12 June, 2011

সেইসব মৌকার্ড


১৯৯৩/৯৪ সাল।
বইমেলায় গিয়েছি বড়ভাইয়া-ছোটোভাইয়া-আপাসহ। শিশু একাডেমির স্টল থেকে বই কিনলাম। ছোটোভাইয়া কবি মহাদেব সাহার অটোগ্রাফ নিলো। কবিতার বই, লাল রঙা প্রচ্ছদ, বইয়ের নাম মনে নেই। এরপর গেলাম যায়যায়দিন স্টলে। তখন বড়ভাইয়া নিয়মিত যাযাদি কিনেন। তসলিমা নাসরিন, মুনতাসির মামুন, মাহমুদুর রহমান মান্না, বিভুরঞ্জন সরকার - রেগুলার কলামিস্ট ছিলেন। সেসময়কার বিশেষ সংখ্যার কথা মনে পড়ছে – গোঁফ, প্রাইভেট টিউশন, বিটিভি, যা চাই যা চাই না, গৃহবধুর বেতন। ঈদ সংখ্যা, বিশেষ করে বর্ষশুরু সংখ্যাগুলো চমৎকার ছিল। ওসব পড়ি, গোপনে পড়ি – প্রেমলীলা, দিনের পর দিনের শেষের গল্প। বইমেলায় যাযাদি স্টলে হাল্কা খয়েরী রঙের কোর্ট পরা, লম্বা চুলের শফিক রেহমানকে দেখলাম, ভাইয়্যাই কানে কানে বলে চেনালো। তখন এক তরুণী অনেকগুলো মৌকার্ড কিনলো। রেহমান হাততালি দিলো, বললো – ‘ম্যাডাম, আপনি একটু আগে এলে গিফট হিসেবে টফি/চকলেট পেতেন।' মৌকার্ড ছিল যাযাদি’র নিজস্ব প্রকাশনা। ভিউকার্ড। কিন্তু, গতানুগতিকতার বাইরে। কার্ডের পেছনে লেখা ছিল – আবেগঘটিত, হৃদয়ঘটিত, মুড ঘটিত; এরকম নানান ক্যাটেগরী। হাতে নিয়ে দেখেছিলাম, কিন্তু ঐ বয়সে – কী হবে কিনে – ভেবে আর কেনা হয়নি। পরে ভাইয়্যারা গেলেন ছাত্রফন্টের স্টলে, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা এরকম কিছু একটা নাম ছিল। সেখান থেকে ৫টা কার্ডের একটা সেট কিনলেন, ৫০টাকা দাম। সেসময় ৫০টাকা অনেক টাকা ছিল বলে মনে পড়ে। আমি ৭/৮টা বই কিনেছিলাম শিশু একাডেমির স্টল থেকে ওগুলোর মোট দাম ছিল ২৭ নাকি ২৯ টাকা। তবুও বড়ভাইয়া রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও সম্পর্ক থেকে ৫টা কার্ডের সেট কিনলেন। কার্ডের মধ্যে শিক্ষা অধিকার, শ্রেণী বৈষম্য, সেক্যুলার সমাজ – এরকম বিষয়ে ৫ মণীষীর লেখা থেকে কোটেশন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, আর বেগম রোকেয়া প্রত্যেকের কোটেশন নিয়ে ৫টা কার্ড। পরবর্তীতে ঐ কার্ডগুলোর মালিক আমিই হয়েছিলাম। কিন্তু, মৌ কার্ডগুলো না পাওয়ার কথা ভুলিনি।

লেখালেখি করার পরিকল্পনা-টল্পনা ছিল না। যাযাদির বিশেষ সংখ্যাগুলো পড়ে সে বয়সে আমারো লিখতে ইচ্ছে হতো। মনে আছে, যা চাই যা চাই না - বিষয়ে একটা লেখাও খসড়া করেছিলাম, পরে পাঠানো হয়নি। যাযাদির বিশেষ সংখ্যা, পরে ভোরের কাগজের পাঠক ফোরাম পড়ে লিখতে ইচ্ছে হতো। লিখি আর ফেলে দিই, কারণ মনে হতো ছাপা হবে না। পাঠক ফোরামে প্রথম দিকে এমনকি ৯৭/৯৮ পর্যন্ত যে মানের লেখা ছাপা হতো, এখনো কোনো পাঠক পাতা, ব্লগ পাতা তার কাছাকাছি যেতে পারেনি। স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠেছি, পাঠক ফোরাম ভেঙে বন্ধুসভা হয়েছে, ওদিকে বদলে গেছে – যাযাদি, এবং শফিক রেহমান। ভেতরের কাহিনী জানতাম না। বিভুরঞ্জন বের করেছেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র। আমি তখনো যাযাদি পড়ি। কেউ কেউ বললো – শফিক রেহমান সবসময় অ্যান্টি গবমেন্ট। কেউ বললো অন্যকিছু। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখেছি – রেহমান কীভাবে ম্যাডামের মুরীদ হয়ে গেছে। ভাষণ লিখে দেয়, পাশে বসে ইফতার করে, এক কোটি তরুণ ভোটারের কাছে আবেদন জানায়। ২০০১ এর ইলেকশনের পরে যাযাদির ভূমিকা নিয়ে বিরক্ত ছিলাম, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ইস্যুতে যাযাদি নির্লজ্জ সব রিপোর্ট প্রকাশ করতো, চিঠিপত্র কলামের অনেক লেখা দেখে মনে হতো – ইন-হাউজ রাইটারদের কাজ। সেসময় নিক্সনের লেখা পড়েছিলাম, নিক্সন বেশ কৌশলে প্রতিবাদ করেছিল, যাযাদি ছাপিয়েওছিল। কিন্তু, আমার কাছে মনে হতো ওগুলো এডিটেড। কলেজ-বন্ধু নিক্সনের সঙ্গে অবশ্য কলেজের পরে, ৯৯ সালে শেষ দেখা হয়েছিল বলে মনে পড়ে। আমি যাযাদি আর কিনবো না প্রমিজ করেছিলাম – ইটিভি ইস্যুতে যাযাদির ভূমিকা দেখে। ইটিভি বন্ধ হওয়ার পরে যাযাদি প্রচ্ছদ করেছিল – আদালতের রায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া টিভি। নোমান ইরফান, এম কে খান এরকম কলামিস্ট কুৎসিত ভাষায় ইটিভির সমালোচনা করতো। এর বিপরীতে কেবল সাবেক সচিব কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ ভোরের কাগজে তার সময়ের কলাম’এ প্রতিবাদ জানাতেন। এগুলো আরো পরের কথা, সম্ভবত ২০০৩/০৪ হবে।

মনের ভেতর রয়ে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা থেকে কিছু লেখা পাঠাই যাযাদিতে। ছাপাও হয় বেশ কিছু। ২০০০ সালের ঈদ সংখ্যায় ছাপা লেখার জন্য যাযাদি থেকে ডাকযোগে পাঠানো হয় ১৮/২০টির মতো মৌকার্ড। সজীব ওনাসিস স্বাক্ষরিত চিঠিতে লেখা ছিল – আশা করি গৃটিংস কার্ডগুলো বিভিন্ন সময়ে আপনার কাজে লাগবে। এরপরে আরো কয়েকটা লেখার জন্য, বর্ষশেষ টাইটেল পাঠানোর জন্য ওনাসিস/রেহমান স্বাক্ষরিত একই ভাষার চিঠি-কার্ড আসতো। বই পাঠিয়েছে দু’বার। ১৯৯৩ সালে যাযাদি’র প্রথম ভালোবাসা সংখ্যা, যেটি বই আকারে ছাপা হয়েছিল সেটি। আরেকটি নির্বাচিত প্রেমের কবিতার বই – ভালোবাসা। বইগুলো বুকশেলফে আছে। কিন্তু, কার্ডগুলো দেয়ার মতো কাউকে পাইনি। খামে করে রেখে দিয়েছিলাম টেবিলের ড্রয়ারে।

শফিক রেহমানের বিবর্তনকে, দৈনিক যাযাদির ধ্বসকে - কোনো এক ব্লগ পোস্টে পতন পঁচন বলেছিলাম। দিনের পর দিন, ভ্যালেনটাইন ডে নিয়ে প্যারোডিও লিখেছি। কিন্তু, কিছু কিছু বিষয়ে রেহমানের আধুনিকতার প্রশংসা করেছি সব সময়। বাংলাদেশের আনকোরা পাঠককে লেখক করার ব্যাপারে, গদ্য লেখাকে উৎসাহ দেয়ার বিষয়ে রেহমানের বিন্দুমাত্র হলেও ভূমিকা আছে বলে মনে করি। লেখা ছাপানোর পরে উপহার, বিভিন্ন ব্যাপারে ফিরতি চিঠি, ফোন করা, লেখক সম্মেলন – কাজগুলো দেশের অন্য কোনো পত্রিকা সম্পাদক করেছেন বলে জানি না। শফিক রেহমান এখন ম্যাডামের ভাষণের পাশাপাশি নেড়ি কুকুরের কলাম লিখেন, বাংলাভিশনে আর্ট শো লাল গোলাপ করেন। যাযাদি থেকে পদত্যাগের দিন পাঠকের উদ্দেশ্যে রেহমানের শেষ চিঠি পড়ে বিমর্ষ হয়েছি। এখন দেখে এক রকম করুণা বোধ হয়, মনে হয় – রেহমান শেষ জীবনে নির্মোহ থাকলে, তেজগাঁওয়ে সাদ্দাদের বেহেশতের মতো পত্রিকা অফিসের স্বপ্ন না দেখে নিউজ প্রিন্টে ছাপানো সাপ্তাহিকের সম্পাদক হিসেবে সন্তুষ্ট থাকলে হয়তো একজন আইকন হতে পারতেন।


ব্যক্তিগত জীবনে বন্ধনে জড়াতে যাচ্ছি।
তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিদিন, দেখা হয় ছুটির দিনে। পরশু ড্রয়ারের ভেতর পুরনো কাগজের ফাঁকে মৌকার্ডের খাম পেলাম। কার্ডগুলোর পেছনে যাযাদির ঠিকানা ৭০ কাকরাইল, আর ওপরে-ভেতরে লেখা লাইনগুলো চমৎকারভাবে মিলে যায় আমাদের দুজনের সাম্প্রতিক অনুভূতিগুলোর সঙ্গে। রেহমান/ওনাসিসের লেখা চিঠি আবার পড়লাম, ‘আশা করছি কার্ডগুলো বিভিন্ন সময়ে আপনার কাজে লাগবে।’
গতকাল চারটা কার্ড গত দু’সপ্তার ৪টা তারিখে লিখে দিলাম তাকে। দেখে বললো, ‘এগুলো কী কার্ড? আবেগঘটিত, হৃদয়ঘটিত; এমনতো চোখে পড়েনি কখনো।’
মৌকার্ডের ইতিহাস, যাযাদিতে লেখা ছাপানোর আগের পরের কাহিনী বললাম। শুনে বললো, ‘তার মানে তুমি ১১ বছর ধরে এগুলো আমার জন্য রেখেছ?’
বললাম, ‘মোটেই না। এর মধ্যে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেই সে-ই পেতো এগুলো।’
সে হাসে, বলে – ‘তোমার এই একটা ব্যাপার ভালো লাগে খুব।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন ব্যাপার?’
জবাব দিলো - ‘এই যে, তুমি কোনো ভনিতা করো না’।


Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP