29 March, 2010

ফেসবুক - ব্যক্তিগত বনাম সামাজিক

প্রথমে ছিলাম অর্কুটে। দশ বারো জন বন্ধুর মতো ছিলো। ব্লগেরই সবাই। ওয়ালে স্ক্র্যাপ করা হতো, ফটোতে কমেন্ট। হঠাৎ করে দেখি সবাই ফেসবুকে যাচ্ছে। ফেসবুক ইনভাইটেশন আসছে। জয়েনও করলাম, কিন্তু ভালো লাগলো না কেনো জানি। সম্ভবত ইউজার ফ্রেন্ডলি মনে হয়নি। অনেকদিন প্রোফাইলে একটা ইমেজ ঝুলিয়ে রেখেছিলাম যাতে লেখা ছিল - "ফেসবুক ভাল্লাগে না"।
২০০৮ এর শেষভাগে ফেসবুকে আসলাম, এবং আসক্ত হলাম।
বাড়তে থাকে বন্ধুর সংখ্যা।

ব্যক্তিগত জীবনে আমার এমনিতেই বন্ধু-বান্ধব কম, তাই পুরনো বন্ধু বলতে ছাত্রজীবনে হাতে গোনা কয়েকজন ফেসবুকে বন্ধু হলো, আর থাকলো/থাকলেন ২০০৬এর মাঝামাঝি থেকে আমার ২য় জীবন হয়ে ওঠা ব্লগ/ফোরামের বন্ধুরা। টের পাই - ফেসবুক খারাপ লাগে না, সবার সাথে যোগাযোগ রাখা যায়, ছবি দেখা যায়, লিংক শেয়ার করা যায়, অন্যের শেয়ার করা লিংক দেখা যায়। স্ট্যাটাসে কার মন খারাপ, কার ঘুম হয়নি কিংবা কে ডিম সেদ্ধ করছে সেসবও দেখি, লিখি। মাঝে একটা এপ্লিকেশনে চেক করে দেখেছিলাম - প্রথম বছরে আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি প্রায় ৪০০র মতো। মানে প্রতিদিন গড়ে একটারও বেশি!

সমস্যাটা (যদি সমস্যা ধরি আর কি) শুরু হলো অন্য জায়গায়।
আমার বিদেশী বন্ধুরা এড করল ফেসবুকে আর অভিযোগ করলো আমার পৃষ্ঠায় গেলে কিছু পড়া যায় না। হুম, ঠিক - আমি তো সব স্ট্যাটাস কমেন্ট মোটামুটি বাংলাতেই করি। আরেকটি সমস্যা হলো - তা-ই-মু টাইপের পোলাপাইন যদি আমার বিদেশী বন্ধুদের ফ্রেন্ড ইনভাইটেশন পাঠিয়ে বিব্রত করে! এসব ভেবে আরেকটা ফেসবুক একাউন্ট খুললাম, যেখানে আমি পড়ালেখা নিয়ে স্ট্যাটাস দেই, ক্লাসের প্রফেসরের পাগলামি নিয়ে নোট লিখি, এলামনাই-ফ্যালামনাই টাইপ অনুষ্ঠানে যাবো কি যাবো না সেসব লিখি...। কালেভদ্রে দশ বারোদিন পরপর ওখানে গিয়ে একে-ওকে হ্যাপি বার্থডে বলে আসি। ...এভাবেই চলতে থাকে।

সমস্যার (অথবা ভাবনার) ২য় পর্যায় শুরু হয় এরপরে...।
আমার এই (মূল) একাউন্টে প্রতিদিন ফ্রেন্ড ইনভাইটেশন আসতে থাকে। চেনা নাম, অচেনা নাম, নিক, শিঙালো তামিল নায়িকার ছবি ঝোলানো বন্ধুহীন তরুণী। যাদের চিনি না তাদের ইগনোর করতে দ্বিধা করি না।
কিন্তু - সমস্যা হলো কেবল ব্লগে পোস্ট পড়া সেইসব মানুষ যাঁরা হয়তো ভালো মনেই ফ্রেন্ডশীপ ইনভাইটেশন পাঠিয়েছেন, তাদেরকে নিয়ে। গ্রহণ কিংবা বর্জন কোনোটাতেই ক্লিক করতে পারছি না। তাই এরকম ইনভাইটেশন ঝুলতেই থাকে, ঝুলতেই থাকে। এ বছরের শুরুতে এসে তাদের সংখ্যা প্রায় শ' ছুঁই ছুঁই।
গত ছয় মাসে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির কারণে এ ইনভাইটেশন বাড়ছে। মাঝে কিছু ঝাড়াঝাড়ি করলেও - ফেসবুকে বন্ধু হতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা তিন অংকের সংখ্যায় পৌঁছে গেছে। ইদানিং দেখা সাক্ষাতে কয়েকজন বলেই ফেললেন - 'ফেসবুকে ইনভাইট করলাম, এড করেননি তো!'
একজনকে বলেছিলাম - 'তাই নাকি! ফেসবুকে যাওয়া হয়নি কয়েকদিন'।
পরে এ শংকাও হলো - কমন ফ্রেন্ডের লেটেস্ট স্ট্যাটাসে তিনি হয়তো দেখেছেন আমি গতরাতে ৭টা কমেন্ট করেছি!

সামাজিক প্লাটফরম ফেসবুককে আমি যতোটা না সামাজিক স্পেস ভেবেছি তার চেয়ে বেশি করেছি ব্যক্তিগত নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গা। এখানে আমি নির্ভার হয়ে যা খুশি বলতে পারি, করতে পারি। অথচ অচেনা-অল্পচেনা বন্ধুর কারণে একটা অস্বস্তির নিঃশ্বাস আমার ঘাঁড়ের ওপরে পড়ে, মনে হয় কেউ যেনো আমাকে আড়াল থেকে দেখছে। নিজস্ব নিঃশ্বাসের নিকেতনে এ ব্যক্তিগত অপছন্দটি জোরালো শব্দে বলতেও সীমাবদ্ধতা কাজ করে, কাছের মানুষগুলো আবার না জানি ভুল বুঝে দূরে সরে যায়!

আজ বিকেলে ভাবলাম, ফেসবুকে যে-ই আসুক এড করে নেব।
আজ সন্ধ্যাতেই বন্ধু সংখ্যা ২১৩ হবে। আগামী মাসে ৫শ, তারপরে হাজার।
কেবল ব্যক্তিগত নিঃশ্বাস ফেলার এই অভ্যাসটুকু বাদ দিতে হবে সেই জনকোলাহলে...

1 মন্তব্য::

রাশেদ 16 August, 2010  

নাহ, তা হলো না। বন্ধু সংখ্যা আরো কমেছে মনে হলো আপনার।

"সামাজিক প্লাটফরম ফেসবুককে আমি যতোটা না সামাজিক স্পেস ভেবেছি তার চেয়ে বেশি করেছি ব্যক্তিগত নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গা। এখানে আমি নির্ভার হয়ে যা খুশি বলতে পারি, করতে পারি। অথচ অচেনা-অল্পচেনা বন্ধুর কারণে একটা অস্বস্তির নিঃশ্বাস আমার ঘাঁড়ের ওপরে পড়ে, মনে হয় কেউ যেনো আমাকে আড়াল থেকে দেখছে। নিজস্ব নিঃশ্বাসের নিকেতনে এ ব্যক্তিগত অপছন্দটি জোরালো শব্দে বলতেও সীমাবদ্ধতা কাজ করে, কাছের মানুষগুলো আবার না জানি ভুল বুঝে দূরে সরে যায়!"


নিদারুণ সত্য। ফেইসবুক ভালো লাগে না আর।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP