17 September, 2008

যখন ভেলা ভাসলো ওপারে

বছর দুয়েক আগে যতগুলো যোগ্যতা আর মান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান এম্বেসিতে ভিসার জন্য এপ্লাই করেছিলাম, ততগুলো কাগজ ঠিক একই ফাইলে সাজিয়ে আমার শেষ কৈশোরে দেখা মুগ্ধতা জাগানো বুক-ধড়াস স্নিগ্ধ-স্মিত মেয়েটির বাবার কাছে গেলে, তিনি অন্ততঃ দ্বিতীয় বিবেচনা মাথায় রাখতেন, এবং আমি নিশ্চিত আমাকে তিনি বলতেন – তুমি ‘প্রি-বিয়া-এসেসমেন্টে’ পাস করেছো। অস্ট্রেলিয়ান এম্বেসির মতো ‘প্রি ভিসা এসেসমেন্টেই’ মুখের উপর না বলে দিতেন না। সে-ই ব্যর্থতা শোক পেরিয়ে এবার যখন কানাডিয়ান ভিসার জন্য এপ্লাই করলাম, তারা আমাকে তিন দিনের মাথায় খুব সুন্দর করে বলে দিলো, তোমাকে ভিসা দেয়া হলে তুমি কানাডাতেই থেকে যাবে, বাংলাদেশে ফেরার কোনো সম্ভবনা তোমার নেই। সেই জন্য তোমাকে ভিসা দেয়া হলো না। ভিসা গাইডলাইনের তেরো নম্বর সেকশনে বলা আছে, তুমি যদি মনে করো তোমাকে প্রত্যাখান করার কারণগুলো যথেষ্ট পরিমাণে পাল্টেছে, তুমি ২য় চেষ্টা করে দেখতে পারো।
এবার আমি চোখে ধোঁয়া দেখি। আমার মনে হলো, আমার হতে-পারতো-শ্বশুর আমাকে বলছে, ‘তোমাকে জামাই করে নিলে, যথেষ্ট সম্ভবনা আছে, তুমি আমার বাড়ীতে ঘর জামাই থেকে যাবে, নিজের ঘরে আর ফিরবে না, এই জন্য আমি তোমার কাছে আমার মেয়ে বিয়ে দেয়া দূরে থাক, ঘরেই ঢুকতে দিবো না।‘
আমি কী করে বুঝাই, আপনার ঐ হীমপূরীতে দীর্ঘদিন থাকার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নেই, পাঠশালার বছর ঘুরলেই আমি ফিরে আসবো। আপনার ঘরের জ্ঞানকন্যা আমার সাথেই ফিরবে, আমার ঘরে-দেশে আলো-হাওয়া দিবে। অনেক ভেবে আরেকবার বুঝানোর চেষ্টা করি, এবং কোনো এক রহস্যজনক কারণে, তিনি/তারা বুঝেন। আমাকে প্রবেশপত্র দেন। আমি চোখ ভিজিয়ে ভেলা ভাসাই এপারে।

পশ্চিমা জীবনের গতি কিংবা স্থবিরতা নিয়ে যতোটা অহম কিংবা হতাশা শুনেছিলাম, তার বিন্দুমাত্রও আঁচ পাইনি গত দু’সপ্তায়। ব্যাগ-বাকশো খোলার আগেই ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, ক্লাসের আগে মেইলে এসে গেছে এসাইনমেন্টের লিস্ট। আবার ছাত্র হয়ে মাস্টারের সামনে সুবোধ সাজি। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। জরুরী দুটো জিনিস এখনো আয়ত্বে আসেনি, মোবাইল ফোন – বাসায় ইন্টারনেট। পকেটের ওজন এবং সম্ভাব্য চাপও মাথায় রাখছি। এক সময়কার নিত্য প্রয়োজন এখন সাময়িক বিলাস মনে হচ্ছে। খানিক গুছিয়ে উঠলে ফোন-নেট হাতে আসবে। তবে ক্রমাগত দৌড়ের উপর আছি, সকালে ঘুম থেকে উঠে বাস ধরি, তারপর ট্রেন। আবার খাতা কলম মন কান হাতের সংযোগের চেষ্টা। মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে যাই, কী বলে প্রফেসার কিচ্ছু বুঝি না। নিজের মতো করে ১৮০ মিনিট বকবক করে হাতে ধরিয়ে দেয় ৩০ পৃষ্ঠার কেইস। বুঝি, আজ রাতেও ঘুমের মাত্রা কমে গেলো। বাসায় ফিরতে রাত। বেলা ডুবে পৌণে আটটায়, এভাবে সন্ধ্যাটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে হারিয়ে যায়। আবার ভাবি, কাল সকালের দৌড়ের কথা। ঠান্ডাটা ঘুমের জন্য দারুণ, কিন্তু অমিত আহমেদ ফোনে বলছে – ‘এটা কোনো ঠান্ডাই না।‘

জানালার দিয়ে বাইরে তাকাই।
গাছের পাতা হলুদ হয়ে আসছে, পাতা ঝরছে।
আর ভাবছি, সময়টা আরও দ্রুত পার হোক...।

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP