01 April, 2012

পনেরোই জুন


প্রবল বৃষ্টি ছিল সে রাতে।
বিকেল পর্যন্ত আমার ইচ্ছে ছিল সন্ধ্যার আগেই ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু, প্রফেসর মেইল করেছে, এ সপ্তাহের মধ্যে প্রপোজালটা ফাইনাল করে পাঠাতে হবে। এবার রিভিউ কমিটিতে তিনি খুব চেষ্টা করবেন যেন আমাকে ফুল ফান্ডিং ও অন্যান্য সুবিধাসহ রিসার্চ অফার দেয়া যায়। গত ছয়মাস প্রতিদিন অল্প অল্প করে প্রপোজালটা লিখেছিলাম। কিন্তু, প্রফেসর যখন রিভাইজ করতে বললো, তখন আমার মাথা বিগড়ে গেছে। প্রপোজালটা ফাইনাল করতে টানা চারদিন কাজ করেছিতাই বৃষ্টির সে রাতে আমার ইউনিভার্সিটি থেকে বের হতে দেরি হয়ে যায়। গেইটের কাছে একটা রিক্সা পেতেই দরদাম না করে গুলশান বলে উঠে পড়ি।

যতটুকু মনে পড়ে, আমি রিক্সার হুডের ডানপাশ ধরে শক্ত হয়ে বসেছিলাম। ডান পা ঠেসে রেখেছিলাম রিক্সার পা-দানিতে। বাম হাতে রিক্সার সামনের প্লাস্টিক মেলে রাখার চেষ্টা করছি, রাখা যাচ্ছে না। বাতাসের ঝাপটায় উড়ে যাচ্ছে বারবার। আমার প্যান্ট, স্যান্ডেল ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। রাস্তার লাইটপোস্টের আলোও যথেষ্ট ছিলো না। মনে হচ্ছিল, মাঝবয়েসী রিক্সাওয়ালা এক পাশবিক শক্তিতে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট পার্ক পার হয়ে রিক্সা বামে মোড় নিয়ে ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বেসীর দিকে যাবে, ঠিক অমন সময় চোখে তীব্র আলো এসে লাগে। জিপ ছিল নাকি ট্রাক ছিল ওটা? দেখতে পাইনি। হঠাৎ যেনো মাটি ফুড়ে কী একটা উঠে গেল, আমি উলটে গেলাম রিক্সাসহ।
তারপর কী হলো মনে পড়ে না।
শুধু এটুকু মনে পড়ে, এক ক্লান্তিকর ঘুম পার হওয়ার পর যখন আমি জেগে উঠি তখনো রাত। সাদা দেয়ালের ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে, দেয়ালে আছে তেলচিত্র – তার ওপরে রঙিন  স্পট লাইট। টের পাই, এ আমার ঘর নয়। হাসপাতালও নয়। কোথায় এলাম, কীভাবে এলাম?
পাশে ফিরতেই দেখি - চেয়ারে বসা এক মহিলা, নাকি তরুণী – আমি বুঝতে পারি না। আধো আলো – আধো অন্ধকারে এটুকু নিশ্চিত হই, মানুষটি আম্মা নয়, বড় আপা নয়, সেতারা খালা নয়, রুমা কিংবা সোমাও নয়। তাহলে কে সে?
আমার মাথার পাশ ফেরানো, শরীর নড়াচড়া দেখে তিনি উঠে আসেন। আমার কপালে হাত রাখেন। অচেনা এ মহিলাকে কিছুটা চেনা চেনা লাগে। কোথায় দেখেছি তাকে? মনে হয় - তিনি বিটিভির ঘোষিকা, নাকি সংবাদ পাঠিকা? আমার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। টের পাই, তখনো আমার শরীর ভেজা। প্যান্ট লেপ্টে আছে দুপায়ে। কোমরে ভর দিয়ে আমি উঠে বসার চেষ্টা করি। পারি না। সমস্ত শরীর ব্যথা করছে।
কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করি, “কে আপনি? আমি এখানে কেন?”
তিনি জবাব দেন না।
আমার কপালে রাখা হাত এবার চুলে বিলির মতো করে কেটে নেন। ঠান্ডা কপালে উষ্ণতা টের পাই। মারাত্মক শীতল কন্ঠে তিনি বলেন, “তুমি অসুস্থ, ক্লান্ত। শুয়ে থাকো।”
আমার ভেজা শরীরে এবার কাঁপুনি দেয়। এ কন্ঠ এমন কেন? মানুষের কন্ঠ? নাকি দূর থেকে ভেসে আসা কোনো এক শব্দ!
“কিছু খাবে?” – চেয়ারে ফিরে গিয়ে তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন।
আমার গলা জড়িয়ে আসছে। আমি কথা বলতে পারছি না। কিন্তু, টের পাচ্ছি, এ কন্ঠ স্বাভাবিক মানুষের কন্ঠ নয়। “কিছু খাবে” এ শব্দ দুটো যেনো কাঁচের বোতল ভর্তি মানুষের আওয়াজ। অস্পষ্ট, বিপদাপন্ন, শংকিত মানুষের গলা। রহস্যময়।
আমি কিছু বলি না। পাশ ফিরে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। চেহারাটা কোথায় দেখেছি ভাবার চেষ্টা করি, বিটিভির সংবাদ পাঠিকা কিংবা ঘোষিকা নয়, মনে হয় – তাকে কোনো বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে দেখেছি। চা পাতার বিজ্ঞাপন, নাকি জন্মবিরতিকরণ পিলের বিজ্ঞাপন? শেষটাই সঠিক মনে হয়। কোথায় ছিল বিলবোর্ডটি? মহাখালী রেলক্রসিংয়ের মোড়ে, নাকি সাত মসজিদ রোডে?
চেয়ার থেকে উঠে এসে এবার তিনি রুমের বাতি জ্বালিয়ে দেন। পুরো ঘর আলোয় ভরে ওঠে। আমার চোখে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। যেন এক জগত থেকে অন্য জগতে চলে যাচ্ছি আমি। রূপান্তর ঘটছে। যাকে এতক্ষণ আমি সেতারা খালার বয়েসী মহিলা ভাবছি, তিনি আসলে আরো তরুণী? কতো বয়স? চব্বিশ অথবা ছাব্বিশ। মুখে প্রগাঢ় মেক-আপ। হাল্কা পারফিউমের ঘ্রাণ। খোলা চুল। হাতে চুড়ি। বেগুনী সিল্কের শাড়ীর আঁচলটা গুছিয়ে নিয়ে তিনি আমাকে বলেন – “আমাকে তুমি বিলবোর্ডে দেখোনি।”
আমার সমস্ত শরীর এবার অবশ হয়ে ওঠে। পায়ে ঝিঝি ধরলে যেমন হয়, কোমরের পর থেকে তেমন হচ্ছে। আমি কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করি, “কোথায় দেখেছি আপনাকে?”
এরপর বিড়বিড় করে বলি - “আপনি কে? আমি এখানে কেন? কীভাবে এলাম এখানে?”
তিনি এবার আমার পায়ের কাছে বিছানায় এসে বসেন। এক পা বিছানায় তুলে হাঁটুতে থুতনি রাখেন। চোখ আমার দিকে। খুব সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “আমি আজ রাতের জন্য তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।”
“কীভাবে আনলেন? কেন আনলেন?”
“গল্প করবো।”
আমি থতমত খাই। টের পাই, অনেক কিছু আমার আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। আমি এখানে বন্দী হয়ে গেছি।
তিনি বলে চলেছেন, “জিপের ড্রাইভারকে মেরে ফেলেছি বনানীতেতারপর একটানে গুলশান লেকের পাশ দিয়ে আসতেই সামনে তোমার রিক্সা। রিক্সাওয়ালাকে মারার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাঁচাতে পারিনি। তুমি বেঁচে আছো।”
আমি এবার নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করি। আমার শরীরটা নাড়ানোর চেষ্টা করি। আমি জানি আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি। একটু নড়াচড়া করলেই ঘুম ভেঙে যাবে, দেখবো – আমি মিরপুরে আমার বিছানায় শুয়ে আছি। তাই ভয় খানিকটা কেটে যায়। আবার জিজ্ঞেস করি, “আপনি কে? কোথায় দেখেছি আপনাকে?”
তিনি হাসেন, বলেন – “আমার কোনো নাম নেই। আজ যেমন আমার নাম এখানে লায়লা। আগামীকাল রাস্তার ওপাশে গেলে আমি হয়ে যাব জুলি। আবার এখানে ফিরে এসে পরের রাস্তায় গেলে আমার নাম হবে সুমি, অন্য কোথাও অন্য কোনো নামে...।”
আমি আবার পুরনো প্রশ্নে যাই, নিজের সঙ্গে নিজের যুক্তি এবং বুদ্ধির পরীক্ষা করি। জিজ্ঞেস করি, “ লায়লা, এখানে মানে কোথায়, আমরা?”
লায়লা তার মুখের কাছে ঝুলে পড়া চুল সরিয়ে বলেন, “এখানে মানে সৌদি অ্যাম্বেসী। আমি এখানে লায়লা। অ্যামেরিকান অ্যাম্বেসিতে আমি জুলি, জাপানেরটায় সুমি।”
আমার সারা শরীরে আবার ঝলক লেগে ওঠে।
“আমি সৌদি অ্যাম্বেসীতে? কী করে ঢুকলাম? আপনি এলেন কী করে?”
“আমি তো আসতাম আগে। এখনো আসি। আমি গল্প করি। গান করি। মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করি
শেষ কথাটি বলে লায়লা খিলখিল করে হেসে ওঠেন। এ হাসির শব্দ দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়একবার দুবার তিনবার করে অনেকবার।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বলেন, “তোমাকে ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বেসি ভিসা দেয়নি বলে মন খারাপ? যাবে, ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বসির ভেতরে যাবে আজ রাতে, এরকম এক ঘরে?”
এবার আমি সত্যি সত্যি ভয় পাই।
স্বপ্ন বাস্তবের মাঝামাঝি দেয়াল ভাঙার যে কৌশলে আমি মেতেছিলাম, সেখানে আমি হেরে যাচ্ছি। মনে প্রাণে চেয়েছিলাম, এ স্বপ্ন হোক, আমার ঘুম ভাঙুক। কিন্তু টের পাচ্ছি, স্বপ্ন নয়, আমি বাস্তবে কথা বলছি।
লায়লা আমাকে আবারও প্রস্তাব দেন, “চলো ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বেসীতে যাই, কেউ আটকাবে না, শুধু গেইটের দারোয়ানকে বলবো, আমি জুলি। দেখবে সব দরজা খোলা। চলো, তোমাকে আজ কুইবেক হুইস্কি খাওয়াবো। আমি পান করি। নাচ করি। আমি গল্প করি। গান করি। মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করি।”
আমার ভয় আরো বেড়ে যায়, কান্নাকাতর কন্ঠে আবারও বলি, “প্লিজ। আমাকে নিয়ে এ খেলা খেলবেন না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন।”
ভেতরে ভেতরে আমার এও মনে পড়ে, হুমায়ূন আহমেদের কোনো এক উপন্যাসে এরকম এক নায়িকা ছিল। বিভিন্ন নামে বিভিন্নজনের সঙ্গে শোয়। কিন্তু, গল্পের মানুষ যখন বাস্তবে এসে আমাকে আঘাত করে, রহস্যের জাল পেতে খেলা করে, তখন আমি অসহায় হয়ে যাই।
আবার বিছানা ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করি। পারি না। লায়লা এবার আমার দিকে ঘনিষ্ট হয়ে আসেন, বলেন – “ঠিক তোমার মতোই ছিল, ঠিক তোমার মতো কোঁকড়া চুলের মানুষ সে। তোমার মতোই লম্বা। তোমার মত করেই তাকাতো।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “কে? কার কথা বলছেন?”
লায়লা বলে চলেছে, “ঠিক আজকের এই তারিখেই, পনেরো জুন। আজ রাতেই, আমি মারা গিয়েছিলাম, খুন হয়েছিলাম।”
শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। “কী?” বলে জোরে চিৎকার করে উঠি। টের পাই, আমার বুকের ভেতরের কলজে উলটে গেছে, সেখানে শক্ত আর কিছু নেই, সব গলে পানি হয়ে গেছে।
লায়লা আমার বুকে হাত রাখে। বিদ্রুপ হাসিতে হেয়ালী করে গান গায়, “এই রাত তোমার আমার, শুধু দুজনের
আমি বরফের মতো শীতল ও শক্ত হয়ে যাই।
লায়লা আমার বুকে তার দুহাত আর মাথা রেখে চেপে ধরে। বলে, “নাচ হবে গান হবে, অনেক কিছু হবে আজ। আজ পনেরো জুন। আমি নাচবো আজ। অনেক নাচবো, গাইবো। কিন্তু প্লিজ, দোহাই খোদার, বুকে লাত্থি দিও না।”
আমি আগের মতো বরফ, স্থীর।
“দেখো, এই যে এখানে”, বুকের আঁচল সরিয়ে ব্লাউজের নিচের হুকের দিকে আঙুল দেখিয়ে লায়লা বলে, “এখানে লাত্থি মেরেছিল লোকটা ঠিক তোমার মতোই ছিল, ঠিক তোমার মতো কোঁকড়া চুলের মানুষ সে। তোমার মতোই লম্বা। তোমার মত করেই তাকাতো।”
লায়লা আমার কপালে চুমু দেয়। আমি টের পাই, এর নাম ডেথকিস। এরপর আমি মারা যাবো। তাই চোখ দুটো বন্ধ করে রাখি।
দুহাতে চুলের দুদিকে ধরে লায়লা আমাকে তোলার চেষ্টা করছে, বলেছে – “উঠো, এসো, গল্প করি, নাচ করি, তুমি যা চাও আমি তা-ই হবো, লায়লা, জুলি, সুমি অথবা অন্য কেউ।”
আমি পাথরের মতো পড়ে থাকি।
লায়লা চুমুতে চুমুতে আমার কপাল ভরিয়ে দেয়। তারপর আচমকা চড় মেরে বসে গালে। চিৎকার করে বলতে থাকে – “হারামজাদা, কুত্তার বাচ্চা, শুওরের বাচ্চা; লাত্থি মারলি ক্যান? বল, লাত্থি মারলি ক্যান? কী দোষ ছিল আমার বল? নাচি নাই, গাই নাই? কোমর দুলাই নাই? তাহলে লাত্থি মারলি ক্যান? খুন করলি ক্যান?”
আমি কোনো সাড়া দেই না। কারণ, জানি – আমি মরে যাচ্ছি।
লায়লা আমার বুকে ঘুষি মারতে থাকে, বলে – “উঠ্‌! রাত শেষ হলেই আমি চলে যাবো, আবার ফিরে আসবো আরেক পনেরো জুনে। দেরী হয়ে যাবে অনেক, উঠ্‌! আয় গল্প করি, গান করি, নাচ করি।”
মৃত্যুর জন্য বন্ধ করা চোখে ভর রেখে আমি টের পাই লায়লা ক্লান্ত হয়ে গেছে। ফোঁসফোঁস শব্দে কাঁদছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলছে – “আমি গ-ল্প করি। গা-ন করি। মানুষের নিঃ-সঙ্গতা দূ-র করি।”

স্বপ্ন এবং বাস্তবের বেড়াজাল থেকে বেরুতে আমি তৎপর হয়ে উঠি। আরেকবার বেঁচে থাকার ইচ্ছা আমার শরীরে শক্তি দেয়। উঠে বসে এক ঝটকায় লায়লার চুল মুঠো করে ধরি। আচমকা এমন আচরণে লায়লাও পালটা আঘাতের চেষ্টা করে। কিন্তু, আমি শক্ত করে তার চুল ধরে ফেলেছি। চেষ্টা করছি মেঝে ফেলে তাকে লাত্থি মেরে শুইয়ে দেয়ার। অথচ আমাকে অবাক করে দিয়ে, আমার এ চেষ্টাকে বৃথা করে দিয়ে, লায়লা অনেকটা শুন্যে দুতিনবার চক্কর খায়। উড়ন্ত পাখির মতো দুম করে লাত্থি মারে আমার কোমরে। তখনো আমার মুঠিতে লায়লার চুল ধরা ছিল। কোমরে কেমন ব্যথা পেলাম জানি না, তার আগে টের পেলাম আমার হাতের তালুতে গেঁথে গেছে লায়লার চুলের ক্লিপ। আরেকবার জ্ঞান হারানোর আগে তালুর ঐ ব্যথাটাই তীব্র হয়ে উঠলো।

চোখ মেলতেই টের পাই আমি মাটিতে শুয়ে আছি। ঠান্ডা বাতাস বইছে। ভোর হয়ে আসছে। উঠে বসে দেখি – গুলশান লেকের পাশে, ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বাসী থেকে ২৫/৩০ ফুট দূরে আছি। মাথাটা কেমন যেনো হাল্কা লাগে। আশেপাশের অবস্থা দেখে বুঝতে পারি রাতে তীব্র ঝড় বয়ে গেছে। পাঁচ সাতটা বড় গাছ ভেঙে পড়ে আছে এখানে ওখানে। আমি উঠে দাঁড়াই। শরীরে তীব্র ব্যথা। হনহন করে হাঁটতে থাকি গুলশান দুই নম্বর মোড়ের দিকে। গত রাতে কী হয়েছিল, আমি কোথায় ছিলাম; কিচ্ছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। আমি বেঁচে আছি। আমি মরিনি। আমি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকবো; এ আনন্দে আমি উল্লসিত হয়ে উঠি। আরো জোরে হেঁটে ডোরেন টাওয়ারের পেছনে গেলে দেখি মিরপুরগামী গ্রামীণ পরিবহনের কোনো গাড়ী নেই। রাস্তার ওপাশে সাবেরা টাওয়ারের নিচে এক সিএনজিওলা দাঁড়িয়ে আছে। দেড়শ টাকা চাইতেই রাজী হলাম। বিশ মিনিটে বাসায় পৌঁছে গেলাম। আম্মা আব্বা গ্রামে গেছেন। বাসার কাজের ছেলে রুস্তম দরজা খুলে দিলে আমি রুমে ঢুকে জামা কাপড় বদলে আবার শুয়ে পড়ি। ভয়ানক ক্লান্তি, চোখ জড়িয়ে আসছে। কিন্তু, ঘুমের লক্ষণ নেই। অদ্ভুত একটা ভয় চারপাশে ঘিরে রেখেছে। রুস্তমকে ডেকে বললাম, “আমি ঘুমাবো, তুই ফ্লোরে বসে থাকবি, কেউ আসলে দরজা খুলবি না, খবরদার!”
রুস্তম আমার কথা বোঝে কিনা জানি না। শুনতে পাই সে বলে, “কই ছিলেন সারা রাত? আমি ভয় পাইছি খুব। কী তুফানটাই হইলো।”
আমি কিছু বলি না। গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে। কয়েকবার মনে হয়, জ্ঞান হারালাম। রুস্তম সম্ভবত আমার মাথায় ঠান্ডা পানিও ঢাললো।

টানা দুইদিন জ্বরে ভোগে সেরে উঠলে পনেরোই জুন রাতের কথা ভাবি।
ফোন করে আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু হাসানকে বাসায় আসতে বলি। ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক, অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী হাসান আমার সব ঘটনা শুনে হেসে উড়িয়ে দেয়বলে, “পুরোটাই বানোয়াট” প্রথম কারণ, সে রাতে আমি রিক্সা করে প্রেসিডেন্ট পার্ক পার হয়ে গুলশান আসছিলাম। অথচ, দূতাবাস এলাকার ঐ অংশে রিক্সা চলে না।
আমি উলটা যুক্তি দেখাই, “সে রাতে বৃষ্টি ছিল। তাই রিক্সাওয়ালা ঢুকতে পেরেছে।”
হাসান জিজ্ঞেস করে, রিক্সা নদ্দা বাজার না হয়ে ঐ উলটা পথে ঘুরতে গেল কেন? আমি কেন রিক্সাওয়ালাকে ভুল পথে যাওয়ায় বাধা দিলাম না?
আমি বলি, আমার মনে নেই কেন বাধা দিলাম না। প্রবল বৃষ্টিতে আমি ভিজে যাচ্ছিলাম, দ্রুত ঘরে ফিরতে চাচ্ছিলাম, সেটাই হয়তো কারণ।
কিন্তু হাসান আমার যুক্তিকে তুচ্ছ করে দেয়।
হাসান তার দ্বিতীয় প্রশ্ন আমার কাছে রাখে – “লায়লা বলেছে, তোমার রিক্সাওয়ালাকে মেরে ফেলেছে সে। তাহলে সকালে ঐ জায়গায় তুমি কোনো লাশ দেখেছো? কিংবা কোনো দুমড়ে যাওয়া রিক্সা?”
আমি বলি, সকালে আমার অতো কিছু খেয়াল ছিল না। কিন্তু, আমার বালিশের নিচ থেকে ষোলোই জুনের দৈনিক সমকাল পত্রিকাটি খুলে হাসানের সামনে মেলে ধরি। প্রথম পাতায় তিন কলামের খবর – “রাজধানীতে প্রবল ঝড়, নিহত ৬ আহত অর্ধশতাধিক”। খবরের ভেতরের অংশ থেকে পড়ে শোনাই, “গুলশান লেকের পাশে তীব্র বাতাসে ভেঙে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে এক রিক্সাওয়ালা নিহত হয়েছে।”
হাসান এবার হাসে। বলে, “হলো না। লায়লা বলেছে, তার গাড়ির চাপায় রিক্সাওয়ালা মারা গেছেতাহলে তো সেরকম রক্তাক্ত থেতলে যাওয়া লাশের খবরই আসতো।
আমি বলি, “ওটা লায়লার কারসাজি। রিক্সাওয়ালাকে মারলেও আমাকে যেমন বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার কতোটুকু দূরত্বেই বা রিক্সাওয়ালা ছিল?”
হাসান মেনে নেয় না। এবার হাসানকে দৈনিক সমকালেরই ভেতরের পাতায় ছোট্ট বক্স নিউজ দেখাই – “বনানীতে ড্রাইভারকে শ্বাসরোধ করে খুন গাড়ী ছিনতাই” জিজ্ঞেস করি, এটা কি লায়লা বলেনি আমাকে?
হাসান হো হো শব্দে হাসে। বলে, “ধুররো, তোর মাথা পুরা শেষ। এখন পত্রিকায় যতো খবর পড়বি, সবটাই তোর কাছে মনে হবে লায়লার কারাসাজি।”
আমি কষ্ট পাই।
আমার ঘনিষ্টতম বন্ধুটি আমাকে এমন অবিশ্বাস করবে ভাবিনি। এবার ডান হাতের তালু হাসানের চোখের সামনে মেলে ধরি, “এই দ্যাখ। ক্ষত দেখিস? শুকানো রক্ত দেখিস?”
হাসান বলে, “হু দেখিতো। তো? শোন, সে রাতে তোর রিক্সার ওপরে গাছ ভেঙে পড়েছিল। তুই ছিটকে গেছিস দূরে। পড়ে গেছিস, বেঁচে গেছিস। হাতের তালুতে কিছু একটা গেঁথে গেছে। আর বাদবাকী লায়লা, এর পুরোটাই স্বপ্ন। গাধা।”
আমি এবার বাম হাতে পকেট থেকে একটা চুলের কালো ক্লিপ হাসানের হাতে তুলে দিই। বলি, “দেখ, ক্লিপে কী লেখা আছে”।
“লায়লা”। হাসান বিড়বিড় করে পড়ে সত্যি কিন্তু, আবারও আমাকে পাত্তা দেয় না। বলে, “চল তোকে পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিগুলায় নিয়ে যাবো। দেখবি, ওরা লায়লা, জুলি, সুমি, পলি, কলি – কতো হাজারো নাম লেখা জিনিস বানায়।”
আমি হাসানের দিকে করুণ চোখে প্রশ্ন ছুড়ি – “তাহলে কি পুরোটাই বানিয়ে বলছি?”
হাসান উঠে দাঁড়ায়। বলে, “শোন, তুই যা বললি, ভুতুড়ে গল্পের জন্যে এটা খুব পপুলার একটা ফরম্যাট। এরকম বিশটা গল্প অন্তত আমি পড়েছি, সিনেমাও দেখেছি সাত আটটা। আর এইমাত্র দেয়ালে ক্যালেন্ডারে দেখলাম, পনেরোই জুন মানে বাংলায় পহেলা আষাঢ়। আষাঢ়ে গল্প হিসেবে তোর এই কাহিনী মন্দ না। লিখে ফেল। রহস্যপত্রিকায় পাঠালে পরের সংখ্যাতেই ছাপিয়ে দেবে। পাঠকের বাহবা পাবি অনেক
আমি বলি, “তাহলে এই ক্লিপটা নিয়ে কী বলবি?”
হাসান দুহাতের বুড়ো আঙুলের চাপে ক্লিপটা কটমট করে ভেঙে ফেলে বলে, “ওটার অস্তিত্বের কোনো প্রয়োজন নেই। পড়ালেখা করতে করতে তোর মাথা বিগড়ে গেছে। একটা ব্রেক দরকার তোর। চল, দলবল নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসি, অফ-সিজনে খরচ কম পড়বে
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি - “আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।”
হাসান বিদায়ের ভঙ্গি করে বলে, “চল চল – তখন সবাই মিলে তোর এই গাঁজাখুরি গল্পটা আবার শোনা যাবে



Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP