13 March, 2010

রকিবুলের অভিমান – বিদায়, ক্ষতি কার?

এ যাবতকাল বাংলাদেশের ক্রিকেটে যা কিছু ঘটেছে তাতে কোনো বরপুত্র কিংবা ওয়ান-ম্যান-শো’র ক্যারিশমাটিক হিরো মঞ্চে আসেনি এখনো। কোনো কোনো ম্যাচে বা সিরিজে একক নৈপূণ্যের কিছু ঘটনা অবশ্যই ঘটেছে, কিন্তু ধারাবাহিকতার তীব্র অভাবে মুছে গেছে সেসব স্মৃতি। ঊনিশশ’ চুরানব্বইতে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নাইরোবিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার পর ফিরতি সফরে বাংলাদেশে এসেছিল কেনিয়া - ঠিক এক বছর পরেই। সেবার বাংলাদেশ জাতীয় দল, যুবদল, এমনকি অনুর্ধ্ব উনিশ দলের সঙ্গেও সব ম্যাচে হেরেছিল কেনিয়া। হেরে গেলেও টানা প্রায় সব ম্যাচে বাংলাদেশের আতঙ্ক ছিলো দুইজন; স্টিভ টিকোলো, মরিস উদুম্বে। কেনিয়া মানে এই দুইজন, আর এই দুইজনের টিকে থাকা মানে প্রতিপক্ষের ওপরে চাপ। এরপরের বিশ্বকাপের তিন আসরে এই দুইজনই দেখিয়ে দিয়েছে কেনিয়ার সামর্থ্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়েছে অনেক, জয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু, পায়নি নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাটসম্যান কিংবা বোলার যে কিনা একাই পালটে দিতে পারে খেলার সমীকরণ...। বোলিং-ব্যাটিং-ফিল্ডিং; তিন ডিপার্টমেন্টে দারুণ খেললেই কেবল জয়ের দেখা মিলেছে কালেভদ্রে।

আশার ব্যাপার হলো – সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ কেবল অভিজ্ঞতা লাভ কিংবা সম্মানজনক পরাজয়ের লক্ষ্যে আর মাঠে নামে না, চেষ্টা করে নিজেদের সেরাটুকু খেলতে। আমরা দর্শকরাও আশায় থাকি - তামিম প্রথম পনেরো ওভারে ধুমাদুম কিছু পিটিয়ে দিলে, ইমরুল কায়েস বা জুনায়েদ সিদ্দিকী ঠান্ডা মাথায় সাপোর্ট দিলে, মাঝে এসে সাকিব-রকিবুল-মুশফিক-মাহমুদউল্ল্যাহ স্লগ ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলে, শেষে হয়তো নাঈম ইসলাম-রাজ্জাক কয়েকটা চার-ছয় মেরে দিলে বাংলাদেশ ‘কিছু একটা’ করেও ফেলতে পারে! কতোই বা আর করা হয় সবসময় – সেটাও বড় প্রশ্ন ইদানিং।

ঠিক এ অবস্থায় –রকিবুল হাসান নামের ব্যাটসম্যানটি উপেক্ষা-অভিমানের অনুযোগে দল ছেড়ে চলে গেলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কী-ই বা এসে যায়? রকিবুলের প্রোফাইল দেখছিলাম, আহামারী কোনো পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু, এরপরেও রকিবুলকে দলে রাখা যায় বলে মনে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে মনে পড়ে গত ওয়েস্ট-ইন্ডিজ সফরে সাকিবের সঙ্গে রকিবুলের কয়েকটি পার্টনারশীপের কথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি সিরিজে ওয়ান-ডে’তে রকিবুল বাদ পড়লেও প্র্যাকটিস ম্যাচে পরীক্ষা দিয়ে, ভালো পারফর্ম করে দলে ফিরবে এমন ইংগিতই দেখা দিয়েছিলো। এমনকি আশরাফুল-রকিবুলের মধ্যে এক রকম তুলনাও এসেছিল নানান পত্রিকা রিপোর্টে, এরকম শিরোনামে – ‘রকিবুল পেরেছেন, আশরাফুল পারেননি’।

কিন্তু, দলে ডাক পেয়েই সব রকম ম্যাচ থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে রকিবুল সবাইকে চমকে দেন। মিডিয়ায় উঠে আসে নানান সম্ভাব্যতার কথা। অভিমান, টিজিং, ব্যক্তিগত কারণ, বোর্ড-সিলেক্টরদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, নাকি মাশরাফি ঘটনার পুনরাবৃত্তি?

আজ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখছিলাম, রকিবুল মুখ খুলেছেন -
‘দল থেকে বাদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেবেছি যে আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে, আমার পারফরম্যান্স দিয়ে আবারও দলে ঢুকেই অবসর নেব।’ নিজেকে প্রমাণ করার জন্য রকিবুল বেছে নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচকেই, ‘তিন দিনের প্র্যাকটিস ম্যাচে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করি। এর পরই ঘোষণা করা হয় জাতীয় দল। এবং জাতীয় দলে সুযোগও পেলাম। এর পরই স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিলাম।’

এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, আবেগের পাশাপাশি ‘দেখিয়ে দেয়ার’ একরকম জেদও আছে। প্র্যাকটিস ম্যাচে সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি না করলে রকিবুল কি এ সিদ্ধান্ত নিতেন? কিংবা নিতে পারতেন? এখনো পর্যন্ত পাবলিক সেন্টিমেন্ট রকিবুলের পক্ষেই বলে মনে হচ্ছে। অন্ততঃ কোচ এবং বোর্ডের পক্ষ থেকে রকিবুলের সঙ্গে যোগাযোগের ও বোঝানোর যে খবরগুলো মিডিয়ায় এসেছে তাতে স্পষ্ট রকিবুল চাইলেই দলে ফিরতে পারেন। ব্যতিক্রম কেবল অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। সাকিব মনে করেন “এই সিদ্ধান্তটা আবেগ থেকে নেওয়া। এর ফলে রকিবুলই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং আগের ঘটনাগুলোতে (মাশরাফির সরে দাঁড়ানো জাতীয়) বোর্ড শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বলেই এই রকিবুল অধ্যায়”। সাকিবের এ মন্তব্যে অধিনায়কোচিত কাঠিন্য আছে, আবেগ বাদ দিয়ে বাস্তবতার ছাপ আছে; কিন্তু কিছুদিন আগে সাকিব-মাশরাফি শীতল সম্পর্ক নিয়ে ক্রিকেটীয় উত্তাপ চাপা দেয়ার একটা সুপ্ত সুক্ষ্ম চেষ্টাও আছে। একটি চলতি সিরিজে টীমমেটের নাটকীয় বিদায়ের কারণ যখন ঘোলাটে, তখন অধিনায়ক সাকিব এমন গরমাগরম বক্তৃতা দিয়ে কতোটা সুবিবেচনার পরিচয় দিলেন সেটা ক্রিকেট বোদ্ধারাই বিচার করবেন আগামীতে। টিভি চ্যানেলে এক সাক্ষাতকারে যেমনটা বলছিলেন সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল; ক’দিন আগে মাশরাফি এবং এখন রকিবুল নিয়ে যা ঘটলো এরকম যদি আরো কয়েকটি ঘটে, তাহলে ২০১১ এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল নির্বাচন হতে পারে সবচে’ সংবেদনশীল কাজ। বোর্ড এবং টীম ম্যানেজমেন্টের এখনি উচিত হবে ঘটনার পেছনের ঘটনা বিচার বিশ্লেষণ করা। কোচ জিমি সিডন্স যেমনটা বলছেন - পেছনে অন্য কিছুও আছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট পাকিস্তানের পথে যাচ্ছে কিনা সে প্রশ্নের জবাবে সিডন্স বলেছেন - 'আশা করি, সেদিকে যাবে না। পাকিস্তানের ক্রিকেটে তো এখন রীতিমতো হট্টগোলই চলছে। আমরা ওদের চেয়ে অনেকটাই সভ্য।'

রকিবুলের বিদায় নিয়ে আরেকটি ইন্টারেস্টিং খবর শেয়ার না করে পারছি না। চট্টগ্রাম থেকে সাইদুজ্জামানের পাঠানো রিপোর্টের সুত্রে দৈনিক কালের কন্ঠ প্রশ্ন তুলেছে “আধ্যাত্মিকতার আহ্বানেই রকিবুলের বিদায়!” রিপোর্টে বলা আছে – “ইদানীং তাঁর মধ্যে নাকি ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনাগুলো প্রাধান্য পেত বেশি। সুদ নিতে হবে না, এমন ব্যাংকে টাকা রাখতেন রকিবুল। তবে ধর্মের প্রতি অন্ধ অনুরাগ থেকেই জাগতিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন রকিবুল? 'টাকা দিয়ে কী হবে? কদিনই বা বাঁচব,' সতীর্থদের নাকি এমন কথাও বলতেন তিনি। এই মানসিকতার কারণেই হয়তো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের চেয়ে রকিবুলের কাছে দল থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে”।

রকিবুল নিয়ে আরো কয়েকদিন মিডিয়ায় হৈ-চৈ হবে নিশ্চয়। গাল-গপ্প রটবে আরো বেশ কিছু হয়তো। তবে এটা নিশ্চিত - বিদায়ী রকিবুল হারিয়ে যাবেন, বিস্মৃত হবেন। পদ্মা-মেঘনায় যেমন করে অনেক জল বয়ে যাবে, তেমনি বিশ্ব ক্রিকেটের মাঠে শত শত ওভার বল করা হবে, রান হবে হাজারে হাজার, দর্শক হাততালি দেবে উল্লাস করবে নতুন কোনো খেলোয়াড়ের চার-ছয়- সেঞ্চুরীতে।

বাইশ বছর বয়েসী অভিমানী রকিবুল, হায়, রকিবুল, হায়!
পৃথিবী খুব কঠিন জায়গা, এখানে চলে গেলে কেউ কাউকে মনে রাখে না। আমাদের বিকাশমান এ ব্লগ সমাজ থেকে কতো কতো অভিমানী চলে গেলো, কিছুদিন হৈ-চৈ হলো, কিন্তু তারপরে? মান্না দে যেমন দেখে গেছেন - কফি হাউজের সাতটি চেয়ার সাতটি পেয়ালা খালি থাকেনি। কিছু থেমে থাকেনি, থাকে না, থাকবেও না। নিরালা ডাকনামের রকিবুল হাসান সদ্দিচ্ছায় চলে গেলে কী-ই বা হবে আর!

এই সচলায়তনেই কে যেনো কবে বলেছিলো - আবেগ বড্ডো বিধ্বংসী। অপটু ব্যবহারে নিজেরই সর্বনাশ হয়।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP