16 September, 2008

নীল নির্বাসনের পরবাস

ঢাকা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে যখন নিচে নামছি, ভাবছি ১ নম্বর গেইট ডানে নাকি বামে, খানিক ঠান্ডায় জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাঁধের ব্যাগের ওজন বয়ে নিয়ে সামনে আগানোর চেষ্টা করছি তখন এক অদম্য শক্তি ভর করে মনে। পেছনে কয়েক কদম, তারপর কাঁচ, আরো কয়েক পা, তারপর আবার কালো কাঁচ; সেখানে আমার শেঁকড়, আমার ডালপালা, আমার প্রবহমান স্বত্বার টান; আমার আমি। একটু আগে ৪টা ১৮ মিনিটে সকালের আজান শোনা গেছে। অন্যরকম ধ্বনি। এ আজান আঁধার কেটে আলো আসার প্রতীক, খারাপ সময় পার হওয়ার সুত্র। অথচ আমি আবার এক নিঃসংগতার মাঝে যাত্রা শুরু করছি। মনে যা-ই হোক, যেতে হবে – জেগে থাকতে হবে – কাটাতে হবে আরও ২৭ ঘন্টা; এসব নিয়েই ১ নম্বর কাউন্টারে এসে থামি।

কুয়েত এয়ারওয়েজে অনেক লোকের ভীড়। সিক্যুরিটির বাড়াবাড়ি। মানুষের গিজগিজ। বেশিরভাগ কাজের সন্ধানে যাওয়া স্বপ্নভূক মানুষ, আশাবাদী কিংবা আশাহত মানুষ, মধ্য বয়সের থেবড়ানো মুখ, চেহারা, উঠতি কিশোর, মায়াবী চাহনী। কারো কারো তখনো ভেজা চোখ। মোবাইল ফোন বেজে চলেছে, কথা বলছি। ভালো আছি, ভালো থেকো।


ফ্লাইট কে ইউ ২৮৪।
২৩ নম্বর রো’তে সীট।
শেষবার যখন ব্যাংকক গেলাম সেবারও এরকম সীট পেয়েছিলাম, কম্পার্টমেন্টের সামনের সারি। সেবার অস্বস্তি ছিল, নাক বোঁচা চিকনা ঠোঁটের এয়ার হোস্টেস দুজন সামনে বসে থাকে মুখোমুখি। আরাম করে পা মেলা যায় না। কতক্ষণ আর সামনে তাকিয়ে থাকা যায় একটানা? এবার সামনে এক সীট। কুয়েত এয়ারওয়েজ ঢাকা-কুয়েত রুটে বাঙালি ক্রু নিয়েছে। আমার ডান পাশে কুয়েতগামী শ্রমিক ভাই। বামে স্মিত তরুণী, শান্ত-সৌম্য বেগম রোকেয়া; গন্তব্য নিউইয়র্ক। তার বামে উচ্ছ্বল লন্ডনী কন্যা।


সময় পাঁচটা দশ।
ফোনবুক থেকে ধরে ধরে কল করি। কারো ঘুম ভাঙাই, কারো সেহরী-উত্তর সুখ ঘুমে ব্যাঘাত দিই, কেউ হয়তো ফোন ধরে না। কিছু এসএমএস। খেয়াল করি ফোন সেট পাল্টানোয় অনেক নম্বর আর কাছে নেই। কথা বলি, বলতে থাকি। হায় কথা! পাঁচটা তিরিশে দোয়া খায়ের, কুয়েত প্রচারণা শেষে প্লেন নড়েচড়ে উঠে। রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উঠে।


নিচে পড়ে থাকে ঢাকা; আমার প্রিয় শহর।
স্মৃতির শহর, আনন্দের শহর, স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভংগের শহর, প্রিয় বন্ধুতার শহর, অভিমানী বন্ধুর শহর, অচেনা মানুষের শহর, ধুলোর শহর, কাদার শহর, পত্রিকা কিনে বাসায় ফেরার শহর, সিংগাড়া ডালপুরির শহর, মেঘ গুমোট বিকেলে বাদাম মুখে দ্রুত পায়ে ঘরে ফেরার শহর। অসংখ্য বিরক্তি আর অনাগত স্বপ্নের শহর।
এবং আমার মা।


ই-টিকিট হাতে পেয়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল করপোরেশনের স্টাফ শামীম ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কেমন কথা – সাড়ে পাঁচ ঘন্টার পথ, খাবার দিবে না?’ শামীম আমার দিকে মুচকি হাসি দেয়। বলে, ‘ভাই রাগ কইরেন না। কুয়েত এয়ারলাইন্সের ধারণা হলো এ রুটে যারা যায় তারা বেশির ভাগ আদম। আগে খাওয়া দিত – সব ফেলে টেলে সীট নষ্ট করত, তাই এখন খাবার বন্ধ করে দেয়া হইছে, টিকিটের দাম কম। আপনি নিজে কিছু খাবার ব্যাগে রাইখেন।‘
আমার আর অপশন নেই। শেষ মুহুর্তে সীট পাওয়াই কষ্ট হলো, ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজে আরো ২৫ হাজার টাকা বেশি।
শামীমের কথা ঠিক হলো না। সকালের নাস্তা পেলাম। যথেষ্ঠ এবং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। কয়েকবার রিফ্রেশিং টিস্যু, শেষে আবার চা-কফি। কুয়েত এয়ারের সীট ভালো, প্রশস্ত। আমি চলেছি পূর্ব থেকে পশ্চিমে। ক্রমাগত সকাল হচ্ছে। আগে বোর্ডিং্যের সময় উইন্ডো সীট দেয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করতাম। এবার করা হয়নি। ডান পাশের জন জানালা দিয়ে নিচে দেখছে, আবার ঘুমাচ্ছে। আমি কয়েকবার ‘বাংলাদেশের ছোটগল্পঃ জীবন ও সমাজ’ পড়ার চেষ্টা করলাম। মন বসে না। ক্লান্তি, ঘুম। চোখ লেগে আসতেই ঘুম ভাঙে ‘আরে নিচে তো সব বালুর টাল’ শুনে। ডানে ঘাঁড় এগিয়ে দেখি নিচে মরুভূমি। বালির জগত। মনে হয় মাঝে-টাঝে কোথাও ক্রেন দিয়ে কিছু করা হয়েছে। রোদের তীব্রতায় স্পষ্ট দেখা যায় না। মোবাইলে ছবি তোলার চেষ্টা করলাম, কেমন হলো জানি না।
এভাবে পাঁচ ঘন্টা চল্লিশ মিনিট যায়।
প্লেন নিচু হয়ে আসে। কুয়েত শহর দেখা যায়। হায়, এ কেমন শহর! পুরোটাই খালি, গাছ নেই, পানি নেই। কিছু কৃত্রিম বুনো ঝাড়। আর্টিফিসিয়াল জলাধারও দেখলাম বোধ হয়। আমি সবুজ দেশের মানুষ, এ বড়ো খাপছাড়া লাগে চোখে। বালির মাঝে সুরম্য দালান, গাড়ী ছুটছে। তখন আমার কেবল খালাতো ভাই সাঈদের কথা মনে পড়ে। এ শহরে সে ছিলো, চার বছর কিংবা আরও বেশি। ছুটি শেষে আবার ফিরবে ক’মাস পরে। এ অচেনা দেশে বাচ্চা ছেলেটি কীভাবে থাকে একা একা?


কুয়েত এয়ারপোর্টে নামি। নামে অনেকেই দলে দলে। শ্রমজীবি মানুষ, সংসারী মানুষ। ঢাকা থেকে আমাকে বোর্ডিং পাস দেয়া হয়েছে দুটা, ঢাকা-কুয়েত, কুয়েত-লন্ডন। ডানে বামে গিয়ে গিয়ে ২৩ নম্বর গেইট খুঁজি। হাতে সময় ৪ ঘন্টা, এ সাহসে ধীর পা চালাই। পেয়ে গেলাম কাছেই। অপেক্ষা করতে হবে। তাই অপেক্ষা করি, বসে থাকি। হঠাৎ মনে হয় ওয়্যারলেস ইন্টারনেট পাই কিনা দেখি। ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করে চালু করে কয়েক চেষ্টায় ইন্টারনেট পেয়ে গেলাম। জিমেইলে আলবাব ভাই অনলাইনে। টুকটাক কথার ফাঁকে মনটা অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে গেলো, তাড়াতাড়ি আব্বুকে মেইল করলাম। আলবাব ভাইকে আব্বুর ফোন নম্বর দিয়ে বললাম, আব্বুকে জানানোর জন্য যে আমি এখন কুয়েত এয়ারপোর্টে, আব্বু যেনো এক্ষুণি মেইল চেক করে...। আলবাব ভাই দ্রুত জানালেনও। আব্বুর মেইল রিপ্লাই পেলাম কয়েক মিনিট পরে, আবার জবাব দিলাম, বঙ্গকাকা মেইল করলেন, সেটাও জবাব দিলাম। বাকি সবাইকে মেইলে জানালাম, আমি এখন কুয়েত এয়ারপোর্টে। এরপর আলবাব ভাইর সাথে চ্যাট করি। মাঝে দ্রুত সচলে লাইভ পোস্ট দিই, লক্ষ্যতীর ধুসর গোধুলী। কনফুসিয়াস অনলাইনে আসে, কথা হয়। আর খেয়াল করি ল্যাপটপের চার্জ প্রায় শেষ। চার্জার দিয়েছি লাগেজে, বেল্টে। বুঝি – ভুল হয়ে গেছে। ঘন্টা সময় চোখের পলকে কাটে। ধন্যবাদ হে অন্তর্জাল। কবিগুরু নেই, ধার করে বলি – ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি, কতো ঘরে দিলে ঠাঁই, দূরকে করিলে নিকট বন্ধু, পরকে করিলে ভাই।‘ ল্যাপটপ বন্ধ করে আরো আড়াই তিন ঘন্টার অপেক্ষায় চেয়ারে পিঠ লাগাই। কোন এক অদ্ভুত কারণে সাথে থাকা জিপির সীমওলা নোকিয়া ফোন সেট অটোমেটিক্যালি কুয়েতের টাইম এডজাস্ট করে নিয়েছে। আমার হাত ঘড়িতে থাই টাইম। দু’মাস ঘড়ি পড়িনি, তাই সময়ও পালটানো হয়নি। ফেলে আসা সময় না হয় এভাবেই থাক!


এবার মানুষ দেখি। নানান রকম মানুষ। লম্বা সুঠাম দেহের আরব মানুষ। পা-থেকে-মাথা-ঢাকা আরব রমনী, জোব্বাওলা তক্তা শরীরের কিশোর। আশেপাশে বাংলা শব্দ কানে ভেসে আসে, একটু আগে চ্যাটে আলবাব ভাই যেমন বলছিলেন, কুয়েত এয়ারপোর্ট আমাদের দখলে – ক্লিনিং স্টাফ বেশিরভাগ দেখি বাঙালি। একজন এসে জিজ্ঞেস করলো, মামা লন্ডন যাইবেন। আমি হাসি দিই, বলি - ভালো আছেন? জানি না উনারা কেমন ভালো আছেন, ক’সপ্তাহ আগে শ্রমিক বিক্ষোভে শত শত বাঙালি দেশে ফিরে গেছে খালি হাতে, রক্ত মাখা জামায়, ভেজা চোখে। রিপোর্ট দেখেছি টিভিতে, পড়েছি দৈনিকে, সাপ্তাহিকে। সারা দুপুর রোদের মাঝে খালি গায়ে দাড় করিয়ে রেখেছে, বসতে দেয়নি মিনিটের জন্য, অর্ধেক রুটি খেতে দিয়েছে। ঘর থেকে ধরে নিয়ে গেছে নিরীহ মানুষকে। এসব মনে পড়ে। তাই সামনে হেঁটে যাওয়া কুয়েতি পুলিস কিংবা সিক্যুরিটি গার্ড দেখে বিতৃষ্ণা আসে মনে। এ সুঠাম শরীরের দানব টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে আমার দেশের হাড্ডিসার মানুষটিকে। মা ফেলে আসা সেসব মানুষকে পিটিয়েছে এ কুয়েতি পুলিস। এসব ভাবতে আমার আর ভালো লাগে না। পেছনে ম্যাকডোনাল্ডস, কফি শপ। সামনে ২২ নম্বর কাউন্টার, তার বামে ২৩ নম্বর। পাশে কিছু ভারতীয় বসেছে, হিন্দিতে কথা বলছে। ২৩ নম্বর গেইটের সামনে এক বাঙালি পরিবার অপেক্ষা করছে, হয়তো লন্ডন যাবে। সামনে দিয়ে বেশ কয়েকবার উচ্ছ্বল লন্ডনী কন্যাটি চক্কর দিয়ে গেলো, কোথাও বসছে না, চলনে অস্থির। আমার বাম পাশের চেয়ার খালি। সেখানে ব্যাগ রেখেছি। সামনে তাকিয়ে আছি, ভাবছি আর কতো দূর, আর কতোক্ষণ, কবে পৌঁছাবো আর কবেই বা দেশে ফিরবো; দুটোই।


সালোয়ার কামিজ পড়া বাংলাদেশি মহিলা সাথে বাচ্চা নিয়ে বাম পাশ থেকে হেঁটে আমার সামনে এলেন, ইংরেজিতে বললেন – ‘পাশের সীটে বসতে পারি?’
ব্যাগ সরিয়ে জায়গা দিলাম। দু’হাত গুটিয়ে সামনে স্থির তাকিয়ে আছি। বাচ্চাটি অস্থির। মায়ের কাছে কলম চাইছে, মা কলম দিলো, বাচ্চা এবার কলম দিয়ে মায়ের ট্রাভেল ব্যাগে আঁকিঝুকি করার চেষ্টা করছে। মা বলছে ওখানে লিখো না, পার্টস থেকে কাগজ দিলো, সেখানে এস এ এম আই এ, সামিয়া লেখা শিখাচ্ছে। আমি কানে শুনছি, চোখে দেখছি। এভাবে সময় যায়। আমি চাইছি আরও দ্রুত সময় যাক। ডান পাশের ভারতীয় লোকটি উঠে গেলে আমি এক সীট ডানে সরে বসি, বাচ্চাটিকে বলি- তুমি এখানে বসতে পারো। বাচ্চা হাসি মুখে পা ঝুলিয়ে বসে। মা শিখিয়ে দেয়, ‘থ্যাংক ইউ বলো’। বাচ্চা তা-ই বলে। কয়েক মিনিট পরে বাচ্চাটি আমার জ্যাকেটে হাত বুলায়, হয়তো তার ভালো লাগে, আমি তাকিয়ে হাসি দিই। প্রত্যয়ের কথা মনে পড়ে, নুজায়রার কথা মনে পড়ে। বাচ্চাটির মা জিজ্ঞেস করে – ‘আপনি বাংলাদেশি?’
আমি জবাব দিই।
এরপর গল্প হয়। আমার ভালো লাগে। ভদ্রমহিলার নাম মুন্নী। যাবেন লন্ডন। স্বামী ডাক্তার। দেশে গিয়েছিলেন বেড়াতে, কোন এক কারণে একটু আগে আগে ফিরতে হচ্ছে। আমার চেয়ে পড়ালেখায় দু’বছরের সিনিয়র। ঢা বি, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন। রাশেদুজ্জামান স্যারকে চিনেন। আমি মুন্নী আপার সাথে আলাপী হয়ে উঠি। দেশ নিয়ে কথা হয়, পড়ালেখা, থাইল্যান্ড, এয়ার জার্নি, প্রবাস জীবন, কলেজ, ঢাকা, ফেলা আসা দেশ - স্বজন। হিথ্রোতে দু’ঘন্টায় ফ্লাইট পাল্টাতে যথেষ্ট সময় পাবো কিনা এসব বিক্ষিপ্ত আলাপ। মুন্নী আপা সুন্দর করে কথা বলেন। আমার ভালো লাগে। মনে হয়, অচেনা মানুষের সাথে চেনা মানুষের মতো করে কথা বলার গুনটি তার আছে। এক স্টিক ওয়েফার বাচ্চা, সামিয়ার হাতে করে এগিয়ে দিলে আমি নিই। থ্যাঙ্কস দিই। ভুলে যাই – ‘অপরিচিত মানুষের দেয়া কিছু খাবেন না’। মাঝেসাঝে এসব সতর্কবাণী মনে থাকে না। এবার তিনি দেশি বিস্কিটের প্যাকেট এগিয়ে দেন, অলিম্পিক কিংবা এনার্জি বিস্কিট। বলেন, ‘আরে খান খান, আমি ব্যাগে সব সময় এরকম খাবার রাখি’। এক টুকরা নিই, বলি – আমার আসলে তেমন খিদে নেই। একটু পরে ফ্রেশ রুমের খোঁজে ডানে গিয়ে ফিরে এসে দেখি ২৩ নম্বর গেইটে বিশাল লাইন ধরে গেছে, সে লাইনে মুন্নী আপা দাঁড়ানো। আমি পেছনে গিয়ে দাড়াই। মানুষ এগুচ্ছে ধীরে। আমার পেছনে এক বাঙালি ফ্যামিলি; মা, বাবা, মেয়ে। এদের দেখছি ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে। লাইনের বহর দেখে মুন্নী আপা বাচ্চা নিয়ে আবার চেয়ারে গিয়ে বসলেন। আমি গুটিগুটি পায়ে আগাই। সামনে কৃষ্ণাঙ্গ বৃদ্ধা একহাতে বই অন্য হাতে ট্রলি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একবার আমি হাত দিয়ে ঠেক দিলে বুড়ি থ্যাঙ্কস বলে। বামে কফি শপে উচ্ছ্বল লন্ডনী কন্যা এক ছেলের সাথে এক টেবিলে বসে কফি খাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে তার কোনো তাড়া নেই। এভাবে যেতে যেতে আমার পালা আসে। গেইটে ইমিগ্রেশনের মতো চেক করে। ভাবি, তোদের কী হে? আমার টিকিট আছে, প্লেনে চড়বো, রাস্তা আঁটকাস কেনো? কিন্তু না। আঁটকালো আমাকেই। কুয়েতি পৃথুলা, মুখে ভারী মেক-আপ বুড়ি। আমাকে যেতে দিবে না, কারণ আমার ভিসা আছে, রেসিডেন্সশীপ নেই। আমি বুঝাই, আমার রেসিডেন্সশীপ থাকার কথা না, আমার স্ট্যাটাস স্টুডেন্ট। অন এরাইভাল আমাকে স্টাডি পারমিট দেয়া হবে। ক্যানাডিয়ান এম্বেসির চিঠি দেখাই। বেটি মানে না। আমাকে লাইন থেকে আলাদা দাড় করিয়ে রাখে। মেজাজ চরম খারাপ হয়ে উঠে। বড়কাকা বলেছিলেন, সে-ই ‘৮৮ সালে উনার সাথে হিথ্রোতে এরকম আচরণ করেছে। কিন্তু কুয়েতে এসব বিটলামি করবে কে-ই বা জানতো? আমার পাসপোর্ট নিয়ে বুড়ি কোথায় গেলো জানি না, যাবার সময় পাশের লোককে কী জিজ্ঞেস করলো বুঝি না, ফিরে এসে বললো – ‘ওকে আনোয়ার সাদাত, ইউ ক্যান গো’। আমি হয়তো মুখে থ্যাঙ্কস বললাম, মনে মনে বললাম, ‘হারামজাদী’।


ভেতরে মানুষের গিজগিজ। আমি যখন অপেক্ষা করছিলাম তখন অনেকে চেকিং পার হয়েছে। মুন্নী আপাও। আমি ভেতরে ঢুকে উনাকে খুজি, দেখি মাঝে ডানে এক চেয়ারে বাচ্চা নিয়ে বসে আছেন। আমি এক চায়নিজ কিংবা কোরিয়ান কিংবা অন্য কোনো দেশের এক বুড়ির পাশে গিয়ে বসি। কুয়েতে দুপুর হয়ে গেছে, জোহরের আজান দিচ্ছে। এখানে আজানের ধ্বনির মাঝে মাধুর্য্য নেই। কেমন কঠিন কঠিন ভাব। হয়তো আমার মন ভালো নেই বলে, কিংবা একটু আগের তিক্ততার কারণে এমন মনে হচ্ছে। কে জানে, আমি কোথায় পাবো শৈশবে ফেলে আসা মাইক ছাড়া কোমলতায় আব্দুল হক দর্জির আজান? লাইন ধরে ধরে প্লেনের দিকে যাই। কুয়েত এয়ারপোর্ট আমার ভালো লাগেনি।


কে ইউ ১০৩।
এখানেও সীট নম্বর ২৩। ভেবেছিলাম আগের মতো সামনের সীট হবে। কিন্তু না, এবার ১ম কম্পার্টমেন্টের একেবারে শেষ সারি। বাম পাশে উইন্ডো সীট। আগের মতো পা মেলা যাবে না। ডান পাশে পেছনে টয়লেট। গরমে অস্থির লাগে। ডানের সীটে এসে বসে অক্ষয়, সুঠাম-সুদর্শন। ইন্ডিয়ান ছেলে, দীল্লির। বড় হয়েছে ইন্ডিয়া, নাইজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়ায়। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। অবরোহন কার্ডে লিখলো সিটিজেনশীপ অস্ট্রেলিয়ান। লন্ডন যাচ্ছে, ওয়ার্কিং হলিডে। দুবছর থাকবে। আরো আলাপের ইচ্ছে ছিলো তার, আমারও। তবে ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে আসলে ঘুমিয়ে পড়ি। অক্ষয় ঘুমকাতুরে সহযাত্রী পেয়ে কী ভাবলো জানি না। সে বই পড়ে, ম্যাগাজিন পড়ে। এরকম আধো ঘুম আধো জাগরণে ঘড়ি দেখি। সামনের সীটের সাথে এটাচড মিনি টিভি স্ক্রীনে মুভি দেখা যায়। আমি যখন ঘুমে অক্ষয় তখন আমার জন্য হেডফোন নিয়ে সামনে রেখে দিয়েছে। ক্লাসিক্স-হলিউড-রিসেন্ট-ইন্টারন্যাশনাল মুভি আছে। একটা ক্লাসিক্স দেখার চেষ্টা করলাম, লুটেরা ধনী স্বামীর মৃত্যুর পরে প্যারিসে এক মহিলা কিভাবে পুলিস আর শত্রু দিয়ে অনুসৃত হয় সে কাহিনী, কিন্তু মহিলা নিজেও জানে না, তার মৃত স্বামীর কয়টা পাসপোর্ট ছিল, কোথায় গেলো সব টাকা! মন বসে না, আবার পাল্টাই – আরেক ছবি, এক প্রফেসর তার ছাত্রীকে শেখাবে কীভাবে জুয়ায় জিততে হয়। এটাও ফালতু মনে হয়। দুটো ছবিরই নাম মনে নেই এখন। হিন্দি আছে কয়েকটা, এগুলোরও নাম মনে পড়ছে না, রিসেন্ট ছবি। আমি তেমন বড় মুভি ফ্যান না। মিউজিকে গিয়ে কান্ট্রি সং শুনি। একটু ভালো লাগে। মাঝে খাবার আসে। শ্রিম্পের সাথে নুডলস, মাছ, অন্যান্য হাবিজাবি আছেই। অক্ষয় রাইস-চিকেন নিলো। আমার আর ভালো লাগে না, এ যাত্রা বড়ো দীর্ঘ, বড়ো বিরক্তিকর। ক্লান্তি আমাকে চেপে বসেছে, আসার আগের দু’রাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি। প্লেনে বসে বসে কোমরে পিঠে ব্যথা করছে, পা দুটো ধরে এসেছে। একেবারে পেছনে হওয়ায় সীট পেছনে মেলতে পারছি না। ঘাঁড় সোজা করে আছি। সামনে স্কৃনে স্কাইভিউ দেখি ইস্তাম্বুল পার হই, ফ্রাঙ্কফুট, তারও আগে ইরাক, নিচে ব্ল্যাক সী। তখন আমি মুন্নী আপাকে মিস করি, আমার খুব ইচ্ছে করে কারো সাথে বাংলায় কথা বলতে । শুরুতে একবার সামিয়াকে নিয়ে ফ্রেশরুমে যাবার সময় মুখোমুখি হলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপা আপনার সীট নম্বর কতো’? এবার আমি উঠে দাড়াই পা দুটো টানটান করি। এদিক ওদিক হাঁটি। সামনে আরও দীর্ঘ পথ। লন্ডন থেকে আবার ৮ ঘন্টা। খানিক এগিয়ে সামনে যাই, ১৫ নম্বর সীটে মুন্নী আপা ঘুমাচ্ছেন, পাশে সামিয়াও ঘুমাচ্ছে। ফিরে আসি। সারা প্লেনে ৮-৯জন বাঙালি। আমিই একা, বাকী সবাই সপরিবারে। খুব একা একা মনে হয় নিজেকে। মন খারাপটা জাঁকিয়ে আসে। সীটে বসতে ইচ্ছে করে না। আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে মীরপুরে কিংবা পাতায়ায়। আমার চেনা অচেনা রুমে। আমার নিজে মতো করে ঘুমানোর বিছানায়। অসহ্য লেগে উঠে। মনে হচ্ছে পুরা শরীর খরায় মরছে, পানি শুন্যতা। আবার এগুলে দেখি মুন্নী আপা জেগে আছেন, সামিয়া ঘুমাচ্ছে, এক পা সীটের বাইরে উলটো হয়ে ঝুলছে। আমাকে দেখে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বললেন, আপনি পাশে বসেন। আমি বসি, বলি – আমার আর ভালো লাগছে না, এত লম্বা পথ। মুন্নী আপা জানালেন উনার প্লেনে দমবন্ধ বন্ধ লাগে, গরীবের ঘোড়া রোগ বলে হাসলেনও। উনার প্রথম বিদেশ যাত্রার কথা বলেন, বলেন – লন্ডনে উনার ভাইরা আশে পাশেই থাকে কিংবা একই এপার্টমেন্টে তাই তেমন খারাপ লাগে না। আমি ভাবি, আমি কোন শহরে যাচ্ছি? সেখানে আমার ভাই নেই, বোন নেই, মা নেই, বাবা নেই। আবার এক অচেনা শহরে আমি একা একা ঘুরে বেড়াবো, আকাশ দেখবো, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি দেখে মন খারাপ করবো, ঝমঝম বৃষ্টির জন্য রাত জাগবো, পোলাও খেয়ে বুরহানীর জন্য আকুল হবো। ব্লগে মন খারাপের বয়ানে বিষন্নতা বিলাবো। জিটকে অপেক্ষা করবো, কখন সৌরভ এসে বলবে, ‘কী করেন?’ আলবাব ভাই বলবেন, ‘কীরে পোলা, কী খবর?’ কনফু-তিথি-অমিত বলবে, ‘শিমুলের নতুন গল্প পড়িনা অনেকদিন’। কিংবা ধুসর গোধুলী, ‘শিমুল, ব্যস্ত নাকি...?’ রক্ত মাংসের স্বজন দেশে রেখে আমি এক ভার্চুয়াল স্বজন বেষ্টনী পালন করি, টের পাই, তারা আমার সাথেই আছেন। আমি যেখানেই যাই। গত দুদিনে জুবায়ের ভাই কেমন আছেন, সে খবর জানি নি। এসব যখন ভাবছিলাম, তখন আমি চুপ হয়ে আছি, মুন্নী আপাও চুপ, কোলে সামিয়া। আমি বলি, কষ্ট করছেন, আমি যা-ই, সামিয়া সীটে ঘুমাক। আমার আর বসতে ইচ্ছে করে না। ভীষণ মন খারাপে আমি মুন্নী আপার সাথে কথা বলতে চাইছি, সংগ চাইছি, এটাও টের পাই। কিন্তু কতোক্ষণ? লন্ডন আর বেশী দূরে নেই। আমি বরং একা থাকার অভ্যাস করি। চুপচাপ। আমাকে মেইল করবেন বলে মুন্নী আপা ই-মেইল এড্রেস চাইলে আমি কাগজে লিখে দিই। কেনো জানি মনে হয়, উনি মেইল করবেন না। আমি জানি না কেনো এমন মনে হয়। ম্যালকম গ্ল্যাডোয়েলের ‘ব্লিংক’ পড়া পুরা শেষ করলে এর উত্তর হয়তো পেতাম। ‘নামার সময় কথা হবে’ বলে, নিজের সীটে ফিরে আসি।


প্লেন লন্ডনে নামছে। নদী কিংবা লেক কিংবা অন্য কিছু দেখা যাচ্ছে। ইট রঙা শহর। টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে যাচ্ছে। স্বপ্নের শহর। মনে পড়ে টেমস নদী, শেক্সপিয়ার। মোরশেদ ভাইকে মনে পড়ে। থাইল্যান্ডে এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, সুবর্নভূমি এয়ারপোর্ট হিথ্রো থেকেও বড়ো। আমি এবার বুঝলাম, ঐ লোকের চোখ ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরে না। নজর সীমিত। হিথ্রোর বিশালতা নিয়ে আমার ধারণা ছিলো না। সবাই বলেছে, দুঘন্টা আমাকে দৌড়ের উপর থাকতে হবে। এক গেইট থেকে আরেক গেইটে যেতে ঘন্টা পার হয়ে যায়। আমি সে-ই টেনশনে আছি। প্লেন থেকে নেমেই জোরে হাঁটছি। যত জোরে হাঁটা যায়। তিন নম্বর গেইটে যেতে হবে। আমার চেয়েও দ্রুত হাঁটছে কেউ কেউ। অনেক সামনে মুন্নী আপা, সামিয়া হাত ধরা। উনারাও জোরে হাঁটছেন। একটু পরে গিয়ে ট্রানজিট-ট্রান্সফার সিগনাল ধরে আমি ডানে গেলাম। মুন্নী আপারা সোজা। আমার আর কথা বলা হলো না। বলা হলো না, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে কথা বলে আমার খুব ভালো লেগেছে।


তিন নম্বর গেইটের দিকে যখন দৌড়াচ্ছি, কাঁচের বাইরে অনেকগুলো পিয়াইএ ফ্লাইট দেখছি, আমার সামনে সে-ই ঢাকা থেকে আসা বাবা-মা-মেয়ে বাঙালি পরিবার। তারাও হয়তো ক্যানাডা যাবে। তারা ছাড়া এ পথে আর কেউ যাচ্ছে না, সামনে পেছনে কেউ নেই। এবারের প্লেন, এয়ার কানাডা ৮৫৯। তিন নম্বর গেইটে ২ ব্রিটিশ দাঁড়ানো। আমার সামনের পরিবারের বাবা জিজ্ঞেস করলো, এয়ার কানাডা ৮৫৯ এ পথে কিনা। জবাব আসলো, সামনে যাও। এ জবাবে সমীহ নেই, সাহায্য নেই, বিনয় নেই। আছে নাক উঁচা, গাম্ভীর্য্য আর দাম্ভিকতা। সিক্যুরিটি চেকে গেলাম। আমার সামনের দলের ব্যাগ, হাত ঘড়ি, বেল্ট, মানিব্যাগ সব খোলাচ্ছে। আমিও প্রস্তুতি নিলাম। সামনের মহিলাটির ওড়নাও খুলতে হলো। আমার পেছনে আরেক বাঙালি পরিবার এসেছে, স্টাফ মহিলাটিকে বলছে – ‘হাতের চুড়ি খোলো’। আমার ক্ষমতা থাকলে ঢাকা এয়ারপোর্টে সব বিদেশির জন্য এরকম খোলাখুলির ব্যবস্থা করতাম। সিকুরিটি পার হয়ে, প্যান্টের বেল্ট পরে, ঘড়ি হাতে আঁটকে, মানিব্যাগ পকেটে নিয়ে, জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে পরের রুমে যেতেই দেখি ইমিগ্রেশন, ১০-১২ কাউন্টার। এয়ার কানাডা ধরে লাইনে যাই। বাঙালি বাবাটি সিরিয়ালে। এরপর মা-মেয়ে একসাথে গেলো। তাদের ক্যানাডিয়ার পি আর কার্ড আছে। আমি একটু টেনশনে আছি। এখানে আবার কোন ঝামেলায় পড়ি। লন্ডন সময় বিকেল পাঁচটায় প্লেন নামার কথা, একটু আগেভাগে নেমেছে। এখন সময় বিকেল সোয়া পাঁচটা। পাশের কাউন্টার থেকে স্থুল সাদা মহিলা ডাক দিলো। গেলাম। কই যাবো, কি প্রোগ্রাম এরকম কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বোর্ডিং কার্ড দিয়ে ছেড়ে দিলো, বললো – গেইট কখন ওপেন হবে সেটা বোর্ডে দেখা যাবে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি বিশাল এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জ। কোথা থেকে কোথায় হারাই, এ ভয়ে দূরে যাই না। সব স্রোত মোহনায় গিয়ে মিশে, তবে এবার মোহনায় মেশার আশায় জনস্রোতে যেতে সাহস করি না। বোর্ডে দেখাচ্ছে – পাঁচটা পঞ্চান্ন মিনিটে বলা হবে এয়ার কানাডা ৮৫৯ এর জন্য কোন গেইটে যেতে হবে। আমার অন্য পাশের সোফায় বাবা-মা-মেয়ে বসে আছে। মেয়ে আইপডে গান শুনছে, মা বই পড়ছে। বাবা কোনোদিকে গেছে। সামনে বইয়ের দোকান। আশেপাশে অনেক বাঙালী দেখতে পাচ্ছি। ফোন বুথে শাড়ী পড়া সৌম্য রমনী কথা বলছে। জানি ল্যাপটপে চার্জ নেই, তবুও অন করি, দেখি ফ্রি ইন্টারনেট পাই কিনা। অনেক অপশন, কিন্তু এক্সেস নেই। মেম্বার হতে হবে, বা ক্রেডিট কার্ডে পে করতে হবে। ব্রিটিশ বেনিয়া আমাকে কোন দুঃখে ফ্রি ইন্টারনেট দিবে? মনজুরের কিনে দেয়া আইপড চেক করে দেখি, সেটারও চার্জ নেই, তাই চালু করি না। পাঁচটা পঞ্চান্ন মিনিটে ভেসে উঠলো, ৫০এ (সম্ভবত) গেটে যেতে হবে। সবাই ছুটছে, আমিও ছুটি। লম্বা পথ। গেট যেনো শেষ হয় না। শেষে গিয়ে পৌঁছলাম। অনেক স্টাফ ইন্ডিয়ান। এখানে নোটিশ দেয়া আছে কীভাবে ফ্রি ওয়্যারলেস ইন্টারনেট পাওয়া যাবে। আমার তখন সময় নেই, ইচ্ছে নেই। সমস্ত শরীর ধরে এসেছে, মনে হচ্ছে আর পারছি না। হাঁটতে পারবো না। কাঁধের ব্যাগের ওজন এবার আরও ভারী মনে হয়। এলোমেলো লাইন শেষে এয়ার কানাডায় উঠি। আবার দূর্ভাগ্য, একেবারে পেছনের সীট মাঝে। ডানে বামে কেউ নেই। ক্রু মনে হলো দক্ষিণ এশীয়। আমাকে বললো, তুমি যদি চাও, বামের জানালার পাশে গিয়ে বসতে পারো। মন্দের ভালো, জানালার পাশে যাই। প্লেন আবার নড়ে উঠে। দূরে পার্ক ইন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল(?), বাস যাচ্ছে, সময় সোয়া সাতটা। লন্ডনে তখনো বিকেলের নরম রোদ। নীল আকাশ। আমি আবার গুনি আট ঘন্টা পার হতে কতোক্ষণ লাগবে? প্লেন আকাশে উড়লে লন্ডন শহর আঁকা ছবি হয়ে যায়। মেঘে ঢেকে যায় প্লেনের ডানা। আমার ডানে মাঝের সীটে তিন শ্বেতাঙ্গ তরুণী। চঞ্চল। এবার ঘাঁড়ে ব্যথা শুরু হয়েছে। এয়ার কানাডার সীট তেমন হেলানো যায় না। ঘুমাতে পারলে ভালো লাগতো। বুকে-পেটে অস্বস্তি লাগছে। বসে বসে পা দুটো টানটান রাখার চেষ্টা করি। কিচ্ছু করার নেই। এভাবেই থাকতে হবে। টিভিতে সব ফালতু প্রোগ্রাম। পাশের মেয়েগুলো মন দিয়ে ম্যুভি দেখছে, হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আমি কফি খেয়ে চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করি। ঘুম হবে না। বাইরে আলো কমছে ধীরে ধীরে। বাংলাদেশে তখন রাত দুটা। বাসা থেকে বের হলাম ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, আমি এখনো রাত দেখলাম না। আলো আঁধার ভাবতে ভালো লাগে না, ঘুম, ঘুম দরকার। মাঝে খাবার এলো, ব্রেড বাটারের অখাদ্য। প্লেন কোথায় আছে জানি না, নিচে সাগর নাকি বরফ নাকি মেঘ জমাট বেধে আছে সেটাও বুঝি না। চোখ জ্বালা করছে। শীত করছে, মনে হচ্ছে কাঁপুনি দিবে প্রচন্ড। দুটো ব্ল্যাংকেট নিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। এভাবে কখন মাথা পাশের সীটে হেলিয়ে দিই জানি না। ঘুম। মাঝে মনে হলো আমার গালের উপর কী একটা পড়ে গেলো, হাল্কা ব্যথা পেলাম, কেউ একজন খুব করে স্যরি বললো। ঘুমে থেকেও বুঝে নিই, আমার মাথার উপরের ক্যাবিনেটটি কেবল এয়ার ক্রু’দের। ওখানে অনেক টিস্যু পেপারের বক্স দেখেছি, খুলতে গিয়ে বেখেয়ালে একটা বক্স আমার গালে পড়ে গেছে, ব্যাপার না। এই ভেবে ভালো লাগে যে, আমি ঘুমাচ্ছি। টের পাই পা বাঁকা হয়ে জমাট বেধে গেছে। এভাবে কতক্ষণ সময় যায় জানি না। ছোটোকাকার সাথে কথা বলি, প্রত্যয় ডাক দিচ্ছে, মা কথা বলছে, আব্বু সাথে আছে; বিক্ষিপ্ত খাপছাড়া স্বপ্নে গড়াগড়ি দিই। তারপর মনে হয় আমার কান দুটো বন্ধ হয়ে গেছে, কেবল ঝি ঝি শব্দ শুনছি। উঠে নাক ধরে নিঃশ্বাসে বাতাসের চাপ দিই, ঠিক হয়ে গেলো। মাথাটা হাল্কা মনে হয় আবার। ঘুম কাজে লেগেছে। পিঠ আর পায়ের ব্যথা যায়নি। আরো পরে শুনি প্লেন টরন্টো পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামবে। নিচে তাকিয়ে দেখি রাত নেমেছে। আলো ঝলমলে শহর। হিসেব মতো রাত দশটা দশে প্লেন নামার কথা। তখন নয়টা বিশ। আর সব যাত্রার মতো এটাও শেষ হয়। ভীড় তেমন নেই। ইমিগ্রেশন পার হলাম তাড়াতাড়ি। স্টাডি পারমিট পেতেও সময় লাগলো না। সব কাজ হয়ে গেলো দশটার আগে। এবার লাগেজ নেয়ার পালা। আমি জানি, এখানে আমার ভোগান্তি আছে। প্রতিবার যা ঘটে, ঘটেছে আগে, এবারও তা হবে। আমার লাগেজ পাওয়া যাবে না। কিংবা দেখা যাবে সবাই চলে গেলে একেবারে শেষে আমার লাগেজ হেলে দুলে আসবে। যেনো মহল্লার নষ্ট ছেলে রাত হলে ঘরে ফিরে। অপেক্ষায় আছি। তাড়া নেই। দেখি দ্রুত আমার দুটো ব্যাগ চলে এলো। জানতাম, এখানে কড়ি না ফেললে মাল নেয়ার ট্রলি আসে না। এক্সিট গেইট দূরে না। ভাবলাম কষ্ট করে বাইরেই যাই। কাঁধে সাত আট কিলো। ডান হাতে তেইশ, বাম হাতে বাইশ। সব মিলিয়ে বাহান্ন-তিপ্পান্ন কিলো। টেনে হিচড়ে বাইরে আসি। বন্ধু আসাদ করিম প্রিয় অপেক্ষায় থাকার কথা। কেউ নেই। মিনিট পাঁচেক এদিক ওদিক তাকাই। অচেনা এয়ারপোর্টে বুঝতে পারি না, কোথায় কতোটুকু কেউ রিসিভ করতে আসতে পারে? এক্সিট সাইন ধরে লিফটে করে উপরে উঠি। ঘামছি প্রচন্ড। চলে এলাম পার্কিং পর্যন্ত। এখানেও কেউ নেই। কোথায় যাই। কীভাবে ফোন করি। হেল্প-সার্ভিস কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলে বললো, নিচে ফোন বুথ আছে। আবার নিচে যেতে হবে! একটু দূরে দেখি খালি ট্রলি পড়ে আছে, মাল নিয়ে মালিক গাড়ীতে উঠে গেছে। ওদিকে গিয়ে ফ্রি ট্রলিতে লাগেজ ব্যাগ চড়িয়ে খানিক স্বস্তি পাই। এয়ারপোর্টে বিজ্ঞাপন দেয়া আছে, ফ্রি ওয়্যারলেস এভেইলেবল। ল্যাপটপ চালু করি। চালু হয় না। চার্জ একেবারেই নেই। নিচে নামি। থাই ভিসা / এটিএম কার্ড দিয়ে ফোন করার চেষ্টা করি। কাজ হয় না। আশে পাশে মানি এক্সচেঞ্জ চোখে পড়ছে না। আমার পাশের বুথে এক বুড়ি মহিলা ফোন শেষ করলো। আমি ওকে কার্ড দেখাই, ফোন করার নিয়ম কী? আমার কার্ড নিচ্ছে না কেনো? বুড়ি একবার দেখলো, কাজ হয় না। শেষে আমাকে বললো, লোকাল কল করবে যখন এই এক ডলার নাও, ট্রাই করো। আমি একটু সংশয়, একটু বিনয় এবং পূর্ণ কৃতজ্ঞ চিত্তে এক ডলার নিলাম। এবার লাইন পাওয়া গেলো। এ সাহায্য নেয়ার কারণে আমার মনের ভেতর একটু খুতখুত লাগে। ব্যক্তিগত অস্বস্তি। আবার ভাবি, রূপকথার রাজ্যে এরকম বুড়ি’মা বারবার সাহায্য করে গল্পের নায়ককে, সে রাজপুত্র কিংবা গরীব কৃষকপুত্র যে-ই হোক না কেনো। রূপকথা নানাভাবে আমাদের জীবনে সত্যি হয়ে আসে, কোটাল পুত্র – রাজকন্যার ব্যবধান হলিউডে নানারূপে নির্মিত হয় বারবার। ফোন ধরে প্রিয় অবাক হলো, আমি এতো দ্রুত কিভাবে বের হলাম। আমারও ধারণা ছিলো দশটা দশে নেমে সব শেষ করে বের হতে হতে সাড়ে এগারোটা বারোটা বাজবে। প্রিয় তখনো বাসায়, বললো – এক্ষুণি রওয়ানা দিচ্ছে, ৪৫-৫০ মিনিট লাগবে। আমি কোন টার্মিনালে আছি ঠিক বলতে পারি না। দূরে সাইন দেখা যাচ্ছে ৩ নম্বর টার্মিনাল। বললাম, ৩ নম্বর টার্মিনাল। ফোন রাখলাম। সামনে যেতেই দেখি আমি আসলে ১ নম্বর টার্মিনালে। ঐ সাইন ছিলো ৩ নম্বর টার্মিনালে যাবার সাইন। ৩ নম্বর টার্মিনালে যাওয়ার জন্য লিফট ধরে উপরে যাই। পাশের বির্ল্ডিং্যে গিয়ে শুনি সেখানে যেতে হয় ট্রেনে করে। হায়, কে আবার ট্রেনে হারাবে? ফিরে আসি। পকেটে কড়ি নেই যে ফোন করবো। মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার পেলাম। একরকম ডলার পালটে অন্যরকম ডলার নিলাম। পঞ্চাশ সেন্ট ফেলে আবার ফোন করি, প্রিয় বলে - রোড ব্লক করা, জ্যামে আঁটকে আছে। আমি জানাই, অসুবিধা নেই – আমি এক নম্বর কাউন্টারে আছি। তারপর অনেক কথা হয়। পথের গল্প। ফেলে আসা দিনের গল্প। আগামীর গল্প। আবার ফোন রেখে একপাশে চেয়ারে বসে থাকি। কানাডায় সময় রাত সাড়ে এগারোটা। ঢাকা থেকে রওয়ানা দিলাম ২৮ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ক্যালেন্ডারের পাতায় তখনো ৩রা সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশে ৪ তারিখ সকাল সাড়ে নয়টা। এসব যখন ভাবছিলাম তখন ক্লান্ত ঝাপসা চোখে দেখি দুজন মানুষ আমার দিকে হাত নেড়ে এগিয়ে আসছে।


বন্ধু দম্পতি প্রিয়-রুমকী।
আমি তাদের দিকে আগাই।

.
.
.

2 মন্তব্য::

নজমুল আলবাব 17 September, 2008  

কি মন্তব্য করা যায় বলোতো?

ভাল থাকবা। সবসময়, সবখানে।

আনোয়ার সাদাত শিমুল 24 September, 2008  

অনেক ধন্যবাদ, আলবাব ভাই!

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP