20 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র শেষ পর্ব)

আমি তখন বুঝে যাই সুদর্শন অমিত আহমেদের সাথে বাজারে উঠলে আমার ভাত নাই। কারণ, ঐ কিশোরী অপলক তাকিয়ে থাকে অমিতের দিকে। আর আমি তাকিয়ে থাকি কিশোরীর দিকে। 'এক পলকে চলে গেলো আহ কী যে তার মুখখানা'।
অমিত আমাকে বলে, 'বুঝছো, রাস্তাঘাটে নানান হাতছানি প্রলোভন আছে। এসবই পরীক্ষা। নিজেকে ঠিক রাখবা। দেখবা, সমস্যা হবে না।'
আমার তখন জরুরী কথা মনে পড়ে যায়। ডাউনটাউনের দিকে থাকবো জেনে দেশের এক সাবেক কানাডাবাসী বড়োভাই বলেছিলো জিরান স্ট্রীট নাকি জেরান্ড স্ট্রীটে যেতে। সেখানে নাকি দেশীয় উপমহাদেশীয় আপুনিরা কামিজ-লেহেঙ্গায় বৈকালিক ভ্রমণে বের হয়। টুকটাক টাংকিও নাকি মারা যায়। ইচ্ছে ছিলো, বন্ধু অমিতকে নিয়ে ওদিকে যাবো। এ স্থবির শহরে অন্য রকম বিকেল খুঁজে নিবো। কিন্তু, গত ৩/৪ ঘন্টার তব্ধায় এই প্রসংগ তুলতে সাহসই পেলাম না।

তারপর আমরা টিম হর্টনস কফি শপে বসি।
আগে যখন অমিতের সাথে দেখা হয়েছিলো চা-কফির সাথে সিগারেট না হলে অমিতের চলতোই না। এবার দেখি অমিত সিগারেট খাচ্ছে না। ছেড়ে দিয়েছে। এ কথা শুনে আমি এবার নিশ্চিতভাবে রঙীন পানি খাবার ইচ্ছাটা কবর দিয়ে দিই। তবে মিস করি দূর্দান্ত এক দৃশ্য, এটা কেবল অমিতকেই করতে দেখেছিলাম আগে; সিগারেট শেষ করে আঙুলের টোকায় শেষ টুকরা ছুড়ে মারা, আর টুকরাটা ডিগবাজি দেয় তিনবার। আমি আমার দেখা চরম এক স্মার্ট স্মোকারএর এ দৃশ্য আর দেখবো না ;
তখন অমিত আমাকে বলে, অপচয় জীবনের জন্য কতো ক্ষতিকর। মাদক-তামুক আরো বেশি খারাপ।
আমি চুপ থাকি।

কফি হাতে ছবি তোলার ইচ্ছে হলো। বিরিয়ানী খাওয়ার সময় দুজন একসাথে ছবি তুলতে পারিনি। এবার ভাবি, দুজনে এক সাথে ছবি তুলি।
কিন্তু কাকে রিকোয়েস্ট করা যায়?
আমাদের ডানে এক সত্তোরোর্ধ সিনিয়র, কাঁপা কাঁপা হাতে কফি খাচ্ছে।
অমিতের পেছনের টেবিলে দুই উদ্ভিন্না তরুণী, সম্ভবতঃ ব্লগার সংসারে সন্ন্যাসী'জির পাড়াতো ভাগ্নী।
আমি জিজ্ঞেস করি, ঐ পেছনের মেয়েটাকে বলি?
অমিত চোখ রাঙায়। বলে, 'পাশের সিনিয়র মাইন্ড করতে পারে।'
কী আর করা 'বুড়ো'কেই দিলাম ক্যামেরা। কাঁপা কাঁপা হাতে ছবি তুললো । ঝাপসা ছবি।

- ছবি তোলার পরে আমাদের কথা আর আগায় না। রাত বেড়েছে। সাবওয়ের শেষ ট্রেন চলে যাবে। ঠিক হয় একদিন অমিতের ওখানে যাবো। আরও কিছু ব্রাদার-সিস্টারের সাথে অমিত পরিচয় করিয়ে দিবে। আমার ভালো বন্ধুর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হবে। অমিত ঠান্ডা বাতাসে স্টেশনের দিকে হেঁটে যায়।

আমি বাসায় ফিরি। ততক্ষণে আমার মাথাটায় ড্রিল মেশিন ঘুরছে। কোথাও কী যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ অনুভূতি ঘিরে থাকে পরের আধ ঘন্টা। টের পাই, আমার অনেক চিন্তা পালটে যাচ্ছে। কোনো এক অবোধ্য শক্তি আমার উপরে ভর করেছে, আর বলছে - 'ভালো হয়ে যা, হে মানুষ। ঠিক হয়ে যা। দুইন্যা দুই দিনের।'
অমিতের এ পরিবর্তন কি আমার উপরও ভর করছে। নেজাম ডাকাত কিভাবে আউলিয়া হয়ে যায় সেটা নিজের মাঝে টের পাই। তাই সিদ্ধান্ত নিই, আমিও ভালো হয়ে যাবো। একেবারে পুরা ভালো মানুষ। কিন্তু আমার কে আমাকে গাইডলাইন দিবে? কে হবে আমার আলোর দিশারী? কোথায় পাবো তারে?

প্রথমেই কম্প্যুটার অন করি।
এফ ড্রাইভে হিডেন ফোল্ডারে উলটাপালটা কিছু জিনিশপাতি ছিলো। ওগুলো কন্ট্রোল প্লাস এ, শিফট প্লাস ডিলিট মারি। আর ঠিক করি কীভাবে মনকে শুদ্ধ করা যায়, চিন্তা শুদ্ধ করা যায়!
পরের সিদ্ধান্তটি হয় - আর ডেবু বাবুর সাইটে যাবো না, ওগুলো খারাপ। মনের শুদ্ধতা নষ্ট করে। ওকে, ঐটাও ডিটারমাইন্ড হলাম। আর ? আর কী? অস্থির লাগে খুব। মনে হয় জীবনের সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত।
৩ নম্বর সিদ্ধান্ত ছিলো, ১৮০ মিনিটের ক্লাসে টায়ার্ড লাগলে প্রায়ই সামনের সারিতে বসা চঞ্চলমতি টিংটিঙ্গা স্বল্প বসনা যে মেয়েটির এখানে ওখানে তাকাতাম, সেরকম আর তাকাবো না। অমিত বলেছে - নানান হাতছানি প্রলোভন, এ সবই পরীক্ষা...'।

রাতে কখন ঘুমিয়ে যাই জানি না।
তবে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হয় - আজ থেকে আমি অন্য মানুষ।
নিজেকে পরিশুদ্ধ মনে হয়।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। অটাম এসে গেলো। গাছের সব পাতা হলুদ থেকে লাল হয়ে যাচ্ছে।
অদ্ভুত সুন্দর লাগে এ পৃথিবী।
অসীম আর সসীমের মাঝে আমার নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। বড়ো তুচ্ছ।
অভ্যাসমতো কম্প্যুটারে মেইল চেক করতে গিয়ে দেখি ইনবক্সে অমিতের মেইল।

শিমুল,
গতকাল আমার আচরণে তুমি অবাক হয়েছো নিশ্চয়ই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কষ্ট পেয়ে থাকলে, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তুমি তো জানোই, আমি গল্প/উপন্যাস যা-ই লিখি অনেক ভেবে চিন্তে লিখি। গল্পের চরিত্র-চারপাশ বোঝার চেষ্টা করি। দরকারী তথ্যগুলো চেক করে নিই নানান সুত্রে। গত দু'মাস ধরে একটা গল্প নিয়ে আঁটকে গেছি। রাইটার্স ব্লক। কোনো ভাবেই আগাতে পারছি , শেষ করতে পারছি না। যেখানে আঁটকে গেছি তা হলো - একজন মানুষ তার কাছের বন্ধুটিকে একেবারে বদলে যেতে দেখলে কেমন রিয়্যাক্ট করে। আমার গল্পের চরিত্র বাংলাদেশের মানুষ। এই বিদেশ-বিভুইয়ে সেরকম মানুষ অবজারভ করার সুযোগ কই? আমার গল্পের এই চরিত্রটির সাথে তোমার খানিক মিল আছে। তাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম, তোমার সাথে টরন্টোতে প্রথম সাক্ষাতেই এই এক্সপেরিমেন্টটা করে নিবো। যথেষ্ট প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। ঐ ৩টা উপন্যাস জোগাড় করেছি অনেক কষ্টে। ঐ অভিনয়ের মহড়া নিজের সাথে নিজের অনেকবার দিয়েছি। তাই, তুমি গতকাল যেই আমাকে দেখেছো, আমি মোটেও সেরকম নই। এক বিন্দুও পাল্টাইনি। তবে নিজেকে পাল্টানোর ভাব করে গতকাল তোমার প্রতিক্রিয়াগুলো আমি মনে মনে টুকে নিয়েছি প্রতি মুহুর্তে। বিশ্বাস করবা না, গল্পের কোনো উপাদান বাকী ছিলো না। সব পেয়ে গেছি এখন। আজকালের মধ্যেই গল্পটা শেষ করে ফেলবো। আমার ধারণা, এই গল্পটা হবে আমার লেখা সেরা একটা গল্প। লেখা শেষ হলে, ১ম পাঠক হিসেবে গল্পটা তুমিই পড়বে। থ্যাংক্স এ লট, ব্রো! শেষে আবার ক্ষমা চেয়ে নিই, যদি একটুখানিও কষ্ট পেয়ে থাকো আমার আচরণে...। আরেকটা কথা, আগামী ১৯ তারিখ রোববারে মিলা-হায়দার হোসেন-নকুল কুমার আসবে একটা প্রোগ্রামে। যাবা? অন্ততঃ মিলার জন্য যাই, চলো। কী বলো?
- অমিত।


মেইল পড়ে আমি আবার তব্ধা খাই।
এবার কী করবো, কী ভাববো বুঝতে পারি না।
চিন্তাশক্তি একদম কাজ করে না।

তখন সাথে সাথে দেখি জি-টকে অমিত আহমেদ।
জিজ্ঞেস করি, 'গল্প লেখা শেষ হইছে?'
অমিত বলে, 'সিগারেটটা শেষ করে নিই। বি আর বি।'

-
(সমাপ্ত)

.
.
.

2 মন্তব্য::

রাশেদ 25 October, 2008  

হা হা! কি আর কমু! দুইজনের গল্প দুইটাই সেইরকম হইছে। :D :D

Selim 20 November, 2008  

একা একা বিরিয়ানী খাওয়া হয়েছে বলেই সাব্বিরের গলায় বিরিয়ানী আটকে আছে-------

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP