ম্যানেজার। তাই আমরা অনুমান করে নিই - রুমের এক কোণায় একজন বয়স্ক ম্যানেজার বসে থাকবে। আর হৈ-হল্লা করা যাবে না, কাগজের প্লেন বানিয়ে এদিকে ওদিকে ছোড়া যাবে না। সবাই বিকল্প খুঁজতে গেলো – খবর পাওয়া গেলো - নতুন ভবনের সাত তলায় একটা খালি ছাঁদ-মতো আছে, সেখানে কারা কারা নাকি লাঞ্চের পরে সিগারেট খায়, আড্ডা দেয়। সিদ্ধান্ত হলো - আমরাও সেখানে চলে যাবো কাজের ফাঁকে।

কিন্তু, আমার মন খারাপ অন্য কারণে...
এতোদিন এই অফিসে কাজের ফাঁকে আমার নিত্য অকাজ, কিংবা কাজ না থাকলেও আমার যে তুমুল ব্যস্ততা তা আর কিছু নয় – সচলায়তন এবং জি-টক। কতো কতোদিন ঘন্টার পর ঘন্টা কতো পোস্ট পড়ে গেছি, কমেন্ট করে গেছি তার হিসেব নেই। বাসায় ইন্টারনেট ছিলো না একসময়, ব্লগে চোখ রেখে খেয়ালই করিনি বাইরে রাত হয়ে গেছে। এমন সব তুমুল অভ্যাস কী করে ছাড়ি কোথাকার কোন এক পাপিষ্ঠ ম্যানেজারের আগমনে?

প্রথম সপ্তাহ অনেক কষ্টে গেলো। নতুন ম্যানেজার মিটিং এর পরে মিটিং ডাকে। আমি প্রায়ই অন্যমনষ্ক হয়ে যাই – সচলে নতুন কী পোস্ট এলো, জি-টকে কে নক করলো – এসব ভেবে ভেবে। কাজের ফাঁকে সচলে উঁকি দিই, জি-টকে একে ওকে গুতাই – কেবল ভয়ে থাকি কখন না আবার ধরা পড়ি! ধরা অবশ্য পড়তেই হলো – আরও দিন কয়েক পর। জি-টক মিনিমাইজ করার পরে ম্যানেজার দুম করে জিজ্ঞেস করে – ‘ওটা কী লুকালা?’
আমি বলি- ‘কোথায় কী?’
ম্যানেজার মাথা নাড়ে – ‘না, আমি প্রায়ই দেখি – আমি এদিকে আসলে তুমি মনিটরে হুটহাট কী জানি করে ফেলো।’
আর চালাকি করা ঠিক হবে না ভেবে জি-টক দেখালাম। ম্যানেজার তখনো ইয়াহু এমএসএনে অভ্যস্ত। অফিসে ওগুলা ব্লকড। সুতরাং তাকে জি-টক শেখালাম। সেও মহাখুশী। আমি প্রায়ই দেখি – জিটকে আমার চেয়েও বেশি ব্যস্ত সে হাসি

এর পরের সপ্তায় আমাকে ধরলো সচলায়তনের পৃষ্ঠা খোলা দেখে।
‘এটা কী?’
আমরা তখন জি-টকে জি-টকে মাসতুতো ভাই হয়ে গেছি। ওকে বোঝালাম এটা একটা রাইটার্স কম্যুনিটি। কম্যুনিটি ব্লগ সাইট নিয়ে জ্ঞান দিলাম। তার ব্যাপক উৎসাহ। বললাম, তুমি চাইলে ব্লগস্পটে নিজের একটা সাইট খুলতে পারো। টুকটাক হেল্প করলাম। দ্বিতীয় দিনেই সে নিজের একটা ব্লগস্পট সাজিয়ে নিলো, এবং আমাকে এও বললো – এটা তার ডায়েরী, কেবল নিজের জন্য, অন্য কারো এক্সেস টেকনিক্যালি ব্লক করা আছে। আমি হাসি।

তবে চমক দেখলাম আরো তিনদিন পরে।
তার ভার্সিটির এলামনাই এসোসিয়েশনের জন্য সে গ্রুপ ব্লগ খুলেছে ব্লগস্পটে, সেখান থেকেই আপডেট হবে সব একটিভিটিজ! একটা নতুন গেজেট যোগ করে, আর আমাকে ডেকে বলে – ‘দেখে যাও এটা কেমন হলো।’
বিকেল হলে আমাকে জিজ্ঞেস করে – ‘আজ ব্লগে কমেন্ট কয়টা করলা?’

মাস ছয়েক পরে ঐ বস অন্য চাকরীতে চলে যায়।
শেষ দিন আমি বলি – ‘ব্লগিং ছেড়ো না’।
সে হাসে।
গত অক্টোবরের দিকে মেইল পেলাম। আমাকে লিখেছে – ‘আশা করছি ভালো আছো। আমার ব্লগের একটি লেখা নেপালের দৈনিক কান্তিপুরে ছাপা হয়েছে। লিংকটা দেখো। ব্লগিং শেখানোর জন্য থ্যাঙ্কস!’

-দুই-
বলা হয় সব শহরের একটি প্রতীক আছে।
লন্ডনের ঘড়ি, ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, চীনের প্রাচীর – আরো কতো কী...
কিন্তু, আমার কাছে এখন অনেক দেশ মানেই সেখানকার সচল।
অস্ট্রেলিয়া মানে কনফু-তিথি।
জার্মানী মানে – হিমু, বদ্দা, ধু-গো।
জাপান মানে – সৌরভ, জ্বিনের বাদশা।
নেদারল্যান্ড মানে –তানবীরা তালুকদার। আগে ছিলো - রুট গুলিট হাসি
স্কটল্যান্ড মানেই – হাসান মোরশেদ।
আরিজোনা মানে – এস এম মাহবুব মুর্শেদ।
তাইওয়ান মানে – মামুন হক।
সিঙ্গাপুর মানে – ফারুক হাসান।
আলাবামা মানেই –দ্রোহী।

আর কতো বলি?
শুধু কি জায়গার নাম? কতো শব্দের অর্থই তো বদলে গেছে অথবা একেবারে নতুন শব্দ –

ঠিকাছে।
উত্তম জাঝা।
বিপ্লব।
চ্রম খ্রাপ।
সেইরম।
হ।
ঞঁ!

-তিন-
উইন্ডজর সফর নিয়ে তিন তিনটি পোস্ট এসেছে এর আগে। যে কথা বলা হয়নি –

এই সফরে এই প্রথমবারের মতো বাকী ৪ জনকে দেখেছেন প্রকৃতিপ্রেমিক।
এই সফরে এই প্রথমবারের মতো বাকী ৪ জনকে দেখেছেন বিপ্র।
আমি-অমিত আর কিংকুর দেখা হয়েছে আগে। আমরা তিনজন এই প্রথম বারের মতো দেখেছি – প্র-প্রেমিক ও বিপ্রকে।
কিন্তু, যে দুইদিন উইন্ডজরে ছিলাম, ৫/৬ ঘন্টার ঘুম ছাড়া বিরতিহীন যে আড্ডা চলেছে – সেখানে একটিবারও মনে হয়নি আমাদের ৫ জনের এই প্রথম আড্ডা। মনেই হয়নি, আমাদের আগে কখনো দেখা হয়নি।
আমাদের আড্ডায় কথা বলার বিষয়ের কমতি ছিলো না।
আমাদের স্মৃতিচারণ ছিলো ব্যাপক।
আমাদের আগামীর কথা ছিলো আরও বেশি।

শেষে যখন বাসে উঠি মনে হয় – আরো কত্তো কথাই না বলা রয়ে গেলো...
বাসে ওঠার আগ মুহুর্তে আরেকবার ছুঁয়ে যাই মানুষগুলোর হাত, তখন মনে হয় এ-তো হাজার বছরের স্বজন, আমাদের পরিচয় উইন্ডজরে নয় – পিলী আইল্যান্ড বা ইরি নদীর উপরে দুলুনি দেয়া জীম্যান জাহাজে নয়, আমরা এমন করেই কাছাকাছি ছিলাম, আছি – আমাদেরই ঘরে...
আমাদের সে ঘরের নাম – সচলায়তন।
না দেখেও আমরা ভাই-বন্ধু-স্বজন, আত্মার আত্মীয়...।

-চার-

আজ হিমু ভাইয়ের পোস্টের ছবি দেখে – আরেকটা ছবি দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।
২০০৮ সালের, ২৭ মার্চ বৃহস্পতিবার – থাইল্যান্ডের কো-সামেট আইল্যান্ডে ।এভাবেই – সচলায়তন থাকে আমাদের সঙ্গে।
আমরাও সচলায়তনের... ।

জয়তু সচলায়তন!!!

Read more...

22 June, 2009

আনোয়ারা সৈয়দ হকের 'মোবাইল সমাচার'

আনোয়ারা সৈয়দ হক সম্ভবতঃ পেশা পরিচয়ে ‘মনোবিজ্ঞানী’ লেখেন। তাঁর কিছু উপন্যাসকেও ‘মনোবিশ্লেষণধর্মী’ উপন্যাস বলা হয়। আমার কাছে আনোয়ারা সৈয়দ হক অন্য কারণে মনে রাখার মতো নাম। প্রথমতঃ ১৯৯৩/৯৪ সালে ‘শিশু’ পত্রিকায় তাঁর লেখা দূর্দান্ত একটি গল্প পড়ি। গল্পের নাম ঠিক মনে পড়ছে না, তবে কাহিনী এরকম – এক মুক্তিযোদ্ধার ছেলের আত্মকথন। তার বাবার মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আর ফিরেনি। সে যখন বড় হয় তখন এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতাপ। সামাজিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারটিকে হেনস্তা করা হয়। জায়গা জমি দখল করে দেয় রাজাকাররা। এরপরে মুক্তিযোদ্ধার কিশোর ছেলেটি ক্রমান্বয়ে পালটে যেতে থাকে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নদীর ঘাঁটে রাখা নৌকায় শুয়ে মাসুদ রানা পড়ে সে। আই লাভ ইউ লেখা লাল গেঞ্জি পরে; এরকম। গল্পটির প্লট আমাকে আক্রান্ত করেছিলো, বিষণ্নতা জাগিয়েছিলো। তাই মনে পড়ে প্রায়ই।

দ্বিতীয়তঃ আনোয়ারা সৈয়দ হকের একটি বই, ‘তুমি এখন বড় হচ্ছো’ খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম। কিশোর বয়সের শরীর ও মন নিয়ে জেগে ওঠা রহস্যময়তার সরল বিশ্লেষণ ছিলো সে বই। গল্পে গল্পে জানলাম অনেক কিছু। এরপর থেকে আনোয়ারা সৈয়দ হক নাম দেখলেই আমার এ দুটো ব্যাপার মাথায় আসে। পত্র-পত্রিকায় বিক্ষিপ্তভাবে তাঁর কলাম পড়েছি। তিনি নারী প্রগতির কথা লেখেন, ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে লেখেন, মানুষের মন ও মনের ভেতর নিয়ে লেখেন। তবে আজ চমকালাম ‘সাপ্তাহিক২০০০’ চলতি সংখ্যায় তাঁর কলাম ‘মোবাইল সমাচার’ পড়ে।

কলামের একেবারে প্রথম কথাগুলো – ‘মোবাইল ফোন আমাদের দেশে একটি অসভ্য সংস্কৃতির ধারা বহন করে ফিরছে বিগত এক দশক। দিনে দিনে এই অসভ্যতা বাড়ছে, বেড়েই চলেছে, এর যেন কোনও আর থামাথামি নেই। মোবাইল ফোন আমাদের দেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক আব্রম্ন নষ্ট করেছে। এবং করেই চলেছে।’

সাপ্তাহিক২০০০ এর ফন্টে সমস্যা আছে, তাই ‘আব্রম্ন’ কী বোঝলাম না। ধারণা করে নিচ্ছি – তিনি বলতে চেয়েছেন মোবাইল ফোন আমাদের দেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক শৃঙ্ক্ষলা/অবস্থান/ব্যালান্স/আবহ কিংবা এরকমই কিছু একটা নষ্ট করছে। এবং করেই চলেছে।

এরকম অভিযোগ নতুন নয়। মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং নানান দিক নিয়ে সুতর্ক-কুতর্ক পুরনো, যার চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। বরং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবার ব্যাখ্যা আছে। তবে, আনোয়ারা সৈয়দ হক মনোবিজ্ঞানী বলেই তাঁর কথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হয়। সাড়ে সাতশ’ শব্দের এ কলামে তার মূল কথা এরকম –
১) মানুষ এখন সময়ে অসময়ে ফোন করে। সময়জ্ঞান কমে যাচ্ছে।
২) ‘মোবাইল ফোন পুরো বাঙালি জাতিকে ইমপাল্‌সিভ একটি জাতিতে পরিণত করেছে। শুধু ইমপাল্‌সিভ নয়, প্যারানয়েডও।‘
৩) সিনিয়র-জুনিয়রের সম্পর্ক নষ্ট করছে মোবাইল ফোন। ‘একজন চ্যাংড়া মোবাইলধারী এখন বৃদ্ধ একজনকে রাত বারোটায় ঘুম থেকে জাগিয়ে সামান্য একটি সংবাদ জানায়, অর্থাৎ দিন হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করতে পারে না।‘
৪) কর্মক্ষেত্র এবং অন্যান্য জায়গা অহেতূক ব্যক্তিগত মোবাইল আলাপে ভরে যাচ্ছে।
৫) কিশোর কিশোরীরা ঋণাত্বকভাবে মোবাইল ফোনে বন্ধু-পরিবার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত সময় কিংবা স্বাধীনতা আর থাকছে না।

মোটের ওপর এই হলো আনোয়ারা সৈয়দ হকের অভিযোগের কিংবা সমাচারের সারমর্ম।

অবাক হলাম, মোবাইল ফোন ব্যবহারের এইসব বিপ্রতীপ বিষয়গুলো সমাধান বা নিয়ন্ত্রণের উপায়ে না গিয়ে তিনি দোষটা মোবাইল ফোনের উপরেই চাপিয়েছেন। সেইসব পুরনো অভিযোগ মনে পড়ে যায়, যখন বলা হতো – কম্পিউটারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে, ১০ জনের কাজ একজন করে ফেলবে, দেশে বেকার সমস্যা দেখা দেবে। কিংবা ইন্টারনেট এলে দেশের সব তথ্য বাইরে পাচার হয়ে যাবে। এসব যুক্তি হাস্যকর হতে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, আনোয়ারা সৈয়দ হক এগুলো জানেন বলেই অনুমান করছি। অন্ততঃ নিজেকে যতোটা বিজ্ঞানমনষ্ক এবং প্রগতিশীল বলে লেখায় ছাপ ফেলতে চান, তাতে করে তাঁর এসব জানার কথা। এজন্যই বেশি চমকাই, যখন দেখি লেখার উপসংহারে তিনি বলেন -

তবে শেষ কথা হচ্ছে এখন মোবাইলের যুগ। প্রতিটি মানুষের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াই এখন বিশ্ব বাজারের লক্ষ্য। তবে এই যুগ থাকবে না। মানুষ অচিরেই এই মোবাইল সংস্কৃতি পরিত্যাগ করবে। মানুষের মন ও আত্মাকে কোনওদিন কোনও মেশিন সন্তুষ্ট রাখতে পারবে না দীর্ঘদিন। এটা আমার বিশ্বাস।


আনোয়ারা সৈয়দ হকের বিশ্বাস কতোটুকু সত্যি হবে, মানুষ মোবাইল সংস্কৃতি পরিত্যাগ করবে নাকি এ সংস্কৃতির ধারা বিবর্তিত হবে; সেসব সময়ই বলে দেবে। তবে আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে পাঠক হিসেবে আমার একটি অন্যরকম চাওয়া আছে। তাঁর অবস্থান, বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য এবং যোগ্যতা বলেই তিনি কাজটি করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বুদবুদ যুগে একদল বিভ্রান্ত কিশোর-তরুণদল নষ্ট এক খেলায় মেতে উঠেছে। প্রেমিকা-বান্ধবী অথবা অন্যকারো ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্ত মোবাইলে রেকর্ড করে ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা মাধ্যমে। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এর প্রধান ভিক্টিম হচ্ছে কিশোরী কিংবা তরুণীটি। ক্ষেত্র বিশেষে পুরুষটিও। আনোয়ারা সৈয়দ হক কি এই প্রবণতা কিংবা চর্চাটি নিয়ে লিখবেন? এসব ঘটনায় আক্রান্ত কিংবা সম্ভাব্য আক্রান্তদের মানসিক বিপর্যয়ের ব্যাপারটি নিয়ে তিনি কি কলাম কিংবা গল্প অথবা উপন্যাস লিখবেন, আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াবেন?

খ্যাতনামা মনোবিশ্লেষক আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে এ চাওয়াটি খুব বেশি হবে কি!

.
.
.

Read more...

19 June, 2009

পারমিতার একদিন : সম্পর্ক এবং আশ্রয়হীনতার ছবি

একই ঘর এবং সংসারে বাস করেও মানুষ দিন শেষে নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। যখন আয়নায় মুখোমুখি তাকিয়ে কেবল নিজের সঙ্গেই কথা বলা লাগে। মনে হয় – এর বাইরেও অন্য কোথাও সঙ্গোপন টানাপড়েন রয়ে গেছে। অঞ্জন দত্তের গানে যেমন, ‘চারটে দেয়াল মানে নয়তো ঘর, নিজের ঘরে অনেক মানুষ পর’। তেমন করেই, নিজের ঘরে পর হয়ে ওঠা মানুষগুলো তাই ক্রমশঃ আশ্রয় খোঁজে অন্য কোথাও।

শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে, মেল শভিনিস্ট স্বামী কিংবা মাতাল সন্তান নিয়ে পারমিতার শাশুড়ী যেমন আশ্রয় খোঁজে, আরো অতীত – আরো গোপন অথচ ভালোবাসার মানুষটির কাছে। জীবনের পৌঁণিক প্রান্তে এসে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না, তাই প্রশ্নহীন উত্তরহীন থাকে সম্পর্কের ধরণ। নিজের এই ব্যক্তিগত দূর্বলতাই হয়তো শাশুড়ীকে বৌয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসে, অথবা দুজনেরই শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানের কারণে কোথাও মিল খুঁজে পায় দুজনে। কিন্তু, নিজের ঘরে পর হয়ে যাওয়া দুজন আসলেই কি সমান্তরাল জীবনে চলতে পারে? কিংবা চললেই বা কতোটুকু? ‘পারমিতার একদিন’ দেখতে গিয়ে এ প্রশ্নই বারবার জেগে উঠেছে। উত্তর জানার চেষ্টা ছিলো - পারমিতার স্মৃতিমন্থনে।

একটি শোকের বাড়িতে পারমিতার আগমন, চারপাশের জটিল মানুষের ফিসফাস, হুট করে অতীত এবং আবার বর্তমান; এভাবেই ছবি এগিয়েছে। সরলরৈখিকভাবে ভাবলে – তেমন চমকের কিছু নেই। কিন্তু, অতীত বর্তমানের মিশ্রণে দর্শককে অপেক্ষা করতে হয়েছে, কখনো দীর্ঘশ্বাসে – কখনো আশায়। পারমিতার দ্বিতীয় জীবনে পা রাখার পেছনের ঘটনা জানার আগ্রহই ছিলো অপেক্ষার মূল বিন্দু। প্রথম জীবনের সঙ্গে সম্পর্কছিন্নের গল্প প্রলম্বিত হয়নি, জটিলতার ছিলো অনেক কিছু – থাকতেও পারতো। কিন্তু, সম্পর্কের সুতোয় টান পড়ে যাওয়া মানুষগুলো একে অন্যকে আর ধরে রাখতে পারে না। খটকা যা লেগেছে তা ঐ দ্বিতীয় জীবনের সম্পর্ক নির্মাণের দ্রুততা। দর্শক হিসেবে মনে হয় – এ পরিচালক কিংবা কাহিনীকারের তাড়াহুড়া। অবশ্য না জেনেও ক্ষতি হয়নি খুব বেশি। গৃহবধু পারুর চেয়ে বিজ্ঞাপনী সংস্থার পারমিতা অনেক বেশি প্রত্যাশিতই মনে হয়।

নামের সঙ্গে মিল রেখেই মূল কাহিনী একদিনের, কিংবা কয়েক ঘন্টার। ক্ষণে ক্ষণে অতীত-বর্তমানের দৃশ্যপট। শেষ ভাগে – পারমিতা এবং মনুকাকা যখন ঐ বাড়ির গেট পেরিয়ে এলো, তখন মনে হয়- এ দুজনের কখনো আর এখানে আসা হবে না। পারষ্পরিক আশ্রয়হীনতার যে সম্পর্ক ছিলো তারও সমাপ্তি হলো। কিন্তু জীবনের গল্পের সমাপ্তি কি হয়? মন হয় - ‘বিপুল তরঙ্গরে...’ গানের মতো করেই পারমিতা ও বাকী মানুষগুলো হয়তো নতুনভাবে আশ্রয় খুঁজবে অন্য কোথাও...।
.
.
.

Read more...

09 June, 2009

মেঘ পিওনের ব্যাগ

এমন সকালে কারও সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। শনি-রবিবার সকাল ছাড়া কোনো সকালেই আমার ঘুম পূর্ণ হয় না। তাই প্রতিটি সকালে আমি বিষন্ন থাকি। মুখভার থাকি। আমার নীরব থাকতে ভালো লাগে। ভেবে দেখলাম গত এক যুগ ক্রমাগতঃ এমন নিঃসঙ্গ সকাল আমাকে অবশ করেছে। সকাল মানে আমার জন্য এক কাপ কফি, সকাল মানে মেইল চেক করা, সকাল মানে গান শোনা। সকাল মানে ভাবা আরও একটা দিন গেলো...।

এখানে আসার পর সকালের ট্রেন যাত্রা খুব উপভোগ করি। ভাগ্যক্রমে সীট পাওয়া গেলে আরামসে বই পড়া যায়। ১১ আর ১০ এ ২১টি স্টেশন দ্রুতই পার হয়। আমার ভালো লাগে। বই পড়তে গিয়ে যা ঘটে তা হলো, গন্তব্যে পৌঁছার মুহুর্তে বইয়ের সবচে' আকর্ষণীয় অংশ শুরু হয়। আর আমি সারাদিন অপেক্ষায় থাকি।

তালিকা করেছি, আগামী ১২ সপ্তায় ১২টা বই শেষ করবো। এ উইকএন্ডে প্রিয়-রুমকির সঙ্গে আড্ডায় খেলা দেখে দিন গেলো। আজ সকালে যখন ভিক্টোরিয়া পার্ক স্টেশনে বাসে উঠতে যাবো, শুরু করবো প্রায় শেষ হয়ে আসা 'আউটলায়ার্স', তখন দেখি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো - পল। মার্কেটিং এর লেকচারার। পলের কাছে আমার সীমাহীন কৃতজ্ঞতা। উইন্টারে টি-এশীপ অনিশ্চিত হয়ে গেলে যখন ধুমায়ে সবার কাছে মেইল করছি, তখন পলই একমাত্র মেইলের রিপ্লাই করেছিল। কফি আলাপের ডাক দিয়ে কাজ দিয়েছিলো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এ কারণেই ৪ মাস থাকা খাওয়া ঘোরা নিরাপদে করতে পেরেছি। আলাপের শুরুতেই জেনে নিলাম সে কোন স্টেশনে যাবে। ব্লোর এন্ড ইয়াং; মানে ১১টা স্টেশন পর্যন্ত কথা বলতে হবে। স্বভাবতই আমি ভালো শ্রোতা তাই সমস্যা হয় না। পড়ালেখা-অর্থনীতি-বাংলাদেশ-পিএইচডি-সোশ্যাল সিস্টেম-বেড়াল; এরকম নানান বিষয়ে কেটে যায় পঁচিশ কিংবা এরকম কোনো মিনিট। আমি ব্লোরে উত্তরমূখী প্ল্যাটফর্মে, ওপাশে দক্ষিণমূখীতে পল। আমি আবার আউটলায়ার্সের পাতা উল্টাই...। টরন্টোর ভিক্ষুকরা এমন ভদ্র ভাবে পয়সা চায়, প্রথমে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে আজ চমকালাম, 'লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান, আয়্যাম হাংরি ফর লাস্ট থ্রি ডেজ, জাস্ট থিংক - থ্রি ডেজ, ওহ গড মারসি মি, প্লিজ হেল্প মী'। ময়লা জামার, অপরিচ্ছন্ন চেহারার কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার সকাতর আকুতি। এক নজরে দেখে মনে হয় ড্রাগ এডিক্টেড। সব ঐ ম্যালকমের দোষ, তার 'ব্লিংক'ই শিখিয়েছে - জাজ এট ফার্স্ট সাইট। অন্ধকার টানেলে ট্রেনের জানালায় তাকিয়ে নিজের মুখই দেখি...। আর কিছু নয়...।

অফিস থেকে যখন বের হবো, প্রচন্ড মাথা ব্যথা। ঠান্ডা বাতাসে উলটো পথে টিম হর্টন্সে না গিয়ে শেপার্ড সেন্টারে ঢুকি। কফি শপ খুঁজি। জানি না কীভাবে, কেনো - এসে দাঁড়াই 'কোল'' , বইয়ের দোকান, এর সামনে। মিনিট চল্লিশেক ঘুরে বগলদাবা - ওয়ার্ল্ড ফেমাস ডিক্টেটরস, আর থ্রি কাপ অব টি। প্রথমটা স্রেফ ইতিহাস জানার জন্য। আর পরেরটা পাকিস্তান-আফগানিস্তান প্রেক্ষিতে লেখা। টিটিসিতে অনেক মাস বিজ্ঞাপিত ছিলো। ততক্ষণে মাথাব্যথা কমে গেছে। তবুও কফি কিনি...। মন খারাপে ট্রেনে উঠি।

মন খারাপের কারণ, ঐ একটাই। লিখতে ইচ্ছে করছে না বিস্তারিত।
সচলে এক পোস্টে দুটো কমেন্ট করেছি -

গত ৫ বছরে আজ এই প্রথম আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের উপরে চ্রম বিরক্ত হলাম।হ্যালু, হ্যালু উৎপল শুভ্র, হ্যালু মতিউর রহমান, হ্যালু প্রথম আলু, আমিও লাইনে দাড়াইলাম। আমিও শপথ করিব আজ।আমি শপথ করিতেছি যে, ২০০৯ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের আর কোনো খেলা আমি টেলিভিশনে কিংবা ক্রিকইনফো বা অন্য কোনো মাধ্যমে ফলো করিবো না।

-
আসসালামুয়ালাইকুম আশরাফুল গং। ভালো থাইকেন। আমার মন ভালো/খারাপ করানোর দায়িত্ব আর বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের উপরে রাখতে চাই না। ২০০৯ সাল অন্ততঃ এই অপদার্থ ক্রিকেট প্রতিভা থেকে মুক্তি চাই। জাঝাকুল্লাহ খাইরান। খুদাপেজ।

-

হিসেব করে দেখেছি, নিজের কাছে করা প্রতিজ্ঞাগুলো ভুলে যাই মাঝে মাঝে।
এই প্রতিজ্ঞা আমি পালন করতে চাই।

অসংখ্য মন খারাপের ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট হুটহাট আজকাল যন্ত্রণা দেয়।
কষে লাত্থি মারতে ইচ্ছে করে এসব যন্ত্রণাকে...

ভরসা ইয়্যুটুব।
এবং রাজ কাপুর...
অনুবাদে পেলাম -
Give ur life for someone's smile..take other's pain..love others..that is life...
i accept that i m poor..but not from heart..life is one which knows how to love..
that is life.. relation among hearts is by belief in each other..
love is alive bcoz of us.. i will be remembered even after I die..
I will smile through someone's tears..that is life...



.
.
.

Read more...

08 June, 2009

ছবি ব্লগ : Eat, Drink, Die

১৩ রকম ব্যস্ততায় দিন যায় আজকাল।
সচল থাকি, সচল রাখি...
_

[১০ শব্দের
কম লিখে
পোস্টানো যায় না
;( ]

Read more...

03 June, 2009

নিয়ন পেপসি - ২ : শুরুর কথা

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার কাছে একটু কঠিন মনে হয়। সাক্ষাতে কিংবা অনলাইন চ্যাটে যারা এ প্রশ্ন করেছেন তারা আমার সরাসরি উত্তর শুনে ভ্রুঁ কুঁচকিয়েছেন। ভাবখানা এমন যেনো, এই ব্লগস্ফিয়ারে এত শত শত লোক থাকতে ঐ লোকের কাছ থেকে আপনি বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের খবর প্রথম পেয়েছিলেন? কী আর করা, সত্য তো সত্যই। এই যেমন সেদিন, ডানডাস স্কয়ারে বসে বন্ধুবর অমিত আহমেদ এবং জনপ্রিয় কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের সঙ্গে কফিতে চুমুক দিচ্ছি, তখনো এ আলাপ শুরু – আপনাকে বাংলা ব্লগস্ফিয়ারের খবর প্রথম কে দিয়েছিলো?

আমাকেও সে-ই পুরনো গল্প বলে যেতে হয়।
অনলাইন জীবনের প্রথম দিকে নানান বাংলা সাইটে রেজিস্ট্রেশনের কারণে কিংবা পত্রিকায় চিঠিপত্র কলামে লেখার শেষে ই-মেইল দেয়ার কারণে – অথবা অন্য কোনো অজানা কারণে, আমার ইয়াহু ইমেইল এড্রেস বিভিন্ন জাংক মেইলের লিস্টে চলে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৯ বছর উলটে গেছে, কিন্তু এখনো হাবিজাবি মেইল আসে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, জব ট্রেনিং, সাইপ্রাসের ভিসা, কক্সবাজারকে ভোট দিন, হাই ফাইভ – ইয়ারীতে বন্ধু করতে চাই। কী নেই! তবে বেশি মনে পড়ে আদিত্য আনীকের কবিতা মেইল। অনেক অনেক রিকোয়েস্ট করেও যখন ঐ মেইল তালিকা থেকে নিজেকে সরাতে পারিনি তখন আদিত্যিক ঠিকানাটি ব্লক করেছিলাম। মনে পড়ে, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি মোহাম্মদ আলী আকন্দকে। ভারতের নানান ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রায়ই তিনি মেইল করে সাবধান করে দিতেন, জনসচেতনতা তৈরি করতেন। এ সবই আজ অতীত! এ অতীতেই, ২০০৫ এর শেষের দিকে সদ্য প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিকের ইয়াহুগ্রুপে আমার ইয়াহু একাউন্ট যুক্ত করে নেয় একজন। এই ভদ্রলোক এরপরে নানান মেইলে নিয়মিত ঐ সাপ্তাহিকের কোন সংখ্যায় কী ছাপা হলো – সে সব লিংক দিতেন। আমিও ক্লিক করে দেখে আসতাম। এই ভদ্রলোক, নিজের রিপোর্টিং এর জন্য নানা রকম জরিপও চালাতেন। লিংক দিয়ে বলতেন – এখানে কিছু প্রশ্ন আছে, উত্তর দিয়ে আসেন। আমি সেই লিংকে যাই, কিন্তু কী লিখবো বুঝি না। তবে পরের সপ্তায় আপডেট আসতো – রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, দেখে আসুন। খারাপ না, ভালোই লাগে। অন্ততঃ কবিতা মেইল বা ভারত সতর্কতার মতো বিরক্তিকর না।

এরকম একদিন, ২০০৬ এর মাঝামাঝি সময়ে – ভদ্রলোক আবার ঐ ইয়াহু গ্রুপে মেইল করলেন। বাংলা ব্লগ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে সাপ্তাহিকটিতে। সেখানে চলমান বাংলা ব্লগের কয়েকজন ব্লগারের মন্তব্য, কে কেনো ব্লগিং করেন, একটি ফান্ড রাইজিং উদ্যোগের কথা ছিলো। তবে আগ্রহ পেয়েছিলাম, এ কথা জেনে – ব্লগে লিখলে সাথে সাথে পাঠক প্রতিক্রিয়া চলে আসবে মন্তব্যের ঘরে। মুহুর্তেই জেনে যাবেন, আপনার লেখাটি কার কেমন লেগেছে। ব্লগ পোস্ট নিয়ে বইও ছাপা হচ্ছে – যেগুলোকে ব্লগ ও বুক এর মিশ্রণে ‘ব্লুকস’ বলা হচ্ছে। মহা তুলকালাম কান্ড। ব্লগে লিখে টাকা আয় করা যাবে, এমনও নাকি সম্ভব! ঐ রিপোর্টে দেয়া লিংকে ক্লিক করে দেখি একটি বাংলা সাইট। এখনকার বাংলা ব্লগজগতের জনবহুল সাইট। দূর্দান্ত কিছু লেখা পড়ে ফেললাম এক টানা। মনে পড়ছে – বাম পাশে সর্বোচ্চ ব্লগারের একটি তালিকাও ছিলো, সেখানে ৭৭/৭৮টি পোস্ট দিয়েও জায়গা করে নিয়েছিলো কেউ কেউ। সেদিনই রেজিস্ট্রেশন করলাম। লিখে ফেললাম – ছোট্ট এক পোস্ট। দিনটি ৩রা জুলাই, ২০০৬।

সে-ই যে ব্লগের নেশা পেয়ে বসলো, এখনো ছাড়লো না। কতো কিছু হয়ে গেলো। ব্লগ জগত বিস্তৃত হলো। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নিলেন ব্লগারুরা। হারিয়ে গেছে প্রথম দিকের কতো কতো মুখ। এসেছে নতুন ব্লগার-প্রজন্ম, আসছে, এবং আসবে। দ্বন্ধ-কোলাহল-সংঘাত কিংবা নাটকের কমতি নেই। তবুও তুমুল গতিতে ছুটছে – কী বোর্ড। ব্লগ এক্সপ্রেস। কতো কতো স্টেশন পেরিয়ে গেলো গত প্রায় তিন বছরে। পিঁছু ফিরে দেখি স্মৃতির ঝাপির ওজন একেবারে কম নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার ব্লগিং এ প্রথম উৎসাহ ছিলো – কনফুসিয়াসের কিছু কমেন্ট। কোন সেই কমেন্ট কেনো এতো গুরুত্বপূর্ণ এ আলাপ পরে হবে, অন্য কোনো পর্বে। সেসব আজ থাক।

লিখতে গিয়ে ভেবেছিলাম, ব্লগিং নিয়ে খানিক নস্টালজিক হই আজ। ধুসর গোধুলি-চোর-মুডিওয়ালা কিংবা নুশরাত শারমিন সুমির কিছু গল্প বলি। কিন্তু, শুরুতেই এসে গেলো – ঐ প্রশ্ন, বাংলা ব্লগের প্রথম খবর আমি কার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। কীভাবে পেয়েছিলাম সে গল্প করা হলেও ভদ্রলোকের নামটি বলা হয়নি। বলাটা খুব জরুরীও নয়। পাবলিক ফোরামে তিনি ৩টি যুগান্তকারী তথ্য দিয়েছিলেন – ১) বাংলাদেশের অনেক অনেক সাংবাদিক সন্ধ্যার সময় তার রুমে এসে অপেক্ষা করে, তার যে কোনো লেখা দেশের ১ম সারির আধা ডজন দৈনিক ছাপানো মুহুর্তের ব্যাপার মাত্র। ২) কামাকাঙ্খাই অসহনীয় মাথাব্যথার অন্যতম কারণ, এবং ৩) তিনি বাংলাদেশের প্রথম পাঁচজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন।
আর বোধ হয় নাম বলার দরকার নেই। ভাবছি, এখন থেকে উত্তরটি এভাবে দেবো, বাংলা ব্লগ জগতের খবর আমাকে প্রথম যিনি দিয়েছিলেন, তিনি বাংলাদেশের প্রথম ৫জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন...।

কিন্তু, আজ এসব বলা কেনো!
কেনো এই স্মৃতিকাতরতা! তেমন কিছু হয়তো নয়, আবার একেবারে তুচ্ছও নয়।
আজ থেকে দুই বছর আগে, তখনো সচলায়তনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়নি – নানান ফিচার কারিগরী দিক টেস্টিং চলছে, জি-টকে নক করেছিলেন অরূপ কামাল, বলেছিলেন - সচলায়তনে রেজিস্ট্রেশন করতে। সেই থেকে শুরু...। ‘আমাদের সচলায়তন!’ শিরোনামের পোস্ট দিয়েছিলাম, এই দিনটিতেই।
৩রা জুন, ২০০৭ ছিলো সেদিন।

.
.
.

Read more...

ফেসবুক স্ট্যাটাস সমগ্রঃ মে ২০০৯

1. সহস্র শব্দের উৎসব থেমে যায় ।।

2. ফেসবুক ভালো লাগে না। একাউন্ড ডিএক্টিভেটের প্রস্তুতিপর্ব চলছে...

3. ফেসবুক ছেড়ে থাকা অসম্ভব কিছু না ।

4. বন্ধুবর সৌরভ (আলীম জামান)-এর দ্রুত শারীরিক সুস্থতা কামনা করছি ।

5. "কে আমাকে কতোটুকু জানে" কুইজ বানাচ্ছি ।

6. দেখছি, 'দৈনিক তোলপাড়'

7. ভুলি নাই, জুবায়ের ভাই..

8. শুভ জন্মদিন, দ্রোহী মহোদয়!

9. had an unexpected, but wonderful day...

10. 'সবার অলক্ষেতে তুমিও কি ছিলে, হাওয়ায় হাওয়ায় - হাওয়ায় হাওয়ায়, বন্ধু তোমায় এ গান শোনাবো বিকেল বেলায়

11. মে মাস ভীষণ ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ মনে হচ্ছে...

12. মাসুদ-মেধা আজ পরস্পরকে 'ভালোবাসি' বলেছে ;)

13. :( :( :( -- 08:02am -- :( :( :(

14. ফেসবুকে বাম পাশে যেই ৬ জন বন্ধু দেখায়, তার কি কোনো সুত্র আছে? গত দুইদিন ধরে এত রিফ্রেশ করি - ৫ জন পালটায় কিন্তু একজন সরেই না, আঠার মতো লেগে আছে ;)

15. গুড মর্ণিং, ফেসবুক!

16. 'সংবিগ্ন পাখিকুল ও বৃষ্টি বিষয়ক'

17. প্র-আলো ২৮ মে ২০০৯ রাশিফল বলছে - "পরকীয়ার অপবাদ ঘুচবে" ;)

18. মেট্রোনিউজ ২৮ মে ২০০৯ রাশিফল বলছে - "লোকজনকে লাই দিও না, মাথায় চড়ে বসবে" ;(

19. রাশিফল-২৯ মে : "অসৎ সঙ্গীর সঙ্গ এড়িয়ে চলুন। প্রিয়জনের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।"

20. Metronews - May 29, 2009: You will win an argument of some kind today but don’t make too big an issue of it. Be gracious in your victory.

21. 'পুরনো কিংবা নতুন মলাটে আমি, আসলে কিন্তু তোমাকে খুঁজবোই...'

22. এমন রোদেলা দিন, অনায়াসে ভাবতে পারি, প্রেমিকার চিবুকে

23. 'আমার পায়ের নখ থেকে মাথার প্রতিটি চুলে এত অপরাধ' : (অনুতাপ)

24. 'গহীন জলে শ্যাওলা ভাসে, বন্ধু ভাসে মনে, নদীর পানি বাড়ে আমার চোখের বরিষণে, আমি সাঁতার না, জানি না বাইতে নাও - কেমনে যাইবো বন্ধুর বাড়ি; ও মাঝি আমায় নিয়া যাও'
-
.
.
.

Read more...

22 May, 2009

ভুলি নাই, জুবায়ের ভাই

আজ এখানে যখন বিকেল, বাংলাদেশে ঘড়ির কাঁটা আরেকদিনে গিয়ে ছুঁয়েছে। এর পরে অনেক সময় কাটালাম, এই একটা কথা ভেবে।
কী লিখবো!
নিশি পাওয়া মানুষ যেমন ঘরে ফিরতে পারে না, কেবল অন্ধকারে চক্কর খায়, তেমন করেই - তেমন করেই আমি আজ বিকেলের পর থেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছি। আগেও মাথায় ছিলো, মে মাস আসার পর থেকে প্রতিদিন ভেবেছি, ২২ তারিখ যেনো না ভুলি...। নাহ, ভুলিনি। কী করে ভুলি!
আমি নিজেই তো কথা দিয়েছিলাম, বাৎসরিক হিসেবে ৩৬৫ পরপর শুভকামনা জানাবো।
হ্যাঁ, বছর পেরিয়ে গেলো।
অতীতচারিতার দোষে অভিযুক্ত এ-ই আমি আজ ঠিক এই কাজটাই করতাম, প্রিন্ট স্ক্রীন নিয়ে বলতাম, 'দেখেন, ভুলি নাই'। এই কথার পরে একটা হাসির ইমো দিতাম। কিছুই হলো না। সে-ই প্রিন্ট স্ক্রীন দিলাম, আর কমেন্ট জুড়ে দীর্ঘশ্বাসের ভার।
ওপারে চলে যাওয়া মানুষ, প্রিয় জুবায়ের ভাই -
শুভ জন্মদিন!
_

ইচ্ছেটা গত সেপ্টেম্বর থেকেই। জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার সব কমেন্ট চালাচালি এক জায়গায় জড়ো করবো।
এরপরে ম্যাপেল পাতার দেশে বরফ জমে, বরফ গলে। ঠান্ডা বাতাস শেষে সামারের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন আসে। আমি কতো কিছুই করি, কতো ফালতু কাজে সময় কাটাই। কেবল, জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্টগুলো জড়ো করা হয় না। কেনো হয় না, এ প্রশ্নটা ক্রমশঃ জটিল লাগে। এই যেমন আজ অনেক ভেবেও সচলায়তনে কোনো পোস্ট দিতে পারলাম না, লেখার বাক্য খুঁজে পেলাম না। যা ভাবলাম তা কেবলই ব্যক্তিগত নিজস্ব অনুভূতি, প্রকাশ্যে বলতে পারবো না কেনো জানি না। যেমন জানি না এ জটিলতার মুক্তি কোথায়। মুক্তি পেলে হয়তো জেনে নিতাম, কেনো প্রিয় মানুষের বিদায় এবং অনুপস্থিতি এমন আক্রান্ত করে...।

জুবায়ের ভাইয়ের লেখা কোথায় প্রথম পড়েছিলাম তা নিয়ে লিখেছিলাম আগে।
খুব ভুল না বললে, জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম কমেন্ট চালাচালি এরকম।
_

৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৩৪
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লেখা।
আচ্ছা এ লেখাটি কি আগে কোথাও ছাপা হয়েছিল? মনে হচ্ছে, কোথায় যেন পড়েছিলাম!
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৩৯
comment by: অতিথি বলেছেন: আনোয়ার সাদাত শিমুল, আমার লেখা কাগজে ছাপা হলে কেউ পড়ে না বলে আমার ধারণা। আপনি ভুল প্রমাণ করলেন। লেখাটি যুগান্তরে ছাপা হয়েছিলো বছরখানেক আগে। প্রসঙ্গটি পুরনো হয়নি ভেবে ব্ল্লগে দেওয়া।
আর সবার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:০৭
comment by: অতিথি বলেছেন: রাইট, যুগান্তরে পড়েছিলাম।
আপনার আরো কিছু লেখাও আমি পড়েছি। কোন একটা বিষয়ে মন্তব্য প্রতিক্রিয়া ও ছিল। ঠিক মনে পড়ছে এখন...।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:২৩
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, আপনার সরণশক্তি ভালো। এই লেখাটি নিয়েই খোন্দকার আলী আশরাফ একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন। দুঃখের বিষয়, তিনি কী বলতে চেয়েছেন আমি তার কিছুই বুঝিনি, সব মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিলো।

_

সামহোয়্যারইনব্লগের টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে - নামগুলো অতিথি হয়ে গেছে। মূল পোস্ট এটা ।
___

আমার স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারিত না করে তাহলে বলতে পারি, সা-ইনেই আমার এই পোস্টে জুবায়ের ভাইয়ের ১ম কমেন্ট পাই। আবার সেই 'অতিথি' হয়ে যাওয়া কমেন্ট -

১৮ ই মার্চ, ২০০৭ সকাল ৯:০৯
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, সময়ের টানাটানিতে খুব থাকি। অজুহাতটা ব্যবহার করতে ইচ্ছে হয় না। তবু বলি এই যে আপনার লেখাটা কয়েকদিন বিলম্বে পড়তে পারলাম, তা-ও ওই সময়ের আকালের জন্যে। পড়লাম তখন আমার এখানে রাত দেড়টা। ইচ্ছে আছে আপনার এবং আরো কয়েকজনের পোস্টগুলো পড়বো। তখন অনেক পুরনো লেখার ওপর মন্তব্য পেলে অবাক হবেন না আশা করি।

_

এরপরে আরেকটি অবাক ব্যাপার ঘটে।
এ যাবত আমার ছাইপাশ লেখাগুলোর মাঝে 'ছাদের কার্ণিশে কাক' নিয়ে নানান জনের মুখে উচ্ছ্বাস শুনেছি, এখনো শুনি। কালেভদ্রে দুয়েকজন অচেনা পাঠক মেইলও করেন। আমার অন্য কোনো লেখা নিয়ে এমন পাঠক প্রতিক্রিয়া পাইনি। এত কিছুর পরে, ইদানিং আমি বিশ্বাস করা শুরু করেছি, ছা/কা/কা আসলেই হয়তো সুখপাঠ্য কিছু ছিলো।
'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজ যেদিন শেষ করলাম, সেদিন হঠাৎ ১ম পর্বে জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্ট -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৩৮
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: প্রথম বাক্যেই গেঁথে ফেললেন। "জীবন যেন অনেকগুলো পাসওয়ার্ডে আটকে আছে।"
আমি ঠিক করেছি আমার এই অসংখ্য পাসওয়ার্ড একটা ডাটাবেজে রাখবো। আর সেই ডাটাবেজ কীভাবে সুরক্ষিত করা যাবে? আরেকটি পাসোয়ার্ড দিয়ে!!!!

_

এখানে শেষ নয় -
২০ পর্ব একটানা পড়ে কয়েকপর্ব পরপর কমেন্ট করেছেন, কমেন্টে অনুমান করেছেন - আগামী পর্বে কী হতে পারে...। হুমায়ূনীয় বিভ্রাট থেকে মুক্ত হতে বলেছেন। এখনো ভেবে অবাক লাগে এমন করে কে-ই বা আপন করতে পারে!

শেষ পর্বে কমেন্ট করেছিলেন -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ১০:৩৫
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: শিমুল, সবগুলো পর্ব পড়া শেষ। খুব সুস্বাদু, গতিময় ও স্মার্ট গদ্য লেখার কৌশল তোমার দখলে। একজন পাঠকপ্রিয় এবং ভালো লেখক হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা তোমার আছে। বাকিটা তোমার ইচ্ছে ও লেগে থাকার ওপরে। একটা কথা বলি, গদ্যরচনাকে আমি বলি শব্দশ্রমিকের নির্মাণকর্ম। সেই পরিশ্রম করতে তুমি ইচ্ছুক হলে আমি খুশি হবো। জ্ঞান দিতে বসেছি ভেবো না। এগুলি আমার অকপট মত।
আচ্ছা, এই লেখাটিকে আরেকটু বাড়িয়ে রক্তমাংস যোগ করে উপন্যাস করে তোলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয়।
_
২৯ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:৫৯
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
ব্লগে লেখার সুবিধা হলো পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় খুব দ্রুত। বিগত ১১ মাস ব্লগিং করে টুকটাক লেখালেখির যা চেষ্টা করেছি তার মাঝে আপনার লেখা ও মন্তব্যের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য অবশ্যই ভাগ্যের ব্যাপার। 'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজে আপনার প্রতিটি মন্তব্য আমার জন্য আশীর্বাদ। ভালো লেগেছে - লেখার দূর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন, সাথে অনুপ্রেরণাসূচক মন্তব্যগুলোও সাহস যোগাবে। এ সাহসকে ভর করে আগামীতে উপন্যাস লেখার দু:সাহসও করে ফেলতে পারি! আপনার মতো একজন গুনী লেখককে সবিনয় কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধা জানাই।

_

কোনো কিছু লেখার পরে প্রিয় মানুষ এসে কমেন্ট করবেন, এমন আশাতেই থাকি। আমার লেখা একটা গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই কষ্ট পেয়েছিলেন। আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিলো, অবস্থান ছিলো। অথচ, কোনো ব্যাখ্যায় যেতে পারিনি। পালিয়ে বেড়িয়েছি। পরে অনুতপ্ত হয়েছি কমেন্টে। কিন্তু বিনিময়ে তিনি আরও বিনয়ী কমেন্ট করে আমাকে অবাক করেছেন। গত বইমেলায় আমার গল্প সংকলনে গল্পটি দেবো কিনা তা নিয়ে ভেবেছি বেশ কয়েকবার। পরে দিয়েছি, একটাই কারণ - আমি মনে রাখতে চাই - এই গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই মনে কষ্ট পেয়েছিলেন, তাঁর কাছে গল্পের বিষয় ডিস্টার্বিং মনে হয়েছিলো...।
_

ব্লগে আমি সচরাচর কাউকে শুরুতেই 'তুমি' বলি না, অপরিচিত কেউ আমাকে 'তুমি' করে বলবেন - এটা একটু খটমটে লাগে। এর পরেও হৃদ্যতায় কারো কারো কাছে 'তুমি' সম্বোধন চেয়ে নিয়েছি। একেবারেই অদেখা মানুষ এঁরা।
জুবায়ের ভাই কি আসলেই অদেখা রয়ে গেলেন!

মনে আছে ছা/কা/কা'র ১ম পর্বে -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৪২
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
একটা অনুরোধ, আমি কি আপনার কাছ থেকে 'তুমি' সম্বোধন প্রত্যাশা করতে পারি!
পড়ার জন্য সবিনয় কৃতজ্ঞতা।
_
২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:২০
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: নিশ্চয়ই শিমুল। অনুমতি ব্যতিরেকে কী করে করি? এমন অনেককে জানি যারা সরাসরি তুমি বললে অফেন্ডেড হন। একটা বয়সে আমি নিজেও :-)। এখন তোমার অনুমতি মিললো, আর চিন্তা কী?

_

এভাবে অনেক অনেক কথা পালটা কথার স্মৃতি।
তাঁর বাসায় আমার খিচুড়ি খাওয়ার দাওয়াত, আমার শহরে তাঁকে চা'য়ের নিমন্ত্রণ...
কিছুই হয় না।
_

আমি থাইল্যান্ড ছাড়ি ১২ জুন, ২০০৮।
১১জুন রাত পর্যন্তও অনলাইনে ছিলাম। দেশে ফিরে বাসায় ইন্টারনেট ছিলো না। সাইবার ক্যাফেতে টুপ করে মেইল চেক করে বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু, জুবায়ের ভাই আমার আবদার ভুলেননি। 'পৌরুষ' উপন্যাসের পেছনের গল্প লিখেছেন। আমাকে অনলাইনে না দেখে মেসেজ দিয়েছেন -

হতে: মুহম্মদ জুবায়ের
প্রতি: আনোয়ার সাদাত শিমুল
বিষয়: পৌরুষ বিষয়ক কেচ্ছা
তারিখ: মঙ্গল, 2008-06-17 23:58
তোমার ফরমায়েশে লেখা, আর তুমিই ক'দিন ধরে নিখোঁজ!
http://www.sachalayatan.com/zubair/16053

_

লাল শাদা ম্যাপেল পাতার ভিসা আমার জন্য দুরহ হয়ে ওঠে।
উৎকন্ঠায় কাটে দিন রাত। এর মাঝে জুবায়ের ভাই অসুস্থ।
কুয়েত এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইটে ওঠার পরে আমার মনে হয় ভার্চুয়াল স্বজনদের কথা, মনে পড়ে - কেমন আছেন, জুবায়ের ভাই!
ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়ম এ চলে যাওয়া।
২৫ সেপ্টেম্বরে ড. ডেল কার্লের ক্লাসে বসে চোখের পানি আঁটকে, ভীষণ চাপা কান্নায় আমি লিখি - এই এলিজি আমি লিখতে চাইনি
_

এভাবেই জীবন বয়ে চলে আমাদের।
আমি শৌখিন ব্লগার মাঝে মাঝে গল্পকার হওয়ার লোভী স্বপন দেখি। লেখালেখি নিয়ে নানান দ্বন্দ্বে ভুগি। আগামীর পাওয়াটা শুন্য ধরে, পেছনে তাকালে দেখি - জুবায়ের ভাইয়ের মুঠো মুঠো ভালোবাসা, কমেন্ট- প্রেরণা।
আমি আবার বাসে উঠি, ট্রেন ধরি। মেইন স্ট্রীট, উডবাইন, ক্যাসেল ফ্র্যাঙ্ক ; এরকম করে স্টেশন পার হই। মাথায় গল্পের প্লট ঘুরঘুর করে। এরকম অনেক, ক্লান্তিময় বিকেলে, বরফ সফেদ দিনে, আমার মনে পড়ে। মনে পড়ে, জুবায়ের ভাই।

আপনি না ফেরার দেশে যাওয়া শিক্ষক সুরাইয়া খানমকে কথা দিয়েছিলেন, ২৫ মে'তে তাঁকে স্মরণ করবেন।
ঐ পোস্টের শুরুর কমেন্ট পালটা কমেন্টে আমিও তো কথা দিয়েছিলাম।
ঐদিনটির আশে পাশেই, আমি আপনাকে শুভকামনা জানাবো ৩৬৫ দিন পরপর।
আজ ২২ মে।
শুভ জন্মদিন, জুবায়ের ভাই।
প্রিয় জুবায়ের ভাই...



.
.
.

Read more...

16 May, 2009

কাক্কুকে মনে পড়ে

এবার ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই টের পেলাম, পত্রিকায় লেখা 'গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত' শিরোনামটি মিথ্যে নয়। এ সময় এমন গরম পড়বে সেটা আগেই জানতাম। বাসায়ও বিদ্যুৎ নেই, ঘামে জবজব হয়ে বসে থাকি প্রথম দিন...
তবুও আমার প্রিয় শহর ঢাকা, কী এসে যায় গরমে?
জেট ল্যাগের জটিলতা কাটাতে না কাটাতে কাক্কুর ফোন।
'ভাতিজা, এইবারও দেখা না করে যাবা?'
আমি জবাবে বলি, ‘এই তো কাক্কু- কালকেই মধ্যেই আসবো, আপনি কি এখনো নয়া পল্টনের অফিসে?’
কাক্কু হেসে বলে - 'আর কই যাবো বলো, কালো গাউনের মানুষ আমরা, কতোই বা পাই?'
ফোন রেখে আমি কাক্কুর কথা ভাবি।
আহা! কতোদিন পরে দেখা হবে, সে-ই কবে হাইকোর্টের মোড়ে চা-সিগারেট খাওয়ালো, আর দেখা নেই।

-দুই-
প্রিয় পাঠক,
আপনারা হয়তো ভাবছেন, এ আমি কোন কাক্কুর কথা শুরু করলাম। একটু সবুর করুন, একটু বসুন-
আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, এ কাক্কু আমার একার সম্পত্তি নয়। এ কাক্কু আপনাদের অনেকেরই চেনা, আপনারা অনেকেই তাকে কাক্কু ডাকেন। এবং আমি এ ও নিশ্চিত - আমার মতো খানিক নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে - আপনাদেরকেও কাক্কু এইভাবে ফোনে ডেকে অফিস যেতে বলবে। বলবে, ভাতিজারে নদীর পানি সমস্যার কিছু তো করতে পারলাম না...।

প্রস্তর যুগের ব্লগার যারা আছেন, তারা নিশ্চয় বুঝে গেছেন আমি কোন কাক্কুর কথা বলছি। হ্যাঁ, তিনিই। আমি সেই কবে কখন তার অফিসে কেনো গিয়েছিলাম মনে নেই। প্রেসক্লাব পার হলে বাসের হেলপার ‘জিপিও পল্টন গুলিস্তান নামেন’ হাঁক দিলে আমি নামি। সেগুনবাগিচার দিকে চলে যাওয়া রাস্তায় – উর্মি ট্রেডিং, হোটেল মেট্রোপলিটন, ফ্লেশপটস রেস্তঁরা খুঁজি। কিছু নেই, বদলে গেছে সব। তবে, পুরনো সিঁড়ি ভেঙে কাক্কুর অফিসে উঠতে একেবারেই কষ্ট হলো না। সেক্রেটারীর রুম পার হয়ে কাক্কুর রুমে গিয়ে ঢুকতেই দুটো জিনিস চোখে পড়লো; কাক্কু অফিসে এসি লাগিয়েছে, কাক্কু এখন কম্পিউটার ইউজ করে।
কম্পিউটারের ব্যাপারটি নতুন নয়, কারণ – আমি জানি, তেমনি আপনারাও জানেন কাক্কু কী করে গত তিন বছরে বাংলা ব্লগের কিংবদন্তি ব্লগার হয়ে গেছেন।
আমাকে দেখেই কাক্কু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। আহা, কী অমায়িক চেহারা, সিঁথি করা চুল, পরিপাটি গোঁফ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, সে-ই ট্রেড মার্ক স্যুট, টাই...।
আমাকে চেয়ারে বসতে বলে কাক্কু টেবিলে রাখা পেপারওয়েট লাটিমের মতো করে ঘুরায়। মিষ্টি হেসে আমাকে বলে, ‘ভাতিজারে তুই কানাডা থেকে আমার জন্য মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে আসলি রে...’।
আমি কাক্কুর কথা বুঝি না।
এই অল্প সময়ের জন্য ঢাকা গিয়েছি সত্য, কিন্তু কারও জন্য কিছু নিতে পারিনি। কাক্কু কী মানিপ্ল্যান্টের কথা বললো বুঝতে পারলাম না। অধুনা চশমা পড়া এই আমি কাক্কুর চশমা ভেদ করে তার চোখে তাকাই। সেখানে গোল দুটি চোখ মার্বেলের মতো ঘুরছে। যেনো গহর বাদশা বানেছা পরী সিনেমার খলনায়ক, চুরি করে আনা রাজকন্যার বয়স পনেরো হবে আজ, আর সে সন্ধ্যায় তাকে কুরবানী দিয়ে অমরত্ব লাভের লোভে চোখ দুটো জলজ্বল করছে তার...।
আমার আগ্রহ আরো উস্কে দিয়ে তিনি বলেন, একটু বসো- দেখবে তামাশা।

আমার কল্পনা প্রবণ মনে আমি ঘুড়ি ওড়াই।
ভাবি – কাক্কু তার নদীর পানি সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছে। টিপাইমুখী বাঁধ নির্মাণ থেমে গেছে, কিংবা বাংলাদেশ জলসম্পদ রক্ষা পরিষদ থেকে কাক্কুকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। অথবা, মুমিনদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে মূল্যবান গবেষণার জন্য কাক্কুকে মগবাজারের কোনো অফিস থেকে ইমান্দারোফদিয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
আমার এসব কল্পনা মোটেও অমূলক নয়। আবার বলি, প্রস্তর যুগের ব্লগ দর্শক যারা আছেন – তারা নিশ্চয় দ্বিমত হবেন না, সে সময় বাংলাদেশের মধ্যরাতে ৪/৫ লাইনের বক্তব্য আর তারচেয়েও লম্বা শিরোনামের পোস্ট দিয়ে নাস্তিক-ভারতের্দালাল-ইসলামের্শত্রু দুষ্টু ব্লগারদলকে কেমন তছনছ করে দিয়েছিলো...। কাক্কুর একটা পোস্টের ওজন আবুজরগিফারী বজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়েচডিধারী- মহম্মদপুর থ্রিডি ইউনিভার্সিটির ভিসি- লাইফটাইম জিয়ারি ক্যান্ডিডেট বালকটিও বইতে পারতো না। আমরা পাঁজি ভাতিজার দল কোন ছার!

অবশ্য আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।
ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো, পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো, ব্লু জিনসের সাথে কালো বুট স্যু...। আমি চোখ কচলাই, আরে তা-ই তো...জ্যামছ। কতদিন গুরুর গান শুনবো বলে কনসার্টে পুলিসের তাড়া খেয়েছি। হ্যাঁ, তিনি এখানে এই কাক্কুর অফিসে কেন?
ব্যান্ড-গুরু জ্যামছ সোজা কাক্কুর হাত ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে, ‘এডভোকেট সাহেব, আমাকে বাঁচান।‘
কাক্কু সান্ত্বনা দেয়, ‘আরে অস্থির হবেন না, আমি তো আছি, বলেছি তো ফোনে...’
জ্যামস হাত ছাড়ে না, বলে – ‘এই গান তো আমি লিখিনি। রাহমান স্যার লিখেছিলেন, তিনিও বেঁচে নেই এখন, আমার উপরে দোষ কেনো তবে?’
কাক্কু এবার বিজ্ঞের মতো হাত নাড়ে, ‘দেখুন, সবই মানলাম। কিন্তু, আইন নিয়ে তো প্রশ্ন চলে না, কী বলেন?’
জ্যামছ এবার মুষড়ে পড়ে। ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে। কাক্কু তাকে দুই হাতে তুলে ওঠায়, বলে – ‘শিনায় শিনায় লাগে টান’। সে কথা জ্যামছের কানে যায় না, সে ‘ইয়ারব ইয়ারব’ জিকির তোলে।
আমি কাক্কুকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী ব্যাপার কাক্কু?’
কাক্কু মুচকি হাসে, ‘প্রিয়তমা সুন্দরী গাইতে গেছিলো...হে হে। এখন মামলায় ফাঁসছে...’

আমি ঠিক বুঝতে পারি না, প্রিয়তমা সুন্দরী গাওয়ার সাথে মামলার কী! তবে এটাও ভাবি, কাক্কু নিশ্চয় অন্য কিছু ইংগিত দিয়েছে, আমি বুঝিনি...।

এই বোঝা না বোঝার চক্করে যখন হিমশিম খাচ্ছি, তখন লিকলিকে শরীরে শাদা শার্ট, মাথায় চুল কম একজন বিক্রমপুরের মোলায়েম কন্ঠে আওয়াজ তোলে কাক্কুর অফিসে ঢুকে। মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে ফালুটিভিতে আমি দেখেছি তাকে। তাই চিনতে কষ্ট হলো না – জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কাম-দাদুল হক লিমন। কাক্কু তাকে দেখে বিনয়ে নত হয় – ‘আরে আপনি আবার কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?’
‘উপায় তো নেই, ভাই! মামলা হয়ে গেছে...’
আমি কাক্কুর চোখে স্পষ্ট লোভ দেখতে পাই। ‘মামলা হয়ে গেছে’ ভীতবাণীতে কাক্কুর চোখের সামনে যেনো অফুরান সম্ভবনা।
কাম-দাদুল হক লিমনকে চেয়ারে বসতে দিয়ে কাক্কু খসখস করে নোট নেয়-
‘কী নাম বইটার? ‘প্রেম প্রীতির সুখ দুঃখ?’
‘ঠিক বলেছেন।’
‘সুন্দরী লিখেছেন কতবার?’
’৪৮ বার। বই ৫ ফর্মার – ৮০ পৃষ্ঠা।’
কাক্কু মাথা নাড়ে – ‘কিন্তু, দ্বিতীয় মামলাটা কীসের?’
জনপ্রিয় লেখক লিমন এবার মাথা নিচু করেন, ‘আপনি তো জানেন, আমাদের বিক্রমপুরে গেলে আমি মোটর সাইকেল চালাই। এবার ভাবলাম, যা-ই গরেহঙ্গা ডিগ্রি কলেজের পাশটা রাউন্ড মেরে আসি। তো বিকেলে তখন কলেজের গেটে যেতেই এক তরুণী আমার পথ আঁটকালো, বললো তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।‘
কাক্কু কপাল কুঁচকায়, ‘তারপরে? পৌঁছে দিলেন?’
‘হ্যা, আপনি হয়তো জানেন- এ ঘটনা আমার জীবনে বারবার ঘটেছে, আমি লেখক মানুষ ,তাই আমার উপরে আস্থা রাখা যায়- এ যুক্তিতে কতোদিন কতো মেয়ে পথে থামিয়েছে, বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়েছে...।‘
‘কিন্তু, এবার সমস্যা হলো কীভাবে?’
লিমন এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের নখ খুঁটেন – ‘এখন তো আসলে সময় পালটে গেছে, মোটর সাইকেল থেকে নামার পরে মোবাইলের ক্যামেরা অন করে মেয়েটি আমাকে বললো, তাকে কিছু বলতে হবে, সে রেকর্ড করে রাখবে- জনপ্রিয় একজন লেখক কী বললো তার স্মৃতি।‘
কাক্কুকে অস্থির মনে হয়, ‘তারপরে, তারপরে কী হলো?’
‘তারপরে আর কী হবে, এমনটা তো আমি আগেও বলেছি নানান তরুণীকে, -তুমি দেখতে খুব সুন্দরী- কখনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার মোবাইল ক্যামেরায় রেকর্ড থাকায় আমি ফেঁসে গেলাম। পরিবার থেকে এক লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণ চেয়ে নিপীড়নের মামলা করা হয়েছে...’।
কাক্কু এসব শুনে অভয় দেয়, ‘একদম ভাববেন না, আমি আছি...’।

জ্যামছের চক্করের পরে কাম-দাদুল হক লিমনের চক্কর। আমার কাছে হিমশিম লাগে। কাক্কুর অফিসে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্ত হাতে নিই। প্রথম পাতায় বিশাল বিজ্ঞাপন, ‘মুহায়ুন আহমেদের পাঠকরা বিভ্রান্ত হবেন না, তিনি কখনোই তার কোনো গল্প উপন্যাসে নায়িকাকে সুন্দরী বলেন নাই’। সঙ্গে মুহায়ুন আহমেদের দুটি নতুন উপন্যাসের বিজ্ঞাপন – ‘সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ী ও হলুদিয়া হিমু’, ‘সুন্দরী রূপবতী নয়’।

মোয়া দিগন্তের প্রথম শিরোনাম – ‘বাড়ছে মামলা, আদালতে মামলা জট, বিপাকে লেখক-শিল্পী’। বুঝলাম, দেশে আসার দুদিন আর এসে একদিন ; এই তিন দিন পত্রিকা পড়িনি। দেশে বিশাল কিছু হয়ে যাচ্ছে। নানান মামলায় জড়ানো হচ্ছে লোকজনকে। নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে মোয়া-দিগন্ত বলছে – ‘জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক, টিভি উপস্থাপক ও নাট্যকার কাম-দাদুল হক লিমনের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস প্রেম-পীরিতের সুখ দুঃখ এর পাতায় পাতায় ‘সুন্দরী’ শব্দের অপব্যবহার করেছেন এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন ঢাকা ডেফারেল সাংঘাতিক ইউনিয়নের সাবেক সম্পাদক জনাব কিয়াস গামাল চৌধুরী। অভিযোগে তিনি বলেছেন, ইসলামী মূল্যবোধের বাংলাদেশে ইমান আকিদা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে এসব শব্দের যত্রতত্র ব্যবহার করে কাম-দাদুল হক মিলন যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরেও লিমনের নানা কুকর্মের ভিডিও ক্লিপ এখন মানুষের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে...‘

এসব পড়ে আমার গা চমকে ওঠে।
মোয়া-দিগন্তের পেছনের পাতায় যাই, সেখানে ‘ঢাকাস্থ আমরা বিক্রমপুরনিবাসী’ এসোসিয়েশনের প্রতিবাদ সভার ছবি। তাদের এলাকার কৃতি সন্তাম লিমনকে হামলা মামলা থেকে মুক্তি দেয়ার দাবী জানাচ্ছে তারা।

খেয়ালই করিনি, প্রথম পাতার নিচে জ্যামছের বিশাল ছবি। ডব্লিউ ভি এ মিলনায়তনে ‘প্রিয়তমা সুন্দরী আমার’ গান গাওয়ার অপরাধে মামলা করেছে কনসার্টে থাকা তিনশ তেত্রিশজন তরুণী। গিটার হাতে দুলে দুলে গাওয়ার ভঙিতে নিশ্চিত ভাবেই কু-ইংগিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা বিভাগ এখন কনসার্টের ভিডিও পরীক্ষা নীরিক্ষা করে চলেছে...।

আমি মাঝে মাঝে স্বপ্ন ও বাস্তবে হিমশিম খাই। কতোকতো দিন সকালে ঘুম ভেঙেছে বিরিয়ানী-বুরহানীর টেবিলের প্লেটগুলো না ছুঁয়ে...। মনে হলো সেরকম স্বপ্নের মাঝে আমি আছি। নয়তো- ‘সুন্দরী’ উচ্চারণের ও লেখার অপরাধে শাস্তি হবে কেনো মানুষের। আবার নিজেকে এ’ও বলি, নচিকেতার গানে জেনেছি – ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়’। পেপারের ভেতরের পাতায় যাই, সেখানে বিশাল তালিকা, নিম্ন আদালতে মামলা হচ্ছে প্রতিদিন। ফেঁসে যাচ্ছে ডজন ডজন লোক...।

জ্যামছ এবং কাম-দাদুল হক লিমনকে কিছু কাগজ পত্র গুছিয়ে দিয়ে বিদায় করে, কাক্কু আমাকে বললো – ‘চলো বাসায় চলো, তোমার কাকীমা শর্ষে ইলিশ রেঁধেছে।‘
আমি কাক্কুর পেছন পেছন বের হই।
তখনি একজন হাড্ডিসার লম্বা টেকো লোক এবং আরেকজন জংলী চুলের যুবক কাক্কুর অফিসে ঢুকে। একে অন্যকে দোষ দিয়ে যায় তারা।
বৃদ্ধ বলে, ‘আমি তো গাই না এখন, তুমি গাইলা, তাই আসামী তুমি।‘
বেয়াড়া যুবক উলটা ধমক দেয় – ‘গানের মালিক আপনি, আমি কেন সাজা পাবো?’

কাক্কু দুজনকে চেয়ারে নিয়ে বসায়...।
আমি হেটে হেটে সু-ওয়াং গার্ডেন রেস্টুরেন্টের বিপরীত দিকে দাঁড়াই, মনে পড়ে এ পথে কতোদিন কলেজে গেছি, তাও দশক পার হয়ে গেলো। তখন এমন কোলাহল ছিলো না, হৈচৈ ছিলো না। কিছু সবুজ গাছ ছিলো রোড ডিভাইডারে।
কাক্কু তখন রিকশা ডেকে আমাকে তুলে নেয়।
জিজ্ঞেস করি, ‘ওরা কারা ছিলো?’
কাক্কু অবাক হয়, ‘চিনলি না?’
‘নাহ!’
‘আরে বড়ো জন দুরশিখ আলম, আর চ্যাঙড়াটা কান্থ পানাই।‘
‘তাদের আবার কী হলো?’
‘চুমকি চলেছে একা পথে শুনিস নাই? ওটার জন্য মামলায় ধরা’।

রিকশা চলতে থাকে। আমি টের পাই, এসব মামলায় কাক্কুর ব্যবসা লালে লাল হবে। কিন্তু, এটাও ভাবি- আচমকা কাক্কুর এত যশ-খ্যাতি ছড়ালো কীভাবে! নানান ইতস্ততঃ করে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘আচ্ছা কাক্কু, এত এত আইনজীবি থাকতে এরা সবাই তোমার কাছে কেন?’
কাক্কু মনে হয় খানিক রুষ্ট হলো আমার প্রশ্নে, বললো – ‘তুই আমাকে এমন তুচ্ছ করলি?’
আমি বোঝানোর চেষ্টা করি, ‘না , মানে হয়েছে কি। আমি তো অনেকদিন দেশের বাইরে ছিলাম, আগে তো তুমি এমন ছিলে না...’
কাক্কু আমাকে খোঁচা দিয়ে বলে, ‘তুই কি আমার দক্ষতা দেখিসনি ব্লগে? কেমন করে শুইয়ে দিয়েছে সব বাঁদরের দলকে, পেরেছে কেউ?’
আমি হুম/হ্যাঁ করে যাই।

কাক্কু এবার বাম হাতে ধরে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্তের বিজ্ঞাপনী পাতা খুলে। সেখানে ৫ কলামে কাক্কুর বিজ্ঞাপন – বড় করে কাক্কুর টাই পড়া ছবি। 'সুন্দরী শব্দটি ব্যবহার সংক্রান্ত মামলায় মুক্তি চান? নির্দ্বিধায় চলে আসুন কাকুন্দ’জ চেম্বারে। কোরিয়া থেকে স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত আইনজীবি, বাংলা ব্লগস্ফিয়ারের জাঁদ্রেল ব্লগার আইনজীবির পরামর্শ নিন। আসুন, কথা বলুন, শুনুন, তারপরে সিদ্ধান্ত নিন। ঘুরে আসুন ডব্লু ডুব্লু ডুব্লু...’

আমার আবার তাজ্জব হওয়ার পালা।
কাক্কু তুমি এত চাল্লু! আগে তো টের পাইনি...।
কাক্কু শুধু মিটিমিটি হাসে।

-তিন-
আরও তাজ্জব হলাম কাক্কুর বাসায় ঢুকে।
দেশি বিদেশি পুলিস বাসা ঘিরে রেখেছে। কোরিয়ান-আমেরিকান ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ‘ইন্টার সার্চের’ একদল অফিসার ঢাকা এসে তোলপাড় করে দিয়েছে।
গত দু’সপ্তায় কোরিয়ায় অন্ততঃ ৭জন নারী আত্মহনন করেছে রহস্যময় কারণে। সবার ঘরে একটাই চিরকুট - ‘এভাবে ঠকাবে ভাবিনি’। পুলিশ মিলিয়ে দেখেছে – ৭জন নারীর ঘরেই টাই পরা, পরিপাটি গোঁফেল, চশমা পড়া এক লোকের ছবি পাওয়া গেছে। নানান বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মাস কয়েক আগে এই লোক কোরিয়া গিয়েছিলো –সেমিনারে নাকি ট্রেনিং’এ। সেখানে অল্প ক’দিনেই ঐ সাত নারীকে প্রেমের ফাঁদে বন্দী করে সে। সে আর কেউ নয়, ছবি মিলিয়ে দেখা গেলো – লোকটি আমাদের কাক্কু...।
বাংলাদেশি এক গোয়েন্দা অফিসার কাক্কুর টাই টেনে ধরে, ‘কোনো রকম চালাকি করবেন না। হোম মিনিস্ট্রিতে আগুন লেগেছে আপনার কারণে...। জলদি স্বীকার করুন, কী হয়েছিলো...’।

কাক্কু মিনমিন করে কম্পিউটার চালু করে।
ফেসবুকে তার ডজন খানেক কোরিয়ান বান্ধবী। প্রাইভেট মেসেজ বক্সে – আবেগঘন প্রেম পত্রে ভর্তি। ফটো তালিকায় – ঘনিষ্ট ছবিতে ভরপুর। কাক্কুর কনুই বড়োই বিপজ্জনকভাবে জায়গা করে নিয়েছে...।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখি...।
কোরিয়ান এক অফিসার হঠাৎ কাক্কুর হাতের মাউস কেড়ে নেয়। কম্পিউটারের মনিটরে একটি জায়গায় সে ফোকাস করে, সেখানে দেখি ফেসবুক আপডেট – ‘... ইস নট সিংগেল এনিমোর, ম্যারিড টু...’।
আমার কাছে আবার সব রহস্যময় লাগে। মনে হয় আমি যেনো হরর ম্যুভির দর্শক হয়ে আছি। কোরিয়ান আরও কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কী কী আলাপ করে। মনে হয় – সাত সাতটি হত্যাকান্ডের রহস্য তারা উদ্ঘাটন করতে পেরেছে...। ততক্ষণে কাক্কুর হাতে শেকল লেগে গেছে। আর আমি পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়েছি। দ্রুত পায়ে রাস্তায় এসে, সি এন জি ধরে চলে যাই – মদীনা ট্রাভেল এজেন্সিতে। ফাঁদে পড়ার আগেই ভাগতে হবে। ঢাকা – দুবাই – হিথ্রো – টরন্টো।

সারা পথ অস্থিরতায় কাটিয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে যখন ল্যাপ্টপ চালু করলাম তখন মনে পড়লো – আজ ১২ মে। জাপানে থাকা এক বন্ধুকে এই দিনটি মনে করিয়ে দিতে হবে, বলতে হবে অঞ্জনের ‘মালা’ গানের কথা...। আমি মেইল টাইপ করি, আর মনে হয় কেউ আমার কাঁধে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। খুব নিচু স্বরে ডাকছে...।

-চার-
চোখ মেলে তাকাতেই দেখি, অপরূপা কুহেলিকা চৈনিক বালিকা।
আমাকে জিজ্ঞেস করছে – কোথায় যাবে তুমি?
আমি চোখ কচলাই। আসলেই , কোথায় যাবো? আমার কিছু মনে পড়ে না...
বালিকা এবার মনে করিয়ে দেয়, আজ রাতে ট্রেন আর চলবে না।
আমি ঘড়ি দেখি, রাত প্রায় দুটো...
ট্রেন থেমে আছে কিপ্লিং স্টেশনে। আমি কম্পার্টমেন্টে এসে দাঁড়াই। মাথা ঝিমঝিম করে। মনে পড়ে আজ সন্ধ্যায় ইয়াং-ব্লোর স্টেশন থেকে বাসায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলাম। একেবারে শেষের সিটে আরাম করে পিঠ হেলিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরে আর কী হলো মনে নেই...। কতোবার ট্রেন তার রুটে চক্কর মেরেছে, আমি একবারও টের পেলাম না কিছু?

এসব যখন ভাবছি, তখন বালিকা জিজ্ঞেস করে – ‘তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ?’
আমি মাথা নাড়ি, ‘না না, ঠিক আছি...’
বালিকা হেঁটে চলে যায়। আমার মনে পড়ে ‘থ্যাঙ্কু’ বলা হয়নি।
আমার ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে বলি, ‘সো নাইস অফ ইউ...’।
তখন আবার আমার মাথায় একটু আগে ঘটে যাওয়া সব মনে পড়ে, ঢাকা-পল্টন-লিমন-জ্যামছ-কোরিয়ান পুলিশ...।
সামনে পা চালাই।
এই মাঝরাতে এখান থেকে কীভাবে বাসায় ফিরবো জানি না।
আমার মাথায় কিছু কাজ করে না।
আমার মনে পড়ে কাক্কুকে। মনে পড়ে কাক্কুকে আমার।
আমার কাক্কুকে মনে পড়ে।
.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP