06 January, 2013

ঢাকামেট্রো ০৬-০১১৩

আজ হরতাল ছিল।
এখন হরতাল শুরু হয়ে যায় আগের সন্ধ্যা থেকে। বাস পোড়ানো হয়, হাতবোমা মারা হয়। গতকাল এক বাসায় দাওয়াত ছিল রাতে। খাওয়া শেষ হতে রাত সোয়া দশটা বেজে গেল। বের হবো, এমন সময় দেখি ঐ বাসায় সত্তরোর্ধ বয়সের নানু আমার পথ আঁটকালেন। চোখ বন্ধ করে কী কী পড়ে মাথায় ফুঁ দিলেন। একটু আগে টিভিতে দেখেছেন - মিরপুর ১ নম্বরে বাসে আগুন দেয়া হয়েছে, সেটা দেখার পর থেকে তিনি টেনশনে আছেন। আমি বললাম, 'আল্লাহ ভরসা, টেনশন করবেন না।'
ঠান্ডা বাতাসে রাস্তায় বের হয়েই রিকশা পেয়ে গেলাম।
মিরপুর দশ নম্বরে বেশ থমথমে ভাব। মানুষের অভাব নেই, একটা বাস আসতেই এক দঙ্গল মানুষ দৌড় দিলো। চোখে পড়ার মতো পুলিস রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। কাউকে কাউকে, দেখলাম, পুলিস রিকশা থামিয়ে চেক করছে। মিরপুর থানার সামনে একটা প্রিজন ভ্যান, ভেতরে কেউ নেই। হঠাৎ একটা অ্যাম্বুলেন্স একেবারে রিকশার গা ঘেঁষে চলে গেলো উচ্চ সাইরেনে। এরপর আরো কাছ দিয়ে গেল ট্রাক। আমি রিকশাঅলাকে বললাম, 'একটু সাবধানে চালান।'
হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল পার হলে ওএসবি চক্ষু হাসপাতালের সামনে একটা ময়লার ডিপো। আগে এগুলো গলির ভেতরে শিশু হাসপাতালের সামনে ছিল। কয়েক মাস আগে সরিয়ে একটা ডিপো ওএসবির সামনে আরেকটা পোস্ট অফিস আর গ্রামীণ ব্যাংকের গেটের মাঝামাঝি রাখা হয়েছে। দেখলাম এক শিশু, ৭/৮ বছর বয়স হবে, ওএসবির সামনের ডিপো থেকে ময়লা ঘেঁটে একটা প্লাস্টিকের ঝুড়ি বের করলো। ভেতরে কিছু না পেয়ে - ধাম করে আছাড় মারলো রাস্তায়। মারার ভঙ্গিতে তীব্র ক্ষোভ। রাগ।
এসব পেরিয়ে রিকশায় বসে যেন ঠান্ডা বাতাসে সাঁতার কেটে কেটে বাসায় চলে এলাম দ্রুত।

-০২-
হরতালের দিনে বাইরে জরুরী কাজ না থাকলে বাসাতেই থাকি। টিভি দেখি, বই পড়ি। এখন আবহাওয়ায় শীত শীত ভাব আছে বলে - ঝিমানোর জন্য দারুণ সময়।
গত সপ্তায় ফুটপাথে বেশ ভালো অবস্থায় পেলাম হুমায়ূন আহমেদের 'নীল হাতী'। কোনো এক ঐশীর জন্মদিনে তার বড়'মা আর আব্বা তাকে উপহার দিয়েছিল। চার বছর না ঘুরতেই ফুটপাথের হকার ঘুরে সে বই আমার হাতে। দাম রাখলো বিশ টাকা। একটানা পড়ে ফেললাম তিনটি শিশুতোষ গল্প। দারুণ লাগলো, সাথে হাশেম খানের আঁকা ছবিগুলো ছিলো অসাধারণ সংযোজন। এখন শিশুদের জন্য কারা গল্প লিখেন জানি না। অনেকদিন 'শিশু' পড়ি না, বইমেলার বাইরে চোখেও পড়ে না। দৈনিক পত্রিকার শিশুদের পাতায় ছাপানো গল্পগুলো পড়ে হতাশ হয়েছি অনেকবার।

-০৩-
ডিভিডিতে একসাথে ছয় সাতটা সিনেমা কিনতে পাওয়া যায়।
অনেকগুলো ডিভিডি জমে আছে ঘরে। গত বছর ইন্ডিয়ান বাংলা কিছু ছবি দেখেছিলাম। সমস্যা হলো - "আর্ট ফিল্ম" ট্যাগের ছবিগুলোর বেশিরভাগ অনেক জটিল করে বানানো। কিছু বিক্ষিপ্ত চরিত্র থাকে, অস্পষ্ট সংলাপ থাকে। অনেক ধৈর্য্য ধরে বসে থাকতে হবে কী ঘটে তা জানার জন্য। এখানেই ধৈর্য্য হারাই। একারণে অটোগ্রাফ, বেডরুম, বাইশে শ্রাবণ, একটি তারার খোঁজে, নেকলেস; এরকম আরো কিছু সিনেমা দেখে শেষ করতে পারিনি। দেখলেও ভালো লাগেনি।
তবে একাধিকবার দেখেছি - ভূতের ভবিষ্যৎ। আবার দেখলেও বিরক্ত হবো না।
বড়দিনের ছুটিতে হলে গিয়ে দেখেছিলাম - রেদওয়ান রনির 'চোরাবালি'। চারপাশের দর্শকদের মাঝে যে উৎসাহ - ভালো লাগার প্রতিফলন দেখেছি, আমার কাছে সেরকম মনে হয়নি। ছবির তেমন কাহিনী নেই, গানগুলোও সাদামাটা, মনে দাগ কাটার মতো কিছু নেই। একথা সত্যি যে শাকিব খানের ঢিশ্যুম আর অনন্ত জলিলের ডোন্মাইন ছবির বিপরীতে এটা অনেক ভালো। 'চোরাবালি' যতক্ষণ দেখেছি ততক্ষণই ভালো লেগেছে। তবে একটা বড়সড় ফাঁকিবাজি আছে এ সিনেমায় নায়কের ছোটবেলার ঘটনা, প্রায় বিশ মিনিটের মতো, টেনেটেনে লম্বা করে দেখানো।

-০৪-
আজ হরতালের অবকাশে ডিভিডি ঘেঁটে দুটো সিনেমা দেখলাম।
প্রথমটা 'লাইফ ইন পার্ক স্ট্রীট'।
নামের সাথে কেন যেন - লাইফ ইন অ্যা মেট্রো, ৩৬ চৌরঙ্গী লেন, ১৫ পার্ক এভিনিউ; এ নামগুলো মনে পড়ে।
তবে পুরো ছবিতে লাইফ ইন অ্যা মেট্রোর ছায়া আছে। কেবল, ব্যান্ড দল রাস্তায় ঘুরে গান গাওয়া নয় - সম্পর্কের জটিলতার ব্যাপারগুলোও লাইফ ইন অ্যা মেট্রোর কাছাকাছি। লাইফ ইন পার্ক স্ট্রীট দেখতে গিয়ে খারাপ লাগছিল না, তবে আহামারি ভালোও লাগছিল না। কী হয় দেখি - ভেবে ভেবে অপেক্ষায় থাকি। এক সময় সিনেমা শেষও হয়, সাদামাটা গল্প। কেবল একটা জায়গা - ভয়ংকর ছিল। অসহায় একটা ছেলেকে সমকামিতায় বাধ্য করার অংশটুকুই অদ্ভুত লেগেছে। ছবির ঐ অংশের পর থেকে একটা দমবন্ধ বন্ধ ভাব ছিল আমার। নায়ক চরিত্রে পুশন (আসল অভিনেতার নাম জানি না) অসহায় অনুভব ফুটিয়ে তুলেছে। তবে সৌমিত্র ২৫ বছর ধরে যে বান্ধবীকে খোঁজে, ২৫ বছর পরেও তার বয়স বাড়েনি। সৌমিত্র বেমানানভাবে সোনালী উইগ পরে অভিনয় করেছে পুরো ছবিতে।
পরে দেখলাম - চারুলতা ২০১১।
রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়' অবলম্বনে বর্তমানের ফেসবুকীয় জীবন নিয়ে সিনেমা 'চারুলতা ২০১১'।
এখনকার চারুলতা ফেসবুকিং করে, নিঃসঙ্গতা কাটাতে অনলাইন বন্ধুর সঙ্গে সাইবার সেক্স করে। অপরাধবোধে ভোগে। (সিরিয়াস ছবির মাঝখানে হালের মেশিন আর লইট্যা ফিশের ঘটনা প্রাসঙ্গিক মনে হলে হা হা হাসি পেলো)। তবে চারুলতা ২০১১তে পুণরাবৃত্তি ঘটে নষ্টনীড়ের ঘটনা প্রবাহের। নতুনভাবে আসে উমাপতি, মন্দাকিনী, অমল। সমাপ্তিও একই রকম।
"হু ইজ দ্য ফাদার?"
"চারুলতাকে জিজ্ঞেস করো।"
গল্পের চৈতি, যে ফেসবুকে চারুলতা২০১১ অ্যাকাউন্টের মালিক, এমন জিজ্ঞাসা 'নষ্টনীড়'এর বক্তব্যকে বর্তমান সময়ে নিয়ে আসে। সাইবার স্পেসে আমরা সবাই নিজের দ্বিতীয় সত্ত্বা তৈরি করছি। বাস্তবকে ছাপিয়ে ভার্চুয়াল প্রধান হয়ে ওঠে প্রায়ই, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
সব মিলিয়ে 'চারুলতা ২০১১' ভালো লেগেছে।

-০৫-
গত একমাস ধরে হাতে আছে 'আমি দালাল বলছি', মিন্নাত আলীর লেখা স্মৃতিকথা/গল্প সংকলন। ১৯৮০ সালে প্রথম প্রকাশিত। গদ্যরীতি বা গল্প বলার ভঙ্গিতে টানটান আগ্রহ জাগানো কিছু নেই, তাই সময় পেলে অল্প অল্প করে গল্প পড়ছি। পড়তে গিয়ে বারবার মনের ভেতর খচখচ করছে। মনে হচ্ছে, অত্যন্ত সচেতনভাবে ৭১এর ঘটনাকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করা হয়েছে! এ চেষ্টা তো এখন কতোজন কতোভাবে করছে। শর্মিলা বসু, মেহেরজান, কতো কতো জ্ঞানপাপী! মিন্নাত আলীর লেখার ব্যাপারে প্রশ্ন জাগে এ কারণে, 'পাক-প্রেম-সমৃদ্ধ' গল্পগুলো সাপ্তাহিক বিচিত্রাতেই ছাপা হয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে। লেখক ছোটগল্পে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৭৫ সালে!
'আমি দালাল বলছি' পড়া শেষ হলে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইলো। কোনো সুহৃদ সচল যদি মিন্নাত আলীর লেখা পড়ে থাকেন, বা লেখক সম্পর্কে জেনে থাকেন, তবে এখানে মন্তব্যের ঘরে তা জানানোর অনুরোধ করছি।

-০৬-
মর্ণিং শো'স দ্য ডে যদি সত্য হয় - ২০১৩ সালের ঢাকামেট্রো লাইফ রাজনৈতিক সহিংসতা আর হরতালে ভরপুর হবে। নির্মানাধীন ফ্লাইওভারগুলো চালু হলে যানজটের মাত্রা কমবে এটাই আশা।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP