27 November, 2009

পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা...

অভিযোগটা করেছেন, নজমুল আলবাব – ‘তুমি বিদেশেই ভালো ছিলা, দেশে এসে উধাও’। এক বিন্দুও ভুল নেই এই অভিযোগ অথবা অনুযোগে। আড়াই মাসের বেশি সময় চলে গেলো, অথচ মনে হয় - টেরই পেলাম না। ব্যস্ততায়, কোলাহলে, ঘনিষ্ঠতায় – এমনই হয়তো স্বাভাবিক। ভার্চুয়াল জগতে উধাও হওয়ার পেছনে দুটো শক্ত কারণ আলবাব ভাইকে বলার পরে তিনি মেনে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘যত দ্রুত পারো নেটে রেগুলার হও’। আমিও শনিবার রবিবার হাঁকাই, এখানে সেখানে - ফেসবুকে। এ সপ্তাহ নয়তো অন্য সপ্তাহ। নকিয়া সিক্স জিরো টু জিরোর ডাটা কেবল কেনা হয় না, যেমন পাইনা ব্রডব্যান্ডের নির্ভরযোগ্য লাইন। চারিদিকে কিউবি’র বিজ্ঞাপন। আসছে অথবা এসে গেছে বাংলালায়ন। আরো কেউ কেউ আসবে সামনে। ‘হায় চিল, সোনালী ডানার চিল’।

দুই-
প্রশ্নটা অস্বাভাবিক নয়।
প্রবাসী কেউ দেশে ফিরলে বন্ধু-স্বজন মিষ্টি মিষ্টি মুখে জিজ্ঞেস করেন – ‘কেমন লাগছে দেশ’, ‘কেমন লাগছে ঢাকা শহর’? অল্প সময়ের জন্য আসলে হয়তো খানিকটা রোমান্টিসিজম কাজ করে। তাই ভালো লাগে – ধুলো, ধোঁয়া, যানজট, দারিদ্র্যের অগমে দুর্গমে থাকা মানুষের মুখ। ক্যামেরার ক্লিকে ধরা পড়ে ১৫ নম্বর রুটের বাস – মিরপুর টু সায়েদাবাদ, বিবর্ণ শরীর, ভাঙা গাল-চোয়ালের হেলপার। ঝাল মুড়ি আর বাদামের ঠোঙা হাতে ট্রাফিক জ্যামে বসে অনায়াসে বার্গার কিং’কে তুচ্ছ করা যায়। সিগন্যালে ফুলঅলা শিশুকে বিশ টাকা দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিজেকে স্পষ্ট করা যায়। করা যায় - এরকম আরো অনেক কিছু। কিন্তু, ফেরা যখন স্বল্প দিনের নয় – জীবন ও জীবিকার জন্য যখন সকাল সন্ধ্যা ছুটতে হয়; তখন ক্লান্তি আসে সহজে। সন্ধ্যায় সারি সারি গাড়ি, ঘর ফেরতা মানুষ, রাস্তার পাশে বিধ্বস্ত পঙ্গু ভিক্ষুক – মাটির শানকিতে পানতা ভাত – পাশে বসা নেড়ি কুকুরের অপলক চাহনি, একটু এগিয়ে কানাডিয়ান হাইকমিশন ভবনে আলো ছায়ার খেলা, ট্রাফিকের অপ্রয়োজনীয় লাল-হলুদ-সবুজ সংকেত। ১২ কিলোমিটার পথ পেরুতে দুই ঘন্টা পার। এসবের কোনো সমাধান যখন জানা থাকে না তখন একটাই হয়তো বলার থাকে – জানি না কী হবে, তবে এসব নিয়েই চলতে হয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যেমন তাঁর কলামে লিখেছেন – ‘ট্রাফিক জ্যামে বসে বসে মুখস্ত হয়ে গেছে দোকানের নাম, সাইনবোর্ড, মোড়ের পুলিসের চেহারা’। গত সপ্তায় বন্ধু-সহকর্মী রাকিব জিজ্ঞেস করছিলো একই প্রশ্ন, ‘কেমন লাগছে ঢাকা’? জবাবে বলি – ‘অপ্রত্যাশিত কিছু নেই। এই জ্যাম, এই লোডশেডিং – এসবই আমাদের। আমাদের ঢাকার’।

তিন-
ডে-লাইট সেভিং’এর সিদ্ধান্তে সময় পরিবর্তনে খুশী হয়েছিলাম প্রথমে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যুক্তিটি ভালো লেগেছিলো। আশাবাদী ছিলাম – হুট করে হয়তো আহামারী ফলাফল পাওয়া যাবে না। তবে পাঁচ সাত বছর পরে হয়তো বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমবে। তাই টেলিফোনে হেসে উড়িয়েছি – এই পরিবর্তন না মানা মানুষের গোয়ার্তুমিকে। এমনও বলেছি – আমাদের দেশের মানুষ পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না। অথচ দেশে ফেরার পরে টের পেয়েছি – সমস্যাটা অন্য কোথাও। কেনো এই সময় পরিবর্তন, কোন কোন সময়ে সময় পালটানো হবে – সেসব নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই, ব্যাখ্যা নেই। সেপ্টেম্বরের ১৯ অথবা অক্টোবরের একে পুরনো সময়ে ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো। ফেরা হয়নি। স্কুল-অফিসের সময় পালটিয়ে ডে-লাইট সেভিং টাইমকে চিরস্থায়ী করা হয়েছে। ব্যাপারটি হয়ে গেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাই ‘ডিজিটাল টাইম’ জাতীয় কটাক্ষে আর অবাক হই না। অবাক হই, এখনো অনেকে ঘড়ির সময় পাল্টায়নি। ‘ভাই, ক’টা বাজে?’ প্রশ্নের জবাবেও বিদ্রুপ – ‘কোনটা বলবো? আল্লার টাইম না বান্দার টাইম?’ ‘এখনকার সময় নাকি আগের সময়’ জাতীয় কথাও হরহামেশা কানে ভেসে আসে। পত্রিকায় পড়ছিলাম – ধানমন্ডির এক গৃহবধুর লেখা চিঠি - স্কুলে তাঁর বাচ্চার ক্লাস শুরু হয় সাতটায়। রওনা দিতে হয় সাড়ে ছয়টায়। আগের সময়ে – ভোর সাড়ে পাঁচটা। নভেম্বর/ডিসেম্বরে শীতের সকালে সাড়ে পাঁচটা মানে অন্ধকার! কেউ কি পড়েছেন সে চিঠি? নীতি-নির্ধারকদের কেউ কি ভাবছেন কিছু? সকাল সাড়ে সাতটায় বিবিসি বাংলার ‘প্রত্যূষা’ অনুষ্ঠানে পত্রিকা পর্যালোচনা পর্বে প্রতি সকালে একজন অতিথি আসেন আলোচক হিসেবে। সৌজন্যস্বরূপ বিবিসির সংবাদ পাঠককে প্রায়ই বলতে শুনি – ‘এত ভোরে – সূর্য ওঠার আগে প্রায় অন্ধকারে কষ্ট করে আপনি আমাদের স্টুডিওতে এসেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ’।

চার-
সিএনজি চালিত বেবি-ট্যাক্সি কিংবা কালো ক্যাবে জ্যামে বসে বসে ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প জুড়ি। বাজার দর, যানজট, মলম পার্টি – বিক্ষিপ্ত আলাপ। এ সপ্তায় সরকারী নির্দেশ এসেছে - সব সিএনজি ট্যাক্সি পেছনে দরজা লাগাতে হবে। ক’দিন আগেই ডেইলি স্টারে ছবি এসেছে উলটে যাওয়া সিএনজি বেবি-ট্যাক্সি থেকে এক মহিলাকে বের করা হচ্ছে। দরজা লাগানো হলে এ উদ্ধার কতটা সহজ কিংবা জটিল হবে সেসব জিজ্ঞেস করি। এক ড্রাইভারের শংকা অন্য জায়গায় – আগে লোকজন মাথা বের করে বমি করতো, এখন দরজা বন্ধ থাকার কারণে ভেতরেই বমি করতে হবে, তার গাড়ি নষ্ট হবে। খেয়াল করে দেখলাম – বেশির ভাগই দরজা লাগানোর হুকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ড্রাইভারের হাতে। যাত্রীর নিজের হাতে খোলার সাধ্য নেই। ব্যাপারটি স্বস্তিকর লাগলো না। পত্রিকার পাতায় হয়তো অন্যরকম ছিনতাইয়ের খবর আসবে সামনে। তবে যাত্রী ছিনতাই নয়, বেবি-ট্যাক্সি ছিনতাইয়ের গল্প শুনলাম – গাইবান্ধার হাসনাতের কাছে। হাসনাতের মেসবন্ধু বারীও বেবি-ট্যাক্সি চালায়। একদিন বারীর গাড়িতে ওঠে রূপবতী তরুণী। ভাসানটেক বেড়ি বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তরুণী থামতে বলে। আরো বলে – ‘একা একা ভালো লাগে না, একটু পেছনে এসে বসেন’। বারী বেসামাল হয়ে পেছনে গিয়ে বসে। তারপর তার চোখে মুখে কী একটা স্প্রে করে তরুণী। এরপরের ঘটনা আর মনে নেই। বারীর জ্ঞান ফেরে রাত দশটায়, বাঁধের দক্ষিণ পাশে। বেবি-ট্যাক্সি হাওয়া।

পাঁচ-
টিভি খুললেই শারমিন লাকী।
হেন কোনো পণ্য নাই যার বিজ্ঞাপনে শারমিন লাকী নাই।
আলু যেমন সব তরকারীতে মানায়, মওদূদ যেমন সব দল করে, শারমিন লাকী তেমনি সব...

ছয় -
মিরপুর থেকে বসুন্ধরা আ/এ যাওয়ার শর্টকাট পথ হলো ভাষানটেক হয়ে জিয়া কলোনী দিয়ে বের হওয়া। মূল রাস্তায় উঠতেই র্যাুডিসন। যানজট না থাকায় – সময় লাগে বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট। কিন্তু, অলিভ-এম্পায়ারের সামন্তদের প্রতাপ ভালো লাগে না। হুট করে একদিন গাড়ি ঘুরিয়ে দিলো। কোনো কারণ নেই, ব্যাখ্যা নেই। একটা সমাধান পাওয়া গেলো – যাওয়া কিংবা ফেরার পথে ‘মানিকদী বাজার যাবো’ বললেই পথ ছেড়ে দেবে। দুয়েকদিন ওরকম বলে - আসলাম এবং গেলাম। পরে আর ভালো লাগলো না। মিথ্যে বলার অপরাধবোধের চেয়েও আরেকটা গভীর হীনমন্যতা কাজ করে, নিজের কাছে নিজেকে ছোটো মনে হয় খুব। একরকম বিষাদ এবং অস্বস্তি ভর করে। কোথায় যেনো একটা দেয়াল লিখন দেখলাম - ‘খুন ও ক্ষরার অবেলায়, এতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই’।

সাত-
ঢাকায় হুট করে কালিজিরার চাহিদা বেড়ে গেছে, অথবা বিক্রি বেড়ে গেছে। কিংবা চাহিদা-বিক্রি নয়, বেড়েছে কেবল বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে আছে – মহানবীর বাণী, “একমাত্র মৃত্যুরোগ ছাড়া যাবতীয় রোগের মহৌষধ এই কালিজিরা”। উপযোগিতা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ মার্কেটিং মিক্সের ভাইটাল এলিমেন্ট হবে ধর্ম। স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে গাড়ির পেছনে ফেসিয়াল টিস্যুবক্সের পাশে সানন্দা এবং আমলে নাযাতের সহাবস্থান পুরনো হয়েছে অনেক আগে। সেদিন একটা মাইক্রোবাসে স্টিকার দেখলাম – ‘There is no god except prophet muhammad’. জ্ঞানহীন ধনীক সমাজের জীবনচর্চায় ধর্ম হয়তো এভাবেই থাকে। অবাক হই না।ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক রোকসানা রহমানকে শিমরাইলের পটেটো চিপস ফ্যাক্টরীতে বেশি সময় দিতে হয় আজকাল।

আট-
এফ এম রেডিও জকিদের খলবলানি কমেনি।
মেয়েলি কন্ঠের পুরুষ এবং ন্যাঁকা কন্ঠের নারী আর-জে বাড়ছে প্রতিদিন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপিত হচ্ছে আর-জে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। রেডিও টুডের আর-জে লিরব নাস্তানাবুদ হলো লাইভ ফোন কলে। লক্ষ্মীপুরের শফিকুল দরাজ কন্ঠে ঘোষণা করলো – ‘লিরব ভাই, আপনার কন্ঠ আমার খুব ভালো লাগে, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি, আপনার সাথে আমি প্রেম করতে চাই’।
আর-জে লিরব পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত, ‘না ভাই, এসব কী বলেন! আমি ওরকম না, আমি ভীষণ স্ট্রেইট ভাই’।
শফিকুল নাছোড়বান্দা, ‘আপনি যা-ই বলেন, আমি শুনবো না। আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনার সাথে প্রেম করতে চাই’।
শেষ পর্যন্ত ফোনের লাইন কেটে গান ছেড়ে পালালো আর-জে লিরব।
চ্যানেলগুলোর মাঝে আলাদা বিশেষত্ব নেই। কেবল এবিসি রেডিও বাংলা শব্দের প্রতি যত্নশীল। আর-জের বদলে কথাবন্ধু, এসএমএস এর বদলে ক্ষুদেবার্তা, মোবাইল ফোনের বদলে মুঠোফোন...। তবে নিয়মিত শ্রোতা হয়ে উঠেছি রেডিও ফূর্তির অনুষ্ঠান ‘ফুর ফুর ফুর্তি’র। ছড়াকার অনীক খান ও কার্টুনিস্ট শাহরিয়ার শরিফ জুটি জমিয়ে রাখে রাত বারোটা থেকে দুটা; রবি সোম মঙ্গল বুধ – এই চারদিন।

নয়-
পত্রিকা খুললেই বিজ্ঞাপন। ইউকে, সাইপ্রাস, সুইডেন যেন পাড়ার মোড়ের গলি। আইইএলটিএস সহ/ছাড়া, স্টাডি ব্রেক এলাউড, স্পন্সর সাপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিটসহ স্টুডেন্ট ভিসা, এয়ারটিকিট ফ্রি, ল্যাপটপ ফ্রি, থাকার ব্যবস্থা, এয়ারপোর্ট পিক আপ, ল্যান্ডিং এর পরে মোবাইল ফোন কানেকশন, এ টায়ার কলেজ, ৪ ঘন্টায় অফার লেটার, তিনদিনে ভিসা লেটার। কী নেই!

দশ-
এক সন্ধ্যায় রায়হান ফোন করে বলে – ‘চলেন এক সাথে বাসায় ফিরি’। এক ঠোঙায় চারটা সিঙ্গাড়া কিনে রাস্তায় গাড়ি খুঁজি। নীল ক্যাব পেয়ে দুজন চেপে বসি। সিঙ্গাড়ায় কামড় দিই, ট্রাফিক জ্যামে দেয়াল লিখন দেখি। সারা দেয়ালময় মতিউর রহমান আর লতিফুর রহমানের ছবি। বক্তব্য – “নাস্তিক প্রথম আলোর আলপিন ম্যাগাজিনে আমাদের প্রিয় মহানবীকে নিয়ে ‘ব্যাঙ্গাক্তক’ ছবি প্রকাশ কারীদের ফাঁসি চাই” – প্রচারে ধর্মপ্রাণ জনগণ। রায়হান আমাকে জিজ্ঞেস করে, “প্রথম আলো আর বসুন্ধরার লাগালাগি খেয়াল করছেন?”
বললাম, “হু, বসুন্ধরাও তো সম্ভবত পত্রিকা নিয়ে আসতেছে সামনে”।
“কিন্তু এতদিন পরে আলপিন নিয়ে টানাটানি কেন?” রায়হানের জিজ্ঞাসা।
উত্তরে গলা চড়িয়ে বসে ট্যাক্সি ড্রাইভার – “না ভাই, প্রথম আলো কাজটা ঠিক করে নাই...”
জিজ্ঞেস করলাম, “কোন কাজ?”
মাথার টুপিটা সামাল দিয়ে ড্রাইভার বলে, “আমাদের নবীজির কোনো ছবি কি আছে দুইন্যায়? তারা কোন সাহসে ছবি ছাপাইলো?”
আমার মজা লাগে। জামাল্গোটা তাহলে কেউ কেউ খায়।
রায়হান বেশ বিরক্ত, “ভাই, আপনি নিজের চোখে ঐ ছবি দেখছেন?”
সামনের রিক্সাকে পাশ কাটিয়ে ড্রাইভার পেছনে তাকায়, চেহারায় জেল্লা ফুটে উঠেছে – “আমি দেখি নাই, তবে এই কথাটা তো হাওয়া থেকে আসে নাই, অবশ্যই তারা ছবি আঁকছে”।
রায়হান কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো। আমি থামাই, “না, না। ঠিক আছে, মামা। আমিও শুনছি, ছবি আঁকছে। তারা কাজটা ঠিক করে নাই”।
রায়হান প্রথমে অবাক হলেও, বুঝে যায় পর মুহূর্তে।
আমার সাপোর্ট পেয়ে ড্রাইভার রায়হানের দিকে আঙুল তোলে – “এই দেশে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়, প্রথম আলোর সাম্বাদিকদেরও হবে। ৪টা সাম্বাদিকের ছবি দেখছেন না? ঐ চারটারে...”
রায়হান মুচকি হাসে, আস্তে করে আমাকে বলে – “দুইরকম পোস্টার দেখে চারজন মনে করছে”।
আমি আবার উস্কানি দিই, “মামা, মতিউর রহমান আর লতিফুর রহমান কি ভাই নাকি?”
ড্রাইভার চুপচাপ।
রায়হান কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে, আমি গুতা মেরে থামাই। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, “মামা কোন দল করেন, জামাত নাকি ইস্লামি ঐক্যজোট?”
“আমি কোনো দলে নাই। তবে তারা নবীজির ছবি এঁকে ভালো করে নাই”।
খানিক পরে আবার জিজ্ঞেস করি – “পত্রিকা কোনটা পড়েন – ইনকিলাব নাকি সংগ্রাম?”
“ঠিক নাই, যখন যেইটা পাই”।
বলি, “সংগ্রাম পইড়েন, ঐটা কিছুটা সঠিক খবর দেয়, নয়াদিগন্তও লাইনে আছে”।
রায়হান হাসি আঁটকাতে পারে না, বলে – “মানবজমিনও পড়তে পারেন, রঙিণ আছে”।
ড্রাইভার রায়হানের ওপরে চ্রম ব্রিক্ত। আমার সাথেও কথা বলছে না। শেষে নামার সময় ভাড়া দিয়ে বলি – “ঠিক আছে মামা, আসি। প্রথম আলো পইড়েন না, গুনাহ হবে”।
রায়হান হাসতেই আছে, “এই রকম করলেন কেন?”
“ধুর মিয়া, এই লম্বা যানজটে এরকম বিনোদন কই পাবা?”

এগারো -
টেলিভিশন চ্যানেলে নবাগত দেশ টিভি। অন্যগুলোর তুলনায় ভালো অনুষ্ঠান করে। সংবাদ, বিশেষ করে স্পোর্টস রিপোর্টিং’এ বেশ বিস্তারিত। দেশ টিভির খবর ভালো লাগার অন্য কারণটি পাপিষ্ঠ শিরোমণিদ্বয় ধুসর গোধুলি এবং পান্থ রহমান রেজা সহজেই অনুমান করতে পারবেন। সংবাদের মাঝেও অনন্য বিনোদন খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে বিয়েনপির নেত্রীকে বলি – এই বয়স্ক মানুষটিকে একটু অবসর দিন, মাথাটা ঠান্ডা করুক তিনি, বড়ো বেশি কথার চাপ। তাই অনেক বেশি অসংলগ্ন। ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টের প্রতিবাদে যে দু’দুটি চিঠি খন্দকার দেলোয়ার লিখেছেন, তার বিপরীতে ডেইলি স্টার যে জবাব দিয়েছে – স্কুল বিতর্কের নবীশরাও লজ্জা পাবে। কিন্তু দেলোয়ার কি থামবেন! “তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি”।

বারো –
“টুপুর ঐ মেইলের রিপ্লাই দেয়নি।
কিন্তু সেই ভোরবেলা যখন একাকী আমি, চরাচরে গভীর শুন্যতা তখন হঠাৎ করেই নিজের কাছে আমি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম – এই মেয়েটা যদি সত্যি কোনো দিন ডাকে আমাকে আমার মতো করে, আমি কি ফেরাতে পারবো?” (শমন শেকল ডানা, হাসান মোরশেদ)

তেরো-
নয় নভেম্বর, সকাল নয়টা। চলে গেলেন ছোটোদাদু, দাদী’মা আমার। যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন শুয়ে শুয়ে পাঁচ বছর। আগেরবার ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে যখন ফোন করি, জিজ্ঞেস করেন – “তুমি আসবা বলে কই গেলা?” বলেছিলাম, “অপেক্ষা করেন, আমি আসবো”। প্রবাসের অসংখ্য মুহূর্তে শংকা জেগেছে। দেখা হলো তবে এবার। মৃত্যুর পরে পত্রিকায় শোক কলামে লেখা হয়েছে – “১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন...”। শোক কিংবা সন্তাপের শব্দবন্ধ নয়। কেবলই অনুভব। আমার শৈশব, কতো কতো বিদ্যুৎহীন রাত, রূপকথা – রাজা-উজির-নাজির...। কতো কতো দুপুর, ভাত মেখে পাখির ডিম বানিয়ে একটা একটা করে খাওয়া - কবুতর, কোয়েল, টিয়া এবং চড়ুইয়ের ডিম। আহ! সেই ঘ্রাণ, স্পর্শ, মমতা। এভাবে চলে যাচ্ছে প্রিয় সব মুখ। “এই বাড়ির এইখানে এলে মনে পড়ে, কে যেনো কে নেই”।

চৌদ্দ-
অনেকদিন পরে কোরবাণীর ঈদ করছি দেশে। গ্রামে যাবো কাল সকালে। থাকার চেয়ে না থাকার অনুভবগুলো তীব্র হয়। সেইসব অনুভূতি নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। গল্প, দিনলিপি – অথবা নিছক ঝালমুড়ি। কোনো এক নামহীন পাঠক ব্লগস্পটে অনুযোগ করেছিলেন – কেবল মন খারাপের কথাই কেনো লিখি, কেনো আনন্দের ভালো লাগার কথা আসে না, ফেসবুকে গরুর মতো গল্প কেনো কম। ইচ্ছে ছিলো – মন ভালো করা একটা গল্প লিখবো, গরু-ফেসবুক কিংবা অন্য কিছু নিয়ে। লিখি লিখি করে আর লেখা হলো না। কখনো লেখা হবে কিনা জানি না। তবুও আশাবাদী হতে চাই। ব্লগিং’এ তুমুলভাবে নিয়মিত থাকতে চাই...

সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে – “অনেক দিনের পরে মিলে যাবে অবসর, আশা রাখি পেয়ে যাবো বাকী দু’আনা...”

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP