11 June, 2010

তরবারী হাতে বিচারক পাঠক


[ব্যাপারটি আগেও একবার ভেবেছিলাম। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রবাহে আবার মাথাচাড়া দিলো। যেহেতু এ নিয়ে আমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি, যেহেতূ এখনো অনেক সম্পূরক-পরিপূরক ভাবনার অবকাশ রয়ে গেছে – তাই ভরা আসরে প্রস্তাবনা উত্থাপন থেকে বিরত থাকলাম আপাতত। বিক্ষিপ্তভাবে আসা ভাবনাগুলো এ মুহূর্তে লিখে রাখলাম নিজস্ব ব্লগস্পটে।]



প্রশ্ন হচ্ছেঃ
(১) বাংলা ব্লগস্ফিয়ারে একজন ব্লগ-লেখকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কতটুকু?
(২) প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্লগ পাঠকের ভূমিকা কী হবে?

প্রথম বিষয়টি নিয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি অবশ্য নেই। ব্লগস্পটে তো যা ইচ্ছা তা লেখা যায়, এমনকি কম্যুনিটি ব্লগগুলোয়ও রয়েছে ব্যাপক স্বাধীনতা। সংশ্লিষ্ট ব্লগগুলোর নীতিমালা, নিজস্ব চেতনাগত অবস্থান বিচারে এমন অনেক কিছু বলা যায় যা আমাদের প্রিন্ট মিডিয়া ছাপাতে সাহস করবে না। ব্লগের শক্তির আরেকটি উৎস হলো আলোচ্য বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া।
সব মিলিয়ে ব্লগের যে মিথষ্ক্রিয়া – পারষ্পরিক প্রতিক্রিয়া তা একজন লেখকের জন্য পরম পাওয়া।

অন্যদিকে, ব্লগের এ অসীম স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে অনেক আগেই অভিযোগ উঠেছিল লেখার মান নিয়ে। যেহেতূ কোনো সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে না, লেখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লেখা প্রকাশ করার সুযোগ থাকছে, তাই নিজের লেখা রিভিউর চর্চাও কমে যাচ্ছে। এর উপরে থাকে বন্ধুদের পিঠ চাপড়ানো ‘দারুণ হচ্ছে’/’চলুক’ টাইপ চলতি কমেন্ট। আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা মতে, এ ক্ষেত্রে একজন লেখককে আত্মসচেতন হতে হবে, নিজের লেখার মান নিয়ে নির্মোহ হতে হবে। প্রকাশ্য আলাপে সংকোচ থাকলে, মানসিক দিক থেকে কাছাকাছি এমন সহব্লগারের সঙ্গে মেইলে লেখা নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা বলে - এমন ব্যক্তিগত আলাপে অনেক খুটিনাটি ব্যাপার উঠে আসে। খেয়াল রাখা দরকার, লেখার স্বাধীনতা যেনো লেখকের আত্মবিশ্বাসের তোড়ে হাল্কা না হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্লগ পাঠকের ভূমিকা কী হবে?
বলতে দ্বিধা নেই - ছাপার মাধ্যমের একপক্ষীয় যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে অন্তর্জালভিত্তিক লেখালেখি। পিঠ চাপড়ানোর যে চর্চার কথা উপরে বলেছি, তার বিপরীত যে ঘটছে না, তা কিন্তু নয়।
ব্লগে লেখা প্রকাশের পরে একজন লেখক অপেক্ষায় থাকেন – কে কী বললো তা জানার জন্য। সে প্রতিক্রিয়ায়, লেখার প্রশংসার পাশাপাশি ভুল-ত্রুটি নিয়ে হরহামেশা চলে কাটাছেঁড়া। এসব প্রশংসা এবং নিন্দা শেষ বিচারে লেখকের জন্য ধনাত্বক প্রাপ্তি বলেই ধারণা করি।

কিন্তু, যে প্রশ্নটি এর আড়ালে অনুক্ত থাকছে তা হলো – প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে একজন পাঠক কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন?
প্রতিক্রিয়া নামক ধারালো অস্ত্রটি যখন পাঠকের হাতে তখন পাঠক কি নিতান্তই পাঠক থাকবেন, নাকি হয়ে উঠবেন সমালোচক, গবেষক কিংবা বিচারক?

মাঝে মাঝে আমি শংকিত হই, যখন দেখি ব্লগের পাঠক আর পাঠক নেই – সমালোচকের স্তর পেরিয়ে পাঠক চলে গেছেন বিচারকের আসনে। সে আসনে বসে একজন পাঠক নিমিষেই দন্ড ঘোষণা করছেন লেখকের। লেখনীর নয়, মৃত্যুদন্ড ঘোষিত হচ্ছে লেখকের ক্ষমতার। যা লেখা হয়েছে তার মূল্যায়ন নয়, বিচারকের আসনে আসীন পাঠক বেশি আগ্রহী লেখাটি কীভাবে লেখা উচিত ছিলো, সে রায় পাঠের উচ্চকিত চিৎকারে।

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লেখককে আপাতঃ দৃষ্টিতে আক্রান্ত মনে না হলেও, আমি মনে করি এমন তরবারি-হাতে-বিচারক টাইপ আচরণ একজন লেখকের চিন্তার স্বাধীনতাকে সন্ত্রস্ত করে। চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলা ব্লগস্ফিয়ার শো-বিজ ট্যালেন্ট হান্টের রিয়েলিটি শো নয় যে বিচারক মাথা নেড়ে বলবেন, ‘ঐ যে ঐ জায়গাটা..., ওখানে নোড একটু কম হতে পারতো, ঐ যে ওটা... উচ্চারণ আরেকটু আবেগী হতে পারতো’।

আমি মনে করি, একজন পাঠক তার পাঠক-অবস্থানে অটুট থাকুক, স্পষ্ট কন্ঠে বলুক – লেখা ভালো লেগেছে কিংবা ভালো লাগেনি। কেনো ভালো লাগেনি, সেটাও পরিষ্কার করে বলুক। কিন্তু, লেখালেখির টোটকা কিংবা ফর্মুলা প্রেসক্রাইব করা থেকে বিরত থাকুক।

লেখক তার ইচ্ছামতো লিখুক।
লেখককে স্বাধীনতা দেয়া হোক।
শেষ পর্যন্ত লেখা টিকে থাকবে কি থাকবে না, সে মান বিচারের সিদ্ধান্ত লেখকের ওপরেই ছেড়ে দেয়া হোক। একজন লেখকের সব লেখা উচ্চ মানের হবে এমনটি সম্ভব নয়। লেখক ভালো লেখা লিখবেন, খারাপ লেখা লিখবেন। নিজের লেখা নিয়ে নিজেকে পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবেন। সময় পেরিয়ে নিজের লেখালেখির দিকে তাকিয়ে ভাববেন, পাঠকের প্রতিক্রিয়া কী ছিলো। নিজের পুরনো লেখাকে নিজেই গ্রহণ কিংবা বর্জন করবেন। সম্ভাব্য লেখকের সামনে এ সুযোগ তৈরি করে দেয়ার দায়িত্ব আর কারো নয়, শুধুই বর্তমান পাঠকের।

তাই ভাবছি, তরবারী-হাতে-বিচারক হয়ে যাওয়াটা একজন পাঠকের জন্য কি খুব জরুরী?
.
.
.

5 মন্তব্য::

মারুফ 15 June, 2010  

আপনার সাথে আমিও একমত

রেজওয়ান 17 June, 2010  

আপনার ভাবনাগুলো খুবই যৌক্তিক। আমার মনে হয় সময় এসেছে লেখকদের নিজের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবা। নিজস্ব ব্লগ যেমন লেখার স্বাধীনতা দেয় তার পাশাপাশি লেখকের উপর চাপও থাকে কম। কমিউনিটি ব্লগের পাশাপাশি নিজেরও একটি টিকানা থাকা দরকার।

কমিউনিটি ব্লগের সমস্যা হলো যখন এটি বিস্তৃতি লাভ করে তখন আর সেই আটোসাটো সঙ্ঘ বোধটি থাকেনা। এটি ক্ষমতার লড়াই ও নানা গ্রুপিংয়ের ঝামেলায় পরে। আপনি দেখবেন চেনা জানা মানুষের লেখাই কমেন্ট পড়ছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে হেয় করতে চেষ্টা করে। একজন নতুন লেখকের লেখা বা অপছন্দের কারও লেখা দেখবেন পড়াই হচ্ছে কম।

আমি নিজে ব্লগে লিখি আমার লেখার চর্চা করতে ও মনের ভাব প্রকাশ করতে - কিন্তু আমার যদি ভয় খাবে আমার লেখা নিয়ে গোষ্ঠিবদ্ধ আক্রমণ করা হবে - গঠনমূলক সমালোচনার বদলে অথবা পড়াই হবে না - তাহলে লেখার আগ্রহ কমে যায় বইকি।

তবে যেহেতু এই মাধ্যমটি নতুন - আমাদের এই তিক্তমধুর অভিজ্ঞতাগুলো হয়ত ভবিষ্যৎে ভাল কোন কিছু করতে সাহায্য করবে।

আমার মনে হয় ব্লগকে বিভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক কাজে ব্যবহার করা উচিৎ - যেমন নারীদের অধিকার নিয়ে লেখা বা শিক্ষানীতি নিয়ে (গৌতমের প্রচেষ্টা আছে সেরকম) - আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো জন্মযুদ্ধের মত উদ্যোগ হয়েছেই (যদিও টেকেনি) - অথবা ধরুন চারপাঁচজন মিলে একটি উপন্যাস লেখা। তাহলে বিভেদ ভুলে একসাথে কাজ করা যাবে।

আনোয়ার সাদাত শিমুল 18 June, 2010  

ধন্যবাদ, মারুফ।

রেজওয়ান ভাই,
আপনার কথাগুলো ভালো লাগলো খুব। সংঘবদ্ধতার বিস্তৃতিতে কিছু গ্রুপ সাব-গ্রুপ বোধ হয় অনিবার্য। অনেকক্ষেত্রে এমনও হয় যে, ব্যস্ততার মধ্যে কেবল চেনা জানা লোকদের লেখায় কমেন্ট করা হয়।

আমিও আশাবাদী, বাংলায় একসময় বিশেষায়িত ব্লগিং হবে। যেমন, হার্টের রোগীদের একটা ব্লগ থাকবে, যেখানে রোগীরা নিজেদের ডায়েরি লিখবে, একে অন্যের লাইফ স্টাইল শেয়ার করবে। যেমন থাকবে, ডায়াবেটিস রোগীদেরও ব্লগ।
থাকতে পারে, বিভিন্ন পেশাজীবিদের ব্লগ। পুলিশদের একটা ব্লগ হতে পারে, যেখানে কেবল বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশরা লিখবেন তাদের পেশার নানান দিক, অভিজ্ঞতা নিয়ে...।
অনেক ধন্যবাদ।

kallol lahiri 25 June, 2010  

আনোয়ার আপনার ব্লগটি খুব সুন্দর। শুভেচ্ছা রইলো।

মুকুল 14 July, 2010  

হক কথা।
"তরবারী হাতে পাঠকের প্রতিক্রিয়া" শব্দগুলো বিষয়টিকে দারুণভাবে প্রকাশ করেছে। :-)

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP