30 September, 2008

আজ ভালো থাকার দিন

ঠিকানাগুলো পালটে যায় বারবার। পালটায় চার দেয়াল। ফেলে যাই ক্রমশঃ আপন হয়ে আসা অচেনা রাস্তা, চলতি পথ, পথের পাশের নিত্য দেখা মানুষ। ঠিকানার শেষ লাইন কেবলই নম্বর। অডেনের আননোন আইডেন্টিটি। পোস্টকোড; ৪৩২০ থেকে ১২১৬। তারপর ২০১৫০ থেকে এম১এল৩জি৫।

...ভালো থাকার চেষ্টা করি।

ভালো থাকার জন্য আজ আমি অনেক ভোরে উঠে ঠান্ডা বাতাসে হেঁটে যাবো। তারপর কফি চুমুকের পরে কিছু উজ্জ্বল মানুষের আসরে বণিকী তর্ক হবে। শিখে নিবো কীভাবে কথার মাঝে টুপ করে চশমা খুলে আঙুল তুলতে হয়। কীভাবে কথায় কথায় মুগ্ধ করতে হবে শ্বেতাঙ্গ উজ্জ্বলতর মেয়েটিকে। আগামীবার ওকে দলে টেনে প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশনের জন্য একটা গুটি চালাচালি হবে। বন্ডের মতো ফেস ভ্যালু বেড়ে যাবে অপ্রত্যাশিত প্রিমিয়ামে। আমি আজ সারা দুপুরময় গুটি চালবো। অনেক আগে মাটিতে ছক কেটে ছয়ঘরা কিংবা আরেকটু বড়ো হয়ে দাবা খেলার কথা আমার তখন মনে পড়বে না। শেষ কবে দাবা খেলেছিলাম, কম্পিউটারের সাথে, মনে নেই প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম। আজ মনে পড়বে না। মনে পড়বে না - ফুটবল ক্রিকেটের আরিফ-বাবু-বাদশাদের নাম। আজ আমি স্টিভ-আমান্দাদের সাথে শিখে নিবো কী করে বাজারী হয়ে উঠতে হয়। কী করে মুখের কথায় কিনতে কিংবা বেচতে হয় ভুল সম্ভবনা। অথবা ক্যারিবিয়ান পিটারের সাথে একাত্ম হবো এন্টি রেসিজম ক্যাম্পেইনে। তারপর সাবওয়েতে বুধবারের পিজা স্পেশাল, ১ ডলার। এভাবে সময় যাবে...। আজ এখানে বিকেল বলে কিছু নেই। বিকেলের রোদ নেই। মেঘলা আকাশে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। ঠান্ডা বাতাসে আরো পরে নিজেকে গুটিয়ে আমি টিম হর্টন্সে যাবো। কাঁচ ঘেরা তাপ-শীত নিয়ন্ত্রিত ঘরে মিডিয়াম সাইজ কফিতে প্রতি চুমুকে উষ্ণ হবো। মাথার ভেতর ট্রায়াঙ্গুলার আর্বিট্রাজ। বিকিকিনি।

এসব শেষে ইচ্ছে করেই একেবারে শেষ ট্রেনে ঘরে ফিরবো। স্থির চোখে দেখে নেবো কসমোপলিটান নাগরিক সমাজ। সামনের সীটে সোমত্ত তরুণ-তরুণীর ব্যবধান-শুন্য-ইঞ্চি ঘনিষ্টতায়ও অবাক হবো না। ফ্রিডম টু লিভে বিশ্বাসী হবো মুহুর্তে। তাই ব্রডভিউ স্টেশনে টুলে বসা দুই তরুণীর বিশ সেকেন্ডব্যাপী চুম্বন দৃশ্যে নিজেকে ঝালিয়ে নিবো, মনটাকে ব্রড করবো। জেন্ডার ডাইভার্সিটি সেমিনারে অমনটাই শিখেছি গত সপ্তায়।

শহর ঘোরা শেষ বাস চলে যাবে তখন। তাই আমি হাঁটবো আবার এক অচেনা রাস্তায়। লেদারের জ্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে স্মার্ট সেজে অলিগলি শেষে ঘরে ফিরবো ধীর পায়ে। আকাশের দুধশাদা চাঁদে আজ জ্যোৎস্না খূঁজবো না। স্ট্রীট লাইটের আলো সব শহরে সোডিয়াম কেনো হয়, তা ভেবে নেবো নিজে নিজে। তাই পালটে যাবে আমার নেভী ব্লু জিন্সের রঙ। অচেনা মনে হবে নিজেকে। এইভাবে অচেনা হয়ে কেটে যাবে আজ সারাদিন।

আইপড পড়ে আছে টেবিলের নিচে। জীবন মুচকি হাসার গান গেয়ে, লোভ দেখিয়ে ভন্ড সুমন সেখানে মরে গেছে কবে। আজ গান শুনবো না, তাই ভেসে আসবে না – ‘রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। ভালো থাকবো আজ, কারণ – সকাল কেটে গেছে অন্য কোথাও। মনে পড়বে না - গায়ে আজ নতুন জামার ঘ্রাণ নেই। ঘরভর্তি মানুষের গমগম স্বর – কোলাহল নেই। কৃষ্ণচূড়া কেটে ফেলা ঈদগাহ মাঠের পাশের মেলা নেই। নেই খেলনা পিস্তল, রঙীণ বেলুন, সাইরেন বাঁশী কিংবা লাল-মোরগ-চকলেট লোভ। কিছুই মনে পড়বে না আজ। পায়েশ সেমাইয়ের কথাও ভুলে যাবো। এসএমএস ইনবক্স খালি থেকে যাবে আজ। হতাশ হবো জেনেও বিটিভির আনন্দমেলা দেখার রাত জাগবো না। এইসব না হওয়ার দিনে আমি বুঝে নিবো – আজ আলাদা কোনো দিন নয়। আজ মঙ্গল অথবা বুধবার। অন্যসব দিনের মতোই সবকিছু সাদামাটা আজ।

ঘুমানোর আগে নিউজ চ্যানেলে দেখবো – কাল সম্ভাব্য টেম্পারেচার বারো অথবা তেরো। বৃষ্টি হবে। সকালে ছাতা নেবো কিনা ভাবতে ভাবতে আজ আমি ঘুমিয়ে যাবো। এভাবে আজ আমি সচেতনভাবে ভালো থাকবো খুব।
.

.
.

2 মন্তব্য::

রেজওয়ান,  07 October, 2008  

আহারে প্রবাস জীবন....

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP