22 May, 2009

ভুলি নাই, জুবায়ের ভাই

আজ এখানে যখন বিকেল, বাংলাদেশে ঘড়ির কাঁটা আরেকদিনে গিয়ে ছুঁয়েছে। এর পরে অনেক সময় কাটালাম, এই একটা কথা ভেবে।
কী লিখবো!
নিশি পাওয়া মানুষ যেমন ঘরে ফিরতে পারে না, কেবল অন্ধকারে চক্কর খায়, তেমন করেই - তেমন করেই আমি আজ বিকেলের পর থেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছি। আগেও মাথায় ছিলো, মে মাস আসার পর থেকে প্রতিদিন ভেবেছি, ২২ তারিখ যেনো না ভুলি...। নাহ, ভুলিনি। কী করে ভুলি!
আমি নিজেই তো কথা দিয়েছিলাম, বাৎসরিক হিসেবে ৩৬৫ পরপর শুভকামনা জানাবো।
হ্যাঁ, বছর পেরিয়ে গেলো।
অতীতচারিতার দোষে অভিযুক্ত এ-ই আমি আজ ঠিক এই কাজটাই করতাম, প্রিন্ট স্ক্রীন নিয়ে বলতাম, 'দেখেন, ভুলি নাই'। এই কথার পরে একটা হাসির ইমো দিতাম। কিছুই হলো না। সে-ই প্রিন্ট স্ক্রীন দিলাম, আর কমেন্ট জুড়ে দীর্ঘশ্বাসের ভার।
ওপারে চলে যাওয়া মানুষ, প্রিয় জুবায়ের ভাই -
শুভ জন্মদিন!
_

ইচ্ছেটা গত সেপ্টেম্বর থেকেই। জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার সব কমেন্ট চালাচালি এক জায়গায় জড়ো করবো।
এরপরে ম্যাপেল পাতার দেশে বরফ জমে, বরফ গলে। ঠান্ডা বাতাস শেষে সামারের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন আসে। আমি কতো কিছুই করি, কতো ফালতু কাজে সময় কাটাই। কেবল, জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্টগুলো জড়ো করা হয় না। কেনো হয় না, এ প্রশ্নটা ক্রমশঃ জটিল লাগে। এই যেমন আজ অনেক ভেবেও সচলায়তনে কোনো পোস্ট দিতে পারলাম না, লেখার বাক্য খুঁজে পেলাম না। যা ভাবলাম তা কেবলই ব্যক্তিগত নিজস্ব অনুভূতি, প্রকাশ্যে বলতে পারবো না কেনো জানি না। যেমন জানি না এ জটিলতার মুক্তি কোথায়। মুক্তি পেলে হয়তো জেনে নিতাম, কেনো প্রিয় মানুষের বিদায় এবং অনুপস্থিতি এমন আক্রান্ত করে...।

জুবায়ের ভাইয়ের লেখা কোথায় প্রথম পড়েছিলাম তা নিয়ে লিখেছিলাম আগে।
খুব ভুল না বললে, জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম কমেন্ট চালাচালি এরকম।
_

৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৩৪
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লেখা।
আচ্ছা এ লেখাটি কি আগে কোথাও ছাপা হয়েছিল? মনে হচ্ছে, কোথায় যেন পড়েছিলাম!
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৩৯
comment by: অতিথি বলেছেন: আনোয়ার সাদাত শিমুল, আমার লেখা কাগজে ছাপা হলে কেউ পড়ে না বলে আমার ধারণা। আপনি ভুল প্রমাণ করলেন। লেখাটি যুগান্তরে ছাপা হয়েছিলো বছরখানেক আগে। প্রসঙ্গটি পুরনো হয়নি ভেবে ব্ল্লগে দেওয়া।
আর সবার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:০৭
comment by: অতিথি বলেছেন: রাইট, যুগান্তরে পড়েছিলাম।
আপনার আরো কিছু লেখাও আমি পড়েছি। কোন একটা বিষয়ে মন্তব্য প্রতিক্রিয়া ও ছিল। ঠিক মনে পড়ছে এখন...।
_
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:২৩
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, আপনার সরণশক্তি ভালো। এই লেখাটি নিয়েই খোন্দকার আলী আশরাফ একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন। দুঃখের বিষয়, তিনি কী বলতে চেয়েছেন আমি তার কিছুই বুঝিনি, সব মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিলো।

_

সামহোয়্যারইনব্লগের টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে - নামগুলো অতিথি হয়ে গেছে। মূল পোস্ট এটা ।
___

আমার স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারিত না করে তাহলে বলতে পারি, সা-ইনেই আমার এই পোস্টে জুবায়ের ভাইয়ের ১ম কমেন্ট পাই। আবার সেই 'অতিথি' হয়ে যাওয়া কমেন্ট -

১৮ ই মার্চ, ২০০৭ সকাল ৯:০৯
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, সময়ের টানাটানিতে খুব থাকি। অজুহাতটা ব্যবহার করতে ইচ্ছে হয় না। তবু বলি এই যে আপনার লেখাটা কয়েকদিন বিলম্বে পড়তে পারলাম, তা-ও ওই সময়ের আকালের জন্যে। পড়লাম তখন আমার এখানে রাত দেড়টা। ইচ্ছে আছে আপনার এবং আরো কয়েকজনের পোস্টগুলো পড়বো। তখন অনেক পুরনো লেখার ওপর মন্তব্য পেলে অবাক হবেন না আশা করি।

_

এরপরে আরেকটি অবাক ব্যাপার ঘটে।
এ যাবত আমার ছাইপাশ লেখাগুলোর মাঝে 'ছাদের কার্ণিশে কাক' নিয়ে নানান জনের মুখে উচ্ছ্বাস শুনেছি, এখনো শুনি। কালেভদ্রে দুয়েকজন অচেনা পাঠক মেইলও করেন। আমার অন্য কোনো লেখা নিয়ে এমন পাঠক প্রতিক্রিয়া পাইনি। এত কিছুর পরে, ইদানিং আমি বিশ্বাস করা শুরু করেছি, ছা/কা/কা আসলেই হয়তো সুখপাঠ্য কিছু ছিলো।
'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজ যেদিন শেষ করলাম, সেদিন হঠাৎ ১ম পর্বে জুবায়ের ভাইয়ের কমেন্ট -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৩৮
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: প্রথম বাক্যেই গেঁথে ফেললেন। "জীবন যেন অনেকগুলো পাসওয়ার্ডে আটকে আছে।"
আমি ঠিক করেছি আমার এই অসংখ্য পাসওয়ার্ড একটা ডাটাবেজে রাখবো। আর সেই ডাটাবেজ কীভাবে সুরক্ষিত করা যাবে? আরেকটি পাসোয়ার্ড দিয়ে!!!!

_

এখানে শেষ নয় -
২০ পর্ব একটানা পড়ে কয়েকপর্ব পরপর কমেন্ট করেছেন, কমেন্টে অনুমান করেছেন - আগামী পর্বে কী হতে পারে...। হুমায়ূনীয় বিভ্রাট থেকে মুক্ত হতে বলেছেন। এখনো ভেবে অবাক লাগে এমন করে কে-ই বা আপন করতে পারে!

শেষ পর্বে কমেন্ট করেছিলেন -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ১০:৩৫
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: শিমুল, সবগুলো পর্ব পড়া শেষ। খুব সুস্বাদু, গতিময় ও স্মার্ট গদ্য লেখার কৌশল তোমার দখলে। একজন পাঠকপ্রিয় এবং ভালো লেখক হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা তোমার আছে। বাকিটা তোমার ইচ্ছে ও লেগে থাকার ওপরে। একটা কথা বলি, গদ্যরচনাকে আমি বলি শব্দশ্রমিকের নির্মাণকর্ম। সেই পরিশ্রম করতে তুমি ইচ্ছুক হলে আমি খুশি হবো। জ্ঞান দিতে বসেছি ভেবো না। এগুলি আমার অকপট মত।
আচ্ছা, এই লেখাটিকে আরেকটু বাড়িয়ে রক্তমাংস যোগ করে উপন্যাস করে তোলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয়।
_
২৯ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:৫৯
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
ব্লগে লেখার সুবিধা হলো পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় খুব দ্রুত। বিগত ১১ মাস ব্লগিং করে টুকটাক লেখালেখির যা চেষ্টা করেছি তার মাঝে আপনার লেখা ও মন্তব্যের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য অবশ্যই ভাগ্যের ব্যাপার। 'ছাদের কার্ণিশে কাক' সিরিজে আপনার প্রতিটি মন্তব্য আমার জন্য আশীর্বাদ। ভালো লেগেছে - লেখার দূর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন, সাথে অনুপ্রেরণাসূচক মন্তব্যগুলোও সাহস যোগাবে। এ সাহসকে ভর করে আগামীতে উপন্যাস লেখার দু:সাহসও করে ফেলতে পারি! আপনার মতো একজন গুনী লেখককে সবিনয় কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধা জানাই।

_

কোনো কিছু লেখার পরে প্রিয় মানুষ এসে কমেন্ট করবেন, এমন আশাতেই থাকি। আমার লেখা একটা গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই কষ্ট পেয়েছিলেন। আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিলো, অবস্থান ছিলো। অথচ, কোনো ব্যাখ্যায় যেতে পারিনি। পালিয়ে বেড়িয়েছি। পরে অনুতপ্ত হয়েছি কমেন্টে। কিন্তু বিনিময়ে তিনি আরও বিনয়ী কমেন্ট করে আমাকে অবাক করেছেন। গত বইমেলায় আমার গল্প সংকলনে গল্পটি দেবো কিনা তা নিয়ে ভেবেছি বেশ কয়েকবার। পরে দিয়েছি, একটাই কারণ - আমি মনে রাখতে চাই - এই গল্প পড়ে জুবায়ের ভাই মনে কষ্ট পেয়েছিলেন, তাঁর কাছে গল্পের বিষয় ডিস্টার্বিং মনে হয়েছিলো...।
_

ব্লগে আমি সচরাচর কাউকে শুরুতেই 'তুমি' বলি না, অপরিচিত কেউ আমাকে 'তুমি' করে বলবেন - এটা একটু খটমটে লাগে। এর পরেও হৃদ্যতায় কারো কারো কাছে 'তুমি' সম্বোধন চেয়ে নিয়েছি। একেবারেই অদেখা মানুষ এঁরা।
জুবায়ের ভাই কি আসলেই অদেখা রয়ে গেলেন!

মনে আছে ছা/কা/কা'র ১ম পর্বে -

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৪২
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: জুবায়ের ভাই:
একটা অনুরোধ, আমি কি আপনার কাছ থেকে 'তুমি' সম্বোধন প্রত্যাশা করতে পারি!
পড়ার জন্য সবিনয় কৃতজ্ঞতা।
_
২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:২০
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: নিশ্চয়ই শিমুল। অনুমতি ব্যতিরেকে কী করে করি? এমন অনেককে জানি যারা সরাসরি তুমি বললে অফেন্ডেড হন। একটা বয়সে আমি নিজেও :-)। এখন তোমার অনুমতি মিললো, আর চিন্তা কী?

_

এভাবে অনেক অনেক কথা পালটা কথার স্মৃতি।
তাঁর বাসায় আমার খিচুড়ি খাওয়ার দাওয়াত, আমার শহরে তাঁকে চা'য়ের নিমন্ত্রণ...
কিছুই হয় না।
_

আমি থাইল্যান্ড ছাড়ি ১২ জুন, ২০০৮।
১১জুন রাত পর্যন্তও অনলাইনে ছিলাম। দেশে ফিরে বাসায় ইন্টারনেট ছিলো না। সাইবার ক্যাফেতে টুপ করে মেইল চেক করে বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু, জুবায়ের ভাই আমার আবদার ভুলেননি। 'পৌরুষ' উপন্যাসের পেছনের গল্প লিখেছেন। আমাকে অনলাইনে না দেখে মেসেজ দিয়েছেন -

হতে: মুহম্মদ জুবায়ের
প্রতি: আনোয়ার সাদাত শিমুল
বিষয়: পৌরুষ বিষয়ক কেচ্ছা
তারিখ: মঙ্গল, 2008-06-17 23:58
তোমার ফরমায়েশে লেখা, আর তুমিই ক'দিন ধরে নিখোঁজ!
http://www.sachalayatan.com/zubair/16053

_

লাল শাদা ম্যাপেল পাতার ভিসা আমার জন্য দুরহ হয়ে ওঠে।
উৎকন্ঠায় কাটে দিন রাত। এর মাঝে জুবায়ের ভাই অসুস্থ।
কুয়েত এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইটে ওঠার পরে আমার মনে হয় ভার্চুয়াল স্বজনদের কথা, মনে পড়ে - কেমন আছেন, জুবায়ের ভাই!
ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়ম এ চলে যাওয়া।
২৫ সেপ্টেম্বরে ড. ডেল কার্লের ক্লাসে বসে চোখের পানি আঁটকে, ভীষণ চাপা কান্নায় আমি লিখি - এই এলিজি আমি লিখতে চাইনি
_

এভাবেই জীবন বয়ে চলে আমাদের।
আমি শৌখিন ব্লগার মাঝে মাঝে গল্পকার হওয়ার লোভী স্বপন দেখি। লেখালেখি নিয়ে নানান দ্বন্দ্বে ভুগি। আগামীর পাওয়াটা শুন্য ধরে, পেছনে তাকালে দেখি - জুবায়ের ভাইয়ের মুঠো মুঠো ভালোবাসা, কমেন্ট- প্রেরণা।
আমি আবার বাসে উঠি, ট্রেন ধরি। মেইন স্ট্রীট, উডবাইন, ক্যাসেল ফ্র্যাঙ্ক ; এরকম করে স্টেশন পার হই। মাথায় গল্পের প্লট ঘুরঘুর করে। এরকম অনেক, ক্লান্তিময় বিকেলে, বরফ সফেদ দিনে, আমার মনে পড়ে। মনে পড়ে, জুবায়ের ভাই।

আপনি না ফেরার দেশে যাওয়া শিক্ষক সুরাইয়া খানমকে কথা দিয়েছিলেন, ২৫ মে'তে তাঁকে স্মরণ করবেন।
ঐ পোস্টের শুরুর কমেন্ট পালটা কমেন্টে আমিও তো কথা দিয়েছিলাম।
ঐদিনটির আশে পাশেই, আমি আপনাকে শুভকামনা জানাবো ৩৬৫ দিন পরপর।
আজ ২২ মে।
শুভ জন্মদিন, জুবায়ের ভাই।
প্রিয় জুবায়ের ভাই...



.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP