30 August, 2008

ইদানিং দ্রুত সন্ধ্যা নামে

গত রাতের বৃষ্টিতে রাস্তায় কাদা হয়ে গেছে। দশ নম্বর গোল চক্করে কাদায় থকথক। আলতো করে পা ফেলে গুটি গুটি করে আগাই। যাবো গুলশান। মিশুক ড্রাইভার 'একদাম একশ' টাকা' বলে ফিরে তাকালো না। আমিও সামনে যাই। বনানী কাকলীর জন্য মানুষের দৌড়। শাদা মাইক্রো কাকলী কাকলী বলে ডাকলে আমি দৌড়ে উঠি, সাথে আরো ৬ জন। ক্যান্টনমেন্টে প্রচন্ড জ্যাম। শনিবারে এত গাড়ী হবে ভাবিনি।

এ পথ আমার অনেক চেনা। জলপাই সাম্রাজ্যের মইনুল রোড।
অনেক সকাল দুপুরের আনন্দ বেদনা গন্তব্য।
জীবনের শ্রেষ্ঠতম এক দৃশ্য দেখেছিলাম এ রাস্তায়।
গোধুলির আলোয় মোটর বাইকে প্রেমিকের পিঠে প্রেমিকার নির্ভার আস্থা।
"তখন আমার একুশ বছর বোধ হয়।"

সৈনিক ক্লাব এগিয়ে গাড়ী সামনে যায়, কাকলী মোড়ে জ্যাম।
আমার ডান পাশে সিএনজি। ঘনিষ্ট তরুণ, উঠতি তরুণী।
চোখ পড়ে যাওয়ায় কিংবা আড়চোখে দেখার বিষ্ময় কাটিয়ে দেখি, মেয়েটি হু হু করে কাঁদছে।
হাত জোড় করে মাফ চাইছে।
ছেলেটি কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কপালে চুমু খাচ্ছে ।
মেয়েটি আরো আবেগী হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা চাইছে হয়তো।

সামনে সিগনাল ছাড়ে না। আমার চোখ লোভী হয়ে উঠে। আবার তাকাই।
হাঁটুর নিচ থেকে পা কাটা এক জোয়ান ভিক্ষা চায় সিএনজির ডানে দাঁড়িয়ে। তাদের নজর নেই ভিক্ষুকের দিকে। রোড ডিভাইডারে জোয়ান বসে পড়ে। এবার এক থুরথুরে বৃদ্ধ। হাত এগিয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে, কী কী জানি বলছে - হয়তো প্রেমীদের সংকট মোচনের দোয়া করছে। বসে থাকা জোয়ান এবার বৃদ্ধের হাত ধরে টান দেয়, শরীরি ভাষায় বলে, এখন ভিক্ষা চেয়ে লাভ হবে না। আবার হাসেও। সি এন জির অন্য দরজায় আরেক বুড়ি ভিক্ষুক। এবার হাত পেতে নয়। তারা নাটক দেখছে।

মেয়েটি ছেলের বুকে মাথা রেখে আছে।
ফোঁসফাস করে কাঁদছে। পা ধরছে।

আমিও ভিক্ষুক হয়ে যাই।
গল্প বানাইঃ
- মেয়েটি বলছে - প্লিজ তুমি আমাকে বিয়ে করে ফেলো, প্লিজ। আমার বাসায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলেটি বলছে, এই তো আর কটা দিন। তার পর টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন।

অথবা,
- মেয়েটি বলছে - প্লিজ তুমি আমাকে ঠকিও না, অনন্তার সাথে ঘুরো না, আমার কী নেই যা ওর কাছে আছে? ছেলেটি বলছে - ও সবই গুজব...

অথবা,
- মেয়েটি পা ধরে বলছে - 'আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি, ভালোবেসে শুয়েছি। প্লিজ, সিডিটা আমাকে দিয়ে দাও।'

এবার আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
নষ্ট ভাবনারা ঘুরঘুর করে। হঠাৎ এ মেয়েটির সাথে কফি খেতে ইচ্ছে হয়। চোখ মুছে বলতে ইচ্ছে করে, 'মেয়ে কেঁদো না'।
দেখি, আশেপাশের অনেক চোখ এখন ঐ সি এন জি তে।

সিগনালের সবুজ বাতি জ্বলে উঠে।
সেদিন ছোট ভাইয়া বলছিল - ছিনতাই ঠেকাতে সিএনজির কাভার ট্রান্সপারেন্ট করা হবে।
ভাবছিলাম, সিক্রেসি অফ লাইফ কোথায় যাবে?
এবার আমি আমার নিজেকে গল্পে নিয়ে আসি। নিজের সাথে নিজের লুকোচুরি। মানুষের মাঝে গল্প খুঁজি, আর সিক্রেসীর দোহাই দিই। শালা, আমি হিপোক্রেট।

দুপুরে দাওয়াতে বসি আজন্ম অদেখা মানুষের টেবিলে।
"বুঝলেন লিখতে গিয়ে ধর্মের বিরোধী হবেন না, এমন কিছু লিখবেন যাতে করে ইমানী মুসলমান দু ফোটা চোখের পানি ফেলে, দোয়া করে।"
আমি আবারও গল্প বানাই। জানি এসব লেখা হবে না।

ইচ্ছে ছিলো, নাজমুল ভাইয়ের বাসায় যাবো। তার আগে আদনানের বাসায় এক ঢু, মিলটনকে ফোন দিয়ে ডেকে মিতুর অফিসে এক মিনিট। বিকেল ঘনায় দ্রুত। আদনানের বাসায় গপ্পে গপ্পে ছ'টা বাজে। মিল্টন বাসার বাইরে যাবে না। ফোনে জানি নাজমুল ভাই গলফ ক্লাবে যাবেন, তাই বলি - 'আজ আমি বাসায় চলে যাবো'।
মিতুর সাথে আর দেখা হবে না। হাজবেন্ডের সাথেও না।
শোনা হবে না, 'তুই আর মানুষ হইলি না'।

মানুষের ভীড়ে গুলশান এক নম্বর চক্কর।
গাড়ী নেই।
নীল ক্যাবে একজন দরাদরি করছে, ড্রাইভার বলছে - মিটারের চেয়ে ১০টাকা বাড়িয়ে দিয়েন।
আমি বলি - মীরপুর যাইবেন?
একজন বলে, চলেন তাইলে দুইজন মিলে যাই, আমিও মিরপুর যাব।
অবিশ্বাসে আমি সামনে ড্রাইভারের সাথে বসি।
মহাখালী পার হলে আর জ্যাম নাই। ক্যান্টনমেন্টে ফ্রি রাস্তা।
পেছনের জন ফোনে গদগদ আলাপ করছে - 'কী বলো, তুমি আমাকে এখনো বিশ্বাস করো না? এতোদিনেও চিনলা না?... আচ্ছা তুমি ডায়ানোসর দেখেছো?"
এখানেও গল্প ভর করে। আমি কি ডায়ানোসর দেখেছি?
সকালের প্রেমী দুজনের কথা মনে পড়ে।
মানুষের সম্পর্ক এখন খুব বেশি ইনসিকিউরড।
"কেউ দেবে নিরাপত্তা, কেউ বিশ্বাস, আসলে সবাই চায় জিততে।"

দশ নম্বরে নেমে রিক্সা করে বাসায় ফিরি।
সময় সোয়া সাতটা।
মাইকে হারানো বিজ্ঞপ্তি। ১২ বছরের কালো মেয়ে হারিয়ে গেছে।
রাস্তার পাশে সারিসারি ভ্যান, তাল - কলা - বই; নেয়ামুল কোরান, নবজাতকের সুন্দর নাম।
হোটেলে বড় কড়াইয়ে মোগলাই পরোটা ভাজা হচ্ছে।
কোলাহলের মাঝে নাকে ঘ্রাণ ভর করে।

আমি পলায়নপর।
দেশের বাইরে গেলে গল্পের প্লট খুঁজি। নিত্য।
এখন গল্প আর লেখা হয় না।

এই দ্রুত সন্ধ্যা নামাটা এখনকার বড় গল্প।

-
-
-

2 মন্তব্য::

সৌরভ 31 August, 2008  

শিমুল, পালানো ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন পথ নেই? কয়েকমাস ধরে ভেবেই যাচ্ছি।
উত্তর পাই না।

আনোয়ার সাদাত শিমুল 24 September, 2008  

কোথায় পালাবো...।

"ভবের হাটে নামছো বন্ধু আসমান পাতাল বুঝছোনি?"

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP