01 April, 2009

পথ চলতে এইসব মুখ

সোনিয়ার সঙ্গে দেখা অনেক দিন পরে।
এমন ভীড়ের মাঝে সচরাচর কারো দিকে তাকানোর অবসর থাকে না। মোটামুটি দৌড়াতে থাকি। ব্রডভিউ-ক্যাসেলফ্র্যাঙ্ক-শেরবোর্ণ শেষে ব্লোর ইয়াং জাংশন। টিটিসির তিন বারের সিগন্যাল। কখনো ভিডিও গেমসের মতো করে শেষ মুহুর্তে ভেতরে ঢুকতে পারা, কখনো বা থমকানো। এক বিকেলে তাকিয়ে থাকে অসহায় কিশোরী...। এসব ভীড়, এসব কোলাহল, এসব ওভারকম্যুনিকেশন - মাইন্ড দ্য গ্যাপ। কিংবা কখনো মুগ্ধতা জাগানো গিটার, হোটেল ক্যালিফোর্ণিয়া আর ফাইভ হান্ড্রের্ডস মাইল; ইফ ইয়্যু মিস দিজ ট্রেন আয়্যাম অন...। দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে, মুগ্ধতায় - ক্লান্তিতে কিংবা অবসাদে। কোনো একদিন বিকেল অথবা সন্ধ্যার দিকে - ভেসে আসে লাকী আখন্দ, 'আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না, ফেরারী পাখিরা কুলায় ফিরে না'। লাকী আখন্দ কি গানের সুর ধার করেছেন, নাকি আমার বিভ্রম? সোনিয়াকে দেখে বিভ্রম জাগে। সকালে ইন্টারভিউ, প্রেজেন্টেশন, ক্লাস শেষে ক্লান্তি নিয়ে ফিরছিলাম। ডানডাস স্টেশনে দেখা সোনিয়ার সঙ্গে। পরে হিসেব করে দেখি ক্যালন্ডারের পাতায় সাত বছর কতো দ্রুত চলে যায়। মাঝে দেখা হয়েছিলো একবার দেশে '০৪ এর দিকে। চোখ পড়তেই আমি বিভ্রমে পড়ি - কারণ, বয়সের ভারে মানুষ ন্যুজ হয়, কিশোরী হয় না। আমার চোখে চশমা উঠেছে তা'ও দু'মাস পার হলো। ভাবি, হয়তো সোনিয়ার মতো কেউ হবে। ভার্সিটিতে আমার এক ব্যাচ সিনিয়র, আপা ডাকি, কীভাবে কীভাবে যেনো বন্ধুতার চক্করে কিছুদিন সে সময়। তারপর তো সবাই নামে কোনো কোনো স্টেশনে। সোনিয়ারা ফ্যামিলিসহ মাইগ্রেট করে '০২ এর প্রথম দিকে। প্রবাসী বন্ধুরা সচরাচর ঈর্ষা জাগায়। বিদেশী বন্ধু-বান্ধবী জুটে। পার্টি হয় উইকেন্ডে, লং ড্রাইভ আর ফিশিং এর গল্প ইয়াহু মেইলের ইনবক্স পেরিয়ে চলে যায় চায়ের কাপে, সিগারেটের ধোঁয়ায়। সোনিয়ার মেইলের রিপ্লাইগুলো, মনে পড়ে, আদনানই রেগুলার করতো...।
আমাকে চিনতে সোনিয়ার কষ্ট হয় না, 'তুমি শিমুল না?' আমি হাসি, বলি - 'না, আমি অন্য কেউ। কেমন আছেন?'
তারপরে নেক্সট ট্রেন ইন থ্রি মিনিটস। সোনিয়া কার এক্সিডেন্ট করে ঘরে ছিলো অনেক মাস, এখন ভালো। আমি বলি - ক্লান্ত হয়ে গেছি সেমিস্টারের শেষভাগে...।
ট্রেন আসে, ভীড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলি। আমার কাধের কাছে কান পেতে স্থুলকায়া ভারতীয় কিশোরী আলাপ শুনে। কলেজ-ওয়েলেসলি-ব্লোর। স্টেশনগুলো কাছাকাছি, আমাদের স্মৃতিচারণগুলো তার তিনগুণ প্রলম্বিত। ব্লোর থেকে ইয়াং'এর প্ল্যাটফর্মে যেতে যেতে লাকী আখন্দের গানের সুর ভেসে আসে। এবার আমি নিশ্চিত - এ বিভ্রম।

নির্মল স্যার কলেজে ইকনোমিক জিওগ্রাফী পড়াতো।
চল্লিশ মিনিটের ক্লাসের বিশ মিনিট নানান ক্যাচাল দিয়ে শুরু করে পরের বিশ মিনিটে চ্যাপ্টার শেষ করে দিতো, আর অদ্ভুতভাবে খেয়াল করতাম - ১ম বিশ মিনিটের ক্যাচালগুলো চ্যাপ্টার পুরো মনে রাখার জন্য ফিট। কিন্তু, বিভিন্ন কারণে এই স্যারকে আমার ভালো লাগতো না। শনিবারে ডেন্টোনিয়া পার্ক ক্রস করে আসছিলাম সকালে। পথে দেখা একজন, নির্মল স্যারের মতো। থমকে দাঁড়ালাম। সাথের মহিলার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে গেলো - গলার আওয়াজ শুনে নির্মল স্যারই মনে হলো। জিজ্ঞেস করলাম না কিছু। কী হবে জিজ্ঞেস করে?
কে-ই বা মনে রাখে কাকে...!

রাত সাড়ে নয়টায় ক্লাস শেষ। ভি/পি'তে এসে দাঁড়াই সোয়া দশটার দিকে। বাস আসতে দেরী হয়। শীত কমে গেলেও ঠান্ডা বাতাস...। ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকি। পাশে কথপোকথন -
"কী দরকার ভাই এখানে আনার? যে ছেলে দেশে কিছু করতে পারে সে এখানে এসে মাল টানার দরকার কী? আপনি জানেন- দেশে এখন কতো বেতন দেয়? ব্যাংক মোবাইল কোম্পানিগুলা অনেক অনেক দেয়, পোলাপাইন গুলশানে সব বান্ধবী নিয়া বাফে খায়, এখানে এসে না পারবে ইংরেজি বলতে না পারবে কাজ করতে। ...কিন্তু অনেকেই তো এসে ভালো করে? আরে ভাই কয়জন করে? কী দরকার এই দেশে কষ্ট করার? তাহলে ভাই আপনি দেশে চলে যান। হ, চলেই যামু, ৩০ তারিখে ডকুমেন্ট রেডি হবে, এর পরেই যামু গা। কি নাকি সামার এসে গেছে, ঠান্ডায় কাঁপতেছি। কে থাকে এই দেশে?"

ফার্মাসি বির্ল্ডিং এসে গেলে তারা নেমে যায়, তাদের আলাপ থামে না।

আমি অন্যমনষ্ক হয়ে পেনায়ারে নামতে ভুলে যাই।
ফ্লোরেন্সে নেমে উলটা হাঁটি।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP