25 March, 2008

গল্প: নীলুফার যখন মারা গেলো

তাদের দেখা গিয়েছিলো এক সাথে, কেউ বলে শনিবারে আবার কেউ বলে শুক্রবারে। তবে বৃহস্পতিবারে সন্ধ্যায় লতু মোল্যার দোকানে তারা টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে চা খেয়েছিলো এমনটা গ্রামের অনেকেই দেখেছে - বলাবলি করছে এবং এ বিষয়ে কারো বিন্দু-বিসর্গ সন্দেহ নেই - তাদের দেখা গিয়েছিলো শুক্রবার জুম্মার নামাজে প্রথম কাতারে, হয়তো বিকালে কমলতলা বাজারেও তারা ছিলো। এখনো এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি যে তারা এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেছে অথবা কোথাও যাবে যাবে করছে। তারা, মানে আমাদের সতেরো নম্বর কমলতলা ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন মেম্বার আবদুল কালাম এবং তার ডানহাত ছুট্টোমিয়া, এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেলে এবং কিছুদিন পরে ফেরত এলে গ্রামের কারো কিছু বলার থাকবে না, করার থাকবে না। বিভিন্ন সময়ে কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিয়া একসাথে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো, সাথে যোগ দিয়েছিলো তুলশীপাড়া গ্রামের সুজিত সাহা, যথারীতি পরে ফিরেও এসেছে - সেটা গ্রামবাসীর কাছে নতুন কিছু নয়। তবে এবার নীলুফার আক্তার মারা যাওয়ার পর এলাকার লোকজনের মনে হয় কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিয়া আবার এলাকা ছাড়া হবে। সাথে তুলশীপাড়ার সুজিত সাহাও হারিয়ে যাবে কিনা এবং গেলে কতোদিন পরে তারা ফিরে আসবে এ বিষয়ে কেউ কেউ কানাঘুষা করে।

দুই.
তবে এই কানাঘুষাটা তেমন ঘন হয় না নীলুফারের মৃত্যূ শোকে। রেল লাইনের ডান পাশে ডিস্ট্রিক্ট রোডের ঢালু খালি জমিতে ছনের ছাউনি আর বাঁশের বেড়ার ঘরঅলা যে বাড়ী, সেটা নীলুফারদের বাড়ী। নীলুফারের মৃত্যূতে এলাকার লোক শোকাহত হয়, তবে শোক জানানোর আসরটা নীলুফারদের বাড়ীতে বসে না। মানুষের মুখে মুখে নীলুফারের মৃত্যুর খবর কমলতলা বাজার, লতু মোল্যার দোকান, প্রাইমারী স্কুলের মাঠ কিংবা ডিস্ট্রিক্ট রোডের শেষ মাথায় নতুন গজিয়ে ওঠা মোবাইল ফোনের দোকানে ছড়িয়ে যায়। এইসব শোকগুজার স্থানের কোথাও আমরা নীলুফারের বাবা, গরীব চাষী সালামাতুল্লাকে দেখি না। সালামাতুল্লা কী করছে, কী খাচ্ছে, মেয়ের শোকে কেমন ভেঙে পড়েছে সে খবরও কেউ নেয় না। গ্রামের লোকজন নীলুফারের জন্য মন খারাপ করে, কারণ নীলুফার গরীব সালামাতুল্লার মেয়ে, নীলুফারের এখনো মরার বয়স হয়নি, কিংবা একই গ্রামের একটা মানুষ আচমকা মারা গেলো - এই সব ভেবে ভেবে লোকজন মন খারাপ করে । তবে এই মন খারাপে নীলুফারের বর্ননা কিংবা নীলুফারের সাথে কোনো স্মৃতিময় ঘটনা উঠে আসে না। কারণ, নীলুফারকে তারা কেউ দেখেনি। তাদের অনেকেই নীলুফারের নাম জেনেছে তার মৃত্যুর সংবাদের পরে, কিংবা জানাযারও পরে। যেসব ছেলেমেয়ে প্রাইমারী স্কুলে দল বেঁধে খালি পায়ে যায় কিংবা লতু মোল্যার দোকানে দশ টাকার কেরোসিন কিনতে শিশি হাতে আসে তাদের অনেককেই গ্রামবাসী চিনে আবুল হোসেন - সামসুদ্দিন - আলাউদ্দিন কিংবা তারামিয়ার ছেলেমেয়ে নামে। এদের মাঝে কখনো নীলুফার ছিলো না। কেউ কেউ ভাবে - নীলুফার হয়তো পর্দানশীল ছিলো, হয়তো লাজুক ছিলো, হয়তো পরপুরুষকে দেখা দিতো না সে - তাই এলাকার চা দোকান কিংবা বাজারে আনাগোণা করা মানুষরা নীলুফারকে দেখেনি কখনো। মনে মনে - অনেকে এটাও মেনে নেয় যে - গরীব সালামাতুল্লার বাড়ীতে যাওয়ার প্রয়োজন কখনো হয়নি, তাই তার মেয়ে নীলুফারকে দেখাও হয়নি। ডিস্ট্রিক্ট রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে কারও কখনো পিপাসা লাগেনি যে গরীব সালামাতুল্লাহর বাড়ীতে গিয়ে এক মগ পানি চাইবে অথবা পিপাসা লেগেছিল কিন্তু গরীব এবং নোংরা বলে কেউ পানির আশায় সালামাতুল্লার বাড়ীমুখো হয়নি। কেউ কেউ ভাবে - কখনো পানি চাইতে গেলে হয়তো নীলুফার পানি এগিয়ে দিতো, নীলুফারের ফরসা কিংবা কালো - মোটা অথবা চিকন হাত দেখা যেতো। বাড়ীর বৌ-ঝিদের কেউ কেউ নীলুফারকে দেখেছিল, তার লম্বা চুল ছিলো, পায়ে আলতা ছিলো, হাতে চুড়ি ছিলো, কপালে হয়তো টিপও ছিলো এবং তাকে দেখা গিয়েছিলো কালাম মেম্বরের বাড়ীর বাইরে আর্সেনিকমুক্ত পানির কলতলায়। আলাউদ্দিনের বৌ মুখে পান চিবিয়ে তারামিয়ার বৌয়ের মাথায় সুগন্ধি নারিকেল তেল মাখতে মাখতে নীলুফারের যে বর্ননা দেয় তাতে নীলুফারের এক রকম কল্পনা মনে আসে, কিন্তু এ বর্ণনা গ্রামের বাকী দশ বিশটা মেয়ের সাথে মিলে যায় এবং নীলুফার ক্রমশ: সাবিনা - সুলিমা - মর্জিনাদের একজন হয়ে যায়, আসল নীলুফারকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং তুলশীপাড়ার কল্পা মাসী এ খবর দেয় যে - গত তিন বছর নীলুফারের চেহারা গ্রামের কেউ দেখেনি, কারণ নিলুফার মাদ্রাসায় পড়তো, সেখানেই থাকতো এবং বছরে ছ'মাসে বাড়ী আসলেও বোরখা পড়ে চলতো, কল্পা মাসীর বাড়ীর সামনে দিয়ে হেঁটে যেতো। একদিন পথ চলতে 'তুমি কোন বাড়ীর মেয়ে গো' জিজ্ঞেস করে কল্পা মাসী নীলুফারের পথ থামিয়েছিলো, নীলুফারও থেমে খানিকটা জিরিয়ে নিয়েছিলো এবং বলেছিলো সে - কমলতলার সালামাতুল্লার সেজো মেয়ে নীলুফার। বোরখার ফাঁক গলিয়ে কল্পা মাসী সে'দিন নীলুফারের চোখ দেখেছিলো, নাকের দুপাশে ফর্সা মুখও দেখেছিল - মনে হয়েছিল নীলুফারের বয়স পনেরো অথবা ষোলো। এভাবেই অনেকে প্রথম জানলো - নীলুফার সালামাতুল্লার একমাত্র মেয়ে নয়, আরও মেয়ে আছে - এই ভেবে কারো কারো শোক হয়তো খানিকটা কমে আসে এবং লতু মোল্যার দোকানে এক কাপ গরম চায়ে ঠোঁট চুবায়। কেউ হয়তো আস্তে করে বলে - মেম্বর সা'ব তো এখনো গেরামে আছে।

তিন.
কমলতলা ইউনিয়ন গোরস্তানে নীলুফারকে মাটি দিয়ে বৃদ্ধ সালামাতুল্লা ঘরে ফেরে, সে হয়তো দাওয়ায় বসে থাকে - আকাশে তাকায়, হয়তো মগে ঢেলে পানি খায়। ছোটো মেয়ে শরীফা হয়তো একপ্লেট ভাত পাশে রেখে যায়, হয়তো রেখে যায় না; কারণ চুলায় আগুন জ্বলেনি। সালামাতুল্লাহ কন্যা শোকে পাথর হয়ে যায়, তবে ঠিক তার পরদিন লোকজন দেখে হাতে ঝুড়ি আর কাঁস্তে নিয়ে সে জমিতে নিড়ানি দিতে চলেছে - নিজের জমি নয়, হতে পারে আবুল হোসেন, আলাউদ্দিন কিংবা সামসুদ্দিনের বর্গা ক্ষেত। কেউ কেউ অনুমান করে নীলুফারের মৃত্যুতে সালামাতুল্লাহ খুব অখুশী হয়নি, কারণ পাঁচটা মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে সে প্রায়ই দু:শ্চিন্তায় থাকতো, আজকাল ডিমান্ড ছাড়া পাত্র আসে না - এতোসব কষ্টের কথা খাঁ খাঁ রোদের দুপুরে ঝিল গাছের তলায় বসে বিড়িতে ফুঁক দিয়ে সালামাতুল্লাহ বলেছিলো - পাশের মোস্তফা কিংবা সাইফুল্ল্যাকে। মোস্তফা কিংবা সাইফুল্ল্যা জানতো সালামাতুল্লার পাঁচ মেয়ে, এর মাঝে কতো জনের বিয়ে হয়েছে সেটা জানতো না, জানার আগ্রহ হয়নি অথবা সালামাতুল্লার বাড়ীতে কখনো ডেকোরেশন কোম্পানীর লাইট জ্বলেনি বলে বিয়ের খবর তারা কেউ জানেনি। এমনকি সালামাতুল্লার সেজো মেয়ের নাম নীলুফার এটা মোস্তফা-সাইফুল্ল্যারাও জানতো না। অথচ সালামাতুল্লাহ মনে মনে নীলুফারকে নিয়ে গর্ব করতো। সাত বছর বয়সে মা মরে যাওয়ার পর নীলুফার কান্না করেছিলো খুব, বড় বোন আকলিমা পাঁচ দিনের মিলাদের পর স্বামীর বাড়ী চলে গিয়েছিল। মেজ বোন শিরিনা সারাদিন সাংসারিক কাজ করতো আর নীলুফার ব্যস্ত থাকতো ছোটো শরীফা এবং লতিফাকে নিয়ে। লতিফা মারা গিয়েছিলো দশ মাস বয়সে, মায়ের মৃত্যুর চারমাস পরে, জ্বরে - ঠান্ডায় এবং হয়তো ক্ষুধায়। বছর তিনেক আগে কমলতলা ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের পাশে 'কমলতলা এতিমখানা ও মহিলা মাদ্রাসা' চালু হলে সালামাতুল্লা খবর নিয়ে, ছুট্টোমিয়ার সুপারিশে, নীলুফারকে মহিলা মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল এবং পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় সে তিরিশটা এতিম মেয়ের আবাসিক হোস্টেলে মুফতে থাকা খাওয়ার সুবিধাও পেয়েছিলো। নীলুফার এতিমখানায় যাওয়ার পর কিছুদিন সালামাতুল্লার ঘরটা খালি খালি মনে হয়েছিলো, মনে হয়েছিলো - বাড়ীর সামনের বড় খেজুর গাছটা কেটে ফেললে যে রকম শুন্য লাগে একপাশ, সেরকম খালি হয়ে গেছে সালামাতুল্লার ঘর। তবে এই ভেবে ভালো লেগেছিলো - অন্যান্য উনত্রিশ এতিম সাথী এবং তিনবেলার খানা খেয়ে এতিমখানায় নীলুফার অবশ্যই ভালো আছে। এতিমখানায় টিনের ঘরে সারাদিন কিতাবে নামাজে ইবাদতে আদবে নীলুফার গুণবতী পরহেজগার হয়ে উঠবে, ভালো ঘরে বিয়ে হবে, সুখে থাকবে - এমনটা ভেবে ভেবে সালামাতুল্লাহ কোনও সকালে-দুপুরে অথবা বিকালে এবং হয়তো রাতেও মুখ লুকিয়ে সুখের হাসি হেসেছিলো। ভালো লেগেছিলো যখন গত কার্তিকে নীলুফার ছুটিতে বাড়ী এসেছিল - সারা শরীর ঢাকা পবিত্রাকন্যা। দুইদিনে নীলুফার ঘরদোর সাফ করে তকতকে করে রেখেছিলো। রোজ সকালে আজানের আগে উঠে যখন নামাজ কলেমা এবং সুর করে নিঁচু স্বরে অজিফা পড়তো তখন সালামাতুল্লার মনটা অন্য রকম রোশনাইতে ভরে যেতো। মনে হতো এই সকালে দলে দলে ফেরেশতা গরীব সালামাতুল্লার ভাঙ্গা বাড়ীর চারপাশ ঘিরে রেখেছে, রহমত আর বরকতের ফিনফিনে বাতাসে ভরে যাচ্ছে ঘর। এ বাতাসে এবার ভালো ফলন হবে, গাইটা বেশি দুধ দিবে এবং সামনের শীতে ঠান্ডা কাশির ভাবটা কমে যাবে। সালামাতুল্লার ইচ্ছা করতো মেয়ে নীলুফারের জন্য কিছু ভালোমন্দ বাজার করবে, শিরিনা রান্না করে নীলুফারের পাতে খানিকটা বেশি ঝোল দিবে - সালামাতুল্লা বলবে - 'তোদের মা'য়ের রান্নাও এরকম ছিলো'। এসব ইচ্ছা পূরণ হয়েছিলো কিনা তা আমরা জানি না, কারণ - নীলুফার বাড়ী এসে কি খেয়েছিলো তা আমাদের কানে আসেনি, সালামাতুল্লাও এরকম সাংসারিক সুখের গল্প কারও সাথে করেনি। তবে নীলুফারকে মাটি দেয়ার পরদিন অথবা তারও পরদিন সালামাতুল্লাহ যখন দুপুরে না খেয়ে জমিতে কাজ করে তখন ঝিল গাছের তলায় বসে সাইফুল্ল্যাহ বিড়ি হাতে আস্তে করে আঙুল তুলে মোস্তফাকে বলে - দেখ, ছুট্টোমিঞা না? মোস্তফা এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে সেদিকে তাকায় আর বিড়বিড় করে বলে - এরকম চক্কর দিতাছে ক্যা?

চার.
তখনও কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিঞা গ্রাম ছাড়া হয়নি। তারা কমলতলা বাজারে পেপার পড়ে, চা খায় - সুজিত সাহার আড়তে কথা বলে। কেউ কেউ চাল-ডাল-তেল কেনার ভান করে সুজিতে আড়তের কিনারে ঘুরঘুর করলেও বুঝতে পারে না কালাম মেম্বরেরা কী নিয়ে কথা বলে। কখনও তারা রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, কখনও মাছের বাজার পাঁকা করার কথা বলে, চাল-ডাল-তেলের আগুন দামের আলাপ করে, হয়তো মরে যাওয়া নীলুফারকে নিয়েও দু'চারবার মন খারাপ করে। অনেক রাতে তারা কমলতলা প্রাইমারী স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে এক সাথে ঘরে ফিরে - এমনটাও লতু মোল্যার দোকানে বসে কেউ কেউ দেখে। এই দেখায়ও মানুষের মনে সন্দেহ দূর হয় না, তারা লতু মোল্যার দোকানে - ডিস্ট্রিক্ট রোডের শেষে ফোনের দোকানে এমন কি কমলতলা বাজারেও মানুষ ভাবে - এরা উধাও হয়ে যাবে, এদের দেখা যাবে না কয়েকদিন। মানুষের এ সন্দেহ অমূলক নয় সেটা সবাই জানে। কারণ, অনেক সংকট মুহুর্তে গ্রামে কালাম মেম্বর এবং ছুট্টো মিঞাকে পাওয়া যায় না। শোনা যায় - তারা সে সময় স্থানীয় সরকারের জেলা অফিসে গিয়েছিলো এলাকার বরাদ্দ আনতে, কাগজপত্রের জটিলতায় ফিরতে দেরী হয় দুইদিন তিনদিন করে পাঁচদিন। এই ফাঁকে কারা যেনো কমলতলা ছাত্র পরিষদের পলাশকে খুন করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। লাশ ঝুলে একরাত এক বেলা - খবর পেয়ে পুলিশ আসে তবে কাউকে ধরে না। তুলশীপাড়ার সুজিত সাহা এসে পুলিশের সাথে কথা বলে - বোতাম খোলা শার্ট পরে পলাশের বাবা অথবা বড় ভাইকে কান্নায় জড়িয়ে ধরে। এরকম অনেকেই কাঁদে। এবং পাঁচদিন পরে এলাকায় কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা ফিরে আসে। আসরের নামাজ শেষে দু'জন পলাশের কবরের সামনে মোনাজাত ধরে। পেছন পেছন এলাকার আরও কয়েকজন বৃদ্ধ, রুগ্ন কিছু কিশোর শামিল হয়। উপড়ানো মাটির সবুজ ঘাসগুলো ততদিনে মলিন হয়ে গেছে, মানুষের শোকও কমেছে। শোক পেরিয়ে পরদিন কালাম মেম্বর গ্রামের রাস্তা বাঁধাইয়ের ঘোষণা দেয়, ট্রাকে করে ইট আসে, খুন্তি-শাবলের ঠুক ঠুক শব্দে গ্রামের লোক উন্নয়ন দেখে, এবং আস্তে আস্তে পলাশকে ভুলে যায়। তবে পলাশ খুনের সময় কালাম মেম্বর-ছুট্টো মিঞার এলাকায় না থাকার কথা মানুষ ভুলে না। তারা মনে রাখে, কারণ - আরও আগে যেবার গ্রামের নিতাই শীলের ঘর দখল করলো সামসুদ্দিনের ভাতিজারা সেবার নিতাই শীল দৌড়ে গিয়েছিলো কালাম মেম্বরের বাড়ীতে, কালাম মেম্বর বাড়ী ছিলো না, ইউনিয়ন পরিষদের অফিসেও ছিলো না, ছুট্টো মিঞাও ছিলো না। পরে জানা গেছে - তুলশীপাড়ার সুজিত সাহাও ছিলো না এলাকায়। নিতাই দুই রাত তিন দিন কালাম মেম্বরের পুকুর ঘাটে ঝিম মেরে বসে ছিল, হয়তো কেউ দয়া করে কিছু খেতে দিয়েছিল, হয়তো দেয়নি। তবে তিনদিন পরে সকালে পুকুরে নিতাইয়ের লাশ ভেসে উঠেছিলো। কেউ কেউ বলে - না খেয়ে দূর্বল হয়ে ঘুমের ঘোরে পুকুরে ডুবে মারা গেছে, কেউ বলে পুকুরের অদেখা শক্তিটা টেনে ডুবিয়েছে, কেউ আবার বলে - তার মৃগী রোগ ছিল। পঁচা লাশ দেখতে গ্রামে পুলিশ এসেছিলো কিনা সেটা কারও মনে পড়ে না। তবে কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা এবং সুজিত সাহা গ্রামে ফিরেছিলো বারো দিন পরে। সাথে ছিলো তুলশীপাড়ার নগেন যোগীর অন্ধ ছেলে, অন্ধ নয় - ভালো চোখ নিয়ে ফিরেছিল। কমলতলা ইউনিয়নের লোকজন জানে - নগেন যোগীর অন্ধ ছেলেটাকে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ার শংকর নেত্রালয়ে নিয়েছিল সুজিত, খরচ দিয়েছে কালাম মেম্বর এবং সঙ্গী ছুট্টো মিঞা। অন্ধ ছেলের জগত দর্শনে মানুষের মাঝে শোরগোল পড়ে যায়। কমলতলা পেরিয়ে তুলশীপাড়ায় লক্ষীপূজার ঢোল একটু জোরেই বাজে। সে উৎসবে ঈশ্বর হয়ে যায় - কালাম মেম্বর। মাঝ রাতে উৎসবের মাঝে এলাকার লোক দেখে কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা এবং সুজিত সাহা মসজিদের পুকুর ঘাটে কী কী আলাপ করে। কেউ কেউ মনে করে - তারা হয়তো নিতাই শীলের জন্য মন খারাপ করে, আবার হয়তো সামসুদ্দিনের ভাতিজাদের নতুন বাড়ী দাওয়াত নিয়েও কথা বলে। এবং এভাবেই কমলতলার অনেকে নিতাই শীলের কথা ভুলে যায়, তার বৌ-ছেলে এলাকা ছেড়ে কোথায় গেলো সে প্রশ্ন আর মনে পড়ে না। তবে এই কথা সবার মনে পড়ে - অনেক অকল্যাণময় ঘটনার সাথে এই তিনজনের এলাকা ছাড়ার মিল পাওয়া যায়। এবং গ্রামবাসী এটাও খেয়াল করে যে, খারাপ ঘটনার সময় কিংবা তারও পরে তারা গ্রামে থাকে না এবং শেষে ফিরে আসে কোনও এক সুসংবাদ নিয়ে। সেদিন লতু মোল্যার দোকানে তারামিয়া কোন এক বেখেয়ালে এরকম ঘটনা আঙুলে গোণে - তালিকায় অনেক আগে তুলশীপাড়ার মন্দির ভাঙ্গা, সুবিদালীর মেয়ে স্কুল থেকে না ফেরা, আলাউদ্দিনের পুকুরের মাছ চুরি, বার্ষিক নাটকের রাতে নবতরুণ ক্লাব ঘরে আগুন লাগা উঠে আসে। পাশ থেকে রং মিস্ত্রি জেবালাম্মদ মনে করিয়ে দেয় - নুরুল হুদার বৌ উত্তরদীঘির বশিরের সাথে ভেগে যাওয়া এবং তৈয়বালীর বিদেশ যাওয়ার আগেরদিন পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা। এইসব ঘটনা অথবা সমস্যা সমাধানে এলাকার মাথা হিসাবে সবার প্রথমে কালাম মেম্বরের কথা মনে পড়ে, মনে হয় - একমাত্র কালাম মেম্বরই এসব সমস্যার মিটমাট করতে পারবে। অথচ এলাকাবাসী বিষ্ময় নিয়ে বারবার দেখে এসব ঘটনার সময় অথবা পরে কালাম মেম্বর বাড়ী নাই। ছুট্টো মিঞাও নাই, মাঝে মাঝে সুজিত সাহাও নাই। ঘটনা দূর্ঘটনার হিসাব ডান হাতের কড়ে রেখে তারামিয়া এবং জেবালাম্মদ অন্য হাতের আঙুলে আনন্দের সংবাদগুলোর হিসাব রাখে - এলাকায় ইলেক্ট্রিসিটি, সবার জন্য ৩ কেজি গম, স্কুল ভবনে রং করা, অথবা মসজিদে দু'দফায় কার্পেট, ফ্যান আর মাইকের আচমকা আগমন - এইসব লেনদেন গোণা শেষ হলে তারামিয়া এবং জেবালাম্মদ একে অন্যের দিকে তাকায়, চোখে কিছু ইশারাও হয়তো দেয়, তারা কী বলে সেটা কেবল তারাই বুঝে, লতু মোল্যা বুঝে না - হয়তো বুঝে, কিন্তু না বুঝার ভান করে - এবং শেষে দোকানের সামনে টুং-টাং ঘন্টা বাজিয়ে চলে যাওয়া কটকটিঅলার দিকে তাকায়।

পাঁচ.
এরকম অনেক কিছু অনেকেই ভাবে, এবং খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয় - নীলুফার গত তিন বছর 'কমলতলা এতিমখানা ও মহিলা মাদ্রাসা'র হোস্টেলে ছিলো। সরকারের এমপি এবং দলের দক্ষিণ জেলা সাধারণ সম্পাদকের সরাসরি তদারকী থাকায় অনুমান করা যায় - নীলুফার তিন বেলা খাবার পেয়েছে, বৃষ্টি বাদলায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। তাহলে নীলুফার মারা গেলো কেনো? এবার এ প্রশ্নে এলাকার কেউ কেউ কপাল কুঁচকায়। নীলুফারের কী কঠিন কোনো অসুখ ছিল, সেটা গোপন ছিলো বলে টের পায়নি এবং আচমকা মারা গেলো এই শুক্রবার রাতে? মরার আগে নীলুফার কী বলেছিলো, সে কি কাউকে দেখতে চেয়েছিলো অথবা কিছু খেতে চেয়েছিলো? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব আমরা, কমলতলা ইউনিয়নের লোকেরা, জানি না। তবে লতু মোল্যার দোকানে সামসুদ্দিনের ভাতিজা খবর দেয় - নীলুফার রাতে ঘুমের ঘোরে মারা গেছে, তার হাত দুটো সোজা করা ছিলো, চোখ দুটো বোঁজা ছিলো, মুখে হাসি ছিলো। এতিমখানার সুপারভাইজর, কালাম মেম্বরের স্বামীহীন বড় বোন, মোছাম্মাত জয়নাব বেগম এ কথা জানায় যে - নীলুফার আগের রাতে এশারের নামাজ পড়ে, ভাত খেয়ে নিয়মমতো বিছানায় গিয়েছে, রাতে কোনো শব্দ করেনি, এবং আরেক ছাত্রী আছিয়া সকালে নীলুফারকে নামাজের জন্য ডাকতে গেলে দেখে নীলুফারের শরীর বরফ শীতল হয়ে আছে। ক্রমশ: ডাকাডাকি-ধাক্কায় নীলুফারের মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হয় কমলতলায়, গরীব কৃষক সালামাতুল্লার বাড়ীতে, তুলশীপাড়া থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিক্ট রোডের ফোনের দোকান পর্যন্ত।

সেই থেকে আমরা নীলুফারের মৃত্যুর সাথে কালাম মেম্বর - ছুট্টোমিঞা এবং সুজিত সাহার সংযোগ খুঁজি। এতিম খানায় তাদের যোগাযোগ কেমন ছিলো, তারা কখনো নীলুফারের সাথে বাতচিতে গিয়েছিলো কিনা, নীলুফারের অন্য সখীদের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করি। এখানে আমরা কিছু গোপন ফিসফিসানি শুনি - কালাম মেম্বর মাঝ রাতে এতিমখানায় যেতো - তবে সত্যতা জানতে জয়নাব বেগমকে আমরা জেরা করতে পারি না। কেউ কেউ সালামাতুল্লাহকে ডেকে জিজ্ঞেস করে গত তিন মাসে তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব হয়েছে কিনা। এরকম জীবন্ত একটা মেয়ে রহস্যজনকভাবে মরে যাওয়ার পরে কোনো পুলিশ এলো না সেটা নিয়ে আমরা কথা বলি। লতু মোল্যার দোকানে এসব আলাপ থামায় আলাউদ্দিন, বলে - গরীবের মেয়ে মারা গেলে কোর্ট কাঁচারি খরচ চালাবে কে? এরপর আমরা নিশ্চিত হই - খুন কিংবা হত্যা নয়, এখানে দৃশ্যমান কোনো শত্রু নেই, অতএব - নীলুফার অজানা কোনো অসুখে মারা গেছে।

এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেও আমরা, কমলতলার লোকেরা, কালাম মেম্বর-ছুট্টোমিঞা এবং সুজিত সাহার উপর নিয়মিত চোখ রাখি। কিন্তু এবার তারা এলাকা ছাড়া হয় না - তাদের দেখা যায় কমলতলা বাজারে সুজিত সাহার আড়তে, প্রাইমারী স্কুলের মাঠে আর পরের জুম্মার জমায়াতের প্রথম সারিতে। তবুও আমরা অপেক্ষা করি - কখন তারা এলাকা ছাড়া হবে এবং নতুন একটি সুসংবাদ নিয়ে ফিরে এসে আমাদের মুখে হাসি এনে দিবে।
.
.
.

Read more...

24 March, 2008

ধূলিমাখা চাঁদের ডাক...

তাকে ডেকেছিলো ধূলিমাখা চাঁদ,/মধ্য দুপুর;/বুকের মাঝে হিম সন্ধ্যার/নিথর পুকুর। সেজুঁতির জন্য এ কবিতা লিখেছিলো দীপু। কথা ছিলো - পহেলা বৈশাখে কবিতা ব্লক করা শাড়ী পরে সেজুঁতি ক্যাম্পাসে আসবে। কথা ছিলো - 'উচ্ছ্বাস' নামের সংগঠনের ব্যানারে উৎসবে মাতবে একদল তরুণ প্রাণ।

এ আয়োজনের পরিকল্পনায় মিটিং ডাকে - আপাত: রাজনীতির বাইরে সিনিয়র-জুনিয়র কিছু ছেলেমেয়ে, এদের কেউ বিতার্কিক, কেউ গায়ক, গীটার বাদক, নীরব কবি এবং সবাই নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। উৎসব আয়োজনে অভিজ্ঞ, সম্প্রতি রাজনীতি ছেড়ে দেয়া, আনিস আসে মিটিংয়ে - উপন্যাসের শুরু এখানে। ক্যাম্পাসে আনিসের প্রবেশ থেকে মিটিং রুমে আসার বিবরণ বেশ দীর্ঘ। ক্যাম্পাসে আনিস হাঁটে, ক্যান্টিন পার হয় - আনিসের মাথার ভেতর বয়ে চলা তড়িৎ চিন্তার সাথে পাঠক জানে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক হালচাল, কোন্দল আর গুটিচাল। বিক্ষিপ্ত এসব বিবরণে একটু ক্লান্তি আসে, তবে ততক্ষণে পাঠক হয়ে উঠে উচ্ছ্বাস'এর একজন।

এরপর মনে হয় - উপন্যাসের মূল চরিত্র আনিস নয়, দীপু। দীপুর মা মারা গেছে, ভাই বোন নেই, বাবা নিরুদ্দেশ। চাচা-চাচীর সংসারে অনাকাঙ্খিত জীবন, টিউশনি করে চলা এবং উচ্ছ্বাসের জন্য মন-প্রাণ নিবেদনে দীপু পাঠকের আপন হয়ে ওঠে দ্রুত। অথচ কোনো কিছুই দীপু ঠিকমতো করতে পারে না, অস্থিরতায় কিছু ভুলচুক থেকেই যায় এবং নীরবে কান্না ঢাকে। এখানে কাহিনী ক্রমশ: দীপুকে ঘিরে চলতে পারতো, তা না করে আমরা দেখি - আবার আনিসের প্রাধান্য। কারিশমায় আনিস ছাড়িয়ে যায় দীপুকে; গল্পের সুপারম্যান নয়, বরং ঠান্ডা মাথার দূর্দান্ত যৌক্তিক এক মানুষ আনিস - শান্ত অথচ ব্যস্ত হিরো। আনিসের দর্শন আর ভাবনা আসে ঘটনা পরম্পরায়। নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা আর তাৎক্ষনিক বুদ্ধিমত্তার মিশেলে পরপর দু'বার কলেজ প্রিন্সিপাল থেকে উৎসবের অনুমতি আদায় করে নেয় আনিস। অথচ তার চারপাশে তখন পথ আঁটকায় প্রশাসনিক বেড়াজাল, রাজনৈতিক ক্যাকটাস, যেখানে প্রিন্সিপাল-বদরুল-ফয়েজ-তৌহিদ একই রকম। জটিল রাজনৈতিক হিসাবের গরমিল খাতে পড়ে উচ্ছ্বাস উৎসব।

এরপরও আমরা দেখি - বর্ষবরণের আয়োজন চলে। কাহিনী ডালপালা ছড়ায় লতার মতো - প্রিয় ক্যাম্পাসে, নিজস্ব পরিসরে ধীরলয়ে - অহেতূক ঘটনা বৃদ্ধিতে যায়নি। কেবল মোরশেদ চরিত্রটিকে মনে হয়েছে লেখক বড্ডো অযতনে ভুলে গেছেন কিংবা বেশি যতনে শোপিচ করে রেখেছেন। ভারতে পড়ালেখা করা মোরশেদ অ্যাকাডেমিক মানুষ, গ্রাফিক্স ভালো বুঝে, নিজে লিটিলম্যাগ বের করে, সাহায্যপরায়ণ লোক - যে দীপুর সাথে মজা করে চা খায়, কবিতা নিয়ে জ্ঞান দেয় - অথচ উপন্যাসের মূল স্রোতের বাইরে থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। মোরশেদ কি তবে জনবিচ্ছিন্ন তাত্ত্বিক গুরুদের ছায়া চরিত্র!

দিনের ক্যাম্পাসে উচ্ছ্বাস কর্মীদের ছোটাছুটি, দীপু-সেজুঁতির খানিক কাছে আসা আর মাঝরাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে সৃষ্টির আনন্দে কাজ করে কিছু চিত্রশিল্পী - শাহআলম, আপেল, সেতু, দীপুসহ অন্যরা। সে রাতে হুমকির আচঁড় কাটতে চায় তওহীদ - ধর্মের নষ্ট ব্যবহারে বিষন্ন হয় মান্না, কষ্ট পায় দীপু এবং পাঠক। ঘোলাটে সময়টা তখন রাতে আরেকটু স্পষ্ট হয়।

এ আঁধার আর কাটে না। বুক পকেটে ধুলিমাখা চাঁদের কবিতা ডাক নিয়ে সেজুঁতির খোঁজে ক্যাম্পাসে যাওয়া দীপু সেজুঁতিকে পায় না, বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে ফয়েজদের সাথে। পড়ন্ত বিকেল, সন্ধ্যা শেষে রাত আসে, দীপু ঘরে ফিরতে চায় অথচ ফিরতে পারে না। পরদিন চারপাশে নীরবতা আর ঘনিয়ে আসা একরাশ অন্ধকারে একাকী দাড়িয়ে থাকে আনিস।

উপন্যাসের পরিশিষ্টে জানা যায় - সিলেট এমসি কলেজের সত্য ঘটনা অবলম্বনে এ কাহিনী লেখা। বোধ করি - সে জন্যই লেখক পুরো আখ্যানে সময়কে নয়, ঘটনাকে ধরতে চেয়েছেন। এবং গতিময় গদ্যে একটি ছিমছাপ উপন্যাস পাঠককে উপহার দিয়েছেন।

টুকটাক কিছু বানান বিভ্রাট দ্রুত গতির এ গল্পে এড়ানো যায় সহজেই, তবে একই মলাটে উপন্যাসের নামে ডেকেছিল/ডেকেছিলো - ধূলিমাখা/ধুলিমাখা একটু চোখে লাগে।

এক সময়কার রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষ, সৌখিন (!) সাংবাদিক, জনপ্রিয় ব্লগার আরিফ জেবতিক তাঁর নিজস্ব ধাঁচে আগামীতে আরও বড় আখ্যান নিয়ে হাজির হবেন আমাদের সামনে এমনটিই আশা করছি। তবে "তাকে ডেকেছিল ধূলিমাখা চাঁদ" পড়ার পরে পাঠকের প্রত্যাশাটি দাবী হয়ে যায়!

.
.
.

Read more...

23 March, 2008

শহীদুল জহির আর নেই!

শহীদুল জহিরের নাম প্রথম শুনি আরমান মুরাদের মুখে। কিছু ভালো উপন্যাসের তালিকার তিনি লিখেছিলেন - আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস সমগ্র, মাহমুদুল হকের 'কালো বরফ' এবং শহীদুল জহিরের 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল'।

আরো পরে, বছর পেরিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস হাতে পেয়েছিলাম, তবে 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল' পাইনি। গত বই মেলায়ও ফরমায়েশ ছিল, যাকে বলেছিলাম তিনি খুঁজে পাননি। অনলাইনে পড়ে নিয়েছি সামান্য কিছু বর্ণনা।

এর মাঝে শহীদুল জহিরের লেখা পড়ার আগ্রহ জাগে অন্য কারণে। ২০০৬এ এটিএনে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নাটক "কোথায় পাবো তারে" ছিলো শহীদুল জহিরের ছোটোগল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। নাটকে দেখা যায়, 'কোথায় পাবো তারে' গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে মিল পায় পুরান ঢাকার নবাবপুরের একদল লোক। মহল্লার আব্দুল আজিজ ব্যাপারী ঠোঙায় করে গরম ডালপুরি কিনে ফেরার পথে আব্দুল করিমের সাথে দেখা হয়, এবং আব্দুল করিম বলে - "ডালপুরির মধ্যে ডাল নাই, হুদা আলু।" আশ্চর্যজনকভাবে এই আব্দুল করিমও তার ময়মনসিং ফুলবাড়ি আকুয়া নিবাসী অদেখা বান্ধবী শেফালীর গল্প জুড়ে সবার সাথে, এবং মহল্লার সবাই দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। আজিজ ব্যাপারীর ছেলে দুলাল মিয়া যখন শহিদুল জহিরের "ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প" পড়তে গিয়ে - কোথায় পাবো তারে গল্পে নিজেদের খুঁজে পায়, তারা তখন অস্থির হয়ে উঠে। মতিন প্রফেসরের সাথে কথা বলে তারা ৩৬ বাংলা বাজার, মাওলা ব্রাদার্সের অফিসে গিয়ে শহিদুল জহিরকে খোঁজ করে, এবং গল্প ও বাস্তবের গোলকধাঁধায় চক্কর খায়। নাটকটি এখানে শেষ।

জীবনে দেখা অনেক নাটকের মতো এটিও হারিয়ে যেতে পারতো, কিন্তু হারায়নি - কারণ ব্লগের এক তর্কে আমি এ নাটকের রেফারেন্স টেনেছিলাম যথাযথ ভাবে, এবং প্রয়োজনটা ছিলো মারাত্মক। মাঝে মাঝে সময় পেলে এর মাঝে "কোথায় পাবো তারে" আরো বেশ ক'বার দেখেছি। এবং এবারের বইমেলায় শহিদুল জহিরের বই খুঁজেছি বেশ। উপন্যাস পাইনি, মাওলা ব্রাদার্স থেকে কিনলাম - "ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প"। মোট সাতটা গল্প।

ঐ রাতেই পড়লাম - 'কোথায় পাবো তারে'।
পরদিন 'আমাদের বকুল'।
ভাষার ভিন্নটা থাকলেও শহীদুল জহিরের গল্প আমাকে কাবু করে ফেলে। পড়ে যাই, পড়ি আর পড়ি। মনে হয় - এটা আবার গল্প কি? এটা তো নিছক বর্ণনা। কিন্তু না - পরে মনে হয়, কথার গভীরে অন্য কথায় শহিদুল জহিরের গল্প বলার এ কারিশমা আর কারো নেই।
পাতায়া এসে পড়েছি - 'প্রথম বয়ান', 'মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা', পরশু রাতে পড়লাম 'ডলু নদীর হাওয়া'। আরও দুটি বাকী। পড়বো কাল অথবা পরশু কিংবা তারপর দিন।

মাঝে মাঝে দু:খ লাগে, অনেক জরুরী সময় অলেখকদের বই পড়ে নষ্ট করেছি। কলেজে বাংলার প্রমীলা ম্যাডাম বলেছিলেন - এই বয়সে নজরুল-রবীন্দ্রনাথ-শরৎ শেষ করার কথা। কিছুই হয়নি। বাণিজ্যের ছাত্র হয়ে - মার্কেট সেগমেন্টেশন আর স্ট্র্যাটেজির পাশাপাশি গদ্য লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করি। এখনো শিশু শ্রেণীতে পড়ে আছি। এমন পাঠকের কাছে শহীদুল জহির এক নতুন মোহ।

চলমান মোহের মাঝে আজ দুপুরে খবর পেলাম, শহীদুল জহির আর নেই। এখন তাঁর নামের পাশে লেখা থাকবে (১৯৫৩-২০০৮)।

ব্যাখ্যাতীত ভালো লাগা লেখক আমার - প্রিয় শহীদুল জহির।
.
.
.

Read more...

15 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - শেষ : এই নীল নির্বাসন

ঢাকা ফিরতে দেরী হয়ে যায়। কারণ, অনেকগুলো সামাজিক দেখা সাক্ষাতে যেতে হয় এবং গিয়ে লক্ষ্য করি - এক মধ্য প্রজন্মে আমি দাঁড়িয়ে। চাচা-চাচী, খালা-খালু যারা এতদিন আমার প্রিয় মানুষ, আমি যাদের অতি স্নেহের; মনে হলো তাঁরা সবাই শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কথায় আচরণে নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা প্রাধান্য পায়। বিপরীতে নতুন এক প্রজন্ম আমাকে মামা কাকা ডেকে কাঁধে চড়তে চায়। বুঝতে পারি, এখন চকলেটের লোভ আমার নয়, বরং পকেট ভর্তি চকলেট রাখতে হবে নতুন কথা শেখা এ শিশুগুলোর জন্য।

চট্রগ্রাম থেকে বিদায় নেয়া শুরু করি। প্রিয় মানুষগুলো দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় দেয়। গেইটটুকু পেরুতে আমি চারবার পেছনে তাকাই। বুকটা ভার হয়ে আসে। একইভাবে ক্যান্সারাক্রান্ত খালু বিকেলে আমাকে ফিরতে দেয় না। ধমকে বসিয়ে রাখে রাতের খাবারের জন্য। আমিও ঘড়ি দেখি, রাত বেড়ে যাচ্ছে, আরেকটু বসি বসি করে বের হতে হয়। পাকা রাস্তা পর্যন্ত টর্চ জ্বালিয়ে খালু আসেন আমার সাথে। রিক্সার জন্য অনেক অপেক্ষা করে তাদেরও ছেড়ে আসি। অন্ধকার রাস্তায় পেছনে কিছু দেখা যায় না। আকাশে অগণন তারা। চোখ দুটো কচকচ করে ওঠে। আলবাব ভাইকে ফোন করে কথা বলি ভিন্ন প্রসঙ্গে।

-

ঢাকা ফিরে আমার হাতে সময় আড়াই দিন। অনেকগুলো কাজ জমে আছে। অনেকের সাথে এখনও দেখা বাকী। সবার আগে দরকার প্লেনের টিকিট রি-কনফার্ম করা। কারওয়ানবাজার ঘুরে শেষে উত্তরা যাই প্লেনের টিকিট আনতে। শুনি - টিকিট আনতে লোক গেছে মতিঝিলে, পথে ভীষণ জ্যাম। দেরী হবে। দেরী হয়। পত্রিকা রিপোর্ট করেছে - বিশ্বের নোংরা শহরের তালিকায় ২য় স্থানে ঢাকা। আমার বিশ্বাস হয় না। কোটি মানুষের এ ভীড়, রাস্তায় দলবেঁধে হেটে যাওয়া শ্রমিকদল। বুকে শিশু আগলে রাখা ভিখারীনি মা'য়ের এ শহর নোংরায় ২য় হতে পারে না, কোনোভাবেই না।
দুপুরে বাসায় খাবো। জ্যামে বসে থাকি। দেখি বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। আকাশ ঢেকে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনে।

শহরের তরুণ-তরুণীগুলো মন খারাপ নিয়ে বসে থাকে। ওয়েটিং ফর গডো? আকাশ ঝেপে ডিজুস বৃষ্টি নামে। এসএমএস বৃষ্টি। এ বসন্তে ডিজুস বৃষ্টিতে ভেজাবেই ভেজাবো - মাত্র দশ টাকায় পাঁচশ এসএমএস। ইয়েস লিখে থ্রি জিরো থ্রি জিরো নম্বরে পাঠাও। উনত্রিশ পয়সা আর পঁচাত্তর পয়সা মিনিটের নানা প্রলোভন। টিভির পর্দা ছাড়িয়ে এ বিজ্ঞাপন লেপ্টে যায় বিআরটিসির বাসে। লাল শর্ট কামিজ আর নীল জিন্সের তরুণীরা বিজ্ঞাপন থেকে বেরিয়ে আসে। রাজলক্ষী মার্কেট, মাস্কট প্লাজা, কিংবা চলতি পথে এমন সাজসজ্জার উঠতি কিশোরী তরুণী চোখে পড়ে। জিন্স এখন তুমুল ট্রেন্ড। কলারঅলা কামিজ, থ্রি কোয়ার্টার হাতা, গুছানো ওড়না কিংবা শাড়ীতে বেগম রোকেয়া রমণীরা কোথায় হারালো! বিউটি পার্লারের তোড়ে এখন আন্টি-আপু বোঝা দায়। ছেলেগুলো কানের কাছে ইয়ার-প্লাগ। হয়তো এফএম। হাবিব ফ্যাশনের কথা আগের পর্বে বলেছিলাম। আপাদমস্তক হাবিব হয়ে হাঁটছে অনেকে। কে জানে হয়তো রেস্তঁরায় গিয়ে জিজ্ঞেস করছে - "ভাই শাধা ভাত আর মাছ হবে?" এবি ব্যাংকের বিজ্ঞাপন। এক সময় মামা-চাচা কিংবা বাবা-মার হাত ধরে সন্তানেরা মিডিয়ায় সিঁড়ি বাইতো। এখন ছেলের বদৌলতে বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদও নতুন জীবন পেয়েছেন। বাবা ছেলের বিজ্ঞাপন, অ্যালবাম। কোথায় সেই গান - 'ডেগের ভিতরে ডাইলে চাইলে উতরাইলে গো সই, সেই উতরানি মোরে উতরাইলি'। এফএম চ্যানেলেও এসব গান নেই। বালামের এক মুঠো রোদ্দুর এখন তুমুল জনপ্রিয়। মিরপুরে-উত্তরায় হাঁটতে গিয়ে খেয়াল করেছি দোকানগুলোয় এফএম রেডিও বাজছে সজোরে। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে আগে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ভেসে আসা সাড়ে সাতটায় সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দূর্বার কিংবা জনসংখ্যা পরিকল্পনা কার্যক্রম - এসো গড়ি সুখের ঘর আর শোনা যায় না। পড়ন্ত বিকেলে চা'য়ের দোকানে আব্দুল জব্বারের 'তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়', রাস্তায় রিক্সার টুং টাং শব্দ বিলীন। আরজে'দের খলবলানিতে অনেক স্মৃতিময় ভালোলাগা হারিয়ে যাচ্ছে।

যানজট এড়াতে মহাখালী ফার্মগেট এড়িয়ে টঙ্গী - আশুলিয়া বেড়ী বাঁধ ধরে বাসায় ফিরি। লম্বা পথ, রাস্তা ভালো না তেমন, এরপরও ভালো লাগে - ফাঁকা রাস্তা। দুপাশে আবাসিক প্রকল্প গজাচ্ছে। খানিক গরমেও চলতি পথের বাতাস ভালো লাগে। আরেকটু আগাতেই চোখে পড়ে প্রেমিক জুটি। কেউ কেউ স্কুল-কলেজ ইউনিফরমে; কমার্স কলেজ - হলিক্রস - ভিএনসি চেনা যায় সহজে। রাসনা মিনি রেস্টুরেন্ট - খোলা জমির ওপর ভাসমান কেবিন, এক পাশ কাপড়ে ঢাকা। শহরে ডেটিং স্পটের বড়ো সংকট। আচমকা চোখ আঁটকে যায় - মূল রাস্তা থেকে নেমে যাওয়া খানিক নিচে - গোলাপী স্কিন টাইট টি-শার্ট ফুঁড়ে ওঠা বক্ষ, গুটানো প্যান্ট - কালো চশমায় ফটো সেশনে ব্যস্ত সোমত্ত তরুণী, পাশে ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত তিন চার জন। খানিক দূরে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে দশ বারো জনের খালি গায়ের উশকো চুলের কিশোর। রাস্তায় দাঁড় করানো ফিয়াট কিংবা পাজেরো কিংবা অন্য কিছু , যার দরজা থেকে এক সুঠাম তরুণ নেমে নিচে যাচ্ছে। ঘাঁড় ফিরিরে আর দেখা গেলো না। রিক্সা আসতেই আমার চোখ চলে যায় সেদিকে। ছোটো হয়ে আসছে পৃথিবী, ছোটো হয়ে আসছে রিক্সা, প্রেমিক-প্রেমিকারা আরও কাছাকাছি বসতে আরও ছোটো হয়ে আসুক। চুমুগুলো আরও নিরাপদ হোক।
ধ্যুত, আমি বোধ হয় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাচ্ছি কিংবা হিংসুটে।

-

মান্নার মৃত্যু তখনও টক অব দ্য টাউন। সনি-জোনাকী-আনন্দ সিনেমা হলে মান্নার ছবি; অবুঝ শিশু - শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেয়ালে দেয়ালে বিজ্ঞাপন। শোক - আত্মার শান্তি কামনা। টিভি চ্যানেলে বিশেষ স্মরণ তখনও। জানাজার দিন এফডিসিতে পুলিশের বেধড়ক পিটুনি খাওয়া এক ভক্ত আরটিভি-তে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে - 'আসছিলাম এক নজর দেখার জন্য, মান্না ভাই যেমন ডায়লক, তেমন পাইটিং, ড্যান্স - উনার মতো আর বিকল্প নাই'। শোকাহত এ ভক্তের মুখে হাসি। মনে হয় - টিভিতে দেখা যাবে এ আনন্দে হাসি আঁটকানো দায়।

-

অনেক কৌশলে সময় বের করে শেষ মুহুর্তে আজিজে ঢুঁ মেরেছিলাম মুক্তান্বেষা আর সচলয়াতন সংকলনের জন্য। দোকান বন্ধ ছিল।

-

গুলশান-১এ চাংপাই হাউজিং প্রকল্পের পাশে টিনের ঘেরা দেওয়া, ছোটো দরজা। বোঝা যায় না ভেতরে কী। খোলা আকাশের নিচে গোল টেবিলে কিছু আলোকিত মানুষ স্বপরিবারে সাপার কিংবা ডিনার করছে। টেবিলে মেনু সাঁটা। দুপাশে তিনটি দোকান। আমি সাথের বন্ধুকে অনুসরণ করে কোণার কাঁচ ঘেরা দোকানে যাই।
পান-সুপারী।
পানের দোকান। এয়ারকন্ডিশনড। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে সাউন্ড সিস্টেমে। ক্যাশে বসা শহুরে তরুণী। দেয়ালে ঝকঝকে কাঁচে আমার ক্লান্ত চেহারা। সামনে নানান আকারের বয়াম। ভেতরে মশলা পাতি। ঝুলন্ত লাইটে ট্রেডিশনাল পান দোকানের ছাপ। সবুজ জামা, মাথায় পাগড়ী পড়া গাল ভাঙা লোকটি মাত্রাতিরিক্ত হাত পা নেড়ে পান বানাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম - আপনি বাংলাদেশের মানুষ?
- না।
- তাহলে, কোথাকার?
- বেনারস, ইন্ডিয়া।
আমি হাসলাম, পান বানারস-আলা।
বললাম - এ কাজের জন্যই বাংলাদেশে আসছেন?
- হ্যাঁ, আমরা মোট নয় জন আছি।
- ব্রাঞ্চ কয়টা।
- তিনটা, একটা এটা, আরেকটা ধানমন্ডি, আরেকটা বসুন্ধরা মার্কেটে।
আমি আরেকটু আলাপ বাড়াই। কাদের মালিকানা জিজ্ঞেস করতেই নামটি চেনা চেনা মনে হয়। প্যাকেজ নাটকের শেষে দেখা যেতো। একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিক পত্নী। আমার পান খেতে ইচ্ছে করলো না। সাথের দুজন খেলো। দাম এক যোগ এক সমান দুই। না, দুই টাকা না। দুই ডলার।
একটা পান সত্তর টাকা।
সত্তর টাকায় পান খাওয়াটা আমার কাছে বিলাসিতার বাইরেও বড়সড় অপরাধ মনে হয়, সবার জন্য না, আমার নিজের জন্য অপরাধ। কারণ, যাদের জন্য এ দোকান তারা ডলারের হিসাবে খুব বেশী মনে করবে না। আমি বরং হাকিমপুরী জর্দায় চমনবাহার মুখে দু'টাকার খিলিতেই ঝুঁকবো, যদি শখ জাগে।
সয়াবিন তেলের লিটার ছত্রিশ থেকে একশ' দশ, চাল তিরিশ থেকে আটচল্লিশ, মধ্যবিত্ত জীবন হাঁফিয়ে উঠছে ক্রমশ:, সেখানে সত্তর টাকায় পান খাওয়ার আগে আরেকবার ফিলিপ কটলারের ভোক্তা আচরণ বিধি অধ্যায়টা উল্টাবো, বোঝতে হবে - মাসলোর পিরামিডের কোথায় আমি দাঁড়িয়ে।

-

শেষের দিকের সকালগুলোয় আমার দ্রুত ঘুম ভেঙে যায়। জানালার পর্দা সরিয়ে গ্রীল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। সকালে ঝাড়ুঅলা হাঁক দিয়ে যায় - অই ঝাড়ু-ঝাড়ু-ঝাড়ু। আমার বুকটা ধুক ধুক করে। এরকম আর মাত্র দুটো সকাল, একটি সকাল, তারপর দেশ ছাড়া। ঘন্টা কিংবা মিনিটের হিসাব। আমার হাসিগুলো থেমে যায়, টের পাই বাসার অন্যদেরও থামে। খাবার টেবিলের কথা হৈহল্লা চুপসে আসে। আমার ছোটোভাই ভাত মেখে আচমকা হাত গুটিয়ে বসে থাকে, নীরবতা ভেঙে বলে - 'ভাইয়া তুমি যাইয়ো না'। আমার মায়ের চোখের কোণায় জমা পানি লাইটের আলোয় আরও চিকচিক করে। আমি সব দেখি। বুঝি - বাবার গোপন করা দীর্ঘশ্বাস, এরকম আরও কিছু। একেবারে ঝিম মেরে থাকি। (পরে সম্প্রতি অমিত, অমিত আহমেদের পোস্টে ওর দেশ ছাড়ার আগের রাতের বাসার বিবরণ অনেক মিলে যায় আমার বাসার সাথে। কারণ, মানুষগুলো বাবা, মানুষগুলো মা, মানুষগুলো ভাই, মানুষগুলো বোন, মানুষগুলো আলাদা নয়; আমরা।)

-

এসব নিয়ে দ্রুত সময় কাটে।
সবাইকে ছাড়ার সময় আসে। এয়ারপোর্টে মায়ের হাত ছেড়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো আমি চারাগাছ, ক্রমাগত: শেঁকড় উপড়ে নিজেই হেঁটে চলেছি। গলায় জমাট বাঁধা কষ্ট নিয়ে দূরে সরছি। আড়াল হয় সবাই। মোবাইলের সিম গেছে পাল্টে, নম্বর হারিয়ে তাই সবার কাছে ফোন করা হয় না। দেশে নেমে দুয়েকজনকে আগ্রহ নিয়ে বলেছিলাম - দেখা করবোই করবো। তাঁদের কাছে আমি ভীষণ বিনীত হয়ে ফোন করি। কী করে বোঝাই - সময়গুলো এতো দ্রুত গেলো! মনে মনে লিস্ট করি - কাকে কাকে মেইল করে স্যরি বলতে হবে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে একটানা ফোন করি - স্মৃতিহীন দাদী বলে, "তুমি আসবা বলে কই গেলা? কখন আসবা?"
আমি কী জবাব দিই! শুধু বলি - 'কিছুদিন পর আবার আসবো।'
দাদু বলে - 'আল্লাহ ভরসা, ঠিক মতো আইসো'।
টিভিতে বাংলাদেশ-সাউথ আফ্রিকা ওডিআই। মাত্র বাংলাদেশ অলআউট হলো একশ আটাত্তর নাকি সাতাত্তর।
খালেদ মাহমুদ সুজন - চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফতের বিশ্লেষণ শেষে সংগীতানুষ্ঠান; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান। আপেল মাহমুদ গাইছে - 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি'। প্লেনে ওঠার ডাক পড়ে। টিভিতে তখন - 'আমরা তোমাদের ভুলবো না।'

মধ্য দুপুরে রানওয়েতে এতো রোদ ছিলো কিনা জানি না। নাকি আমার ভারী চোখে সব কড়া লাগছিলো! অসহ্য সব কিছু। টিজি থ্রি টু টু; শোঁ শোঁ শব্দে উড়াল দেয়। জানালায় তাকিয়ে দেখি; আমার প্রিয় শহর, প্রিয় রাস্তা, প্রিয় ঘর; এর কোনও একটির মাঝে আমার শেঁকড়।

-

ক্রমাগত বিরক্তিকর এবং আশ্চর্যজনকভাবে আপন হয়ে আসা এ পর-শহরে আমি ফিরে আসি। মনটা ভারী থাকে। এ ভার কাটাতে ব্লগে শুরু করি বিগত দিনলিপি, বকেয়া পোস্ট। আজ এক সপ্তাহ পরে মনে হলো - কাদা মাটির মনটা একটু শক্ত হয়েছে, আরও ক'দিন গেলে পাথর হয়ে উঠবে, পাথর করে নেবো।
এবং এভাবেই এ সিরিজ পোস্টের বকেয়া শোধ হলো।
.
.
.

Read more...

11 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - ২ : ঢাকা টু চট্টগ্রাম

সেই বিকেলে মাথা হাল্কা লাগলে ঘর থেকে বের হতে মন চায়। দুই নম্বর স্টেডিয়ামের উল্টোদিকের এক্সপ্লোরার সাইবার ক্যাফে বন্ধ হয়ে গেছে। হেঁটে হেঁটে সোজা মীরপুর দশ নম্বর। আগে একটা সাইবার ক্যাফে ছিল নতুন মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেটাও নেই। সিরাজী সাইবার ক্যাফে বেশ বড়সড় ছিল, এবার খুঁজে পেলাম না। আবার সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার নতুন এক্সপ্লোর ক্যাফে। উদ্দেশ্য মেইল চেক করা। পাঁচ ছ'টা মেইল জমে আছে। জরুরীগুলোর জবাব দিয়ে শেষ করতেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। ইউপিএস আছে, পাঁচ মিনিটের ব্যাক আপ। সব অ্যাকাউন্ট সাইন আউট করে বেরিয়ে আসি। সিঁড়ি অন্ধকার, মোবাইলের টিমটিমে আলোয় নিচে নামি। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে।

চিরায়ত মিরপুর দশ। হকার বসেছে এখানে ওখানে। টুথব্রাশ - শার্ট প্যান্ট - শাল - চাদর। চশমা, মোবাইল কভার। পাশে পঁচিশ টাকার উপন্যাস; মোহাম্মদ খায়রুল বাশারের "তোমাকে ভালাবাসা আমার ভুল ছিল"।
সুইট এসএমএস গাইডও বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ পাতা উল্টে দেখে নিচ্ছে।
বামে ফুলের দোকান। রজনীগন্ধার স্টিকগুলোকে সাজানো হচ্ছে। বাসের হর্ণের শব্দে মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে আসে।
পনেরো নম্বর রুটের বাস সায়েদাবাদ-মতিঝিল-ভাষানটেক; আমার এক সময়কার নিত্যযাত্রা। এক নম্বর রুট মীরপুর-গুলিস্তান বাসের পেছনে গেইট লক সার্ভিসও চোখে পড়লো। রাস্তা পার হতে গিয়ে নামটি ভুলে গেলাম। আর মনেই পড়লো না।

রাস্তার ওপাশে ক্যাফে মীরপুর। সাতানব্বই-আটানব্বই সালে এককাপ চা'য়ের দাম চার টাকা ছিল। খুব আয়েশী হলে ঢুঁ মারতাম, সাথে হালিম অথবা মোগলাই পরোটা পনেরো টাকা। এবার যাওয়া হলো না। ক্যাফে মীরপুরের সামনে পত্রিকা স্টল। সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের ভালোবাসা সংখ্যা নতুন মোড়কে বেরিয়েছে - 'মৌচাকে ঢিল'। এক সময়কার বন্ধ হওয়া রম্য সাপ্তাহিকটি কি আবার চালু হয়েছে?
পাশে সাপ্তাহিক ক্রীড়া জগত, সাপ্তাহিক২০০০, আনন্দভূবন, মনোজগত, তারকাছবি। প্রচ্ছদে - "পূর্ণিমা ইন, শাবনুর আউট"। এখানেও এসএমএস গাইড। বইয়ের প্রচ্ছদে বাংলা ছবির নায়িকা।
এক সময়কার হাতছানি দেয়া সানন্দসম্ভার কিংবা রোগজিজ্ঞাসা চোখে পড়লো না।

চৌরঙ্গী মার্কেটের পাশে বাসায় ফেরার রিক্সা দরদাম করি। গতবারও ভাড়া ছিল ছয় টাকা, রিক্সাঅলা চাইলো দশ টাকা। ভাবলাম - দুর্মূল্যের বাজারে ভাড়া বাড়তেই পারে। আমি, পুঁজিবাদের ছাত্র, ভারসাম্য বিন্দুর প্রত্যাশায় আট টাকা বলি। রিক্সাঅলা বললো - চলেন। রিক্সায় চলতে চলতে পুরনো সব ঘ্রাণ নাকে আসে। মনে হচ্ছে, এই তো ওয়ারদা ক্লিনিক বামে রেখে ভিলা ম্যাগনোলিয়া পেরিয়ে বাদাম খেতে খেতে দোস্ত পরাগের বাসা থেকে বাসায় ফিরছি। কাল কী কী ক্লাশ আছে ভাবছি। পথে মীরপুর দু'নম্বর বাজারে বিশাল ব্যানার। "বার্ড ফ্লু'তে আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা। সঠিকভাবে রান্না করা মুরগীর মাংশ এবং সেদ্ধ করা ডিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রচারে ঢাকা সিটি করপোরেশন"।

বাসার মোড়ের রাস্তায় রিক্সা থেকে নেমে দোকানে সাজানো সেভেনআপে চোখ যায়। দুপুরে গরুর গোশত খেয়ে স্প্রাইট খেতে ইচ্ছে করছিলো। দু'লিটার সেভেন আপ সত্তর টাকা। দেড় বছর আগেও পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা ছিলো। বোতলের উপরে কোথাও দাম লেখা নেই। পুঁজিবাদের ছাত্র, শিখছি নিত্য।

-

পরদিন সকাল সকাল বাসা থেকে বের হই। সায়েদাবাদ থেকে চট্রগ্রামগামী ইউনিক সার্ভিস। সকাল ন'টা পনেরো। বসেছি ডানের সারিতে জানালার পাশে। আমার সামনে এক তরুণ-তরুণী। স্বামী স্ত্রী কিংবা ভাই বোন কিংবা অন্য কিছুও হতে পারে। বাম পাশের সারিতে অপেক্ষাকৃত সুদর্শন তরুণ-তরুণী। এবং আমি নিশ্চিত তারা স্বামী স্ত্রী কিংবা আরও ঘনিষ্ঠ কেউ। কারণ পুরুষটি তরুণীটির কাঁধে হাত রেখে বসেছে। তরুণীটির হাত পুরুষের উরুতে। এবং মিনিট খানের পরপর তাদের দু'জনের হাতের স্থান পরিবর্তন হচ্ছে। পারষ্পরিক স্পর্শে ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ পাচ্ছে। (প্রিয় ধুসর গোধুলী, আপনি ভাববেন না - আমি চোখ ছানাবড় করে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। মন্দ লোকেরা বলে - এমন দৃশ্য আমি অনায়াসে নব্বই থেকে পঁচানব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। কেবল বিবরণটুকু আপনার মতো করে দিতে পারি না।)
কাঁচপুর ব্রিজ পার হতে না হতেই সামনের সীটের মহিলাটি বমি শুরু করেছে।
টাই পরা পরিপাটি সুপারভাইজর দৌড়ে এলো পলিব্যাগ নিয়ে। নিয়মিত বিরতিতে বমি চলছেই চলছে, থামে না। চান্দিনা পেরিয়েও বমি থামে না। পাশের স্বামী-অথবা ভাই-অথবা অন্য কেউ মানুষটির বিকার নেই। একবার বোধ হয় কথা বললো কিছু। তারপর চুপচাপ। হয়তো এমন বমির ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই অনায়াসে বামে দেখছে - সেই সুদর্শন তরুণীটি তরুণের কোলে মাথা রেখে সীটের উপর পা দুটি গুটিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তরুণটি পরম মমতায় কপালে চুলে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।

মহাসড়কের পাশে বিজ্ঞাপনের বহর।
বাংলালিংক, গ্রামীণ ফোনের চোখ ধাঁধানো সাইনবোর্ড।
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীরগুলো মলিন হয়ে এসেছে। অনেক বছর বোধ হয় রঙের প্রলেপ নেই। পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা কার্যক্রমের দুটো বিজ্ঞাপন মনে রাখার মতো - "বিয়ের পরে দু'জন মিলে সেবা কেন্দ্রে যাও/ আলাপ আলোচনা করে সঠিক পদ্ধতি নাও।"
আরেকটি "মহিলাদের জন্য টিউবেক্টোমি হলো সর্বাধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। কোনও প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।"

চৌদ্দগ্রামে রয়েল হোস্টে বিরতির পর সামনের বমি এবং পাশের ঘুম দুটোই ভাঙে। এবং তারা ক্রমাগত সজোরে কথা বলে। জানতে পারি - বামের মানুষগুলোর গন্তব্য কক্সবাজার-রাঙামাটি। মোবাইলে লাউড স্পীকারে গান শুনছে - আসিফের গান।

ফেনী পার হলে আরেকটি বিশাল বিজ্ঞাপন : "হিরো থাকলে রিস্ক নাই। হিরো।"

এভাবে নানান মুখ-পথ-দৃশ্য পেরিয়ে আমি ছিয়াশি বছরের দাদীর পাশে আসি। স্মৃতি হারানো মানুষটি অনেক কথা শুরু করে। মনে হলো, এই চিনলো আবার চিনলো না। তবুও স্নেহের কতো প্রশ্ন, মমতার ছোঁয়া। এ শেঁকড় ছেড়ে আমি কীভাবে উঠি?

বিয়ের দাওয়াত দাঁত ফসকে গেছে। আজ রাতে বৌভাত। লোকজনের সংগী সাথী হলাম রাত আটটায়। অনেকের সাথে দেখা আট দশ বছর পরে। বরের বাবা সাবেক নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা। তাই পতেঙ্গায় তাদের কী একটা সেন্টারে খাওয়ার আয়োজন। বিভিন্ন নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে খেতে যাই। হল রূমে সাবেক প্রধানদের ছবি। বড় স্ক্রীনে বিটিভি। রাত তখন দশটা। মনে হলো অনেকেই খেয়ে চলে গেছে। আশেপাশে কেবল চেনা কিছু মুখ। খাবারে মেনুতে মুরগী নেই। বার্ড ফ্লু আতঙ্ক। তবে গরুর পাশাপাশি খাসী আছে। বরের বাবা বিশেষ কৌশলে রান্না করা ডাল টেস্ট করার বিনীত অনুরোধ করলেন। মিষ্টি এবং টক মেশানো এ ডাল নাকি নেভী স্পেশাল। আহামারী কিছু মনে হলো না। বরং শেষে বুরহানীর জগ না দেখে কিছুটা হতাশ হলাম।

চট্রগ্রাম শহরের জন্য আমার আলাদা রকম টান আছে। কোনও রাস্তা ঘাট চিনি না। তবুও ভালো লাগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য। ঢাকার তুলনার বাগান মনে হতো। এবার আর সেরকম মনে হলো না। রাত সাড়ে এগারোটায়ও রাস্তায় ধুলো। সংস্কার নেই। বড়চাচার বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। মোবাইলে হঠাৎ এসএমএস, গ্রামীণ ফোন পাঠিয়েছে - "রান্না করা মুরগীর মাংশ ও সেদ্ধ করা ডিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।"
.
.
.

Read more...

10 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - ০১ : আরজে'ময় দিনগুলি

শুরুতেই মোরশেদ ভাইয়ের কথাটা রিপিট করি - "যারা দেশে বসে ব্লগিং করেন,তারা আমার অভিবাদন গ্রহন করুন।" সাইবার ক্যাফেতে জি-মেইল খুলতে ৮ মিনিট, এইচটিএমএল ভিউ। সচলায়তনের ফন্ট পড়া যায় না। ফন্ট সেটিং ঠিক করতে আরও পনেরো মিনিট। এভাবে প্রতিদিন বারবার করা হয়ে ওঠে না। তাই ক্যাফেতে কিশোর কুমারের গান শুনি, অপেক্ষা করি।
দেশ থেকে ফিরেছি রবিবার।
এই মুহুর্তে ভালো লাগছে না কিছু।
মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া গত দিন দশেকের দিনলিপি নিয়ে এসব বকেয়া পোস্ট।
____

হ্যাল্লো, ডিয়ার লিসেনার্স, গুড মর্নিং।
কুল কুল - আমি আর-জে মুকুল আপনাদের সকাল বেলার সংগী হয়ে এসেছি ,
এফ এম - - -।
_

হাই, ফ্রেন্ডজ । আমি আর জে পাঁখি আবার ফিরে এলাম। লাস্ট দু'দিন অসুস্থ ছিলাম, তাই আসতে পারিনি। আমার হাতে এখন একটি এসএমএস , পাঠিয়েছে উত্তরা থেকে সান্তনু। লিখেছে - 'ডিয়ার পাঁখি আপু, তুমি সিক শুনে আমি তোমার জন্য ১২ রকাত নফল নামাজ পড়েছি। তোমার জন্য দোয়া করেছি।'
আর-জে পাঁখি ভীষণ গদগদ । মনে হচ্ছে - এক্ষুণি কান্না শুরু করবে - "মা-ই গঅড! আমার জন্য এত্তো ভালবাসা? আমার জীবনে এরচে' বড় আর কী এচিভমেন্ট হতে পারে? উপ, উমম। ডিয়ার সান্তনু, এতদিন আমার ছোটোভাই ছিলো না বলে দু:খ ছিল। আজ আর সে দু:খ রইলো না। তোমাকে আমার ছোটোভাই করে নিলাম। তোমার জন্য এখন প্লে করছি আমার খুব পছন্দের একটি গান।"
_

ইয়েস, আবারও সময় হলো স্মৃতিকাতর হবার। এসে গেছি আমি আরজে রাজীন। আপনার প্রিয় কোনো স্মৃতি নিয়ে সংক্ষেপে এসএমএস করুন অ্যাসুনাজপসিবল। আমি ফিরছি একটু পরে। ইয়াপ, আমি জানতাম - আপনারা আমার অনেক ভালো ফ্রেন্ডস। তাই, অনেক এসএমএস জমে গেছে। আর কথা বাড়াচ্ছি না - এখন যে এসএমএসটি রিড আউট করছি তা পাঠিয়েছে শ্যামলী থেকে মুনিয়া, লিখেছে - "ভাইয়্যা, তুমি রেডিওতে যেভাবে কথা বলো, বাস্তবেও কি সেভাবেই কথা বলো?"
"হা হা, মুনিয়া। হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন? আমার মাঝে আর্টিফিশিয়াল কিছু নেই। আমি সব সময় এভাবেই কথা বলি। ভনিতা আমার একদম পছন্দ না"
_

হ্যাল্লো বোন-ধুরা, ঘড়ির কাঁটা বলছে এখন রাত দশটা পঞ্চাশ। আমি আর-জে শাকীল প্রতিদিনের মতোই হাজির। একটু আগে এসএমএস পেলাম - মুন্সিগঞ্জ হরেগংগা ডিগ্রী কলেজ থেকে শাহনুর লিখেছে - "আজ আমার মন খুব খুব খুব খারাপ। আজ আমার লাভবার্ড আমার উপর রাগ করেছে। এখন মোবাইল রিসিভ করছে না"
-

ঘড়িতে এখন রাত বারোটা।
এসে গেছেন লাভ-গুরু। সাথে অতিথি আমারদের লিসেনার্স ইশতিয়াক। আচ্ছা, আপনার মনের মানুষের সাথে আপনার প্রথম দেখা কোথায় হয়েছিল?
"কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফিরতে"
"পথে?"
"হাঁ, বাসে?"
"ওয়াও, বাসে দেখা? কোন বাস?"
"সোহাগ পরিবহন।"
_

খবর শুনেছেন নাকি? তাহশানকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। দাড়ান, বাসায় ফোন করি।
- ভাবী, তাহশান ভাই কি বাসায় আছে?
- না তো, বাসায় নেই।
তাহলে বাচ্চু ভাইয়ের ওখানে দেখি - "বাচ্চু ভাই, আপনার ওখানে তাহশান ভাই আছেন?"
- "নাহ, আমার এখানে আসে নি।"
কোথায় গেলো? হাবিব ভাইয়ের বাসায় না তো? "হ্যালো হাবিব ভাই, তাহশান ভাই কি আপনার বাসায় আছে?"
- "তাহশান? আমার এখানে? না তো! কেনো?"
হা হা!
তাহশান ভাইকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া যাবেও না।
প্রতি শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে তাহশান থাকছেন আমাদের সাথে, অনলি অন রেডিও ফুর্তি - - -।
_

মোটামুটি চার পাঁচদিন কাটানোর পর ঢাকায় আমার দিনগুলো এরকম আরজে-ময় হয়ে থাকে। একটা সময় ছিল - বৈদেশ থেকে আসা বন্ধুরা দুয়েক দিনের মাঝে অসুস্থ হয়ে যেতো। সর্দি-কাশি মিশিয়ে ফ্যাশফেশে গলায় কথা বলতো, হাতে টিস্যু পেপার। সে সময় বেশ খোঁচা মেরে বলতাম - 'আহারে, ওয়েদার সুট করছে না।'
এবার আমার অবস্থা হলো সেরকম। সকালে উঠতেই গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। শরীরের তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। দুপুরে বাড়ে আরও খানিক। ঠোঁটের উপর গোটা, লাল চোখ নিয়ে সারাদিন বাসায় থাকি। একদিন-দু'দিন-তিনদিন। নাপা দিয়ে চাপার চেষ্টা। যারা শুনলো, বললো - আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এ অবস্থা, শহরে জ্বর হচ্ছে অনেকের। আলবাব ভাই ফোনে বললেন - 'আরে ঢাকা গেলেই অসুস্থ হয়ে যাই। ব্যাপার না।'

বাংলাদেশ বেতার (সে সময়কার রেডিও বাংলাদেশ) শোনার অভ্যাসে ফিরে এবার এফএম চ্যানেলগুলো ভরসা হয়ে ওঠে। জ্বর নিয়ে চিটাগাং যাওয়া হয় না, বিয়ের দাওয়াতটা মনে হয় দাঁত-ফসকে হয়ে গেলো। প্রতি রাতে ভাবি - সকালে ভালো লাগলেই বাস ধরবো। অথচ সকাল মানেই আবার খারাপ লাগা। তাই কুল কুল আরজে মুকুলের ভয়েস শুনি। এক সময় রাতের বেলা রেডিও'র নব ঘুরিয়ে কোলকাতার আমার১০৬-২এফএম চ্যানেল শুনতাম। কেনো জানি মনে হলো আমাদের ঢাকার আরজে'রা চলনে বলনে কোলকাতার আরজে-দের ফলো করার চেষ্টা করছে ক্রমশ:।
পুরুষ কন্ঠ মানেই একটু ভারী করা হবে। জিহ্বায় জড়িয়ে ভারী করে শব্দ উচ্চারণ করা হবে। এবং অবশ্যই অবশ্যই নি:শ্বাস ফেলতে হবে খুবই কম।
হা-ডু-ডু খেলায় যেমন নি:শ্বাস ফেললেই দান হারাবে, তেমনি আরজে'রা কথা বলার মাঝে নি:শ্বাস ফেললেই চাকরী চলে যাবে।
এক নি:শ্বাসে অনেক কথা বলে আলতো করে ঢোক গিলতে হবে। বোঝাতে হবে, আমি ক্লান্ত (তারা শব্দটিকে টায়ার্ড বলতে পছন্দ করেন)। এরপরও কৃত্রিম ভাব নিয়ে হাসতে হবে। সুইট সুইট কথা বলতে হবে। নেতাদের ভোট চাওয়ার মতো করে এসএমএস চাইতে হবে।
নারী কন্ঠের আরজে'দের তেমন ভ্যারিয়েশন নেই। মোটামুটি নাকের আশেপাশে এনে শব্দ ছুড়ে দিতে পারলেই হবে। বাংলা ইংরেজির জগাখিচুড়ির বিরক্তিকর জ্বলুনিটা আর টানলাম না।
-

শহরে নতুন নতুন ধারা আসে ফ্যাশনে।
প্যান্ট ষাটের দশকের বেলবটম পেরিয়ে বেগী কিংবা স্কিনটাইটে পৌঁছেছে এবং চক্কর খেয়েছে গত দশকে। চুলের স্টাইলে রাহুল কাট কিংবা স্পাইকিতে ভারতীয় সিনেস্টারদের ধারাকে মোড় ঘুরিয়েছে দেশি তারকারা। ফ্রেঞ্চকার্ট দাঁড়ির জায়গায় নিচের ঠোট ও থুতনির মাঝামাঝি জায়গায় একগুচ্ছ কেশের হাবিবীয় স্টাইলটি বছর দুয়েকেই পুরনো হয়ে গেলো। কুমার বিশ্বজিতের গোলাকার লেটেস্ট স্টাইলে ঝুঁকছে তরুণদল।
পোশাকী এসব সজ্জার পাশাপাশি একটি আরজে ঘরানার সমাজ আমাদের চারপাশে বোধ হয় তৈরি হতে যাচ্ছে। এদের কথাগুলো আর স্বাভাবিক মনে হবে না। মনে হবে ইথারে ভেসে আসছে অবিকল।
-

চতুর্থ দিন বিকেলে মাথাটা হাল্কা মনে হয়। আগামী সকালে ভালো লাগলেই চিটাগাং যাবো।

আগামী পর্বে: জ্বর কমেছে। বৌ-ভাত ভোজনে চট্টগ্রামগামী ইউনিক সার্ভিসের টিকিট কিনলাম।
.
.
.

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP