15 November, 2008

ব্লগে প্রবাসী বাঙালীর স্মৃতিকাতরতা

ইন্টারনেট ছাড়া চলছে না একদম। গুরু-সতীর্থ-স্বজন সব এই অন্তর্জালে বাঁধা। লগ ইন করা মানেই জিমেইল, ফেসবুক আর সচলায়তনে যাওয়া। এখন গান শোনার বাইরে বিনোদন বলতে ফেসবুক আর সচলায়তন। এক সময় ফেসবুক ভাল্লাগতো না। দু'বার মনে হয় ডিলিট করেছিলাম। আদনানের বিয়ের ছবি দেখতে হবে, বললো - ফেসবুকে আছে দেখে নাও। আমি বললাম, মেইলে পাঠাও। উহু, ফেসবুকে গিয়েই দেখতে হবে। অতঃপর আবার যাই ফেসবুকে, মনজুর কী করে ধরে ফেলে - এড করে। এরপর আর থামাথামি নেই। ব্লগের সংগীরাই বেশি। এখন খারাপ লাগে না। মজাই লাগে, নানান জনের ছবি দেখি, কমেন্ট করি টুকটাক। এর মাঝে সময় কেড়ে নিলাম সচলায়তন থেকে। মন দিয়ে লেখা পড়ে কমেন্ট কবে করেছি সেটা মনে করতে পারি, কারণ সেরকম কমেন্ট খুবই কম। ঝালমুড়ি পোস্টে ঐ তুলনায় দ্রুত কমেন্ট করা যায়। করেছিও মাঝে মাঝে।

আরেকটা কাজ করি, প্রিয় কজন মানুষের ব্লগস্পটে ঢুঁ মারি মাঝে মাঝে।
গতকাল এরকমই চোখ আঁটকালো অমিত আহমেদের ব্লগে।
'ষড়ব্লগ' লেখার ১ম অনুচ্ছেদের কিছু কথায় ভাবনায় পড়লাম।
অমিত লিখেছে -

প্রবাসী বাংলাদেশীদের দিনলিপি মার্কা ব্লগ পড়তে ইদানিং খুব ক্লান্ত লাগে। এসব ব্লগে অবধারিত ভাবেই দেশের স্মৃতিচারণ থাকবে। "আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম" উপলব্ধি থাকবে। নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস থাকবে। আর নিশ্চিত ভাবেই এমন কিছু থাকবে যাতে মন খারাপ হয়ে যাবে। তাই অনেক প্রিয় লেখকের ব্লগ পড়ার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবে পড়তে হয়। এমন কেনো? এটা কী প্রবাসের মূলধারার সাথে মিলে যেতে না পারার আক্ষেপ? নাকি ব্লগাররা খুব মন খারাপ হলেই কেবল দিনলিপি লেখেন?

ক্লান্তি লাগাটা অমিতের নিজস্ব বোধ। আপত্তি নেই মোটেও। অনেক ভালো কিছুতেও ক্লান্তি আসতে পারে। কিন্তু এর পরে অমিত খুব সিরিয়াস একটা বিষয় ধরেছে - প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্লগে স্মৃতিচারণ থাকবে, আগের দিন নিয়ে আক্ষেপ থাকবে। এবং অবধারিতভাবে পাঠকের মন খারাপ করানোর একটা ছোঁয়া থাকবে। ভেবে দেখলাম, এ পর্যবেক্ষণ আমারও। এরপর আমি অমিতের সাথে একমত হই তার করা শেষ দুটি প্রশ্নে। কারণ, প্রশ্নগুলো আমারও।

এটা কী প্রবাসের মূলধারার সাথে মিলে যেতে না পারার আক্ষেপ? নাকি ব্লগাররা খুব মন খারাপ হলেই কেবল দিনলিপি লেখেন?

অমিত এর পরে ৫ অনুচ্ছেদে একান্তই ডায়েরি লিখেছে। সিগারেট, বুরহানি, স্ট্রাইক, ম্যুভি। তবে আগের প্রশ্নগুলো উত্তরহীন রয়ে গেছে। বাংলা ব্লগস্ফিয়ারে আরও বছর দুয়েক আগে এক শক্তিমান ব্লগার লিখেছিলেন 'আজ বৃষ্টি হলো, বৃষ্টিতে ভিজলাম। আজ আমার মন ভাল নাই; এইসব বালছাল পড়তে ভালো লাগে না। ব্লগে এগুলো লিখবেন না।" বোঝা গিয়েছে তিনি নিজেই বিরক্ত ছিলেন ঐসব একঘেঁয়ে একান্ত দিনলিপির চক্করে। হতে পারে কম্যুনিটি ফোরামে এমন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ অনুভূতির প্রকাশ্য বয়ান কাম্য নয়। হতেই পারে। সমস্যার কিছু নয়। আপনার একান্ত ফ্যাঁচফ্যাঁচ কান্না আপনার ব্লগে ভেজান, আপনার বিরিয়ানী-বুরহানী না পাবার খিদা আপনার ব্লগেই ঢালেন, ঝমঝম বৃষ্টির জন্য রাত জাগার শব্দমালা আপনার নিজের ব্লগে নির্ঘুম করে লিখেন। আমজনতার আপত্তি নেই।
একমত অনেকাংশে।
আমার নিজের সুখ-দুঃখ নিয়ে কম্যুনিটি ব্লগে আজান দেবো কেনো?
এরচেয়ে বরং 'পেঁয়াজের দাম তিন দিনে বেড়েছে দশটাকা, আলু তিন টাকা' নিয়ে কমেন্ট্রি লেখা যায়। পারষ্পরিক আলাপের সুযোগ আছে এমন বিষয় নিয়ে কীবোর্ডে ঝড় তোলা যায়। আপলোডারদের কনুই মেরে ব্লগ সাহিত্য যে আগামীতে মূলধারায় জায়গা করে নেবে সেটা নিয়ে গম্ভীর আলাপ জুড়ে দেয়া যায়।
এমনটাই তো ভালো।

কথা হচ্ছে, এসব তো কম্যুনিটি ফোরামের কথা।
তাহলে একান্ত নিজের ব্লগ বলে পরিচিত ব্লগস্পটে লেখালেখির ধরণ কী রকম হবে?
এখানে কি আমি আমার সদ্য অথবা পুরনো বন্ধুবীকে দৈনিক চুমু খাওয়ার বর্ণনা অথবা স্মৃতি বা তার চলে যাওয়া, অথবা অন্যকোনো কারণে মন খারাপের কথা লিখতে পারবো? এ লেখা লিখতে গেলে কি পাঠকের চিন্তা আমার মাথায় আসবে?
যদি ধরে নিই, ব্লগস্পট আমার দিনলিপির জায়গা, আমার নিজের পাতা। তাহলে এখানে যা খুশি ইচ্ছা লেখার অধিকার আমার আছে। এটা আমার ডিজিটাল ডায়েরি।
তাই, এই ডায়েরি আমি খোলা পাতা রাখবো, নাকি বন্ধ করে রাখবো, সেটা আমার সিদ্ধান্ত।
প্রক্রিয়া জটিল কিছু নয়। আমার কথা আমি গোপন রাখতে চাইলে ব্লগ রিডারের জায়গাটা ক্লোজ করে দিতে পারি। কেবল সিলেক্টেড মানুষই আমার ব্লগ পড়তে পারবেন। কিংবা একান্তই আমি। কাগজ কলমে না লিখে কম্পিউটারে ডায়েরি লিখি।
এ জায়গাটা একেবারেই নিরাপদ। এরকম নিরাপদ জোন অপ্রকাশ্য থাকে, অপ্রকাশ্যই থাক। সেখানে ভালোবাসা থাক, ভালোলাগা থাক, অভিমান থাক, নিন্দা থাক। পরচর্চাও থাকুক। এবং সেটা গোপনই থাকুক।

কিন্তু, আমি যখন আমার ডায়েরি উন্মুক্ত রাখছি, তখন কী একেবারে স্বাধীনভাবে লিখতে পারছি। লিখতে গেলে কী একবারও ভাবছি যে অন্য কেউ এ লেখা পড়তে পারে? হায়দার নামক পাকি প্রফেসারকে আমি গত ১০ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্ধি চুত্মারানি-শুওরের বাচ্চা-মাদার্চুত এবং আরও কুৎসিত গালি দিই। আমার এ তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া-বোধ কিংবা অনুভব কি খোলা ডায়েরিতে লেখা যাবে? লেখার পর আমি প্রিয় কোনো ব্লগার এসে বলবে না তো - 'মাথা গরম করো না...'? আমার এই একান্তই নিজস্ব ব্যাপারগুলোতে অন্য কেউ এসে নাক গলাবে সেটা কি আমি পছন্দ করবো? ঘুরে ফিরে সে-ই কথাই চলে আসে, প্রকাশ্য ব্লগ কতোটা ব্যক্তিগত, কতোটা ভাগাভাগির?

এখানে দুটো অপশন থাকতে পারে, ১) আমার নিজের ব্লগে আমি লিখি, আমার ইচ্ছা তাই পাতা খোলা রাখি, তুমি পড়ো, কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমার লেখা পড়ে তোমার কান্না পেলো নাকি বিরক্তি লাগলো - থোড়াই কেয়ার করি। হু দ্য হেল ইয়্যূ আর? ভালো না লাগলে আমার ব্লগবাড়িতে আর এসো না।
২) আসলে এরকম মনে হলো, গতকাল ঘটনাটা ঘটলো, বা ছোটো ভাইটাকে কাল স্বপ্নে দেখলাম, ব্লগে তাই লিখলাম। এই মন খারাপটা হয়তো কেটে যাবে দ্রুত। কিন্তু মনে হলো, লিখে ফেলি। এই দূরদেশে কথা বলার লোক কই? নিজের সাথে নিজেই বলি, ব্লগেই লিখি। আর লিখতে গেলে মনটা আরও নরোম হয়ে আসে। যা ভেবেছি লিখতে গিয়ে তার চেয়ে আবেগী হয়েছি। ব্লগ লেখাটা এক রকম থেরাপী বলা যায়। সকালে এই পোস্ট লিখে বিকেলে ঠিকই ম্যুভি দেখে এলাম। সারাদিন আর এসব মনেই পড়েনি।

এই দুই অপশনের ১ম টা নিরাপদ।
কিন্তু, ২য়টা নিয়ে কথা থেকে যায়।
নিজের ব্লগপাতা একান্ত করে রেখে এবং লিখে, প্রিয় কিছু লিংক যখন রাখবো, চাইবো অন্যরা আমার লেখা পড়ুক। কে কে আসে না আসে সেটা দেখার জন্য স্ট্যাট কাউন্টার লাগাবো। রেফারিং ইউ আর এল নিয়ে গুতাবো। এই পাঠক মোহ যখন থাকেই, তখন নিজের মন খারাপের বয়ানে অন্যের বিরক্তি বা মন খারাপ করানোর অধিকার আমার কতোটুকু আছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা আপাততঃ কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

এক সময় ঘরকুনো বলে পরিচিত বাঙালী প্রবাসে ছড়িয়েছে কয়েক দশকেরও বেশি হলো। নেটিজেন হয়ে ফিজি থেকে আলবার্টা, ক্যামেরুন থেকে সুইডেনের দূরত্ব ভুলতে বসেছে। চিন্তায় আচরণে আধুনিক হতে পারছে, অনুভূতিগুলো ব্লগের পাতায় তুলছেও হয়তো। কিন্তু, সে-ই ঘর-বিরামীর রোমান্টিসিজম ভুলতে পারছে ক'জন?

প্রবাসের মূলধারার সাথে মেশা না মেশায় এইসব অনুভূতি পাল্টাবে কিনা সেটা আমার বড়ো সন্দেহ। কোথায় যেনো পড়েছিলাম, বিদেশী পাসপোর্ট পেয়ে বছর পেরিয়েছে অনেক। সবুজ পাসপোর্টটা তবুও কতো যত্ন করে রাখে আলমারীর ড্রয়ারে। মাঝে মাঝে হাতে নিয়ে আলতো করে পরশ বুলায় পাতায়, যেনো অনেক আগে চলে যাওয়া বাবার ফ্রেমবন্দী সাদাকালো ছবি।

অমিতের লেখা পড়ে বারবার ভাবছিলাম, প্রবাসী বাঙালীর এ অন্তর্জালিক নস্টালজিয়া, এ স্মৃতিকাতরতা আসলেই কী এড়ানো সম্ভব!

.
.
.
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ এখানে

4 মন্তব্য::

Aumit Ahmed 15 November, 2008  

দুর্দান্ত আলোচনা। তবে বাংলাদেশীদের স্মৃতিকাতরতাকে মেকি/নেঁকি বলাটা খুব বাড়াবাড়ি হবে। এমন আমার কখনো মনে হয় নাই। প্রবাসে থাকলে মন খারাপ হবেই, এড়ানো সম্ভব না। হুট করে মনে পড়ে যাবে ফেলে আসা সময় স্থান কিংবা মানুষের স্মৃতি। আমারও যে হয় তার প্রমান আমার ব্লগেই আছে। তবে একটানা এমন ব্লগ পড়ে গেলে মনে হয় আমরা সবাই বুঝি হতাশাবাদী হয়ে গেছি। এই বোধটি ক্লাক্তিকর।

কমিউনিটি আর ব্যক্তিগত ব্লগের তুলনামূলক আলোচনা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। দুই ব্লগেই পাঠকের আনাগোনার ব্যাপারটি যেহেতু আছে (লুকানো ব্লগের ব্যাপার আলাদা। সেটা অনেকটা ব্যক্তিগত ডায়রি ধরণের হয়ে যাচ্ছে।) সেহেতু কিছু জিনিস বিবেচনায় রাখতেই হয়। তবে কমিউনিটি ব্লগের মেজাজের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ব্যক্তিগত লেখা দুই ব্লগেই দেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি।

আনোয়ার সাদাত শিমুল 15 November, 2008  

ধন্যবাদ অমিত। ভালো লাগলো।

শিরোনামের 'মেকি/ন্যাঁকি' মুছে দিলাম।

নিঘাত সুলতানা তিথি 16 November, 2008  

হুম।
প্রবাসী বাংগালীর স্মৃতিকাতরতা এড়ানো সম্ভব না কিছুতেই। যার লেখালিখি করার সামান্য স্বভাবও আছে, সে ব্লগে সেই নিয়ে লিখবেই। লিখতেই থাকবে। নিজের কথা মাথায় রেখেই বলছি বোধ করি। অন্তত ব্লগস্পটে নিজের একেবারে যা ইচ্ছা তাই লিখাই যায়। শিমুলের বিশ্লেষনে ১ নাম্বারে যেটার উল্লেখ করেছে। হুম, অন্যদের লিংক অবশ্য রাখি আমরা। পড়লে খুশিও হই। তারপরেও আউটপুট নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হই না। আর কমিউনিটি ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রেও অমিত ভাইয়ার মন্তব্যের সাথে একমত, "কমিউনিটি ব্লগের মেজাজের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ব্যক্তিগত লেখা দুই ব্লগেই দেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি।"

Selim 20 November, 2008  

জটিল ও কুটিল আলোচনার কিছুই আমার মাথায় ঢুকলো না।
তবে একথা একবাক্যে স্বীকার করছি ঐ ন্যাকামি মার্কা পোষ্ট আমারও ভাল লাগে না।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP