17 February, 2012

ঢাকামেট্রো ১৭-০২১২

সকাল দশটা দশ মিনিট
মাঝে মাঝে যখন হীনমন্যতায় ভূগি, ক্ষমতার লোভ এবং আকাঙ্ক্ষা যখন জেগে ওঠে, তখন মনে হয় সবকিছু ছেড়ে সিয়েঞ্জি ট্যাক্সির ড্রাইভার হয়ে যাই। প্রায়ই মনে হয়, ঢাকা শহরে ক্ষমতাবান একটা পেশার নাম সিয়েঞ্জির ড্রাইভার। রোদ-বৃষ্টি-মেঘলা আকাশ, শীত-গরম-বর্ষা, সকাল অফিস টাইম, দুপুরের জ্যাম, সন্ধ্যার অফিস টাইম, রাত হয়ে গেছে; সব পরিস্থিতিতে সিয়েঞ্জির ড্রাইভাররা রাজা-বাদশা। ‘যামু না’ বলার জন্য
যতোটুকু মনোযোগ দেয়া দরকার সেটুকুও দেবে না। মামা-কাকা-ভাই ডাকে লাভ নেই। বিশ টাকা বাড়িয়ে দেবো – এমন প্রস্তাবও এখন কাজ করে না। জমা নাকি ৮৫০ টাকা হয়ে গেছে, সিয়েঞ্জির দাম ডবল হয়ে গেছে, ঐদিকে জ্যাম বেশি; এসব ছুতোয় রাজারা তুচ্ছ করে দেয় যাত্রীদের। তবুও রাস্তায় দাঁড়াই, দাম হাকি। আজ ভাগ্য প্রসন্ন, বয়স্ক ড্রাইভার বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, "শুক্রবার – ১৪ নম্বর মোড়ে চেক করে – মিটারে চলেন – বিবেকমত একটু বাড়ায়ে দিয়েন।" উঠে বসলাম, মিরপুর-বনানী।
মিরপুর তেরো নম্বর পার হতে মোবাইল ফোনে রিং। অপরিচিত নম্বর। জিজ্ঞেস করলাম – কে?
নারীকন্ঠ হ্যালো, "একটু রনিকে দেন।"
"জ্বী, কাকে চান?"
"রনিকে দেন ভাইয়া।"
"এটা রনির নম্বর না, আপনি ভুল নম্বরে কল করছেন।"
"ভুল নম্বর না, আমি আপনাকে চিনি, প্লিজ রনিকে একটু দেন।"
এবার বিরক্ত হই – "আচ্ছা আপনি কত নম্বরে ডায়াল করছেন?"
"আমি ঠিক নম্বরেই করছি, এটা আমার সীম।"
"হা হা, আপনার? শোনেন, এইটা আমার অনেক পুরানা নম্বর। আপনি নম্বর দেখে ঠিকমত ডায়াল করেন।"
"প্লিজ রনিকে দেন, নাইলে আমি গাজীপুর চলে যাবো।"
ধ্যুত বলে লাইন কেটে দিলাম।
"বিশ সেকেন্ড পরে আবার কল, প্লিজ ভাইয়া রনিকে দেন।"
"আচ্ছা, বলেন তো রনি কে, কী করে? আপনার নাম কী?"
"আমার নাম সুপ্তি।"
"সুপ্তি শোনেন, আমি ভদ্রভাবেই বলছি এটা রনির নম্বর না।"
"ও ভদ্রভাবেই তো বলবেন। ভদ্রভাবে বলার জন্যই তো গতরাতে…"
এই বাক্যে চার-পাঁচ অশ্লীল শব্দে সুপ্তি যা বললো তার মানে এই যে গতরাতে তারা ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়েছে, সুপ্তি তার গোপনতম ভালোবাসা প্রকাশ করেছে।
একটু ধাক্কা খেলাম, ধমক দিলাম, "শোনেন, ভুল নম্বরে ফোন করে জটিলতা বাড়াবেন না।"
সুপ্তি এবার রেগে গেল। বললো, "রনিকে বইলেন – সে কথা না বললে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, আমি গাজীপুর চলে যাবো। হু, গাজীপুর চলে যাবো।"
কন্ঠে হাল্কা কান্না ও তীব্র ক্ষোভ। নিজে থেকেই লাইন কেটে দিলো।
ভাবলাম, কে এই সুপ্তি? রনি কে? রনি ফোন ধরছে না কেন? সুপ্তি কেন বারবার ভুল নম্বরে ফোন করছে? আর সে গাজীপুর কেন যাবে? গাজীপুর গেলে রনির কী ক্ষতি হবে?
এসব যখন ভাবছিলাম, সিয়েঞ্জি কাকলী মোড়ে এসে সিগন্যালে থামে। ডানে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে তাকিয়ে থাকি। শেল্টেক বা স্টীলটেকের মডেল তরুণী, স্কার্ট পরা, হাঁটুদ্বয় দেখতে বড়ো রুক্ষ, পুরুষালী...।
সিয়েঞ্জি মিটারে বিল এসেছে চৌষট্টি টাকা, দিলাম পঁচাশি টাকা।


বিকাল চারটা চল্লিশ মিনিট
মিরপুর দশ নম্বরে কাজীপাড়া থেকে গোলচক্করের দিকে যাওয়া সব গাড়ি স্থবির হয়ে আছে। অন্য পাশে পার হতে গিয়ে দেখি অনেক নিরাপত্তা পুলিশ, পার হতে দিচ্ছে না। মাঝে রোড ডিভাইডারেও দাঁড়ানো নিষেধ। তীব্র হুইসেলে সবাইকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনুমান করলাম, ভিয়াইপি কেউ যাবে। শুনলাম প্রাইম মিনিস্টার যাবেন। আরো অপেক্ষার পরে সাঁই সাঁই করে কিছু মোটর সাইকেল এবং আরো কয়েকটা প্রাইভেট কার, জিপ, শেষে পুলিসের ভ্যান গেলে অনুমান করি তিনি চলে গেছেন। পুলিসের সংকেত পেয়ে গাড়ি চলতে শুরু করে, আমি এবং অন্যরা রাস্তা পার হয়। কেউ কেউ মাথা তুলে কাজীপাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে –ঐ তো একটু আগে চলে গেল!
আজ মনজুর হাসান অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষা।
আমার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও, আমি মাঝে প্রবাসে কাটালেও বন্ধুত্ব অটুট আছে নিত্য যোগাযোগে, কারণ আমরা সমমনা। আজ বাসায় দেখা করতে গিয়ে, শেষে যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, বললাম – "এ শহরের অর্ধেক খালি হয়ে গেল"। হ্যাঁ, কোনো কোনো মানুষের অনুপস্থিতি অনেক বেশি শুন্যতা সৃষ্টি করে।


সন্ধ্যা ছয়টা আটান্ন মিনিট
মতিঝিল শাপলা চত্ত্বর। শুক্রবার বলে তেমন ভীড় নেই। সোনালী ব্যাংক ভবনের সামনে সেই চেনাজানা হকারদল। অনেকদিন আগে, যখন কলেজ থেকে বাসায় ফিরতাম ১৫ নম্বর বাসে চড়ে, একটা ঘ্রাণ পেতাম নাকে, সে ঘ্রাণ আজও আছে। বাসে ওঠার আগে ভাবলাম বাদাম কিনে উঠি।
দশ টাকার বাদাম দিলো অতি সামান্য।
জিজ্ঞেস করলাম, "এত কম? ১০০ গ্রাম কত?"
বললো, "২০ টাকা।"
"এহ! এই না দু’দিন আগেও ১৪ টাকা ছিল?"
"হ, ছিল। তখন কেজি ছিল ৮০টাকা, আজ কেজি ১০৫ টাকা।"
ঠোঙা হাতে নিয়ে ডাক শুনলাম, “ঐ মিরপুর দশ, ডাইরেক্ট সিটিং, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর দশ চৌদ্দ, ডাইরেক্ট।“
দৌড়ে বাসে উঠলাম।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP