09 March, 2009

গল্প: শনিবারে নাজ ম্যারেজ মিডিয়ায় (শেষ)

ফারজানার মনে হয়েছিলো এমন প্রশ্ন করার জন্য সাহস লাগে। রাজনের সেই সাহস আছে। এরপর তারা ক্রমশঃ ঘনিষ্ঠ হয়। তাদের একসাথে দেখা যায় ক্যান্টিনে, লাইব্রেরিতে, ছাত্র সংসদের অফিসে অথবা আরেকটু দূরে পুকুর পাড়ের নির্জনে। কেউ কেউ বলতো, ফারজানা নাজনীনের এ সাহসের পেছনে আসল লোক রাজন। কারণ, সে উপজেলা ভূমি কমিশনারের ছেলে, মোটর সাইকেল চাপিয়ে কলেজে আসে। যখন ইচ্ছা ক্লাস করে, যখন ইচ্ছা করে না, কিন্তু পাশ করে সব পরীক্ষায়। এলাকার ছেলেপেলে ফারজানাকে ঘাঁটানোর সাহস পেতো না এই রাজন এবং তার বাবার ভয়ে। সরকারী অফিসারের ক্ষমতা নিয়ে কম বেশি জানা ছিলো সবারই। অথচ ফারজানা কখনো রাজনের নাম ভাঙায়নি কোথাও। কলেজের বাইরে টং দোকানে চা খাওয়ার সময় কোনো এক ছেলে খারাপ কিছু একটা বলেছিলো, যেটা দোকানের মালিক রুস্তমচাচাও শোনেনি। শুনেছে ফারজানা, আর সাথে সাথে গরম চায়ের কাপ ছুড়ে মেরেছে ঐ ছেলের মুখে। রাজনকে ডাকা লাগেনি। ভয়ে ছেলেটি দৌড়ে পালিয়েছিলো, দেখে কেউ বলেছিলো – ‘খুব ভালো করেছে চায়ের কাপ মেরে’, কেউ বলেছে – ‘এমন দস্যি মেয়ে কোন বাবা জন্ম দিলো’। ফারজানার বাবা বেঁচে ছিলো না তখন। ভাইদের প্রশ্রয়ে নানান কাহিনীর নায়িকা ফারজানাকে এরপর একদিন দেখা যায় উপজেলা ভূমি কমিশনারের ছেলে রাজনের মোটরবাইকের পেছনে বসে কুসুমিয়া কলেজের সামনে দিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছে। তার ডান হাত রাজনের কোমর ছুঁয়ে ছিলো। অনেকদিন পর ফারজানার তাই রাজনকে মনে পড়ে সে বিকেলে। ইচ্ছে করে, রাজনের মোটর বাইকে চড়ে কুসুমিয়া থানা কমপ্লেক্সের সামনে গিয়ে থামতে। রাজন মোটরবাইকে বসে থাকবে, ওসি রওশন আরাকে ইচ্ছেমতো শাসিয়ে ফারজানা। এ কাজ সে এখনো ইচ্ছে করলে করতে পারে, ফারজানা জানে, সাহসের কমতি হবে না। কিন্তু এতদিন পরে ঝামেলায় জড়াতে ইচ্ছে করে না। তাই পুরনো রোমান্টিসিজম ভর করে মনে, যেখানে রাজন আর তার মোটরবাইক সঙ্গী হয়ে উঠে। রাজনের উপর পুরনো অভিমান আবার জেগে উঠে – একটা মানুষ চলে যাওয়ার পর একবারও খবর নিলো না! রাজন এখন কোথায় আছে কী করছে কিছুই জানা নেই। কেবল জেনেছিলো পাঁচ বছর আগে, ‘আব্বা বদলী হয়ে যাচ্ছে। আমরা চলে যাবো ত্রিশ তারিখে।’ এসব ভেবে ভেবে ফারজানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সেই শনিবারের পরে আরো দুই শনিবার চলে যায়। রওশন আরার জন্য পাত্র পাওয়া যায় না। নাজ ম্যারেজ মিডিয়া চালু হওয়ার আগে যেসব বেকার বৃদ্ধ ঘটকালী ব্যবসায় ছাতা হাতে ছুটতো তাদের কাছে ধর্না দেয় মাসুদ চাচা, বলে - যদি তেমন পাত্র থাকে। কিন্তু পাত্রীর নাম পরিচয় গোপন রাখে ফারজানার পরামর্শে। সেসব পুরনো ঘটকদের কেউ কেউ অবাক হয়, নাজ ম্যারেজ মিডিয়ার ম্যানেজার এসে তাদের কাছে পাত্র খুঁজছে। অথচ গত দু’বছরে তাদের সব ব্যবসা কেড়ে নিয়েছে এই ফারজানা নাজনীন। মুখে না বললেও সবাই বুঝে, এখানে ধমক ছিলো না একেবারে, যা ছিলো তার পুরোটাই নিছক চমক। উদ্যমী, সাহসী, স্পষ্টভাষী ফারজানার কথায় প্যাঁচ নেই। পাত্র কিংবা পাত্রী পক্ষের তথ্য গোপনের চেষ্টা নেই। আর মানুষ যখন ক্রমশঃ আধুনিক হচ্ছে, মোবাইল ফোনে কথা বলছে, ঘরে চৌদ্দ ইঞ্চি কংকা রঙিণ টিভি দেখছে, তখন জীর্ণ শীর্ণ বুড়ো পানখেকো বুড়ো ঘটক নয়, ফি দিয়ে ফাইলে নাম লেখানো সিস্টেমে নাজ ম্যারেজ মিডিয়ায় গিয়ে ফারজানার সাথে আলাপ করা যায়, ঠান্ডা ফ্যানের বাতাসে বসে স্প্রাইটের বোতলে মুখ লাগিয়ে এলবামে রাখা পাত্র-পাত্রীর রঙিণ ছবি দেখা যায়। এতোসব হাঁকডাকের মধ্যে ফারজানা মোবাইলে নানান নম্বর টিপে, কিন্তু কোথাও ত্রিশোর্ধ্ব অবিবাহিত সরকারী চাকুরীজীবি অথবা ব্যবসায়ী পাত্র পাওয়া যায় না। শেষে ফারজানা নিজেই ফোন করে ওসি রওশন আরাকে। মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় রওশন আরা ফারজানাকে পরে ফোন করবে জানায়, কিন্তু ফোন করে না। আরো তিন চারদিন পর এক দুপুরে রওশন আরা হাজির হয় নাজ ম্যারেজ মিডিয়ার অফিসে। তখন সেখানে পাত্র পাত্রীর সন্ধানে আসা জনা চারেক লোক ছিলো, মাসুদ চাচা ছিলো। ওসির আচমকা আগমনে উপস্থিত লোকেরা খানিক সংকোচিত হলে তাদের ভীত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে রওশন আরা বলে,
‘আপনারা সবাই একটু বাইরে যান, ফারজানা ম্যাডামের সাথে আমার প্রাইভেট আলাপ আছে।’
শুরুতেই ‘ঠান্ডা কিছু খাবেন’ প্রশ্ন করে আলাপ জমাতে চাইলেও ফারজানার অস্বস্তি কমে না, বরং বাড়তে থাকে যখন রওশন আরা বলে – ‘কিছু খাবো না, আমার ব্যাপারটার কদ্দুর কী করলেন?’ ফারজানা সহজ হওয়ার চেষ্টা করে, হাসিমুখে বলে – ‘আসলে বুঝেন তো আমাদের ছোট মফস্বল। আপনার মতো উঁচু মানুষের জন্য পাত্র পাওয়া সহজ না মোটেও...।’ এরপর ফারজানা আরো কিছু বলতে চায়, পারেনা। কারণ, রওশন আরা ফারজানাকে ইশারায় থামিয়ে বলে, ‘আপনাদের এই ম্যারেজ মিডিয়ার নামে তো থানায় অনেক কমপ্লেইন।’
ফারজানা থতমত খায়, ‘কী রকম?’
রওশন আরা টেবিলে আঙুলের টোকা মারে। ঠুক ঠুক করে বলে, ‘অভিযোগ আর কি? প্রতারণা...। বিয়ে শাদীর নাম করে আপনারা লোক ঠকান। টাকা দাবী করেন। এইসব।’
ফারজানা এবার সাহসী হয়, ‘অভিযোগের বিবরণ কি আমি জানতে পারি? প্রয়োজন হলে আপনার অফিসেও যেতে পারি।’
রওশন আরা চেয়ার ছেড়ে উঠে, বলে - ‘থানায় যেতে হবে না। একটু সতর্ক থাকেন কাজে কর্মে, তাতেই চলবে।’
নাজ ম্যারেজ মিডিয়ার অফিসে ওসি রওশন আরা আসার এবং চলে যাওয়ার এ দৃশ্য দেখে অনেকেই। কেউ কেউ এর কারণ খুঁজে। সেরকমই একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব বিগত বাম বিপ্লবী চিরকুমার বিল্টুকাকা আসে ফারজানার অফিসে, ‘কি ফারজানা! পুলিশ আসলো তোমার অফিসে? বিয়েশাদী করতে চায় নাকি?’
ফারজানা হাসি দেয়, ‘হ্যাঁ বিল্টু্কাকা – ঠিক ধরেছেন, ঐ ওসিকে আপনি বিয়ে করবেন?’
বিল্টুকাকা টেবিলে মাথা ঝোঁকায়, ‘তুমি আমার জন্য ঘুষখোর পাত্রী পছন্দ করলা?’
এরপর দুজনেই শব্দ করে হাসে। সামনের টেবিলে বসা মাসুদ চাচা হাসে। ফারজানা বলে, ‘বিল্টুকাকার জন্য চা নিয়ে আসেন চাচা’।

এ ঘটনার পরে আরো মাস চলে যায়। নাজ ম্যারেজ মিডিয়া আগের মতোই সরগরম থাকে। ওসি রওশন আরা আর আসেনি, ফোনও করেনি। একদিন খবর আসে ওসি রওশন আরা বদলী হয়ে গেছে জেলা পুলিশ সদর দপ্তরে। উপজেলা অডিটোরিয়ামে তাকে বিদায় সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছে, এমন খবরও ফারজানার কানে আসে।

এরপর অন্য এক শনিবারে দুপুর এবং বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে নাজ ম্যারেজ মিডিয়ার অফিসে কাজে মগ্ন ফারজানার মনোযোগ ভাঙে ‘নাজ, আপনার হাতে ভালো পাত্রী আছে’ প্রশ্নে। ফারজানা চোখ তুলে তাকায়।
সামনে চেয়ারে বসা ইউনিফর্ম পরা রাজন আহমেদ, কুসুমিয়া থানার নতুন ওসি।
__

(সমাপ্ত)

.
.
.

2 মন্তব্য::

রাশেদ 18 March, 2009  

পরে পড়বো।

Taohidul Hassan 26 March, 2009  

মোটামুটি ভালই.........

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP