03 October, 2012

ঢাকামেট্রো ০৩-১০১২

হুটহাট কয়েকটা লাইন এসে মাথায় হাতুড়ির আঘাত করে যায়। ভাবি, লিখে রাখবো এখানে ওখানে। আজ যেমন সাত সকালে নিজেই আওড়ে গেলাম, “অনুভুতিগুলো সব পুরনো হয়ে যাচ্ছে। তরতাজা স্মৃতি বলে কিছু নেই। এই সেদিনের প্রেম-প্রণয়ও আজ বিগত দিন। আরও আগের ডানডাস স্কয়ার স্বপ্নের দৃশ্যের মতো ঘোলাটে। আজ দিনটুকু বেঁচে আছে কেবল, ব্যক্তিগত জামায়।" জানি, এ লাইনগুলো আর লেখা না হবে অন্য কোথাও। মুছে যাবে স্মৃতি থেকে। এই করি, ঐ করি, হাতি মারি, ঘোড়া মারি করে করে কিছুই করা হয় না, দিনের শেষে কেবলই মনে হয়,’সব ঘোড়ার ডিম’। আবার দেখা করবো বলেও হাসিব ভাইয়ের সাথে আর দেখা করা হলো না, ফোনও করলাম না; শেষ মুহূর্তে বিদায়ী এসএমএস পেয়ে মন খারাপ হলো। অপরাধবোধও জাগলো।


হাসপাতালে নৃবিজ্ঞানী
মানুষের হিংস্রতা কেমন হতে পারে ভাবছিলাম। গতকাল ফেসবুকে পাওয়া লিংক ধরে খবরে পড়লাম - চমেক হাসপাতাল পাঁচতলা থেকে রোগীর ভাইকে ফেলে দিল কর্মচারীরা! সংক্ষেপে খবর হলো - বোনের জন্য ওষুধ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢোকার সময় ইমরান (১৭) নামে এক তরুণকে বাধা দেন প্রবেশপথে কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষী। এ নিয়ে ওয়ার্ডের ফটকে দারোয়ানের সঙ্গে সামান্য বাকবিতণ্ডা হয় ইমরানের। এর জের ধরে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী মিলে পাঁচতলা থেকে ইমরানকে নিচে ফেলে দিয়েছে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনেরা। গুরুতর আহত ইমরান এখন চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ইমরান নিজেই পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের এ মন্তব্য মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। গত দু’সপ্তাহ ধরে কাজে আসা যাওয়ার পথে পড়ছিলাম শাহাদুজ্জামানের “হাসপাতালে একজন নৃবিজ্ঞানী ও কয়েকটি ভাঙা হাঁড়”। গল্প কিংবা উপন্যাস নয়। লেখকের পিএইচডি পেপারের বাংলা সংস্করণ। নৃতাত্ত্বিক গবেষণার পর্যবেক্ষণ এবং প্রাপ্ত ফলাফল চমৎকার সুপাঠ্য বাংলায় লেখা হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো এক সরকারী হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে লেখক কয়েকমাস পর্যবেক্ষণ করেছেন, কথা বলেছেন। সে সুত্রেই উঠে এসেছে – রোগী, রোগীর আত্মীয়, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার, জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তার, নার্স বিভিন্ন পক্ষের কথকথা এবং বিশ্লেষণ। শাহাদুজ্জামান তার বইয়ে লিখেছেন, হাসপাতালে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের মানুষ হলো রোগী। ডাক্তার থেকে ক্লিনার সবাই রোগীকে ধমক দেয়। রোগী এবং তার আত্মীয়দের ভোগান্তির কথা বলতে গিয়ে লেখক নিজেই একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যেখানে একজন রোগীর আত্মীয়কে হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী লাঠি দিয়ে আঘাত করে পিটিয়ে রুম থেকে বের করে দিয়েছে। বইটি যদিও গবেষণপত্র – এর ভেতরে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা গল্পাকারে আছে। ভালো লেগেছে। তবে ইমরানকে যারা ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে তাদের কোনো বিচার হবে – এমনটা আমি আশা করছি না।


ক্যাম্পাসের যুবক
মিরপুর দশ নম্বর ফায়ার সার্ভিসের পাশে পুরনো বইয়ের দোকানগুলোয় আজকাল বইয়ের দাম বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগে চোখে পড়লো, আসিফ নজরুলের উপন্যাস “ক্যাম্পাসের যুবক”। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শুনেছিলাম, একসময় নাকি খুব আলোচিত হয়েছিল এ উপন্যাস। ৭৮ পৃষ্ঠার বই দরদাম করে কিনলাম ২০ টাকায়। একটানা বসে পড়ে ফেললাম। এরশাদের শাসন আমলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষিতে লেখা। কয়েকটি চরিত্র, তাদের প্রেম-অপ্রেম এবং রাজনীতির চাল উপন্যাসের মূল বিষয়। কিন্তু, পড়ে হতাশ হলাম। পুরো উপন্যাসে সময় কিংবা ইতিহাসকে ধরার কোনো চেষ্টা ছিল বলে মনে হয়নি। এমনও হতে পারে সে সময় যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ঘনিষ্ট ছিল, কেবল তারাই বুঝবে কে ছিল কোন জন। দুই দশক পেরিয়ে নতুন পাঠক এ উপন্যাসে সময় কিংবা ইতিহাসের কিছুই পাবে বলে মনে হয়নি। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে মূল চরিত্র শাকিল যখন সাকুরা থেকে বের হয়ে আসে, কিংবা এর আগে শাকিল যখন বাম ধারার আন্দোলনকে স্বগোক্তিতে তুচ্ছ করে তখন শাকিলের মাঝে লেখকের নিজেরই ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষে শাকিল রাস্তায় হেঁটে যায়, আর আমার মনে হয় – ওটাই ছিল আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত মেটামরফসিস পর্যায়। উৎসর্গ পাতায় লেখা আছে – ‘অভি, যারা তোমাকে বিষাক্ত করেছে তাদের অভিশাপ দিচ্ছি’। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ‘কর্মী’ আসিফ নজরুল নিজেই কবে বিষাক্ত হয়ে গেলেন তা কি তিনি জানেন? ঘাতক দালালদের কী চমৎকার বচনে তিনি সৎ নির্দোষ সার্টিফিকেট দিচ্ছেন মধ্যরাতের টক শোতে! কে জানে, আগামীকে হয়তো কোনো এক নতুন লেখক হয়তো আসিফ নজরুলকে নিয়ে উপন্যাস লিখবেন – “টকশো’র যুবুক”।


ঢাকার যানজট ও বিজ্ঞাপন
আগারগাঁও থেকে মিরপুর দশ এগারো পল্লবী হয়ে উত্তরা আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত একটা বাস সার্ভিস – জাবাল-এ-নূর- চালু হয়েছিল রোজার মাস থেকে। বিজয় স্বরণী-মহাখালী-বনানী হয়ে কুড়িল বিশ্বরোডে যেতে যেখানে যানজট মিলিয়ে দেড় ঘন্টার মতো লেগে যায়, জাবাল-এ-নূরে যেতে সময় লাগতো ২৫ মিনিট। ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে চলার পারমিশন পেয়েছিল, এর মালিকানায় ছিল নাকি অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা। মিরপুর থেকে যারা ও পথে আসা যাওয়া করেন, তাদের জন্য দারুণ একটা ব্যাপার ছিল। আমিও সকাল ছ’টা চল্লিশের ট্রিপ ধরতাম নিয়মিত। মোট বাস ছিল ৭টা আরও দশটা নাকি পারমিশনের অপেক্ষায় ছিল। গতকাল সকাল ছ’টা চল্লিশের বাস এলো না, পরের সোয়া সাতটায়ও এলো না। আজ সকালেও পেলাম না। ফেরার পথে যখন দেশবাংলা পরিবহনে ফিরছি – কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম, জাবাল-এ-নূর বন্ধ নাকি? কন্ডাক্টর জানালো, ‘হ বন্ধ  কইরা দিসে’। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বন্ধ করলো ক্যানো? ভালোই তো ছিল’। জবাবে সে জানালো – ‘বুঝেননা, শাহজাইন্যা তো লোক ভালো না’। বুঝলাম না কোন শাহজানের কথা বলছে সে, ভাবলাম – হয়তো কোনো স্থানীয় নেতা হবে হয়তো। তবুও জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে কে?’ কন্ডাক্টর বললো – ‘শাহজান খানরে চিনেন না, মন্ত্রী!’ আমি বললাম, ‘অ!’
আজ কুড়িল বিশ্বরোড থেকে দেশবাংলা বাসে উঠেছিলাম বিকেল চারটার দিকে, বাসায় পৌঁছলাম রাত আটটারও পরে। দু’ঘন্টা জ্যামে ছিলাম এয়ারপোর্ট রোডে মাছরাঙা টেলিভিশন অফিসের সামনে বাস ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল দেড় ঘন্টা। এর পর প্রতি দশ মিনিটে দশ হাত যায় অবস্থা। বনানীর দিকে কুল আফটার শেভ আর ডিওডরেন্ট প্রচুর বিলবোর্ড দিয়েছে, এ বিজ্ঞাপনগুলো। যারা করেছে তাদের একজন মাস ছয়েক আগে ফেসবুকে মতামত নিচ্ছিলো – কেমন হয়েছে। তার বেশিরভাগ ফেসবুক বন্ধুরা বলেছে – সেক্স অ্যাপিল দিয়ে সব অ্যাড সফল হয় না। কে শোনে কার কথা। দৈনিক বণিকবার্তা বিজ্ঞাপন করেছে ভেজালের ভীড়ে আসল খবর দেবে তারা। বিজ্ঞাপনের ছবিতে একজন মানুষের চারটি চোখ এবং দুটো নাক করে দিয়ে অপটিক্যাল ইল্যুশন করা হয়েছে – তাকালেই চোখে বিভ্রম লাগে। যানজটে বসে বসে এসব দেখি। সেনসেশন নিরোধকের বিজ্ঞাপন করেছে, একটা মেয়ে স্ট্রবেরি কামড়ে আছে। মোবাইল ফোনে হেডফোনে রেডিও চালু করি। সার্চ করতে করতে নতুন একটা চ্যানেল পেলাম এফ এম নাইন্টি টু পয়েন্ট এইট। শুরুতে চ্যানেলের নাম বুঝতে পারলাম না ওয়েভ রেডিও বা উই রেডিও এরকম কিছু একটা মনে হলো। ভালো ভালো গান চলছে – উপস্থাপকের কথা বার্তায় বাংলাদেশ বেতার ভাব। ডিয়ার লিসেনার না বলে বলছে – প্রিয় শ্রোতাসঙ্গী। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, কবীর সুমন, অঞ্জন দত্ত, লোপামুদ্রা আর শুভমিতা গান শুনলাম একটানা। আরো কয়েকবার মন দেয়ার পর শুনলাম, চ্যানেলের নাম রেডিও ভূমি। নামটি ভালো লাগলো। আসলে, চ্যানেলটিকেই ভালো লাগছিল খুব। ভালো লাগার কারণ হলো – এখনো বিজ্ঞাপন নেই, আড়ঝেদ্যার বাংলিশ নেই, এসএমএস ভিক্ষা নেই। মন চায় বলি – রেডিও ভূমি তুমি এরকমই থাকো, কথা দিচ্ছি –অন্য কোনো চ্যানেলে কান পাতবো না আর। অথচ জানি, এরকম থাকবে না শেষ পর্যন্ত। এখন সম্ভবত পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে, পূর্ণাঙ্গ আয়োজন শুরু হলে – বিজ্ঞাপন আর আরজেদের খলবলানির অধিকারে নষ্ট হবে সব। মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপরে যখন হাল্কা জ্যাম, রেডিওতে শুভমিতা গাইছে ‘যদি বন্ধু হতে চাও’, তখন গুলশান থেকে মহাখালির দিকে জ্যামে আঁটকে থাকা সারিবাধা গাড়ির টিমটিমে আলোর দিকে তাকিয়ে ঘরে ফেরা মানুষগুলোর জন্য মায়া জেগে ওঠে। মনে হয়, গানের কথাগুলোর মতোই মানুষ ঘরে ফিরছে বন্ধুর কাছে...।


অসহায় জীবন যাপন
ইউট্যুবে থাকা এক ভিডিওর প্রতিবাদের আমাদের দেশে হরতাল হয়! মোল্লারা পুড়িয়ে দেয় গাড়ি। এখনো গুগল সার্চ ঠিকমতো কাজ করে না। ব্লকড দেখায় অনেক কিছু। এর মাঝে রামুতে ঘটে গেছে কুৎসিত এক ঘটনা। মিডিয়া বলছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দূর্বলের ওপরে সবলের এই একপক্ষীয় হামলাকে ‘দাঙ্গা’ বলা যায় কিনা সেটা প্রশ্ন। প্রথম আলোও শিরোনামে 'ওরা' লিখে অশ্লীলভাবে জানাচ্ছে - আমরা আক্রান্ত নই। জামাত-বিএনপি সরকার আমল হলে অবাক হতাম না। প্রচলিত আছে, আ-লীগ নাকি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল। অথচ আজ পর্যন্ত একটা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়লো না। পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধমুর্তির ছবি দেখে ভাবি, ব্যাপক শান্তি নাজিল হচ্ছে, পাকসারজমিন সাদবাদের আগুন পানি শান্তি। আশার কথা এটুকুই যে, এখনো একদল মানুষ অনলাইনে অফলাইনে এর প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্টের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে অসহায় মনে হয়। কৌশিক বড়ুয়া নামের যে ছাত্রটি পরশু বিকেলে আমাকে স্লামালাইকুম বলে সম্মান দেখালো তার সামনে নিজেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম প্রাণী মনে হয়। বাংলাদেশ নিয়ে আশা নিরাশার কথা বলছে আমার বন্ধুরা। যারা সোহেল তাজের মতো ২য় সুযোগ রেখেছেন, তাঁরা হয়তো এই নষ্টভূমিতে আর ফিরবেন না। বন্ধুরা যারা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই আর ফিরবে না, যারা ফেরা-না-ফেরার দোলাচলে আছে, মেইলে পরামর্শ চাচ্ছে দেশে ফিরবে কিনা- তাদের নির্লজ্জের মতো করে বলছি – না ফিরলেই ভালো। গত এপ্রিলে ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে আমার মোবাইল ফোনটা নিয়ে গিয়েছিল, গত সপ্তাহে নিয়ে গেল বৌয়ের ফোন। বাসায় ফিরে বৌ কাঁদছে – অন্যদের সাথে আমিও সান্ত্বনা দিচ্ছি – জানের ওপরে এসেছিল মালের ওপরে গেছে। বলছি, এরচেয়েও খারাপ কিছু ঘটতে পারতো, ছিনতাইকারী তোমার ব্যাগ নিতে পারতো, মুখ ছুরি মারতে পারতো। এসব বাক্যে কাজ হয়নি। প্রিয় ফোনের শোক এবং একরকম আতঙ্কে কেটেছে তার সারারাত। অথচ এর পরদিন সে ফেসবুক থেকে নিজেই আমাকে শোনাচ্ছে – তার এক বন্ধুর মামাকে ছিনতাইকারী কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে গেছে, জাপান বাংলাদেশ মেডিক্যালে আছে- রক্ত লাগবে এবি পজিটিভ। বৌ আমাকে বলে, ভাগ্যিস আমার শুধু ফোনটাই গেছে!
আমি বলি, হ্যাঁ – অনেক ভালো আছি আমরা।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP