30 June, 2009

তুমি না থাকলে...

২০০৭ সালের ১৬ আগস্ট আমার কাছে ভীষণ মন খারাপের সকাল। আমার সে সময়কার অফিস দীর্ঘদিন ম্যানেজারহীন হয়ে থাকার পরে আমাদের কলিগদের মাঝে যে ‘টীম ওয়ার্ক’ গড়ে ওঠেছিলো তা ‘শ্যাষ’ হয়ে যাবে সেদিন। শুনেছি ইউএনডিপি-তে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে নেপাল থেকে আসছে নতুন ম্যানেজার। তাই আমরা অনুমান করে নিই - রুমের এক কোণায় একজন বয়স্ক ম্যানেজার বসে থাকবে। আর হৈ-হল্লা করা যাবে না, কাগজের প্লেন বানিয়ে এদিকে ওদিকে ছোড়া যাবে না। সবাই বিকল্প খুঁজতে গেলো – খবর পাওয়া গেলো - নতুন ভবনের সাত তলায় একটা খালি ছাঁদ-মতো আছে, সেখানে কারা কারা নাকি লাঞ্চের পরে সিগারেট খায়, আড্ডা দেয়। সিদ্ধান্ত হলো - আমরাও সেখানে চলে যাবো কাজের ফাঁকে।

কিন্তু, আমার মন খারাপ অন্য কারণে...
এতোদিন এই অফিসে কাজের ফাঁকে আমার নিত্য অকাজ, কিংবা কাজ না থাকলেও আমার যে তুমুল ব্যস্ততা তা আর কিছু নয় – সচলায়তন এবং জি-টক। কতো কতোদিন ঘন্টার পর ঘন্টা কতো পোস্ট পড়ে গেছি, কমেন্ট করে গেছি তার হিসেব নেই। বাসায় ইন্টারনেট ছিলো না একসময়, ব্লগে চোখ রেখে খেয়ালই করিনি বাইরে রাত হয়ে গেছে। এমন সব তুমুল অভ্যাস কী করে ছাড়ি কোথাকার কোন এক পাপিষ্ঠ ম্যানেজারের আগমনে?

প্রথম সপ্তাহ অনেক কষ্টে গেলো। নতুন ম্যানেজার মিটিং এর পরে মিটিং ডাকে। আমি প্রায়ই অন্যমনষ্ক হয়ে যাই – সচলে নতুন কী পোস্ট এলো, জি-টকে কে নক করলো – এসব ভেবে ভেবে। কাজের ফাঁকে সচলে উঁকি দিই, জি-টকে একে ওকে গুতাই – কেবল ভয়ে থাকি কখন না আবার ধরা পড়ি! ধরা অবশ্য পড়তেই হলো – আরও দিন কয়েক পর। জি-টক মিনিমাইজ করার পরে ম্যানেজার দুম করে জিজ্ঞেস করে – ‘ওটা কী লুকালা?’
আমি বলি- ‘কোথায় কী?’
ম্যানেজার মাথা নাড়ে – ‘না, আমি প্রায়ই দেখি – আমি এদিকে আসলে তুমি মনিটরে হুটহাট কী জানি করে ফেলো।’
আর চালাকি করা ঠিক হবে না ভেবে জি-টক দেখালাম। ম্যানেজার তখনো ইয়াহু এমএসএনে অভ্যস্ত। অফিসে ওগুলা ব্লকড। সুতরাং তাকে জি-টক শেখালাম। সেও মহাখুশী। আমি প্রায়ই দেখি – জিটকে আমার চেয়েও বেশি ব্যস্ত সে হাসি

এর পরের সপ্তায় আমাকে ধরলো সচলায়তনের পৃষ্ঠা খোলা দেখে।
‘এটা কী?’
আমরা তখন জি-টকে জি-টকে মাসতুতো ভাই হয়ে গেছি। ওকে বোঝালাম এটা একটা রাইটার্স কম্যুনিটি। কম্যুনিটি ব্লগ সাইট নিয়ে জ্ঞান দিলাম। তার ব্যাপক উৎসাহ। বললাম, তুমি চাইলে ব্লগস্পটে নিজের একটা সাইট খুলতে পারো। টুকটাক হেল্প করলাম। দ্বিতীয় দিনেই সে নিজের একটা ব্লগস্পট সাজিয়ে নিলো, এবং আমাকে এও বললো – এটা তার ডায়েরী, কেবল নিজের জন্য, অন্য কারো এক্সেস টেকনিক্যালি ব্লক করা আছে। আমি হাসি।

তবে চমক দেখলাম আরো তিনদিন পরে।
তার ভার্সিটির এলামনাই এসোসিয়েশনের জন্য সে গ্রুপ ব্লগ খুলেছে ব্লগস্পটে, সেখান থেকেই আপডেট হবে সব একটিভিটিজ! একটা নতুন গেজেট যোগ করে, আর আমাকে ডেকে বলে – ‘দেখে যাও এটা কেমন হলো।’
বিকেল হলে আমাকে জিজ্ঞেস করে – ‘আজ ব্লগে কমেন্ট কয়টা করলা?’

মাস ছয়েক পরে ঐ বস অন্য চাকরীতে চলে যায়।
শেষ দিন আমি বলি – ‘ব্লগিং ছেড়ো না’।
সে হাসে।
গত অক্টোবরের দিকে মেইল পেলাম। আমাকে লিখেছে – ‘আশা করছি ভালো আছো। আমার ব্লগের একটি লেখা নেপালের দৈনিক কান্তিপুরে ছাপা হয়েছে। লিংকটা দেখো। ব্লগিং শেখানোর জন্য থ্যাঙ্কস!’

-দুই-
বলা হয় সব শহরের একটি প্রতীক আছে।
লন্ডনের ঘড়ি, ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, চীনের প্রাচীর – আরো কতো কী...
কিন্তু, আমার কাছে এখন অনেক দেশ মানেই সেখানকার সচল।
অস্ট্রেলিয়া মানে কনফু-তিথি।
জার্মানী মানে – হিমু, বদ্দা, ধু-গো।
জাপান মানে – সৌরভ, জ্বিনের বাদশা।
নেদারল্যান্ড মানে –তানবীরা তালুকদার। আগে ছিলো - রুট গুলিট হাসি
স্কটল্যান্ড মানেই – হাসান মোরশেদ।
আরিজোনা মানে – এস এম মাহবুব মুর্শেদ।
তাইওয়ান মানে – মামুন হক।
সিঙ্গাপুর মানে – ফারুক হাসান।
আলাবামা মানেই –দ্রোহী।

আর কতো বলি?
শুধু কি জায়গার নাম? কতো শব্দের অর্থই তো বদলে গেছে অথবা একেবারে নতুন শব্দ –

ঠিকাছে।
উত্তম জাঝা।
বিপ্লব।
চ্রম খ্রাপ।
সেইরম।
হ।
ঞঁ!

-তিন-
উইন্ডজর সফর নিয়ে তিন তিনটি পোস্ট এসেছে এর আগে। যে কথা বলা হয়নি –

এই সফরে এই প্রথমবারের মতো বাকী ৪ জনকে দেখেছেন প্রকৃতিপ্রেমিক।
এই সফরে এই প্রথমবারের মতো বাকী ৪ জনকে দেখেছেন বিপ্র।
আমি-অমিত আর কিংকুর দেখা হয়েছে আগে। আমরা তিনজন এই প্রথম বারের মতো দেখেছি – প্র-প্রেমিক ও বিপ্রকে।
কিন্তু, যে দুইদিন উইন্ডজরে ছিলাম, ৫/৬ ঘন্টার ঘুম ছাড়া বিরতিহীন যে আড্ডা চলেছে – সেখানে একটিবারও মনে হয়নি আমাদের ৫ জনের এই প্রথম আড্ডা। মনেই হয়নি, আমাদের আগে কখনো দেখা হয়নি।
আমাদের আড্ডায় কথা বলার বিষয়ের কমতি ছিলো না।
আমাদের স্মৃতিচারণ ছিলো ব্যাপক।
আমাদের আগামীর কথা ছিলো আরও বেশি।

শেষে যখন বাসে উঠি মনে হয় – আরো কত্তো কথাই না বলা রয়ে গেলো...
বাসে ওঠার আগ মুহুর্তে আরেকবার ছুঁয়ে যাই মানুষগুলোর হাত, তখন মনে হয় এ-তো হাজার বছরের স্বজন, আমাদের পরিচয় উইন্ডজরে নয় – পিলী আইল্যান্ড বা ইরি নদীর উপরে দুলুনি দেয়া জীম্যান জাহাজে নয়, আমরা এমন করেই কাছাকাছি ছিলাম, আছি – আমাদেরই ঘরে...
আমাদের সে ঘরের নাম – সচলায়তন।
না দেখেও আমরা ভাই-বন্ধু-স্বজন, আত্মার আত্মীয়...।

-চার-

আজ হিমু ভাইয়ের পোস্টের ছবি দেখে – আরেকটা ছবি দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।
২০০৮ সালের, ২৭ মার্চ বৃহস্পতিবার – থাইল্যান্ডের কো-সামেট আইল্যান্ডে ।এভাবেই – সচলায়তন থাকে আমাদের সঙ্গে।
আমরাও সচলায়তনের... ।

জয়তু সচলায়তন!!!

0 Comments: