31 October, 2006

শহরের মৃত্যুর পোট্রেট

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সংগ্রামী মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নব্য ধনীক শ্রেণীর পারষ্পরিক ব্যবধান-বৈষম্যের মাঝে মুকিতের বসবাস। মাস্টার্সে থার্ডক্লাস পেয়েও বিচলিত নয় সে; বরং বাইশ বছরের শীর্ণ শরীর আর প্রত্যয় নিয়ে প্রচলিত সিস্টেমকে পালটে দেয়ার স্বপ্ন দেখে অবিরাম। আমাদের চিরচেনা শহরের পরিচিত মানুষগুলোর মুখোশ টুপটাপ খসে পড়ে মুকিতের ধারালো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। বড়লোক বন্ধু শুভর ফোর রানার হুইলে চাপা পড়ে এক কবির মৃত্যু মুকিতের ভাবনাগুলো ওলট-পালট করে দেয়। মুকিতের চারপাশে ভীড় করে একবিংশের একদল উদ্ভ্রান্ত তরুণ প্রাণ; যাদের কেউ প্রেম-অপ্রেমের সাপলুডু খেলায় হতবিহবল, কেউ প্রতারিত প্রেমিক-প্রেমিকা, ব্যর্থ কবিদল, নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী-সুবিধাবাদী নাট্যগুরু, পঁূজিবাদের পেশীর কাছে পরাজিত স্বাপ্নিক চলচ্চিত্র নির্মাতা, পদক ব্যবসায়ী অথবা পলিটিক্যাল ফিশিংয়ের হাউজ অব ডেথ পেরুনো কর্পোরেট থিংকট্যাংক আর সুশীল সমাজের ছদ্মবেশ ধরা হিংস্র সব মানুষ।

স্বচ্ছল জীবনের হাতছানিতে বিভ্রান্ত শেহনাজ-ফারাদের মোহ কাটিয়ে মুকিত বিয়ে করে ভিন্ন ধর্মের ধনীকণ্যা সিনডেরেলাকে। বিয়ের পর সামাজিক ফরম্যাটে সংসারী হওয়ার চেষ্টায় মুকিত হাঁফিয়ে উঠে। নাগরিক জীবনের উচ্ছ্বাস উতসবের পহেলা বৈশাখ, শেরাটনে সুমনের গান, সংখ্যালঘুর যন্ত্রণা, বিবৃতিবাজ বুদ্ধিজীবি, ভন্ড পলিটিশিয়ান আর রটেন অ্যাফলুয়েন্ট সোসাইটির নরম রঙীন কার্পেটের তলায় স্তর জমা নাগরিক ধুলোবালি মুকিত উন্মোচন করে দেয় এক ঝাপটায়। একঘেঁয়ে বিরক্তিকর মানুষদের ভীড়ে সহজ-সরল হারূ মিয়া কিংবা হিজড়াদের সংস্পর্শে এসে মুকিতের মনে হয় এখনো একটি আকাশ আছে, কেবল জানালা খোলার বাকী!

তারপর একদিন কবি হত্যাকারী শুভ ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসা উপলক্ষে শুভর বাবা উতসব আয়োজন করে; নৌ-বিহারে শহরের আলোকিত ঝলমলে মানুষদের ভীড়ে পুরনো ভাবনাগুলো আবার ফিরে এলেও তীর্থ যাত্রার আত্মসংশোধন পর্ব ভেবে মুকিত কিছুটা আশাবাদী হয়। সিনডেরেলার সাথে ভালোলাগার মুহূর্তগুলো শিহরণ জাগায়। তবে স্বপ্ন ভঙ্গ হতেও দেরী হয় না। সামাজিক দানবদের শহরে ফেরার প্রস্তুতি দেখে আশঙ্কায় মুকিতের বুক শুকিয়ে যায়। নস্টালজিয়া ঘেরা ভালোবাসার শহরে মৃত্যু দানবদের সাঁজোয়া বহরের নিচে প্রাণ দিবে কবি-পরাজিত মেঘদল-অসহায় কালো মানুষ! মুকিতের আকাঙ্খার শহর তখন কেবলই মৃত জোনাকীর থমথমে চোখ। ...কোথায় যাবে সে!

’মৃত্যুর শহর’ মাসকাওয়াথ আহসানের প্রথম উপন্যাস। এক অভিনব স্টাইলে লেখক মুকিতকে নিয়ে গেছেন শহরের পরতে পরতে বিচিত্র সব মানুষদের মনের গোপন কামরায় যেখানে অ্যাফলুয়েন্ট সোসাইটির পলেস্তারা লাগানো জীবনের খাঁ খাঁ শূণ্যতার পাশাপাশি উঠে আসে নিম্ন মধ্যবিত্তের আটোসাঁটো জীবনক্ষরা। সোডিয়াম আলোর বিভ্রম এড়িয়ে পরিশুদ্ধতার প্রত্যয়ে নাগরিক জীবনের এক অনবদ্য আখ্যান ’মৃত্যুর শহর’। টানটান গদ্যে লেখা বইটি প্রকাশ করেছে পড়ুয়া, ৪৫ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

Read more...

26 October, 2006

ব্যাংকক পোস্টে বাংলাদেশ

সকাল বেলা Bangkok Post এর প্রথম পেজ দেখেই বুকটা ধক করে উঠলো। না জানি কী রিপোর্ট! গত বছর ব্যাংকক পোস্টে একটা ছবি ছাপা হয়েছিল - অবরোধের দিন ঢাকার রাস্তায় পুলিশি পাহারায় একদল শীর্ণ শরীরের মানুষ নামাজ পড়ছে। ...তাই আজ সকালের শংকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আজকের পত্রিকার হরাইজনস সেকশনের কভার স্টোরি বাংলাদেশ নিয়ে। রবার্ট লা বুয়া- রিপোর্টটি পড়ে ক্যামন যেন ভালো লাগা জাগলো মনের ভেতর। ব্লগের আগ্রহী পাঠকদের জন্য মূল অংশগুলো আমার নিজের মতো করে ভাবগত অনুবাদের চেষ্টাঃ

* বাংলাদেশে যদি আপনি আগে গিয়ে থাকেন, তবে হয়তো দেশটি সম্পর্কে ভাবলে - প্রবল দারিদ্রø, মৌসুমী বন্যা আর লঞ্চ ডুবির কথা মনে পড়বে প্রথমেই । তবে সাথে সাথে আপনাকে অবশ্যই দেশটির অমায়িক জনগণ, হাসিখুশি মুখ এবং পুরুষ প্রধান সমাজের সাথেও পরিচিত হতে হবে। বিভিন্ন সূত্র দেখে ভেবেছিলাম জঘণ্যতম অপরাধ, জনসংখ্যা, ভীড়, আবাসনের চড়া দামই দেখবো।
* বাস্তবে, বিদেশী মিডিয়াগুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা দেয় তা চমতকার দেশটির বাস্তব প্রতিচিত্র নয়। (যা শিখলামঃ সংবাদে আপনি যা পড়েন, শুনেন বা দেখেন তার সব কিছু বিশ্বাস করবেন না)। আমি বাংলাদেশের যেখানেই গেছি বেশ নিরাপদ বোধ করেছি, এশিয়ার অনেক শহরের চেয়ে বাংলাদেশের আকাশকে বেশী নীল মনে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
* বাংলাদেশ কি সাংঘাতিক গোলযোগপূর্ণ , প্রপীড়িত এবং অভুক্ত মানুষে ভরা? না। অমনটি নয়। মানুষজন গরীব হতে পারে, কিন্তু অতোটা দুর্দশাগ্রস্ত নয়। পাশ্চাত্য স্টান্ডার্ডে গরীব হলেও এখানকার মানুষগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক সুখী।
* বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলেও যারা রয়েল বেঙল টাইগার দেখেছেন, পার্বত্য উপজাতীয়দের সাথে থেকেছেন, চা বাগান কিংবা প্রাচীন মন্দিরগুলো দেখেছেন তাদের কাছে দেশটি তেমন জনবহুল মনে হবে না।
* ইন্টারন্যাশনাল প্রেস আমাদের যে রকম ধারণা দেয়, বাংলাদেশ তার চেয়েও অনেক বেশি সভ্য দেশ। এখানকার লোকজন আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে অনেক বেশী সচেতন। প্রধান নগরী ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩৬টির মতো দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, যার ৯টি ইংরেজী দৈনিক।
* বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান দেখার আগে ঐতিহাসিক মুঘল সাম্রাজ্যের নিদর্শন লালবাগের কেল্লা, শাঁখারি বাজার, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরসহ ঢাকার আরো কিছু দর্শনীয় স্থান দেখা উচিত।
* থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশও বিশ্বের অন্যতম পোশাক প্রস্তুতকারক দেশ, যেখানে কম দামে জামা কাপড় কেনা যায়। প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে পান্থপথে রয়েছে অত্যাধুনিক বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টার। এর বাইরে বনানী ও গুলশানের বিপনীগুলো বিদেশিদের খুব পছন্দের আকর্ষণ।
* বিশাল জনসংখ্যার কারণে সংগতভাবেই বাংলাদেশ এখনো নদী বিধৌত কৃষিভিত্তিক সমাজ। প্রাকৃতিক আকর্ষণের মাঝে সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্ক নিঃসন্দেহে অন্যতম। বিশ্বের বৃহত্তম এ ম্যানগ্রোভ বন ইউনেস্কো ঘোষিত ’ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সুন্দরবন গেলে কমপক্ষে ৫ দিনের জন্য যাওয়া উচিত। শীতকালে বাংলাদেশে যাওয়ার সেরা সময়, তবে আপনি এপ্রিলে গেলে মাওয়ালিদের মধু উতসব দেখতে পাবেন।
* দেশের ২য় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। উপনিবেশিক আমলের বেশ কিছু দালান দেখতে পাবেন এখানে। শিপব্রেকিং এরিয়া এখানকার আরেকটি দেখার মতো জায়গা, তবে সেখানে ছবি তোলা নিষেধ। আরেকটু দক্ষিণে আছে কক্সবাজার; বিশ্বের দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার) সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম থেকেই যাওয়া যায় চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে। বাংলাদেশের মূলধারা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে এখানে রয়েছে অনেকগুলো উপজাতি গ্রাম।
* বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দেশের চা বাগানের প্রধান এলাকা। সেখানে গিয়ে চা উতপাদনের পদ্ধতি দেখা যায়; যার জন্য মার্চ- ডিসেম্বর সবচে ভালো সময়।
* দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দির। রাজশাহীর পুঠিয়া শহরে রয়েছে বেশ কিছু হিন্দু রাজবাড়ী ও দালান। দেশের প্রাচীনতম যাদুঘর ’বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ অন্যতম স্থাপত্যকলার এক নিদর্শন। এছাড়াও এখানে রয়েছে হিন্দু দেব-দেবীর অনেক মুর্তি। উত্তরবঙ্গের কান্তনগরের মন্দির আরেকটি ছোট কিন্তু চমতকার স্থান।

এক সংগ্রামী ইতিহাসের দেশ; বাংলাদেশ

Read more...

22 October, 2006

বাড়ী বদলে যায়

আজ কোন মিটিং সমাবেশ নেই।
দর্শনার্থী নেই।
দফতরের কাজকর্মও স্থগিত করা হয়েছে। তবুও সকাল থেকে তার মনটা খুব ভার হয়ে আছে। আহ! পাঁচ বছর কেটে গেলো! মনে হলো এই তো সেদিনের ঘটনা। সবাই মিলে কি হৈ হুল্লোড় করে এ বাড়ীতে উঠেছিল। আজ বাড়ীটা ছেড়ে দিতে হবে। বিশাল লন, খোলা বারান্দা, চাকর-বাকর-খানসামায় সয়লাব। চা-য়ের কেটলী চুলা থেকে নামতো মাঝরাতে। কত লোক এর আসা যাওয়া! কতো দেন-দরবার, শলা পরামর্শ, কতো স্মৃতি! এরকম লোকে গমগম এই বাড়ীটা আজ থেকে বেশ কয়েক মাস খাঁ খাঁ করবে। আগামীতে কে আসবে জানে না কেউ।


...বিপরীতে নতুন ভাড়া নেয়া গুলশানের তিন হাজার স্কয়ার ফিটের অ্যাপার্টমেন্টের কথা ভাবলে ভীষণ অস্বস্তি লাগে। কেমন যেন দমবন্ধ গুমোট ম্যাচবক্স বাসা। এরকম খোলা হাওয়া কই? এরপরও এ বাড়ী ছেড়ে ম্যাচবক্স জীবনে যেতে হবে! রোজাদারের দোয়া সবার আগে কবুল হয়। তাইতো এবার প্রতিদিন ইফতার সামনে নিয়ে চোখ বুঁজে বারবার বলেছেন - হে পরওয়ারদেগার, হে সর্বশক্তিমান, তুমি দয়ার সাগর। তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করো, যাকে ইচ্ছা তাকে নিঃস্ব করো। ইয়া রাহমানির রাহিম, পাঁচ বছরে অনেক ভুল-ত্রুটি করেছি - হে মাবুদ, তুমি ক্ষমা করে দিও, ...আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই; কেবল আর একবার ইলেকশনে জিতায়ে মন্ত্রী বানায়ে দিও...।

...এসব ভাবতে ভাবতে তিনি পিক-আপ ভ্যানগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একে একে সব মালপত্র উঠানো হচ্ছে। শংকা হয় - নতুন অ্যাপার্টমেন্টে এতো জিনিসের জায়গা হবে তো! গিন্নিও বিষণ্ন মুখে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে ছিল ঈদটা এই বাড়ীতেই করবে! অথচ সরকারের অর্ডার...। আরেকটু দূরে পোষা বিড়াল ছানা কোলে নিয়ে তাদের আট বছর বয়েসী মেয়ে বসে আছে। তারও এই বাড়ী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। অথচ যেতে হবে! মা-কে অনেক বুঝিয়ে বিড়াল ছানাটা নেয়া যাচ্ছে। বাবা বলেছিল - অ্যাপার্টমেন্টে বিড়াল নেয়া যাবে না। পরে কান্নাকাটি করায় বাবা রাজী হয়েছে। এখন ইচ্ছে করছে - সামনের আম গাছে ঝুলানো দোলনাটা নিয়ে যেতে। মা-কে বলার পর চোখ রাঙানো দেখে আর কথা বলার সাহস হয় না। বাবাও গম্ভীর মুখে চেয়ে আছেন।
অবশেষে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে তিনজন গাড়ীতে উঠে বসে। তখন হঠাত মোবাইল বাজে
- মিনিস্টার সাব, জাকাতের কাপড় নিয়া হেভি গ্যাঞ্জাম লাগছে। ঠেলাঠেলিতে কয়েকজন মারাও গেছে। এতো লোক সামাল দেয়া মুশকিল।
-আহারে জ্বালা! এই শেষ ক’টা দিনও কি তোরা আমারে শান্তি দিবি না? যেমনে পারিস সামাল দিয়ে যা। আমি ঈদের আগের রাতে আসবো..। হুম... হুমম... ঠিক আছে, ঠিক আছে...।

ফোনের লাইন কেটে মিনিস্টার সাহেব শেষ বারের মতো বাড়ীটার দিকে তাকান। আম গাছে ঝোলানো দোলনাটা আপন মনে বাতাসে দুলছে।
বুকটা হু হু করে উঠে...।

Read more...

16 October, 2006

আর্চিস গ্যালারী পেরিয়ে

মাধবী কখনো সিডিউল মিস করে না। তপুই বরং মাঝে মাঝে দেরী করে। কিন্তু আজ উলটো ঘটনা। তপু পনের মিনিট আগে এসে অপেক্ষা করছে। এ সময়টায় আর্চিস গ্যালারীর ভেতরে ভীড় হয়। তপু-মাধবী ঈদকার্ড কিনবে, কিন্তু শর্ত হলো ঈদের সকাল ছাড়া খোলা যাবে না। ঈদের সকালে ফোনে ’ঈদ মোবারক’ বলতে বলতে খাম খুলতে হবে। গত কয়েকটা ঈদে এমন হচ্ছে।
একটু পর মাধবীর রিকশা এসে থামে।
- উঠ, রিকশায় উঠ...।
- কোথায় যাবি? এখানেই তো আসার কথা ছিল।
- আহ! উঠ তো, তারপর দেখবি কই যাই। মাধবী তাড়া দেয়।
তপু উঠে বসে।
রিকশা চলতে শুরু করলে মাধবী মাথায় ওড়না তুলে ঘোমটা দেয়। তপু হাসে - ’কীরে হঠাত মাথায় ঘোমটা দিলি’।
- মাথায় রোদ লাগে।
- এতক্ষণ রোদ লাগেনি, আমি পাশে বসার সাথে সাথে রোদ লাগা শুরু হলো?
- বুঝিস যখন - তখন এতো কথা বলিস কেন?
- এক কাজ কর, রিকশার সীটটা অনেক বড়। তোর ব্যাগটা আমাদের দুজনের মাঝখানে রাখ...
- চুপ করবি?
...রিকশা চলতে থাকে।



দুই.
মাধবীর কথাবার্তা তপু ঠিক বুঝতে পারে না। আবারো জিজ্ঞেস করে - ’আমি তোকে কত টাকা দামের কার্ড দিবো ওটা আমার ব্যাপার...’
- বললে সমস্যা কি?
- আমি কি তোকে জিজ্ঞেস করছি - তোর বাজেট কতো! তুই দিনদিন ছোটলোকের মতো কথা বলছিস...
- ঠিক আছে, আমি ছোটলোক। শোন, আমি তোকে ৫০ টাকার ঈদকার্ড দিবো। এখন বল - তুই কত টাকার দিবি?
- ওকে ধর, আমিও ৫০টাকার কার্ড দিবো। তপু জবাব দেয়।
- গুড, এখন আমাকে ৫০ টাকা দে।
তপু পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে দেয়।
মাধবী হাসে, বলে - তোর ৫০ আর আমার ৫০ মোট ১০০ টাকার গিফট কিনলাম একজনের জন্য।
- কার জন্য?
- জানি না। এখনো খুঁজে চলেছি।
রিকশা তখন কচুক্ষেত - ইব্রাহিমপুর - তের নাম্বার মোড় পেরিয়ে গেছে।
- চাচা, থামেন, থামেন, একটু থামেন। হঠাত মাধবী রিকশা থামায়।
তপুও রিকশা থেকে নামে। রাস্তার পাশ দিয়ে এক ময়লা কুড়ানো ’টোকাই’ হেঁটে যাচ্ছিল। ওকে থামিয়ে মাধবী তার সাথে গল্প জুড়ে দেয়। নাম মিলন। কোথায় থাকিস, কী করিস, বাপ-মা কী করে...। এইসব। এই গল্পগুলো প্রায় একই রকম। তারপর মাধবী তার ব্যাগ থেকে শার্ট-প্যান্ট দুটো বের করে দেয়। নতুন জামা পরে মিলন ভূবন ভুলানো এক হাসি দেয়, জিজ্ঞেস করে - আফা, আপনে কে? কি করেন?
জবাব না দিয়ে - মাধবী তপুর হাত ধরে রিকশায় উঠে বসে।
তপু পেছন ফিরে দেখে - মিলন হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তাদের রিকশার দিকে। এ যেন এক দেবশিশু স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে, হাসছে...।



তিন.
মিনিট দুয়েকের নীরবতা ভেঙে তপু খোঁচা দেয় - ’ভালোই লাগছে, মাদার তেরেসার সাথে নগর ভ্রমণ...’
মাধবী হাসি দেয় - আচ্ছা তপু, তুই তো প্রায়ই বলিস, আমরা স্টুডেন্ট মানুষ - এইসব বঞ্চিত মানুষদের জন্য আমরা কী-ই বা করতে পারি!
- হুম বলি...
- কিন্তু, এই যে আমাদের অহেতুক লোক দেখানো ফরমালিটিসের ঈদকার্ড দেয়া নেয়া; এই অভ্যাসটা কি আমরা পরিবর্তন করতে পারি না? ভেবে দেখ - তোর আর আমার ১০০ টাকা একজনের মুখে যে হাসি আনন্দ এনে দিলো, এটা কী খুব কঠিন কিছু?
- না কঠিন কিছু না। কিন্তু তোর কথাগুলোকে এই মুহূর্তে খুব কঠিন মনে হচ্ছে। ...তোর মাথার ঘোমটা কই?
মাধবী মুচকি হাসে।
’এখন রোদ লাগছে না’ - বলে আরেকটু কাছে ঘেঁষে বসে।

Read more...

10 October, 2006

বায়েজীদ স্যার

সেই পুরনো কথাগুলো আমাকে আবারো বলতে হয়। একঘেঁয়ে মুখস্ত কথা, ইতিহাস জ্ঞান পরীক্ষার মতো - আনোয়ার সাদাত মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিল।
এবার তিনি আমার দিকে আরো একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেন - মারা গিয়েছিল কিভাবে জানো?
- জ্বী স্যার, ৬ অক্টোবর ১৯৮১ সালে - ন্যাশনাল ডে-র প্যারেডে।
- রাইট! হি ওয়াজ গান শ্যুটেড। এনিওয়ে, য়্যূ আর মাই নিউ টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট।
এটা ছিল স্যারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত। ড. আবুল কাশেম বায়েজিদ স্যারের কথা বলছি। সময়টা জানুয়ারী ২০০৩। স্যারের কাজে টুকটাক সাহায্য করি। সাথে চলে মজার সব আলোচনা। ঐ সেমিস্টারে এম.বি.এ ক্লাসে স্যার "ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস" কোর্স পড়াচ্ছিলেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৈষম্যের ব্যাপারে স্যার ছিলেন শোচ্চার। ধনী দেশগুলোর অন্যায্য আচরণের তীব্র সমালোচনা করতেন দারূণ দারূণ সব ধারালো বিশেষণ দিয়ে। বাণিজ্যের পাশাপাশি গ্লোবালাইজেশনের নামে তাদের কালচারাল আগ্রাসনেরও বিপক্ষে ছিলেন তিনি। মনে পড়ে - একদিন কথার মাঝখানে আমি মাসকাওয়াথ আহসানের একটা বই থেকে কোট করে বলছিলাম - সভ্যতার চিমনীর কালো ধোঁয়া আমাদের শরতের আকাশটুকু কেড়ে নিবে। সাথে সাথে স্যার চমকে উঠলেন - চমতকার কথা, অসাধারণ। বইটার দাম কতো?
সাথে সাথে আমাকে টাকা দিলেন বইটি কেনার জন্য।
পরদিন কিনে আনলাম।
শুনেছি অ্যামেরিকায় যখন ছিলেন তখন তাঁর গাড়িতে একটা ছোটখাটো লাইব্রেরী ছিল।
এরপর ঈদের ছুটি ছিল। ঈদের পর ক্যাম্পাসে এসে শুনি স্যার অসুস্থ। একদিন খবর পেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে আছেন। অথচ বেড নাম্বার কেউ জানে না। তবুও গেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে। রোস্টার চেক করে দেখি - এই নামে কোন রোগী নেই। একজন পরামর্শ দিলো - ’সবগুলো ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। রোস্টারে সব থাকে না’। এরপর শুরু হয় আমার হসপিটাল চককর। ৫০/৬০জন রোগীর চেহারা চেক করি, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত সবাই, কিন্তু স্যার নেই। ঘন্টা তিনেক ঘুরেও বায়েজিদ স্যারকে পেলাম না। পরের সপ্তায় জানলাম - স্যার নাকি পিজি হসপিটালে আছেন। এবার বেড নাম্বার কালেক্ট করি। গিয়ে দেখি - ঐ বেডে অন্য মানুষ শোয়া। কথা না বলে চলে এলাম। আবার সেই একই চক্র। রোস্টার চেক করা। অনেক অনুনয় বিনয়। শেষে দেখা গেলো - বেড নাম্বার ঠিক আছে। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করলাম - এ তো বায়েজিদ স্যারই! শরীর সাংঘাতিক ভেঙে গেছে। শেভ না করায় মুখে লম্বা দাড়ি। চেনার উপায় নেই। কিছুক্ষণ কথা বললাম। স্যারের ’বোন ক্যান্সার’ ধরা পড়েছে। নিজের বয়স ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সত্বেও বললাম - ’মনে সাহস রাখেন স্যার, আপনি ভালো হয়ে যাবেন’।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন - ’তুমি আমাকে সান্তনা দিচ্ছো? ’
সে সন্ধ্যায় খুব মন খারাপ নিয়ে পিজি হসপিটালের বাইরে এলাম। দিনটা মনে থাকবে অন্য আরেকটা কারণে - সেদিনই বুশ ইরাক আক্রমণ শুরু করে। সপ্তাহ খানেক পর আবার পিজি হসপিটালে গিয়েছিলাম - স্যারকে দেখতে। সেদিন দেখলাম স্যার খুব আশাবাদী, সুস্থ হয়ে উঠবেন। বললেন - তুমি যে বইটা কিনেছিলে ওখানে একটা শব্দ আছে - ’লোলিতলোভনকান্তি’। আমরা সবাই এখানেই আঁটকে আছি...।
স্যারের চিকিতসা সাহায্যার্থে ছাত্রেরা একটি কনসার্টও আয়োজন করেছিল। সবাই কামনা করছিলেন - স্যার ফিরে আসুক!
পরের সেমিস্টারে সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যার ক্যাম্পাসে ফিরলেন। ভীষণ দূর্বল। ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটেন। বসে বসে ক্লাস নেন। শুনেছি - যাদুকরী কথাবার্তার কমতি ছিল না তখনো। স্যারের রুমে টেবিলে তখন বইয়ের পাশাপাশি ১৫/১৬ রকম অসুদ থাকতো। ক্লাস রুটিনের পাশাপাশি অসুদ খাবারও একটা রুটিন ছিল। আমি দেখা করতে গেলাম। আবার সেই আলোচনা। পশ্চিমা আগ্রাসন - গ্লোবালাইজেনশন থ্রেট...। মনেই হচ্ছিলো না - নিজের ভেতরে কী অসুখ নিয়ে তিনি কথা বলছেন!
বায়েজিদ স্যার জীবনের একটা গুরূত্বপূর্ণ সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। ওয়েস্টার্ণ লাইফের জৌলুসের মোহ কাটিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। মীরপুরের পল্লবীর ছোটখাটো বাসায় থেকে তাঁর প্রিয় শহর ঢাকাকে ভালোবেসে কাছে থাকতে চেয়েছেন। অবসর সময়টুকু ছাত্রদের মাঝে কাটিয়ে টুকরো টুকরো ভাবনাগুলো শেয়ার করতে চেয়েছেন। মরণব্যাধি নিয়ে বারবার হসপিটালে ভর্তি হয়েও প্রচন্ড মানসিক শক্তির জোরে ফিরে এসেছেন ক্যাম্পাসে।
...ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়মকে এবার আর এড়াতে পারলেন না। জুলাই ২০০৬। স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা রয়ে গেলাম অসাধারণ এক মানুষের অপূরণীয় ঋণ ও ভালোবাসা নিয়ে!


ঃঃঃ আজ ৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ড. বায়েজিদ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Read more...

তাহাদের ঈদী ফোনালাপ

রাত বারোটার দিকে হঠাত মিসকল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
নাম্বারটির দিকে তাকিয়ে খালেদা মুচকি হাসলো। ভাবলো সেও মিসকল দিবে। কিন্তু কী ভেবে জানি ফোন করে বসলো।
ফোন রিসিভ করেই ওপাশে হাসির মাতম। হাসি থামিয়ে হাসিনা বলে
- কী গো বইন ডরাইছো?
- না, ডরামু ক্যান। তুমি মনে করছো তোমার নম্বর আমি জানি না?
- নম্বর জানলে ফোন করো না ক্যান?
- এই তো করলাম।
- হ করলা... আমি মিসকল দিলাম বইলাই তো করলা।
- মিসকল দিলে কী সবাই কলব্যাক করে কও? তোমার নম্বর দেইখাই কল ব্যাক করলাম।
-যাউক আর কথা বাড়াইও না আছো ক্যামন? হাসিনা জিজ্ঞেস করে।
খালেদা কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে - ভালো থাকতে আর দিলা কই কও, কীসব সংস্কার-ফংস্কার নিয়া গ্যাঞ্জাম শুরু করছো, শেষের ক’টা দিন শান্তিতে থাকবার দিছো?
- শুনো বইন, রাইত বিরাতে ফাউল কথা কইও না। বিলাই শুনলেও হাসবো। প্রথম যদি আমার কথার গুরুত্ব দিতা, তাইলে আইজ আর এরকম হইতো না।
- অই, কী কইলা? আমার কথা শুনলে বিলাই হাসবো? বিলাই হাসবো? আর তোমার কথা শুনে তো জগত হাসে, ঐটা বুঝো?
- মুখ সামলাও কইলাম...
- তুমি মুখ সামলাও...
- তুমি
- তুমি
- তুমি তুমি
- তুমি তুমি তুমি - - - -
(টেলিফোনে - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। তারপর অপারেটরের আওয়াজ - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের কলটি স্থগিত করা হলো। অনূগ্রহপূর্বক দুই মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর কল অ্যাকটিভেটেড হবে। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে - পরবর্তী সংঘাতমূলক আলোচনার জন্য কল পাঁচ মিনিট স্থগিত করা হবে। ধন্যবাদ।)
দুই মিনিট পর লাইন রি-কানেক্টেড।
- হ্যালো।
- হ্যালো। আছো তাইলে। হাসিনা জিজ্ঞেস করে।
- হুম আছি। শোন - পলিটিক্স বাদ দাও। আসো অন্য কথা কই।
- ঠিক কইছো বইন। তো আছো ক্যামন? শরীর ভালো? পায়ের ব্যাথার কী অবস্থা?
- আর কইওনা। মাঝে মাঝে খুব ব্যাথা করে। ডাক্তার পেইন কিলার দিছে। খাইতে মন চায় না। তারাবীর নামাজ পড়ার পর হাল্কা পাতলা ব্যাথা করে।
- অসুদ-পত্র ঠিকমতো খাও। আলসেমী কইরো না।
- এইবার তোমার কথা কও। কানের কী অবস্থা?
- এখনো পুরাপুরি ভালো হয় নাই। মাইকের আওয়াজে প্রবলেম হয়। মাঝে মাঝে ঝিঝি শব্দ শুনি।
- ঈদের ছুটিতে বিদেশে গিয়া ডাক্তার দেখায়ে আসো। এরপর ইলেকশনের ঝামেলা শুরু হইলে সময় পাইবা না।
- হঅ আমিও তাই ভাবছিলাম। দেখি কী হয়।
হাসিনা এবার প্রসংগ পালটায়।
- ভাবতেছি একটা একটেল জয় প্যাকেজ নিবো। তোমারে জয় পার্টনার করবো। কথা কইতে খরচ কম পড়বো।
- ভালো হইবো। আচ্ছা, তোমার ছেলে জয় কেমন আছে?
- আছে, ভালোই আছে।
- ভালো থাকলো ক্যামনে? পেপারে তো দেখি সব আজব খবর। একদিন দেখলাম ক্রিস্টিনারে ডিভোর্স দিবো, মিশরীয় কোন মাইয়ার লগে নাকি নতুন সম্পর্ক হইছে। পরদিন শুনলাম আবার তুমি দাদী হইবা।
- তোমার এই এক দোষ। পেপারে যা লিখে সব বিশ্বাস করো। অন্যের পোলার কী হইছে খবর না নিয়া নিজের পোলার দিকে তাকাও।
- কী হইছে? আমার পোলা কী করছে? আমার পোলা দেশেই আছে। আমি তো খারাপ কিছু দেখি না।
- নিজে না দেইখা পাবলিক কি কয় ওগুলাও একটু শুনো।
- আমার শুনতে হইবো না। আমার পোলা তো আর তোমার পোলার মতো বিদেশী মাইয়া গো লইয়া...
- হিসাব কইরা কথা কও কইলাম। তুমি কিন্তু আমার কইলজ্যার ভিতর হাত দিতেছো।
- তুমিও আমার কইলজ্যা নিয়া টানাটানি করতাছো।
- তুমিই তো শুরু করলা।
- আমি করছি? নাকি তুমি?
- তুমি
- তুমি
- তুমি - তুমি
- তুমি - তুমি - তুমি
(টেলিফোনে আবার - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। ...অপারেটরের ঘোষণা - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের কলটি স্থগিত করা হলো। অনূগ্রহপূর্বক পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর কল অ্যাকটিভেটেড হবে। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে - পরবর্তী সংঘাতমূলক আলোচনার জন্য আপনাদের ফোন কানেকশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হবে। ধন্যবাদ।)
পাঁচ মিনিট পর লাইন রি-কানেক্টেড।
- হ্যালো।
- হঁ্যা, শোনো - পলিটিক্সের কথা আর কইওনা। এইবার লাস্ট চান্স।
- আমিও ঐটাই ভাবছিলাম। হাসিনা জবাব দেয়।
- ঈদে কী করবা?
- কী আর করবো। ঘরেই থাকবো। টিভি চ্যানেলগুলায় ভালো প্রোগ্রাম আছে। দেখতে হবে।
- ভালো কথা মনে করাইচো। সুন্দর কোন প্রোগ্রাম দেখলে আমারে এসএমএস দিয়া জানাইও।
- আচ্ছা। ঈদের কেনাকাটা করা শেষ?
- টুকটাক কিনছি। আমি তো আবার শিফন ছাড়া অন্য কিছু তেমন লাইক করি না। আচ্ছা বইন, তোমারে একখান কতা জিগাই।
- কও।
- হাসবা না তো?
- হাসবার হইলে হাসুম না?
- ঠাট্টা করলা?
- আচ্ছা হাসুম না। কও কী কতা।
- ২০০১ এর ইলেকশনের দিন তুমি একখান শাড়ি পড়ছিলা, খেয়াল আছে - নৌকা প্রিন্ট করা...
- হুম আছে। ক্যান কী হইছে?
- না মানে - কোত্থেকা কিনছিলা? আমিও ভাবছিলাম ধানের শীষ প্রিন্ট করা এইরকম একটা শাড়ি কিনমু।
- ও এই কথা? ঐগুলান তো রেডিমেট পাওয়া যায় না। অর্ডার দিতে হয়।
- কোন কোম্পানী?
- থাক, ভাইবো না। তুমি যখন কইচো - আমি তোমার জন্য ধানের শীষ প্রিন্টঅলা ক’খান শাড়ী অর্ডার দিমু। তোমারে আমার ঈদ গিফট। ঈদের আগের দিন পৌঁছায়া দিমু। কাউরে কইও না বইন।
- ঠিক আছে, কাউরে কমু না। তয় আমি কইলাম তোমার জন্য ঈদে আমার রান্না করা সেমাই পাঠামু। ফিরাই বা না তো?
- আচ্ছা ফিরামু না।
- এইটাও কাউরে কইও না।
- আচ্ছা কমু না। কিন্তু বইন, আমি ভাবছিলাম অন্য কথা।
- ক্যান, কী হইছে?
- না মানে, ঐ যে শাড়ী কোম্পানিটা। ঐটা কুফা কোম্পানী। গতবার ইলেকশনের দিন ওদের বানানো শাড়ী পইরা কুফা লাগছিল। কী হারা হারলাম।
- ধুররো, কী যে কও। শাড়ী কী আর ভোট আনে? ভোট আনে উন্নয়ন। দেইখো, এইবারও আমাদের চারদল ক্ষমতায় আইবো।
- বেশি স্বপন দেইখোনা, পরে পস্তাইবা। নাজিম কামরানের রিপোর্ট পড়ছো?
- ঐসব হিসাব পাবলিক খাইবো না। আর আমি পস্তাইবো? হা হা... তোমার আরো কঠিন দিন আসতাছে। রেডি থাইকো।
- কী কইলা, আমার কঠিন দিন? আসলে তোমার কঠিন দিন আসতাছে।
- তোমার
- তোমার তোমার
- তোমার তোমার তোমার
- তোমার তোমার তোমার তোমার ...
(টেলিফোনে আবারো - টুট, টুওট, টুট, টুওট, টুট, টুওট, পিট পিট শব্দ। ...অপারেটরের ঘোষণা - ’সংঘাতমূলক কথা বলার জন্য আপনাদের ফোন কানেকশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হলো। আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।)

Read more...

08 October, 2006

ভুল মিসটেকের ফাঁদে

কয়েকটা পোস্টের লিংক পাঠিয়েছিলাম। ভার্সিটির ক্লাসমেট অংকন মেইল করেছে - ’এতো ডিপ্রেসিং লেখা লিখিস না। মানুষের জীবনে তো কষ্টের শেষ নাই, আরো মন খারাপ করিয়ে দিয়ে কী লাভ?’
তাই এবার হাসার কিংবা হাসানোর - সাথে সাথে মন ভালো করার একটা ভুল চেষ্টা। সব প্রিন্ট মিসটেক আর টাইপিং এররে ভুলে ভুলে ভরা -



সংযমঃ
গত রমজানের কথা।
আমি দেশের বাইরে আসার পর প্রথম রমজান। ঈমাণী জোশে অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ ক’জন বন্ধু ই-গ্রিটিংস কার্ড পাঠালো। এক বন্ধু মেইল করলো - ড়থশথষ-প ংথলস শসয়স ঢ়ভসষবসশ ঢ়থনভসষথ রসড়স...
আমি রিপ্লাই করলাম - নাউজুবিল্লাহ!!!



ছাপাখানার ভূতঃ
১৯৯৭/৯৮ সালে দৈনিক ভোরের কাগজের ম্যাগাজিন ’অবসর’-এ পড়েছিলাম। একবার এক জায়গায় পুলিশ-জনগণ সংঘর্ষ হলো। তিনজন মারা গেলো। পরদিন একটি পত্রিকা নিউজ করলো - পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত। কিন্তু ছাপাখানার ভূতের কেরামতিতে পত্রিকায় ছাপা হলো - "পুলিশের গু-তে তিনজন নিহত"!
পরদিন বিশাল হৈচৈ। হাসাহাসি। প্রতিবাদ।
পত্রিকা কতৃপক্ষ ক্ষমা প্রার্থনা করলো। পরদিন সংশোধনী ছাপালো - এই ছাপাজনিত বিভ্রাটের কারণে আমরা দুঃখিত।
কিন্তু আবারো ছাপাখানার ভূতের কারসাজি। ’ছাপা’ উলটে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো - "এই পাছাজনিত বিভ্রাটের কারণে আমরা দুঃখিত" !!!



মিস য়ূøঃ
আমার এক দোস্ত একবার ইয়াহু চ্যাটরুমে একটা মেয়ের সাথে পরিচিত হলো। মেয়ে বাবা-মাসহ ক্যানাডায় থাকে। বিবিএ পড়ছে। দোস্ত বেশ ভালোই গল্প গুজব জমালো। অনেক কথা। ঐ মেয়ে নাকি সাংঘাতিক ইম্প্রেসড। বারবার বলছে - নেটে অনেকদিন পর ভদ্র কথা বলা কোন ছেলে দেখলাম, আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো, আমার ঢাকার বন্ধুদের খুব মিস করি, মাঝে মাঝে এরকম কথা হবে।
এসব শুনে আমার দোস্ত বিশাল পাংখা!
ঘন্টা দু’য়েকের চ্যাটিংয়ের শেষের দিকে - গুড বাই, গুড নাইট, টেক কেয়ার এর সাথে আমার দোস্ত লিখতে চাইলো - মিস য়ূø। কিন্তু অতি উতসাহে দ্রুত টাইপ করতে আঙুল ফসকে লিখলো - কিস য়ূø!!! টাইপিং এরর।
এরপর ঐ মেয়ের ঝাড়ি কে দেখে - ’ছিঃ ছিঃ আপনি শেষে এসে এরকম একটা বাজে কথা বললেন? আই ক্যান্ট ইমাজিন! য়ূø অল বয়েজ আর সেইম... কালপ্রিট..."
আমার দোস্ত ’প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড...’ লিখার আগেই ঐ মেয়ে লগ আউট।
টাইপিং এররে অনলাইন বিচ্ছেদ।



আবারো ছাপাখানার ভূতঃ
এ ব্যাপারটা প্রতি বছর ঘটে। কোরবানীর সবচে দামী গরুর ছবি ছাপা হয় পত্রিকায়, সাথে সাথে যিনি গরুটি কিনেছেন তারও হাস্যোজ্জ্বল ছবি ছাপা হয় পাশাপাশি।
একবার জনৈক ইদি্রস আলী ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে গাবতলী গরুর হাটের সবচে’ দামী গরুটি কিনলো । সাংবাদিকরা তার বাসায় ভীড় করলো। গরুর ছবি তুললো, গরুর ক্রেতার ছবিও। পরদিন পত্রিকায় দুজনেরই ছবি ছাপা হলো। কিন্তু ছবির ক্যাপশন উলটা-পালটা হয়ে গেলো।
ইদি্রস আলীর ছবির নিচে ছাপা হলো - এই গরুটির দাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর গরুর ছবির নিচে ছাপা হলো - পাশের গরুটিকে কিনেছেন এই ভদ্রলোক, নাম - জনাব ইদি্রস আলী !!!
.........
টাইপিং এররে একবার আমার মান-ইজ্জত পুরা ডুবতে বসেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি! ...ব্যাপারটির বিবরণ ডিসেন্সীর লাইন ক্রস করবে বলে এখন শেয়ার করতে পারছি না! সুযোগ পেলে অন্য কোনদিন...

Read more...

02 October, 2006

স্বপ্নের জল

বড় মামা এসে হুটহাট করে সব আয়োজন করলেন। বাবা-মা রাজী। ছেলে নৌ-বাহিনীর অফিসার, ফ্যামিলিও ভালো। বিয়ের পর বৌসহ গভর্মেন্ট কোয়ার্টারে থাকবে। বড় মামার পকেট থেকে সুদর্শনের ছবি বাবা-মা’র হাত ঘুরে নীলুর কাছে আসে। এক পলকের ঝলকানি!
মাঝে মাঝে বুঝি স্বপ্নেরা এমন করে ধরা দেয়। কৈশোরের এলোমেলো ভাবনার গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলো সত্যি হয়ে যায়। তখন নীলুর কেবল নিজেকে নিজের মাঝে লুকাতে ইচ্ছে করে আর কলেজ পেরুনো মনে উথাল পাথাল শিহরণ জাগে। ... সে-ই যে কবে বাসায় পুরনো ম্যাগাজিনের পেছনে নেভী সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেখে মোহ লেগে যায়। কল্পনায় স্বপ্নের বুননগুলো রঙিন হয়ে উঠে। জাহাজের ডেকে দাড়ানো লম্বা সুদর্শন - সাদা পোশাক - মাথায় হ্যাট। পাশে আকাশী শাড়ী পরে নীলু দাড়ানো। শিরশির বাতাসে শাড়ীর আঁচল উড়ে যায়। তারপর...। নীলু জানে না - তারপর কি! দৃশ্যটা কেন জানি এখানেই থেমে যেতো, আবার শুরু হতো প্রথম থেকে - পড়ন্ত বিকেলে জাহাজের ডেক, পাশাপাশি দু’জন, বাতাসের শব্দে ভালোলাগার নীরবতা...।


বিয়ের পর মোহিত বেশ ক’বার নীলুকে নিয়ে সমুদে্র গিয়েছে। স্পীড বোটের তুমুল গতিতে সাদা সাদা ফেনারাশিতে অদ্ভুত ভালো লাগা। মলির জন্মের পর আর সমুদ্র বিহারে যাওয়া হয়নি। প্রমোশন পেয়ে মোহিতেরও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। দিন-সপ্তাহ পেরিয়ে মাসের পর মাস সমুদে্র। ল্যান্ডে ফিরে এলে শুধুই বিরহ যাতনার অবিরাম ফিসফাস...।


...তারপর আচমকা ২৯ এপ্রিল, ১৯৯১। প্রকৃতির বৈরিতার সাথে তিনদিন লড়াই করে মলিকে কোলে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মোহিতের খবর কেউ জানে না, জানা যায়নি আরো অনেকের খবর। অনেকেই আর ফিরেনি, মোহিতও ফিরেনি!
এতদিন পর মাঝে মাঝে নীলুর মনে হয় - কৈশোরের ভাবনাটা হয়তো এই নিষ্ঠুর পরিণামের জন্যই একটা জায়গায় এসে আঁটকে যেতো...। ঈশ্বর কেন এমন খেলা খেলে! খবরটা গতকাল টিভি নিউজে একটু করে শুনেছে নীলু। আজ সকাল থেকে পত্রিকার একটা পাতা চোখের সামনে নিয়ে বসে আছে। বারবার পড়ছে আর চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে -
"আকস্মিক ঝড়ে উপকূল লন্ডভন্ডঃ পাঁচ হাজার জেলেসহ তিনশ’ ট্রলার নিখোঁজ, ২৭ লাশ উদ্ধার, ফ্রিগেট নিমজ্জিত, ক্যাপ্টেন ফিরোজ কবীরের খোঁজ মেলেনি"।

নীলু টের পায় না কখন মলি কলেজ থেকে ফিরে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক ঝাপটায় মায়ের হাত থেকে পেপারটা নিয়ে দূরে ছুড়ে দেয় - ’এইসব মন খারাপের খবর না পড়লে তোমার দিন কাটে না, চলো - খেতে চলো’।
নীলু ভেজা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
...আরো একজন মোহিত ফিরলো না!

Read more...

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP