29 October, 2008

চক্কর

একটা চক্করে আঁটকে যাচ্ছি ক্রমাগতঃ। নিজের তৈরি চক্কর। প্রতিদিন ভাবি, রাত এগারোটায় ঘুমিয়ে যাবো, হয় না একবারও। এটা সেটা করতে করতে তিনটা চারটা। তারপর ভাবি, ক'ঘন্টা ঘুমানো যাবে সকাল অবধি। মোবাইল ফোন নেই, তাই অনেক দিনের অভ্যাস মোবাইল ফোনে এলার্ম দেয়া, এনি বাটন জ্বালিয়ে সময় দেখা নেই। কেমাওয়ানের দেয়া ছোট্ট লাল ঘড়িতে এলার্ম সেট করে ফেলে রাখি রুমের কোণায়, মনে হয় চোখ বুঁজলাম আর সাথে সাথে সকাল হলো। সকাল সাতটা দশ। সূর্যোদয় সকাল সাতটা উনপঞ্চাশ। কমফোর্টার সরিয়ে ঘড়ি হাতে নিই, মনে হয় পুরা শরীর কাঁপছে। বাইরে অন্ধকার। ঝিম মেরে বসে থাকি। সারাদিনে কী কী করতে হবে লিস্টি করি। এই ঘুম নিয়ে কীভাবে ক্লাসে যাবো, কাজ করবো, চিন্তা করি - সন্ধ্যার ক্লাস না করলে কী হয়! শেষমেষ যা হয় - গোসল ক্বাজা করতে হয়। চুলে ভেজা হাত বুলিয়ে ইতংবিতং শীতের জামা গায়ে চাপিয়ে বের হই।

হীম সকাল।
মনে হয় নাক-কান ফেটে যাবে। কনরয়তে বাস চলে গেলো মাত্র। তারপর দাঁড়িয়ে থাকি উলটোপথে মুখ করে। চোখ বুঁজলে মনে পড়ে গোসল করবো বলে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছি পুকুরের ঘাটে। অনেক পরে বাস আসে, ট্রেনে উঠি। নিত্য দেরী হয়। দুপুর পর্যন্ত ঘুমে থাকি, ঘুমে হাঁটি, ঘুমে ভাবি। কয়েক দফা কফির পরে মনে হয়, না থাকি। সন্ধ্যার ক্লাস করি। ক্লাসের শুরুতে আবার ঘুম পায়। "ঘুম ঘুম ক্লাস রুম, পাশে খোলা জানালা, ডাকছে আমাকে তোমার আকাশ"। ফাইন্যান্সের প্রফেসর এলান গস মজার লোক। সুযোগ পেলেই বৌয়ের গল্প নিয়ে আসে। বলে, "গতকাল বিকেলে শেয়ার বাজারে তোলপাড় ছিলো বলে, তোমরা ব্ল্যাকবোর্ড ডিসকাশনে নানান প্রশ্ন করেছো বলে, আমি কম্পিউটারে চোখ রেখে বসেছিলাম, নইলে বৌয়ের সাথে লনের ঘাস কাটতে হতো।" তারপর পড়াতে পড়াতে অন্য কী যেনো ভাবে, বলে - "আচ্ছা সোমবারে কী হবে? আসো বাজী ধরি।"
তখন আমার ঘুম পায়।

এখন যেমন পাচ্ছে।
বা'হাতি এলান বোর্ডে অংক করে চলেছে।
আমি ভাবছি বাসায় গিয়ে শাওয়ার নেবো, চুলে খুশকি হয়েছে, শ্যাম্পু করতে হবে, রুম গুছাই না তিন সপ্তাহ। টেবিলে কলম রাখার জায়গা নেই। খাটের অর্ধেক জুড়ে বই পত্র। কার্পেটে পত্রিকা। গুছাতে হবে।
তারও আগে আজ রাতে আরও দুটা এসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে।
ধন্যবাদ কফি আবিষ্কর্তা, আমি জেগে থাকি কফি খেয়ে।
আগামী সকাল পর্যন্ত। আবার পৌণপুনিকতা।

এ চক্করে আমি কীভাবে আঁটকে গেলাম!

.
.
.

Read more...

24 October, 2008

বৈয়াম-বন্দী সময়


অনেকদিন লেখালেখি হচ্ছে না। না গল্প, না ডায়েরী। অলস মানুষের মতো গান শুনছি সকাল রাত। একেবারে পৌণপুঁনিক সময়ে আঁটকে গেছি।

০২.
ব্যাপারটা প্রতিদিন ঘটে, সকালে এলার্ম দেয় ঘড়ি। আলগোছে বন্ধ করি। বাইরে অন্ধকার, ভাবি - আরেকটু বেলা হোক। শেষে বাস ট্রেন মিস করে ক্লাসে লেট।

০৩.
কানাডা আসলাম আজ পঞ্চাশ দিন হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে কতো দ্রুত যাচ্ছে দিন। নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছি না। ডায়েরী ভর্তি এসাইমেন্টের লিস্ট। মাথার ভেতর গিজগিজ। নেই বুক পকেটে জোনাকী পোকা।

০৪.
পরশু প্রথম তুষার পড়লো। চিনির মতো মিহিদানা। মন্দ না।

০৫.
মংগলবারে আলবিয়ন এভিনিউ থেকে বাসে উঠলো একটা ছেলে, চেহারা চেনা চেনা। আমাকেও চিনে নিলো। কায়সার; ৮ বছর পরে দেখা। শেষে বললো, 'দেখো উইন্টার আসলে কেমন লাগে...'

০৬.
এম পি থ্রি প্লেয়ার নষ্ট। কানের ভেতর গুঁজে দেয়ার কিছু নেই। বালাম-অনিলা-সুমন-তপু-সিমিন'দের গান শুনি ইদানিং। বই পড়ার সময় পাচ্ছি না।

০৭.
অবশেষে ফেইসবুকেও এডিক্টেড হলাম।

০৮.
বৃহষ্পতিবারে ক্লান্তি জড়িয়ে আসে। শনি-রবিবার যথেষ্ঠ না। ডিসেম্বর আর কতো দূরে?

০৯.
এশিয়ার দূরে যাওয়ার কারণে প্রিয় কিছু মানুষকে এখন অনলাইনে পাই না।
সময়ে দূরত্বে এইভাবে মানুষ আড়াল হয়?

১০.
...
কেটে গেছে কালিদাসের কাল।

.
.
.

Read more...

20 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র শেষ পর্ব)

আমি তখন বুঝে যাই সুদর্শন অমিত আহমেদের সাথে বাজারে উঠলে আমার ভাত নাই। কারণ, ঐ কিশোরী অপলক তাকিয়ে থাকে অমিতের দিকে। আর আমি তাকিয়ে থাকি কিশোরীর দিকে। 'এক পলকে চলে গেলো আহ কী যে তার মুখখানা'।
অমিত আমাকে বলে, 'বুঝছো, রাস্তাঘাটে নানান হাতছানি প্রলোভন আছে। এসবই পরীক্ষা। নিজেকে ঠিক রাখবা। দেখবা, সমস্যা হবে না।'
আমার তখন জরুরী কথা মনে পড়ে যায়। ডাউনটাউনের দিকে থাকবো জেনে দেশের এক সাবেক কানাডাবাসী বড়োভাই বলেছিলো জিরান স্ট্রীট নাকি জেরান্ড স্ট্রীটে যেতে। সেখানে নাকি দেশীয় উপমহাদেশীয় আপুনিরা কামিজ-লেহেঙ্গায় বৈকালিক ভ্রমণে বের হয়। টুকটাক টাংকিও নাকি মারা যায়। ইচ্ছে ছিলো, বন্ধু অমিতকে নিয়ে ওদিকে যাবো। এ স্থবির শহরে অন্য রকম বিকেল খুঁজে নিবো। কিন্তু, গত ৩/৪ ঘন্টার তব্ধায় এই প্রসংগ তুলতে সাহসই পেলাম না।

তারপর আমরা টিম হর্টনস কফি শপে বসি।
আগে যখন অমিতের সাথে দেখা হয়েছিলো চা-কফির সাথে সিগারেট না হলে অমিতের চলতোই না। এবার দেখি অমিত সিগারেট খাচ্ছে না। ছেড়ে দিয়েছে। এ কথা শুনে আমি এবার নিশ্চিতভাবে রঙীন পানি খাবার ইচ্ছাটা কবর দিয়ে দিই। তবে মিস করি দূর্দান্ত এক দৃশ্য, এটা কেবল অমিতকেই করতে দেখেছিলাম আগে; সিগারেট শেষ করে আঙুলের টোকায় শেষ টুকরা ছুড়ে মারা, আর টুকরাটা ডিগবাজি দেয় তিনবার। আমি আমার দেখা চরম এক স্মার্ট স্মোকারএর এ দৃশ্য আর দেখবো না ;
তখন অমিত আমাকে বলে, অপচয় জীবনের জন্য কতো ক্ষতিকর। মাদক-তামুক আরো বেশি খারাপ।
আমি চুপ থাকি।

কফি হাতে ছবি তোলার ইচ্ছে হলো। বিরিয়ানী খাওয়ার সময় দুজন একসাথে ছবি তুলতে পারিনি। এবার ভাবি, দুজনে এক সাথে ছবি তুলি।
কিন্তু কাকে রিকোয়েস্ট করা যায়?
আমাদের ডানে এক সত্তোরোর্ধ সিনিয়র, কাঁপা কাঁপা হাতে কফি খাচ্ছে।
অমিতের পেছনের টেবিলে দুই উদ্ভিন্না তরুণী, সম্ভবতঃ ব্লগার সংসারে সন্ন্যাসী'জির পাড়াতো ভাগ্নী।
আমি জিজ্ঞেস করি, ঐ পেছনের মেয়েটাকে বলি?
অমিত চোখ রাঙায়। বলে, 'পাশের সিনিয়র মাইন্ড করতে পারে।'
কী আর করা 'বুড়ো'কেই দিলাম ক্যামেরা। কাঁপা কাঁপা হাতে ছবি তুললো । ঝাপসা ছবি।

- ছবি তোলার পরে আমাদের কথা আর আগায় না। রাত বেড়েছে। সাবওয়ের শেষ ট্রেন চলে যাবে। ঠিক হয় একদিন অমিতের ওখানে যাবো। আরও কিছু ব্রাদার-সিস্টারের সাথে অমিত পরিচয় করিয়ে দিবে। আমার ভালো বন্ধুর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হবে। অমিত ঠান্ডা বাতাসে স্টেশনের দিকে হেঁটে যায়।

আমি বাসায় ফিরি। ততক্ষণে আমার মাথাটায় ড্রিল মেশিন ঘুরছে। কোথাও কী যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ অনুভূতি ঘিরে থাকে পরের আধ ঘন্টা। টের পাই, আমার অনেক চিন্তা পালটে যাচ্ছে। কোনো এক অবোধ্য শক্তি আমার উপরে ভর করেছে, আর বলছে - 'ভালো হয়ে যা, হে মানুষ। ঠিক হয়ে যা। দুইন্যা দুই দিনের।'
অমিতের এ পরিবর্তন কি আমার উপরও ভর করছে। নেজাম ডাকাত কিভাবে আউলিয়া হয়ে যায় সেটা নিজের মাঝে টের পাই। তাই সিদ্ধান্ত নিই, আমিও ভালো হয়ে যাবো। একেবারে পুরা ভালো মানুষ। কিন্তু আমার কে আমাকে গাইডলাইন দিবে? কে হবে আমার আলোর দিশারী? কোথায় পাবো তারে?

প্রথমেই কম্প্যুটার অন করি।
এফ ড্রাইভে হিডেন ফোল্ডারে উলটাপালটা কিছু জিনিশপাতি ছিলো। ওগুলো কন্ট্রোল প্লাস এ, শিফট প্লাস ডিলিট মারি। আর ঠিক করি কীভাবে মনকে শুদ্ধ করা যায়, চিন্তা শুদ্ধ করা যায়!
পরের সিদ্ধান্তটি হয় - আর ডেবু বাবুর সাইটে যাবো না, ওগুলো খারাপ। মনের শুদ্ধতা নষ্ট করে। ওকে, ঐটাও ডিটারমাইন্ড হলাম। আর ? আর কী? অস্থির লাগে খুব। মনে হয় জীবনের সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত।
৩ নম্বর সিদ্ধান্ত ছিলো, ১৮০ মিনিটের ক্লাসে টায়ার্ড লাগলে প্রায়ই সামনের সারিতে বসা চঞ্চলমতি টিংটিঙ্গা স্বল্প বসনা যে মেয়েটির এখানে ওখানে তাকাতাম, সেরকম আর তাকাবো না। অমিত বলেছে - নানান হাতছানি প্রলোভন, এ সবই পরীক্ষা...'।

রাতে কখন ঘুমিয়ে যাই জানি না।
তবে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হয় - আজ থেকে আমি অন্য মানুষ।
নিজেকে পরিশুদ্ধ মনে হয়।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। অটাম এসে গেলো। গাছের সব পাতা হলুদ থেকে লাল হয়ে যাচ্ছে।
অদ্ভুত সুন্দর লাগে এ পৃথিবী।
অসীম আর সসীমের মাঝে আমার নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। বড়ো তুচ্ছ।
অভ্যাসমতো কম্প্যুটারে মেইল চেক করতে গিয়ে দেখি ইনবক্সে অমিতের মেইল।

শিমুল,
গতকাল আমার আচরণে তুমি অবাক হয়েছো নিশ্চয়ই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কষ্ট পেয়ে থাকলে, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তুমি তো জানোই, আমি গল্প/উপন্যাস যা-ই লিখি অনেক ভেবে চিন্তে লিখি। গল্পের চরিত্র-চারপাশ বোঝার চেষ্টা করি। দরকারী তথ্যগুলো চেক করে নিই নানান সুত্রে। গত দু'মাস ধরে একটা গল্প নিয়ে আঁটকে গেছি। রাইটার্স ব্লক। কোনো ভাবেই আগাতে পারছি , শেষ করতে পারছি না। যেখানে আঁটকে গেছি তা হলো - একজন মানুষ তার কাছের বন্ধুটিকে একেবারে বদলে যেতে দেখলে কেমন রিয়্যাক্ট করে। আমার গল্পের চরিত্র বাংলাদেশের মানুষ। এই বিদেশ-বিভুইয়ে সেরকম মানুষ অবজারভ করার সুযোগ কই? আমার গল্পের এই চরিত্রটির সাথে তোমার খানিক মিল আছে। তাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম, তোমার সাথে টরন্টোতে প্রথম সাক্ষাতেই এই এক্সপেরিমেন্টটা করে নিবো। যথেষ্ট প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। ঐ ৩টা উপন্যাস জোগাড় করেছি অনেক কষ্টে। ঐ অভিনয়ের মহড়া নিজের সাথে নিজের অনেকবার দিয়েছি। তাই, তুমি গতকাল যেই আমাকে দেখেছো, আমি মোটেও সেরকম নই। এক বিন্দুও পাল্টাইনি। তবে নিজেকে পাল্টানোর ভাব করে গতকাল তোমার প্রতিক্রিয়াগুলো আমি মনে মনে টুকে নিয়েছি প্রতি মুহুর্তে। বিশ্বাস করবা না, গল্পের কোনো উপাদান বাকী ছিলো না। সব পেয়ে গেছি এখন। আজকালের মধ্যেই গল্পটা শেষ করে ফেলবো। আমার ধারণা, এই গল্পটা হবে আমার লেখা সেরা একটা গল্প। লেখা শেষ হলে, ১ম পাঠক হিসেবে গল্পটা তুমিই পড়বে। থ্যাংক্স এ লট, ব্রো! শেষে আবার ক্ষমা চেয়ে নিই, যদি একটুখানিও কষ্ট পেয়ে থাকো আমার আচরণে...। আরেকটা কথা, আগামী ১৯ তারিখ রোববারে মিলা-হায়দার হোসেন-নকুল কুমার আসবে একটা প্রোগ্রামে। যাবা? অন্ততঃ মিলার জন্য যাই, চলো। কী বলো?
- অমিত।


মেইল পড়ে আমি আবার তব্ধা খাই।
এবার কী করবো, কী ভাববো বুঝতে পারি না।
চিন্তাশক্তি একদম কাজ করে না।

তখন সাথে সাথে দেখি জি-টকে অমিত আহমেদ।
জিজ্ঞেস করি, 'গল্প লেখা শেষ হইছে?'
অমিত বলে, 'সিগারেটটা শেষ করে নিই। বি আর বি।'

-
(সমাপ্ত)

.
.
.

Read more...

19 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র ২য় পর্ব)


সন্ধ্যায় বিরিয়ানী খাবো ভেবে ভেবে দুপুরে খাইনি কিছু।
পেটে খিদায় চোঁ চোঁ। কিন্তু অমিতের কাছে রোজার কথা শুনে খাবারের নাম মুখে নিতে সাহস পেলাম না।
'বুঝলা শিমুল, রোজার মাস সিস্টেমটা এক্সিলেন্ট একটা জিনিস। শরীর মন অর্থ সব কিছুর জন্যই ভালো।'
আমি হু হু করি। আর ঘড়ি দেখি, বলি - 'আজ ইফতার কয়টায়? সাতটা পনেরো?'
অমিত বলে, 'সাতটা সতেরো।'
এরপর সে বিড়বিড় করে কী যেনো পড়ে। মনে হয় তজবী জপছে। আমার ধারণাই ঠিক হলো, অমিতের ডান হাতে ডিজিটাল কাউন্টার। আধুনিক তজবী। আমাকে দেখিয়ে বলে, 'খুবই দরকারী জিনিস, কমফোর্ট্যাবল।'

ভিক্টোরিয়া পার্কের সবুজ ঘাসে আমরা কোনাকুনি হেঁটে যাই। অমিতই পথ দেখায়।
আমি ভাবছি আরও ঘন্টা খানেক সময় বাকী আছে। খিদা সামলাই কীভাবে?
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছো?'
বললাম, 'না, তেমন না। এই ধরো, দশ পনেরো মিনিট।'
'আসরের নামাজ পড়েই তো বের হইছো মনে হয়, নাকি?'
'হুমম, ওরকম সময়েই।'
'আমিও নামাজ পড়ে রওনা দিছি।'
তারপর আমরা সামনে আগাই। ডানে ডেন্টোনিয়া পার্ক পার হই। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'সামনে নাকি সুন্দর একটা মসজিদ হচ্ছে?'
আমি জানাই, আমিও শুনেছি, বাংলা কাগজ/দেশের আলো পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু দেখিনি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'শুক্রবারে জুম্মার নামাজ কোথায় পড়ো?'
বলি, ঐ সময় তো আমি ক্যাম্পাসে থাকি।
এরপর ক্যাম্পাসের প্রেয়ার রুম নিয়ে কথা হয়। মুসলিম স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনে জয়েন করেছি কিনা অমিত সেটা জিজ্ঞেস করে। আর বলে, বিদেশ মানেই অন্য রকম। এখানে এসে মানুষ পালটে যায়। বিশেষ করে সাদা চামড়ার পোলা মাইয়্যাদের সংগ খুবই খারাপ। এরা আমার মতো সহজ সরল ছেলেকে একেবারে বিগড়ে দিতে পারে।
এরকম নানান সতর্কবাণী দিয়ে অমিত আমাকে সাহস দেয়, বলে - 'তেমন ভয়ের কিছু নাই। সময়ে সব বুঝে যাবা। খালি উপরওয়ালার উপর আস্থা রাখবা। মনে রাখবা তুমি কোত্থেকে আসছো। তোমার শেঁকড় কোথায়। এইসব একেবারে ভুলবা না।'

এইবার অমিত আমার বাসা নিয়ে জানতে চায়। বাড়ীর মালিক ঈমানদার মানুষ, আমাকে ভালো ইফতার দেয় শুনে অমিত বলে, 'তুমি আসলে খুব লাকী, বিদেশে এরকম পাওয়াই যায় না।'

ইফতারের প্রসঙ্গে আমার খিদা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে।
অমিতের এইসব কথাবার্তা ভালো লাগে না আমার।
এতোদিন পরে দুই বন্ধুর দেখা। কোথায় ব্লগ নিয়ে কথা বলবো, গল্প লেখা নিয়ে কথা বলবো, টুকটাক নিষিদ্ধ আলাপে মাতোয়ারা হবো। এবং আমার অনেকদিনের ইচ্ছা, অমিতের মতো যোগ্য বন্ধু পেলে হাল্কা শরাবী হবো। এসব চিন্তা মুহুর্তেই মাটি চাপা পড়ে গেলো।

ডেন্টোনিয়া পার্কের বেঞ্চিতে বসে আমাদের গল্প হয়। আমার পেটের মধ্যে ডজন খানেক ইঁদুর লাফালাফি করছে। যদি জানতাম অমিত রোজা রাখবে তাহলে আমিও রোজা রাখতাম। পেটের আগুনে সান্ত্বনা পেতাম খানিক। কী আর করা!

এখানে এসে বেশ কাঠবেড়ালী দেখি, গাছ থেকে নিচে নেমে কাছে চলে আসে। সাদা একটা কাঠবেড়ালী কাছে এসে ঘুরঘুর করলে আমি অমিতকে জিজ্ঞেস করি, 'অমিত এইটা কাঠবেড়াল, নাকি বিড়ালী?'
অমিত বুড়া আঙুলে তজবী কী টেপা বন্ধ করে। উলটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি সাদা মেয়েদের সাথে ফ্রেন্ডশীপ করতেছো?'
আমি তো অবাক! কোথায় কাঠবেড়াল, আর কোথায় সাদা মেয়ে...
বললাম, 'না তো, কেনো?'
অমিত বলে, 'ব্লগে এরকম কী যেনো লিখলা। বদ্দাও উস্কানি দিলো।'
আমি মাথা নাড়ি, 'না না, ওরকম কিছু না।'
'তবুও খেয়াল রাইখো, শাদা মাইয়্যাগুলা কথা বলার সময় গায়ে হাত দেয়, পিঠে চাপড় দেয়। এগুলা সবই উস্কানি।'
আমি গম্ভীর হয়ে বলি, 'আরে ধুর, আমি ম্যাচিওর্ড না?'

তখন রিমাইন্ডার বেজে উঠে অমিতের পিডিএ থেকে।
অমিত বলে, 'চলো উঠি। আজানের ৩ মিনিট আছে'।
সামনে হাঁটি।
'শিমুল, জিন্সের প্যান্ট কি দেশ থেকে কিনছো?'
বলি, 'হ্যা, নিউ মার্কেট থেকে।'
'ফিটিং করা লাগছে না?'
'হু, তা তো লাগেই। একেবারে পুরা তো ফিট হয় না'।
'তা যখন করলাই, নিচটা এতো লম্বা রাখলা কেনো?'
'মানে?' আমি অবাক হই, কারণ - এর থেকে ছোট করলে তো খুবই বাজে দেখাবে?
অমিত বলে, 'এখন ধরো তুমি নামাজ পড়বা, প্যান্ট নিচে গুটাতে হবে। ঝামেলা না?'
আমি দেখি, অমিতের প্যান্ট পায়ের গোড়ালির উপরে। প্রথম দেখায় ফ্যাশন কিংবা কেয়ারলেস ভাবলেও এখন বুঝি, কেনো অমিত পায়ের গোড়ালির উপরে উঠানো প্যান্ট পরে...'।
দুম করে তখন আমার মাথায় ক্লিক করলো, অমিত কেনো দিনে দেখা করতে চায়নি, কেনো ইফতারের পরে আড্ডা দিতে চেয়েছে...।'

এই অমিত কেনো এরকম হলো, কী জাদুমন্ত্রে অমিত পালটে গেলো; এ ভাবনা আমার মাথায় কাজ করে না। স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। সেবার বই মেলায় আলবাব ভাইয়ের কাছ থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে আড়ালে ফিশফিশ করে অমিত বলেছিল, 'যাবা নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে?'
কোথায় এবং কখন জিজ্ঞেস করলে অমিত বলেছিল এ-লেভেলসের তামান্না-মৌটুসী আরও কে কে থাকবে। চিটাগাং যাওয়ার কারণে সেই পার্ট মিস করেছি। ধারণা ছিলো, টরন্টোতেও এরকম কিছু ইয়ো ইয়ো পার্টির দাওয়াত পাবো। মজমা হবে। কিন্তু এ কী! অমিত আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

'ওজু করবা? নাকি করা আছে?' বায়তুল আমান মসজিদের সামনে এসে অমিত জিজ্ঞেস করে।
অমিতের এ প্রশ্নে আমি ইতিউতি করি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'নামাজ পড়বা না?'
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। বলি, 'আসলে গোসল করি নাই, শরীর একটু নাপাক আছে...'।
অমিত যেনো আকাশ থেকে পড়লো, 'ছিঃ শিমুল, ছিঃ। আসছো শুক্কুরে শুক্কুরে ১৫ দিন হয় নাই, এর মধ্যেই...?'
আমি অমিতের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করি, বলি অমিত যে রকম ভাবছে সেরকম কিছু নয়, সকালে উঠলেই ঠান্ডা লাগে, গোসল করতে ইচ্ছা করে না। গত চারদিন গোসল করি নাই, সাথে আরো কিছু অস্পষ্ট শব্দ এবং চোখের ইশারা যোগ করি, যাতে অমিত বুঝে যায় আমার এ শারীরিক অপবিত্রতায় গন্ধম ইফেক্ট নেই। আমি অমিতকে বুঝাই, স্বর্গের উদ্যানে এখনো নিপাট ব্রহ্মচারী হয়ে আছি।
অমিত হেসে বলে, 'আগে বলবা না? আমারে তো টেনশনে ফালায়ে দিছিলা মিঞা, আমার ভালো একটা বন্ধু কুপথে চলে যাবে ভেবে...।'
ভাবলাম, নামাজ পড়া থেকে মুক্তি বোধ হয় পেলাম।
কিন্তু, অমিত হাল ছাড়ে না। গোসল না করে কীভাবে বিশেষ ওজু করা যায়, শার্টের বাম দিকের কোণা ডান হাতে টেনে এনে আধ বিঘত পরিমাণ জায়গা পানিতে ভিজিয়ে কোন দোয়া পড়লে গোসলের মতো পবিত্রতা চলে আসবে সে তরিকা এবং ফজিলত অমিত আমাকে শেখায়। আমি অমিতকে অনুসরণ করি। মাথার ভেতর ঘুরঘুর করে - এ কোন নতুন অমিত?
হিন্দি সিনেমার জমজ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে।
ভাবি, একেবারে এক্সক্লুসিভ কথা জিজ্ঞেস করি, যাতে নকল অমিত হলে ধরে ফেলি...। কিন্তু, জিজ্ঞেস করা হয় না। আজান ভেসে আসে, আমি রোজা না রেখেও ইফতারে শামিল হই। হাঁটু গেঁড়ে কোন বিশেষ ভঙ্গিতে খানাহ-পিনাহ করতে হয়, কীভাবে ডান হাতে গ্লাস নিয়ে বাম হাতে নিচ থেকে ঠেস দিতে হয়। এসব জীবন চর্চায় অমিত আমাকে দীক্ষা দেয়। কেবলই ভাবি, হায় - বিরিয়ানী সন্ধ্যা কোথায় গেলো?

অমিত বিরিয়ানীর কথা ভোলেনি।
ড্যানফোর্থের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি বাঙালি পাড়া দেখি।
বাংলা দোকান , সাইন বোর্ড। মারহাবা স্টোর, সরকার ফুডস, প্রিয়তা স্টোর, ঢাকা কনভেনিয়েন্স, ঢাকা কাবাব কিংবা সোনালী ব্যাংক; দেশের টাকা পাঠান সহজে।
অমিত আমাকে দেখায় কোথায় কী আছে।
'ঘরোয়া বিরিয়ানী' পার হয়ে গেলে আমি আঙুল তুলি, 'এখানে খাবার ভালো না?'
অমিত ঠিক ভালো মন্দ বলে না। বলে, গেছিলাম একবার। তবে সামনে চলো, সামনে আরেকটা ভালো আছে।
চোখে পড়ে এটিএন মিউজিক। আমি জিজ্ঞেস করি, 'তুমি ইভা রহমানের গান শুনছো?'
(আমি আবার ইভা রহমানের ফ্যান, এটা অমিতকে বলেছি কিনা জানি না)।
অমিত জবাব না দিয়ে এটিএন মিউজিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ডানে ইভা রহমানের বিশাল পোস্টার, ভেবেছিলাম সেদিকে যাচ্ছে। কিন্তু না, বামে জাকির নায়েকের বক্তিমার সিডির পোস্টারের সামনে অমিত মনোযোগী পাঠক। আমি আড়চোখে ইভা রহমানের গোলাপী শাড়ী দেখি। একটু মুটিয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
অমিত মাথা নাড়ে, 'নাহ, এইটা তো আছে আমার কাছে।'
আমি ভাবি, অমিত কি জাকির নায়েকের ফ্যান হয়ে গেলো?

এভাবে রাস্তা সিগনাল পার হয়ে অমিত আমাকে নিয়ে যায় 'মক্কা বিরিয়ানী হাউজ'এর সামনে। জিজ্ঞেস করি, 'এটা কি ঘরোয়া বিরিয়ানীর চেয়ে ভালো?'
অমিত বলে, 'অলমোস্ট সেম, তবে ব্র্যান্ড নেম বলে একটা ব্যাপার তো আছে। তুমি মার্কেটিং্যের ছাত্র না?'
আমি এইবার বিরিয়ানির কাস্টোমার নিয়ে ভাবি, ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভাবি।
এসবের কী জবাব পাওয়া যায়?

অমিত মুরগীর বদলে ছাগলের বিরিয়ানি অর্ডার দিলো।
ইচ্ছে ছিলো, মুরগী খেলে কী সমস্যা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু, মুরগী থেকে চিকেন এবং চিকেন থেকে চিক'এ আলোচনা পৌঁছে গেলে অমিত আমাকে আবার হেদায়েত করবে, এই ভয়ে কথা বলি না। খাসির টুকরায় কামড় দিয়ে অমিত জিজ্ঞেস করে, শিমুল জিওম্যাট্রি কেমন বুঝতা?
বললাম, ভালো লাগতো না। আমি তো কমার্সে ছিলাম।
'বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য বুঝো?' এই প্রশ্নের জবাবে বলি জিওগ্রাফীতেও আমি ভালো না।
অমিত কেনো এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে তা আমার মাথায় ঢুকে না।
-

প্রিয় সচল বন্ধুরা, আপনারা ভাবছেন - আমি এসব গল্প করছি, সত্যি নাকি চাপাবাজী?
কী করে বুঝাই আপনাদের?
যেবার জার্মানী গিয়ে ধুসরের সাথে শালী-বাণিজ্য করে আসলাম, সেবারও আপনারা অনেকে আমাকে বিশ্বাস করেননি। কেউ কেউ বলেছেন, ফটো না দিলে বিশ্বাস নাই। একবারও তারা ভাবেননি, মানিব্যাগ হারিয়ে আমি কোন বিপদে পড়েছিলাম।
আর ছবি দিলেই কী হয়? অবিশ্বাসীরা কী আর লাইনে আসবে?
অমিত যখন, এই কিছুদিন আগে, ব্যাংকক ট্যুরের ছবি দিলো তখন অনেকেই বলে দিলো - এগুলো ফটোশপে করা। হায়, কী আর বলি! অবশ্য অমিত যে ফটোশপের কাজ ভালো পারে সেটা নিজেই স্বীকার করলো খাওয়ার টেবিলে। আমি ফটোশপের কিচ্ছু পারি না, ঐ বিরিয়ানীর ছাগ-হাড্ডির কসম লাগে, এইটা বিশ্বাস করেন সকলে...।

আমাকে এইবার চাপাবাজ যাতে বলতে না পারেন, সেইজন্য পোস্টে ফটো দিলামই দিলাম।

খাবার টেবিলে মনে হলো, ছবি তোলা দরকার।
দেশ থেকে অমিতের জন্য আনা 'পূর্ণমুঠি' দিলাম।
অমিত খুশি হলো।
এখন এইসব ঘটনা বিশ্বাস করাতে হলে বিরিয়ানী-বোরহানী-পূর্ণমুঠি-এবং আমি এক ফ্রেমে আসতে হবে।
অমিত এদিক ওদিক ট্রাই করে, ফ্রেমে আঁটে না।
আমি হাসিমুখে পোজ দিয়ে বসে আছি।

-
শেষে অমিত বিরক্ত হয়, ধুর মিয়া, মোটার মোটা হইসো - ফ্রেমেই তো আসো না।
মোটা গালি শুনে মন খারাপ লাগলেও মুখে হাসি ধরে রাখি।
শেষে অমিত ছবি তুললো দুটা। আমাকে দেখালো। এক ছবিতে বিরিয়ানী-বোরহানী-সালাদ-পূর্ণমুঠি আছে। আমার একাংশ আসছে, মাথা নেই। অন্য ছবিতে কেবল আমার মাথা। বললাম, হায়! এরকম কেনো?
অমিত বলে, দেখি মাথাটা ফটোশপে কিছু করতে পারি কিনা।

তবে, অমিতের ছবি তুলতে আমার কষ্ট হয় না।
একে ফটোজেনিক লুক, তার উপর শুকিয়ে গেছে, এটা আগেই বলেছি। ক্যামেরা ফ্রেমে চমৎকার মানিয়ে যায়। আমি চেয়ারে বসেই ছবি তুলি। ডানবাম করতে গিয়ে গ্লাসের পানি পড়লো ক্যামেরার লেন্সে। এরপরে ছবির এই অবস্থা।

-
এই ছবির মানুষটি অমিত আহমেদ না, তার হাতের বইটি এডিট করা হয়েছে, এমন কুৎসাও রটাবেন মন্দজনেরা। সেই তর্ক দূরে রাখি। বলি, অমিতের সাথে তারপর কী কথা হলো...

এর মাঝে অমিতের মোবাইলে ফোন এলো। এস এম মাহবুব মুর্শেদ ভাই। খাবার সময় বেশি কথা বলতে হয় না, তাই সামান্য মাসলা মাসালা বলে ফোন আমার কাছে দিলো। আমি মুর্শেদ ভাইয়ের সাথে কথা বলি, 'অমিতের সাথে ইফতার করতেছি, বস!'

দুষ্টলোকদের কথা বলছিলাম উপরে। অমিত অভিযোগ করলো, ব্লগে আমার বেশিরভাগ বন্ধুই নাকি দুষ্টু। আমি নাকি জাপান-জার্মানের কতিপয় বাঁদর-ব্লগারের সাথে বেশি বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখাই। এমনকি শালী বিষয়ক কমেন্ট করে নিজের ইমেজ খারাপ করছি। অমিত খবর পেয়েছে, অনেক শালীসমৃদ্ধ ব্লগার আমার লেখায় কমেন্ট করে না। আমার মতিগতি দেখে তারা নাকি শালী হারানোর শংকায় আক্রান্ত। কমেন্ট নসিহতের পাশাপাশি অমিত এবার আমার লেখা নিয়ে আলাপ করে। আমি বোরহানীতে চুমুক দিয়ে মনোযোগ দিই, ভাবি - এমনটাই তো চেয়েছিলাম। বন্ধু মানুষ, একে অন্যের লেখা নিয়ে আলাপ করবো।

কিন্তু, অমিত দেখি আমার লেখা নিয়ে খুবই বিরক্ত। গল্পের নামে আমি যা লেখার চেষ্টা করি এগুলো সবই মূল্যহীন। এগুলোর মাঝে সমাজ নেই, নীতি নেই, আদর্শ নেই। জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কী রকম?
অমিত বলে, আমার লেখায় শিক্ষণীয় কিছু নেই। মনে দাগ কেটে প্রভাব ফেলার কিছু নেই।
জিজ্ঞেস করলাম, অমিত নিজেই বা সেরকম কয়টা লেখা লিখেছে, তাহলে আমারও ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হয়। সে স্বীকার করে, তারও সেরকম কোনো লেখা নেই। তবে এখন পড়ালেখা করছে। এই কথা বলেই ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করলো সে। ইন্টারন্যাশনাল কুরিয়ারের সীল। ৩টা বইঃ
হামিদুর রহমানের উপন্যাস 'ফুটন্ত গোলাপ'।
কাশেম বিন আবু বকরের 'বোরকা পরা সেই মেয়েটি' আর 'বিলম্বিত বাসর'।

অমিতের মতো দূরন্ত লেখকের হাতে এই বই দেখে আমি আবার তব্ধা খাইলাম। জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি য়ে-ই সব বই পড়ো?'
অমিত দেখি উলটা খ্যাপা, 'নাক সিটকালা কেনো?'
বললাম, 'এই সব ছাইপাশ...', কথা শেষ করতে পারি না। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কাশেম বিন আবু বকরের বই পড়ছো? নাকি না পড়ে কথা বলতেছো?'
হাসি দিয়ে বলি, 'বাসর রাত' উপন্যাসটা পড়ছিলাম।
অমিত যেনো জোশ পেয়ে যায়, বলে - 'মনে আছে কিছু? কী নিয়ে লেখা?'
স্ম্বৃতি হাতড়ানো লাগে না, মুহুর্তেই বলে ফেলি, "শেষ প্যারাটায় নায়ক নায়িকার বিয়ে হয়ে গেছে, নায়ক বলছে - আসো এবার কাছে আসো, দেখি কে কতো বেশি কামড় দিতে পারে..."
অমিত মাথা নাড়ে, 'বাহ! এই না হলে শিমুল! তোমাদের সমস্যা কী জানো? মনের ভেতর ময়লা, উপন্যাস পড়বা আর সিলেক্টেড লাইন খুঁজবা, তাইলে আসল জিনিশ কই পাইবা?'
জিজ্ঞেস করি, কাবিআ বকরের বইয়ের ভালো দিক কি?
অমিত এবার খিলাল দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে খাসির গোশের ছুটাছাটা বের করে, বলে - 'তোমাকে দেখতে হবে সাহিত্য মানুষের জীবনকে কেমন প্রভাবিত করছে। আজিজের চিপায় সাদা-কালো কাউয়া মারা বা কাফকা-কামু-বোদলেয়ার মুখস্ত করে যারা বই লিখে তাতে পাঠকের কি?'
বললাম, 'বকরের বই পড়ে মানুষ কী জীবন দীক্ষা পায়?'
এরপর অমিত শরিয়ত সম্মত প্রেমের গল্প করে। সেখানে শরীরি ব্যাপার কীভাবে আসতে পারে তা বলে। পর্দার মধ্যে থেকেও প্রেম মহব্বত হলে আমাদের ইয়াং জেনারেশন কিভাবে ধ্বংসের কাছ থেকে ফিরতে পারে তা নিয়ে কথা বলে।

আমি তখন রবি কবির কাছে ধর্না দিই। 'তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি'।

জিজ্ঞেস করলাম, 'এই বইগুলা পাইলা কই? কে দিলো?'
অমিত এবার পোস্টেজের প্যাক দেখায়। প্রেমিকা, স্যরি, প্রেরিকার কী যেনো নাম মনে পড়ছে না। চিনলাম না। কিন্তু এটা জানলাম, অমিতের মারাত্মক ফ্যান। কিন্তু, অমিতও আগে একটু ডি-জুইস জেনারেশন নিয়ে লেখালেখি করছে। এইটা ঐ ফ্যান লাইক করে না। সে চায় অমিত 'উজ্জীবন' লেখা লিখুক। এসো তরুণ সত্যের পথে, আমাদের পতাকা হাতে, সংগঠনকে আঁকড়ে ধরো। এই টাইপ বিপ্লবী লেখা লিখুক সে।

এবার অবাক হই, বলি - কাহিনী কী? ডিটেইল বলো।
অমিত বলে, "সব উপরোয়ালার লীলাখেলা। মানুষ কখন কীভাবে পালটে যায় টের পাওয়া যায় না। সামান্য চ্যাটে এম এস এনে টুকটাক আলাপ করে আমাকে পালটে দিলো, ম্যান!"
হায়, এ কী কথা?
এতোক্ষণে, নতুন অমিতের কাহিনী বুঝলাম।
কে সেই অপরূপা কণ্যা, কুহেলিকা ছায়া?
তাহলে অমিতের জি-টকের বাদবাকী এতো এতো টুনটুনি পাখীর কী হবে? আমি হাত পাতি। উহু, অমিত করুণা করে না। বরং তার আরেক ফ্যানকে আমার কাছে গোছানোর চেষ্টা করে। বারবার বলে, 'ভয় পাচ্ছো কেনো? বোরখা পরে না তো?'
আমি রাজী হই না। বলি, যেই প্রোফাইল দিছো, বোরখা লাগবে না, এমনিতেই ভয় পাইছি। আসলে ঐটাইপের সাথে আমার রাশি মিলে না।'
এবার অমিত আমার জন্য নন-মুসলিম পাত্রী অফার করে। আমার সাথে নাকি খাপে খাপে মিলবে। তবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মুসলিম করে নিতে হবে।
আমি পাত্তা দিই না, 'ধুর মিয়া, অনেক লম্বা প্রজেক্ট। বাদ দাও। তৃণা টাইপ কেউ থাকলে বলো।'
অমিত এবার বিধর্মীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করলে কয়টা কুরবানীর সওয়াব পাওয়া যাবে তা নিয়ে কথা বলে। এই কথায় কথায় আমরা মক্কা বিরিয়ানী থেকে বের হয়ে আসি। (বিলটা অমিতই দিয়েছে, আমি নাকি তার মেহমান। মেহমানের খেদমত না করলে পরকালে...)

আলাপে আলাপে আমরা আবার রাস্তা ধরে হাঁটি।
গন্তব্য - কাছের কফি শপ।

তখন দেখি আমাদের বিপরীত দিক থেকে সালোয়ার কামিজময় এক পড়ন্ত বাঙালী কিশোরী আব্বু-আম্মুর সাথে হেঁটে আসছে। কার দিকে তাকিয়ে আছে সে? আমার দিকে নাকি অমিতের দিকে?

____

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

.
.
.

Read more...

অসহ্য গানের বিকাল

অ.
এখন আধুনিক হচ্ছি।
ওয়েদারের খবর রাখি, স্টারবাকসে উষ্ণ রাখি শরীর।
স্টক মার্কেটে কী হলো শেষে?
কী আর হয়? পুশকিন স্কয়ারে ম্যাকডোনাল্ডস প্রাসাদ গড়লো, বছর পনেরো আগে।
বাহাবা পেলো রাশিয়ার জনগণ। আর যখন মস্কো এরোস্টার হোঁচড় খায়?
শালার লুজারের দল সব।


ক.
সৌরভ জিগ্যেস করছিলো, ইদানিং অঞ্জন বেশি যন্ত্রণা করে কিনা।
খালি অঞ্জন না, আরও নানান জিনিশ যন্ত্রণা করে।
অসহ্য সুর, অসহ্য কথা; অসহ্য মানুষ, মানুষের মুখ।
নানান অসহ্য থেকে মুক্তির জন্য গান, অসহ্য গান।

____

০১. ভেসে যাওয়ার গান ।। হাসান মাসুদ

08 Bheshe Jaoar Ga...

__

০২. যাও পাখী বলো তারে ।। কৃষ্ণকলি

BDROCKSTAR_'Z-Jao_...


.
.
.

Read more...

16 October, 2008

হঠাৎ ভালো লাগা গান

আজকাল এক সময়কার ভালো-না-লাগা ব্যাপারগুলো ভালো লাগতে শুরু করেছে। হাবিব-অর্নবের গান শুনছি নিয়মিত।
তৌসিফের 'বৃষ্টি ঝরে যায়'এর পাঙ্খা হয়ে গেছি।
অনিলা-সুমনের গানও শুনি। রিপ্লে হয় ৪/৫ ঘন্টা একটানা।
সাথে আছে বালাম।
এফ এম ট্রেন্ড।

কোন প্রেমিকের কখন জেমস ভালো লেগেছিল, 'দুঃখিনী দুঃখ করো না', লিখেছিলো গল্পে। এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি সে।

এই ভিডিওটা চোখ-কান-মন তিনটারই ভালো লাগছে।

হু, সুজন-সুপ্রিয়।
খারাপ হয়ে যাচ্ছি, ছ্যাত...





মেয়েটার নামঃ Alizee
গানের শিরোনামঃ La Isla Bonita


Last night I dreamt of San Pedro
Just like I'd never gone, I knew the song
A young girl with eyes like the desert
It all seems like yesterday, not far away

Refrain:

Tropical the island breeze
All of nature wild and free
This is where I long to be
La isla bonita
And when the samba played
The sun would set so high
Ring through my ears and sting my eyes
Your Spanish lullaby

I fell in love with San Pedro
Warm wind carried on the sea, he called to me
Te dijo te amo
I prayed that the days would last
They went so fast

(refrain)

I want to be where the sun warms the sky
When it's time for siesta you can watch them go by
Beautiful faces, no cares in this world
Where a girl loves a boy, and a boy loves a girl

Last night I dreamt of San Pedro
It all seems like yesterday, not far away

(refrain x 2)

La la la la la la la
Te dijo te amo
La la la la la la la
El dijo que te ama
.
.

Read more...

15 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সূচনা পর্ব)

শহরের যে প্রান্তে আমি থাকি অমিত আহমেদ সেদিকে সচরাচর আসে না।
সে-ই কবে প্রথম আলো - আনন্দবাজারে ইলিশ মাছের ঘ্রাণ পেয়ে অমিত ড্যানফোর্থে আসলো। ইলিশ কিনে ব্যাগে ভরে মেট্রো ধরলো। মাঝ পথে কোন এক আন্টিকে দেখে চিন্তার ভারসাম্যে টান পড়লো; সে গল্প পড়লাম আরিজোনা থেকে ছাপা পত্রিকায়। এসবই অনেক আগের কথা।

এবার টরন্টো এসে অমিতকে ফোন দিলাম, টাইম মিলাও - দেখা করি।
আমার ইচ্ছে ছিলো, ছুটির দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অমিতের সাথে আড্ডা দেবো। ভারী এবং হাল্কা উভয় রকম খাবার খাবো। নানান বিষয়ে গল্প হবে। কিন্তু অমিতের টাইম মিলে না।
সময় যা-ও মিলে, অমিত কেবল সন্ধ্যার পরের কথা বলে। বড়ো জোর পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত আগায়। একবার এমনও বললো যে রাত নয়টা থেকে আড্ডা শুরু করতে।

কী আর করা?
নানান দিন তারিখ শেষে সময় ঠিক হলো।
পরের বুধবার বিকেল ৫টা ৩৫ এ দেখা হবে, ফাইনাল।
_

চেনা অচেনা সব শহরে আমি রাস্তা হারাই, এ আবার নতুন কী?
হাতে মোবাইল ফোন নেই, তাই কাগজে অমিতের ফোন নম্বর লিখে স্টেশনে অপেক্ষা করি।
অমিত আসে না।
৫টা ৩৫ পেরিয়ে পঞ্চাশ হয়।
পকেটের আধুলি পাবলিক ফোনে ফেলে ট্রাই করে যাচ্ছি। সংযোগ সম্ভব না।
রিডায়াল করি। আবার। আবার। এবং আবার। উত্তর একই, সংযোগ সম্ভব না।
রিসিভার রাখি না। কারণ, পয়সা ফেরত নেই। আমার পকেটেও আধুলি নেই।
স্টার বাটন টিপে টিপে তাই রিডায়াল করি। শেষে ভেসে আসে অমিতের গলা, 'হ্যাঁ, এসে গেছি। ২ মিনিট।'

অমিত এলো।
এসে হাত মিলিয়ে কোলাকুলি করলো।
তার আগে দূর থেকে হয়তো হাতও নাড়লো। আমি সেসব কিছুই দেখিনি।
কারণ, এ এক অন্য অমিত।
বই মেলায় সফেদ পাঞ্জাবীতে বাহারী চুলের যে অমিতকে দেখেছিলাম, এ অমিত সে অমিত নয়।
চুল ছোটো, পোশাক বেশে পাল্টেছে, তবে শুকিয়ে গেছে আরও বেশি।
প্রাথমিক তব্ধাবস্থা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এরকম শুকিয়ে গেছো কেনো?'
অমিত একটু গম্ভীর হয়ে বললো, 'কই নাতো? এরকমই হয়, রোজার মাসে একটু শুকিয়ে যাই।'
আমি বললাম, 'ওহ, আচ্ছা।'
এবার অমিত জিজ্ঞেস করে, 'শিমুল, তুমি রোজা রাখো না?'

...(চলবে)

____

আগামী পর্বে থাকবেঃ
সচিত্র বিরিয়ানী-বুরহানী-কফি, পূর্ণমুঠি-বোরখা পরা সেই মেয়েটি-বিলম্বিত বাসর-ফুটন্ত গোলাপ, প্রেম-বন্ধুত্ব-বিয়েশাদি নিয়ে জীবন ঘনিষ্ঠ আলাপ, এবং একটি তব্ধা খাওয়া ই-মেইল।


.
.
.

Read more...

13 October, 2008

শেখ জলিলের জায়গীরনামা

রাসেল আমাদের সাথে বিকেলে খেলতো না। স্কুল শেষে বাড়ী গিয়ে খেয়ে, একটু শুয়ে আবার মাস্টারের কাছে পড়তে বসতো। বুঝতাম না - বিকেলে খেলার সময় মাস্টার কেনো পড়াবে? পড়ালেখা তো রাতে করতে হয়! আবার শুনতাম, রাতে মাস্টার নিজে পড়ালেখা করে। মাস্টার কলেজে পড়ে, থাকে রাসেলদের কাঁচারী ঘরে। ক্লাস টু-থ্রি পড়ুয়া মন এসব জটিলতা বুঝতো না। কেবল ভেবে নিতো, রাসেলদের খুব কঠিন একজন মাস্টার আছে যে শিখিয়ে দেয় কীভাবে খাতায় মার্জিন টানতে হবে, কীভাবে হাতের লেখা সুন্দর করতে হবে। টিফিনের সময় সবুজ মাঠের আকাশে কাগজের প্লেন উড়িয়ে আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতাম, সেই কাগজের প্লেনের পেছনে লেজ বানিয়ে উপরের দিকে তুলে দিলে, দেখতে আরো একটু সত্যি প্লেনের মতো মনে হয়, আকাশে আরেকটু বেশি সময় নিয়ে ভাসে, সেটা আমাদের দেখিয়েছিল রাসেল। আর রাসেল শিখেছিলো তার মাস্টারের কাছে। এসব মিলিয়ে নানাভাবে রাসেলদের মাস্টারের গল্প শুনি। আরও অনেকদিন পরে কোনো এক দুপুরে দূর থেকে দেখি হ্যাংলা শরীরের এক তরুণ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, রাসেল বলে – ‘উনি আমাদের লজিং মাস্টার’। এতোদিনের কল্পিত মানুষটিতে মিল পাই না, কারণ – এরকম অল্প বয়সের মানুষ মাস্টার হয় কীভাবে? ক্লাস ফোরে সেই মাস্টার চলে গিয়েছিলো অন্য কোথাও, অন্য কলেজে কিংবা নিজের দেশে। মাস্টার না থাকায় রাসেলের পরীক্ষা ভালো হয়নি।

আমার শৈশবে এসব যখন ঘটছিলো, তার চৌদ্দ পনেরো বছর আগে শেখ জলিলের জায়গীরনামা শুরু। লেখকের জবানীতে - সিদ্ধান্ত নিজের ছিলো না, ‘বাবা ঠিক করলেন- আমাকে জায়গীর করে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন'| কারণটা স্পষ্টতঃ অর্থনৈতিক। রাসেলদের মাস্টার তাও কলেজের ছাত্র ছিলো, কিন্তু শেখ জলিল তখন মাত্র ক্লাস সিক্সের ছাত্র। বুঝা যায়, পরবর্তী দশক সময়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। ‘জায়গীর’এর পরিবর্তে ‘লজিং মাস্টার’ মানুষের মুখে জায়গা করে নিয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে লজিং মাস্টারের সামাজিক অবস্থান। কিন্তু শেখ জলিলের সময়টা অন্যরকম। অর্থনৈতিক মন্দার বছর তখন, তাই হাটকয়েড়া গ্রামের মাজম মেম্বারের গেরস্থ বাড়িতে শান শওকত কিংবা নামের বাহার থাকলেও ভেতরের সংকট প্রবল হয়ে উঠে। দশ-এগারো বছরের জায়গীরকে বারোমাসী কামলার সাথে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এটাই হয়তো বাস্তবতা। রিলিফের আটা-চিনি-দুধ হাতিয়ে নেয়া শাসক শ্রেণীর ছড়ি সমাজ নিয়ন্ত্রণ শেষে ক্লান্ত বিকেলে এসে পড়ে জায়গীরের উপরে।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে, সমগ্র জেলায় ফার্স্ট হয়ে, ক্ষণিক আদৃত হলেও উঠতি কিশোরটিকে যেতে হয় নতুন জায়গীরবাড়ীর সন্ধানে। গন্তব্য কুড়িপাড়া, সঙ্গী জনৈক লতিফ ভাই –


"দু'জন মিলে সারাদিন হাঁটি। সমতল ছেড়ে যখন পাহাড়ে উঠলাম তখনই দুপুর গড়িয়ে গেলো। পাহাড়ি পথ আর ফুরায় না। সমতলে মানুষ, এরকম হাঁটাপথে অভ্যস্তও তেমন ছিলাম না। মাঝে মাঝে থামি, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। পেটে ক্ষুধা, রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি খাই আবার হাঁটি।"


বদলে যায় রাজা, থেকে যায় ছায়া। তাই প্রথম দিনেই তামাক ক্ষেতে পানি দিয়ে, শরীরে ব্যথা-পেটে খিদা নিয়ে কৌতুহলী রাত শেষ হয়। লতিফ ভাইয়ের সাহসে মধুপুর গড় পেছনে ফেলে শেখ জলিল ফিরে আসেন। শেষ হয় একদিনের জায়গীর জীবন। প্রশ্ন জাগে, লতিফ ভাই না থাকলে শেখ জলিল কি ঐ জায়গীর বাড়ী ছাড়তে পারতেন? বয়স এবং প্রতিকূল সময়ে মানুষ সহনশীল হয়ে উঠে, কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সীমাবদ্ধতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ বেশি ছিলো কি? আগের মাজম মেম্বারের বাড়ীর কামলাদের নাম মনে থাকলেও কুড়িপাড়ার এ পরিবারটির পরিচয় অস্পষ্ট রেখেছেন লেখক। হয়তো স্মৃতিভ্রম, তবে এতো সময় পরে এসেও সামাজিক দায়ের কৌশল হলে সেই সীমাবদ্ধতার কথাটিই মনে করি আবার। অবশ্য, জায়গীরপ্রভুর নাম-সাকিন জানা পাঠক হিসেবে খুব জরুরী কিছু নয়।

‘যদি কেউ রাগ করে, যদি কেউ মারে ধরে, ভয় শুধু ভয়, শুধু ভয়, ...বাড়ছে না বয়স, পনেরোতে গেছে আঁটকে’ – অঞ্জন গেয়েছে আরও পরে। শেখ জলিল ঐ বয়সে খয়েরপাড়ার লালু সরকার আর হরিপুরের হাতেম আলী আকন্দ বাড়ী শেষে বোর্ডিং স্কুলের গন্ডি পেরুনোর সময়। সাথে চলছে জায়গীর জীবন। বয়ঃসন্ধির উৎসুক সময়, শরীরি নিষিদ্ধ আলাপ-অভিজ্ঞতা, খানিক দূরন্তপনায় রাস্তার পাশে বুট পুড়িয়ে খাওয়া, সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকে মোহনলালের পার্ট, ভাটার ইট চুরি করে কনক সিনেমা হল অথবা যাত্রাপালায় প্রিন্সেসের গায়ে কাগজ ছুড়ে মারার ইচ্ছেটুকু আঁটকানোর সাধ্য ছিলো না কারো। মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর ‘আমি এক দূরন্ত যাযাবর’ গলায় চেপেছে তারও আগে। এসব দিন যাপনের গল্পে উনিশ’শ ছিয়াত্তরের গণবাহিনীর উৎপাত এবং পরিণতি প্রসঙ্গও আসে।

অধুনাপতিত এক সাপ্তাহিক সম্পাদক একবার লিখেছিলেন, চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষ বাংলা সাহিত্যে তেমনভাবে আসেনি। তার সে আফসোস কলামে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট থাকলেও শেখ জলিলের জায়গীরনামা পড়তে গিয়ে আবার মনে পড়ে গেলো, সাথে যোগ হলো এবার গণবাহিনী প্রসঙ্গ। এরশাদের প্রথমদিকের সময় এসেছে এভাবে –

"উনিশ শ’ বিরাশি সাল। এরশাদের সামরিক শাসন সবেমাত্র শুরু হয়েছে। চারদিকে থমথমে গুমোট পরিবেশ। লোকজনের কথাবার্তাতেও নিচু স্বর। রাস্তাঘাটে মহিলাদের চলাচলেও চলছে খবরদারি। পরীক্ষার হলগুলোতে চলছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এমতাবস্থায় শুরু হলো আমার এইচএসসি পরীক্ষা।"


জায়গীর জীবনের শেষ অধ্যায় ঢাকা শহরে।
গ্রামের মেঠো পথের বদলে ইট সুরকির দালান। হাঁফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠা। চারদিকে শহুরে মানুষ, শহুরে ভাষা, তবুও ভেতরে কোথায় যেনো সেই গ্রামীণ মন। স্যান্ডেল পরে কলেজে যাবার, বিকেলে নিচ থেকে বন্ধুদের ডাকাডাকি, এসব ঘটনার মাঝে একটা ‘হারানো দিন’ ভাব আছে। দৃশ্য কল্পে মনে হয় ‘নীল আকাশের নীচে’ বা ‘প্রফেসর’ সিনেমার নায়ক। সাদাকালো জীবন, মনের ভেতরে রঙীন ইচ্ছা। তবে সব কিছুর প্রকাশের ভঙ্গী বদলেছে, বদলায়নি জীবনচর্চা। শেখ জলিল এই সময়কে ভিন্নভাবে দেখেছেন, দেখার চেষ্টা করেছেন অন্য চোখে। বলেছেন, নিজের যাপন বদলানোর কথা। ধারণা করি, বয়সটাই অমন। নানান সংকটেও আশাবাদী থেকেছেন। স্থায়ী জায়গীরের বদলে বেড়েছে প্রাইভেট টিউশন। প্রসঙ্গতঃ চলে আসে পড়ন্ত কৈশোরের অপ্রকাশ্য প্রেম-বিরহের কথা। সে-ই কবে কুতকুত খেলতে গিয়ে একটু বয়সী দোলার সাথে জড়াজড়ি, স্পর্শ, না-ভোলা-স্মৃতি। পালাক্রমে আফরোজার প্রতি মুগ্ধ বিষ্ময়, শ্যামলা বর্ণের মেয়ে ঝিনুক, শান্ত মেয়ে সাথী, স্মার্ট বিরু, অথবা ইমা। এসব মুগ্ধতা শেষতক ভালোলাগাই রয়ে গেছে, ভালোবাসা হয়নি, কিংবা শেখ জলিল বাঁধনে জড়াতে চাননি। বরং এড়িয়েছেন শেফালী কিংবা সাদমাকে বিয়ে করার বণিকী প্রস্তাব।

জায়গীরনামার গল্প করতে গিয়ে লেখক নিজের জীবনের গল্প বলেছেন সাবলীলভাবে। এসেছে নানান চরিত্র। বানোয়াট নয় বলেই হয়তো প্রতিটি ঘটনা গল্পের ব্যাপকতাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে শেখ জলিল প্রথম দিকের ঘটনা বিস্তারে আত্মকেন্দ্রীক থেকেছেন, কেবল নিজের গল্প বলেছেন। বিশেষ করে মফস্বল জীবনের সময়কে ছাড় দিয়ে গেছেন। তাই নিজের মাঝেই টেনেছেন স্মৃতির শেষ রেখা। এ রেখা তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত করতে পারতো, এখনো পারে – যদি জায়গীরনামায় স্মৃতিছুরি চালানো হয়। জলিল ভাই কি অমন করবেন?

খুব সম্ভবনা থাকে – আত্মজীবনীর এসব চেষ্টায় চাপা পড়ে কষ্টের কথা, বেদনার কথা, হতাশার কথা, লজ্জার স্মৃতি। সেটা হতে পারে সচেতন লেখনী কৌশল কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ‘জায়গীরনামা’ এদিক থেকে অনেক মুক্ত।
স্মৃতি হাতড়ে সাত বছরের জীবন এসেছে রঙীণ কাঁচের ছোঁয়াচবিহীন ভাবে। ঘটনা বর্ণনে চাতুর্য্য নেই, আছে নিটোল সারল্য। জীবন সংগ্রাম তাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। হার-না-মানা দৃঢ়তা আসে নগর জীবনের নিত্য সংকটে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যাওয়ার বলাকা এক্সপ্রেসে শেখ জলিল তাই একা থাকেন না, সাথে থাকে সংগ্রামী অভিজ্ঞতা, আশাবাদী প্রত্যয়।
যার পুরো প্রেরণাই জায়গীরনামা।

.
.
.

Read more...

09 October, 2008

আজ আমাদের দূর্গার জয়জয়ন্তী

তোকে বলা হয়নি, আমি আসলে এভাবে পালাতে চেয়েছি। পালিয়ে সফল হয়েছি। আজও অমন ভাবছি। নিশ্চয়ই জানিস, আবেগ এবং জেদ কতোটা তাড়ায় আমাকে। কেউ কেউ আসলে এভাবেই থাকে, আমার মতো - আবেগ এবং জেদ নিয়ে। এতো দূরে এসে এইসব অনুভূতি কোথায় যেনো লুকিয়ে আছে। আমি কী করে বুঝাই, এটাই হয় আমার সাথে। কতোবার নিজের সাথে নিজে ভেবে সিদ্ধান্ত পাল্টেছি। সুনীল সাইফুল্ল্যার কবিতার লাইন শুনে ভয় পেয়েছিলি, যদি অমন করি। করার কথা ছিলো, সত্যি। দিন তারিখ হিসাব করে টোকাটুকি হয়েছে কেবল। সেই সাহস কই? সবুজ পায়রার কলজে চিবিয়ে খেয়ে যাবার ইচ্ছাটা সত্যি হয় না। আবেগী ও জেদী মানুষের মাঝে সাহসের ঘাটতি থাকে। সেটা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি না দিলেও বুঝে নিতে হয়।

আমার ধারণা, তুই বুঝে গেছিস। আমিও যেমন বুঝে গেছি তুই আমার চেয়ে কম একরোখা নস।
তাই, তোকেও ঐ কাতারে নিয়ে আসি। কেউ কেউ এভাবেই জীবন যাপন করে।

তখনো আমাদের হাতে বিভুতিভূষণ আসেনি।
আমরা ক্রমাগতঃ হুমায়ুন পড়ে বড় হচ্ছি।
তাই, আরও পরে অপু-দূর্গার কাহিনি সেভাবে স্পর্শ করেনি।
আমি কখনো অপু হতে চাইনি। ঐসব চোখ ভেজানো কল্পকথা আমার খেলার বিকেল নষ্ট করেনি।
আমরা হয়তো - অপু,দূর্গার চেয়ে বেশি ছিলাম।

পরশু বললি, একবারও কেনো 'অভিনন্দন' বললাম না।
এটা বলতে হয়?
তোর এ চলে যাওয়া, এই ব্যবধান আমার যাপনরীতিকেই পালটে দেবে।
নম্বর ধরে ধরে বললে, আরও ৩৩০ দিনের যে মিনিট আমি গুনি তাও ফুরিয়ে যাবে।
সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত।
ভেবে দেখেছিস কতোটা পাল্টাবে?
ওসব বলে আর কী হয়? একযুগ আগের ঈদ বাড়ী ফেরার আগে তুই যেভাবে গাইলি,
'বোঝেনি অবুঝ মন, নীলাঞ্জনা তখন...দাম দিয়ে যন্ত্রণা কিনতে চায়'।
আমি অবাক হয়ে রইলাম, নচিকেতার কন্ঠ আমি বুঝিনি, যেমন বুঝেছি তোর উচ্চারণে।
আজ, এই মুহুর্তে কেনো মনে পড়ছে এ গান।
আমি তো এসব ভুলতেই চেয়েছি। চেয়েছি বলেই, শুকনো চোখে এবার এয়ারপোর্টের কালো কাঁচ পেরিয়েছি।
...এরপর চোখ ভিজেছি, তোকে বলিনি। তোদের বলিনি।

এখন বোধ হয় ব্লগে আসিস না, কিংবা দু'বছরের বেশি।
তাই এটাও তুই পড়বি না। সে-ই ভালো।

না বলা একটা ঘটনা বলি।
যেবার ঢাকা এলাম, কলেজে ভর্তি হবো।
হুমায়ূন আহমেদের 'জয়জয়ন্তী' পড়লাম কৈশোরিক নিঃসঙ্গতায়।
সে বিকেল আমি হু হু করে কেঁদেছি। তোর জন্য।
শেষ লাইনগুলো এরকম ছিলো, আমরা ভাই-বোন সিঁড়ি বেয়ে একা নেমে আসি।

শুনেছি, ভার্সিটি থেকে ফিরে তুই বলতি, 'শিমুল নেই, ঘর খালি খালি লাগে,আমার ভালো লাগে না।'
আমার আর ঘরে ফেরা হলো না।
তোর-আমার সেসময়কার চিঠিতে সময় ফিরে পাবার স্বপ্ন ছিলো।
সেসব কিছুই হলো না দশক পেরিয়েও। লোভী আমি ম্যাটাডোরের ষাঁড়ের মতো ছুটছি।
আজ বৃষ্টিতে ভিজেছি অনেক ক্ষণ। স্কুলে যাবার মতো করে তুই আবার ছাতা ধরবি?

মনে আছে? আমি ছুটি শেষে ঢাকা ফিরবো।
জামা পরি, ব্যাগ গুছাই। তুই চা এনে দিলি। কী করে ভুলে গেলাম চায়ের কথা, ব্যস্ততায় বেরিয়ে এলাম।
পরে তুই কাপ হাতে কান্না করলি অনেক।
আরেকবার, আমাকে দেখার জন্য সকাল ৫টায় রওনা দিলি, আর আমি সাতটায় বাড়ী ছাড়লাম।
এগুলো সব সিম্বলিক ছিলো।
কারণ, এভাবে দূরেই সরে গেলাম, তুই আর আমি।
আজ আমার ইচ্ছে করছে প্লেনের টিকিট কেটে দেশে যাই।
বণিক হবার পাঠশালায় ছাত্র হয়ে আছি, একদিন হয়তো ঢাকা-টরোন্টো-ঢাকা টিকিট কেনার অনেক টাকা হবে।
তখন ক্যালেন্ডারের পাতা অনেক উলটে যাবে।
এই ৯ অক্টোবর, ২০০৮ কি ফিরে আসবে?

ইচ্ছে ছিলো, দুই প্যারায় কথা শেষ করে ঘুমাতে যাবো।
হলো না।
কিছু ইচ্ছে আসলে মরে না।
সে-ই কবেকার মতো করে আমি তোর স্কুল ব্যাগের ভেতরের পকেটে সিঙাড়া খুঁজে বেড়াবো।
সে ঘ্রাণ, আমি চোখ বুঁজে নিঃশ্বাসে টেনে নেবো।
আজ এই গলাভার সময়ে এভাবেই আমি সান্ত্বনা খুঁজবো।

আপা, তোর নতুন জীবন চমৎকার কাটুক।

_

রাত ৯টা ৪৫। ৮ অক্টোবর, ২০০৮ (কানাডা)
সকাল ৭টা ৪৫। ৯ অক্টোবর, ২০০৮ (বাংলাদেশ)

একই মুহুর্তে তোর আর আমার ক্যালেন্ডারে দুইদিন।
এটা আমার ভালো লাগে খুব। সকাল-রাতগুলো হিসেব থাকে না।

.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP