13 April, 2009

ধুসর সন্ধ্যা শেষে

লেখালেখি নিয়ে একটা দীর্ঘ বন্ধ্যা সময় যাচ্ছে। যতোটা না সময়ের টানাটানি তারচে' অনীহা বড়ো হয়ে গেছে আজকাল। কিছু প্লট মাথায় ঘুরঘুর করে। আবার চলে যায়, ওড়ে যায় অন্য কোথাও। কতোদিন হলো বিকেলে হাল্কা জামা গায়ে স্যান্ডেল পায়ে বের হই না। হতে পারি না। এপ্রিলের মাঝামাঝি এসেও মাইনাস তাপমাত্রা বিদায় নিচ্ছে না।

বিকেল হলে দেশে ফোন করতে ইচ্ছে করে, কথা বলতে ইচ্ছে করে। এখানে বিকেল সাড়ে চারটা মানে দেশে রাত আড়াইটা। অতএব সকালের অপেক্ষা। কলিং কার্ড যা কিনতাম আগে একটা একসপ্তায় শেষ হতো। কতো মিনিট ২০০ নাকি ১৩৫? শেষের বিশ মিনিটের অবশ্য হিসেব থাকে না। ইদানিং খেয়াল করছি কার্ডগুলো শেষ হচ্ছে না। দেশে কথা বলা কমে গেছে। না ঠিক কথা বলা কমেনি, বলার কথা কমে গেছে...।

সে-ই কবে একবার ছুটির দিনে টিটিসি'র বাসের অপেক্ষায় অপেক্ষায় রাস্তা থেকে রাগ করে ঘরে ফিরলাম, এরপর ছুটির দিনে সতর্ক থাকি। নেটে বাসের সময় দেখে বের হই। এরপরেও টের পাই সাতটা বিশের বাস চলে গেছে আগে। তাই সাতটা চল্লিশের অপেক্ষা করি। পায়চারি করি, রিহার্সেল দিই - আগামীর; স্বপ্ন এবং সম্ভবনার।

ডেন্টোনিয়া পার্কে বিকেলের রোদের ছটা। একদল ছেলে ফুটবল খেলছে। এ যেনো অনেক আগে অন্য কোথাও দেখা, ভুলে যাওয়া, কলোনীর মাঠ। কোলাহল। মারহাবা সুপার স্টোরে কলিং কার্ড কিনি। রাস্তার ওপাশে কফি টাইম। আমার ভালো লাগে টিম হর্টন্স। প্রিয়-রুমকির সাথে আড্ডায় সেকেন্ড কাপ। মাঝে মাঝে স্টারবাকস। কফি টাইমে তেমন যাইনি। অমিতের সংগে আড্ডায় আরেকটু হেঁটে টিম হর্টন্সে গিয়েই বসেছি। এই কফি টাইমে না আসলেও কফি খেয়েছিলাম আরেকবার। শাকিল স্যার আমাকে গাড়ীতে বসিয়ে কফি এনেছিলো। গাড়ীর পেছনে জুহের - নায়েফ ঘুমায়। স্যার কফি নিয়ে এসে বলে - 'ভেতরে বিশাল ক্যাওস'। জিজ্ঞেস করলাম - 'কী রকম?' স্যার হাসে - 'এ-ই, চিনি ২ প্যাক, আমাকে এইটা দেন...'।
আজ কফি টাইমে ঢুকে টের পেলাম - মিনি বাংলাদেশ। ফেয়ার ট্রেডের পরিবেশ বান্ধব কফি। লার্জ ডবল ডবল। কাঁচের পাশে টেবিল খালি ছিলো একটা। সেখানে গিয়ে বসি। বাইরে সন্ধ্যা নামবে নামবে করছে। আমার ডানের টেবিলে দুটো পরিবার। পুরুষ দু'জন আলোচক। বামে দুই বন্ধু, পঞ্চম বা ষষ্ঠ কাপ কফির জন্য গেছে একজন। যোগ দেয় আরেকজন; তাদের অনেকদিন পরে দেখা। খানিক নিচু স্বরে আলাপ করে। আরেকটু দূরে তিন আন্টি ভীষণ কটকটে গলায় কথা বলছে - যেনো ঝগড়া চলেছে অবিরাম, আবার হাসি। তাদের ডানে এক টেবিলে আফ্রিকা কিংবা ক্যারিবিয়ান তরুণ দল। চার তরুণ - এক হিজাবী তরুণী। সব ছাপিয়ে আমার ডানের পরিবারের দুই পুরুষের আলাপ কানে বাজে বেশি। বাংলাদেশে রড-সিমেন্টের ব্যবসা নিয়ে আলাপ করে তারা। জনৈক জসিমের সম্মুন্দি অডিট করতে এসে কী বলে গেলো তা বলে, মন্ট্রিওলে মান্না চৌধুরী নামের একজন ছোটোখাটো গার্মেন্টস খুলে ফেলছে সে-ই গল্প করে; বাংলাদেশি মহিলারা সেখানে কাজ করে। এসব আলাপের কোনো যোগসূত্র নেই, বড়োই বিক্ষিপ্ত। কিংবা আমি তাদের আলাপের গতি ধরতে পারি না। কারণ, নানান কোলাহল চারপাশে - আরেক কাপ ডবল ডবল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে হুড়োহুড়ি, কেউ আসছে কেউ যাচ্ছে। মনে হয় আমি এক বিয়ে বাড়ীতে বসে আছি। কফিতে চুমুক দিই, ভাবি - কতোদিন পরে এমন কোলাহলের মাঝে এসে বসলাম। বিয়ে বাড়ীতে মানুষের গমগম, কথার তুবড়ি, দল উপদল। নীরব দর্শক আমি। ড্যানফোর্থ ধরে টিটিসি'র ১২ নম্বর বাস যাচ্ছে। ট্রাফিকের লাল হাত, শাদা মানুষ পাল্টাচ্ছে একটু পরপর। দূরে মেট্রো শপিং, শপার্স ড্রাগ, স্টাপলস; আরও দূরে পে-লেস শ্যুজ। বাচ্চা হাতে এক দক্ষিণ এশীয় মহিলা হেঁটে যাচ্ছে। বাচ্চার হাতে কোকের গ্লাস। আসার সময় এরকমই বাঙালি পরিবার রাস্তা ক্রস করছিলো। বাচ্চাটি মা'কে হাত ধরতে দিচ্ছিলো না। মা বলছে - 'না, এখানে মা'কে হাত ধরতে হয়। নইলে পুলিস এসে ধরে নিয়ে যাবে।' এসব ভাবি, এই কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা, মাথায় হানা দেয় আরও কতো কিছু...। টিম হর্টন্স রোল আপ প্রমোশনে পুরস্কার দিচ্ছে। কাপের গায়ে খেয়াল করে দেখি কফি টাইমও একই প্রোগ্রামে নেমেছে। আড্ডাহীন কফিপান বড়ো দীর্ঘ আর ক্লান্ত মনে হয়। ঘড়ির কাঁটা আটটা পার হয়ে গেছে। বাকী কফি হাতে বের হয়ে আসি। ঠান্ডা বাতাস। আরও কয়েক চুমুক পরে কফি শেষ হয়। জানি, কিছু পাবো না - টিম হর্টনসের কাপে গত ২ মাসে মাত্র একবার এক্সট্রা কফি পেয়েছি, আজ এটাও বললো - 'স্যরি ট্রাই এগেইন...'। ভি/পি'তে এসে দেখি আটটা বিশের বাস চলে গেছে। আবার আটটা চল্লিশের অপেক্ষা...।

মাইকের কথা লিখেছিলাম আগের কোনো পোস্টে।
সবাই যখন ইনটার্ন নিয়ে চিন্তায় আছে, মাইক তখন সিরিয়ার ফ্লাইট কনফার্ম করেছে। ইন্ট্যারন্যাশনাল মার্কেটিং ক্লাসের প্রথমেই কার প্ল্যান কি জিজ্ঞাসায় সে বলেছিলো - 'আমি সিরিয়ায় কাজ করেছি ৩ বছর, সেখানে আমার গার্লফ্রেন্ড আছে, সে মুসলিম, তার বাবা ক্রেজি, আমার সাথে তার মেয়ের বিয়ে মেনে নিবে না, আমিও তাকে ভুলতে পারবো না, তাই সিরিয়া চলে যাবো, জানি না কপালে কী আছে, তবে আমি যাবোই যাবো।' বৃহস্পতিবারে মাইককে দেখছিলাম আরবী টাইপ শিখতে, আর ওয়েবে সিরিয়ার কোম্পানী সার্চ করতে। জিজ্ঞেস করলাম - সিরিয়া তো যাবা, জান নিয়ে ফিরতে পারবা? মাইকের রক্তহীন চেহারায় অনিশ্চয়তা - 'আই ডোন্ট নো'। জানলাম ফ্লাইট মে মাসের ৪ তারিখে, রাতে। গুড লাক, মাইক মিলানী...।

দীর্ঘদিন পরে, আসলে এই প্রথমবারের মতো তমকোর মেইল পেলাম। আগের অফিসে জাপানীস ক্লাস্টারের কলিগ। আমি যখন থাইল্যান্ড ছাড়ি তখন তমকো ছুটিতে। জেনেছি, দ্বিতীয় বয়ফ্রেন্ডসহ জাপান গেছে, উদ্দেশ্য বিয়ে। গডমাদার, তার কন্যাসমাবেশ এবং সভাসদ গোপনে এ খবরও বের করেছিলো - তমকো ইজ এক্সপেক্টিং। তাই দেখা হয়নি তমকোর সাথে। আগেরবার আসার সময় আমার জন্য আকুতাগাওয়া আর মেইজির ছোটোগল্পের বই নিয়ে এসেছিলো। মনে পড়ে ১ম দিকে আমি যখন কিছু চিনি না, এক ডিপার্টমেন্ট থেকে অন্য ডিপার্টমেন্টে যেতে হারিয়ে যাই, অর্থোপেডিক্সে গিয়ে নিওরোলজি খুঁজি, তখন তমকো হাত ধরে জায়গা মতো পৌঁছে দিতো। কিছু জানতে চাইলে কাগজে সুন্দর করে ডিটেইল লিখে দিতো। প্রায়ই ভাবতাম, এমন গুছানো মানুষ আমি জীবনেও হতে পারবো না। কিংবা কেবল জাপানীরাই এমন হয়...। গত সপ্তায় তমকোর মেইল পেলাম, সংক্ষিপ্ত - "তোমার মেইল পেলাম, আশা করছি ভালো আছো। আমার জীবনের কিছু বড় ঘটনা জানাই। গত জুনে বিয়ে করেছি, অক্টোবরে মা হয়েছি, আর এই ফেব্রুয়ারীতে ডিভোর্স দিয়েছি। ভালো আছি। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়।" মেইলের সাথে বাচ্চার ছবি। এ ধরণের মেইলের কি রিপ্লাই করতে হয় আমার জানা নেই। লিখি - 'আমি ভালো আছি, পড়ালেখা চলছে, কানাডা ভালো লাগছে। তোমার আপডেট জানলাম, বাচ্চাটা কিউট - তার জন্য আদর আর শুভকামনা রইলো। আমাদের জীবনটা ছোটো, তাই জীবনকে দীর্ঘ করেই বেঁচে থাকো।"

থার্ড পারসন সিংগুলার নম্বর সিনেমার অডিও ট্র্যাক বেরিয়েছে আগে। ন্যান্সির কন্ঠে - 'দ্বিধা' শুনে মাতাল ছিলাম সপ্তাহ কয়েক। কী মায়া জাগানো মিষ্টি কন্ঠ। অপেক্ষায় ছিলাম ন্যান্সির প্রথম সলো ' ফার্স্ট এপিসোড' এর। শেষে পেলাম। এবং হতাশ হলাম। চরম হতাশ। অসাধারণ মিষ্টি কন্ঠের কন্ঠের কী অদ্ভুত অপচয়!
সেই হতাশা কাটিয়ে দিলো অচেনা পারভেজ নামের এক শিল্পী। হৃদয় খান ফিচারিং পারভেজ এর 'পথ' পেলাম আবারজিগস ডট কমে। ভালো লাগার ব্যাখ্যা নেই। প্রয়োজনও নেই। আজ এই ধুসর সন্ধ্যা শেষে মন ছোঁয়ার ক্ষমতা আছে এ গানের -
_

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

_

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP