31 August, 2011

প্রিয় লোমেলা - ৪

শুরুর আগেও শুরু আছে।
তাই এখানে ভূমিকা জরুরী কিছু নয়। বলেছিলে, ভূমিকাগুলো ভনিতা হয়ে যায়। তাই আগে কী হয়েছিল সেসব সরিয়ে রাখি আজ। স্মৃতিকাতরতার দিন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টনের সুর এখনো বাতাসে ভাসে। আমরাও নিশ্চয় একদিন কাতর হবো ইয়াহু মেসেঞ্জার, অর্কুট, জিমেইল প্রসঙ্গে। হয়তো ফেসবুকও বিগত হবে একদিন, হবে স্মৃতি। পুরনো সবকিছু স্মৃতি হয় কিনা জানিনা, তবে অনেক পুরনো কিছু মুছে যায়।
তোমার নিশ্চয় ইয়াসমিনকে মনে আছে, দিনাজপুরের ইয়াসমিন, কিশোরী ইয়াসমিন, ২৪ অগাস্ট; সঞ্জীব চৌধুরীর গান মনে পড়ে? হয়তো পড়ে। আমি জানিনা, তুমি রুবেলকে মনে রেখেছ কিনা, রুবেল, যে কিনা পুলিসি হেফাজতে খুন হয়েছিল। তোমার স্মৃতিতে চরেশ রিশিল আছে? তুমি জানো কী হয়েছিল শেষমেশ? খুব অতীতে না যাই, গত বছর পুড়ে যাওয়া নিমতলী মনে পড়ে? এত এত জিজ্ঞাসা, স্মৃতিকাতরতার নাম করে স্মৃতি হাতড়ানো কেন – এ প্রশ্ন নিশ্চয় তোমার মনে জাগছে এখন। আমি কিন্তু এমনটি ভাবছি না যে তুমি আমাকে ভুলে যাবে, বরং এ নিশ্চয়তা দিতে চাই, স্মৃতি নিয়ে তোমার কাছে ফিরে আসব বারবার। আমাকে উল্টোদিকে রেখে তুমি হয়তো হেটে যাবে অন্যদিকে, যেমন করে হাটছো প্রতিদিন, কিন্তু দূরত্ব কি কমে? হয়তো শুনেছ, গতকাল থেকে লিমনও হাটছে। কৃত্রিম পায়ে ভর করে হাটছে। ভেবে দেখো, জানবে – লিমন তার পায়ের ভর বইছে না, বইছে বাংলাদেশ, যেখানে মিশে আছে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত। লিমন বলছে – এই পা নিয়ে সে এগিয়ে যেতে চায়। একজন গল্পকার গল্প লিখছেন দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকে –‘লিমনের জন্য জীবনানন্দ দাশ কামরাঙা নিয়ে এসেছিলেন”। লিমন কে? – এমন প্রশ্ন করো না আবার। বরং, মিলনের কথা বলি। ইউটিউবে হয়তো মিলনকে দেখেছ, দেখোনি? পাকিস্তানের সোয়াতের ঐ কিশোরীর ভিডিওটি মনে আছে? লিংক দিয়েছিলাম। মেয়েটিকে তালেবানরা পিটিয়েছিল। তালেবান নয়, এদেশেরই মানুষ, বিনোদনহীন – হাত নিশপিশ একদল মানুষ পিটিয়ে মেরেছে মিলনকে। রক্ষক তুলে দিয়েছিল জনগণের হাতে, আবার নিয়েও গেছে। তুমি হয়তো কবীর সুমনও শুনেছ – এই অসহ্য সময়টাকে কাঁদতে দে। আর আব্দুল কাদের! পরিচয়ে ছাত্র প্রাণ রসায়ন, ঢাবি – পিতা আবদুর রউফ, মা মনোয়ারা বেগম, বড় বোন জান্নাতুল ফেরদৌস; অসংখ্য মানুষের একজন কাদের – নিরাপদে ফিরতে পারেনি ছাত্রাবাসে। হয়তো শংকিত হচ্ছো, আমি নিরাপদে আছি কিনা ভেবে। জীবনের নিরাপত্তা কেনার ক্ষমতা এখনো হয়নি। তবে এখন নতুন জীবন না সৃষ্টিকারী নিরাপত্তা কিনি নিত্য। সুপার স্টোর থেকে একশ সাতাশ টাকায় এক ডজন ডিম কিনি। আমাদের শহরে এখন ব্র্যান্ডেড ডিমও বিক্রি হয়। প্রতীক চৌধুরীর গান মনে পড়ে যায় – গ্লোবালাইজেশন এক খুড়োর কল/ব্র্যান্ডেড পৃথিবী ব্র্যান্ডেড জল। ভাবছো, কেবল হতাশার কথাই শোনাচ্ছি? তোমার শহরে তাপমাত্রা কতো? বৃষ্টি হয়? কী লেখা আছে আজ দৈনিকের শিরোনামে? কি মনে হয় তোমার – ঘুর্ণিঝড় আইরিন কি ওভারহাইপড? ক’জন মারা গেছে স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে? নয় নাকি দশ? রেডিও টুডে’র খবর বলি – আজ বাংলাদেশে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছে আঠারো জন। ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়ক চায়। ফিডব্যাকের মাকসুদ অনেক আগে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে গান করেছিল। সমস্যার সমাধান আমি জানি না, জানলে আসিফ নজরুলের মত করে আজকের মধ্যরাতের বাংলালিংক একুশের রাতের টক শোতে যেতাম, পাশে বসে আছে আন্দালিব পার্থ। আরেক উঠতি বুলিবাজ। আমি অবাক হয়ে দেখর এই বুলিবাজের সারমর্মহীন বক্তব্য ইউটিউবে লাইক দিয়েছ তুমি। লাইক ডিজলাইক থাক। সংবাদপত্রের শিরোনাম বলি, শোনো - বাসযোগ্য নগরী: শেষের দিকে ঢাকা, শীর্ষে মেলবোর্ন। দেশে ফিরেছেন খালেদা জিয়া। ২০০ অভাবীর কিডনি বিক্রি। ইভা রহমানের ‘মনে আলপনা এঁকেছি’। স্মার্টফোনে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। এবং সবার উপরে এলো খুশির ঈদ। এই ঈদে তোমার কি মনে পড়বে মিশুক মূনীরকে? অনেক আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, ঝুঁকিতেও যিনি বেঁচে ছিলেন। অথচ মারা গেলেন চুয়াডাঙা এক্সপ্রেস নামের এক ঘাতক বাসের ধাক্কায়! আর তারেক মাসুদ? স্বপ্নবাজ জাফর ইকবাল স্যার লিখেছেন - "তারেক-ক্যাথরিনের ছোট্ট বাচ্চাটি একদিন বড় হবে। আমার খুব ইচ্ছে, তখন তাকে আমরা বলব, ‘তুমি জানো, তোমার আব্বু ছিল অসম্ভব সুদর্শন একজন মানুষ! এই দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তার বুকের মাঝে ছিল অসম্ভব ভালোবাসা। একদিন গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে সে তার প্রাণের বন্ধুদের নিয়ে মারা গেল। তখন সারা দেশের মানুষ খেপে উঠে বলল, এই দেশে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে আর কাউকে মরতে দেওয়া হবে না। দেশের মানুষ তখন পুরো দেশটাকে পাল্টে দিল। এখন আমাদের দেশে আর গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মানুষ মারা যায় না!’ আমরা তখন ছোট শিশুটির মাথায় হাত দিয়ে বলব, ‘তুমি তোমার আব্বুকে হারিয়েছ। কিন্তু তোমার আব্বুর জীবন দেওয়ার কারণে এই দেশের আর কোনো শিশুর আব্বু এভাবে মারা যায় না।" আমি জানি – এ স্বপ্নই থেকে যাবে। কারণ, আমাদের আবুল মন্ত্রী হাসে আর অনবরত প্রলাপ বকে। লোমেলা, আমার কথাগুলোও তোমার কাছে হয়তো প্রলাপ লাগছে। তোমাদের শহরে কি ঈদের আনন্দ আছে? আমাদের শহরে আছে যদিও ধর্ম উৎসব এবার শহীদ মিনারে যাচ্ছে ধোঁয়াটে কলামিস্টের হাত ধরে। শেষে বলোতো, মিরসরাইয়ের আবুতোরাব গ্রামে এবার ঈদের আনন্দ কেমন? চল্লিশ স্কুল ছাত্র ট্রাক উলটে মরে গিয়েছিল। স্কুলের চল্লিশটি ছাত্রের রোল নাম্বার ধরে আর ডাকা হয় না। এবার ঈদে কেমন থাকবে তাদের বাবা মা? ঈদে মেলা বসে আবুতোরাবে। খেলনা বেলুন বাঁশির পসরা বসে। চল্লিশটা শিশু সেখানে অনুপস্থিত। আমি যেমন করে তোমার অনুপস্থিতি টের পাই, কেউ কি তেমন করে টের পাবে শিশুগুলোর না থাকা? ধীরে ধীরে সব পুরনো হয়ে যায় আমাদের স্মৃতির মতো করে। উড়ে যায় দিন, বেদনার রঙ, শোক এবং সন্তাপ। সব পাখি কি আসলেই ঘরে ফিরে? কোনো এক নামহীন গোত্রহীন এক পাখি আমরা লালন করি। পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP