17 April, 2009

হারিয়ে যাচ্ছে পত্রমিতালী

আমেরিকার সিয়েরা আর ইংল্যান্ডের মারলিন যখন প্রথম বারের মতো দেখা করে তখন একজনের বয়স ৬৭ আরেকজনের ৬৮। অথচ দু'জনের যোগাযোগ শুরু আরও ৫৬ বছর আগে। আটলান্টিকের ওপার থেকে চিঠি আসে সিয়েরার স্কুলের ঠিকানায়। তারপরে দুজনের পত্রমিতালী। এতোদিন পরে সেসব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দু'জনই স্মৃতি বিহবল হচ্ছে, বলছে - কী কী তারা শেয়ার করতো চিঠিতে - কী করে মাঝে ৮ বছর যোগাযোগ হয়নি, আবার কীভাবে যোগাযোগ হলো, এইসব।
এ তো গেলো ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া পত্রমিতালীর পুরনো গল্প।

অথচ আমাদের জীবনে এই বছর দশেক আগেও পত্রমিতালীর ছাপ ছিলো। বুদ্ধদেব গুহের 'সবিনয় নিবেদন' সাহিত্য হিসেবে কালজয়ী। কিন্তু, বাস্তবে মানুষ পত্র মিতালী কেনো করে?
অচেনা মানুষের সাথে যোগাযোগ, পরিচয়ের উৎসাহ, বয়সের উৎসুক্য - নাকি আরও বেশি কিছু?
আগে নানান ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপন থাকতো -
মুক্তমনের ছেলে/মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই।
উদার বন্ধুত্বে আগ্রহী, হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল...
কেবল বরিশালের মেয়েরা লিখুন, আমি এক হতভাগা মানুষ হাত পেতেছি...

এরকম বাহারী সব আহবান।
তসলিমা নাসরিনের লেখালেখির শুরুও নাকি পত্রমিতালীর বিজ্ঞাপন থেকে।

পত্রমিতালী থেকে পরিচিত হয়ে সংসারী হয়েছেন, এমন ঘটনাও অনেক।
একসময় রেডিও'র নানা অনুষ্ঠানে চিঠি লেখার সুবাদে আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল - রাজশাহী বাঘা থানার এক ছেলের...।
পত্রিকায় 'শব্দজব্দ' ছাপানোর সুত্রে বোধ হয় সব'চে বেশি পত্রমিতালীর আহবান পেয়েছি।
তবে, বেশ কয়েকবার নামের শেষ অংশটুকু ছাপার কারণে - মেয়ে ভেবে অনেক প্রেমাকাঙ্খী যুবক ভাই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলো ;)
অন্যদিকে মনে পড়ে - কক্সবাজারের সুমি, আলেকান্দার জুলি, পশ্চিম রাজাবাজারের নিম্নি পাল; গোটা গোটা হাতের অক্ষর...। আহা!

দেশ বিদেশের ১ হাজার ছেলে মেয়ের নাম ঠিকানা ও ফোন নম্বরের স্লোগানওয়ালা পত্রমিতালী গাইডের বিজ্ঞাপন বোধ হয় এখনো কালেভদ্রে পত্রিকায় দেখা যায়...।

তবে হারিয়ে যাচ্ছে পত্রমিতালী।
প্রযুক্তি এখন মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, জীবনকে গতিময় করছে। হাতে চিঠি লিখে খামে পুরে ডাকঘরে গিয়ে পোস্ট করার দিন ফুরিয়েছে ইন্টারনেট আসার সাথে সাথে।

'হাই সুজি এট ইয়াহু, তোমার খবর কি হাউ ডু ইয়্যূ ডু
আমার বাড়ী যাদবপুর আর তোমার বাড়ী সিংগাপুর
টেকনোলজির এ যুগে মোটেও নয় যে দূর'

প্রতীক চৌধুরী গেয়ে গেছে তা'ও দশ বছর হতে চললো।

সিংগাপুরের সুজি, টেক্সাসের জেনি এক ক্লিকেই কথা বলছে মীরপুরের পল্লবীর টিনশেডের ঘরে কিংবা এক্সপ্লোর সাইবার ক্যাফেতে বসা পরাগের সঙ্গে। মিরপুর-সিংগাপুর, মতিঝিল-কারগিল, কিংবা বাসাবো-কসভো; দূরত্ব কমে গেছে দিনদিন। মেইল-টেক্সট চ্যাটের পরে ভয়েস চ্যাটে বাড়ছে যোগাযোগ। গতির তোড়ে চ্যাট বক্স থেকে মোবাইল ফোনে...। ওভারকম্যুনিকেটেড সোসাইটির অভিযোগ তুচ্ছ করে মোবাইলের আলাপও সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। রংপুর মেডিক্যাল কলেজের তুশি ঢাকা মামার বাসায় বেড়াতে এসে ২য় বিকেলেই দেখা করে মিসকল মিসকল খেলায় পরিচিত অভির সংগে। সাহসের কমতিতে ছাদেই দেখা হয়। আর শহুরে কিশোর কিশোরী, তরুণ তরুণীরা ততক্ষণে 'ডিঙি'তে চলে গেছে। অথবা ম্যাংগো ক্যাফেতে।

টেস্ট ক্রিকেটের পরে ৫০ ওভারের ওয়ান ডে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে টুয়েন্টি২০ ম্যাচ হয়ে যায়। ফলাফল জানতে অপেক্ষার তীব্রতা প্রবল।
তেমন করেই তীব্রতা অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা করার। তাই আগের মতো অপেক্ষা নেই, নেই চিঠি লিখে ফিরতি চিঠি পাওয়ার অপেক্ষা, গেরুয়া খামের ঘ্রাণ। নেই অনুভূতি - 'আজ সকালেই মনে হয়েছিলো, তোমার চিঠি পাবো। দুপুরে বাসায় ফিরেই তোমার চিঠি পেলাম। জামা কাপড় না পালটে, না খেয়েই লিখতে বসেছি। বিকেলের ডাকে পোস্ট করবো।'
ফিরতি চিঠিতে - 'এই যে মিস্টার, পেটের খিদে নিয়ে চিঠি লিখতে নেই, তাহলে মনের খিদেও চলে আসে।'
হায় ঋতু রায়, হায় রাজর্ষি বসু! আপনাদের হাতেও মোবাইল এসে গেছে বুঝি!

দু'বছর আগে থেকে বাংলাদেশে টেলিগ্রাম সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। পাপিয়া সরোয়ার কি এখনো গাইবেন - 'নাই টেলিফোন নাইরে পিওন, নাইরে টেলিগ্রাম।'
কিংবা মাকসুদের 'আজ তোমার চিঠি যদি না-ই পেলাম, তবে ভেবে নেবো ডাকপিওনের অসুখ হয়েছে।'
এ সবই গল্প হবে একদিন...
প্রায়ই পত্রিকায় দেখি - ডাক বিভাগ লস দিচ্ছে বছর বছর। 'চিঠি লিখুন, চিঠি স্থায়ী' কেবল ডাক দিবসের স্লোগানে বন্দী।

হারিয়ে যাচ্ছে, চেনা-অচেনা মানুষের কাছে চিঠি লেখার দিন। বন্ধুর কাছে চিঠি লেখা, খামের কিংবা চিঠির কাগজ-কালির মতো নস্টালজিক ঘ্রাণ হয়ে যাচ্ছে...।
হারিয়ে যাচ্ছে পত্রমিতালী।

মধ্যরাতের পরে ডিজুস ফ্রি কলের যুগও ফুরালো। ফোন নম্বর জানার কিংবা জানানোর ঝামেলা নেই। শুনেছি - জিপি'র ২৮২৮ সার্ভিস ফোন নম্বর প্রকাশের ঝামেলা মিটিয়ে দিচ্ছে, চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে - বিচ্ছিন্নতায় বেড়ে উঠা নিঃসংগ কিংবা অস্থির বাটারফ্লাই তরুণদল।
সুষম সাইবার সমাজে মেল শভিনিজম এবার ভাঙলো বলে...।


ইউটিউবে ঘুরতে ঘুরতে পেলাম লেডিchatআর্জির ডাক -
'আমার সংগে চ্যাট করবে? আমি সা-রা-রা-ত চ্যাট করি...'



.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP