16 May, 2009

কাক্কুকে মনে পড়ে

এবার ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই টের পেলাম, পত্রিকায় লেখা 'গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত' শিরোনামটি মিথ্যে নয়। এ সময় এমন গরম পড়বে সেটা আগেই জানতাম। বাসায়ও বিদ্যুৎ নেই, ঘামে জবজব হয়ে বসে থাকি প্রথম দিন...
তবুও আমার প্রিয় শহর ঢাকা, কী এসে যায় গরমে?
জেট ল্যাগের জটিলতা কাটাতে না কাটাতে কাক্কুর ফোন।
'ভাতিজা, এইবারও দেখা না করে যাবা?'
আমি জবাবে বলি, ‘এই তো কাক্কু- কালকেই মধ্যেই আসবো, আপনি কি এখনো নয়া পল্টনের অফিসে?’
কাক্কু হেসে বলে - 'আর কই যাবো বলো, কালো গাউনের মানুষ আমরা, কতোই বা পাই?'
ফোন রেখে আমি কাক্কুর কথা ভাবি।
আহা! কতোদিন পরে দেখা হবে, সে-ই কবে হাইকোর্টের মোড়ে চা-সিগারেট খাওয়ালো, আর দেখা নেই।

-দুই-
প্রিয় পাঠক,
আপনারা হয়তো ভাবছেন, এ আমি কোন কাক্কুর কথা শুরু করলাম। একটু সবুর করুন, একটু বসুন-
আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, এ কাক্কু আমার একার সম্পত্তি নয়। এ কাক্কু আপনাদের অনেকেরই চেনা, আপনারা অনেকেই তাকে কাক্কু ডাকেন। এবং আমি এ ও নিশ্চিত - আমার মতো খানিক নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে - আপনাদেরকেও কাক্কু এইভাবে ফোনে ডেকে অফিস যেতে বলবে। বলবে, ভাতিজারে নদীর পানি সমস্যার কিছু তো করতে পারলাম না...।

প্রস্তর যুগের ব্লগার যারা আছেন, তারা নিশ্চয় বুঝে গেছেন আমি কোন কাক্কুর কথা বলছি। হ্যাঁ, তিনিই। আমি সেই কবে কখন তার অফিসে কেনো গিয়েছিলাম মনে নেই। প্রেসক্লাব পার হলে বাসের হেলপার ‘জিপিও পল্টন গুলিস্তান নামেন’ হাঁক দিলে আমি নামি। সেগুনবাগিচার দিকে চলে যাওয়া রাস্তায় – উর্মি ট্রেডিং, হোটেল মেট্রোপলিটন, ফ্লেশপটস রেস্তঁরা খুঁজি। কিছু নেই, বদলে গেছে সব। তবে, পুরনো সিঁড়ি ভেঙে কাক্কুর অফিসে উঠতে একেবারেই কষ্ট হলো না। সেক্রেটারীর রুম পার হয়ে কাক্কুর রুমে গিয়ে ঢুকতেই দুটো জিনিস চোখে পড়লো; কাক্কু অফিসে এসি লাগিয়েছে, কাক্কু এখন কম্পিউটার ইউজ করে।
কম্পিউটারের ব্যাপারটি নতুন নয়, কারণ – আমি জানি, তেমনি আপনারাও জানেন কাক্কু কী করে গত তিন বছরে বাংলা ব্লগের কিংবদন্তি ব্লগার হয়ে গেছেন।
আমাকে দেখেই কাক্কু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। আহা, কী অমায়িক চেহারা, সিঁথি করা চুল, পরিপাটি গোঁফ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, সে-ই ট্রেড মার্ক স্যুট, টাই...।
আমাকে চেয়ারে বসতে বলে কাক্কু টেবিলে রাখা পেপারওয়েট লাটিমের মতো করে ঘুরায়। মিষ্টি হেসে আমাকে বলে, ‘ভাতিজারে তুই কানাডা থেকে আমার জন্য মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে আসলি রে...’।
আমি কাক্কুর কথা বুঝি না।
এই অল্প সময়ের জন্য ঢাকা গিয়েছি সত্য, কিন্তু কারও জন্য কিছু নিতে পারিনি। কাক্কু কী মানিপ্ল্যান্টের কথা বললো বুঝতে পারলাম না। অধুনা চশমা পড়া এই আমি কাক্কুর চশমা ভেদ করে তার চোখে তাকাই। সেখানে গোল দুটি চোখ মার্বেলের মতো ঘুরছে। যেনো গহর বাদশা বানেছা পরী সিনেমার খলনায়ক, চুরি করে আনা রাজকন্যার বয়স পনেরো হবে আজ, আর সে সন্ধ্যায় তাকে কুরবানী দিয়ে অমরত্ব লাভের লোভে চোখ দুটো জলজ্বল করছে তার...।
আমার আগ্রহ আরো উস্কে দিয়ে তিনি বলেন, একটু বসো- দেখবে তামাশা।

আমার কল্পনা প্রবণ মনে আমি ঘুড়ি ওড়াই।
ভাবি – কাক্কু তার নদীর পানি সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছে। টিপাইমুখী বাঁধ নির্মাণ থেমে গেছে, কিংবা বাংলাদেশ জলসম্পদ রক্ষা পরিষদ থেকে কাক্কুকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। অথবা, মুমিনদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে মূল্যবান গবেষণার জন্য কাক্কুকে মগবাজারের কোনো অফিস থেকে ইমান্দারোফদিয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
আমার এসব কল্পনা মোটেও অমূলক নয়। আবার বলি, প্রস্তর যুগের ব্লগ দর্শক যারা আছেন – তারা নিশ্চয় দ্বিমত হবেন না, সে সময় বাংলাদেশের মধ্যরাতে ৪/৫ লাইনের বক্তব্য আর তারচেয়েও লম্বা শিরোনামের পোস্ট দিয়ে নাস্তিক-ভারতের্দালাল-ইসলামের্শত্রু দুষ্টু ব্লগারদলকে কেমন তছনছ করে দিয়েছিলো...। কাক্কুর একটা পোস্টের ওজন আবুজরগিফারী বজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়েচডিধারী- মহম্মদপুর থ্রিডি ইউনিভার্সিটির ভিসি- লাইফটাইম জিয়ারি ক্যান্ডিডেট বালকটিও বইতে পারতো না। আমরা পাঁজি ভাতিজার দল কোন ছার!

অবশ্য আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।
ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো, পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো, ব্লু জিনসের সাথে কালো বুট স্যু...। আমি চোখ কচলাই, আরে তা-ই তো...জ্যামছ। কতদিন গুরুর গান শুনবো বলে কনসার্টে পুলিসের তাড়া খেয়েছি। হ্যাঁ, তিনি এখানে এই কাক্কুর অফিসে কেন?
ব্যান্ড-গুরু জ্যামছ সোজা কাক্কুর হাত ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে, ‘এডভোকেট সাহেব, আমাকে বাঁচান।‘
কাক্কু সান্ত্বনা দেয়, ‘আরে অস্থির হবেন না, আমি তো আছি, বলেছি তো ফোনে...’
জ্যামস হাত ছাড়ে না, বলে – ‘এই গান তো আমি লিখিনি। রাহমান স্যার লিখেছিলেন, তিনিও বেঁচে নেই এখন, আমার উপরে দোষ কেনো তবে?’
কাক্কু এবার বিজ্ঞের মতো হাত নাড়ে, ‘দেখুন, সবই মানলাম। কিন্তু, আইন নিয়ে তো প্রশ্ন চলে না, কী বলেন?’
জ্যামছ এবার মুষড়ে পড়ে। ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে। কাক্কু তাকে দুই হাতে তুলে ওঠায়, বলে – ‘শিনায় শিনায় লাগে টান’। সে কথা জ্যামছের কানে যায় না, সে ‘ইয়ারব ইয়ারব’ জিকির তোলে।
আমি কাক্কুকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী ব্যাপার কাক্কু?’
কাক্কু মুচকি হাসে, ‘প্রিয়তমা সুন্দরী গাইতে গেছিলো...হে হে। এখন মামলায় ফাঁসছে...’

আমি ঠিক বুঝতে পারি না, প্রিয়তমা সুন্দরী গাওয়ার সাথে মামলার কী! তবে এটাও ভাবি, কাক্কু নিশ্চয় অন্য কিছু ইংগিত দিয়েছে, আমি বুঝিনি...।

এই বোঝা না বোঝার চক্করে যখন হিমশিম খাচ্ছি, তখন লিকলিকে শরীরে শাদা শার্ট, মাথায় চুল কম একজন বিক্রমপুরের মোলায়েম কন্ঠে আওয়াজ তোলে কাক্কুর অফিসে ঢুকে। মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে ফালুটিভিতে আমি দেখেছি তাকে। তাই চিনতে কষ্ট হলো না – জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কাম-দাদুল হক লিমন। কাক্কু তাকে দেখে বিনয়ে নত হয় – ‘আরে আপনি আবার কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?’
‘উপায় তো নেই, ভাই! মামলা হয়ে গেছে...’
আমি কাক্কুর চোখে স্পষ্ট লোভ দেখতে পাই। ‘মামলা হয়ে গেছে’ ভীতবাণীতে কাক্কুর চোখের সামনে যেনো অফুরান সম্ভবনা।
কাম-দাদুল হক লিমনকে চেয়ারে বসতে দিয়ে কাক্কু খসখস করে নোট নেয়-
‘কী নাম বইটার? ‘প্রেম প্রীতির সুখ দুঃখ?’
‘ঠিক বলেছেন।’
‘সুন্দরী লিখেছেন কতবার?’
’৪৮ বার। বই ৫ ফর্মার – ৮০ পৃষ্ঠা।’
কাক্কু মাথা নাড়ে – ‘কিন্তু, দ্বিতীয় মামলাটা কীসের?’
জনপ্রিয় লেখক লিমন এবার মাথা নিচু করেন, ‘আপনি তো জানেন, আমাদের বিক্রমপুরে গেলে আমি মোটর সাইকেল চালাই। এবার ভাবলাম, যা-ই গরেহঙ্গা ডিগ্রি কলেজের পাশটা রাউন্ড মেরে আসি। তো বিকেলে তখন কলেজের গেটে যেতেই এক তরুণী আমার পথ আঁটকালো, বললো তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।‘
কাক্কু কপাল কুঁচকায়, ‘তারপরে? পৌঁছে দিলেন?’
‘হ্যা, আপনি হয়তো জানেন- এ ঘটনা আমার জীবনে বারবার ঘটেছে, আমি লেখক মানুষ ,তাই আমার উপরে আস্থা রাখা যায়- এ যুক্তিতে কতোদিন কতো মেয়ে পথে থামিয়েছে, বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়েছে...।‘
‘কিন্তু, এবার সমস্যা হলো কীভাবে?’
লিমন এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের নখ খুঁটেন – ‘এখন তো আসলে সময় পালটে গেছে, মোটর সাইকেল থেকে নামার পরে মোবাইলের ক্যামেরা অন করে মেয়েটি আমাকে বললো, তাকে কিছু বলতে হবে, সে রেকর্ড করে রাখবে- জনপ্রিয় একজন লেখক কী বললো তার স্মৃতি।‘
কাক্কুকে অস্থির মনে হয়, ‘তারপরে, তারপরে কী হলো?’
‘তারপরে আর কী হবে, এমনটা তো আমি আগেও বলেছি নানান তরুণীকে, -তুমি দেখতে খুব সুন্দরী- কখনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার মোবাইল ক্যামেরায় রেকর্ড থাকায় আমি ফেঁসে গেলাম। পরিবার থেকে এক লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণ চেয়ে নিপীড়নের মামলা করা হয়েছে...’।
কাক্কু এসব শুনে অভয় দেয়, ‘একদম ভাববেন না, আমি আছি...’।

জ্যামছের চক্করের পরে কাম-দাদুল হক লিমনের চক্কর। আমার কাছে হিমশিম লাগে। কাক্কুর অফিসে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্ত হাতে নিই। প্রথম পাতায় বিশাল বিজ্ঞাপন, ‘মুহায়ুন আহমেদের পাঠকরা বিভ্রান্ত হবেন না, তিনি কখনোই তার কোনো গল্প উপন্যাসে নায়িকাকে সুন্দরী বলেন নাই’। সঙ্গে মুহায়ুন আহমেদের দুটি নতুন উপন্যাসের বিজ্ঞাপন – ‘সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ী ও হলুদিয়া হিমু’, ‘সুন্দরী রূপবতী নয়’।

মোয়া দিগন্তের প্রথম শিরোনাম – ‘বাড়ছে মামলা, আদালতে মামলা জট, বিপাকে লেখক-শিল্পী’। বুঝলাম, দেশে আসার দুদিন আর এসে একদিন ; এই তিন দিন পত্রিকা পড়িনি। দেশে বিশাল কিছু হয়ে যাচ্ছে। নানান মামলায় জড়ানো হচ্ছে লোকজনকে। নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে মোয়া-দিগন্ত বলছে – ‘জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক, টিভি উপস্থাপক ও নাট্যকার কাম-দাদুল হক লিমনের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস প্রেম-পীরিতের সুখ দুঃখ এর পাতায় পাতায় ‘সুন্দরী’ শব্দের অপব্যবহার করেছেন এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন ঢাকা ডেফারেল সাংঘাতিক ইউনিয়নের সাবেক সম্পাদক জনাব কিয়াস গামাল চৌধুরী। অভিযোগে তিনি বলেছেন, ইসলামী মূল্যবোধের বাংলাদেশে ইমান আকিদা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে এসব শব্দের যত্রতত্র ব্যবহার করে কাম-দাদুল হক মিলন যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরেও লিমনের নানা কুকর্মের ভিডিও ক্লিপ এখন মানুষের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে...‘

এসব পড়ে আমার গা চমকে ওঠে।
মোয়া-দিগন্তের পেছনের পাতায় যাই, সেখানে ‘ঢাকাস্থ আমরা বিক্রমপুরনিবাসী’ এসোসিয়েশনের প্রতিবাদ সভার ছবি। তাদের এলাকার কৃতি সন্তাম লিমনকে হামলা মামলা থেকে মুক্তি দেয়ার দাবী জানাচ্ছে তারা।

খেয়ালই করিনি, প্রথম পাতার নিচে জ্যামছের বিশাল ছবি। ডব্লিউ ভি এ মিলনায়তনে ‘প্রিয়তমা সুন্দরী আমার’ গান গাওয়ার অপরাধে মামলা করেছে কনসার্টে থাকা তিনশ তেত্রিশজন তরুণী। গিটার হাতে দুলে দুলে গাওয়ার ভঙিতে নিশ্চিত ভাবেই কু-ইংগিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা বিভাগ এখন কনসার্টের ভিডিও পরীক্ষা নীরিক্ষা করে চলেছে...।

আমি মাঝে মাঝে স্বপ্ন ও বাস্তবে হিমশিম খাই। কতোকতো দিন সকালে ঘুম ভেঙেছে বিরিয়ানী-বুরহানীর টেবিলের প্লেটগুলো না ছুঁয়ে...। মনে হলো সেরকম স্বপ্নের মাঝে আমি আছি। নয়তো- ‘সুন্দরী’ উচ্চারণের ও লেখার অপরাধে শাস্তি হবে কেনো মানুষের। আবার নিজেকে এ’ও বলি, নচিকেতার গানে জেনেছি – ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়’। পেপারের ভেতরের পাতায় যাই, সেখানে বিশাল তালিকা, নিম্ন আদালতে মামলা হচ্ছে প্রতিদিন। ফেঁসে যাচ্ছে ডজন ডজন লোক...।

জ্যামছ এবং কাম-দাদুল হক লিমনকে কিছু কাগজ পত্র গুছিয়ে দিয়ে বিদায় করে, কাক্কু আমাকে বললো – ‘চলো বাসায় চলো, তোমার কাকীমা শর্ষে ইলিশ রেঁধেছে।‘
আমি কাক্কুর পেছন পেছন বের হই।
তখনি একজন হাড্ডিসার লম্বা টেকো লোক এবং আরেকজন জংলী চুলের যুবক কাক্কুর অফিসে ঢুকে। একে অন্যকে দোষ দিয়ে যায় তারা।
বৃদ্ধ বলে, ‘আমি তো গাই না এখন, তুমি গাইলা, তাই আসামী তুমি।‘
বেয়াড়া যুবক উলটা ধমক দেয় – ‘গানের মালিক আপনি, আমি কেন সাজা পাবো?’

কাক্কু দুজনকে চেয়ারে নিয়ে বসায়...।
আমি হেটে হেটে সু-ওয়াং গার্ডেন রেস্টুরেন্টের বিপরীত দিকে দাঁড়াই, মনে পড়ে এ পথে কতোদিন কলেজে গেছি, তাও দশক পার হয়ে গেলো। তখন এমন কোলাহল ছিলো না, হৈচৈ ছিলো না। কিছু সবুজ গাছ ছিলো রোড ডিভাইডারে।
কাক্কু তখন রিকশা ডেকে আমাকে তুলে নেয়।
জিজ্ঞেস করি, ‘ওরা কারা ছিলো?’
কাক্কু অবাক হয়, ‘চিনলি না?’
‘নাহ!’
‘আরে বড়ো জন দুরশিখ আলম, আর চ্যাঙড়াটা কান্থ পানাই।‘
‘তাদের আবার কী হলো?’
‘চুমকি চলেছে একা পথে শুনিস নাই? ওটার জন্য মামলায় ধরা’।

রিকশা চলতে থাকে। আমি টের পাই, এসব মামলায় কাক্কুর ব্যবসা লালে লাল হবে। কিন্তু, এটাও ভাবি- আচমকা কাক্কুর এত যশ-খ্যাতি ছড়ালো কীভাবে! নানান ইতস্ততঃ করে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘আচ্ছা কাক্কু, এত এত আইনজীবি থাকতে এরা সবাই তোমার কাছে কেন?’
কাক্কু মনে হয় খানিক রুষ্ট হলো আমার প্রশ্নে, বললো – ‘তুই আমাকে এমন তুচ্ছ করলি?’
আমি বোঝানোর চেষ্টা করি, ‘না , মানে হয়েছে কি। আমি তো অনেকদিন দেশের বাইরে ছিলাম, আগে তো তুমি এমন ছিলে না...’
কাক্কু আমাকে খোঁচা দিয়ে বলে, ‘তুই কি আমার দক্ষতা দেখিসনি ব্লগে? কেমন করে শুইয়ে দিয়েছে সব বাঁদরের দলকে, পেরেছে কেউ?’
আমি হুম/হ্যাঁ করে যাই।

কাক্কু এবার বাম হাতে ধরে রাখা দৈনিক মোয়া-দিগন্তের বিজ্ঞাপনী পাতা খুলে। সেখানে ৫ কলামে কাক্কুর বিজ্ঞাপন – বড় করে কাক্কুর টাই পড়া ছবি। 'সুন্দরী শব্দটি ব্যবহার সংক্রান্ত মামলায় মুক্তি চান? নির্দ্বিধায় চলে আসুন কাকুন্দ’জ চেম্বারে। কোরিয়া থেকে স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত আইনজীবি, বাংলা ব্লগস্ফিয়ারের জাঁদ্রেল ব্লগার আইনজীবির পরামর্শ নিন। আসুন, কথা বলুন, শুনুন, তারপরে সিদ্ধান্ত নিন। ঘুরে আসুন ডব্লু ডুব্লু ডুব্লু...’

আমার আবার তাজ্জব হওয়ার পালা।
কাক্কু তুমি এত চাল্লু! আগে তো টের পাইনি...।
কাক্কু শুধু মিটিমিটি হাসে।

-তিন-
আরও তাজ্জব হলাম কাক্কুর বাসায় ঢুকে।
দেশি বিদেশি পুলিস বাসা ঘিরে রেখেছে। কোরিয়ান-আমেরিকান ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ‘ইন্টার সার্চের’ একদল অফিসার ঢাকা এসে তোলপাড় করে দিয়েছে।
গত দু’সপ্তায় কোরিয়ায় অন্ততঃ ৭জন নারী আত্মহনন করেছে রহস্যময় কারণে। সবার ঘরে একটাই চিরকুট - ‘এভাবে ঠকাবে ভাবিনি’। পুলিশ মিলিয়ে দেখেছে – ৭জন নারীর ঘরেই টাই পরা, পরিপাটি গোঁফেল, চশমা পড়া এক লোকের ছবি পাওয়া গেছে। নানান বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মাস কয়েক আগে এই লোক কোরিয়া গিয়েছিলো –সেমিনারে নাকি ট্রেনিং’এ। সেখানে অল্প ক’দিনেই ঐ সাত নারীকে প্রেমের ফাঁদে বন্দী করে সে। সে আর কেউ নয়, ছবি মিলিয়ে দেখা গেলো – লোকটি আমাদের কাক্কু...।
বাংলাদেশি এক গোয়েন্দা অফিসার কাক্কুর টাই টেনে ধরে, ‘কোনো রকম চালাকি করবেন না। হোম মিনিস্ট্রিতে আগুন লেগেছে আপনার কারণে...। জলদি স্বীকার করুন, কী হয়েছিলো...’।

কাক্কু মিনমিন করে কম্পিউটার চালু করে।
ফেসবুকে তার ডজন খানেক কোরিয়ান বান্ধবী। প্রাইভেট মেসেজ বক্সে – আবেগঘন প্রেম পত্রে ভর্তি। ফটো তালিকায় – ঘনিষ্ট ছবিতে ভরপুর। কাক্কুর কনুই বড়োই বিপজ্জনকভাবে জায়গা করে নিয়েছে...।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখি...।
কোরিয়ান এক অফিসার হঠাৎ কাক্কুর হাতের মাউস কেড়ে নেয়। কম্পিউটারের মনিটরে একটি জায়গায় সে ফোকাস করে, সেখানে দেখি ফেসবুক আপডেট – ‘... ইস নট সিংগেল এনিমোর, ম্যারিড টু...’।
আমার কাছে আবার সব রহস্যময় লাগে। মনে হয় আমি যেনো হরর ম্যুভির দর্শক হয়ে আছি। কোরিয়ান আরও কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কী কী আলাপ করে। মনে হয় – সাত সাতটি হত্যাকান্ডের রহস্য তারা উদ্ঘাটন করতে পেরেছে...। ততক্ষণে কাক্কুর হাতে শেকল লেগে গেছে। আর আমি পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়েছি। দ্রুত পায়ে রাস্তায় এসে, সি এন জি ধরে চলে যাই – মদীনা ট্রাভেল এজেন্সিতে। ফাঁদে পড়ার আগেই ভাগতে হবে। ঢাকা – দুবাই – হিথ্রো – টরন্টো।

সারা পথ অস্থিরতায় কাটিয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে যখন ল্যাপ্টপ চালু করলাম তখন মনে পড়লো – আজ ১২ মে। জাপানে থাকা এক বন্ধুকে এই দিনটি মনে করিয়ে দিতে হবে, বলতে হবে অঞ্জনের ‘মালা’ গানের কথা...। আমি মেইল টাইপ করি, আর মনে হয় কেউ আমার কাঁধে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। খুব নিচু স্বরে ডাকছে...।

-চার-
চোখ মেলে তাকাতেই দেখি, অপরূপা কুহেলিকা চৈনিক বালিকা।
আমাকে জিজ্ঞেস করছে – কোথায় যাবে তুমি?
আমি চোখ কচলাই। আসলেই , কোথায় যাবো? আমার কিছু মনে পড়ে না...
বালিকা এবার মনে করিয়ে দেয়, আজ রাতে ট্রেন আর চলবে না।
আমি ঘড়ি দেখি, রাত প্রায় দুটো...
ট্রেন থেমে আছে কিপ্লিং স্টেশনে। আমি কম্পার্টমেন্টে এসে দাঁড়াই। মাথা ঝিমঝিম করে। মনে পড়ে আজ সন্ধ্যায় ইয়াং-ব্লোর স্টেশন থেকে বাসায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলাম। একেবারে শেষের সিটে আরাম করে পিঠ হেলিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরে আর কী হলো মনে নেই...। কতোবার ট্রেন তার রুটে চক্কর মেরেছে, আমি একবারও টের পেলাম না কিছু?

এসব যখন ভাবছি, তখন বালিকা জিজ্ঞেস করে – ‘তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ?’
আমি মাথা নাড়ি, ‘না না, ঠিক আছি...’
বালিকা হেঁটে চলে যায়। আমার মনে পড়ে ‘থ্যাঙ্কু’ বলা হয়নি।
আমার ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে বলি, ‘সো নাইস অফ ইউ...’।
তখন আবার আমার মাথায় একটু আগে ঘটে যাওয়া সব মনে পড়ে, ঢাকা-পল্টন-লিমন-জ্যামছ-কোরিয়ান পুলিশ...।
সামনে পা চালাই।
এই মাঝরাতে এখান থেকে কীভাবে বাসায় ফিরবো জানি না।
আমার মাথায় কিছু কাজ করে না।
আমার মনে পড়ে কাক্কুকে। মনে পড়ে কাক্কুকে আমার।
আমার কাক্কুকে মনে পড়ে।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP