27 February, 2007

শিডনী শেলডন

সতেরো বছর বয়সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। বাবার কারণে পারেননি। শিকাগোতে জন্ম নেয়া মানুষটি বিশ বছর বয়সে সপ্তায় 17 ডলার বেতনে হলিউডে স্ক্রিপ্ট রিডারের কাজ নিয়েছিলেন। দ্্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন এয়ারফোর্সের পাইলট। আর গত 30 জানুয়ারী, 2007 এ যখন চলে গেলেন তখন তাঁর নামটি এক ইতিহাস...
-------------------------

ইংরেজী বইপত্র পড়ার অনভ্যাসের কারণে প্রথমে খানিকটা সংশয় ছিল। পুরনো বইয়ের মাঝ থেকে লাল কভারের একটি বই তুলে নিলাম। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে মনে হলো - নাহ্, এটা পড়া যাবে। ভাষাটা তেমন দূর্বোধ্য মনে হচ্ছে না। ...তারপর পড়তে পড়তে টের পাচ্ছিলাম, কোথায় যেন ম্যাগনেটিক পাওয়ার আছে এ লেখায়। একটা সেকশন পড়ি আর ব্যাক কভারে লেখকের ছবির দিকে তাকাই। লেখার কী অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর! লেখকের নাম শিডনী শেলডন, বই - 'ইফ টুমরো কাম্স'। এভাবেই প্রথম পরিচয় হলো শেলডনের লেখার সাথে। তারপর নেশার মতো পড়েছি 'দ্য নেকেড ফেস', 'মাস্টার অব দ্য গেমস', 'স্যান্ডস অব দ্য টাইম', 'ব্লাড লাইন'। একবার ব্যাংকক এয়ারপোর্টে বাংলাদেশ বিমান ডিলে ছিল 10 ঘন্টা। ওয়েটিং রুমে বসে বসে পড়েছিলাম - 'দ্য আদার সাইড অব মিডনাইট'। টেরই পাইনি কখন 10ঘন্টা সময় কেটেছিল। পড়া শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না, এমনই আকর্ষণ তাঁর লেখার।

-------------------------
জেনে অবাক হলাম - 1970 সালে প্রথম নভেল 'দ্য নেকেড ফেস' যখন প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর বয়স 53! অবশ্য এর আগেই 1948-এ 'দ্য ব্যাচেলর অ্যান্ড দ্য বেবী সক্সার'-এর জন্য পেয়েছেন অ্যাকাডেমী এওয়ার্ড। আগের বছরই ছবিটি সেরা চিত্রনাট্যের জন্য পেয়েছিল 'ব্লু রিবন আওয়ার্ড'। এছাড়াও ব্রডওয়ে মিউজিকাল রেডহেডের জন্য 1959 সালে টনি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন শেলডন। এক সময়কার আলোচিত টিভি সিরিয়াল - আই ড্রিম অব জিনি, দ্য প্যাটি ডিউক শো, হার্ট টু হার্ট তাঁরই লেখা।
সবশেষ 2005 সালে বেরিয়েছে শেলডনের স্মৃতিকথা 'দ্য আদার সাইড অব মী'।

শিডনী শেলডনের সাক্ষাৎকার: এখানে

Read more...

24 February, 2007

স্বপ্ন ফুরোবার আগে

তারপর অনেকগুলো মুহূর্ত কেটে যায়। আমরা কথা বলি না। টেলিফোনের দুপাশে কেবল নি:শ্বাসের শব্দ, অক্ষমতার কষ্ট। বুঝতে পারি - এক নৈ:শব্দের মাঝে ডুব দিচ্ছি আমরা। আর কথা হয় না। মাধবী ফোনের লাইন কেটে দেয়। "রাজনীতি আমাদের জিম্মি করে দিলো" - মাধবীর কথাগুলো আমার চৈতন্যে শীষ দিয়ে যায়, ভাবনার গভীরে ভাবনা সৃষ্টি করে।

অস্থির সময়ের সহযাত্রী আমরা। ভাঙনের শব্দ আমাদের অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যায়। আমরা জানিনা কোথায় যাবো, কীভাবে যাবো। নষ্ট সময়ের স্রোত আমাদের বিশ্বাসের নৌকায় বৈরী হাওয়া দেয়। চারপাশে সব কিছু ভেঙে পড়ছে প্রতিনিয়ত। গার্মেন্টসে আগুন লেগে শতশত শ্রমিক মারা যায়, তাদের লাশ গায়েব হয়ে যায়। অসহায় স্বজন ছবি হাতে অপেক্ষা করে আর বিত্তশালী শোষকগোষ্ঠী চুরি ঠেকাতে মেইন গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। আগুনে বন্দী শ্রমিকের চিৎকারে মে দিবসের গান ম্লান হয়ে যায়। আরো একটি ভবন ধ্বসে পড়ে। আরো কিছু প্রাণ ঝরে যায়। কোথায় যেন একটা গড়বড় ছিল, কিংবা উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে যাচ্ছে এখন। ক্ষমা করো - শফিক, বরকত, জব্বার; ভাষার জন্য রক্ত দেয়া এ জাতি এখন বিদূ্যৎ-পানির দাবীতে লাশ হয়ে ঘরে ফিরে। একাত্তরের তিরিশ লক্ষ প্রাণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সাহসটুকু নেই; অস্থির সময়ে সবাই এখন 'বন্ধু বাড়াতে' ব্যস্ত। তাই তো লাল-সবুজের পতাকা শোভিত গাড়ীতে সামরিক প্রহরায় ছড়ি ঘোরায় একাত্তরের কীট! নূরাণী চেহারায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে - "দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এখন এসব ইস্যু না"। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর, নিজেদের খুব ক্ষুদ্র মনে হয়, যখন ৩৫ বছর পর দেশে ফেরার পর আপনাকে সম্মান জানাতে পারলাম না! 'বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর' নির্বাচিত কীটগুলো আপনার কবরের পাশে দাড়িয়ে কী বললো - তা শুনেছেন নিশ্চয়! সকালের বাতাসের গুমোট ঝাপটায় আপনার দীর্ঘশ্বাস আমাদের ভেঙে দিয়ে যায়। তখন নিয়মের হর্তাকর্তারা রাজনীতির সাপ-লুড়ু খেলায় বারবার মই বেয়ে উপরে উঠে যায়। শহরের কম্যুনিটি সেন্টারগুলো ফোর-ডাইমেনশনাল আলোয় ঝলমল করে। বিরিয়ানী-কোর্মা-রোস্টেড ডাক শেষ করে শরাব জিসনে বানায়া উসে হামারা সালামে মাতোয়ারা হয় এলিট সোসাইটি। শ্রমজীবি-মেহনতি মানুষের রাতের ঘুমের বিঘ্ন ঘটিয়ে মার্সিডিজ-ফিয়াট-ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা সাঁইসাঁই করে শহর কাঁপিয়ে যায়। ট্রাফিকের লাল-সবুজ বাতি ঝিমুনির মতো জ্বলে আর নিভে। - - - আর দূর গ্রামে হারিকেনের টিমটিম আলোয় একদল কিশোর-কিশোরী 'আমার জীবনের লক্ষ্য' রচনা পড়তে গিয়ে দেশপ্রেমের তীব্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়। আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। এ দেশকে গড়ে তোলা আমাদের সকলের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ দেশকে গড়ে তোলা আমাদের সকলের পবিত্র - - -। সামনে তাদের এসএসসি পরীক্ষা। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর ঝমঝম করে চলে যাওয়া রেলগাড়ী তাদের আগামীর উজ্জ্বল সকালের স্বপ্ন দেখায়। ঘরের চৌকাঠে বসে হতাশ চেহারায় তাদের বাবা অনিশ্চয়তার জালে ঘুরপাক খায়। বাজারে সার নেই, ডিজেল সাপ্লাই নেই। বোরো আমনের হিসাব মিলে না। আপাতত নিয়তির উপর সব দোষ চাপিয়ে হারিকেনের আধো আলো আধো ছায়ার মাঝে প্রত্যয়ী মুখগুলোর উপর আস্থা রাখতে ভালো লাগে তার। দেশের মাইক্রো আর ম্যাক্রো ইকনোমির হিসাব-নিকাশে তার কী-ই বা এসে যায়! পাঁচ তারার আলোকিত সেমিনার রূমে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে লুটেরা পলিসি মেকাররা কটকটে মিথ্যা বলে যায় - এবার জিডিপির গ্রোথ সেভেন পার্সেন্ট। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে, দারিদ্র্যসীমা কমছে। আরো বিদেশী বিনিয়োগ আসছে, মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে আর দেরী নেই। প্রয়োজন কেবল সবার সহায়তা! তারপর মিডিয়া মোঘলদের রঙীন কাগজে আর চ্যানেলে দারিদ্র্যের বাহারী মসলায় রান্না হয় উন্নয়নের স্যুপ। কিছু সেলিব্রেটি এসেও যোগ দেয় ওখানে। দু:খ কেবল - প্রমাণ করা গেলো না - বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি! থার্টি ফার্স্ট আর ভ্যালেন্টাইন ডে সাফল্যের পর এবার হ্যালুইন ডে প্র্যাকটিস করতে হবে। পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূল শংকায় উদ্বেল হলে কী-ই বা এসে যায়!

মোবাইলের মেসেজ টোন এলার্টে সম্বিৎ ফিরে পাই - "খেলা দেখো, আশরাফুল ভালো খেলছে"। টিভি খুলে বুকটা গর্বে ভরে যায়। বাংলার বিষ্ময় বালক ছক্কা মারলো মুরালীর বলে! উচ্ছ্বল গ্যালারী আনন্দে নেচে চলেছে। এবার আমি নিশ্চিত হই- এখনো সব তারা নিভে যায়নি। দূর গ্রামের কিশোর দলের প্রত্যয় ব্যর্থ হবে না, কারণ তারা শহরের সোডিয়াম আলোয় বিভ্রান্ত হয়নি। তারা আগামীর আলোকরশ্মি। আমার বাসার বারান্দার পাতাবাহার গাছে তখন কিছু ঘাসফড়িং উড়ে বসে। আমি মাধবীকে আবার ফোন করি। এবার সেও আশাবাদী। আমরা আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া আলোকরশ্মি - নক্ষত্র আর ঘাসফড়িংয়ের গল্প বলে যাই।

Read more...

20 February, 2007

মিসকল যখন বুমেরাং

বান্ধবীকে মিসকল থেকে বাঁচানোর জন্য দেশী চ্যাটরুমগুলো খুব উপকারী। ওখানে বিজ্ঞাপন দিয়ে নাম্বার ছেড়ে দিলেই হয়!
কিন্তু এ লেখার প্রসংগ ভিন্ন।
আমার খুব কাছের বন্ধু হাসান। খুব ভালো ছাত্র, ভালো মানুষ। ভার্সিটি অ্যাডমিশনে অ্যাসিস্ট করে এরকম একটি কোচিংয়ে পড়াতো মাঝে মাঝে। প্রথমবার স্টুডেন্টদের ফোন নাম্বার দিয়ে সে মহা যন্ত্রণায় পড়ে। রাত নাই দিন নাই - 'ভাইয়্যা এটা কি হবে, ওটা কি হবে' এরকম নানান প্রশ্ন। কিছু কিছু বালিকা কিংবা কিশোরী মিসকলের পাশাপাশি - 'কেমন আছেন'/'কী করেন' টাইপ এসএমএস পাঠানো শুরু করলো। এটা ছিল প্রথম বছরের ঘটনা।

পরের বছর ও আর মোবাইল নম্বর দিলো না। তবুও টুকটাক মিসকল আসতো। ক্রমান্বয়ে ভার্সিটি অ্যাডমিশন শেষ হলো। কিন্তু ঐ মিসকল থামে না। হাসান ফোন করলে ওপাশে কেউ রিসিভ করে না। অন্য ফোন থেকে করলেও কথা বেশী বলে না, লাইন কেটে দেয়। মিষ্টি গলা হলে কথা ছিল। হাসানের ধারণা - ওটা কোন বাসার কাজের মেয়ে। অথবা গাঁইয়্যা ভূত। সমস্যা থেকে বাঁচতে ঐ নাম্বার ছড়ানোর পরিকল্পনা করা হলো। প্রথম দেয়া হলো আমাকে। আমার তখন নির্ভেজাল বেকার জীবন। দিন নাই, রাত নাই মিসকল দেয়া শুরু করলাম। সপ্তাহ খানেক পর - ভোর রাত সাড়ে চারটার দিকে ফোন। আমি ঘুমঘুম ভাব নিয়ে 'হ্যালো' বললাম।
ওপাশ থেকে বালিকা বলে - 'হে: হে:, মানুষরে মিসকল দিয়ে কী শান্তি পান?'
(আসলেই কাজের বুয়ার মতো কথার স্টাইল)
আমি বললাম - 'আপনি শান্তি পান?'
বালিকা বলে - 'আমি আপনারে কোনদিন মিসকল দিছি?'
- আমারে দেন নাই, অন্য কাউরে দিছেন তো
তখন লাইন কেটে গেলো। দেখলাম - লাস্ট কল ডিউরেশন 58 সেকেন্ড।
বুঝলাম - বালিকা হিসাবী আছে।

হাসানকে ফোন করে জানালাম। ও বলে - 'যতো পারো মিসকল দিয়ে যাও। আজকে সকালে একটানা 16টা মিসকল দিছে। 3টা ধরছি। এরপরও মিসকল থামে না।'

'আসুন আমরা বন্ধুর পাশে দাড়াই' - থিয়রী ফলো করে আমি রাত-বিরাতে মিসকল দিয়ে যাই। একদিন রাত বারোটার পর ফোন আসলো ঐ নাম্বার থেকে। কথা বলে না, খালি হাসে। তারপর বললো - আপনার নাম কি?
আমি বললাম - আমার নাম দিয়ে আপনার কী দরকার?
এরপর আমি নানান কথা জিজ্ঞেস করি। জানলাম - মহিলা কোন এক উইমেন কলেজে বাংলা সাহিত্যে পড়েন।
আমি পরামর্শ দিলাম - 'বাংলা কথা বলাটা আগে শিখে নেন। তারপর মিসকল দিয়েন'।
ম্যাডাম রাজী হলেন। আর কখনোই আমাকে বা আর কাউকে মিসকল দিবেন না। শর্ত - আমার নাম বলতে হবে।
আমি ভাবলাম, বাঁচা গেলো। নাম বললাম - 'ফয়সাল'।
'থ্যাংক ইউ ফয়সাল সাহেব' বলে ফোন রেখে দিলো।
তারপর কিছুদিন চুপ। হাসান খুশি। আমিও খুশি।
এরমধ্যে আমার নাম 'ফয়সাল' হলো বন্ধুমহলে!

এনিওয়ে, যন্ত্রণা শেষ হলো না।
এবার দুইটা নাম্বার থেকে মিসকল। পুরনোটার সাথে নতুন একটা।
একসাথে 15-20 বার। রিসিভ করলেও ওদের গায়ে লাগে না।
এবার আমি ফোন করলাম। ফোন করে বললাম - মিসকল দিচ্ছেন কেনো?
সেই বাংলা সাহিত্যে পড়া বালিকা বলে - 'আপনি কেডা?'
ভাবলাম - এ-ই সুযোগ, গলার টোন পালটে বললাম - 'আমি এই সীমটা গত সপ্তাহে কিনলাম'।
বালিকা বলে - 'ফয়সাল কই?'
আমি বললাম- 'আমি ক্যামনে বলি ফয়সাল কই? তবে আপনি আর মিসকল দিবেন তো, আপনার খবর আছে'।
ধমকে কাজ হলো। মিসকল বন্ধ।
কিন্তু, ক'দিন পর আবার ফোন - 'প্লিজ ফয়সালের নাম্বারটা দেন না।'
আমি বললাম - দেখি কী করা যায়। 5/7 দিন পরে ফোন করেন।
এর মাঝে বরিশালের এক ফয়সালের খবর পাওয়া গেল। ওর নাম্বার জানিয়ে দিলাম। কিন্তু ঐ ফয়সালের সাথে তার বনাবনি হয় না। বালিকা নাকি ফয়সালকে বলেছিল - 'আমি যেই ফয়সালরে চাই, আপনে হেই ফয়সাল না'।

তারপর দিলো - আমার নম্বরে ফোন। ভীষণ ক্ষ্যাপা, বলে - আপনার মতো ফালতু মানুষ আমি দেখি নাই। আপনার মতো মানুষরে আমি ভিক্ষা দিই।
আমি মজা পেয়ে গেলাম। বললাম - 'ভিক্ষা প্রসংগ কোত্থেকে আসলো'?
বালিকা বলে - ' হ আপনেরে আমি 50টাকা ভিক্ষা দেমু'।
লাইন কেটে যায়।
একটু পর দেখি - আমার নাম্বারে কোন একজন 50 টাকা ফ্লেক্সিলোড করেছে!
হা হা হা

এর সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আমি দেশ ছাড়ি।
শুনেছি, পরে হাসানের কাছে ফোন করেছিল - 'ফয়সাল সাহেবের সাথে আমার জরূরী কথা আছে। উনার নম্বরটা কতো?'
হাসান জিজ্ঞেস করেছিল - 'ফয়সাল কে? আপনি কে?'
****
গত জুনে দেশে গিয়েছিলাম এক সপ্তার জন্য।
একদিন দেখি - আননোন নাম্বার থেকে ফোন। (জিপি ততদিনে আরো এক ডিজিট যোগ করেছে)
আমি হ্যালো বলার পর শুনলাম - 'কীরে পাখি, তুই এতদিন কই ছিলি?'
আমি জিজ্ঞেস করি -'কে বলছেন?' কিন্তু বুঝলাম - ইনি সেই বাংলা সাহিত্যে পড়া বালিকা অথবা মহিলা।
আবার বলে - ' তোরে আমি প্রত্যেকদিন ফোন করি, তোর মোবাইল বন্ধ কেন?'
এবার দিলাম ঝাড়ি। ভদ্্রভাবে কথা বলেন, কে বলছেন? কাকে চান?
তখন লাইন কেটে গেল।
কল ডিউরেশন 28 সেকেন্ড। জিপিতে তখন 30 সেকেন্ড পালস্। বুঝলাম - বালিকা আরো হিসাবী হয়েছে।
এরপর চললো মিসকল। অল্প সময়ের জন্য দেশে গিয়ে আমি থাকি দৌড়ের উপর। কিন্তু মিসকল থামে না। একটানা 30/40টা মিসকল। বিব্রতকর অবস্থা কাটাতে - মোবাইল সাইলেন্ট করে রাখি।
শেষে ফোন করে খুব ভদ্্রভাবে বললাম - 'দেখুন এরকম মিসকল দিবেন না, আপনি নিশ্চয় 'গুড গার্ল'। 'কলগার্ল' না। কী বলেন?
এর পাঁচ মিনিট পর এসএমএস পেলাম - 'ফয়সাল, তুই নিজেকে কি মনে করিস্? তুই মোটকা, তুই ভোটকা, তুই জাম্বু' । আরো হাবিজাবি।
মজাই লাগে।

এরপর ছুটি কাটিয়ে আবার পাতায়া চলে আসি।
দু'সপ্তাহ আগে নাকি হাসানের মোবাইলে বালিকা ফোন করেছিল - 'ফয়সাল সাহেব কই থাকে আপনে জানেন?'
হাসান বলেছিল - 'আরে আপনি জানেন না? ফয়সল তো সৌদী আরব থাকে, ওখানে এক শেখের মেয়েকে বিয়ে করেছে, বাচ্চাও আছে। আপনি কে বলছিলেন?'
শুনে বালিকা নাকি আস্তে করে লাইন কেটে দিয়েছিল।

হাসানের মেইল পড়ে আমি হাসি।

Read more...

মুখোশ

আজ সকালটা অন্যরকম। প্রতিদিনের মতো আজ সকালে বিছানায় গড়াগড়ি করলেন না প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী। হাল্কা শীতের মাঝেও উঠলেন। বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন, আর মনে মনে কী যেন ভেবে গেলেন। আজ সরকারী ছুটি। য়ূ্যনিভার্সিটি বন্ধ, ক্লাসের ঝামেলা নেই। তবুও আজ ব্যস্ততার দিন। তাড়াহুড়া করে কুসুম কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল সারলেন। কর্ণফ্লেক্স, স্যান্ডউইচ আর সয়ামিল্ক দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলেন। কুমিল্লার খাদি পাঞ্জাবী-পায়জামা, শেরওয়ানী কলারের কটি জড়ালেন গায়ে। মাথায় ঘন জেল দিলেন। ততক্ষণে ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে হাজির। বেশ ফুরফুরে মেজাজে আশরাফ চৌধুরী গাড়ীর পেছনের সীটে বসলেন। গাড়ী ছুটে চললো শহর পেরিয়ে আশরাফ চৌধুরীর নিজের এলাকায়। ...সবাই এমনভাবে ধরলো আর না বলা গেলো না। এছাড়াও এলাকার কৃতি সন্তান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে কিছুটা দায়বোধ তো আছেই। দু'ঘন্টার জার্ণি হলেও মাঝে মাঝে গ্রামে যেতে খুব ভালো লাগে তার। আজ ভালো লাগার পাশাপাশি মনে মনে একটা খসড়া করে চলেছেন আশরাফ চৌধুরী। হাল্কা কুয়াশা কেটে গাড়ী এগিয়ে চলেছে। মনের ভেতর কথকথার খসড়াটাও এগিয়ে চলেছে...।


দুই.
চারদিকে আজ সাজসাজ রব। ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহে সকালের রোদ কড়া হচ্ছে ক্রমাগত। স্কুলের ছেলেমেয়েরা ইউনিফরম পরে ছোটাছুটি করছে। কেউবা মাঠের মাঝখানে রোদ পোহাচ্ছে দলবেঁধে। মাইকে বেজে চলেছে দেশের গান, ভাষার গান। "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কী ভুলিতে পারি", "ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়, "আমি বাংলায় গান গাই"। বাংলা, বাঙালী, বাংলা ভাষা! স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত একটি নতুন সকাল। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রফেসর আশরাফ চৌধুরীর আগমনে গুঞ্জন-কোলাহল শেষে ফুলের মালায় অতিথিদের বরণ করা হয়। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন আর জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্থানীয় গণ্যমান্যদের পর বক্তৃতা শুরু করেন প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী। এই সকালে শতশত কিশোর প্রাণের সমাবেশ দেখে তিনি আনন্দে উদ্্বেলিত হন। নস্টালজিক হন। 40 বছর আগের একুশে ফেব্রুয়ারীর স্মৃতিচারণ করেন। তখনকার গ্রাম বাংলার নৈসর্গিক বিবরণ দেন, বাংলার গ্রামের মানুষদের সহজাত সারল্যের প্রশংসা করেন, নাগরিক জীবনের যন্ত্রণার কথা বলেন, সর্বস্তরে বাংলা চর্চার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সাথে সাথে বাংলা সংস্কৃতির উপর বিদেশী ভাষার সম্ভাব্য আক্রমণের আশংকা করেন। দর্শকদের তালিতে মুখরিত হয় যাদবমোহন বিদ্যাপীঠের সবুজ প্রাঙ্গণ। মফস্বলের সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিষ্ঠার ব্যাপক প্রশংসা করে একুশের চেতনা লালন ও বিস্তারের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। স্থানীয় সাংবাদিকরা ক্লিক ক্লিক ছবি তোলে। মফস্বল সংবাদ পাতায় বিশেষ রিপোর্ট যাবে। অনুষ্ঠান শেষে সূধীজনের প্রশংসায় আপ্লুত হন প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার আগেই শহরে ফিরে আসলেন তিনি। সন্ধ্যায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে "আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একুশের চেতনা" টক শো-তে অংশ নিবেন তিনি।


তিন.
আড়ঙের ঝকঝকে পাঞ্জাবী, কাঁধে নকশীবাংলার শাল, চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা পরে আলোচনা করছেন প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী। টিভি প্রোগ্রাম, তাই হাল্কা মেকআপও নিয়েছেন। সম্রাট আকবরের সময় থেকে শুরু করেছেন তিনি। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান পিরিয়ড, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ, সামরিক শাসন, গণ-অভূ্যত্থান; এভাবে সময় ভাগ করে কথা বলছেন তিনি। পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ব্যবস্থার পট পরিবর্তনের প্রসংগে গেলেন। ইংলিশ মিডিয়াম এডুকেশনের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলেন। প্রাইভেট য়ূ্যনিভার্সিটিগুলোকে দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির মূলধারার বাইরে বিভ্রান্ত ব্যবস্থা বলে বকাঝকা করলেন। শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলা, দেশীয় ঐতিহ্যে জীবন-যাপনের প্রয়াস, অপসংস্কৃতি, কালচারাল ইন্টারাপশান, কালচারাল ডাইভারশান, জেনারেশন গ্যাপ, স্যাটেলাইট প্রভাব, গ্লোবালাইজেশন আর পোস্ট-মর্ডানিজমের কঠিন কঠিন থিয়রী টেনে পাশ্চাত্য মোহে শেকল পরিয়ে অন্তজ: শেকড়ের টানে মূলধারায় ফিরে যাওয়ার শাশ্বত আহবান জানিয়ে প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী আলোচনা শেষ করেন।


চার.
রাতে বাসায় ফিরে প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী অনেকগুলো ফোন রিসিভ করলেন। চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। য়ূ্যনিভার্সিটির ডীন স্যারও ফোন করেছিলেন। ধন্যবাদ আর প্রশংসার জোয়ার বয়ে যায়। ডিনার শেষে বিছানায় গা হেলিয়ে বিজনেস উইক আর দ্য ইকনোমিস্ট ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিলেন। পাশের রূমে স্কলাসটিকায় এ-লেভেল পড়ুয়া মেয়ে সিলভিয়া ফুল ভলিউমে জেনিফার লোপেজের ওয়েটিং ফর টু নাইট শুনছে আর বয়ফ্রেন্ডের সাথে গুট্টুস গুট্টুস গল্প করছে। যুগল বন্ধন, একটেল জয় - কথা হয় যে কোন সময় নির্ভাবনায়, কাছে থাকুক প্রিয়জন। ড্রয়িং রূম থেকে মা আফসানা চৌধুরী মেয়েকে বকাঝকা করছেন। গানের শব্দে টিভি দেখতে অসুবিধা হচ্ছে তার। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত তিনি হিন্দি ডেইলী সোপ দেখে যাবেন। ও রেহনেওয়ালী মেহলোন কি, হারে কাঁচ কী ছুড়িয়া, সিন্দুর, কিট্টু সব জানতি হ্যায় কিংবা বলি সে তারে রিক্যাপ - কিছুই বাদ যাবে না। পরদিন উইমেন রাইটস ক্লাবে মিসেস আহমেদ আর মিসেস হকের সাথে একচোট হয়ে যাবে। তাই সিন্দুরের আজকের পর্বের ভেদিকা আর রূদ্্র রায়জাদার সংলাপগুলো খানিকটা মুখস্ত করে নেন। মা-মেয়ের কোলাহলে ম্যাগাজিনে মন দিতে পারছিলেন না প্রফেসর আশরাফ চৌধুরী। আবার ফোন বাজে। স্টেটস থেকে ছেলে ফোন করেছে। প্রতি উইক-এন্ডে ছেলে ফোন করে কথা বলে। তার অ্যামেরিকান হোয়াইট বৌ শ্বশুরের ইংলিশ অ্যাকসেন্ট না বুঝায় কনভার্সেশনে ইন্টারেস্ট পায় না। তবুও 7 বছরের নাতির সাথে কথা হয়- হাই, গ্রান্ড ফা!
- হ্যালো, হাউ আর য়ূ্য?
- আই অ্যাম ফাইন, য়ূ্য?
- মী টু। হাউ'জ য়ূ্যর ড্যাড অ্যান্ড মম?
- দে আর ওকে, বাট কোয়ারেল সামটাইম। প্লিজ গ্রান্ড ফা, টেল ড্যাডি টু টেক মী বাংলাদেশ।
- ওহ ডিয়ার ডোন্ট সে দিস। ইটস অ্যা ভেরী ডার্টি কান্টি ্র , নাথিং টু সি এরাউন্ড।
- হোয়াই?- ইট'স অ্যা পুওর ক্রাউডি ল্যান্ড। ফুল অব আনকালচার্ড পিপল।
- সো হোয়াট? য়ূ্য আর গুড!
- নো! ইফ আই হ্যাড অপশন, আই উড হ্যাভ লেফট দিস ল্যান্ড।
সফল মানুষ প্রফেসর আশরাফ চৌধুরীর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ!

Read more...

16 February, 2007

আমরা যখন কয়েদী

এ গ্রহের সবচেয়ে বড় কারাগারের খবর পেয়েছিলাম আগেই। কিন্তু এবার যখন 'কয়েদী' পড়া শুরু করলাম তখন ক্রমান্বয়ে তিন পাশে গজিয়ে উঠে অক্ষমতার দেয়াল আর অন্যপাশে বাধা দেয় কষ্ট ও ক্ষোভের কপাট। গৌরবময় ইতিহাসের সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ যখন হরতাল নামক দানবের হিংস্র ছোবলের শিকার তখন নিষ্ঠুরভাবে দেশটির 14 কোটি মানুষ বন্দী হয় অদ্ভুত এক কারাগারে। এ কারাগারের পাঁচটি সেলের গল্প উঠে এসেছে আমাদের ব্লগার শুভ'র 'কয়েদী' উপন্যাসে।

প্রথম সেলে আমরা দেখি - গার্মেন্টস মালিক জামিল আহমেদ এবং তার জাপানীজ বায়ার রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার গল্প। টানা অসহযোগ আন্দোলনের ফাঁদে ফ্যাক্টরী বন্ধ, শ্রমিকদের জীবন অনিশ্চিত। বৈরী পরিস্থিতিতে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ ছাড়ে আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদ হারায় প্রসপেক্টিভ বিজনেস ডিল। তবে আকুতাগাওয়ার রেখে যাওয়া চিঠি ছুঁড়ে দেয় অনেকগুলো প্রশ্ন। দেশপ্রেমের অসহায় বোধ প্রকট হয়ে উঠে।

দ্্বিতীয় সেলে রয়েছে - মরণাপন্ন মায়ের মুখ শেষবারের মতো না দেখার যন্ত্রণায় সন্তানের করূণ কান্না। অসুস্থ মা'কে ঢাকা দেখতে যাওয়ার পথে সাকিবের ট্রেন আঁটকা পড়ে আখাউড়া জংশনে। বৌ-বাচ্চা নিয়ে সাতদিন বন্দী থাকে রেলের কামরায়। কয়েদী জীবনের উপায়হীন হাহাকার তখন কেবলই শুন্যে প্রকম্পিত হয়।

তবুও কয়েদী জীবন উপভোগ করে কেউ কেউ। তৃতীয় সেলে আমরা দেখি - হরতালের অখন্ড অবসরে একজন লেখক আনমনে লিখে যাচ্ছেন। দেশের ক্ষতি তাকে ভাবাচ্ছে না। 'পাঠক খাওয়ানো' রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে ব্যস্ত তিনি। ...এ অংশে 'কয়েদী'-র পাঠক খানিকটা খেই হারাতে পারে। তবে একটু ধৈর্য্য নিয়ে পরের সেলে তাকাতেই চোখে পড়বে - হরতাল দানবের আরেকটি কুৎসিত আঁচড়; অফিসগামী শহীদ সাহেবকে বিবস্ত্র করছে সন্তান-বয়েসী পিকেটাররা। মিরর অব দ্য সোসাইটির অভিজ্ঞ রাঁধুনির ক্যামেরা তখন ক্লিক ক্লিক ছবি তুলে যায়। এটুকু পড়ে পাঠক বিবেক কুঁকড়ে যায় অক্ষমতার যাতনায়। অনেকগুলো তীর এসে মূল্যবোধের ঘরে হানা দেয়।

উপন্যাসের শেষ অংশে আমরা দেখি - অসুস্থ দশ মাসের শিশুকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যাচ্ছে শাহেদ-ফারা দম্পতি। তিন ঘন্টার রাস্তায় মোড়ে মোড়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকে হরতাল দানব। দানবের মেদ জমা শরীরের ফাঁক-ফোকর পেরিয়ে খানিকটা এগুলেও গন্তব্যে পৌঁছা যায় না। ...পিকেটাররা উৎসব করে ভাঙছে শাহেদের গাড়ী!

'কয়েদী' পড়ে প্রথমে মনে হতে পারে ঘটনাগুলো সম্পর্কহীন-বিক্ষিপ্ত। অমনটিই স্বাভাবিক। কয়েদখানার সেলগুলোয় পাশাপাশি থেকেও কোন যোগসূত্র স্থাপিত হয় না, অথচ খুব কাছাকাছি অবস্থান সবার। ঠিক তেমনি জামিল আহমেদ, সাকিব, লেখক, শহীদ সাহেব কিংবা শাহেদ - এরা আমাদেরই আশেপাশের মানুষ। হয়তো তাদের পাশের সেলে বাস করছি আমি-আপনি এবং আমরা। হরতাল প্রেক্ষিতে আমাদের এক একটি নিজস্ব গল্প পূরণ করে দেয় 'কয়েদী' কাহিনীর শুন্যতাগুলো!

'কয়েদী' সম্ভবত: বাংলাদেশে হরতাল নিয়ে লেখা একমাত্র উপন্যাস। বিবেক নাড়া দেয়া বইটি প্রকাশ করেছে জাগৃতি প্রকাশনী, 33 আজিজ সুপার মার্কেট, ঢাকা।

Read more...

13 February, 2007

এবং ভ্যালেন্টাইন

পুরনো গল্প দিয়ে শুরু করা যাক ।
শত্রু রাজ্যের রাজকণ্যার প্রেমে পড়লো রাজপুত্র। একদিকে দুই রাজায় চলে যুদ্ধ। মারামারি। হানাহানি। অন্যদিকে রাজপুত্র আর রাজকণ্যার উথাল পাথাল প্রেম। গোপন অভিসার। ঘটনাক্রমে একদিন শত্রু রাজ্যে ধরা পড়লো রাজপুত্র। নিয়ে যাওয়া হলো রাজ দরবারে। রাজপুত্র প্রবল বিক্রমে ঘোষণা করলো - ’আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই’। শুনে রাজা রেগে অগ্নিশর্মা। অন্যদিকে রাজকণ্যাও অনড়, এই রাজপুত্রের গলায় সে মালা পরাবেই পরাবে। নয়তো আহার নিদ্রা ছেড়ে...।রাজা পড়লেন মহা সমস্যায়। একদিকে শত্রু রাজ্যের রাজপুত্র। অন্যদিকে কণ্যা স্নেহ। উভয় সংকট! উজির-নাজির-সভাসদ ডেকে আসর জমালেন রাজা। কীভাবে এ রাজপুত্রকে শায়েস্তা করা যায়! চলে জটিল সব শলা-পরামর্শ।শেষে রাজা বের করলো এক চমকানো খেলা। ঘোষণা দেয়া হলো - লটারী হবে। দুইটা কাগজ থাকবে ভাজ করা। একটায় লেখা থাকবে - ’আমি রাজকণ্যাকে পেলাম, এবং তাকে আমার রাজ্যে বৌ করে নিয়ে যাচ্ছি’। অন্যটায় লেখা থাকবে - ’আমি রাজকণ্যাকে পেলাম না। আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হোক’।লটারীর আয়োজন করা হলো।ঢোল-বাজনা বাজিয়ে আশেপাশের তিন রাজ্যের লোক জমা হলো।কিন্তু রাজা করলো অন্য চালাকী । দুটা কাগজেই লিখলো - ’আমি রাজকণ্যাকে পেলাম না। আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হোক’।যথাসময়ে রাজপুত্রের সামনে দুটি ভাজ করা কাগজ রাখা হলো। রাজপুত্র একটি কাগজ তুলে পড়লো। তারপর রহস্যময় হাসি দেয়।...শেষ পর্যন্ত রাজপুত্র রাজকণ্যাকে বিয়ে করে বীরবেশে স্বরাজ্যে গিয়েছিল। মাঝে কী ঘটলো সেটা বলছি একটু পরে...।

ভালোবাসা অন্ধ, বিয়ে চোখ খুলে দেয়ঃ
রাজপুত্র-রাজকণ্যার কাহিনী এখন নেই। একবিংশে এসে ভালোবাসাও এখন উতসব। দিনক্ষণ বেছে ঘটা করে বলতে হবে - ’আমি তোমাকে অনেক অনেক আই লাভ য়ূø করি’। ভালোবাসা পরিমাপ হবে রঙীণ কার্ডের চমকানো বাহারে। কে জানি একবার বলেছিল - ’ভালোবাসা মরে যায় একমাস দশ দিন পর’। মরে কোথায় যায়? হয়তো বা চল্লিশ দিনের তাবলীগি চিল্লায় যায় আখেরী জামানার এন্তেজামে। এদিকে বিয়ের পর দুনিয়াদারীর হিসাব-নিকাশে যখন মাথা চককর দেয় নিয়ত, তখন ক’জনেরই বা মনে থাকে ভ্যালেন্টাইন ডে-র কথা!
ভ্যালেন্টাইন ডে-র সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী তার স্বামীকে বলছে- জানো, আজ রাতে স্বপ্নে দেখলাম তুমি আমাকে দামী একটি হীরার নেকলেস দিয়েছ। বলো তো এর মানে কী?স্বামী মুচকি হেসে বলে - এর মানে তুমি আজ সন্ধ্যায় জানবে।স্ত্রী সারাদিন নানান ভাবনায় ডুবে থাকে। ভাবে - স্বামী বুঝি সন্ধ্যায় সত্যি সত্যি হীরার নেকলেস নিয়ে আসবে...।সন্ধ্যায় স্বামী ঘরে ফিরে। হাতে রঙীণ কাগজে মোড়ানো একটি প্যাকেট। স্ত্রীর জন্য উপহার। স্ত্রী অস্থির উত্তেজনায় প্রবল আগ্রহে প্যাকেট খুলে দেখে ছোট্ট একটি বই। বইয়ের নাম - সোলেমানী খাবনামা ও তাবীর, স্বপ্নে কি দেখিলে কি হয়!!!


ভালোবাসার এপাশ ওপাশঃ
ভালোবাসা নাকি অনেকটা জলবসন্তের মতো। সবার জীবনে একবার না একবার আসবেই। ভালোবাসার তীব্রতাও প্রকট, কবিতায় যেমন - ’ভালোবাসতে বাসতে ফতুর করে দেবো’। ভালোবেসে কেউ কেউ সত্যিই নিঃস্ব হয়ে যায়। মান্না দে গেয়ে গেছেন - ’ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী’। তবে ভার্সিটির এক কণ্যাকে ভালোবেসে ভিখারীনি হতে দেখেছিলাম। প্রেমিক প্রবর পুরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হাতিয়ে নিয়েছিল নানান ছলে কৌশলে। এ নিয়ে প্রেমিকার কোন wেভ ছিল না। ওটা নাকি - ’যে দরে কেনা সে দরে বেচা’ কাহিনী! অল্প কিছু দিনের মাঝেই ঐ জুটি নতুন ভালোবাসার সন্ধান পেয়েছিল। ছেলেটিকে দেখেছিলাম সেকেন্ড ইয়ারের লোমেলার সাথে ধাবা রেস্টুরেন্টে দই ফুচকা খেতে। আর মেয়েটি ততদিনে এমবিএ-এর এক সিনিয়র ভাইয়ার সাথে লিমুজিনে চড়ে বেড়ায়। ওয়েস্টার্ণ গ্রীলে বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে খেতে সুইজারল্যান্ডে হানিমুনের স্বপ্ন দেখে। কারো কারো জীবনে ভালোবাসা আসে নানা রঙে কিংবা ঢঙে। ই-মেল অ্যাড্রেস কিংবা মোবাইল নাম্বারের মতো পালটে যায় ভালোবাসার মানুষ। নচিকেতার ভাষায় - ’ভালোবাসা কোন পেসমেকার তো নয়, শুধু এক বুকে পাবে যা আশ্রয়, ... যার মন বড় যত ভালোলাগে অবিরত, তারাই তো ভালোবাসে বারবার।’

তবুও কমিটমেন্টের ব্যাপারটি একদম অগ্রাহ্য করা যায় না। কেউ কেউ মন থেকে বলে - ’পৃথিবীর কাছে তুমি একজন মানুষ মাত্র, কিন্তু জেনে নিও - একজন মানুষের কাছে তুমিই তার পৃথিবী। আমিই সেই জন!’

কেন এই ভালোবাসাবাসিঃ
সওয়াল-জবাবের পর স্বর্গে প্রবেশের অনুমতি পেলো রোমিও। ঈশ্বরকে বললো - ঈশ্বর, আমি কি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?ঈশ্বর অনুমতি দিলো।রোমিও জিজ্ঞেস করে - আপনি মেয়েদের এতো চমতকার করে বানালেন কেন?- চমতকার বলেই তো তোমরা তাদের পছন্দ করো।- কিন্তু আপনি তাদের এতো রূপবতী করে পাঠালেন কেন?- রূপবতী বলেই তো তোমরা তাদের ভালোবাসো।রোমিও এবার একটু ভাবে, আবার প্রশ্ন করে - রূপবতী করলেন, মানলাম। কিন্তু তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি কম দিলেন কেন?- এ জন্যই তো তারা তোমাদের ভালোবাসে।ঈশ্বরের জবাব শুনে রোমিও স্বর্গে পা রাখে। ভালোবাসা হোক বোকার স্বর্গ, তবুও ভালোবাসা বেঁচে থাক।

ফিরে আসি সেই রাজপুত্র আর রাজকণ্যার গল্পে।রাজপুত্র আগেই টের পেয়েছিল - কোথাও একটা চালাকী হচ্ছে। তাই অনুমানও করে নিয়েছিল কাগজগুলোয় কী লেখা থাকবে।...কাগজ হাতে নিয়ে রাজপুত্র পড়ে কী লেখা আছে। তারপর রহস্যময় হাসি দেয়। হাসি দিয়ে কাগজটি ভাজ করে নিজের মুখে দিয়ে গিলে ফেলে। বলে - ’আমার পছন্দের অপশনটি আমি গিলে ফেললাম, এখন দেখি অন্য কাগজে কী লেখা আছে!’সবাই দেখলো অন্য কাগজে লেখা আছে - ’আমি রাজকণ্যাকে পেলাম না। আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হোক’।রাজা থতমত খায়।রাজপুত্র বিজয়ীর হাসি হাসে।সবাই জেনে যায় - রাজপুত্রের তুলে নেয়া কাগজে লেখা ছিল - ’আমি রাজকণ্যাকে পেলাম, এবং তাকে আমার রাজ্যে বৌ করে নিয়ে যাচ্ছি’।ততক্ষণে বেজে উঠে সানাইয়ের সুর।জয় হয় ভালোবাসার।
কেবল আবেগ নির্ভর নয়, সাথে জয় হোক - বুদ্ধিবৃত্তিক ভালোবাসার!

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP