06 March, 2009

মধ্য রাতের নেটনামচা

দীর্ঘ ক্লান্তিময় অথচ বিরক্তিহীন সময় পার করছি। মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু ভালো লাগছে না। অথচ খারাপ লাগার কিছু নেই। মাঝে মাঝে এভাবে সীমা টানা কষ্টকর হয়ে যায়। এইসব বোধ কাজ করে না। একেকটা বৃহস্পতিবার কাটছে কতো দ্রুত, আবার ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাচ্ছে ধীরে, বাইরে বরফ গলবে গলবে করেও গলছে না। ক্যালেন্ডারে টুকিটাকি নোট রেখে ভর্তি। আলস্য, ব্যস্ততা, সীমাবদ্ধতা সব পেরিয়ে খেয়াল করছি মোটামুটি সব ডেডলাইন ধরতে পারছি। মৃতরেখায় পৌঁছায় না কেউ কেউ। তাহলে করছিটা কী? এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন মনে হয়। বলার মতো কিছু নেই। কিছুই করছি না। ভালো বই পড়ছি না, মুভি দেখছি না, ব্লগিং করছি না, কমেন্ট করছি না, গল্প লিখছি না, এমনকি নিয়ম করে পেপারও পড়ছি না। এরপরেও করার তালিকার কমতি নেই। কহতব্য কিছু নেই, হয়তো ওসব আমি নিজের জন্য করি না, ভালো লাগার জন্য করি না, করতে হয় বলেই করি। অথবা আমাকে বেঁচে থাকতে হলে এইসব করতে হবে। এভাবেই চলতে হবে। আমার তাই ঘুম পায়। গ্রীণউড, কক্সওয়েল, উডবাইনের পরে আমার ঘুম পায়। মেইনস্ট্রীট স্টেশন পেরুলে আমি ভারী ব্যাগ কাঁধে তুলি। তারপর বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরলে আবার কাজের তালিকায় চোখ বুলাই। কোনটা আগে কোনটা পরে এসব ভেবে ভেবে মাঝরাত হয়ে যায়। ভেবে দেখলাম, প্রতিদিন যাদের সাথে কথা হয় বাংলা ভাষায়, তাদের বেশিরভাগ অনলাইনে। সাইবার সমাজের নাগরিক আমরা। এরকম কতো আগে কবে কীভাবে এসব ভার্চুয়ালিতে ডুব দিলাম, ভেবে শংকা হয় - আসল সোশ্যাল বেষ্টনীতে খুব অপাংক্তেয় হয়ে যাবো হয়তো, কিংবা হয়ে গেছি। যাচ্ছি ক্রমশঃ। অনেক সময় খুব গন্ডিবদ্ধ মনে হয় নিজেকে , এইসব সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেঁচে থাকি প্রতিদিন। পিলখানা ট্র্যাজেডিতে বিমর্ষ হই, হতবাক হই। কী-ই বা করার থাকে। কোথাও খেলারাম খেলে যাচ্ছে, কে যেনো জোর করে বসিয়ে দিয়েছে গ্যালারীতে। দর্শক হয়ে আছি এইসব সাজানো প্লটের। নাম মনে নেই, একই স্কুলে আন্ডারগ্রেডে পড়ে, ছেলেটির সাথে পরিচয় হয়েছিল আরও মাস কয়েক আগের। স্বদেশী সারল্যে ভরপুর, প্রবল উৎসাহ পরায়ণ। মনে হয় সারাক্ষণ দেশ নিয়ে ভাবে। মায়ানমার সমুদ্রপথে আক্রমণ করলে চায়না আসবে নাকি ভারত আসবে তা নিয়ে ভাবে। আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর কঠিন মনে হয়। এরপর আরও অনেকদিন দেখা হয়ে যায়, চলতি সিঁড়িতে, ব্যস্ত করিডোরে কিংবা ডানডাস স্টেশনে, বন্ধুদের সাথে হই-হল্লা করে বাসায় ফিরছে রাতের ট্রেনে। আমি মুখ বুঁজে আছি শ্যন ওয়াইজের 'ওয়াইজ ওয়ার্ডস'। ' দ্য ফার্স্ট মিটিং উইথ ইউর ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ইজ লাইক দ্য ফার্স্ট ডেট। গেট ড্রাঙ্ক এন্ড সি হাও হি/শী বিহেভস।' রুল সেভেন্টিন। সন্ধ্যা ছয়টায় ক্লাস, সাড়ে পাঁচটায় প্রিন্ট আউট নিতে হবে। নির্ঘুম চোখ নিয়ে দৌড়ে যেতেই দেখে অসহায়ভাবে ছেলেটি বসে আছে। হাত তুলে সালাম দেয়। হয়তো দেশের বড়ো ভাই ফ্যাক্টর কাজ করে, আমি মানিনা এসব। ডেকে বলে, মন ভালো নেই। দেশটার কী হয়ে যাচ্ছে এসব। ইনভেস্টমেন্ট কমে যাবে, ইমেজ খারাপ হবে। আমি হু হ্যা করি, বলি - আসলেই হতাশার ব্যাপার, কিন্তু - আমাদের কন্ট্রোলের বাইরে। তাকে বুঝাই দর্শক হয়ে আছি। আমার মনে হয় সে হতাশ হয়। আমার দৃশ্যমান নির্লিপ্ততা আলাপ থামিয়ে দেয়। অবশ্য এসব আলাপে অন্য পক্ষের মনোভাব বুঝে গেলে আমি চুপ হয়ে যাই অথবা তীব্র রিভার্স খেলি। সাবেক সম্ভবনাময় যুবরাজের ফ্যান মিল্টন তাই এমএসএনে আমার সাথে আলাপে আগ্রহী হয় না। আজ বাংলাদেশ সময় রাত দুটায় তাকে অনলাইনে দেখে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে, তার মন খারাপ, দেশের জন্য মন ভালো নেই। আমি বলি, আসলে সব দোষ ইন্ডীয়ার। মিল্টন টের পায়, সে আমাকে পলিটিক্সের দোহাই দেয়, আমি পালটা দোহাই দিই, বলি - 'দেশের কথা ভাবি'। তারপর সে আমাকে যাবতীয় অনিশ্চয়তার কথা বলে, এসবই ভারতের পরিকল্পিত। বর্ডার খুলে দিয়েছে, ঢাকা শহরে এখন ইন্ডিয়ান ছিনতাইকারী ভরপুর, সে রাত দশটার আগে ঘরে ফিরে, মোবাইল নিতে ভয় পায়। আমি আরও উস্কে দিই, চুকচুক করি। মিল্টন কনফিউজড হয়। আবার আওয়ামি-বিয়েনপি সীমারেখা টানতে চায়। আমি ঈশ্বরের দোহাই দিই, রাজনীতি দূরে রাখতে বলি। বলি - খালেদা কি মনে করে, সরকার পতনের আন্দোলন কি করা উচিত? তার মতে এখন না। আমি একজন ব্লাইন্ড বিয়েনপি সাপোর্টারের সাথে কথা বলি, হয়তো সে আরাম পায়, আমার স্বভাবে বাঁক দেখে। পাকিস্তানে শ্রী লংকার ক্রিকেটারদের উপর হামলার কথা আসে, আমি একে ভারত আর আওয়ামি লীগের সাথে যুক্ত করি, বলি - এসব পরিকল্পিত। মিল্টনের আগ্রহ বাড়ে। এভাবে সময় যায় এম এস এনে। বাংলাদেশে তখন রাত তিনটা। জিজ্ঞেস করি, এত রাত জাগার কারণ কি? ব্যক্তিগত নাকি রাষ্ট্রিক? মিল্টন বলে, দেশের জন্য দুঃশ্চিন্তা। এবার আমি সমাধান দিই, এভাবে ঘুম নষ্ট করে লাভ নেই, বরং ম্যানিফেস্টো করা যায়, দাবী নিয়ে মাঠে নামা যায়, দেশের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া যায়, প্রয়োজনে গায়ে আগুন ঢেলে দেয়া যায়। এটুকু বলা বেশি হয়ে যায়, আমি কেনো প্রবাসে সে প্রশ্ন আসে। কাটকাট বলে ফেলি, আমি সেলফিস, আম দেশের জন্য রাত জাগি না। তবে প্রয়োজনে তার ম্যানিফেস্টো তৈরিতে সহায়তা করবো। প্রফেসর টিম ম্যাকলারেন তখন সাপ্লাই চেইন ডিমান্ড ফোরকাস্টিং'এর চ্যাপ্টার শেষ করেছে। আমার সামনের বেঞ্চের মার্সাল এক্সেল শীটে তুলে নিয়েছে সব, তার সামনের ক্রিস্টি বইয়ের পাতায় হাইলাইটারে দাগিয়েছে সব। আমি দর্শক হয়ে আছি। বাইরে বাতাসটা সহনীয় ইদানিং। নিঃশ্বাসে আরাম আছে, আজ মাইনাস টু ছিলো, আগামীকাল প্লাস বারো হবে। গত সপ্তার মাইনাস সাতাশের পরে এ বোধ বড়ো আরামের, বড়ো স্বস্তির। এই উইন্টার প্রলম্বিত হলে আমি ক্লান্ত হবো আরো, আমি স্থূল হবো শরীরে-মননে। 'অথবা গল্পহীন সময়' নিয়ে টুকটাক পাঠক প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পেলাম বইয়ের আকার ছোটো দেখতে কিউট। সেই গুণ বিচারীর আগে দর্শনধারী তত্ত্ব চলে আসে আবার। প্রফেসর পলও এই কথা বলছিলো গত রোববারে। কিছু এসাইনমেন্ট ফেরত নিতে এসেছিলো আমার বাসায়। বাড়ীওলার আতিথেয়তায় নাশতার টেবিলে আলাপ জমে। বুঝায়, এইসব এমবিএ ফ্যাম্বিয়ে করে আসলে চাকরি হয় না। বেকারের সাথে কেউ নেটওয়ার্কিং করে না। আমার সহকর্মী ভ্যালেরির কথা আসে, আর যা-ই হোক দেখার গুণে সে চাকরির বাজারে এগিয়ে যাবে। দু'দিন পরে পরীক্ষায় ইনিভিজিলেশন ডিউটি ছিলো। পুরনো নিয়মে আমি পেছনে দাঁড়িয়ে থাকি। ন্যাশনাল পোস্টের ফাইন্যান্স পাতায় দেখি ক্রাইজলারের ভায়াবিলিটি প্ল্যান নিয়ে জ্ঞান। তখন আরেক মিল্টনকে মনে পড়ে। মিল্টন বিশ্বাস আমাদের বাংলা পড়াতো সেকেন্ড ইয়ারে, লালসালু। হয়তো বয়সে তরুণ ছিলো বলে, কিংবা আমাদের প্রত্যাশা সেরকম ছিলো বলে, মিল্টন বিশ্বাস নানান ইংগিতপূর্ণ কথায় ক্লাস জমিয়ে তুলতো - 'এই, এই- এই ছেলে, আমি তোমাকে কাল দেখছি, তুমি কাল গেটে দাঁড়িয়ে রিকশা চড়ে যাওয়া মেয়েদের দেখছিলা।' ক্লাসে হাসির রোল উঠে। 'এই, তোমরা কি দেখ? মেয়েদের কাঁধ ঘাঁড় দেখো?' আবার 'ছিঃ ছিঃ' কলরবে তবলা স্যারের ক্লাসের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। 'একবার কি হয়েছে শোনো, এইচ এস সি পরীক্ষায় ডিউটি পড়লো, আইডিয়াল গার্লসে, ঐসব রুমে আবার বসার চেয়ার নাই, ভাবলাম কী করবো, মেয়েদের ফরসা ফরসা ঘাড় গলা দেখে সময় কাটাবো, ওহ! গিয়ে দেখি মেয়েরা আরও চালাক, সবাই স্কার্ফ পরে এসেছে।' ক্লাসে আবার ছিঃ ছিঃ রোল উঠে। আমরা সবাই টের পাই আমাদের আর ক্লান্তি লাগে না। প্রমীলা ম্যাডামের চেয়ে মিল্টন বিশ্বাসকে ভালো মাস্টার বলে মনে হয়। ১১ বছর পরে মঙ্গলবারে এসব যখন ভাবছিলাম তখন পল এক প্যানিক ছাত্রীর পাশে গিয়ে বসেছে, প্রশ্ন বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমি অকারণে এদিক থেকে ওদিকে হাঁটি। কাজের তালিকা করি হাতের কড়ে গুনে গুনে। আমি জানি এসব দিন শেষ হবে, কতো পুড়ে ফেলা ডায়েরিতে লিখেছিলাম দিনগোণা বড়ো বোকামি। তাই দিন গুনি না। ইচ্ছে করে না। এই ক্লান্তি ভালো লাগে। তাই বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। অলটারনেটিভ থাকে মৃত্যুর। আপত্তি নেই। বিশাল মোহে পড়ার আগে, এই পৃথিবীর চোরকাঁটায় জড়ানোর আগে বিদেয় নেয়া যায়। অথচ জানি, ঘরে ফিরতে হবে। অপেক্ষার খেরোখাতা ফেলে দিয়েছি আগে। জেনে গেছি, মৃত্যুর জন্য ছাড়া পৃথিবীর সব অপেক্ষা বিরক্তিকর। তাহলে শেষে এ সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় - এসবই সাময়িক। ইদানিং খুব টের পাচ্ছি, পালটে যাচ্ছে চারপাশ। সোশ্যাল এলিমেন্ট। যা কিছু পাল্টানোর কথা ছিলো, তা তো পাল্টাবেই, কী এসে যায় একগুঁয়েমি করে কী সব দর্শনে বসে থেকে?
__

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP