19 October, 2008

অমিত আহমেদের সাথে বিরিয়ানী সন্ধ্যা (সচিত্র ২য় পর্ব)


সন্ধ্যায় বিরিয়ানী খাবো ভেবে ভেবে দুপুরে খাইনি কিছু।
পেটে খিদায় চোঁ চোঁ। কিন্তু অমিতের কাছে রোজার কথা শুনে খাবারের নাম মুখে নিতে সাহস পেলাম না।
'বুঝলা শিমুল, রোজার মাস সিস্টেমটা এক্সিলেন্ট একটা জিনিস। শরীর মন অর্থ সব কিছুর জন্যই ভালো।'
আমি হু হু করি। আর ঘড়ি দেখি, বলি - 'আজ ইফতার কয়টায়? সাতটা পনেরো?'
অমিত বলে, 'সাতটা সতেরো।'
এরপর সে বিড়বিড় করে কী যেনো পড়ে। মনে হয় তজবী জপছে। আমার ধারণাই ঠিক হলো, অমিতের ডান হাতে ডিজিটাল কাউন্টার। আধুনিক তজবী। আমাকে দেখিয়ে বলে, 'খুবই দরকারী জিনিস, কমফোর্ট্যাবল।'

ভিক্টোরিয়া পার্কের সবুজ ঘাসে আমরা কোনাকুনি হেঁটে যাই। অমিতই পথ দেখায়।
আমি ভাবছি আরও ঘন্টা খানেক সময় বাকী আছে। খিদা সামলাই কীভাবে?
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছো?'
বললাম, 'না, তেমন না। এই ধরো, দশ পনেরো মিনিট।'
'আসরের নামাজ পড়েই তো বের হইছো মনে হয়, নাকি?'
'হুমম, ওরকম সময়েই।'
'আমিও নামাজ পড়ে রওনা দিছি।'
তারপর আমরা সামনে আগাই। ডানে ডেন্টোনিয়া পার্ক পার হই। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'সামনে নাকি সুন্দর একটা মসজিদ হচ্ছে?'
আমি জানাই, আমিও শুনেছি, বাংলা কাগজ/দেশের আলো পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু দেখিনি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'শুক্রবারে জুম্মার নামাজ কোথায় পড়ো?'
বলি, ঐ সময় তো আমি ক্যাম্পাসে থাকি।
এরপর ক্যাম্পাসের প্রেয়ার রুম নিয়ে কথা হয়। মুসলিম স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনে জয়েন করেছি কিনা অমিত সেটা জিজ্ঞেস করে। আর বলে, বিদেশ মানেই অন্য রকম। এখানে এসে মানুষ পালটে যায়। বিশেষ করে সাদা চামড়ার পোলা মাইয়্যাদের সংগ খুবই খারাপ। এরা আমার মতো সহজ সরল ছেলেকে একেবারে বিগড়ে দিতে পারে।
এরকম নানান সতর্কবাণী দিয়ে অমিত আমাকে সাহস দেয়, বলে - 'তেমন ভয়ের কিছু নাই। সময়ে সব বুঝে যাবা। খালি উপরওয়ালার উপর আস্থা রাখবা। মনে রাখবা তুমি কোত্থেকে আসছো। তোমার শেঁকড় কোথায়। এইসব একেবারে ভুলবা না।'

এইবার অমিত আমার বাসা নিয়ে জানতে চায়। বাড়ীর মালিক ঈমানদার মানুষ, আমাকে ভালো ইফতার দেয় শুনে অমিত বলে, 'তুমি আসলে খুব লাকী, বিদেশে এরকম পাওয়াই যায় না।'

ইফতারের প্রসঙ্গে আমার খিদা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে।
অমিতের এইসব কথাবার্তা ভালো লাগে না আমার।
এতোদিন পরে দুই বন্ধুর দেখা। কোথায় ব্লগ নিয়ে কথা বলবো, গল্প লেখা নিয়ে কথা বলবো, টুকটাক নিষিদ্ধ আলাপে মাতোয়ারা হবো। এবং আমার অনেকদিনের ইচ্ছা, অমিতের মতো যোগ্য বন্ধু পেলে হাল্কা শরাবী হবো। এসব চিন্তা মুহুর্তেই মাটি চাপা পড়ে গেলো।

ডেন্টোনিয়া পার্কের বেঞ্চিতে বসে আমাদের গল্প হয়। আমার পেটের মধ্যে ডজন খানেক ইঁদুর লাফালাফি করছে। যদি জানতাম অমিত রোজা রাখবে তাহলে আমিও রোজা রাখতাম। পেটের আগুনে সান্ত্বনা পেতাম খানিক। কী আর করা!

এখানে এসে বেশ কাঠবেড়ালী দেখি, গাছ থেকে নিচে নেমে কাছে চলে আসে। সাদা একটা কাঠবেড়ালী কাছে এসে ঘুরঘুর করলে আমি অমিতকে জিজ্ঞেস করি, 'অমিত এইটা কাঠবেড়াল, নাকি বিড়ালী?'
অমিত বুড়া আঙুলে তজবী কী টেপা বন্ধ করে। উলটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি সাদা মেয়েদের সাথে ফ্রেন্ডশীপ করতেছো?'
আমি তো অবাক! কোথায় কাঠবেড়াল, আর কোথায় সাদা মেয়ে...
বললাম, 'না তো, কেনো?'
অমিত বলে, 'ব্লগে এরকম কী যেনো লিখলা। বদ্দাও উস্কানি দিলো।'
আমি মাথা নাড়ি, 'না না, ওরকম কিছু না।'
'তবুও খেয়াল রাইখো, শাদা মাইয়্যাগুলা কথা বলার সময় গায়ে হাত দেয়, পিঠে চাপড় দেয়। এগুলা সবই উস্কানি।'
আমি গম্ভীর হয়ে বলি, 'আরে ধুর, আমি ম্যাচিওর্ড না?'

তখন রিমাইন্ডার বেজে উঠে অমিতের পিডিএ থেকে।
অমিত বলে, 'চলো উঠি। আজানের ৩ মিনিট আছে'।
সামনে হাঁটি।
'শিমুল, জিন্সের প্যান্ট কি দেশ থেকে কিনছো?'
বলি, 'হ্যা, নিউ মার্কেট থেকে।'
'ফিটিং করা লাগছে না?'
'হু, তা তো লাগেই। একেবারে পুরা তো ফিট হয় না'।
'তা যখন করলাই, নিচটা এতো লম্বা রাখলা কেনো?'
'মানে?' আমি অবাক হই, কারণ - এর থেকে ছোট করলে তো খুবই বাজে দেখাবে?
অমিত বলে, 'এখন ধরো তুমি নামাজ পড়বা, প্যান্ট নিচে গুটাতে হবে। ঝামেলা না?'
আমি দেখি, অমিতের প্যান্ট পায়ের গোড়ালির উপরে। প্রথম দেখায় ফ্যাশন কিংবা কেয়ারলেস ভাবলেও এখন বুঝি, কেনো অমিত পায়ের গোড়ালির উপরে উঠানো প্যান্ট পরে...'।
দুম করে তখন আমার মাথায় ক্লিক করলো, অমিত কেনো দিনে দেখা করতে চায়নি, কেনো ইফতারের পরে আড্ডা দিতে চেয়েছে...।'

এই অমিত কেনো এরকম হলো, কী জাদুমন্ত্রে অমিত পালটে গেলো; এ ভাবনা আমার মাথায় কাজ করে না। স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। সেবার বই মেলায় আলবাব ভাইয়ের কাছ থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে আড়ালে ফিশফিশ করে অমিত বলেছিল, 'যাবা নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে?'
কোথায় এবং কখন জিজ্ঞেস করলে অমিত বলেছিল এ-লেভেলসের তামান্না-মৌটুসী আরও কে কে থাকবে। চিটাগাং যাওয়ার কারণে সেই পার্ট মিস করেছি। ধারণা ছিলো, টরন্টোতেও এরকম কিছু ইয়ো ইয়ো পার্টির দাওয়াত পাবো। মজমা হবে। কিন্তু এ কী! অমিত আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

'ওজু করবা? নাকি করা আছে?' বায়তুল আমান মসজিদের সামনে এসে অমিত জিজ্ঞেস করে।
অমিতের এ প্রশ্নে আমি ইতিউতি করি।
অমিত জিজ্ঞেস করে, 'নামাজ পড়বা না?'
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। বলি, 'আসলে গোসল করি নাই, শরীর একটু নাপাক আছে...'।
অমিত যেনো আকাশ থেকে পড়লো, 'ছিঃ শিমুল, ছিঃ। আসছো শুক্কুরে শুক্কুরে ১৫ দিন হয় নাই, এর মধ্যেই...?'
আমি অমিতের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করি, বলি অমিত যে রকম ভাবছে সেরকম কিছু নয়, সকালে উঠলেই ঠান্ডা লাগে, গোসল করতে ইচ্ছা করে না। গত চারদিন গোসল করি নাই, সাথে আরো কিছু অস্পষ্ট শব্দ এবং চোখের ইশারা যোগ করি, যাতে অমিত বুঝে যায় আমার এ শারীরিক অপবিত্রতায় গন্ধম ইফেক্ট নেই। আমি অমিতকে বুঝাই, স্বর্গের উদ্যানে এখনো নিপাট ব্রহ্মচারী হয়ে আছি।
অমিত হেসে বলে, 'আগে বলবা না? আমারে তো টেনশনে ফালায়ে দিছিলা মিঞা, আমার ভালো একটা বন্ধু কুপথে চলে যাবে ভেবে...।'
ভাবলাম, নামাজ পড়া থেকে মুক্তি বোধ হয় পেলাম।
কিন্তু, অমিত হাল ছাড়ে না। গোসল না করে কীভাবে বিশেষ ওজু করা যায়, শার্টের বাম দিকের কোণা ডান হাতে টেনে এনে আধ বিঘত পরিমাণ জায়গা পানিতে ভিজিয়ে কোন দোয়া পড়লে গোসলের মতো পবিত্রতা চলে আসবে সে তরিকা এবং ফজিলত অমিত আমাকে শেখায়। আমি অমিতকে অনুসরণ করি। মাথার ভেতর ঘুরঘুর করে - এ কোন নতুন অমিত?
হিন্দি সিনেমার জমজ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে।
ভাবি, একেবারে এক্সক্লুসিভ কথা জিজ্ঞেস করি, যাতে নকল অমিত হলে ধরে ফেলি...। কিন্তু, জিজ্ঞেস করা হয় না। আজান ভেসে আসে, আমি রোজা না রেখেও ইফতারে শামিল হই। হাঁটু গেঁড়ে কোন বিশেষ ভঙ্গিতে খানাহ-পিনাহ করতে হয়, কীভাবে ডান হাতে গ্লাস নিয়ে বাম হাতে নিচ থেকে ঠেস দিতে হয়। এসব জীবন চর্চায় অমিত আমাকে দীক্ষা দেয়। কেবলই ভাবি, হায় - বিরিয়ানী সন্ধ্যা কোথায় গেলো?

অমিত বিরিয়ানীর কথা ভোলেনি।
ড্যানফোর্থের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি বাঙালি পাড়া দেখি।
বাংলা দোকান , সাইন বোর্ড। মারহাবা স্টোর, সরকার ফুডস, প্রিয়তা স্টোর, ঢাকা কনভেনিয়েন্স, ঢাকা কাবাব কিংবা সোনালী ব্যাংক; দেশের টাকা পাঠান সহজে।
অমিত আমাকে দেখায় কোথায় কী আছে।
'ঘরোয়া বিরিয়ানী' পার হয়ে গেলে আমি আঙুল তুলি, 'এখানে খাবার ভালো না?'
অমিত ঠিক ভালো মন্দ বলে না। বলে, গেছিলাম একবার। তবে সামনে চলো, সামনে আরেকটা ভালো আছে।
চোখে পড়ে এটিএন মিউজিক। আমি জিজ্ঞেস করি, 'তুমি ইভা রহমানের গান শুনছো?'
(আমি আবার ইভা রহমানের ফ্যান, এটা অমিতকে বলেছি কিনা জানি না)।
অমিত জবাব না দিয়ে এটিএন মিউজিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ডানে ইভা রহমানের বিশাল পোস্টার, ভেবেছিলাম সেদিকে যাচ্ছে। কিন্তু না, বামে জাকির নায়েকের বক্তিমার সিডির পোস্টারের সামনে অমিত মনোযোগী পাঠক। আমি আড়চোখে ইভা রহমানের গোলাপী শাড়ী দেখি। একটু মুটিয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
অমিত মাথা নাড়ে, 'নাহ, এইটা তো আছে আমার কাছে।'
আমি ভাবি, অমিত কি জাকির নায়েকের ফ্যান হয়ে গেলো?

এভাবে রাস্তা সিগনাল পার হয়ে অমিত আমাকে নিয়ে যায় 'মক্কা বিরিয়ানী হাউজ'এর সামনে। জিজ্ঞেস করি, 'এটা কি ঘরোয়া বিরিয়ানীর চেয়ে ভালো?'
অমিত বলে, 'অলমোস্ট সেম, তবে ব্র্যান্ড নেম বলে একটা ব্যাপার তো আছে। তুমি মার্কেটিং্যের ছাত্র না?'
আমি এইবার বিরিয়ানির কাস্টোমার নিয়ে ভাবি, ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভাবি।
এসবের কী জবাব পাওয়া যায়?

অমিত মুরগীর বদলে ছাগলের বিরিয়ানি অর্ডার দিলো।
ইচ্ছে ছিলো, মুরগী খেলে কী সমস্যা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু, মুরগী থেকে চিকেন এবং চিকেন থেকে চিক'এ আলোচনা পৌঁছে গেলে অমিত আমাকে আবার হেদায়েত করবে, এই ভয়ে কথা বলি না। খাসির টুকরায় কামড় দিয়ে অমিত জিজ্ঞেস করে, শিমুল জিওম্যাট্রি কেমন বুঝতা?
বললাম, ভালো লাগতো না। আমি তো কমার্সে ছিলাম।
'বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য বুঝো?' এই প্রশ্নের জবাবে বলি জিওগ্রাফীতেও আমি ভালো না।
অমিত কেনো এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে তা আমার মাথায় ঢুকে না।
-

প্রিয় সচল বন্ধুরা, আপনারা ভাবছেন - আমি এসব গল্প করছি, সত্যি নাকি চাপাবাজী?
কী করে বুঝাই আপনাদের?
যেবার জার্মানী গিয়ে ধুসরের সাথে শালী-বাণিজ্য করে আসলাম, সেবারও আপনারা অনেকে আমাকে বিশ্বাস করেননি। কেউ কেউ বলেছেন, ফটো না দিলে বিশ্বাস নাই। একবারও তারা ভাবেননি, মানিব্যাগ হারিয়ে আমি কোন বিপদে পড়েছিলাম।
আর ছবি দিলেই কী হয়? অবিশ্বাসীরা কী আর লাইনে আসবে?
অমিত যখন, এই কিছুদিন আগে, ব্যাংকক ট্যুরের ছবি দিলো তখন অনেকেই বলে দিলো - এগুলো ফটোশপে করা। হায়, কী আর বলি! অবশ্য অমিত যে ফটোশপের কাজ ভালো পারে সেটা নিজেই স্বীকার করলো খাওয়ার টেবিলে। আমি ফটোশপের কিচ্ছু পারি না, ঐ বিরিয়ানীর ছাগ-হাড্ডির কসম লাগে, এইটা বিশ্বাস করেন সকলে...।

আমাকে এইবার চাপাবাজ যাতে বলতে না পারেন, সেইজন্য পোস্টে ফটো দিলামই দিলাম।

খাবার টেবিলে মনে হলো, ছবি তোলা দরকার।
দেশ থেকে অমিতের জন্য আনা 'পূর্ণমুঠি' দিলাম।
অমিত খুশি হলো।
এখন এইসব ঘটনা বিশ্বাস করাতে হলে বিরিয়ানী-বোরহানী-পূর্ণমুঠি-এবং আমি এক ফ্রেমে আসতে হবে।
অমিত এদিক ওদিক ট্রাই করে, ফ্রেমে আঁটে না।
আমি হাসিমুখে পোজ দিয়ে বসে আছি।

-
শেষে অমিত বিরক্ত হয়, ধুর মিয়া, মোটার মোটা হইসো - ফ্রেমেই তো আসো না।
মোটা গালি শুনে মন খারাপ লাগলেও মুখে হাসি ধরে রাখি।
শেষে অমিত ছবি তুললো দুটা। আমাকে দেখালো। এক ছবিতে বিরিয়ানী-বোরহানী-সালাদ-পূর্ণমুঠি আছে। আমার একাংশ আসছে, মাথা নেই। অন্য ছবিতে কেবল আমার মাথা। বললাম, হায়! এরকম কেনো?
অমিত বলে, দেখি মাথাটা ফটোশপে কিছু করতে পারি কিনা।

তবে, অমিতের ছবি তুলতে আমার কষ্ট হয় না।
একে ফটোজেনিক লুক, তার উপর শুকিয়ে গেছে, এটা আগেই বলেছি। ক্যামেরা ফ্রেমে চমৎকার মানিয়ে যায়। আমি চেয়ারে বসেই ছবি তুলি। ডানবাম করতে গিয়ে গ্লাসের পানি পড়লো ক্যামেরার লেন্সে। এরপরে ছবির এই অবস্থা।

-
এই ছবির মানুষটি অমিত আহমেদ না, তার হাতের বইটি এডিট করা হয়েছে, এমন কুৎসাও রটাবেন মন্দজনেরা। সেই তর্ক দূরে রাখি। বলি, অমিতের সাথে তারপর কী কথা হলো...

এর মাঝে অমিতের মোবাইলে ফোন এলো। এস এম মাহবুব মুর্শেদ ভাই। খাবার সময় বেশি কথা বলতে হয় না, তাই সামান্য মাসলা মাসালা বলে ফোন আমার কাছে দিলো। আমি মুর্শেদ ভাইয়ের সাথে কথা বলি, 'অমিতের সাথে ইফতার করতেছি, বস!'

দুষ্টলোকদের কথা বলছিলাম উপরে। অমিত অভিযোগ করলো, ব্লগে আমার বেশিরভাগ বন্ধুই নাকি দুষ্টু। আমি নাকি জাপান-জার্মানের কতিপয় বাঁদর-ব্লগারের সাথে বেশি বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখাই। এমনকি শালী বিষয়ক কমেন্ট করে নিজের ইমেজ খারাপ করছি। অমিত খবর পেয়েছে, অনেক শালীসমৃদ্ধ ব্লগার আমার লেখায় কমেন্ট করে না। আমার মতিগতি দেখে তারা নাকি শালী হারানোর শংকায় আক্রান্ত। কমেন্ট নসিহতের পাশাপাশি অমিত এবার আমার লেখা নিয়ে আলাপ করে। আমি বোরহানীতে চুমুক দিয়ে মনোযোগ দিই, ভাবি - এমনটাই তো চেয়েছিলাম। বন্ধু মানুষ, একে অন্যের লেখা নিয়ে আলাপ করবো।

কিন্তু, অমিত দেখি আমার লেখা নিয়ে খুবই বিরক্ত। গল্পের নামে আমি যা লেখার চেষ্টা করি এগুলো সবই মূল্যহীন। এগুলোর মাঝে সমাজ নেই, নীতি নেই, আদর্শ নেই। জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কী রকম?
অমিত বলে, আমার লেখায় শিক্ষণীয় কিছু নেই। মনে দাগ কেটে প্রভাব ফেলার কিছু নেই।
জিজ্ঞেস করলাম, অমিত নিজেই বা সেরকম কয়টা লেখা লিখেছে, তাহলে আমারও ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হয়। সে স্বীকার করে, তারও সেরকম কোনো লেখা নেই। তবে এখন পড়ালেখা করছে। এই কথা বলেই ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করলো সে। ইন্টারন্যাশনাল কুরিয়ারের সীল। ৩টা বইঃ
হামিদুর রহমানের উপন্যাস 'ফুটন্ত গোলাপ'।
কাশেম বিন আবু বকরের 'বোরকা পরা সেই মেয়েটি' আর 'বিলম্বিত বাসর'।

অমিতের মতো দূরন্ত লেখকের হাতে এই বই দেখে আমি আবার তব্ধা খাইলাম। জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি য়ে-ই সব বই পড়ো?'
অমিত দেখি উলটা খ্যাপা, 'নাক সিটকালা কেনো?'
বললাম, 'এই সব ছাইপাশ...', কথা শেষ করতে পারি না। অমিত জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কাশেম বিন আবু বকরের বই পড়ছো? নাকি না পড়ে কথা বলতেছো?'
হাসি দিয়ে বলি, 'বাসর রাত' উপন্যাসটা পড়ছিলাম।
অমিত যেনো জোশ পেয়ে যায়, বলে - 'মনে আছে কিছু? কী নিয়ে লেখা?'
স্ম্বৃতি হাতড়ানো লাগে না, মুহুর্তেই বলে ফেলি, "শেষ প্যারাটায় নায়ক নায়িকার বিয়ে হয়ে গেছে, নায়ক বলছে - আসো এবার কাছে আসো, দেখি কে কতো বেশি কামড় দিতে পারে..."
অমিত মাথা নাড়ে, 'বাহ! এই না হলে শিমুল! তোমাদের সমস্যা কী জানো? মনের ভেতর ময়লা, উপন্যাস পড়বা আর সিলেক্টেড লাইন খুঁজবা, তাইলে আসল জিনিশ কই পাইবা?'
জিজ্ঞেস করি, কাবিআ বকরের বইয়ের ভালো দিক কি?
অমিত এবার খিলাল দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে খাসির গোশের ছুটাছাটা বের করে, বলে - 'তোমাকে দেখতে হবে সাহিত্য মানুষের জীবনকে কেমন প্রভাবিত করছে। আজিজের চিপায় সাদা-কালো কাউয়া মারা বা কাফকা-কামু-বোদলেয়ার মুখস্ত করে যারা বই লিখে তাতে পাঠকের কি?'
বললাম, 'বকরের বই পড়ে মানুষ কী জীবন দীক্ষা পায়?'
এরপর অমিত শরিয়ত সম্মত প্রেমের গল্প করে। সেখানে শরীরি ব্যাপার কীভাবে আসতে পারে তা বলে। পর্দার মধ্যে থেকেও প্রেম মহব্বত হলে আমাদের ইয়াং জেনারেশন কিভাবে ধ্বংসের কাছ থেকে ফিরতে পারে তা নিয়ে কথা বলে।

আমি তখন রবি কবির কাছে ধর্না দিই। 'তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি'।

জিজ্ঞেস করলাম, 'এই বইগুলা পাইলা কই? কে দিলো?'
অমিত এবার পোস্টেজের প্যাক দেখায়। প্রেমিকা, স্যরি, প্রেরিকার কী যেনো নাম মনে পড়ছে না। চিনলাম না। কিন্তু এটা জানলাম, অমিতের মারাত্মক ফ্যান। কিন্তু, অমিতও আগে একটু ডি-জুইস জেনারেশন নিয়ে লেখালেখি করছে। এইটা ঐ ফ্যান লাইক করে না। সে চায় অমিত 'উজ্জীবন' লেখা লিখুক। এসো তরুণ সত্যের পথে, আমাদের পতাকা হাতে, সংগঠনকে আঁকড়ে ধরো। এই টাইপ বিপ্লবী লেখা লিখুক সে।

এবার অবাক হই, বলি - কাহিনী কী? ডিটেইল বলো।
অমিত বলে, "সব উপরোয়ালার লীলাখেলা। মানুষ কখন কীভাবে পালটে যায় টের পাওয়া যায় না। সামান্য চ্যাটে এম এস এনে টুকটাক আলাপ করে আমাকে পালটে দিলো, ম্যান!"
হায়, এ কী কথা?
এতোক্ষণে, নতুন অমিতের কাহিনী বুঝলাম।
কে সেই অপরূপা কণ্যা, কুহেলিকা ছায়া?
তাহলে অমিতের জি-টকের বাদবাকী এতো এতো টুনটুনি পাখীর কী হবে? আমি হাত পাতি। উহু, অমিত করুণা করে না। বরং তার আরেক ফ্যানকে আমার কাছে গোছানোর চেষ্টা করে। বারবার বলে, 'ভয় পাচ্ছো কেনো? বোরখা পরে না তো?'
আমি রাজী হই না। বলি, যেই প্রোফাইল দিছো, বোরখা লাগবে না, এমনিতেই ভয় পাইছি। আসলে ঐটাইপের সাথে আমার রাশি মিলে না।'
এবার অমিত আমার জন্য নন-মুসলিম পাত্রী অফার করে। আমার সাথে নাকি খাপে খাপে মিলবে। তবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মুসলিম করে নিতে হবে।
আমি পাত্তা দিই না, 'ধুর মিয়া, অনেক লম্বা প্রজেক্ট। বাদ দাও। তৃণা টাইপ কেউ থাকলে বলো।'
অমিত এবার বিধর্মীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করলে কয়টা কুরবানীর সওয়াব পাওয়া যাবে তা নিয়ে কথা বলে। এই কথায় কথায় আমরা মক্কা বিরিয়ানী থেকে বের হয়ে আসি। (বিলটা অমিতই দিয়েছে, আমি নাকি তার মেহমান। মেহমানের খেদমত না করলে পরকালে...)

আলাপে আলাপে আমরা আবার রাস্তা ধরে হাঁটি।
গন্তব্য - কাছের কফি শপ।

তখন দেখি আমাদের বিপরীত দিক থেকে সালোয়ার কামিজময় এক পড়ন্ত বাঙালী কিশোরী আব্বু-আম্মুর সাথে হেঁটে আসছে। কার দিকে তাকিয়ে আছে সে? আমার দিকে নাকি অমিতের দিকে?

____

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP