22 May, 2009

ভুলি নাই, জুবায়ের ভাই

আজ এখানে যখন বিকেল, বাংলাদেশে ঘড়ির কাঁটা আরেকদিনে গিয়ে ছুঁয়েছে। এর পরে অনেক সময় কাটালাম, এই একটা কথা ভেবে।
কী লিখবো!
নিশি পাওয়া মানুষ যেমন ঘরে ফিরতে পারে না, কেবল অন্ধকারে চক্কর খায়, তেমন করেই - তেমন করেই আমি আজ বিকেলের পর থেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছি। আগেও মাথায় ছিলো, মে মাস আসার পর থেকে প্রতিদিন ভেবেছি, ২২ তারিখ যেনো না ভুলি...। নাহ, ভুলিনি। কী করে ভুলি!
আমি নিজেই তো কথা দিয়েছিলাম, বাৎসরিক হিসেবে ৩৬৫ পরপর শুভকামনা জানাবো।
হ্যাঁ, বছর পেরিয়ে গেলো।
অতীতচারিতার দোষে অভিযুক্ত এ-ই আমি আজ ঠিক এই কাজটাই করতাম, প্রিন্ট স্ক্রীন নিয়ে বলতাম, 'দেখেন, ভুলি নাই'। এই কথার পরে একটা হাসির ইমো দিতাম। কিছুই হলো না। সে-ই প্রিন্ট স্ক্রীন দিলাম, আর কমেন্ট জুড়ে দীর্ঘশ্বাসের ভার।
ওপারে চলে যাওয়া মানুষ, প্রিয় জুবায়ের ভাই -
শুভ জন্মদিন!
_

ইচ্ছেটা গত সেপ্টেম্বর থেকেই। জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার সব কমেন্ট চালাচালি এক জায়গায় জড়ো করবো।
এরপরে ম্যাপেল পাতার দেশে বরফ জমে, বরফ গলে। ঠান্ডা বাতাস শেষে সামারের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন আসে। আমি কতো কিছুই করি, কতো ফালতু কাজে সময় কাটাই। কেবল, জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্টগুলো জড়ো করা হয় না। কেনো হয় না, এ প্রশ্নটা ক্রমশঃ জটিল লাগে। এই যেমন আজ অনেক ভেবেও সচলায়তনে কোনো পোস্ট দিতে পারলাম না, লেখার বাক্য খুঁজে পেলাম না। যা ভাবলাম তা কেবলই ব্যক্তিগত নিজস্ব অনুভূতি, প্রকাশ্যে বলতে পারবো না কেনো জানি না। যেমন জানি না এ জটিলতার মুক্তি কোথায়। মুক্তি পেলে হয়তো জেনে নিতাম, কেনো প্রিয় মানুষের বিদায় এবং অনুপস্থিতি এমন আক্রান্ত করে...।

জুবায়ের ভাইয়ের লেখা কোথায় প্রথম পড়েছিলাম তা নিয়ে লিখেছিলাম আগে।
খুব ভুল না বললে, জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম কমেন্ট চালাচালি এরকম।
_

৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৩৪
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লেখা।
আচ্ছা এ লেখাটি কি আগে কোথাও ছাপা হয়েছিল? মনে হচ্ছে, কোথায় যেন পড়েছিলাম!
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৩৯
comment by: অতিথি বলেছেন: আনোয়ার সাদাত শিমুল, আমার লেখা কাগজে ছাপা হলে কেউ পড়ে না বলে আমার ধারণা। আপনি ভুল প্রমাণ করলেন। লেখাটি যুগান্তরে ছাপা হয়েছিলো বছরখানেক আগে। প্রসঙ্গটি পুরনো হয়নি ভেবে ব্ল্লগে দেওয়া।
আর সবার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:০৭
comment by: অতিথি বলেছেন: রাইট, যুগান্তরে পড়েছিলাম।
আপনার আরো কিছু লেখাও আমি পড়েছি। কোন একটা বিষয়ে মন্তব্য প্রতিক্রিয়া ও ছিল। ঠিক মনে পড়ছে এখন...।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:২৩
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, আপনার সরণশক্তি ভালো। এই লেখাটি নিয়েই খোন্দকার আলী আশরাফ একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন। দুঃখের বিষয়, তিনি কী বলতে চেয়েছেন আমি তার কিছুই বুঝিনি, সব মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিলো।

_

সামহোয়্যারইনব্লগের টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে - নামগুলো অতিথি হয়ে গেছে। মূল পোস্ট এটা ।
___

আমার স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারিত না করে তাহলে বলতে পারি, সা-ইনেই আমার এই পোস্টে জুবায়ের ভাইয়ের ১ম কমেন্ট পাই। আবার সেই 'অতিথি' হয়ে যাওয়া কমেন্ট -

১৮ ই মার্চ, ২০০৭ সকাল ৯:০৯
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, সময়ের টানাটানিতে খুব থাকি। অজুহাতটা ব্যবহার করতে ইচ্ছে হয় না। তবু বলি এই যে আপনার লেখাটা কয়েকদিন বিলম্বে পড়তে পারলাম, তা-ও ওই সময়ের আকালের জন্যে। পড়লাম তখন আমার এখানে রাত দেড়টা। ইচ্ছে আছে আপনার এবং আরো কয়েকজনের পোস্টগুলো পড়বো। তখন অনেক পুরনো লেখার ওপর মন্তব্য পেলে অবাক হবেন না আশা করি।

_

এরপরে আরেকটি অবাক ব্যাপার ঘটে।
এ যাবত আমার ছাইপাশ লেখাগুলোর মাঝে 'ছাদের কার্ণিশে কাক' নিয়ে নানান জনের মুখে উচ্ছ্বাস শুনেছি, এখনো শুনি। কালেভদ্রে দুয়েকজন অচেনা পাঠক মেইলও করেন। আমার অন্য কোনো লেখা নিয়ে এমন পাঠক প্রতিক্রিয়া পাইনি। এত কিছুর পরে, ইদানিং আমি বিশ্বাস করা শুরু করেছি, ছা/কা/কা আসলেই হয়তো সুখপাঠ্য কিছু ছিলো।
'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজ যেদিন শেষ করলাম, সেদিন হঠাৎ ১ম পর্বে জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্ট -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৩৮
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: প্রথম বাক্যেই গেঁথে ফেললেন। "জীবন যেন অনেকগুলো পাসওয়ার্ডে আটকে আছে।"
আমি ঠিক করেছি আমার এই অসংখ্য পাসওয়ার্ড একটা ডাটাবেজে রাখবো। আর সেই ডাটাবেজ কীভাবে সুরক্ষিত করা যাবে? আরেকটি পাসোয়ার্ড দিয়ে!!!!

_

এখানে শেষ নয় -
২০ পর্ব একটানা পড়ে কয়েকপর্ব পরপর কমেন্ট করেছেন, কমেন্টে অনুমান করেছেন - আগামী পর্বে কী হতে পারে...। হুমায়ূনীয় বিভ্রাট থেকে মুক্ত হতে বলেছেন। এখনো ভেবে অবাক লাগে এমন করে কে-ই বা আপন করতে পারে!

শেষ পর্বে কমেন্ট করেছিলেন -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ১০:৩৫
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: শিমুল, সবগুলো পর্ব পড়া শেষ। খুব সুস্বাদু, গতিময় ও স্মার্ট গদ্য লেখার কৌশল তোমার দখলে। একজন পাঠকপ্রিয় এবং ভালো লেখক হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা তোমার আছে। বাকিটা তোমার ইচ্ছে ও লেগে থাকার ওপরে। একটা কথা বলি, গদ্যরচনাকে আমি বলি শব্দশ্রমিকের নির্মাণকর্ম। সেই পরিশ্রম করতে তুমি ইচ্ছুক হলে আমি খুশি হবো। জ্ঞান দিতে বসেছি ভেবো না। এগুলি আমার অকপট মত।
আচ্ছা, এই লেখাটিকে আরেকটু বাড়িয়ে রক্তমাংস যোগ করে উপন্যাস করে তোলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয়।
_
২৯ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:৫৯
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
ব্লগে লেখার সুবিধা হলো পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় খুব দ্রুত। বিগত ১১ মাস ব্লগিং করে টুকটাক লেখালেখির যা চেষ্টা করেছি তার মাঝে আপনার লেখা ও মন্তব্যের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য অবশ্যই ভাগ্যের ব্যাপার। 'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজে আপনার প্রতিটি মন্তব্য আমার জন্য আশীর্বাদ। ভালো লেগেছে - লেখার দূর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন, সাথে অনুপ্রেরণাসূচক মন্তব্যগুলোও সাহস যোগাবে। এ সাহসকে ভর করে আগামীতে উপন্যাস লেখার দু:সাহসও করে ফেলতে পারি! আপনার মতো একজন গুনী লেখককে সবিনয় কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধা জানাই।

_

কোনো কিছু লেখার পরে প্রিয় মানুষ এসে কমেন্ট করবেন, এমন আশাতেই থাকি। আমার লেখা একটা গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই কষ্ট পেয়েছিলেন। আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিলো, অবস্থান ছিলো। অথচ, কোনো ব্যাখ্যায় যেতে পারিনি। পালিয়ে বেড়িয়েছি। পরে অনুতপ্ত হয়েছি কমেন্টে। কিন্তু বিনিময়ে তিনি আরও বিনয়ী কমেন্ট করে আমাকে অবাক করেছেন। গত বইমেলায় আমার গল্প সংকলনে গল্পটি দেবো কিনা তা নিয়ে ভেবেছি বেশ কয়েকবার। পরে দিয়েছি, একটাই কারণ - আমি মনে রাখতে চাই - এই গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই মনে কষ্ট পেয়েছিলেন, তাঁর কাছে গল্পের বিষয় ডিস্টার্বিং মনে হয়েছিলো...।
_

ব্লগে আমি সচরাচর কাউকে শুরুতেই 'তুমি' বলি না, অপরিচিত কেউ আমাকে 'তুমি' করে বলবেন - এটা একটু খটমটে লাগে। এর পরেও হৃদ্যতায় কারো কারো কাছে 'তুমি' সম্বোধন চেয়ে নিয়েছি। একেবারেই অদেখা মানুষ এঁরা।
জুবায়ের ভাই কি আসলেই অদেখা রয়ে গেলেন!

মনে আছে ছা/কা/কা'র ১ম পর্বে -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৪২
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
একটা অনুরোধ, আমি কি আপনার কাছ থেকে 'তুমি' সম্বোধন প্রত্যাশা করতে পারি!
পড়ার জন্য সবিনয় কৃতজ্ঞতা।
_
২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:২০
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: নিশ্চয়ই শিমুল। অনুমতি ব্যতিরেকে কী করে করি? এমন অনেককে জানি যারা সরাসরি তুমি বললে অফেন্ডেড হন। একটা বয়সে আমি নিজেও :-)। এখন তোমার অনুমতি মিললো, আর চিন্তা কী?

_

এভাবে অনেক অনেক কথা পালটা কথার স্মৃতি।
তাঁর বাসায় আমার খিচুড়ি খাওয়ার দাওয়াত, আমার শহরে তাঁকে চা'য়ের নিমন্ত্রণ...
কিছুই হয় না।
_

আমি থাইল্যান্ড ছাড়ি ১২ জুন, ২০০৮।
১১জুন রাত পর্যন্তও অনলাইনে ছিলাম। দেশে ফিরে বাসায় ইন্টারনেট ছিলো না। সাইবার ক্যাফেতে টুপ করে মেইল চেক করে বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু, জুবায়ের ভাই আমার আবদার ভুলেননি। 'পৌরুষ' উপন্যাসের পেছনের গল্প লিখেছেন। আমাকে অনলাইনে না দেখে মেসেজ দিয়েছেন -

হতে: মুহম্মদ জুবায়ের
প্রতি: আনোয়ার সাদাত শিমুল
বিষয়: পৌরুষ বিষয়ক কেচ্ছা
তারিখ: মঙ্গল, 2008-06-17 23:58
তোমার ফরমায়েশে লেখা, আর তুমিই ক'দিন ধরে নিখোঁজ!
http://www.sachalayatan.com/zubair/16053

_

লাল শাদা ম্যাপেল পাতার ভিসা আমার জন্য দুরহ হয়ে ওঠে।
উৎকন্ঠায় কাটে দিন রাত। এর মাঝে জুবায়ের ভাই অসুস্থ।
কুয়েত এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইটে ওঠার পরে আমার মনে হয় ভার্চুয়াল স্বজনদের কথা, মনে পড়ে - কেমন আছেন, জুবায়ের ভাই!
ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়ম এ চলে যাওয়া।
২৫ সেপ্টেম্বরে ড. ডেল কার্লের ক্লাসে বসে চোখের পানি আঁটকে, ভীষণ চাপা কান্নায় আমি লিখি - এই এলিজি আমি লিখতে চাইনি
_

এভাবেই জীবন বয়ে চলে আমাদের।
আমি শৌখিন ব্লগার মাঝে মাঝে গল্পকার হওয়ার লোভী স্বপন দেখি। লেখালেখি নিয়ে নানান দ্বন্দ্বে ভুগি। আগামীর পাওয়াটা শুন্য ধরে, পেছনে তাকালে দেখি - জুবায়ের ভাইয়ের মুঠো মুঠো ভালোবাসা, কমেন্ট- প্রেরণা।
আমি আবার বাসে উঠি, ট্রেন ধরি। মেইন স্ট্রীট, উডবাইন, ক্যাসেল ফ্র্যাঙ্ক ; এরকম করে স্টেশন পার হই। মাথায় গল্পের প্লট ঘুরঘুর করে। এরকম অনেক, ক্লান্তিময় বিকেলে, বরফ সফেদ দিনে, আমার মনে পড়ে। মনে পড়ে, জুবায়ের ভাই।

আপনি না ফেরার দেশে যাওয়া শিক্ষক সুরাইয়া খানমকে কথা দিয়েছিলেন, ২৫ মে'তে তাঁকে স্মরণ করবেন।
ঐ পোস্টের শুরুর কমেন্ট পালটা কমেন্টে আমিও তো কথা দিয়েছিলাম।
ঐদিনটির আশে পাশেই, আমি আপনাকে শুভকামনা জানাবো ৩৬৫ দিন পরপর।
আজ ২২ মে।
শুভ জন্মদিন, জুবায়ের ভাই।
প্রিয় জুবায়ের ভাই...



.
.
.

Read more...

16 May, 2009

কাক্কুকে মনে পড়ে

এবার ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই টের পেলাম, পত্রিকায় লেখা 'গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত' শিরোনামটি মিথ্যে নয়। এ সময় এমন গরম পড়বে সেটা আগেই জানতাম। বাসায়ও বিদ্যুৎ নেই, ঘামে জবজব হয়ে বসে থাকি প্রথম দিন...
তবুও আমার প্রিয় শহর ঢাকা, কী এসে যায় গরমে?
জেট ল্যাগের জটিলতা কাটাতে না কাটাতে কাক্কুর ফোন।
'ভাতিজা, এইবারও দেখা না করে যাবা?'
আমি জবাবে বলি, ‘এই তো কাক্কু- কালকেই মধ্যেই আসবো, আপনি কি এখনো নয়া পল্টনের অফিসে?’
কাক্কু হেসে বলে - 'আর কই যাবো বলো, কালো গাউনের মানুষ আমরা, কতোই বা পাই?'
ফোন রেখে আমি কাক্কুর কথা ভাবি।
আহা! কতোদিন পরে দেখা হবে, সে-ই কবে হাইকোর্টের মোড়ে চা-সিগারেট খাওয়ালো, আর দেখা নেই।

-দুই-
প্রিয় পাঠক,
আপনারা হয়তো ভাবছেন, এ আমি কোন কাক্কুর কথা শুরু করলাম। একটু সবুর করুন, একটু বসুন-
আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, এ কাক্কু আমার একার সম্পত্তি নয়। এ কাক্কু আপনাদের অনেকেরই চেনা, আপনারা অনেকেই তাকে কাক্কু ডাকেন। এবং আমি এ ও নিশ্চিত - আমার মতো খানিক নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে - আপনাদেরকেও কাক্কু এইভাবে ফোনে ডেকে অফিস যেতে বলবে। বলবে, ভাতিজারে নদীর পানি সমস্যার কিছু তো করতে পারলাম না...।

প্রস্তর যুগের ব্লগার যারা আছেন, তারা নিশ্চয় বুঝে গেছেন আমি কোন কাক্কুর কথা বলছি। হ্যাঁ, তিনিই। আমি সেই কবে কখন তার অফিসে কেনো গিয়েছিলাম মনে নেই। প্রেসক্লাব পার হলে বাসের হেলপার ‘জিপিও পল্টন গুলিস্তান নামেন’ হাঁক দিলে আমি নামি। সেগুনবাগিচার দিকে চলে যাওয়া রাস্তায় – উর্মি ট্রেডিং, হোটেল মেট্রোপলিটন, ফ্লেশপটস রেস্তঁরা খুঁজি। কিছু নেই, বদলে গেছে সব। তবে, পুরনো সিঁড়ি ভেঙে কাক্কুর অফিসে উঠতে একেবারেই কষ্ট হলো না। সেক্রেটারীর রুম পার হয়ে কাক্কুর রুমে গিয়ে ঢুকতেই দুটো জিনিস চোখে পড়লো; কাক্কু অফিসে এসি লাগিয়েছে, কাক্কু এখন কম্পিউটার ইউজ করে।
কম্পিউটারের ব্যাপারটি নতুন নয়, কারণ – আমি জানি, তেমনি আপনারাও জানেন কাক্কু কী করে গত তিন বছরে বাংলা ব্লগের কিংবদন্তি ব্লগার হয়ে গেছেন।
আমাকে দেখেই কাক্কু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। আহা, কী অমায়িক চেহারা, সিঁথি করা চুল, পরিপাটি গোঁফ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, সে-ই ট্রেড মার্ক স্যুট, টাই...।
আমাকে চেয়ারে বসতে বলে কাক্কু টেবিলে রাখা পেপারওয়েট লাটিমের মতো করে ঘুরায়। মিষ্টি হেসে আমাকে বলে, ‘ভাতিজারে তুই কানাডা থেকে আমার জন্য মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে আসলি রে...’।
আমি কাক্কুর কথা বুঝি না।
এই অল্প সময়ের জন্য ঢাকা গিয়েছি সত্য, কিন্তু কারও জন্য কিছু নিতে পারিনি। কাক্কু কী মানিপ্ল্যান্টের কথা বললো বুঝতে পারলাম না। অধুনা চশমা পড়া এই আমি কাক্কুর চশমা ভেদ করে তার চোখে তাকাই। সেখানে গোল দুটি চোখ মার্বেলের মতো ঘুরছে। যেনো গহর বাদশা বানেছা পরী সিনেমার খলনায়ক, চুরি করে আনা রাজকন্যার বয়স পনেরো হবে আজ, আর সে সন্ধ্যায় তাকে কুরবানী দিয়ে অমরত্ব লাভের লোভে চোখ দুটো জলজ্বল করছে তার...।
আমার আগ্রহ আরো উস্কে দিয়ে তিনি বলেন, একটু বসো- দেখবে তামাশা।

আমার কল্পনা প্রবণ মনে আমি ঘুড়ি ওড়াই।
ভাবি – কাক্কু তার নদীর পানি সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছে। টিপাইমুখী বাঁধ নির্মাণ থেমে গেছে, কিংবা বাংলাদেশ জলসম্পদ রক্ষা পরিষদ থেকে কাক্কুকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। অথবা, মুমিনদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে মূল্যবান গবেষণার জন্য কাক্কুকে মগবাজারের কোনো অফিস থেকে ইমান্দারোফদিয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
আমার এসব কল্পনা মোটেও অমূলক নয়। আবার বলি, প্রস্তর যুগের ব্লগ দর্শক যারা আছেন – তারা নিশ্চয় দ্বিমত হবেন না, সে সময় বাংলাদেশের মধ্যরাতে ৪/৫ লাইনের বক্তব্য আর তারচেয়েও লম্বা শিরোনামের পোস্ট দিয়ে নাস্তিক-ভারতের্দালাল-ইসলামের্শত্রু দুষ্টু ব্লগারদলকে কেমন তছনছ করে দিয়েছিলো...। কাক্কুর একটা পোস্টের ওজন আবুজরগিফারী বজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়েচডিধারী- মহম্মদপুর থ্রিডি ইউনিভার্সিটির ভিসি- লাইফটাইম জিয়ারি ক্যান্ডিডেট বালকটিও বইতে পারতো না। আমরা পাঁজি ভাতিজার দল কোন ছার!

অবশ্য আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।
ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো, পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো, ব্লু জিনসের সাথে কালো বুট স্যু...। আমি চোখ কচলাই, আরে তা-ই তো...জ্যামছ। কতদিন গুরুর গান শুনবো বলে কনসার্টে পুলিসের তাড়া খেয়েছি। হ্যাঁ, তিনি এখানে এই কাক্কুর অফিসে কেন?
ব্যান্ড-গুরু জ্যামছ সোজা কাক্কুর হাত ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে, ‘এডভোকেট সাহেব, আমাকে বাঁচান।‘
কাক্কু সান্ত্বনা দেয়, ‘আরে অস্থির হবেন না, আমি তো আছি, বলেছি তো ফোনে...’
জ্যামস হাত ছাড়ে না, বলে – ‘এই গান তো আমি লিখিনি। রাহমান স্যার লিখেছিলেন, তিনিও বেঁচে নেই এখন, আমার উপরে দোষ কেনো তবে?’
কাক্কু এবার বিজ্ঞের মতো হাত নাড়ে, ‘দেখুন, সবই মানলাম। কিন্তু, আইন নিয়ে তো প্রশ্ন চলে না, কী বলেন?’
জ্যামছ এবার মুষড়ে পড়ে। ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে। কাক্কু তাকে দুই হাতে তুলে ওঠায়, বলে – ‘শিনায় শিনায় লাগে টান’। সে কথা জ্যামছের কানে যায় না, সে ‘ইয়ারব ইয়ারব’ জিকির তোলে।
আমি কাক্কুকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী ব্যাপার কাক্কু?’
কাক্কু মুচকি হাসে, ‘প্রিয়তমা সুন্দরী গাইতে গেছিলো...হে হে। এখন মামলায় ফাঁসছে...’

আমি ঠিক বুঝতে পারি না, প্রিয়তমা সুন্দরী গাওয়ার সাথে মামলার কী! তবে এটাও ভাবি, কাক্কু নিশ্চয় অন্য কিছু ইংগিত দিয়েছে, আমি বুঝিনি...।

এই বোঝা না বোঝার চক্করে যখন হিমশিম খাচ্ছি, তখন লিকলিকে শরীরে শাদা শার্ট, মাথায় চুল কম একজন বিক্রমপুরের মোলায়েম কন্ঠে আওয়াজ তোলে কাক্কুর অফিসে ঢুকে। মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে ফালুটিভিতে আমি দেখেছি তাকে। তাই চিনতে কষ্ট হলো না – জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কাম-দাদুল হক লিমন। কাক্কু তাকে দেখে বিনয়ে নত হয় – ‘আরে আপনি আবার কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?’
‘উপায় তো নেই, ভাই! মামলা হয়ে গেছে...’
আমি কাক্কুর চোখে স্পষ্ট লোভ দেখতে পাই। ‘মামলা হয়ে গেছে’ ভীতবাণীতে কাক্কুর চোখের সামনে যেনো অফুরান সম্ভবনা।
কাম-দাদুল হক লিমনকে চেয়ারে বসতে দিয়ে কাক্কু খসখস করে নোট নেয়-
‘কী নাম বইটার? ‘প্রেম প্রীতির সুখ দুঃখ?’
‘ঠিক বলেছেন।’
‘সুন্দরী লিখেছেন কতবার?’
’৪৮ বার। বই ৫ ফর্মার – ৮০ পৃষ্ঠা।’
কাক্কু মাথা নাড়ে – ‘কিন্তু, দ্বিতীয় মামলাটা কীসের?’
জনপ্রিয় লেখক লিমন এবার মাথা নিচু করেন, ‘আপনি তো জানেন, আমাদের বিক্রমপুরে গেলে আমি মোটর সাইকেল চালাই। এবার ভাবলাম, যা-ই গরেহঙ্গা ডিগ্রি কলেজের পাশটা রাউন্ড মেরে আসি। তো বিকেলে তখন কলেজের গেটে যেতেই এক তরুণী আমার পথ আঁটকালো, বললো তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।‘
কাক্কু কপাল কুঁচকায়, ‘তারপরে? পৌঁছে দিলেন?’
‘হ্যা, আপনি হয়তো জানেন- এ ঘটনা আমার জীবনে বারবার ঘটেছে, আমি লেখক মানুষ ,তাই আমার উপরে আস্থা রাখা যায়- এ যুক্তিতে কতোদিন কতো মেয়ে পথে থামিয়েছে, বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়েছে...।‘
‘কিন্তু, এবার সমস্যা হলো কীভাবে?’
লিমন এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের নখ খুঁটেন – ‘এখন তো আসলে সময় পালটে গেছে, মোটর সাইকেল থেকে নামার পরে মোবাইলের ক্যামেরা অন করে মেয়েটি আমাকে বললো, তাকে কিছু বলতে হবে, সে রেকর্ড করে রাখবে- জনপ্রিয় একজন লেখক কী বললো তার স্মৃতি।‘
কাক্কুকে অস্থির মনে হয়, ‘তারপরে, তারপরে কী হলো?’
‘তারপরে আর কী হবে, এমনটা তো আমি আগেও বলেছি নানান তরুণীকে, -তুমি দেখতে খুব সুন্দরী- কখনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার মোবাইল ক্যামেরায় রেকর্ড থাকায় আমি ফেঁসে গেলাম। পরিবার থেকে এক লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণ চেয়ে নিপীড়নের মামলা করা হয়েছে...’।
কাক্কু এসব শুনে অভয় দেয়, ‘একদম ভাববেন না, আমি আছি...’।

জ্যামছের চক্করের পরে কাম-দাদুল হক লিমনের চক্কর। আমার কাছে হিমশিম লাগে। কাক্কুর অফিসে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্ত হাতে নিই। প্রথম পাতায় বিশাল বিজ্ঞাপন, ‘মুহায়ুন আহমেদের পাঠকরা বিভ্রান্ত হবেন না, তিনি কখনোই তার কোনো গল্প উপন্যাসে নায়িকাকে সুন্দরী বলেন নাই’। সঙ্গে মুহায়ুন আহমেদের দুটি নতুন উপন্যাসের বিজ্ঞাপন – ‘সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ী ও হলুদিয়া হিমু’, ‘সুন্দরী রূপবতী নয়’।

মোয়া দিগন্তের প্রথম শিরোনাম – ‘বাড়ছে মামলা, আদালতে মামলা জট, বিপাকে লেখক-শিল্পী’। বুঝলাম, দেশে আসার দুদিন আর এসে একদিন ; এই তিন দিন পত্রিকা পড়িনি। দেশে বিশাল কিছু হয়ে যাচ্ছে। নানান মামলায় জড়ানো হচ্ছে লোকজনকে। নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে মোয়া-দিগন্ত বলছে – ‘জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক, টিভি উপস্থাপক ও নাট্যকার কাম-দাদুল হক লিমনের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস প্রেম-পীরিতের সুখ দুঃখ এর পাতায় পাতায় ‘সুন্দরী’ শব্দের অপব্যবহার করেছেন এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন ঢাকা ডেফারেল সাংঘাতিক ইউনিয়নের সাবেক সম্পাদক জনাব কিয়াস গামাল চৌধুরী। অভিযোগে তিনি বলেছেন, ইসলামী মূল্যবোধের বাংলাদেশে ইমান আকিদা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে এসব শব্দের যত্রতত্র ব্যবহার করে কাম-দাদুল হক মিলন যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরেও লিমনের নানা কুকর্মের ভিডিও ক্লিপ এখন মানুষের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে...‘

এসব পড়ে আমার গা চমকে ওঠে।
মোয়া-দিগন্তের পেছনের পাতায় যাই, সেখানে ‘ঢাকাস্থ আমরা বিক্রমপুরনিবাসী’ এসোসিয়েশনের প্রতিবাদ সভার ছবি। তাদের এলাকার কৃতি সন্তাম লিমনকে হামলা মামলা থেকে মুক্তি দেয়ার দাবী জানাচ্ছে তারা।

খেয়ালই করিনি, প্রথম পাতার নিচে জ্যামছের বিশাল ছবি। ডব্লিউ ভি এ মিলনায়তনে ‘প্রিয়তমা সুন্দরী আমার’ গান গাওয়ার অপরাধে মামলা করেছে কনসার্টে থাকা তিনশ তেত্রিশজন তরুণী। গিটার হাতে দুলে দুলে গাওয়ার ভঙিতে নিশ্চিত ভাবেই কু-ইংগিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা বিভাগ এখন কনসার্টের ভিডিও পরীক্ষা নীরিক্ষা করে চলেছে...।

আমি মাঝে মাঝে স্বপ্ন ও বাস্তবে হিমশিম খাই। কতোকতো দিন সকালে ঘুম ভেঙেছে বিরিয়ানী-বুরহানীর টেবিলের প্লেটগুলো না ছুঁয়ে...। মনে হলো সেরকম স্বপ্নের মাঝে আমি আছি। নয়তো- ‘সুন্দরী’ উচ্চারণের ও লেখার অপরাধে শাস্তি হবে কেনো মানুষের। আবার নিজেকে এ’ও বলি, নচিকেতার গানে জেনেছি – ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়’। পেপারের ভেতরের পাতায় যাই, সেখানে বিশাল তালিকা, নিম্ন আদালতে মামলা হচ্ছে প্রতিদিন। ফেঁসে যাচ্ছে ডজন ডজন লোক...।

জ্যামছ এবং কাম-দাদুল হক লিমনকে কিছু কাগজ পত্র গুছিয়ে দিয়ে বিদায় করে, কাক্কু আমাকে বললো – ‘চলো বাসায় চলো, তোমার কাকীমা শর্ষে ইলিশ রেঁধেছে।‘
আমি কাক্কুর পেছন পেছন বের হই।
তখনি একজন হাড্ডিসার লম্বা টেকো লোক এবং আরেকজন জংলী চুলের যুবক কাক্কুর অফিসে ঢুকে। একে অন্যকে দোষ দিয়ে যায় তারা।
বৃদ্ধ বলে, ‘আমি তো গাই না এখন, তুমি গাইলা, তাই আসামী তুমি।‘
বেয়াড়া যুবক উলটা ধমক দেয় – ‘গানের মালিক আপনি, আমি কেন সাজা পাবো?’

কাক্কু দুজনকে চেয়ারে নিয়ে বসায়...।
আমি হেটে হেটে সু-ওয়াং গার্ডেন রেস্টুরেন্টের বিপরীত দিকে দাঁড়াই, মনে পড়ে এ পথে কতোদিন কলেজে গেছি, তাও দশক পার হয়ে গেলো। তখন এমন কোলাহল ছিলো না, হৈচৈ ছিলো না। কিছু সবুজ গাছ ছিলো রোড ডিভাইডারে।
কাক্কু তখন রিকশা ডেকে আমাকে তুলে নেয়।
জিজ্ঞেস করি, ‘ওরা কারা ছিলো?’
কাক্কু অবাক হয়, ‘চিনলি না?’
‘নাহ!’
‘আরে বড়ো জন দুরশিখ আলম, আর চ্যাঙড়াটা কান্থ পানাই।‘
‘তাদের আবার কী হলো?’
‘চুমকি চলেছে একা পথে শুনিস নাই? ওটার জন্য মামলায় ধরা’।

রিকশা চলতে থাকে। আমি টের পাই, এসব মামলায় কাক্কুর ব্যবসা লালে লাল হবে। কিন্তু, এটাও ভাবি- আচমকা কাক্কুর এত যশ-খ্যাতি ছড়ালো কীভাবে! নানান ইতস্ততঃ করে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘আচ্ছা কাক্কু, এত এত আইনজীবি থাকতে এরা সবাই তোমার কাছে কেন?’
কাক্কু মনে হয় খানিক রুষ্ট হলো আমার প্রশ্নে, বললো – ‘তুই আমাকে এমন তুচ্ছ করলি?’
আমি বোঝানোর চেষ্টা করি, ‘না , মানে হয়েছে কি। আমি তো অনেকদিন দেশের বাইরে ছিলাম, আগে তো তুমি এমন ছিলে না...’
কাক্কু আমাকে খোঁচা দিয়ে বলে, ‘তুই কি আমার দক্ষতা দেখিসনি ব্লগে? কেমন করে শুইয়ে দিয়েছে সব বাঁদরের দলকে, পেরেছে কেউ?’
আমি হুম/হ্যাঁ করে যাই।

কাক্কু এবার বাম হাতে ধরে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্তের বিজ্ঞাপনী পাতা খুলে। সেখানে ৫ কলামে কাক্কুর বিজ্ঞাপন – বড় করে কাক্কুর টাই পড়া ছবি। 'সুন্দরী শব্দটি ব্যবহার সংক্রান্ত মামলায় মুক্তি চান? নির্দ্বিধায় চলে আসুন কাকুন্দ’জ চেম্বারে। কোরিয়া থেকে স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত আইনজীবি, বাংলা ব্লগস্ফিয়ারের জাঁদ্রেল ব্লগার আইনজীবির পরামর্শ নিন। আসুন, কথা বলুন, শুনুন, তারপরে সিদ্ধান্ত নিন। ঘুরে আসুন ডব্লু ডুব্লু ডুব্লু...’

আমার আবার তাজ্জব হওয়ার পালা।
কাক্কু তুমি এত চাল্লু! আগে তো টের পাইনি...।
কাক্কু শুধু মিটিমিটি হাসে।

-তিন-
আরও তাজ্জব হলাম কাক্কুর বাসায় ঢুকে।
দেশি বিদেশি পুলিস বাসা ঘিরে রেখেছে। কোরিয়ান-আমেরিকান ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ‘ইন্টার সার্চের’ একদল অফিসার ঢাকা এসে তোলপাড় করে দিয়েছে।
গত দু’সপ্তায় কোরিয়ায় অন্ততঃ ৭জন নারী আত্মহনন করেছে রহস্যময় কারণে। সবার ঘরে একটাই চিরকুট - ‘এভাবে ঠকাবে ভাবিনি’। পুলিশ মিলিয়ে দেখেছে – ৭জন নারীর ঘরেই টাই পরা, পরিপাটি গোঁফেল, চশমা পড়া এক লোকের ছবি পাওয়া গেছে। নানান বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মাস কয়েক আগে এই লোক কোরিয়া গিয়েছিলো –সেমিনারে নাকি ট্রেনিং’এ। সেখানে অল্প ক’দিনেই ঐ সাত নারীকে প্রেমের ফাঁদে বন্দী করে সে। সে আর কেউ নয়, ছবি মিলিয়ে দেখা গেলো – লোকটি আমাদের কাক্কু...।
বাংলাদেশি এক গোয়েন্দা অফিসার কাক্কুর টাই টেনে ধরে, ‘কোনো রকম চালাকি করবেন না। হোম মিনিস্ট্রিতে আগুন লেগেছে আপনার কারণে...। জলদি স্বীকার করুন, কী হয়েছিলো...’।

কাক্কু মিনমিন করে কম্পিউটার চালু করে।
ফেসবুকে তার ডজন খানেক কোরিয়ান বান্ধবী। প্রাইভেট মেসেজ বক্সে – আবেগঘন প্রেম পত্রে ভর্তি। ফটো তালিকায় – ঘনিষ্ট ছবিতে ভরপুর। কাক্কুর কনুই বড়োই বিপজ্জনকভাবে জায়গা করে নিয়েছে...।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখি...।
কোরিয়ান এক অফিসার হঠাৎ কাক্কুর হাতের মাউস কেড়ে নেয়। কম্পিউটারের মনিটরে একটি জায়গায় সে ফোকাস করে, সেখানে দেখি ফেসবুক আপডেট – ‘... ইস নট সিংগেল এনিমোর, ম্যারিড টু...’।
আমার কাছে আবার সব রহস্যময় লাগে। মনে হয় আমি যেনো হরর ম্যুভির দর্শক হয়ে আছি। কোরিয়ান আরও কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কী কী আলাপ করে। মনে হয় – সাত সাতটি হত্যাকান্ডের রহস্য তারা উদ্ঘাটন করতে পেরেছে...। ততক্ষণে কাক্কুর হাতে শেকল লেগে গেছে। আর আমি পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়েছি। দ্রুত পায়ে রাস্তায় এসে, সি এন জি ধরে চলে যাই – মদীনা ট্রাভেল এজেন্সিতে। ফাঁদে পড়ার আগেই ভাগতে হবে। ঢাকা – দুবাই – হিথ্রো – টরন্টো।

সারা পথ অস্থিরতায় কাটিয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে যখন ল্যাপ্টপ চালু করলাম তখন মনে পড়লো – আজ ১২ মে। জাপানে থাকা এক বন্ধুকে এই দিনটি মনে করিয়ে দিতে হবে, বলতে হবে অঞ্জনের ‘মালা’ গানের কথা...। আমি মেইল টাইপ করি, আর মনে হয় কেউ আমার কাঁধে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। খুব নিচু স্বরে ডাকছে...।

-চার-
চোখ মেলে তাকাতেই দেখি, অপরূপা কুহেলিকা চৈনিক বালিকা।
আমাকে জিজ্ঞেস করছে – কোথায় যাবে তুমি?
আমি চোখ কচলাই। আসলেই , কোথায় যাবো? আমার কিছু মনে পড়ে না...
বালিকা এবার মনে করিয়ে দেয়, আজ রাতে ট্রেন আর চলবে না।
আমি ঘড়ি দেখি, রাত প্রায় দুটো...
ট্রেন থেমে আছে কিপ্লিং স্টেশনে। আমি কম্পার্টমেন্টে এসে দাঁড়াই। মাথা ঝিমঝিম করে। মনে পড়ে আজ সন্ধ্যায় ইয়াং-ব্লোর স্টেশন থেকে বাসায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলাম। একেবারে শেষের সিটে আরাম করে পিঠ হেলিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরে আর কী হলো মনে নেই...। কতোবার ট্রেন তার রুটে চক্কর মেরেছে, আমি একবারও টের পেলাম না কিছু?

এসব যখন ভাবছি, তখন বালিকা জিজ্ঞেস করে – ‘তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ?’
আমি মাথা নাড়ি, ‘না না, ঠিক আছি...’
বালিকা হেঁটে চলে যায়। আমার মনে পড়ে ‘থ্যাঙ্কু’ বলা হয়নি।
আমার ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে বলি, ‘সো নাইস অফ ইউ...’।
তখন আবার আমার মাথায় একটু আগে ঘটে যাওয়া সব মনে পড়ে, ঢাকা-পল্টন-লিমন-জ্যামছ-কোরিয়ান পুলিশ...।
সামনে পা চালাই।
এই মাঝরাতে এখান থেকে কীভাবে বাসায় ফিরবো জানি না।
আমার মাথায় কিছু কাজ করে না।
আমার মনে পড়ে কাক্কুকে। মনে পড়ে কাক্কুকে আমার।
আমার কাক্কুকে মনে পড়ে।
.
.
.

Read more...

15 May, 2009

-নিয়ন পেপসি - ১ ।। ভ্রমণ অথবা বিজ্ঞাপন-

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কি অয়ন, মাথাব্যথা করছে নাকি?’
আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে আবার সামনের সীটে মাথা ঠেকিয়ে রাখে সে। বাস তখন সম্ভবতঃ বাবুবাজার পার হলো বা এর কাছাকাছি। খানিক পরে আরেকবার ডাকলে সে মুখে আঙুল চেপে ইশারা দেয়, যার অর্থ হলো – ‘চুউপ, কথা নাই।‘
একবার ভেবেছিলাম – অয়ন নামাজ পড়ছে। যাত্রাপথে বাসে অনেকেই ইশারায় নামাজ পড়েন, এমন দেখেছি। তাই চুপ থাকি। টিভিতে নাটক চলছে ‘স্ক্রিপ্ট রাইটার’। বেকার নায়ক চাকরির জন্য এখানে ওখানে ঘুরছে...। বন্ধুরা টিপ্পনী কাটছে। এক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় স্ক্রিপ্ট রাইটারের অফার আসে। নায়ক রাত জেগে কাগজ কলমে কাটাকুটি করে, নানান দৃশ্য কল্প জাগে তার মনে।
আরও পরে অয়ন মাথা সোজা করে সিটে থিতু হয়। মুখে শয়তানি হাসি। জিজ্ঞেস করি, ‘কাহিনী কী?’
অয়ন বলে, ‘ওরা কী বলে শোনার চেষ্টা করলাম।‘
‘কী বলে?’
‘বোঝা যায় না, ফিসফিস করে...।‘
আমি আবার নাটকে মন দিই। সামনের দুই সীটের ফাঁক দিয়ে দৃশ্য দেখার চেষ্টা করেছিলাম শুরুতে। ব্যবধান শুন্য ইঞ্চি ঘনিষ্টতায় দুজনের আসলে একটি সীট হলেই চলতো। তবে খুলে রাখা স্কার্ফের আড়ালে কিছু দেখা যায় না। আমি তাই হতাশ হই, এরচে’ বরং নাটক দেখা ভালো। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জয়া আহসান তার স্বামী আতিককে প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বলছে – ‘আচ্ছা, তুমি কখনো কচ্ছপ দেখেছো?’
অয়ন এবার আমাকে গুতা দিয়ে ইশারা দেয়। সে বসেছে জানালার পাশে। চোখ একটু এংগেল করে তাকালে সামনের সীটে কী হচ্ছে দেখা যায় জানালার কাঁচে। হাসি আঁটকাতে আমি মুখে হাত চাপি। আমার ডানে পেছনে সীটে বসা স্থুলকায়া আন্টি কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে...।

সেদিন ২২ আগস্ট, শুক্রবারে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম পান্থপথ থেকে। ঢাকা শহরের আরও তিনটি কাউন্টারে থেমে থেমে ফকিরাপুল থেকে সোহাগ পরিবহন যখন ছাড়ে তখন সাড়ে ছয়টা বেজে গেছে। আমার হিসেব ছিলো, সোয়া পাঁচটায় পান্থপথ থেকে ছাড়লে চল্লিশ মিনিটেই কাঁচপুর ব্রিজ পার হবো। সেসব হিসেব ওলট পালট হয়ে যাত্রা বিলম্বিত হয়। খিদেও চাড়া দেয়। চিপসের প্যাকেট কিনেছিলাম আগেই। এবার যখন চোখে পড়লো গরম গরম সমুচা-সিংগাড়া ভাজা হচ্ছে, তখন আমার পা চালানো দায়। অয়নকে বলি, ‘তুমি বাসে গিয়ে বসো, আমি কিছু কিনে আনি।‘
বাসে উঠে দেখি অয়ন জানালার পাশে সীট দখল করেছে। কী আর করা...। এই মন খারাপে আরও মন খারাপ যোগ হলো যখন বুরখা পড়া কিশোরীবাতরুণীকিংবামহিলা এক সুদর্শনবখাটেভাবের তরুণের হাত ধরে বাসে ওঠে। এসে বসে আমাদের সামনের সীটে। বুরখাওয়ালী জানালার পাশের সীটে, তরুণ আমার সামনের সীটে। আমার সংগোপন মন খারাপের মাত্রাকে ছাড়িয়ে অয়নের হতাশা নীরবতা ভাঙে। সব দোষ দেয় আমার ওপরে –
‘এইটা আপনার কারণে হইলো...’
‘আমার কী দোষ?’ আমি অবাক হই।
‘বুঝেন না, আপনার কী দোষ? এত এত বাসে চড়লাম কখনো এমন হয় নাই, আর আজ আপনি আসতেই বুরখাওয়ালী উড়ে আসলো...’
আমি কী করে বুঝাই, ভাই অয়ন – এই বুরখাওয়ালী জোটার সংগে আমার সম্পর্ক নেই, আর যদি আমার ক্ষমতা থাকতো তবে এই সোহাগ পরিবহনের প্রতিটি সীট সেই কবে ফেলে আসা কো-সামেট আর কো-চ্যাঙ আইল্যান্ড বীচের তীক্ষ্ম-ধারালো তরুণী দিয়ে ভর্তি করে দিতাম। অয়নকে বোঝানো হয় না। বাসের সুপারভাইজর ভাইজান তখন পানির বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট দিয়ে যাচ্ছে। বিস্কুটের নামটা মনে পড়ছে না এই মুহুর্তে, তবে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখেছি ঐ বিস্কুট খেলে মুখ দিয়ে ফটফট করে ইংরেজী কথা বের হয়। সাইফুরসের ব্যবসা লাঠে ওঠলো বলে...। এসব যখন ভাবছিলাম, তখন বাস চলছে, আর সামনের বুরখার স্কার্ফ গেছে খুলে। আরও মিনিট কয়েক পরে কিশোরীবাতরুণীকিংবামহিলা বিভ্রম কাটে যখন তিনি দাঁড়িয়ে কালো বুরখা খসিয়ে দিচ্ছেন গা থেকে। অয়ন ব্লগে তেমন লেখালেখি করে না, লিখলে উদ্ভিন্নাযৌবনা শব্দটি নির্ঘ্যাৎ নিয়ে আসতো বিশেষণ হিসেবে।
গলা একটু চড়া করে জিজ্ঞেস করি, ‘কী খবর অয়ন, কেমন আছো?’
একথা আরও অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, সেদিন বাসে, পরদিন সিলেটে রাস্তায় চলতে গিয়ে। অয়ন যা বোঝার বুঝে গেছে...। তার আসলে না বুঝে উপায় নেই। স্কার্ফ বুরখা খুলে তারা ক্রমশঃ ঘনিষ্ট হয়, ডান পাশের জন ক্রমাগত বাম পাশে যায়। একটি মাথা অন্য ঘাঁড়ে আশ্রয় নেয়, ব্যবধান শুন্য ইঞ্চি হয়। আর অয়ন মাথা নিচু করে সামনে সীটে ঠেক দিয়ে শোনার চেষ্টা করে তারা কী বলে...। আমার প্রশ্নের উত্তরে বলে - ‘বোঝা যায় না, ফিসফিস করে...।‘

বাইরে রাত নেমে এলে, বাস অন্ধকার হয়। আমরা টিভিতে নাটক দেখি। হুমায়ুন আহমেদের ‘চোর’। গুরু এজাজুল ইসলাম শিষ্য ফারুক আহমেদকে টিপস দিচ্ছে, ‘তিন ধরণের বাড়ীতে চুরি করতে যাবি না, এক- যে বাড়ীতে বৃদ্ধ থাকে, ওদের ঘুম পাতলা। দুই- যে বাড়ীতে শিশু থাকে, সারারাত কাঁদে, মা বাপ ওঠতে হয় বাচ্চার জন্য, আর তিন নম্বর হলো – যে বাড়িতে নতুন বিবাহিত স্বামী স্ত্রী আছে, তারা সারারাত ফুসুরফুসুর করে, ঘুমায় শেষ রাতে...। মুগ্ধ শিষ্য গুরুর পায়ে ধরে সালাম করে আশীর্বাদ নেয়।
অয়নকে জিজ্ঞেস করি, ‘এরা কি হানিমুনে যাচ্ছে?’
অয়ন বলে- ‘মনে হয় বাসা থেকে পালাচ্ছে’।
তখন টিভিতে সোহাগ পরিবহনের বিজ্ঞাপন চলছে। একদল ছেলেমেয়ে বাসে করে যাচ্ছে। অন্ত্যাক্ষরী খেলছে তারা। নাচছে সবাই, মুরুব্বীও যোগ দিচ্ছেন। পে-অফ লাইন – নিরাপদ আনন্দময় ভ্রমণের জন্য সোহাগ পরিবহন। অয়ন বলে, বিজ্ঞাপনটা ফালতু। জিজ্ঞেস করলাম – ‘কেন’?
তার হতাশা – পুরা বাসটা নিরানন্দ, এরকম নাচে না কেউ...।

সে রাতে সিলেট পৌঁছে আলবাব ভাইকে জিজ্ঞেস করি, ‘আচ্ছা, বিজ্ঞাপনে যা দেখায় সব কি সত্যি হয়?’
আলবাব ভাই জিজ্ঞেস করে, ‘কেন, কী হইছে?’
‘আজকে বাসে সামনের সীটে...’
আরেকটু শুনে আলবাব ভাই চোখ বড়ো করে চশমায় ধাক্কা দেয়।
অয়ন থামে, আমিও।

এবার বুঝি – বিজ্ঞাপনের মুরুব্বীরা নাচে আর বাসের মুরুব্বীরা নাচে না কেনো...
__

(পরের পর্ব অন্য প্রসংগে।)
.
.
.

Read more...

05 May, 2009

চুপিচুপি রাত নামে - ০১

আদনান আহমেদ বেকার। তবে একেবারে পরিশুদ্ধ বেকার নয়। কিছুটা ভেজালযুক্ত। দুটো টিউশনি করে। যা পায়, তাতেই চলে। চাকরীর জন্য মামা-চাচা লাগে, এ যুক্তিতে বিশ্বাসী নয় আদনান। বরং প্রচন্ড আশাবাদী একজন মানুষ। অল্প ক'দিনের মধ্যে কিছু একটা হয়ে যাবে এমনটা আশা করছে সে গত দুই বছর।

সকাল দশটা।
আজ দিনটা আদনানের জন্য অন্যরকম। আজ তার দুটি জরুরী কাজ - ১) ইন্টারভিউ ২) মেহজাবিন। আদনান সবচেয়ে পছন্দের জামা পরেছে। সাদা শার্ট। কালো প্যান্ট। কালো স্যু। সঙ্গে একটা লাল টাই হলে মন্দ হতো না। নেই যখন আর কী করা? চুলটা আরেকবার আঁচড়ে নেয় সে। গোল আয়না ঝাপসা হয়ে গেছে। শেষে হাত দিয়ে আরেকবার ঝাড়া দেয় চুলে। নাহ! বেশ লাগছে। ক্লিয়ার শ্যাম্পু দেয়ায় চুল বেশ ঝরঝরা লাগছে। হেড এন্ড শোল্ডার দিলে আরও ভালো হতো। আদনান ঘড়ি দেখে। সকাল দশটা বাইশ মিনিট। এগারোটায় ইন্টারভিউ।

ছয় নম্বর বাসে করে বনানী আসে সে। ফারুখ টাওয়ারের চার তলায় ইন্টারভিউ। একটি মাল্টিন্যাশনালের অফিস। সবার আগে আদনানের ডাক পড়ে। ইন্টারভিউ বোর্ডে চারজন ছিলো। তারা বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্ন করে। আদনান স্বাভাবিকভাবে জবাব দেয়। প্রায় দশ মিনিটের মতো ইন্টারভিউ চলে।
আদনান ভাবে চাকরিটা তার হয়েই যাবে। তবু মনে হয়- একটা লাল টাই পরলে পুরো নিশ্চিত হওয়া যেতো। এসব ভাবতে ভাবতে সে ফারুখ টাওয়ারের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। এরপর সে আজিজ মার্কেটে যাবে। কবিতার বই কিনবে মেহজাবিনের জন্য। আর দুটো লাল গোলাপ।

মেহজাবিনের সঙ্গে আজ দেখা হবে ক্যাফে ঝিলে। পাঠক সমাবেশ থেকে আদনান কবিতার বই কিনে। পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি। রফিক আজাদ। মৎস্য ভবন-প্রেসক্লাব পেরিয়ে ক্যাফে ঝিলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে দুপুর দুইটা। কোণার টেবিলে মেহজাবিন বসে ছিলো। আদনান তার হাতে কবিতার বই তুলে দেয়। মেহজাবিন মুচকি হাসে। আজ সে বেগুনি জামা পরেছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে।

-দুই-

আদনান খুব দ্রুত চুলে চিরুনী চালাচ্ছে।
আজ বোধ হয় দেরীই হয়ে গেলো। চাকরী পাওয়ার পর গত দু'মাসে একদিনও দেরি হয়নি। হাজার বিশেক একেবারে কম টাকা নয়। লাল টাইয়ের নট আরেকটু টাইট করে সে। মেহজাবিনের উপহার। আদনান ভাবছে সামনের মাঝে এক ডজন টাই কিনে নিবে। সব সময় এক রঙা টাই পরতে ভালো লাগে না। জিলেট দিয়ে শেভ করা মুখে আলতো করে ডেনিম মাখে সে। পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। ছয় নম্বর বাস এখন আদনানের কাছে ধুলো আর ভীড়ের ঝামেলা মনে হয়। ট্যাক্সি ক্যাবে অফিস যায় সে। ...আজ অফিস থেকে খানিক আগে আগে বের হয়। মেহজাবিনকে নিয়ে ম্যাঙ্গো ক্যাফেতে যায়। ওয়েটার পেপসি দেয়। আদনান ভাবে মেহজাবিনকে আজই বিয়ের কথা বলবে। এই মুহুর্তে। কিন্তু কথাগুলো ঠিক গুছাতে পারে না। পেপসিতে চুমুক দেয় সে। তাকায় মেহজাবিনের দিকে। কিন্তু! মেহজাবিনের মুখে যেনো আলোর বিস্ফোরণ। আদনান তাকাতে পারছে না। তার চোখ টনটন করে। প্রচন্ড আলোয় মেহজাবিন যেনো মিলিয়ে যাচ্ছে। আদনান কথা বলার চেষ্টা করে, চিৎকার দেয়। অথচ মুখ দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। দমবন্ধ হাঁসফাস লাগে।

...চোখ দুটো কচলে নেয় আদনান। দেখে জানালার গ্রীল পেরিয়ে সকালের রোদ পড়ছে তার চোখে। মাথার পাশে রাখা ঘড়িতে তাকায় সে। সকাল সাতটা তেরো। বালিশে মুখ গুঁজে আদনান আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে।

স্বপ্ন দেখতে আদনানের ভীষণ-ভীষণ ভালো লাগছিলো।

(চলবে)

Read more...

04 May, 2009

জরিপ সমগ্র



_________________



_________________


_________________

_________________

_________________

_________________

Read more...

01 May, 2009

মৃত কবিতারা - ০১

আমি ফেসবুকে একজনকে বন্ধু করেছি -
সে স্ট্যাটাস পালটায়, ছবি পালটায়
পালটায় জন্মতারিখ,
আমি ইউটিউবে একজনকে সাবস্ক্রাইব করছি -
সে নাচে - গায় এবং হাসে
বাংলা-ইংরেজী ও হিন্দিতে,
আমি ব্লগস্পটে একজনকে ফলো করছি -
সে কতো রকম ছলচাতুরি করে
গল্পে ছবিতে দিনলিপিতে, তারপর
ফেসবুকের বন্ধুটি ডিম সেদ্ধ করে স্ট্যাটাসে
ইউটিউবে নর্তকীর বয়স বাড়ে ভিড্যু আপডেটে
ব্লগস্পটের চতুর বাড়ায় হিটখোর‌্যামি ক্লিকে ক্লিকে,
আর আমি চেয়ে থাকি-
আমি চেয়ে থাকি ফেসবুকে, ইউটিউবে এবং ব্লগস্পটে
চশমার কাঁচ মুছি, নখ খুঁচাই, এন্টিভাইরাস আপডেট করি-
কারা কারা ডিম সেদ্ধ করে খোসা ছিলে খায়
নর্তকীর বয়স বাড়লে কোমর স্থুল হয়ে যায়
ব্লগস্পটে হিট ক্লিকে ক্লিকে ছয় হাজার ছাড়ায়- অথচ
আমার চেয়ে থাকা ছাড়া কিচ্ছু করা হয় না
আমি চশমার কাঁচ মুছি, নখ খুঁচাই, এন্টিভাইরাস আপডেট করি।
.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP