21 February, 2009

তারপর অথবা গল্পহীন সময়

আমার তখন মনে হয়, আমার কৈশোর শেষের প্রথম বান্ধবী আমাকে হাত ধরে জোর করে রিকশায় তুলে নিলো। আমি পাশাপাশি বসে আছি, রিকশা চলছে। ভালো লাগা, ভয়, লজ্জা, সংশয়; সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতিতে আমি আঁটকে গেছি। আমার কানের কাছে কেউ বলছে - 'এমন চুপ করে আছো কেনো? কথা বলো...'

আমি কী বলবো ভেবে পাই না।
আমার জ্বর জ্বর লাগে। বুক ধুক ধুক করে।
আমি উত্তর খুঁজে পাই না।
আলবাব ভাই আবার বলেন, তাহলে এবার কাজ আগাই।

তারপর কতো কিছু ঘটে। গল্প গুছাই। আমি একা নই। আমার আত্মজন কনফুসিয়াস-তিথি-অমিত আমাকে সাহস দেয়। তাঁরা (খুব সচেতনভাবে চন্দ্রবিন্দু দিচ্ছি) আমার গল্পগুলো পড়ে। কোনটা কী করা যায় বলে। তারপর এক সন্ধ্যায় আমি সিদ্ধান্ত নিই - বই হবে না। আমাকে দিয়ে কিছু করা যাবে না। আলবাব ভাই ঠান্ডা মাথায় কারণ শোনেন। আমার বাকী ৩ পাশের তিনজন আমাকে ভাবতে বলে। যেমন বলে, আমার আশৈশব বন্ধু সৌরভ, প্রিয় হিমু ভাই, অনেক আড্ডার দৃশা।
তারপর আবার অন্য কোথাও ফেলে দেয়া ফোল্ডার খুলি। ক্রমশঃ গুছিয়ে উঠে একটি বই। নানান আপডেটে ফোন করি রুমকি-প্রিয়কে। তাদের ক্যামেরার ক্লিকে দাঁড়াই এক সন্ধ্যায়।

প্রচ্ছদ হয় নানা রকম।
পছন্দ হয়, আবার হয় না।
নানান মেইল চালাচালি।

বইয়ের শেষ প্রচ্ছদ দিই, ফেসবুকে।
সেই কবে, কতোসব ভুলে যাওয়া মঙ্গলবারে, কতোসব জাদুকরী শব্দে ঝিম ধরানো মানুষ মোরশেদ ভাই। প্রিয় হাসান মোরশেদ লিখেন সচলায়তনে। সেদিন আমি পালিয়ে বেড়াই। সচলে লগ ইন করি না অনেক বেলা। আমার কেবল নিজের মাঝে লুকোতে ইচ্ছে করে...।

স্কুল জীবনের পর প্রবল নিঃসঙ্গতার মাঝে আমার বেড়ে ওঠা। কীভাবে এমন অতীতচারী হয়ে গেছি, কে জানে, কেনো। কর্ণফুলী না দেখে গোমতী-মেঘনা পার হয়ে, বুড়িগঙ্গা না দেখে, কবে চলে গেলাম কাওয়াই নদীর পাশে। তারপরে অনেক স্রোতে ভেসে আটলান্টিকের এপাড়ে। লেক অন্টারিও।

অনুভূতিগুলো মাঝে মাঝে অবশ হয়ে যায়।
আমার কিছু বলার থাকে না। আজ ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯।
গৌরবের একুশের বইমেলায়, ভালোবাসার প্রাঙ্গণে, শুদ্ধস্বরের স্টলে আজ একটি বই শোভা পাচ্ছে।
আনোয়ার সাদাত শিমুলের 'অথবা গল্পহীন সময়'।
ভিখিরি আমি আজ ডাকাত হয়ে গেছি, কাগুজে লেখক তালিকায় নাম লিখিয়ে কুঁকড়ে আছি খুব।
কেবল একটি ছবির দিকে তাকিয়ে চশমাটা খুলে নিচ্ছি চোখ থেকে। মোড়ক উন্মোচনে একজন মানুষ আমার বই হাতে তুলে দেখাচ্ছেন সবাইকে। এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষর তাঁর পরম মমতায় পৃষ্ঠাবন্দী হয়েছে। নজমুল আলবাব। প্রিয় লেখক, শ্রদ্ধার মানুষ, বড়োভাই; কতো কিছুই তো ডাকি।
আলবাব ভাই, বারবার ফোন করবো ভেবেও নম্বরটা চাপতে পারছি না। কিছু কিছু সময় এমন অবশ হয়ে যায়। করে দেন কেউ কেউ। খুব অল্প কিছুজন। অথবা গল্পহীন সময়। অথবা প্রিয় নজমুল আলবাব।

.
.
.

Read more...

15 February, 2009

ফারুকীর ‘ফার্স্ট ডেট’: প্রেম শুধু শরীর ঘিরে

ফারহানা বিথী ফেসবুকে পরিচয় সুত্রে পিন্টুকে সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পরে আসতে বলেছিলো। প্রথম দেখা হবে। পিন্টু গিয়ে দেখে সেই স্পটে আরও একদল প্রেমিক ভীড় করেছে, তাদের কেউ রোসান, কেউ সাগর, সাদা-শার্ট কালো প্যান্টে। হাতে গোলাপের স্টিক। কেবল ফারহানা বিথী নেই। প্রেম-অপ্রেমের বিষণ্ণ শহরে প্রেমিকেরা গোলাপের স্টিক ফেলে আরও বিষণ্ণ হয়। কিন্তু, ডিজুস লাভার পিন্টু থেমে থাকার নয়।

নানান চক্কর শেষে পিন্টু লিটনের ফ্ল্যাটে। নতুন প্রেমিকার সাথে।
‘কী করা যায়?’
প্রেমিকা বলছে - চা বানাও, অথবা আসো ইংলিশ টু বেঙ্গলী ডিকশনারী পড়ি। পিন্টু ডিকশনারীই পড়তে চায়, হাজারো শব্দের মাঝে কেবল 'ডেটিং' শব্দটি শিখতে চায়। উহু, আগে চা বানাতে হবে। চা ভালো হলে ওখানে (আঙুলের ইশারায় বিছানা)।
পিন্টু চা বানায়। এনটিভি সীল মারা মগে চা খায় তারা। তবুও ডেট হয় না। এই প্রেমিকা বুঝায়, ডেটিং করতে করতে কাউকে কি পুরনো মনে হয় না?
পিন্টুর জবাব দেয় না। তার আকুতি, চা কেমন হলো। প্রেমিকা পাশ মার্ক দেয়। এবং তারা বিছানা রুমের দিকে যায়। দরজা বন্ধ হয়। প্রেমিকা নাটক করে বলে, সে এইচআইভি পজিটিভ। পিন্টু যেহেতু ভীতু, তাই তারা আবার ডায়নিং রুমে ফিরে।

তাহলে শেষে কী হবে? পিন্টুকে হেদায়েত করার দায়িত্ব কে নিবে? নাট্যকার এবার বিবেকীয় সংলাপে বলায় পিন্টুর মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, সম্পর্কগুলোকে বস্তুগত কিংবা শারীরিক না, মানবিক সম্পর্ক হিসেবে ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত এইচআইভির ভয় (‘নাট্যকার কি বাঁচতে হলে জানতে হবে’ জানে না?) দেখিয়ে প্রেমিক পিন্টুকে একা রিকশায় বসিয়ে নাটক শেষ হয়।
__
এরকম বিবেকীয় বিশেষ সম্পাদকীয় লিখেছিলো আরেকজন। রগরগে সব কাহিনী ছাপিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়তে সত্তুরোর্ধ স্যুটেড বুটেড সম্পাদকটি লিখেছিলো, এসব কাহিনী আগামী দিনে সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণার উপাদান হবে, এগুলো অশ্লীল নয় – সামাজিক বাস্তবতা। সেই সম্পাদকটি বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন ডে চালু করেছিলো। নানান নাটক শেষে মিস্টার রেহমানের পতন হয়েছে। ঢাউশ সাইজের বিশেষ ভালোবাসা সংখ্যা এখন বোধ হয় বের হয় না। কিন্তু তার জায়গাটি এবার দখল করে নিলো মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। প্রাইম ইয়ুথের চাওয়া-পাওয়া স্যালুলয়েডের ফিতায় বন্দী করে এনটিভি’র বক্সে দর্শকের ড্রয়িং রুমে তুলে দিয়েছে।
__

মো.স. ফারুকী,
দর্শক হিসেবে আমি এখনো পিঁছিয়ে আছি হয়তো। এফ টিভির ‘মিডনাইট হটস’ ব্যক্তিগত পরিবেশে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। শরীরি প্রেমের এসব সংলাপ ঘনিষ্ট – দৃশ্য কুৎসিত নির্মাণে এনটিভি’তে দেখতে প্রস্তুত নই। চড়ুইভাতি/স্পার্টাকাস এবং আরও কিছু কাজ দেখে মুগ্ধতা ছিলো আপনার প্রতি।
তাই ‘ফার্স্ট ডেট’ দেখে আপনার প্রতি আমার জঘন্যতম নিন্দাটি জানাচ্ছি তাৎক্ষণিক।
__

ডাউনলোড লিংকঃ এখানে

ছবিসূত্র
.
.
.

Read more...

08 February, 2009

মিথিলা কি মারা যাবে?

এক মিথিলা মারা গিয়েছিলো ব্লগে। ২০০৭এর ১/১১ এ সময়ের কাছে কিনারে। অথবা মিথিলা মারা যায়নি। সে কেবলই নাটক ছিলো। নাট্যকার-কুশীলবের দক্ষতায় মাতম ছিলো অনলাইনে। 'মিথিলা, তোমার ম্রিত্যুর জন্য দিনটি চমৎকার ছিলো' লাইনের অসাধারণ কবিতাও লিখেছিলো কেউ। সেন্ট্রাল পার্কে মিথিলার ভার্চুয়াল কবর দেয়া হয়েছিলো। এসবই এখন অতীত।

ইফতেখার ফাহমি আর রেদওয়ান রনির মেগা সিরিয়াল 'হাউজফুল'। এন টি ভি'তে দেখায় সপ্তায় দুদিন। মোটামুটি ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ইউটিউবে /রঙিলা সাইটে চলে আসে। সাপ্তাহিক বিনোদন হিসাবে খারাপ লাগে না। হিউমার আর উইটের ভালো মিশ্রণ আছে। আছে স্টারের আনাগোনা। ৫৮ পর্ব শেষে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, এই নাটকে কী হয়? কাহিনী কি? এর উত্তর দর্শক আমি দিতে পারবো না। মনে হবে, কিছুই হয় না। আবার মনে হবে- অনেক কিছু হয়। তবে ওগুলো কাহিনী নয়, ঘটনা। এই দেখি, এই ভুলি। সব বিক্ষিপ্ত, এক সুতোয় গাঁথার মতো না।

আজ ৫৯ পর্ব দেখতে গিয়ে শুরুতেই নাটকের চরিত্র মিথিলা (যার আসল নামও মিথিলা, কেউ কেউ তাহসানের বৌ নামে চিনে) আড্ডার মাঝে মাথা ব্যাথায় আক্রান্ত হলো। নাট্যকার যেহেতু ব্লগের মহাজনীয় তত্ব জানেনা, তাই দর্শক হিসাবে অনুমান করি - ব্রেইন টিউমার। রাতে ঘুমের মাথাব্যাথা, ডাক্তারের চেম্বার, ব্লাড টেস্ট, পেছনে স্যাড মিউজিক, রিপোর্ট নিয়ে পারিবারিক লুকোচুরি শেষে ব্রেইন টিউমারই ধরা পড়লো। মেগা সিরিয়ালে ধুম করে কাউকে মেরে দর্শক সেন্টিমেন্ট আদায় খুব চাল্লু টেকনিক হয়ে যাচ্ছে তাহলে। ফারুকীর ৬৯, হুমায়ুনের 'এইসব দিন রাত্রি', 'কোথাও কেউ নেই', কিংবা অন্যকারো 'ট্যাক্সি ড্রাইভার' সব জায়গায় দেখি এই এক ধারা।

ফেসবুকে হাউজফুল সিরিয়ালের ফ্যানরা ধমক দিচ্ছে - মিথিলাকে মারলে হাউজফুল বয়কট করা হবে। ফেসবুকে গ্রুপটি চালায় হাউজফুল প্রোডাকশনের লোকজন, ৫০তম পর্বে নাট্যকারেরা এই গ্রুপে জয়েনের ডাকও দিয়েছিলো স্বয়ং। তারা কি শুনছে তাদের ভিউয়ার্স কী বলছে।

ব্রেইন সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট কি ভুল আসবে আগামী পর্বে, নাকি শেষ পর্যন্ত মিথিলা মারাই যাবে?

.
.
.

ছবি সুত্রঃ এখানে

Read more...

01 February, 2009

গল্প: শনিবারে নাজ ম্যারেজ মিডিয়ায়

শনিবার সকালে ফারজানা নাজনীনের তেমন কিছু করার ছিলো না। ভারী বাইন্ডিং ফাইল দেখে দরকারী আপডেট শেষে প্রতিদিনের মতো নতুন-পুরনো ক্লায়েন্টের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। দেয়াল ঘড়িতে তখন সকাল দশটা দশ। এমন সময় ম্যানেজার মাসুদ চাচা চলে আসার কথা। অফিসের জানালা খুলে, পর্দা সরিয়ে, বারান্দা থেকে হাঁক দিয়ে ফারজানার জন্য চায়ের অর্ডারও দেয়ার কথা। ফারজানা তাই অপেক্ষা করে। দরজার ওপাশে দেয়ালে বড় করে লেখা 'নাজ ম্যারেজ মিডিয়া - বিয়ের পাত্র পাত্রী অনুসন্ধান'। মাত্র দু'বছরে এ নাম এলাকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

কুসুমিয়া উপজেলায় এমন করে বিয়ের ঘটকালীও যে রমরমা ব্যবসা হয়ে উঠবে সেটা কেউ ভাবেনি আগে। ফারজানা নাজনীন নিজেও হয়তো ভাবেনি। কিন্তু, আশেপাশে তখন পালটে যাচ্ছে সব। মাদ্রাসা মার্কেটের নিচ তলায় সিঙ্গার ইলেকট্রনিক্সের শো রুম হয়েছে, সারা দেশে মোবাইল ফোন ৪ টাকা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অনেকগুলো মোবাইল ফোনের দোকান হয়েছে। তখন ম্যারেজ মিডিয়ার দোকান দেখে অনেকে হেসেছিলো, কেউ কেউ ভেবেছিলো – ফারজানা এমন করবে সেটা আগেই টের পেয়েছে তারা। কুসুমিয়া ডিগ্রি কলেজে বি.কম পাস দিয়েও যে মেয়ে বাজারে বাজারে টো টো করা ছাড়লো না, বিয়ে শাদী করলো না, সে ঘরে বসে না থেকে এরকম কিছু করবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মানুষের এসব কথা ফারজানা মাথায় নেয়নি, বরং নিজেই কিছু একটা করছে এমন ভেবে ভেবে খুশি হয় আনমনে। এই খুশির ভাবনায় বড়ো ধাক্কা লাগে শনিবার সকালে যখন সে মাসুদ চাচার জন্য অপেক্ষা করে, তখন মোবাইল ফোনে রিং হয়। কুসুমিয়া থানার ওসি রওশন আরা ফোনে ফারজানার কাছে পাত্র অনুসন্ধান করে। এমন ফোনে অখুশী হওয়ার কিছু নেই। পাত্র অথবা পাত্রীর বিবরণ নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে কাগজে টুকে রাখে, তারপর সময় করে অফিসে আসতে বলে সব ক্ষেত্রে। কিন্তু রওশন আরার ফোনে ফারজানা একটু ঘাবড়ে গেলো। ছ'মাস আগে কুসুমিয়া থানায় মহিলা ওসি'র আগমন এলাকায় হৈচৈ ফেলেছিলো। সার্কাস অথবা যাত্রাপালার প্রিন্সেসকে দেখার মতো করে দূর দূরান্তের লোকজন থানার আশেপাশে চক্কর মেরেছে। উপজেলা সদরে যারা থাকে, ব্যবসা করে কিংবা নিয়মিত আসে তারা রওশন আরাকে হরহামেশা দেখে। তবে ভয়ে কেউ ইঙ্গিতি কথা বলে না। কলেজের উঠতি ছেলেরা হয়তো নিজেদের মাঝে টিপ্পনী কাটে। বুড়োদের কেউ জগত সংসার গেলো বলে পিঠ ঘুরায়। কেউ কেউ অকারণেই হাসে নিজেদের মাঝে, যার অনেকগুলো অর্থ হতে পারে। তবে সব মিলিয়ে ঐ এক কথা – থানায় মহিলা ওসি এসেছে, পুলিশের ইউনিফরম গায়ে নানান দিকে গাড়ী নিয়ে যায়, এটাই এলাকায় অভূতপূর্ব ঘটনা। এত কিছুর মাঝে মাস কয়েক আগে সে যখন রাত দুইটায় অপারেশন চালিয়ে ইন্ডিয়ান শাড়ী চালানকারী দলকে ধরে ফেললো, অনেক রাউন্ড গোলাগুলিও হলো, তখন জাতীয় পত্রিকা এবং স্যাটেলাইট টিভিতে রওশন আরাকে নিয়ে সাড়া পড়ে গেলো। কুসুমিয়া উপজেলা সদরের পাকা সড়ক পেরিয়ে দত্তপাড়া, ছাতিমপুর, মুন্সীতলা এরকম নানান গ্রামে রওশন আরার নানান গল্প ছড়িয়ে গেলো। এমন জাঁদরেল ওসি এলাকার চোর ডাকাত সব জেলে দিচ্ছে, নিজেই রাত বিরাতে চোরাকারবারী ধরছে এ প্রশংসায় সবাই আপ্লুত হয়। অনেকে তাকে নিজের চোখে না দেখলেও তার সাহসের সুত্র ধরে নানান গল্প ফাঁদে। বলে, এমন লোকই দরকার। দুষ্ট বাচ্চাদের ভয় দেখাতে স্কুলের হেড মাস্টারের বদলে রওশন আরার নাম নিতে শুরু করেছে বাবা মায়েরা এমন খুচরা গাল-গল্পও ফারজানার কানে এসেছে। কিন্তু, শনিবার সকাল দশটা পনেরো অথবা বিশ মিনিটের সময় রওশন আরা ফোন করে ফারজানাকে বলে,
'হাতে ভালো পাত্র আছে নাকি?'
ফারজানা ভেবেছিলো রওশন আরা তার পরিচিত কারো জন্য পাত্র খোঁজ করছে। কুসুমিয়ায় পাত্রের অভাব নেই। গ্রামের ঘরে ঘরে মিডল ইস্ট ফেরতা যুবক। ডিগ্রি পাস, ডিগ্রি ফেইল, ইন্টার-মেট্রিক পাস অথবা ফেইল, অথবা পড়ালেখা নাই – বংশ আছে, এরকম নানান ভেদের পাত্র ফারজানার হাতের নাগালে। সামনে ডিসেম্বর মাসে ঈদ উপলক্ষ্যে ছুটিতে গ্রামে গ্রামে বিদেশবাসী যুবক। এদের মোটামুটি সবাই বিবাহযোগ্য এবং বিবাহউন্মুখ। কসমেটিকসের পাশাপাশি সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত কিংবা দুবাই, বাহারাইন থেকে গহনাপাতি কিনে এনেছে হবু বৌয়ের জন্য। তাই কুসুমিয়া ডিগ্রি কলেজের বি.কম, বি.এ পড়ুয়া মেয়েদের বাবার পাশাপাশি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর অনেক মেয়ের মামা চাচারা ভীড় জমায় নাজ ম্যারেজ মিডিয়ায়। আগামী তিন মাসের তেরো শুক্রবারে কম করে হলেও বিশটা বিয়ে হবে ফারজানার ঘটকালীতে। এমন জমজমাট সময়ে থানার ওসি রওশন আরা ফোনে জিজ্ঞেস করে ফারজানার হাতে ভালো পাত্র আছে কিনা। কোন ধরনের পাত্র, বয়স কতো জানতে চাইলে রওশন আরা বলে, রওশন আরার বয়স তিরিশের কাছাকাছি তাই বত্রিশ কিংবা চৌত্রিশ অথবা আরেকটু বেশি বয়সী পাত্রই চলবে। ব্যবসায়ীতে আপত্তি নেই, গভমেন্ট অফিসার হলে সবচে' ভালো হয়। এমন বয়স্ক পাত্র পাত্রীর ক্ষেত্রে ফারজানা শুরুতেই জিজ্ঞেস করে দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা বৈধব্যে আপত্তি আছে কিনা। কিন্তু, রওশন আরাকে এ প্রশ্ন করার সাহস ফারজানা পেলো না। 'একটু খোঁজ খবর নিতে হবে' – বিনয়ের সাথে এ কথা জানালে ফোন রাখার আগে রওশন আরা বলে,
'খুব নামডাক শুনি আপনার, দেখি কেমন আপনার দক্ষতা, সময় কিন্তু একমাস।' নামডাকের প্রশংসায় খুশি হলেও শেষে 'সময় কিন্তু একমাস' শুনে ফারজানা ঘাবড়ে যায়। সাহস করে জিজ্ঞেস করে,
'একমাস কেনো?'
এবার রওশন আরা গলা গম্ভীর করে –
'একমাসের মধ্যে কিছু না পারলে আপনার সাথে আমার বোঝাপড়া আছে'।
একথা বলেই ওসি রওশন আরা ফোনের লাইন কেটে দেয়। আবার কল ব্যাক করার সাহস পায় না ফারজানা।

গত দু'বছরে ফারজানাকে এমন করে ধমক দিয়ে কথা বলার সাহস করেনি কেউ। বরং পাত্র-পাত্রী পক্ষের লোকজন বিনয় করে কথা বলেছে, সফল বিয়ের আসরে ঘটকের সম্মান পেয়েছে, নির্ধারিত ফি'র উপরি হিসেবে নানান রকম উপহার দিয়েছে কেউ কেউ। দত্তপাড়ার সালাম মাস্টার নাতির জন্মের সংবাদ আর মিষ্টি নিয়ে নাজ ম্যারেজ মিডিয়ায় এসেছিলো গত সপ্তায়। সালাম মাস্টারের মেজো ছেলের সাথে চৌধুরিহাটা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রফিকুল্লার মেয়ের বিয়ে ফারজানার ঘটকালীতেই হয়েছে। ফারজানা মাঝে মাঝে ভাবে, কতো দ্রুতই জীবনের সময় চলে যায়...। কিন্তু, সেই শনিবারে ওসি রওশন আরার ফোনের পর মনটা ভার হয়ে থাকে। বাইন্ডিং খাতায় পনেরোই নভেম্বর তারিখের নিচে সে লিখে পাত্রী – রওশন আরা, বয়স – তিরিশ, পেশা – পুলিশ, ঠিকানা – কুসুমিয়া থানা সদর, চাহিদা – সরকারী চাকুরীজীবি/ব্যবসায়ী, বয়স ৩০+। এর মাঝে পাত্রীর বিবরণের একঘর খালি থাকে। ফারজানা ভাবে, সেখানে লেখা যায় পাত্রী কালো, লম্বা, সুস্বাস্থ্য। কিন্তু, কী জানি ভেবে লিখে না। মনের ভেতর কেবল ফোনের ধমক সুরের কথাটা ঘুরপাক খায়। সময় মাত্র একমাস।

ফারজানা নাজনীন বুঝে – এমন পাত্রীর জন্য পাত্র পাওয়া সহজ কাজ নয়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, লম্বা-খাটো বিভিন্ন রকম পাত্র পাওয়া যায় সহজে, সাথে জাত-বংশ মিলানোও যায়। কিন্তু, এমন জাঁদরেল মেয়ে যাকে অনেকেই মহিলা ওসি বলে জানে, তার জন্য পাত্র পাওয়া বেশ কঠিন। এলাকায় বেড়ে উঠা, বিশেষ করে কুসুমিয়া কলেজে পড়া ও ছাত্র সংসদের মহিলা সম্পাদিকা হওয়ার কারণে ফারজানার জানাশোনার অভাব নেই। আশেপাশের কোন গ্রামে বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রী খবর তার মাথার ভেতর ভর্তি। মাঝে মাঝে মাসুদ চাচাও সংবাদ দেয়, 'ছাতিমপুরের নজু ভুইয়ার সেজো ছেলের পাত্রী দরকার'। অনেক ভেবে চিন্তেও ফারজানা কিছু মিলাতে পারে না। এলাকায় ত্রিশোর্ধ্ব সরকারী চাকরীজীবি বা ব্যবসায়ী এবং তা'ও অবিবাহিত এমন মিলের পাত্র চোখে পড়ে না। ফারজানা যখন এসব ভাবছে তখন মাসুদ চাচা অফিসে এসেছে, চা সিংগাড়া এনে টেবিলে রেখেছে। এবার ফারজানার খানিক রাগ জমে। থানার ওসি হয়েছে বলে এমন ধমক দেয়ার অধিকার রওশন আরা কোথায় পেলো? নাজ ম্যারেজ মিডিয়া তো আর সরকারী অফিস নয় যে পুলিশের হুকুম পালন করতে হবে। অন্য কেউ হলে ফারজানা মুখের উপর কড়া কথা বলতে পারতো। প্রয়োজনে হাত চালাচালিতেও তার দক্ষতা কম নেই, সেটা কুসুমিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীর পাশাপাশি এলাকার লোকজনও জানে। এখন যেমন উপজেলা মোড়ের টি-স্টলগুলি বা মাদ্রাসা মার্কেটের মেরিনা কুলিং কর্ণারে বসে লোকজন থানার ওসি রওশন আরাকে নিয়ে গল্পে গল্পে চায়ে চুমুক দেয়, তেমনি বছর পাঁচেক আগে এসব আলাপের কেন্দ্রে ছিলো ফারজানা নাজনীন। ছাত্রদল ছাত্রলীগকে টেক্কা দিয়ে সেবার ছাত্রফ্রন্টের পরিষদ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিতেছিলো। সবাই জানে, কী করে ফারজানা সবার নজর কেড়েছিলো নানান সময়ে। বার্ষিক পিকনিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফারজানাকে দেখা যেতো সামনের সারিতে। কলেজের গেটে দাঁড়ানো সেকেন্ড ইয়ারের সিটি বাজানো ছেলেগুলোকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে কলেজ ছাড়া করেছে ফারজানা। পাশে দাঁড়িয়েছে সাধারণ ছাত্রছাত্রী, নীরব সম্মতি দিয়েছে শিক্ষকেরা। নিয়ম ভাঙ্গা সেই ফারজানা নাজনীন সকালে হিসাববিজ্ঞান, দুপুরে ব্যবস্থাপনা ক্লাস শেষে কমন রুমে আড্ডা দিতো, তারপর আশেপাশে যাকে পাওয়া যেতো তাকে নিয়ে সামনের কলেজ ক্যান্টিনে ডালপুরি খেতো, লিপস্টিক না মাখা ঠোট চুবাতো চায়ের কাপে। ফারজানা কখনো লিপস্টিক মাখেনি এটি প্রথম খেয়াল করেছিল রাজন। হয়তো আরো অনেকেই খেয়াল করেছিলো কিন্তু বলেনি। সাহস করে রাজনই প্রথম ফারজানাকে জিজ্ঞেস করেছিলো,
'তুমি কখনো লিপস্টিক দাও না কেনো?'

(চলবে?)

.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP