26 January, 2011

এ শহরে মানুষ হারিয়ে গেলে

স্কুল জীবন থেকে রেডিও শোনার ব্যাপক শখ আমার। রেডিও’র নানান অনুষ্ঠানে চিঠি লিখতাম, নাম শোনার অপেক্ষা করতাম। এসব স্মৃতি নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা এখনো আছে, লিখবো আগামীতে। কৈশোরের সে সময়ে রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা-খ চ্যানেলে দুপুর একটার ইংরেজী সংবাদের পরে থাকতো ‘নিখোঁজ সংবাদ’। হারিয়ে যাওয়া মানুষের সন্ধান বিজ্ঞপ্তি। ধীর উচ্চারণে জানানো হতো – কে কখন হারিয়ে গেছে, বয়স কতো, হারিয়ে যাওয়ার সময় গায়ে কী রকম পোশাক ছিল, কোন ভাষায় কথা বলে; এসব। বেশিরভাগের বয়স ছিল দশের নিচে। আম্মা আমাদের বলতেন, এদেরকে ছেলে-ধরা নিয়ে গেছে।
হয়তো ভয় দেখাতে বলতেন, যাতে খেলতে গেলে সাবধানে থাকি, চকলেট দেখিয়ে ডাকলে কারো সঙ্গে কোথাও না যাই...।
জানি না, ‘নিখোঁজ সংবাদ’ বিজ্ঞপ্তির হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো ঘরে ফিরেছিল কিনা।

দুপুরে বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান শুনি না অনেকদিন। তাই বলতে পারছি না, এখনো ‘নিখোঁজ সংবাদ’ প্রচারিত হয় কিনা। তবে মানুষ হারিয়ে যায় আমাদের ঢাকা শহরে। কেবল শিশু নয়, যুবক, মধ্য বয়সী, বৃদ্ধেরা হারিয়ে যায়; পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখি, মানুষের মুখে শুনি। স্বজন উধাও হয়ে যাওয়ার উৎকন্ঠাটা ঠিক বুঝতাম না যদি কিছুদিন আগে আমার কাজিন হারিয়ে না যেতেন।
তাঁর বয়স চল্লিশ। বিবাহিত। একমাত্র পুত্র সন্তানের বয়স সাত।
এক রাত এগারোটায় ফোন পেলাম, শনিবার ছুটির বিকেলে “হাঁটতে যাচ্ছি” বলে বাসা থেকে বেরিয়েছেন, প্রায়ই এরকম প্রায়ই বের হন, কিন্তু আর ঘরে ফেরেননি। মোবাইল ফোন বন্ধ। চেনা জানা যতো জায়গা আছে, খোঁজ নেয়া হয়েছে; পাওয়া যাচ্ছে না। এরকম নিপাট ভদ্রলোক, যিনি মোটামুটি ঘর-অফিস-ঘর করেন, কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত নেই বলেই আমরা সবাই জানি। এরকম একজন মানুষ উধাও হয়ে কোথায় যাবেন? প্রথমেই তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো কিছু বলে গেছে কিনা, পারিবারিক কলহ ছিল কিনা; বারবার জ্ঞান হারানো স্ত্রী জানান – সব কিছু স্বাভাবিক ছিল, কোনো সমস্যাই হয়নি। এরকম অবস্থায় মুরুব্বিদের সামাল দেয়াও কষ্ট। কান্নার রোল উঠলে আর থামাথামি নেই। এমন মধ্যরাতে আর কোথায় খোঁজ খবর করবো? এসব ভেবে ভেবে শেষে একজন গিয়ে থানায় জিডি করে আসেন। আশেপাশে কয়েকটা হাসপাতালে খবর নেয়া হয়। কোথাও নেই।
এসব করে করে ঘড়িতে রাত আড়াইটা।
কাজিনের মোবাইলে বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বন্ধ। বন্ধ। বন্ধ।

মুখে না বললেও আমাদের মনের ভেতরে নানান কু-ডাক ডাকে।
কোটি মানুষের এ ঢাকা শহরে – এতসব অলিগলির ইট-পাথরের জঙ্গলে কোথায় খোঁজ করবো?
কতো কিছু হতে পারে!
সড়ক দূর্ঘটনা হতে পারে।
ছিনতাইকারী আহত করে রাস্তার পাশে ফেলে যেতে পারে।
অপহৃত হতে পারে।
মলম পার্টির খপ্পরে পড়তে পারে।
অসম্ভব নয়, [সন্দেহজনক ভিত্তিতে] র্যা বও ধরে নিয়ে যেতে পারে।

রাত তিনটায়ও যখন কোনো খবর পাওয়া গেল না, তখন আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই – ওপরের কিছু একটা ঘটেছে। মন্দের ভালো হিসেবে সড়ক দূর্ঘটনাকেই ভাবতে ভালো লাগে। কিন্তু, যে শহরের অলিতে গলিতে ক্লিনিক, হসপিটাল; সংখ্যায় অগুনতি, তখন কোথায় ফোন করবো? বড় সরকারী হসপিটালগুলোয় হয়তো সন্ধান নেয়া যায়, কিন্তু সেটাও সকালের আগে নয়।
অপহৃত হলে হয়তো মুক্তিপণের জন্য ফোন আসবে। এ শংকাও আমাদের মনে জাগে, হয়তো সারা রাত টেনশনে রেখে সকালে মুক্তিপণ চাইবে। হয়তো এটাও অপহরণকারীদের একটা টেকনিক। এসব আমরা কেবল নাটক-সিনেমাতেই দেখেছি, আমাদের নিজস্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির খপ্পরে পড়লে পরিণতি হয়তো আরো খারাপ হতে পারে। এর কিছুদিন আগে এক টিভি চ্যানেলের রিপোর্টারকে ঢাকা থেকে তুলে নিয়েছিল মলম পার্টি, লাশ পাওয়া গেছে ৩দিন পরে আশুলিয়ায়। সন্দেহের একেবারে শেষ ইস্যুটিও অস্বাভাবিক নয়। চুয়ান্ন ধারার চেয়েও শক্তিশালী ক্ষমতা তাঁদের...।

এসব টেনশনে জেগে থেকে সে রাতে একটা সম্ভাব্য-সেবার কথা আসলো মনে।
এমন যদি কোনো সংস্থা থাকতো যারা নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে তথ্য দেবে। যতগুলো অস্বাভাবিক ঘটনা/দূর্ঘটনা থানায় রিপোর্ট হয়, যতগুলো দূর্ঘটনা কবলিত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়; তাদের একটা বিবরণ থাকবে ঐ সেবা সংস্থার কাছে। হাসপাতাল ও থানার সাথে সংস্থাটির যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থাকবে, প্রতি আট ঘন্টা পরপর তথ্যগুলো আপডেট করা হবে। শহরের অর্ধেক হাসপাতালকে এবং সব থানাকে এ নেটওয়ার্কে যোগ করা গেলে, ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষের’ স্বজনরা সন্ধান প্রক্রিয়ায় কিছুটা হলেও সহায়তা পাবেন। অন্ততঃ এটুকু জানতে পারবেন যে, এতগুলো থানা এবং এতগুলো হাসপাতাল জানাচ্ছে এ-ই...। অন্যভাবে চিন্তা করলে, অমন বিপদের সময়ে অনেকগুলো থানা এবং হাসপাতালে ঘোরার ঝামেলা কমে যাবে।
জানি না, বাস্তবে এ সেবা সংস্থা চালু করা সম্ভব কিনা।
কাজিন-হারিয়ে-যাওয়ার সে রাতে যখন ‘কোথায় গেলে খোঁজ পাওয়া যেতে পারে’; এমন চিন্তা যখন মাথায়-বুকে পাথর হয়ে চেপে আসে, তখন চরম কল্পনা হিসেবে এ ভাবনা মাথায় এসেছিল।
পরে মনে হয়েছে, এখনো আমাদের নিত্য নাগরিক সেবাগুলোর জন্য লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়। যে শহরে বিদ্যুৎ-পানির সংকট, দুপুর একটায় যে শহরের বেশিরভাগ এলাকায় গ্যাসের সংকট থাকে; সে শহরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সন্ধানে এমন ‘সম্ভাব্য সেবা’ নিতান্তই ফ্যান্টাসি...।

সকাল সাতটায়ও কাজিনের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
কাজিনের মোবাইল ফোনটি সর্বশেষ কোন নেটওয়ার্কের অধীনে ছিল, সে তথ্য কীভাবে জানা যায় – জানতে ফোন করলাম, একটি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে কাজ করেন এমন এক সচল-বন্ধুকে। তিনি পরামর্শও দিলেন। এর দশ মিনিট পরে খবর পেলাম কাজিনকে পাওয়া গেছে। মোবাইল ফোন অন করেছেন তিনি। রাতে এক বন্ধুর বাসায় ছিলেন, এখন অফিসের পথে আছেন।

কী হয়েছিল তার, কেন সারারাত মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল, কেন কোনো খবর দেননি; এসব জানাটাই তখন মূখ্য হয়ে ওঠে। সচল-বন্ধুটিকেও জানালাম ‘পাওয়া গেছে’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘গেছিলো কই?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘কী আর বলবো ভাই, এখন জানলাম – বৌয়ের সাথে অভিমানপর্ব...।’
সচল-বন্ধু বললেন, ‘বাসায় গিয়ে লাঠি নিয়ে দুইটারে পিটানি দেন।’

সকাল আটটায় আমাদের চরম উৎকন্ঠার ক্ষণ শেষ হয়। যতগুলো কু-ডাক মনে এসেছিল, সেগুলো সত্যি হয়নি; এটাই ছিল সে মুহূর্তের সবচে’ বড় সান্ত্বনা। ঐসব শংকার কোনো একটি সত্যি হয়ে গেলে, এ শহরে আমরা আসলেই অসহায়, খুব অসহায়।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP