05 May, 2009

চুপিচুপি রাত নামে - ০১

আদনান আহমেদ বেকার। তবে একেবারে পরিশুদ্ধ বেকার নয়। কিছুটা ভেজালযুক্ত। দুটো টিউশনি করে। যা পায়, তাতেই চলে। চাকরীর জন্য মামা-চাচা লাগে, এ যুক্তিতে বিশ্বাসী নয় আদনান। বরং প্রচন্ড আশাবাদী একজন মানুষ। অল্প ক'দিনের মধ্যে কিছু একটা হয়ে যাবে এমনটা আশা করছে সে গত দুই বছর।

সকাল দশটা।
আজ দিনটা আদনানের জন্য অন্যরকম। আজ তার দুটি জরুরী কাজ - ১) ইন্টারভিউ ২) মেহজাবিন। আদনান সবচেয়ে পছন্দের জামা পরেছে। সাদা শার্ট। কালো প্যান্ট। কালো স্যু। সঙ্গে একটা লাল টাই হলে মন্দ হতো না। নেই যখন আর কী করা? চুলটা আরেকবার আঁচড়ে নেয় সে। গোল আয়না ঝাপসা হয়ে গেছে। শেষে হাত দিয়ে আরেকবার ঝাড়া দেয় চুলে। নাহ! বেশ লাগছে। ক্লিয়ার শ্যাম্পু দেয়ায় চুল বেশ ঝরঝরা লাগছে। হেড এন্ড শোল্ডার দিলে আরও ভালো হতো। আদনান ঘড়ি দেখে। সকাল দশটা বাইশ মিনিট। এগারোটায় ইন্টারভিউ।

ছয় নম্বর বাসে করে বনানী আসে সে। ফারুখ টাওয়ারের চার তলায় ইন্টারভিউ। একটি মাল্টিন্যাশনালের অফিস। সবার আগে আদনানের ডাক পড়ে। ইন্টারভিউ বোর্ডে চারজন ছিলো। তারা বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্ন করে। আদনান স্বাভাবিকভাবে জবাব দেয়। প্রায় দশ মিনিটের মতো ইন্টারভিউ চলে।
আদনান ভাবে চাকরিটা তার হয়েই যাবে। তবু মনে হয়- একটা লাল টাই পরলে পুরো নিশ্চিত হওয়া যেতো। এসব ভাবতে ভাবতে সে ফারুখ টাওয়ারের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। এরপর সে আজিজ মার্কেটে যাবে। কবিতার বই কিনবে মেহজাবিনের জন্য। আর দুটো লাল গোলাপ।

মেহজাবিনের সঙ্গে আজ দেখা হবে ক্যাফে ঝিলে। পাঠক সমাবেশ থেকে আদনান কবিতার বই কিনে। পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি। রফিক আজাদ। মৎস্য ভবন-প্রেসক্লাব পেরিয়ে ক্যাফে ঝিলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে দুপুর দুইটা। কোণার টেবিলে মেহজাবিন বসে ছিলো। আদনান তার হাতে কবিতার বই তুলে দেয়। মেহজাবিন মুচকি হাসে। আজ সে বেগুনি জামা পরেছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে।

-দুই-

আদনান খুব দ্রুত চুলে চিরুনী চালাচ্ছে।
আজ বোধ হয় দেরীই হয়ে গেলো। চাকরী পাওয়ার পর গত দু'মাসে একদিনও দেরি হয়নি। হাজার বিশেক একেবারে কম টাকা নয়। লাল টাইয়ের নট আরেকটু টাইট করে সে। মেহজাবিনের উপহার। আদনান ভাবছে সামনের মাঝে এক ডজন টাই কিনে নিবে। সব সময় এক রঙা টাই পরতে ভালো লাগে না। জিলেট দিয়ে শেভ করা মুখে আলতো করে ডেনিম মাখে সে। পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। ছয় নম্বর বাস এখন আদনানের কাছে ধুলো আর ভীড়ের ঝামেলা মনে হয়। ট্যাক্সি ক্যাবে অফিস যায় সে। ...আজ অফিস থেকে খানিক আগে আগে বের হয়। মেহজাবিনকে নিয়ে ম্যাঙ্গো ক্যাফেতে যায়। ওয়েটার পেপসি দেয়। আদনান ভাবে মেহজাবিনকে আজই বিয়ের কথা বলবে। এই মুহুর্তে। কিন্তু কথাগুলো ঠিক গুছাতে পারে না। পেপসিতে চুমুক দেয় সে। তাকায় মেহজাবিনের দিকে। কিন্তু! মেহজাবিনের মুখে যেনো আলোর বিস্ফোরণ। আদনান তাকাতে পারছে না। তার চোখ টনটন করে। প্রচন্ড আলোয় মেহজাবিন যেনো মিলিয়ে যাচ্ছে। আদনান কথা বলার চেষ্টা করে, চিৎকার দেয়। অথচ মুখ দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। দমবন্ধ হাঁসফাস লাগে।

...চোখ দুটো কচলে নেয় আদনান। দেখে জানালার গ্রীল পেরিয়ে সকালের রোদ পড়ছে তার চোখে। মাথার পাশে রাখা ঘড়িতে তাকায় সে। সকাল সাতটা তেরো। বালিশে মুখ গুঁজে আদনান আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে।

স্বপ্ন দেখতে আদনানের ভীষণ-ভীষণ ভালো লাগছিলো।

(চলবে)

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP