13 October, 2008

শেখ জলিলের জায়গীরনামা

রাসেল আমাদের সাথে বিকেলে খেলতো না। স্কুল শেষে বাড়ী গিয়ে খেয়ে, একটু শুয়ে আবার মাস্টারের কাছে পড়তে বসতো। বুঝতাম না - বিকেলে খেলার সময় মাস্টার কেনো পড়াবে? পড়ালেখা তো রাতে করতে হয়! আবার শুনতাম, রাতে মাস্টার নিজে পড়ালেখা করে। মাস্টার কলেজে পড়ে, থাকে রাসেলদের কাঁচারী ঘরে। ক্লাস টু-থ্রি পড়ুয়া মন এসব জটিলতা বুঝতো না। কেবল ভেবে নিতো, রাসেলদের খুব কঠিন একজন মাস্টার আছে যে শিখিয়ে দেয় কীভাবে খাতায় মার্জিন টানতে হবে, কীভাবে হাতের লেখা সুন্দর করতে হবে। টিফিনের সময় সবুজ মাঠের আকাশে কাগজের প্লেন উড়িয়ে আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতাম, সেই কাগজের প্লেনের পেছনে লেজ বানিয়ে উপরের দিকে তুলে দিলে, দেখতে আরো একটু সত্যি প্লেনের মতো মনে হয়, আকাশে আরেকটু বেশি সময় নিয়ে ভাসে, সেটা আমাদের দেখিয়েছিল রাসেল। আর রাসেল শিখেছিলো তার মাস্টারের কাছে। এসব মিলিয়ে নানাভাবে রাসেলদের মাস্টারের গল্প শুনি। আরও অনেকদিন পরে কোনো এক দুপুরে দূর থেকে দেখি হ্যাংলা শরীরের এক তরুণ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, রাসেল বলে – ‘উনি আমাদের লজিং মাস্টার’। এতোদিনের কল্পিত মানুষটিতে মিল পাই না, কারণ – এরকম অল্প বয়সের মানুষ মাস্টার হয় কীভাবে? ক্লাস ফোরে সেই মাস্টার চলে গিয়েছিলো অন্য কোথাও, অন্য কলেজে কিংবা নিজের দেশে। মাস্টার না থাকায় রাসেলের পরীক্ষা ভালো হয়নি।

আমার শৈশবে এসব যখন ঘটছিলো, তার চৌদ্দ পনেরো বছর আগে শেখ জলিলের জায়গীরনামা শুরু। লেখকের জবানীতে - সিদ্ধান্ত নিজের ছিলো না, ‘বাবা ঠিক করলেন- আমাকে জায়গীর করে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন'| কারণটা স্পষ্টতঃ অর্থনৈতিক। রাসেলদের মাস্টার তাও কলেজের ছাত্র ছিলো, কিন্তু শেখ জলিল তখন মাত্র ক্লাস সিক্সের ছাত্র। বুঝা যায়, পরবর্তী দশক সময়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। ‘জায়গীর’এর পরিবর্তে ‘লজিং মাস্টার’ মানুষের মুখে জায়গা করে নিয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে লজিং মাস্টারের সামাজিক অবস্থান। কিন্তু শেখ জলিলের সময়টা অন্যরকম। অর্থনৈতিক মন্দার বছর তখন, তাই হাটকয়েড়া গ্রামের মাজম মেম্বারের গেরস্থ বাড়িতে শান শওকত কিংবা নামের বাহার থাকলেও ভেতরের সংকট প্রবল হয়ে উঠে। দশ-এগারো বছরের জায়গীরকে বারোমাসী কামলার সাথে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এটাই হয়তো বাস্তবতা। রিলিফের আটা-চিনি-দুধ হাতিয়ে নেয়া শাসক শ্রেণীর ছড়ি সমাজ নিয়ন্ত্রণ শেষে ক্লান্ত বিকেলে এসে পড়ে জায়গীরের উপরে।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে, সমগ্র জেলায় ফার্স্ট হয়ে, ক্ষণিক আদৃত হলেও উঠতি কিশোরটিকে যেতে হয় নতুন জায়গীরবাড়ীর সন্ধানে। গন্তব্য কুড়িপাড়া, সঙ্গী জনৈক লতিফ ভাই –


"দু'জন মিলে সারাদিন হাঁটি। সমতল ছেড়ে যখন পাহাড়ে উঠলাম তখনই দুপুর গড়িয়ে গেলো। পাহাড়ি পথ আর ফুরায় না। সমতলে মানুষ, এরকম হাঁটাপথে অভ্যস্তও তেমন ছিলাম না। মাঝে মাঝে থামি, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। পেটে ক্ষুধা, রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি খাই আবার হাঁটি।"


বদলে যায় রাজা, থেকে যায় ছায়া। তাই প্রথম দিনেই তামাক ক্ষেতে পানি দিয়ে, শরীরে ব্যথা-পেটে খিদা নিয়ে কৌতুহলী রাত শেষ হয়। লতিফ ভাইয়ের সাহসে মধুপুর গড় পেছনে ফেলে শেখ জলিল ফিরে আসেন। শেষ হয় একদিনের জায়গীর জীবন। প্রশ্ন জাগে, লতিফ ভাই না থাকলে শেখ জলিল কি ঐ জায়গীর বাড়ী ছাড়তে পারতেন? বয়স এবং প্রতিকূল সময়ে মানুষ সহনশীল হয়ে উঠে, কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সীমাবদ্ধতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ বেশি ছিলো কি? আগের মাজম মেম্বারের বাড়ীর কামলাদের নাম মনে থাকলেও কুড়িপাড়ার এ পরিবারটির পরিচয় অস্পষ্ট রেখেছেন লেখক। হয়তো স্মৃতিভ্রম, তবে এতো সময় পরে এসেও সামাজিক দায়ের কৌশল হলে সেই সীমাবদ্ধতার কথাটিই মনে করি আবার। অবশ্য, জায়গীরপ্রভুর নাম-সাকিন জানা পাঠক হিসেবে খুব জরুরী কিছু নয়।

‘যদি কেউ রাগ করে, যদি কেউ মারে ধরে, ভয় শুধু ভয়, শুধু ভয়, ...বাড়ছে না বয়স, পনেরোতে গেছে আঁটকে’ – অঞ্জন গেয়েছে আরও পরে। শেখ জলিল ঐ বয়সে খয়েরপাড়ার লালু সরকার আর হরিপুরের হাতেম আলী আকন্দ বাড়ী শেষে বোর্ডিং স্কুলের গন্ডি পেরুনোর সময়। সাথে চলছে জায়গীর জীবন। বয়ঃসন্ধির উৎসুক সময়, শরীরি নিষিদ্ধ আলাপ-অভিজ্ঞতা, খানিক দূরন্তপনায় রাস্তার পাশে বুট পুড়িয়ে খাওয়া, সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকে মোহনলালের পার্ট, ভাটার ইট চুরি করে কনক সিনেমা হল অথবা যাত্রাপালায় প্রিন্সেসের গায়ে কাগজ ছুড়ে মারার ইচ্ছেটুকু আঁটকানোর সাধ্য ছিলো না কারো। মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর ‘আমি এক দূরন্ত যাযাবর’ গলায় চেপেছে তারও আগে। এসব দিন যাপনের গল্পে উনিশ’শ ছিয়াত্তরের গণবাহিনীর উৎপাত এবং পরিণতি প্রসঙ্গও আসে।

অধুনাপতিত এক সাপ্তাহিক সম্পাদক একবার লিখেছিলেন, চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষ বাংলা সাহিত্যে তেমনভাবে আসেনি। তার সে আফসোস কলামে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট থাকলেও শেখ জলিলের জায়গীরনামা পড়তে গিয়ে আবার মনে পড়ে গেলো, সাথে যোগ হলো এবার গণবাহিনী প্রসঙ্গ। এরশাদের প্রথমদিকের সময় এসেছে এভাবে –

"উনিশ শ’ বিরাশি সাল। এরশাদের সামরিক শাসন সবেমাত্র শুরু হয়েছে। চারদিকে থমথমে গুমোট পরিবেশ। লোকজনের কথাবার্তাতেও নিচু স্বর। রাস্তাঘাটে মহিলাদের চলাচলেও চলছে খবরদারি। পরীক্ষার হলগুলোতে চলছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এমতাবস্থায় শুরু হলো আমার এইচএসসি পরীক্ষা।"


জায়গীর জীবনের শেষ অধ্যায় ঢাকা শহরে।
গ্রামের মেঠো পথের বদলে ইট সুরকির দালান। হাঁফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠা। চারদিকে শহুরে মানুষ, শহুরে ভাষা, তবুও ভেতরে কোথায় যেনো সেই গ্রামীণ মন। স্যান্ডেল পরে কলেজে যাবার, বিকেলে নিচ থেকে বন্ধুদের ডাকাডাকি, এসব ঘটনার মাঝে একটা ‘হারানো দিন’ ভাব আছে। দৃশ্য কল্পে মনে হয় ‘নীল আকাশের নীচে’ বা ‘প্রফেসর’ সিনেমার নায়ক। সাদাকালো জীবন, মনের ভেতরে রঙীন ইচ্ছা। তবে সব কিছুর প্রকাশের ভঙ্গী বদলেছে, বদলায়নি জীবনচর্চা। শেখ জলিল এই সময়কে ভিন্নভাবে দেখেছেন, দেখার চেষ্টা করেছেন অন্য চোখে। বলেছেন, নিজের যাপন বদলানোর কথা। ধারণা করি, বয়সটাই অমন। নানান সংকটেও আশাবাদী থেকেছেন। স্থায়ী জায়গীরের বদলে বেড়েছে প্রাইভেট টিউশন। প্রসঙ্গতঃ চলে আসে পড়ন্ত কৈশোরের অপ্রকাশ্য প্রেম-বিরহের কথা। সে-ই কবে কুতকুত খেলতে গিয়ে একটু বয়সী দোলার সাথে জড়াজড়ি, স্পর্শ, না-ভোলা-স্মৃতি। পালাক্রমে আফরোজার প্রতি মুগ্ধ বিষ্ময়, শ্যামলা বর্ণের মেয়ে ঝিনুক, শান্ত মেয়ে সাথী, স্মার্ট বিরু, অথবা ইমা। এসব মুগ্ধতা শেষতক ভালোলাগাই রয়ে গেছে, ভালোবাসা হয়নি, কিংবা শেখ জলিল বাঁধনে জড়াতে চাননি। বরং এড়িয়েছেন শেফালী কিংবা সাদমাকে বিয়ে করার বণিকী প্রস্তাব।

জায়গীরনামার গল্প করতে গিয়ে লেখক নিজের জীবনের গল্প বলেছেন সাবলীলভাবে। এসেছে নানান চরিত্র। বানোয়াট নয় বলেই হয়তো প্রতিটি ঘটনা গল্পের ব্যাপকতাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে শেখ জলিল প্রথম দিকের ঘটনা বিস্তারে আত্মকেন্দ্রীক থেকেছেন, কেবল নিজের গল্প বলেছেন। বিশেষ করে মফস্বল জীবনের সময়কে ছাড় দিয়ে গেছেন। তাই নিজের মাঝেই টেনেছেন স্মৃতির শেষ রেখা। এ রেখা তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত করতে পারতো, এখনো পারে – যদি জায়গীরনামায় স্মৃতিছুরি চালানো হয়। জলিল ভাই কি অমন করবেন?

খুব সম্ভবনা থাকে – আত্মজীবনীর এসব চেষ্টায় চাপা পড়ে কষ্টের কথা, বেদনার কথা, হতাশার কথা, লজ্জার স্মৃতি। সেটা হতে পারে সচেতন লেখনী কৌশল কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ‘জায়গীরনামা’ এদিক থেকে অনেক মুক্ত।
স্মৃতি হাতড়ে সাত বছরের জীবন এসেছে রঙীণ কাঁচের ছোঁয়াচবিহীন ভাবে। ঘটনা বর্ণনে চাতুর্য্য নেই, আছে নিটোল সারল্য। জীবন সংগ্রাম তাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। হার-না-মানা দৃঢ়তা আসে নগর জীবনের নিত্য সংকটে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যাওয়ার বলাকা এক্সপ্রেসে শেখ জলিল তাই একা থাকেন না, সাথে থাকে সংগ্রামী অভিজ্ঞতা, আশাবাদী প্রত্যয়।
যার পুরো প্রেরণাই জায়গীরনামা।

.
.
.

1 মন্তব্য::

Anonymous,  28 March, 2009  

কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেলাম শিমুল। ভালো থাকুন।
-শেখ জলিল

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP