17 November, 2008

ভার্চুয়াল আচরণ বনাম ব্যক্তি অনুসন্ধান

যারা ব্লগস্পটে ব্লগান তাঁদের বেশিরভাগই কাউন্টার বসান - কে এলো গেলো, কোত্থেকে এলো, কেমন ভিজিটর এলো এসব জানতে। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। গুগলে কোন শব্দ সার্চ করে আমার ব্লগস্পটে কীভাবে কে এলো সেটাও দেখা যায়। গত এক মাসে খেয়াল করেছি জনৈক জম্মানবাসী সচলের নাম ধরে গুগলিং করে আমার নিজের ব্লগস্পটে ভিজিটর বাড়ছে। আটলান্টিকের এপার ওপার দুপার থেকেই গুগলিং হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে পোস্টে ভিজিটররা আসছেন সেটা নিছক কল্পগল্প। ব্লগ ইন্টার‌্যাকশনের অতীত না জানা থাকলে ঐ লেখা পড়ে নতুন কারো বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা মারাত্মক।

‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ সেমিনারে প্রফেসর আভনার প্রশ্নটা তুলেছিলেন কয়েক সপ্তাহ আগে। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে কারও সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া যায় সেটা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য। কিংবা পাওয়া তথ্য পুরোপুরি সত্য হলেও তার কতোটা গ্রহণ কিংবা কতোটা বর্জন করতে হবে?
তর্ক হয়েছে তুমুল।
কেউ তার নিজস্ব অবস্থান থেকে নিজের সাইট/ব্লগ চালাতে পারে। সেখানে তার নিজের রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলতে পারে। এটা নিতান্তই তার ব্যক্তিগত। কিন্তু, অন্যরা তার এ মত কিংবা আদর্শকে কীভাবে দেখবেন?

এ ব্যাপারেই জানতে চাইছি প্রিয় সচলদের কাছে -

কয়েকটা দৃশ্যকল্প দিলে মনে হয় ভালো হয়ঃ

এক.
একজন মানুষের সাথে নতুন পরিচয় হলো আপনার। তার সাথে সামাজিক কিংবা পেশাগত সম্পর্কের একটা সম্ভবনা আছে। যেমন, প্রেম বন্ধুত্ব বা বিয়ের প্রস্তাব হতে পারে। আবার হতে পারে তার সাথে ব্যবসা করবেন অথবা সে আপনাকে চাকরী দিবে তার অফিসে কিংবা আপনি তাকে চাকরী দিবেন আপনার অফিসে।
হঠাৎ মনে করলেন, আররে, গুগলে ওর নামে সার্চ মেরে দেখি তো কী কী আছে! এখন বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে। আপনি হয়তো তার ব্লগ পেলেন, কিংবা কোনো ফোরামে আলাপ-আড্ডা পেলেন, অথবা ফেসবুক একাউন্টের খবর পেলেন।

প্রশ্নঃ এসব জায়গায় পাওয়া তথ্যগুলোকে আপনি কতোটা সিরিয়াসলি নিবেন? যা পড়বেন তা কি বিশ্বাস করবেন? আগে যেমনটা বলেছি, সামাজিক বা পেশাগত সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব ভার্চুয়াল তথ্য আপনাকে কতোটা প্রভাবিত করবে?
__

দুই.
এটা আগেরটার সম্পুরক বা পরিপূরক। অনেকেই বলেন, ভার্চুয়াল স্বত্বা বাস্তব থেকে আলাদা। তার মানে কি এটা দাবী করা যাবে যে আমি অন্তর্জালে যা বলছি সেটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়! যাঁরা ছদ্মনামে লিখেন তাঁদের ব্যাপারটা আলাদা করে রাখি। কিন্তু যাঁরা নিজের নামে লিখেন, বিভিন্ন বিষয়ে তর্ক বিতর্কে অংশ নেন, তাঁরা কি নিজের সব মন্তব্যের কিংবা অবস্থানের দায়ভার নিবেন? ধরি একজন মানুষ নাম ‘গাজী ওবামাকেইন’। এটা তাঁর আসল নাম, তিনি এই নামেই ব্লগে লিখেন। যুক্তির আসরে ঝাপিয়ে পড়েন স্বউদ্যোমে। অন্যায় কথাবার্তা দেখলেই যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চান ঠান্ডা মাথায়। মাঝে মাঝে পারেন, মাঝে মাঝে পারেন না। তখন মাথায় রাগ চড়ে যায় আর প্রায়ই বলে ফেলেন – ‘রামছাগলের মতো কথা বললে গদাম লাত্থি খাবি’। এই কথা তিনি এতোবার বলেছেন যে একটু ডিটেইল গুগলিং করলে এই ব্যাপারটা সার্চে চলে আসে। এখন গাজী ওবামাকেইন চাকরি বা বিয়ের জন্য মাঠে নামলেন। চাকরীদাতা বা হবু শ্বশুর দিলেন গুগলে সার্চ। দিয়ে বললেন, ‘ধুর, ওতো অভদ্র রগচটা। দেখো কী সব নোংরা কথা বলে নানান ফোরামে।‘
আর এভাবে ক্রমাগতঃ বাদ পড়েন গাজী ওবামাকেইন। বন্ধুরা বিয়ে করে, বন্ধুরা চাকরি পায়। গাজী ওবামাকেইন অপেক্ষা করে সুদিনের। জানেও না কেনো সে বাদ পড়ে বারবার। জানলেও যুক্তি দেখায়, ‘আরে ওটা তো ভার্চুয়াল...’।

প্রশ্নঃ ভার্চুয়াল স্বত্ত্বা আর বাস্তব স্বত্ত্বাকে আপনি কতোটা একাত্ব বা আলাদা করে দেখেন? গাজী ওবামাকেইনের অন্তর্জালিক আচরণকে আপনি কেমন করে দেখবেন?

__
তিন.
এটা একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এটা হলো অন্তর্জাল আচরণের দায়ভার। যেমন ধরি, আমি সময় পেলে প্রায়ই ইউটিউবে ঘুরি। এরকম ঘুরতে ঘুরতে আজ পেলাম বাংলাদেশী সদ্য কিশোরী এবং সদ্য যৌবনা দুই বোনের মর্ডান নাচের ফাইল, গায়ে টি শার্ট- থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। পুরোটাই ঘরোয়া এমেচার কাজ। ভিডিও করেছে তাঁদের মা বা খালা বা বড়বোন বা অন্য কেউ। গুতিয়ে দেখলাম ঐ ইউজারের ফোল্ডারে এরকম আরও হাফ ডজন শৌখিন নাচ-গানের ভিডিও আছে। ধরি, নাচগুলো আমার কাছে খুব ভাল লাগলো। একটু ঝাকানাকা, তবে বারবার দেখার মতো ব্যাপার। কিংবা ধরি, আসলে সেরকম শিল্প মানের কিছু নয়, আমার উথাল-পাথাল বয়সের কারণেই এরকম অসাধারণ জিনিশ বলে মনে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, সচলায়তনে কিংবা ফেসবুকে দিই, সাথে আরও কিছু ইন্টারেস্টিং ভিডিও দিই। সবার সাথে শেয়ার করি। দেয়ার আগে কথা বললাম, আমার বাল্যবন্ধু দীপ্তর সাথে। সে প্রতিভাবান কম্পিউটার বিজ্ঞানী। এবং সে কম্পু-এথিকসের ব্যাপারে ভালো জানে। সে আমাকে বললো, ‘এটা একটু গ্রে সিদ্ধান্ত। তবে যেহেতু ধরা যায় এগুলো পাবলিক প্লেসে ওপেন করে রাখা আছে, সেহেতু তুমি সচলে এমবেডেড ভিডিও করে দিতে পারো। কিন্তু, খেয়াল রাখো – উলটা পালটা কমেন্ট আসলে তার দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে’।
এরপরে চিন্তা করলাম, আসলেই কী তাই? উচ্ছ্বলা উদ্ভিন্না দুটো মেয়ে নাচবে, দুলবে; এটা দেখে কেউ একজন সরেস কমেন্ট করে বসতেই পারেন। আরও দুয়েকজন তাতে রসদ দিতে পারেন, কারণ – যারা নাচছে তাদের আমরা কেউ চিনি না, তারাও আমাদের চিনে না। এই ফোরামে এরকম কমেন্ট চালাচালি হচ্ছে সে খবর তাদের কানে হয়তো যাবেও না। যেহেতূ মালিকের অনুমতি ছাড়া এরকম ক্লিপ আমি অন্য কোথাও শেয়ার করছি, এবং সেখানে ‘অনুভূতিতে আঘাত আসতে পারে’ টাইপ কমেন্ট করা হচ্ছে, সেহেতু পাবলিশার/ডিস্ট্রিবিউটর হিসাবে এর পুরো দায়ভার আমাকেই নিতে হবে। দীপ্তর এ ব্যাখ্যাটা মনে ধরেছে।

প্রশ্নঃ দীপ্ত যা বলেছে তা কি শতভাগ ঠিক? কোনো পারফরম্যান্স, সেটা লেখা হোক – গান হোক – নাচ হোক, যখন পাবলিকলি আসে তখন পাঠকের/শ্রোতার/দর্শকের মতামত দেয়ার স্বাধীনতা কি অসীম নয়? সকল প্রকার মতামত কি পারফরমারকেই নিতে হবে না?

প্রিয় সচল, আপনি কী ভাবছেন?
__

বাংলা অন্তর্জাল বিস্তৃত হচ্ছে। নিত্য আসছে নতুন ফোরাম। থাকছে নানা রকম নীতিমালা, অবস্থান। উপরের দৃশ্যপট বিবেচনায় এই মুহুর্তে ভার্চুয়াল আচরণের সীমানা নির্ধারণ কি প্রয়োজন?

__

সচলদের মন্তব্য প্রতি মন্তব্য আছে এখানে...।

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP