28 November, 2007

হাজারদুয়ারী: ঐতিহ্য ও আগামীর যোগসূত্র

প্রচার ও প্রসারের সাথে সাথে অন্তর্জালে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে প্রতিনিয়ত। প্রথম থেকেই অনেকে ওয়েবে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিভাগ সংযোগ ও মান উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইউনিকোড ব্যবহার করে বিস্তৃতি পাচ্ছে বাংলা ব্লগিং কিংবা ফোরাম। বিশ্বায়নের ফলে আসন্ন পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার সংকটকে মলিন করে দিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে সাইবার সমাজ, সেখানে পিঁছিয়ে নেই বাংলাদেশের মানুষও। নিজেদের ভাবনা-প্রত্যাশাগুলোকে বিশ্বব্যাপী জানান দিচ্ছে কী-বোর্ডের দূরন্ত গতিতে। লেখালেখি ও ভাবনার এমনি এক আকাশ-উঠোন অনলাইন ম্যাগাজিন 'হাজারদুয়ারী' ।

গত একুশে ফেব্রুয়ারীতে যাত্রা শুরু করে প্রতি মাসের পনেরো তারিখে অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে হাজারদুয়ারী। সাদাকালোয় নির্মিত এ সাইটে ঢুকলেই মনটা ভীষণ নস্টালজিক হয়ে উঠে, 'ঐতিহ্য ও আগামীর যোগসূত্র' শ্লোগানটি যেন ভেতরকার শেঁকড় ধরে টান দেয়। হাজারদুয়ারী ইতোমধ্যে অনেকগুলো দুয়ার খুলে দিয়েছে - সদর দুয়ার, ভাবনা দুয়ার, নন্দন দুয়ার, দখিন দুয়ার, আকাশ দুয়ার এমনই চমৎকার সব নামের বিভাগ যোগ হচ্ছে প্রতি সংখ্যায়। হাজারদুয়ারীর সম্পাদক জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক মাসকাওয়াথ আহসান বলছিলেন - "আমরা নতুন লেখকদের খোঁজে। যারা ভাল লেখেন অথচ লেখা ফেরী করেন না, ডাকসাইটে সম্পাদকদের দপ্তরে ধর্ণা দিতে অনাগ্রহী - আমরা সেইসব প্রচারবিমুখ, নির্লিপ্ত অথচ অহংকারী লেখিয়েদের ভক্ত। …হাজারদুয়ারী আপনার ভাবনা প্রকাশের জায়গা, স্পষ্ট উচ্চারণের প্ল্যাটফরম। যারা লিখতে ভালোবাসেন, ভালোবেসে লিখেন তাদের জন্য হাজারদুয়ারীর সবগুলো দরজা খোলা। চলুন আমরা সবাই মিলে পন্ডিত লেখক এবং সেলিব্রেটি কলামিস্টদের মনোপলি ভেঙে দিই।"

প্রথম ছয়টি সংখ্যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হলেও ভাটা পড়েছে গত তিন মাসে। সর্বশেষ নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশিত হলো কিছুদিন আগে। জানা গেছে - সংশ্লিষ্টদের উৎসাহে কমতি নেই বরং সময় এবং সমন্বয় সংকটেই এ বিলম্ব। এরপরও প্রত্যয়-প্রত্যাশার আশাবাদী ছাপ দেখা গেছে প্রতিটি সংখ্যায়। গল্প-কবিতার পাশাপাশি থাকছে বেশ কিছু ভাবনা জাগানিয়া নিবন্ধ। প্রবাসে বাংলা চর্চা, বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক, সার্ক দিল্লী ঘোষণা, বাঙালীর বৈশাখ ভাবনা, স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কসহ চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো ঠাঁই পেয়েছে হাজারদুয়ারীতে। উঠে এসেছে প্রবাসে সফল বাংলাদেশী হিরোদের গল্প।

পাঠকদের সাড়াও আশাব্যঞ্জক। হাজারদুয়ারীর ওয়েব ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আসাদুজ্জামান রুমন জানালেন - হাজারদুয়ারী পরিব্রাউজে প্রতি মাসে অনেক পাঠক যোগ হচ্ছেন। নতুন অনেক লেখক লেখা পাঠাচ্ছেন, মতামত জানাচ্ছেন। পাঠক মতামতের উপর ভিত্তি করে প্রতি সংখ্যায় বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। ধীর গতির ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে যারা পেজ লোড টাইমিং সমস্যার কথা জানিয়েছেন তাদের জন্যই ইউনিকোড পেজ অপশন থাকছে, বাড়তি পলেস্তারা লাগাতে গিয়ে হাজারদুয়ারী আভিজাত্য হারাতে রাজী নয়, বরং সাদাকালো ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার ফন্টে ঝলমল করে আমাদের অহংকারী বর্ণমালায় সৃষ্ট ভাবনার মহীরুহ।

আগামী সংখ্যা হবে 'বিজয় দিবস' সংখ্যা। স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে যে কোনো রকম লেখা আহ্বান করছে হাজারদুয়ারী। সম্পাদকীয় ডেস্ক থেকে জানা গেছে - ২০০৮এ হাজারদুয়ারী আসবে নতুন আঙ্গিকে, নতুন সম্ভবনায়।

লেখক পাঠকের ধুসর ব্যবধান মুছে দিতে হাজারদুয়ারী আহ্বান জানাচ্ছে - একবার হলেও হাজারদুয়ারী ভিজিট করুন, অন্তত: একটি লেখা পাঠান। নিজের ভেতরের এদিক-ওদিকের ভাবনাগুলোকে জানান দিন হাজারদুয়ারীয়, নিয়মিত।

ইন্টারনেটে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশ ভাবনার এক অনন্য অঙ্গণ হয়ে উঠবে হাজারদুয়ারী ; এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
.
.
.

Read more...

19 November, 2007

নিরবধি পথ ছোঁয়ার শিল্পী; সঞ্জীব চৌধুরী

আমি তখন নচিকেতা-অঞ্জন-সুমনের গানের পাগল। দশ নম্বর গোল চক্করের চৌধুরী উদ্দোগে বলা ছিল - নচিকেতার নতুন অ্যালবাম আসলেই যেন আমাকে জানায়। মাঝে চিটাগাং গিয়ে হাতে পেলাম, দলছুটের অ্যালবাম - 'আহ!''সাদা ময়লা রঙীলা পালে আউলা বাতাস খেলে' নাকি বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান শুভেচ্ছায় প্রচারিত হয়ে বেশ লোকপ্রিয় হয়েছে ইতোমধ্যে। নতুন শিল্পীর গান প্রথমে শুনলে ভালো লাগে না, বারবার শুনতে হয়, কান পেরিয়ে মনে লাগতে সময় লাগে। অথচ, দলছুটের গান নিমিষেই মনে ধরে গেলো।

ক্যাসেট প্লেয়ারে বারবার এপিঠ ওপিঠ করে 'আহ!' শুনি। প্রয়াত বন্ধু শুভ্রর করা প্রথম গানের হামিংটা গুনগুন করি সারাদিন। এরপর অন্যান্য গান, একটার চেয়ে একটা প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায়ই নিজের অজান্তে বলে উঠি - ঐ অন্ধের চোখে কেনো সানগ্লাস? কিনে ফেলেছো কি স্বর্গের সিঁড়ি? কিংবা আমার মনেতে নাই সুখ, চোখের মধ্যে বসত করে অন্য লোকের চোখ। কিছু ভালোলাগা যেমন উড়িয়ে নেয় না, উথাল-পাথাল করে না, বরং - নরম এক আবেশে জড়িয়ে রাখে অনেকক্ষণ, অনেক দিন। সেরকম 'আহ!' অ্যালবামের গানগুলো আমার প্রিয় হয়ে থাকে।

আরও পরে, হয়তো বছর দু'য়েক পরে - ফ্র্যাগমেন্টেড বাক্যের উদাহরণে আশিক বলছিলো - গাড়ী চলে না, চলে না চলে না রে। এটা সম্ভবত: বিটিভি'র ইত্যাদিতে প্রচারিত হয়ে শ্রোতাপ্রিয়। তখন কী যেন ক্যামন একটা সময় ছিল, তাই 'হৃদয়পুর' কিনতে দেরী হয়। চলতি পথে কোথাও 'মেয়ে তুমি এভাবে তাকালে কেনো, এমন মেয়ে কিভাবে বানালে ঈশ্বর' যে হৃদয়পুরের গান সেটাও বোঝতে দেরী হয়। এবার মনে হয় 'আহ!'র স্পর্শ ছাড়িয়ে যায় 'হৃদয়পুর'আমি তোমাকে বলে দেবো, কী যে একা দীর্ঘ রাত আমি কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়, ছুঁয়ে কান্নার রং ছুঁয়ে জোছনার ছায়া! ভেবেছিলাম, বায়সিক অনুসঙ্গে এ মুগ্ধতা; কিন্তু এখন অনুভব করি - স্পর্শের ক্ষমতা যার আছে, সে গানের সময় কোনো ব্যাপার না - এখনও ঠিক একই রকমভাবে শিহরিত হই।

তারপর দুম করে এক বৈশাখে পাই - 'আকাশচুরি'। পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব-বাপ্পা বলছিলেন - বেশ এক্সপেরিমেন্ট আছে অ্যালবামে। আমি গানের তাল-মাত্রা বুঝি না। কথা ভালো লাগলে, সুর ভালো লাগলে চোখ বুঁজে শুনি বারবার। আকাশচুরি শুনে মনে হলো, আসলেই এক্সপেরিমেন্ট আছে। বাপ্পার 'জ্বরের ঘোরে ভালো থাকি, দেখতে আসো কেমন আছি, রাখো হাত কপালটায়, পুড়ে যাওয়ার কিছু থাকে না বাকী' যেমন ছেলেমানুষী মনে জ্বর প্রত্যাশী করে, তেমনি সঞ্জীবের 'আগুনের কথা বন্ধুকে বলি' দগদগে ক্ষত তৈরি করে, আমাকে নষ্ট শহরের নষ্ট ছেলে করে দেয়। ফরহাদ মজহারের লেখা এ গানে কোথায় যেনো আমি আমাকে খুঁজে পাই। দীর্ঘদিন যাবত আমার এমএসএনে নিক ছিলো - 'নষ্ট শহরের নষ্ট ছেলে'।

এরপর ২০০৩এর ডিসেম্বরে 'স্বপ্নবাজি' নিয়ে হাজির হন সঞ্জীব। এক পলকে চলে গেলো, আহ কি যে তার মুখখানা রিক্সা কেনো আস্তে চলে না? স্বপ্নবাজি খুব বেশী প্রভাব ফেলেনি, কারণ ব্যক্তিগত স্বপ্নময়তা কিংবা বাজির দরে তখন আমি ক্লান্ত, ম্যাটাডোরের লাল ষাঁড়। লাল কাপড়ের পেছনে দৌঁড়াতে দৌড়াতে থাইল্যান্ড এসে যখন থামলাম, তারও পরে দেশে যাবার সময় স্বপ্নবাজি ব্যাকুল করে দিলো। সেটা পরে বলছি।

একটা সময় ছিল বন্ধুসভার জন্য অপেক্ষা, বুধবার। ২০০১এ বন্ধুসভা 'মহানির্বাচন' আয়োজন করে সেরা লেখক বন্ধু ঠিক করলো। আমি বরাবরের মতোই পাঠক, অনুষ্ঠানেও গেলাম দর্শক হিসাবে একা। অনুষ্ঠানে নাম জানা অনেক লেখক-বন্ধুকে দেখলাম। দেশের দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাঠক পাতার প্রথম সম্পাদক হিসেবে আজীবন সম্মাননা দেয়া হলো সঞ্জীব চৌধুরীকে। চেয়ারে বসেছিলেন অনেকটা রাজার ভঙ্গিতে, মাথা উঁচু করে। শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইলেন। গাড়ী চলে না দিয়ে নাচিয়ে গেলেন। দলছুটের গান শোনার সুযোগ আসে আরেকবার পরের বছর আর্মী স্টেডিয়ামে। কোনো এক অসুস্থ শিশুকে সাহায্য করতে অন্তর শো বিজের আয়োজন। অঞ্জন-নচিকেতা-দলছুট-আজম খান-ওয়ারফেজ। আগ্রহটা বেশী ছিল অঞ্জন দত্ত আর নচিকেতার জন্য। বিশাল লাইন পেরিয়ে যখন আর্মী স্টেডিয়ামে ঢুকি তখন মঞ্চে দলছুট। প্রথম বারের মতো শুনলাম - তুমি আমার বায়ান্ন তাস। পরে রেডিও মেট্রোওয়েভে শুনলেও ঐ কনসার্টের স্টাইলটা মনে গেঁথে আছে। তুলনামূলক ধীর গতির সুরটাও।

স্বপ্নবাজির কথা বলছিলাম। দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি ও যাওয়া আমার কাছে বিশাল এক আনন্দের ব্যাপার। ছুটির আবেদন, প্লেনের টিকিট, বাসের টিকিট, বিমান বাংলাদেশ ৬/৭ ঘন্টা ডিলে হয়ে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা এসবই আনন্দের, ভীষণ আনন্দের। গত বছর জানুয়ারীতে দেশে যাবো। যাওয়ার আগের রাতে আমার ঘুম হয় না। খানিকটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। আবার মনে হয় ঘুমালে আমি অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে যাবো। এখানে আমাকে ডাকার কেউ নেই, ফ্লাইট মিস হবে! তাই রাত জেগে গান শুনি। আচমকা সঞ্জীবের 'যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন, যাই পেরিয়ে ব্যস্ত নদী অশ্রু আয়োজন' নতুনভাবে মুগ্ধতা জাগায়। বাকী রাত এ গান শুনে কাটিয়ে দিই। হেমন্তের 'পথের ক্লান্তি ভুলে' ছাড়া এমন বাড়ী ফেরার গান আর শুনিনি। আর কোনো গান এমন করে আমাকে ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল করতে পারেনি।

দলছুটের সঞ্জীব চৌধুরীর অনেক পরিচয়। পত্রিকায় দেখলাম ছাত্রজীবনে তুমুল তুখোড় ছিলেন, রাজনীতি করেছেন, কবিতা গানে অদম্য। এটিএনে এক ধারাবাহিক নাটকে (?সুখের লাগিয়া?) অভিনয়ও করেছেন। পরিচয়ে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তারুণ্যের প্রাধান্য দিতেন। গতকাল থেকে মনে পড়ছে আলী মাহমেদ শুভ'র একটা কথা। 'একালের রূপকথা' বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন - সঞ্জীব চৌধুরী লেখক বানাবার মেশিন।

দিনলিপি লিখতে ভালো লাগে না। খালি মন খারাপের কথা আসে। পরশু শনিবার মরার মতো ঘুমিয়েছি। সন্ধ্যায় কানে আইপড চাপিয়ে চিরচেনা নোরা রেস্টুরেন্টে খেতে বসি। রাস্তার পাশে খোলা আয়োজন। 'তোমার ভাঁজ খুলো আনন্দ দেখাও করি প্রেমে তরজমা' - অকারণ ভালো লাগা আনে। এমনটি আনে প্রায়ই সুবীর নন্দী, শাহনাজ রহমতউল্লাহ কিংবা নিয়াজ মোহম্মদ চৌধুরী। অধুনা শিরিন, হাবীব, শান্তারাও ভর করে। বাসায় ফিরে শুঁড়িখানা ব্লগে দেখি সঞ্জীব চৌধুরী অসুস্থ! এরপর নানা আপডেট। অনেকের মতো আমিও মিরাকলের আশায় থাকি। এখনো 'জোছনা বিহার' শোনা হয়নি। তৃষ্ণা মেটেনি। সঞ্জীবের গান আরও চাই, সঞ্জীবকে চাই। নানা গুজবও রটে সংবাদ অসংবাদের। পড়তে ইচ্ছে করে না। একজন মানুষ, প্রিয় শিল্পী এরকম করে কেনো চলে যাবে?

--- শেষে চলে যায়। কেনো যায়? এ প্রশ্নের জবাব আমি জানি না, ঈশ্বরের নিষ্ঠুরতায় নীরব হয়ে থাকি। সঞ্জীব চৌধুরী চলে গেছেন, যেখানেই যাক - ভালো থাকুক। তাঁর গানগুলো থাকুক আগামীর দিনগুলোয়, আমাদের মাঝে কালজয়ী হয়ে।
.
.
.

Read more...

08 November, 2007

পরোটা, সুচিত্রা সেন এবং সন্দেহ

কয়েক দিন আগে আয়নার সামনে যখন ব্যাপারটা চোখে পড়লো, তখনও সাত্তার মামা তেমন গুরুত্ব দেননি। মাথার হাজার হাজার চুলের মাঝে দু'য়েকটা সাদা হয়ে গেলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হয়! বরং দুপাশে জুলফির ওপরে সাদা চুল ঘন হয়ে আসলে খানিকটা আভিজাত্য আসে। ক্ষণিক সময়ে সাত্তার মামা ভাবছিলেন - আরো কিছু চুল সাদা হয়ে উঠুক, চশমার কালো ফ্রেমের সাথে মিলিয়ে নতুন গেট আপ মন্দ হবে না একেবারে। এ বয়সে স্মিত-সৌম্য চেহারা নিয়ে প্যাকেজ নাটকে নায়ক হওয়া যাবে না, বাংলালিংকের আপার ক্লাস প্যাকেজের মডেল হওয়া যাবে না, প্রমিত উচ্চারণে বিটিভি'র টক শো ও করা যাবে না। তবুও অন্তত: অফিসে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ধরে রাখা যাবে। পাশের ডেস্কের ত্রিশোর্ধ্ব লতিফ সাহেব যখন নীলক্ষেত থেকে কেনা ডেল কার্নেগী কিংবা ম্যালকম গ্লাডোয়েলের বাংলা সংস্করণ পড়ে সাফল্যের দরজা খুঁজছে, তখন সাত্তার মামা নিজেই কার্নেগী, কিংবা আরও বেশি কিছু হবেন। অফিসের বোর্ড মিটিংয়ে কল মানি রেট কিংবা এল সি নিয়ে আলোচনায় নিজস্ব মতামত শেষে চশমায় ধাক্কা দিয়ে সাদা চুলগুলোর উজ্জ্বল্য ফুটিয়ে তোলা যাবে। মনে হবে - সাদা চুলগুলো মোটেও বয়সের চিহ্ন নয়, বরং অভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ। অথচ মামার সমস্ত ভাবনাকে তুচ্ছ করে দিলো সেদিন মারিয়ার ছোট্ট একটি কথা।

মামা যে ব্যাংকে চাকরী করেন মারিয়া সেখানে ইন্টার্ণ। জানুয়ারী-মে-সেপ্টেম্বর মাস ধরে ধরে এরকম ইন্টার্ণরা আসে, চলে যায়। কারো কারো শেখার আগ্রহ, কারো টাইম পাস, আবার কারো কাছে ইন্টার্ণ কোর্স করতে হবে বলে করা। গত তিন বছরে মামার ব্রাঞ্চে ইন্টার্ণ হিসেবে মেয়েদেরই প্রাধান্য। বিভিন্ন প্রাইভেট য়্যূনিভার্সিটির ছেলে-মেয়েরা আবেদন করে। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছোটোখাটো ইন্টারভিউতে-ও বসেন। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে বাছাই করেন। এ প্রক্রিয়ায় সাত্তার মামা কখনোই নিজেকে জড়াতে চাননি, প্রোবেশনারী পিরিয়ডের জুনিয়র অফিসারদের মতো উথাল-পাথাল আগ্রহ নিয়েও ইন্টার্ণদের দিকে তাকাননি। মনের ভেতর একটা ধারণা ছিলো - ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের বুদ্ধি সুদ্ধি ভালো আছে। তুলনামূলকভাবে স্মার্ট মেয়েদের ইন্টার্ণ হিসেবে নিয়ে একদিকে অফিসের সৌন্দর্য্য বাড়ছে, আবার ঝিমুনিঅলা স্টাফরা মোটিভেটেড হচ্ছে। যেমন - লতিফ সাহেবের কথাই ধরা যাক, সকাল নয়টায় অফিস শুরু অথচ তিনি কখনো নয়টা দশের আগে আসতে পারেন না। হেলেদুলে যাও আসেন, নেক টাই পরিমাণে লম্বা অথবা বিশ্রী রকম খাটো হয়ে যায়। অনেক বলাবলিতেও লতিফ সাহেবের পরিবর্তনের লক্ষণ ছিলো না, অথচ - ইন্টার্ণ আসার সাথে সাথে লতিফ সাহেব ন'টা বাজার দশ মিনিট আগে অফিসে, পরিপাটি চুল, গায়ে ইদানিং খানিকটা ইনফিনিটিও মাখেন মনে হয়! আর প্রোবেশনারী পিরিয়ডের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনীরা লাঞ্চ ব্রেকের সময় কমিয়ে মন দিয়ে কাজ করে, কথাবার্তায়ও পরিমিত-মার্জিত হয়ে ওঠে। এতোদিন দূর থেকে মামা এগুলো দেখে নিজের মাঝে নিজে নানান বিশ্লেষণ করে আমোদিত হয়েছেন কেবল। কিন্তু এবার মারিয়া আসার পর মামাকেও জড়িয়ে পড়তে হলো। ফিন্যান্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কনসেন্ট্রেশনের মারিয়া কাজ করছে ইন্টার-ব্যাংক লোন রেট আর ফরেন কারেন্সী ম্যানেজমেন্টের উপর। সিনিয়র ব্যাংকার হিসেবে মামার উপরেই সব ঘাপলা। একটু পরপর মারিয়া এটা সেটা প্রশ্ন নিয়ে মামার ডেস্কে ঘেঁষে আসে। তত্ত্বীয় অনেক বিষয় ভুলে গেলেও মামা মোটামুটি জবাব দিয়ে কাজ সারতে পারেন। তবে ইদানিং প্রফেসর এম এ মান্নানের 'ব্যাংকিং যুগে যুগে' বইয়ে চোখ বুলান সামান্য। সাত্তার মামা আর মারিয়ার এ সংশ্লিষ্টতা কিংবা ঘনিষ্টতা নিয়ে অফিসে বেশ ফিসফাস গুজগুজ শোনা যায়। তরুণরা এ ব্যাপারে খানিকটা অস্থির কিংবা হিংসা বোধ করতেই পারে, সেটা সাত্তার মামার কাছে জটিল কিছু নয়। বরং লতিফ সাহেব যখন ইনিয়ে বিনিয়ে মামার বয়সের ব্যাপারটা আলোচনায় নিয়ে আসে, তখন মেজাজ আসলেই চড়ে ওঠে। এই যেমন সেদিন, ডলারের উর্ধ্বগতির সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক এবং সময়ের সাথে ব্যবসা বিধির পরিবর্তন নিয়ে মামা যখন মারিয়াকে চমৎকার জ্ঞান দিচ্ছিলেন, পাশ থেকে লতিফ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে অহেতূক জিজ্ঞেস করে - "সাত্তার ভাইয়ের ম্যাট্রিক তো বোধ হয় দেশ স্বাধীনের আগে, নাকি?"
সাত্তার মামা কিছু বলার আগেই মারিয়া বলে ওঠে - "সাত্তার ভাই তাহলে আমার ড্যাডিদের ব্যাচের হবেন।"
তখনি কোণার ডেস্ক থেকে সাকিল টিপ্পনী কাটে - "সাত্তার ভাইকে দেখলে সেরকম বয়েসী মনেই হয় না!"

এসব বিদ্রুপকে সাত্তার মামা নিতান্তই পরশ্রীকাতরতা ভাবেন। বরং লাঞ্চ আওয়ারে মারিয়ার সাথে একত্রে খেতে বসে হতভাগা তরুণদল কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী লাতিফ সাহেবের দিকে মুচকি হাসি ছুঁড়েন। খাবার টেবিলে মারিয়ার সাথে টুকটাক আলাপ হয়। ব্যাংকিং সেক্টর, ক্যারিয়ার, জেনারেশন গ্যাপ কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি শাড়ী-গহনার আলাপও জমে ওঠে। মারিয়া ইদানিং সাত্তার মামার টিফিন বক্সে হাত বাড়াচ্ছে। মামীর রান্না করা মিক্সড ভেজিট্যাবলের মৌতাত ঘ্রাণে মারিয়া লোভ সামলাতে পারে না। মামাও আগ্রহ নিয়ে কয়েক চামচ সব্জিভাজি তুলে দেন। বিনিময়ে মারিয়ার প্লেট থেকে মুরগির রান পাওয়া যায়।

মামীর রান্নার প্রতি মারিয়ার এ মুগ্ধতা মামা গোপন রাখতে পারেন না। বাসায় ফিরে মামীর কাছে মারিয়ার কথা ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড গল্প করেন। প্রথম প্রথম মামী তার স্বভাব সুলভ নম্রতায় 'কী আর এমন রান্না' বলে উড়িয়ে দিতো। প্রশংসায় গদগদ হয়ে পরে বেশ কয়েক দিন মামার টিফিন বক্সে মারিয়ার জন্য পরোটা-সব্জি পাঠিয়েছে। মামাও সন্ধ্যায় ফিরে এসে মারিয়ার গল্প বলেছেন নিয়মিত। মামার মুখে ক্রমাগত মারিয়ার গল্প শুনতে শুনতে মামীর সন্দেহ বোধটা জেগে ওঠে একদিন। সেদিন অফিসে মারিয়া সবুজ প্রিন্টের-কালো পাড়ের বালুচূড়ি কাতান শাড়ী পড়ে এসেছিল, রাপা প্লাজার যার দাম হাজার দুয়েকের মতো। মামীকে সেরকম একটি শাড়ী কিনে দেয়ার কথা বলার পর, মামীর মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটা নিমিষেই উধাও হয়ে যায় মামার এক সম্পূরক মন্তব্যে - 'মারিয়াকে শাড়ীতে আসলেই ভালো লাগছিল'। মামার এ প্রশংসা বাক্য মামীর কাছে আরও বেশী কিছু মনে হলো, এবং মারিয়া নামটা নিমিষেই এক ঘোর শত্রু-শব্দে রূপ নিলো। এ নিয়ে মামী কথা আগালো না, তবে সে রাতে ঘুমও ভাঙলো বেশ কয়েকবার। মাঝ রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে মামা অস্ফুট শব্দে 'মারিয়া' বললো নাকি 'মা রে' বললো সেটা মামী ঠিক নিশ্চিত হতে পারলো না। এ দু:শ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে পরদিন সকালে মামীর মাথা ব্যথা দেখা দিলো, বিছানা ছাড়তে দেরী হলো, এবং মামা সকালের নাস্তা না করে - টিফিন না নিয়ে বাসা থেকে বেরুলেন।

মামীর মাথা ব্যথার ব্যাপারটিকে সাত্তার মামা একেবারে তুচ্ছ মনে করলেন না। বিশ-বাইশ বছরের সংসার জীবনে মামা খেয়াল করেছেন, কোনো কিছু গড়বড় হলেই মামীর মাথা ব্যথা হয়, এবং সেটা প্রায়শই অভিমান-অনুযোগ-রাগ থেকে সৃষ্টি। গতকাল এমন কিছু হয়নি যে মামীর মাথা ব্যথাটা চড়ে উঠবে! মামার আরও অবাক লাগে - বালুচুড়ি কাতান শাড়ি কেনার ব্যাপারে মামী কোনো আগ্রহই দেখালো না! মামীর এ ভিন্ন আচরণে মামার মনে হলো দিনটাই মাটি হবে। এসব অস্থির ভাবনায় দুপুরে বাইরে খেতে যাওয়ার সময় মারিয়া ডাক দেয় - 'বাইরে যেতে হবে না, আমি আপনার জন্য খাবার এনেছি আজ।' মামা আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন সাকিল-লতিফরা কেউ শুনলো কিনা। মারিয়া সেদিন স্যান্ডউইচ আর কিমা পরোটা এনেছিল। খেতে খেতে নাটক সিনেমা নিয়ে গল্প হয়। গল্প হয় - সুচিত্রা সেনের সাম্প্রতিক অসুস্থতা নিয়ে। মারিয়া আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে চোখ রাখছে নিয়মিত। মামাও তার এক সময়কার স্বপ্নকণ্যা সুচিত্রা সেনের সিনেমা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। আনমনে নিজেকে আবার উত্তম কুমার মনে হয়। মামার চুলের স্টাইলটা এখনো সেরকম আছে অবিকল। ভাবনার ডানা প্রশাখা গড়িয়ে জুলফির উপরের সাদা চুলে যেতেই মারিয়া বলে উঠে - "সাত্তার ভাই, চুলে কালার করেন না কেনো?"
সাত্তার মামার মনে হলো কেউ যেনো তার দু'গালে চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে বসেছে। চোখ-কান গরম হয়ে আসে। তবুও হাসি দিয়ে সাত্তার মামা বলেন - "পাকা চুল কই? অল্প দুয়েকটা চোখে পড়ে!"
মারিয়া এবার হাসি দেয়, মনে হয় চরম বিদ্রুপের হাসি - "আয়নায় তাকিয়ে দেখেন, দুপাশের সব পাকা চুল উঁকিঝুকি দিচ্ছে, হি হি হি।"
জুলফির ওপরের পাকা চুল নিয়ে মামা যে আভিজাত্য ভাবনায় ডুবে ছিলেন কিছুদিন আগে, সেটা তুচ্ছ করে দিলো মারিয়ার এ ছোট্ট একটি কথা। আশেপাশে কেউ নেই, তবুও সাত্তার মামার মনে হয় - অফিসের সবাই এ কথা শুনে গেলো, এরপর সাকিল-লতিফরা কথায় কথায় পাকা চুলের কথা টেনে আনবে, মামাকে অপমান করবে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সাত্তার মামার মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। সকালে মামীর মাথা ব্যথা, দুপুরে মারিয়ার বিদ্রুপ সব মিলিয়ে বাজে একটি দিন গেলো। বাসাবো মোড়ে বাস থেকে নেমে কেনো জানি - সুচিত্রা সেনের কথা মনে পড়ে বারবার। মামীও উত্তম-সুচিত্রা জুটির ফ্যান। ভেবে চিন্তে মামা ঢুকলেন মিউজিক প্যালেসে। উত্তম সুচিত্রার তিনটি সিনেমার সিডি কিনে বাসার পথে রওনা দেন। মনটা উড়ুউড়ু হয়ে ওঠে মুহুর্তে। এ উড়ন্ত মনকে আরেকটু চটকে দেয় কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কংকন হেয়ার ড্রেসিং। মারিয়ার বিদ্রুপ ঢাকতে মামা সেলুনে ঢুকে চুলে কালার করান। নাপিত ছোকড়া যখন জুলফির ওপরে কালো রঙ করছিল, তখন মামার মনটাও রঙীন হয়ে উঠে।

বাসায় ফিরে মামীর কাছে চুল কালারের ঘটনা চেপে যান এবং মামীর মাথা ব্যথা সেরে গেছে জেনে মন আরও ভালো হয়ে যায়। মামীও উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখার আগ্রহে সন্ধ্যায় বাসার পুলি-পিঠা বানায়। সারাদিনের মন খারাপের মেঘ কেটে সাত্তার মামার মনের আকাশে রোদের ঝলকানি লাগে। রাতের খাবার শেষে আগ্রহ নিয়ে দু'জন সিনেমা দেখতে বসে। প্রথমে 'ইন্দ্রাণী'; মামীর প্রিয় ছবি।
এক পর্যায়ে সুচিত্রা সেন বলছে - 'বাড়ীটা একটু ছোটো হয়ে গেলো'।
উত্তম কুমার জানালার কাছে দাড়ানো। গুনগুন করে নায়ক গান শুরু করে - "নীড় ছোটো, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো"।
সুচিত্রা সেন ঘাঁড় ফিরিয়ে উত্তম কুমারের দিকে তাকায়। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটের দুপাশে হাসি আস্তে আস্তে বিস্তৃত হয়। সাত্তার মামার মনে হয় - যৌবনের সে-ই বুক ধুপধুপটা আবার শুরু হবে আজ!
মামা রি-ওয়াইন্ড করে আবার দেখেন, সুচিত্রার ভুবনজয়ী হাসি।
মামীকে বলেন - "দেখো, হাসিটা খুব দারুণ না!"
মামী চুপচাপ।
মামা পাশে তাকিয়ে দেখেন, মামী দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে।
গায়ে হাত দিয়ে মামা আস্তে করে ধাক্কা দেন - "কি হলো? সিনেমা দেখছো না? ঘুমাচ্ছো নাকি?"
- "খুব মাথা ধরেছে, ভালো লাগছে না"। মামীর এ মৃদূ জবাবে মামা কোনো পলেস্তারা খুঁজে পেলেন না। মামীর মাথা ধরার কারণ সন্ধানে না গিয়ে মামা আপাত: উত্তম-সুচিত্রার গভীর প্রেমের সংলাপে ডুবে যান। পছন্দ মতো রি-ওয়াইন্ড/ফরওয়ার্ডও করেন।

আরও সময় পরে, সিনেমা প্রায় শেষের দিকে যখন, মামা শুনতে পান - মামী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ কান্নার কি হলো? মামীর কপালে হাত রেখে মামা জিজ্ঞেস করেন - "কী হলো, দু:স্বপ্ন দেখছো?"
মামী এক ঝাপটায় মামার হাতটা দূরে সরিয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে - "পোড়া মিনসে, আমি সকালে এক্সট্রা পরোটা-সব্জি বানিয়ে দিই - আর সন্ধ্যায় উনি জামায় কাজলের দাগ নিয়ে ঘরে ফিরেন!"
মামা থতমত খান।
মামীর ফোঁসফোস কান্নাটা বেড়ে চলেছে।

মামা টিভি বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

.
.
. *****************************************


২০১৪ এডিটেড



কয়েক দিন আগে আয়নার সামনে যখন ব্যাপারটা চোখে পড়লো, তখনো তেমন গুরুত্ব দেননি সাত্তার মামামাথার হাজার হাজার চুলের মাঝে দু'য়েকটা সাদা হয়ে গেলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হয়! বরং দুপাশে জুলফির ওপরে সাদা চুল ঘন হয়ে এলে খানিকটা আভিজাত্য আসে। তাই সাত্তার মামা ভাবছিলেন, আরো কিছু চুল সাদা হয়ে উঠুক, চশমার কালো ফ্রেমের সাথে মিলিয়ে নতুন গেট আপ মন্দ হবে না একেবারে। এ বয়সে স্মিত-সৌম্য চেহারা নিয়ে প্যাকেজ নাটকে নায়ক হওয়া যাবে না, আকাশ-ঢাকা বিলবোর্ডে হাস্যজ্জ্বোল মডেল হওয়া যাবে না, প্রমিত উচ্চারণে টেলিভিশনের মধ্য রাতের টক-শোও করা যাবে না। তবুও, অন্তত: অফিসে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ধরে রাখা যাবে। পাশের ডেস্কের ত্রিশোর্ধ্ব লতিফ সাহেব যখন নীলক্ষেত থেকে কেনা ডেল কার্নেগী কিংবা ড্যান ব্রাউনের বাংলা সংস্করণ পড়ে সাফল্যের দরজা খুঁজছে, তখন সাত্তার মামা নিজেই কার্নেগী, কিংবা আরো বেশি কিছু হবেন। অফিসের বোর্ড মিটিংয়ে কল মানি রেট কিংবা লেটার অভ ক্রেডিট নিয়ে আলোচনায় নিজস্ব মতামত শেষে চশমায় ধাক্কা দিয়ে সাদা চুলগুলোর ঔজ্জ্বল্য ফুটিয়ে তোলা যাবে। মনে হবে - সাদা চুলগুলো মোটেও বয়সের চিহ্ন নয়, বরং অভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ। অথচ মামার সমস্ত ভাবনাকে তুচ্ছ করে দিলো সেদিন মারিয়ার ছোট্ট একটি কথা।

মামা যে ব্যাংকে চাকরী করেন মারিয়া সেখানে ইন্টার্ণ। জানুয়ারী-মে-সেপ্টেম্বর মাস ধরে ধরে এরকম ইন্টার্ণরা আসে, চলে যায়। কারো কারো শেখার আগ্রহ, কারো কাছে হাজিরা দেয়াটাই মূল। গত তিন বছরে মামার ব্রাঞ্চে ইন্টার্ণ হিসেবে মেয়েদেরই প্রাধান্য। বিভিন্ন প্রাইভেট য়্যূনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা আবেদন করে। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছোটোখাটো ইন্টারভিউতেও বসেন। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে বাছাই করেন। এ প্রক্রিয়ায় সাত্তার মামা কখনোই নিজেকে জড়াতে চাননি প্রোবেশনারী পিরিয়ডের জুনিয়র অফিসারদের মতো উথাল-পাথাল আগ্রহ নিয়েও ইন্টার্ণদের দিকে তাকাননি। মনের ভেতর একটা ধারণা ছিলো, ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের বুদ্ধি সুদ্ধি ভালো আছে। তুলনামূলকভাবে স্মার্ট মেয়েদের ইন্টার্ণ হিসেবে নিয়ে একদিকে অফিসের সৌন্দর্য্য বাড়ছে আবার ঝিমুনিঅলা স্টাফরা মোটিভেটেড হচ্ছে। যেমন - লতিফ সাহেবের কথাই ধরা যাক, সকাল নয়টায় অফিস শুরু অথচ তিনি কখনো নয়টা দশের আগে আসতে পারেন না। হেলেদুলে যা-ও আসেন, নেক টাই আকারে বিশ্রী রকম লম্বা অথবা খাটো হয়ে যায়। অনেক বলাবলিতেও লতিফ সাহেবের পরিবর্তনের লক্ষণ ছিল না অথচ ইন্টার্ণ আসার সঙ্গে সঙ্গে লতিফ সাহেব ন'টা বাজার দশ মিনিট আগে অফিসে আসেন। পরিপাটি চুল, গায়ে ইদানিং খানিকটা পারফিউমও মাখেন! আর প্রোবেশনারী পিরিয়ডের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনীরা লাঞ্চ ব্রেকের সময় কমিয়ে মন দিয়ে কাজ করে, কথাবার্তায়ও পরিমিত-মার্জিত হয়ে ওঠে।
এতদিন দূর থেকে  এগুলো দেখে সাত্তার মামা আপন মনে নানান বিশ্লেষণ করে আমোদিত হয়েছেন কেবল। কিন্তু এবার মারিয়া আসার পর মামাকেও জড়িয়ে পড়তে হলো। ফিন্যান্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কনসেন্ট্রেশনের মারিয়া কাজ করছে ইন্টার-ব্যাংক লোন রেট আর ফরেন কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের পর। সিনিয়র ব্যাংকার হিসেবে মামার উপরেই সব ঘাপলা। একটু পরপর মারিয়া এটা সেটা প্রশ্ন নিয়ে মামার ডেস্কে ঘেঁষে আসে। তত্ত্বীয় অনেক বিষয় ভুলে গেলেও মামা মোটামুটি জবাব দিয়ে কাজ সারতে পারেন। তবে ইদানিং প্রফেসর এম এ মান্নানের 'ব্যাংকিং যুগে যুগে' বইয়ে চোখ বুলান টুকটাক
সাত্তার মামা আর মারিয়ার এ সংশ্লিষ্টতা কিংবা ঘনিষ্টতা নিয়ে অফিসে বেশ ফিসফাস গুজগুজ শোনা যায়। তরুণ সহকর্মীরা এ ব্যাপারে খানিকটা অস্থির কিংবা হিংসা বোধ করতেই পারে, সেটা সাত্তার মামার কাছে জটিল কিছু নয়। বরং লতিফ সাহেব যখন ইনিয়ে বিনিয়ে মামার বয়সের ব্যাপারটা আলোচনায় নিয়ে আসে, তখন মেজাজ আসলেই চড়ে ওঠে মামার এই যেমন সেদিন, ডলারের উর্ধ্বগতির সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক এবং সময়ের সাথে ব্যবসা বিধির পরিবর্তন নিয়ে মামা যখন মারিয়াকে চমৎকার জ্ঞান দিচ্ছিলেন, পাশ থেকে লতিফ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে অহেতূক জিজ্ঞেস করে, সাত্তার ভাইয়ের ম্যাট্রিক তো বোধ হয় দেশ স্বাধীনের আগে, নাকি?’
            সাত্তার মামা কিছু বলার আগেই মারিয়া বলে ওঠে,  সাত্তার ভাই তাহলে আমার ড্যাডিদের ব্যাচের হবেন।  তখনি কোণার ডেস্ক থেকে ছোকড়া সাকিল টিপ্পনী কাটে, সাত্তার ভাইকে দেখলে সেরকম বয়েসী মনেই হয় না!
এসব বিদ্রুপকে সাত্তার মামা নিতান্তই পরশ্রীকাতরতা ভাবেন। বরং লাঞ্চ আওয়ারে মারিয়ার সঙ্গে এক টেবিলে  খেতে বসে হতভাগা তরুণদল কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী লাতিফ সাহেবের দিকে মুচকি হাসি ছোঁড়েনখেতে খেতে মারিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত বিষয়ে আলাপ করেন সাত্তার মামাব্যাংকিং সেক্টর, ক্যারিয়ার, জেনারেশন গ্যাপ কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি শাড়ী-গহনার আলাপও জমে ওঠে। মারিয়া ইদানিং সাত্তার মামার টিফিন বক্সে হাত বাড়াচ্ছে। মামীর রান্না করা মিক্সড ভেজিট্যাবলের মৌতাত ঘ্রাণে মারিয়া লোভ সামলাতে পারে না। মামাও আগ্রহ নিয়ে কয়েক চামচ সব্জিভাজি তুলে দেন। বিনিময়ে মারিয়ার প্লেট থেকে মুরগির রান পাওয়া যায়।
মামীর রান্নার প্রতি মারিয়ার এ মুগ্ধতা মামা গোপন রাখতে পারেন না। বাসায় ফিরে মামীর কাছে মারিয়ার কথা ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড গল্প করেন। প্রথম প্রথম মামী তার স্বভাব সুলভ নম্রতায় 'কী আর এমন রান্না' বলে উড়িয়ে দিতেনপ্রশংসায় গদগদ হয়ে পরে বেশ কয়েক দিন মামার টিফিন বক্সে মারিয়ার জন্য পরোটা-সব্জি পাঠিয়েছেন মামীমামাও সন্ধ্যায় ফিরে এসে মারিয়ার গল্প বলেছেন নিয়মিত। মামার মুখে ক্রমাগত মারিয়ার গল্প শুনতে শুনতে মামীর সন্দেহ বোধটা জেগে ওঠে একদিন। সেদিন অফিসে মারিয়া সবুজ প্রিন্টের-কালো পাড়ের বালুচূড়ি কাতান শাড়ী পড়ে এসেছিল, রাপা প্লাজার যার দাম সাত হাজার টাকার মতো। মামীকে সেরকম একটি শাড়ী কিনে দেয়ার কথা বলার পর, মামীর মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিমিষেই উধাও হয়ে যায় মামার এক সম্পূরক মন্তব্যে - 'মারিয়াকে শাড়ীতে আসলেই ভালো লাগছিল'মামার এ প্রশংসা বাক্য মামীর কাছে আরো বেশী কিছু মনে হলো এবং মারিয়া নামটা নিমিষেই এক ঘোর শত্রু-শব্দে রূপ নিলো। এ নিয়ে মামী কথা বাড়ালেন না তবে সে রাতে মামীর ঘুম ভাঙলো বেশ কয়েকবার। মাঝ রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে মামা অস্ফুট শব্দে 'মারিয়া' বললো নাকি 'মা রে' বললো সেটা মামী ঠিক নিশ্চিত হতে পারলেন না। এ নিয়ে দু:শ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে পরদিন সকালে মামীর মাথা ব্যথা দেখা দিলো, বিছানা ছাড়তে দেরী হলো, এবং মামা সকালের নাস্তা না করে - টিফিন না নিয়ে বাসা থেকে বেরুলেন।
মামীর মাথা ব্যথার ব্যাপারটিকে সাত্তার মামা একেবারে তুচ্ছ মনে করলেন না। বিশ-বাইশ বছরের সংসার জীবনে মামা খেয়াল করেছেন, কোনো কিছু গড়বড় হলেই মামীর মাথা ব্যথা হয়, এবং সেটা প্রায়শই অভিমান-অনুযোগ-রাগ থেকে সৃষ্ট গতকাল এমন কিছু হয়নি যে মামীর মাথা ব্যথাটা চড়ে উঠবে! মামার আরও অবাক লাগে - বালুচুড়ি কাতান শাড়ি কেনার ব্যাপারে মামী কোনো আগ্রহই দেখালো না! মামীর এ ভিন্ন আচরণে মামার মনে হলো আজ দিনটাই মাটি হবে। এসব অস্থির ভাবনায় দুপুরে বাইরে খেতে যাওয়ার সময় মারিয়া ডাক দেয় - 'বাইরে যেতে হবে না, আমি আপনার জন্য খাবার এনেছি আজ।'
মামা আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন সাকিল-লতিফরা কেউ শুনলো কিনা। মারিয়া সেদিন স্যান্ডউইচ আর কিমা পরোটা এনেছিল। খেতে খেতে নাটক সিনেমা নিয়ে গল্প হয়। গল্প হয় - সুচিত্রা সেনের প্রয়ান, রহস্যময় জীবন এবং এ নিয়ে বিভিন্ন গুজব নিয়ে। মারিয়া আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে পড়ে শোনাচ্ছিল সেদিনমামাও তার এক সময়কার স্বপ্নকন্যা সুচিত্রা সেনের সিনেমা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। আনমনে নিজেকে আবার উত্তম কুমার মনে হয়। মামার চুলের স্টাইলটা এখনো সেরকম আছে অবিকল। ভাবনার ডানা প্রশাখা গড়িয়ে জুলফির উপরের সাদা চুলে যেতেই মারিয়া বলে উঠে সাত্তার ভাই, চুলে কালার করেন না কেন?
সাত্তার মামার মনে হলো কেউ যেনো তার দু'গালে চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে বসেছে। চোখ-কান গরম হয়ে আসে। তবুও হাসি দিয়ে সাত্তার মামা বলেন পাকা চুল কই? অল্প দুয়েকটা চোখে পড়ে!
মারিয়া এবার হাসি দেয়, মনে হয় চরম বিদ্রুপের হাসি আয়নায় তাকিয়ে দেখেন, দুপাশের সব পাকা চুল উঁকিঝুকি দিচ্ছে, হি হি হি'
জুলফির ওপরের পাকা চুল নিয়ে মামা যে আভিজাত্য ভাবনায় ডুবে ছিলেন কিছুদিন আগে, সেটা তুচ্ছ করে দিলো মারিয়ার এ ছোট্ট একটি কথা। আশেপাশে কেউ নেই, তবুও সাত্তার মামার মনে হয় - অফিসের সবাই এ কথা শুনে গেল এরপর সাকিল-লতিফরা কথায় কথায় পাকা চুলের কথা টেনে আনবে, মামাকে অপমান করবে।
সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সাত্তার মামার মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। সকালে মামীর মাথা ব্যথা, দুপুরে মারিয়ার বিদ্রুপ সব মিলিয়ে বাজে একটি দিন গেলো। বাসাবো মোড়ে বাস থেকে নেমে সুচিত্রা সেনের কথা মনে পড়ে বারবার। মামীও উত্তম-সুচিত্রা জুটির ভক্তভেবে চিন্তে মামা ঢুকলেন মিউজিক প্যালেসে। উত্তম সুচিত্র জুটি অভিনীত সিনেমার ডিভিডি কিনে বাসার পথে রওনা দেন। মনটা উড়ুউড়ু হয়ে ওঠে মুহূর্তেএ উড়ন্ত মনকে আরেকটু চটকে দেয় কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কংকন হেয়ার ড্রেসিং। মারিয়ার বিদ্রুপ ঢাকতে মামা সেলুনে ঢুকে চুলে কালার করান। নাপিত ছোকড়া যখন জুলফির ওপরে কালো রঙ করছিল, তখন মামার মনটাও রঙীন হয়ে উঠে।
সাত্তার মামা বাসায় ফিরে মামীর কাছে চুল কালারের ঘটনা চেপে যান এবং মামীর মাথা ব্যথা সেরে গেছে জেনে মন আরও ভালো হয়ে যায়। মামীও উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখার আগ্রহে সন্ধ্যায় বাসা পুলি-পিঠা বানায়। সারাদিনের মন খারাপের মেঘ কেটে সাত্তার মামার মনের আকাশে রোদের ঝলকানি লাগে। রাতের খাবার শেষে আগ্রহ নিয়ে দু'জন সিনেমা দেখতে বসে। প্রথমে 'ইন্দ্রাণী'; মামীর প্রিয় ছবি।
এক পর্যায়ে সুচিত্রা সেন বলছে বাড়ীটা একটু ছোটো হয়ে গেল
উত্তম কুমার জানালার কাছে দাড়ানো। গুনগুন করে নায়ক গান শুরু করে - নীড় ছোটো, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো
সুচিত্রা সেন ঘাঁড় ফিরিয়ে উত্তম কুমারের দিকে তাকায়। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটের দুপাশে হাসি আস্তে আস্তে বিস্তৃত হয়। সাত্তার মামার মনে হয়, যৌবনের সে-ই বুক ধুপধুপটা আবার শুরু হবে আজ!
মামা রি-ওয়াইন্ড করে আবার দেখেন, সুচিত্রার ভুবনজয়ী হাসি।
মামীকে বলেন দেখো, হাসিটা কী সুন্দর!
মামী চুপচাপ।
মামা পাশে তাকিয়ে দেখেন, মামী দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে
গায়ে হাত দিয়ে মামা আস্তে করে ধাক্কা দেন কি হলো? সিনেমা দেখছো না? ঘুমাচ্ছো নাকি?
খুব মাথা ধরেছে, ভালো লাগছে না মামীর এ মৃদূ জবাবে মামা কোনো পলেস্তারা খুঁজে পেলেন না। মামীর মাথা ধরার কারণ সন্ধানে না গিয়ে মামা আপাত: উত্তম-সুচিত্রার গভীর প্রেমের সংলাপে ডুবে যান। পছন্দ মতো রি-ওয়াইন্ড/ফরওয়ার্ডও করেন।
আরও সময় পরে, সিনেমা প্রায় শেষের দিকে যখন, মামা শুনতে পান - মামী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেহঠাৎ কান্নার কি হলো? মামীর কপালে হাত রেখে মামা জিজ্ঞেস করেন কী হলো, দু:স্বপ্ন দেখছো?
মামী এক ঝাপটায় মামার হাতটা দূরে সরিয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘পোড়া মিনসে, আমি সকালে এক্সট্রা পরোটা সব্জি বানিয়ে দিই - আর সন্ধ্যায় উনি জামায় কাজলের দাগ নিয়ে ঘরে ফিরেন!
মামা থতমত খান।
মামীর ফোঁসফোস কান্নাটা বেড়ে চলেছে।
মামা টিভি বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।


Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP