23 May, 2008

দ্রোহের আগুনে জ্বলে দ্রোহীর জন্মদিনের মোমবাতি

শম্পার সাথে আমার ইটিশপিটিশ তখন শাহবাগের মৌরী, নাজিমুদ্দিন রোডের নীরব কিংবা অসংখ্য বাদামওয়ালা পেরিয়ে বনানীর নিউ ইয়র্কারে গিয়ে পৌঁছেছে। সেরকমই এক মংগলবারে মে মাসের ২৩ তারিখে বিকালে বসে দুইজনে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাই, সামনে বড় কফির মগ থেকে ধোঁয়া উড়ে। শম্পার সাথে এ পথ চলা এবং ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে শম্পার চেহারা পুরাটা এক মনে হয়। কেবলই ধোঁয়াটে। এসব যখন ভাবছিলাম, তখন শম্পা বলে – ‘তাড়াতাড়ি কফি শেষ করো, সোবাহানবাগ যাবো’।
আমি বুঝলাম না, হঠাৎ করে সোবাহানবাগের দরকার হলো কেনো? তবে চুপ থাকলাম, নিঃশব্দে কফিতে চুমুক দিই। আমার নীরবতা দেখে শম্পা বলে, ‘আপুর বাসায় যাবো, তুমিও যাবে, প্রোগ্রাম আছে।‘

এরপরের সময়টুকু কথা ছাড়াই কাটে। সিএনজি থামিয়ে সুমি’জ থেকে কেক কিনে, আমি একটু গা ঘেঁষে – ‘কার জন্মদিন’ জিজ্ঞেস করলে শম্পা ‘ভীতূর ডিম কোথাকার’ বলে ভেংচি কাটে। এই ভেংচির অর্থ হতে পারে – ‘তুই একটা গাধা’ অথবা ‘ওরে আমার গুডি বয় রে...’। এইসব সম্ভাব্য অর্থে হাবুডুবু খেয়ে বিজয় স্মরণী – শ্যামলী পেরিয়ে সোবাহানবাগে একটা বাড়ীর সামনে সিএনজি থামলে, শম্পা বলে – ‘নামো’।

আমি অনুগত ছাত্রের মতো তাকে ফলো করি। সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠি। কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে যায়। কিন্তু এ কী!
এমন শব্দ করে কোন যুবক কান্না করছে?
আমি চোখ কচলাই, স্বপ্ন দেখছি না তো?
দুই হাতে নিজের কানে চাপ দিই – বাইরের গাড়ীর হর্ণে কানের পর্দা ফাটেনি তো?
নাহ, ঠিকই আছে।
তাহলে, এরকম ভরাট গলার যুবকের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে কোত্থেকে?
‘আমি প্যান্টাসি কিন্ডমে যাবো, আমাকে নিয়ে যাও, আমি যাবো’ - বলে কান্না করছে কে?
আবার মনে হয়, টিভিতে নাটক হচ্ছে না তো, যে নাটকের সংলাপ শুনছি!
শম্পাও আমাকে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেলো। এবার নিশ্চিত হই এ কান্না – এ হাহাকার নাটকের সংলাপ হয়, কারণ – যুবকটি বলছে, ‘শম্পা, তোমার আপুকে বলো আমাকে প্যান্টাসি কিন্ডমে নিয়ে যেতে, আমি রুলার কুস্টারে চড়বো’। শম্পা কী বলে শুনি না, তবে আরেক অগ্নিকন্ঠা, দ্য এরাবিয়ান নাইটসের মালিকা হামিরার মতো, বলে – ব্যালকনিতে নিয়ে সোজা নিচে ফেলে দেবো, তখন বুঝবে রোলার কোস্টারের মজা। তখন যুবকটি ফ্লোরে হাত পা আছড়ে চলেছে। ভেঁউ ভেঁউ কান্না করছে।

আমি বাদাইম্ম্যা হয়ে বসে থাকি। একটু পর শম্পা আসে, সাথে ঐ অগ্নিকন্ঠা (তবে দেখতে শম্পার মতোই...) আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, এ হলো আমার আপু, আর আপু এর কথা তোমাকে বলেছিলাম, ও হলো...
শম্পা আর আমার নাম বলতে পারে না, বড় আপু বলে – ‘নাম জানি, এই ছোকড়া তুমি বিড়ি খাও?’
আমার হাঁটু ততক্ষণে কাঁপাকাপি শুরু করেছে।
আপু আবার বলেন, ‘বিড়ি না খেলে ঠোঁট এতো কালো কেনো? আজ কটা খেয়েছ বলো?’
আমি থতমত খেয়ে বলি, ‘আ-প-উ, আমি তো বিড়ি খাই না, শুধু শম্পার সাথে মাঝে মাঝে ফ্রেঞ্চ খাই?’
আপু হাতের খুন্তি উপরে তুলে বলেন, ‘কী খাস? কী ফ্রেঞ্চ...’
আমি তড়িৎ সামলে নিয়ে বলি – ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রা-ই খাই’।
এবার ভেতরে রুম থেকে হাত পা বাঁধা সে-ই যুবক, যাকে শম্পা একদিন দূর থেকে দেখিয়ে বলেছিলো - উনি আমার দূলাভাই, তিনি খুড়িয়ে হেটে বের হয়ে আসেন। ভদ্রলোক অনলাইনে দ্রোহী নিকে পরিচিত। আমি শম্পাকে বলি – ‘শম্পা আমি আসি’, শুনে দ্রোহী ভাই বলে – ‘ভাইরে, আমারে উদ্ধার করেন। আজ জন্মদিনে প্যান্টাসি কিন্ডমে যেতে চাইলাম বলে সারাদিন হাত পা বেধে রেখেছে, এই অত্যাচার...’।

আমি কিছু বলার আগেই আপু বলে, ‘এই শম্পা, তোর সাথে আসা বলদাটারেও ধর, দুইটারে একসাথে বান্ধা দরকার। ওদের হাড্ডি-গুড্ডি ভেঙে আমরা ফরিদপুরের ভাঙা থানার মান রক্ষা করবো। শম্পা আমার হাত ধরতেই আমি হাঁটুপানির জলদস্যু স্টাইলে যত্ন করে কামড় দিয়ে এক দৌড়ে ভোঁ... রাস্তার ওপারে।

হোটেল নীদমহলের সামনে দেখি অনুভূতিশুন্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে হেসে বলে – কী, ক্যামন দৌড়ানি দিলো? আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বলি – চলেন ৯নম্বর বাস আসছে উঠি। অনুভুতিশুন্য লোকটি আমাকে থামায় বলে দেখেন কে যায়। দেখি রিকশায় বসে পায়ের উপর পা তুলে এক হাতে হুড ধরে, আরেক হাতে খাজানার মিষ্টি নিয়ে শম্পাদের বাসার গলির দিকে যাচ্ছে ধুসর গোধুলী।

আমরা দুজনই বলি – ‘আল্লাহ জানে, ধুসরের কপালে আজ কি আছে। তবে রশি-বান্ধা ধোলাই নিশ্চিত।‘

এরপর তো অনেক কিছু ঘটে। আলাবামা কাহিনীর টুকটাক ব্লগেও প্রকাশিত হয়। মন্দ লোকেরা বলে, আলাবামায়ও সে-ই যুবক মাঝে মাঝে কাতর স্বরে কান্না করে। তবে আজ আমরা আর সে-সব দুষ্ট গল্প শুনবো না।

আজ ২৩ মে। আজ খুব চমৎকার একজন মানুষ – দূর্ধর্ষ ব্লগার দ্রোহীর জন্মদিন। জন্মদিনে অযুত নিযুত শুভকামনা।

অরল্যান্ডো ফ্লোরিডাতে ওয়াল্ট ডিজনী ম্যাজিক কিংডম, আর ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে তিন দিন আনন্দে কাটুক।

ভালো কাটুক সবসময়!

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP