24 December, 2012

অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা

২০০৫-২০০৮ সাল পর্যন্ত আমি থাইল্যান্ডের একটি হসপিটালের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং ডিভিশনে কাজ করতাম। মেডিক্যাল-ট্যুরিজমের জন্য থাইল্যান্ড বরাবরই ইউরোপ-অ্যামেরিকা-অস্ট্রেলিয়ানদের পছন্দের জায়গা। আমাদের মার্কেটিং বিভাগের কাজ ছিল - বিভিন্ন দেশের এজেন্সিগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখা; তাদের পারফরম্যান্স ইভ্যালুয়েশন, বাজেট অ্যাপ্রুভাল, বিভিন্ন রকম তথ্য দেয়া এবং সামগ্রিক যোগাযোগ রাখা...।
২০০৫এর মাঝামাঝি পর্যন্ত হসপিটালটির জন্য একটি লাভজনক মার্কেট ছিল - বাংলাদেশ। ২০০৪-০৫এ বাংলাদেশে অ্যাপলো হসপিটাল- স্কয়ার হসপিটাল  চালু হলে বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীর সংখ্যা অনেক কমে যায়। এরপরও প্রতি মাসে গড়ে ১০/১২ জন রোগী বাংলাদেশ থেকে যেতো। বাংলাদেশের এজেন্সী ছাড়া এ তিন বছরে আমি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউএসএ এবং ইংল্যান্ডের ৫/৭টি এজেন্সি দেখাশোনা করতাম।

তিন বছরে সামগ্রিক অভিজ্ঞতা ভালো-মন্দের মিশ্রণ ছিল। অনেক কিছু দেখছি-শিখেছি। কোনোদিন স্মৃতিকথা লিখলে তিন বছর নিয়ে ৩৬ অধ্যায়ের একটি বই লেখা যাবে নিশ্চয়! কিন্তু, আজ একটি ঘটনায় হঠাৎ এতোটাই আবেগাক্রান্ত হলাম, মনের ওপর চাপ কমাতেই লিখে রাখা...।

হাসপাতালে লোক গিয়ে সুস্থ হবে, এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে কেউ কেউ মারাও যায়। কতো রোগী মারা যায় সে হিসেব - আমাদের প্রশাসনিক লোকজনের কাছে আসতো না। মৃত্যু-জড়িত বলে সেসব তথ্য নিয়ে ঘাটাঘাঁটিও করতাম না। তবে বিদেশ থেকে যাওয়া ৮০ ভাগ রোগী যেতো প্লাস্টিক সার্জারীর জন্য, বিশেষ করে আমার হাতে থাকা এজেন্সীগুলোর মোটামুটি শতভাগ রোগী ছিল - প্লাস্টিক সার্জারীর; মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, সব অংশেরই সৌন্দর্য্যকরণ সম্ভব!

বাংলাদেশ থেকে যারা যেতেন, তাদের অধিকাংশ ছিল বহির্বিভাগের রোগী, মানে ডাক্তারের সাথে আলাপ পরামর্শ করে, ঔষধ কিনে বিদায় নেয়া রোগী। বাকীরা সার্জারী করাতো, তবে প্লাস্টিক সার্জারী নয় - জীবন রক্ষাকারী সার্জারী - হার্ট, কিডনী, ব্রেইন। এসব।
বলছিলাম, রোগী মারা যাওয়ার কথা। আমার তিন বছরের চাকরী জীবনে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একজন মাত্র রোগী মারা গিয়েছিলেন। তিনি আক্রান্ত ছিলেন লিভার ক্যান্সারে। দু'দুটো সাকসেলফুল অপারেশনও হয়েছিল ১০ দিনের ব্যবধানে। কিন্তু, এক রাতে হঠাৎ করে মারা গেলেন - হার্ট অ্যাটাকে। ভদ্রলোককে থাইল্যান্ডে নিয়েছিলেন তার ব্রিটেন প্রবাসী বোন আর ভাগ্নী। অকষ্ম্যাৎ মৃত্যুতে তারা শোকাহত ছিলেন, ক্ষুব্ধ ছিলেন। আমার চাকরি জীবনের বয়স তখন মাত্র চল্লিশ দিন। আরেক বাংলাদেশী সহকর্মী বন্ধু রকিব দেশে এসেছে ছুটিতে। রোগী যেদিন মারা গেলেন শনিবার রাতে- পরদিন ছিল রোববার। সব ছুটি। একা আমিই দোড়াচ্ছি, এখানে ওখানে ফোন করছি। হসপিটালের ফরমালিটিস, অ্যাম্বাসী কাগজপত্র, কফিনের জন্য কার্গো বুকিং, মৃতের দুই স্বজনের জন্য এয়ার টিকিট। নতুন দেশ, অচেনা মানুষ, অনভিজ্ঞতা, স্বদেশী মানুষের মৃত্যু, তাদের স্বজনের আহাজারী; সব মিলিয়ে আমি নিজেই মানসিকভাবে পুরো ঘটনায় জড়িয়ে গেছি।  আরেক বন্ধু প্রিয়, যে ওখানে আগে চাকরী করতো, এসএমএস দিলো, মেইলে বললো - মাথা ঠান্ডা রাখো, সব হসপিটালে ওরকম ঘটে। টানা দুইদিন বিভিন্ন দিকে যোগাযোগের শেষে - সোমবারে অনেক কাজ আগালো। কফিন গেলো আলাদা অ্যাম্বুলেন্সে, রোগীর দুই স্বজনের সাথে আমিও এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। তারাই অনুরোধ করেছিলেন, আমি থাকলে নাকি সাহস পাবে। পথে দুজন মহিলাই কাঁদছিলেন, আমাকে বলছিলেন - মৃত ব্যক্তির ছোট ছেলে - ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ে, কাঁদছে খুব। আমি কোনো সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পাইনি। প্রায় মধ্যরাতে যখন এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফিরে আসছিলাম, তখন তুমুল বৃষ্টি - আমার মাথার ভেতর সেলাই মেশিনের পা'দানির মতো করে ২ দিনের ঘটনা দুলছে। আরো পরে, রোগীর স্বজনরা মৃত্যুর জন্য হসপিটালকে দায়ী করে মামলা করবে বলে চিঠি দিয়েছিল। হসপিটালও জবাব দিয়েছিল, পরে আর আগায়নি।
আমার থাইল্যান্ড স্মৃতিতে অনেক ভালো-মন্দের সাথে এই ঘটনা জড়িয়ে আছে। প্রায় সাড়ে সাত বছর পার হলেও ঘটনাটি মাথায় আসে মাঝে মাঝে। মৃতের নাম, স্বজনদের নাম, পরিচয় সব মনে আছে...।


গতকাল আন্ডারগ্রেড অ্যাডমিশনের ভাইভা ছিল। একটা অংশ ছিল ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন।
এক প্রার্থীর বাবার নাম জিজ্ঞেস করতেই চমকে উঠলাম।
ডকুমেন্টে মিলিয়ে দেখলাম, নামের আগে 'লেইট' লেখা আছে।
জিজ্ঞেস করলাম, বাবা কবে মারা গিয়েছিলেন ?
- ২০০৫ সালে।
- কীভাবে?
- ক্যান্সারে।
- ঢাকায়?
- না, ব্যাংককে।
মুহূর্তের জন্য সমস্ত শরীর চমকে উঠলো! হাতের কাগজগুলো যেন নাড়াতে পারছিলাম না। উঠতি তরুণের চেহারায় তাকিয়ে দেখি, অনেক মিল তার বাবার সাথে। ২০০৫ সালে মরে যাওয়া লোকটির ছেলে!!!
আমি চাইলে আরো কথা আগাতে পারতাম। বলতে পারতাম, তোমার বাবার মৃত্যুর আগেরদিনও আমি তাঁর সাথে কথা বলেছি। করতে পারতাম কিছু স্মৃতিচারণ। পরে আবার মনে হলো, কী হবে বলে? কী দরকার। সেদিনকার থ্রি-ফোর পড়ুয়া ছেলেটি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অফার লেটার নিয়ে এসেছে, কষ্টের স্মৃতি টেনে এনে আশাবাদী চেহারা মলিন করার কী দরকার? এ'ও মনে হলো - হয়তো তার কাছে, তার পরিবারের কাছে ঐ হসপিটালের নাম, ঐ এলাকা, ঐ ডাক্তার- এমনকি আমিও অভিশপ্ত, তার বাবার মৃত্যুর জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। এসবই আমার ভাবনা। ঐ মুহূর্তে মাথায় চেপে আসা ভাবনা।

বাকীদিন কেবলই মনে হয়েছে, গোলাকার পৃথিবীতে এভাবেই বুঝি মানুষের সাথে মানুষের দেখা হয়ে যায়!



2 মন্তব্য::

Sultan Mahmud 02 January, 2013  

এমন ঘটনা বাস্তবেও ঘটে! খুবই অবাক লাগলো।

Enayet 03 January, 2013  

লিখে রেখছ, ভাল করেছ।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP